সম্ভাবনা ছিল মহাকাব্যের -সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

Print Friendly and PDF

১৯৭৮-এ ভাষা আন্দোলনের ওপর আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। তাতে যা বলেছিলাম সেটি এরকমের, ভাষা আন্দোলনকে একজন বুদ্ধিজীবী ‘রায়ট’ বলেছিলেন, আরেকজন বুদ্ধিজীবী ‘ট্র্যাজেডি’ বলেছেন। কোনটি সত্য, কোন বর্ণনা? এ কি রায়ট ছিল, নাকি ট্র্যাজেডি? এ প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়, অপ্রত্যাশিত নয়, কেননা এরা উভয়েই, দু’জন বুদ্ধিজীবীই, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। পরিচিত, স্বীকৃত ও মান্য। তাহলে কি আমরা এই দুই ভিন্ন মতকে অবলম্বন করে ভাগাভাগি হয়ে যাব, আমাদের মধ্যে কেউ হবেন রায়টপন্থি কেউ ট্র্যাজেডিপন্থি? গড়ে উঠবে দু’টি পরস্পরবিরোধী স্কুল? তর্ক চলবে, বাধবে বিত-া, লাগবে কলহ?
একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনকে যিনি রায়ট বলে প্রচার করেছিলেন এক কথায় যদি তার পরিচয় দিতে হয় সাফ সাফ বলতে হবে তিনি ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল। সকল সময়ে, সর্ব অবস্থায়, সম্ভব হলে প্রকাশ্যে, অসুবিধে দেখলে গোপনে, কিন্তু অনমনীয় রূপে তিনি সামাজিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন এবং তিনি পক্ষে ছিলেন শাসন কর্তৃপক্ষের। মানসিকতায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে, অনুভবে ও কল্পনায় তিনি যে প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন, এ খবর জানতো সবাই। একাত্তর সালে হানাদারদের সঙ্গে তাকে সহযোগিতা করতে দেখে তাই কেউ বিস্মিত বা হতাশ হননি।
দ্বিতীয় বুদ্ধিজীবী, যিনি ট্র্যাজেডির তত্ত্ব দিয়েছেন, প্রগতিশীল বলে প্রায় ততটাই পরিচিত যতটা রায়টবাদী পরিচিত প্রতিক্রিয়াশীল বলে। একাত্তরে তিনি সেনাবাহিনীকে খোঁজেননি, সেনাবাহিনীই তাকে খুঁজেছে, ধরতে না পেরে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণসহ চৌদ্দ বছরের কারাদ- ঘোষণা করেছে। কাজেই অবস্থাগত দূরত্ব তাদের মৌলিক, বিরোধিতা তাদের অবৈরী নয়, বৈরী।
তাই তো বলতে হয়, বায়ান্নর আন্দোলন যদি একজনের চোখে রাত হয় অপরজনের চোখে হবার কথা দিন। বলতে হয় এ আন্দোলন যদি রায়ট হয়ে থাকে তবে এ অবশ্যই ট্র্যাজেডি নয়, আর যদি ট্র্যাজেডি হয়ে থাকে তা হলে কিছুতেই সে রায়ট নয় এবং প্রশ্ন দাঁড়ায়কোন মত আমরা গ্রহণ করব? কোন দিকে যাবরায়টের দিকে নাকি ট্র্যাজেডির দিকে? কোনটি সত্য, রায়ট না ট্র্যাজেডি?
সত্য কোনোটাই নয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটি আর যাই হোক রায়ট ছিল না। লাঠিসোঁটা বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষ পরস্পরকে আক্রমণ করেনি, যেমন করেছে, ধরা যাক, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। না, এ আন্দোলনকে দাঙ্গা বলে চালাতে হলে যে কল্পনাশক্তি আবশ্যক তা সহজপ্রাপ্য নয়। কিন্তু তাই বলে ট্র্যাজেডিও নয় এ আন্দোলন। যদি কেউ একে নাটক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন তবে তিনি অবশ্যই ভ্রান্ত। আন্দোলন নাটক ছিল না, ছিল জীবনমরণ সংঘর্ষ। যদি একে ট্র্যাজেডি বলা হয়ে থাকে এ বিবেচনায় যে এর পরিণত হয়েছে বিয়োগান্ত তবে সে-ধারণাও মিথ্যা। বায়ান্ন সালে ঢাকার রাজপথ রুধিরাক্ত হয়েছে, রক্তপাত শোক ডেকে এনেছে ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে; কিন্তু তার পরিণতি তো বিয়োগান্ত হয়নি, ওই আন্দোলন এক নতুন পথ তৈরি করে দিয়েছে, যে পথ ক্রমসম্প্রসারণশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তথা অর্থনৈতিক মুক্তির। একুশ তো নতুন জন্মের দিন, ব্যথার মধ্য দিয়ে নবজন্মের। একুশে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের মৃত্যু তো ব্যর্থ হয়নি, তারা প্রাণ হারাননি ব্যক্তিগত কোনো দুর্বলতার কারণেযেমন নাকি ট্র্যাজেডির নায়কেরা হারিয়ে থাকেন। ট্র্যাজেডি ও মার্টডম দুই বিপরীত প্রান্তের ব্যাপার, শহীদের জীবন করুণার পাত্র নয়, কখনো।
কিন্তু ঐ ‘প্রগতিশীল’ বুদ্ধিজীবী যে একে ট্র্যাজেডি বলেছেন সে অন্য এক কারণে। এই মোটা অর্থেই বলেছেন, এই অর্থে যে এ একটি দুর্ঘটনা, যাকে এড়ানো যেত এবং এড়ানো উচিত ছিল। হায়, কর্তৃপক্ষের বোকামির জন্য এমন একটি করুণ দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সাক্ষাৎকারে (সাক্ষাৎকারেই বলেছেন তিনি এই কথা) তিনি এও জানিয়েছেন আমাদের যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যদি কিছুটা কা-জ্ঞানের পরিচয় দিতেন, যদি তিনি সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন ছাত্রদের মিছিলের, তাহলে গুলিও ছুটতো না, আন্দোলনও হতো না। কিন্তু উপাচার্য তেমনটি করেননি, তাই তো আন্দোলন আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল দেশে, সেই আন্দোলনের শিখায় পুড়ে ছারখার হয়ে গেল অনেক কিছু।
এই বুদ্ধিজীবী শুধু বুদ্ধিজীবীই নন, তিনি প্রগতিশীলও এবং তিনি সমাজতত্ত্ববিদও। তিনি বলছেন, ইতিহাস অন্যপথে ঘুরে চলে যেত উপাচার্য যদি দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিতেন। ছাত্ররা বুঝি খেলাধুলা করতে এসেছিল, ভাষার প্রশ্ন বোধ করি ছিল ছেলেখেলার ব্যাপার, যেন এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না সামাজিক দ্বন্দ্বের, শাসক-শাসিতের সম্পর্কের, শোষক-শোষিতের মধ্যকার বিরোধের। ব্যাপার আরও আছে। কোন দৃষ্টিতে এই প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী দেখছেন এ আন্দোলনকে? দেখছেন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গেই ছিলেন তিনি।
শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে যাই। একজন বলছেন রায়ট, আরেকজন বলছেন ট্র্যাজেডি। অনেক দূরত্ব দু’জনের মধ্যে। কিন্তু সত্যি কি দূরে তারা পরস্পরের? তারা দু’জনেই যে ব্যর্থ হয়েছেন আন্দোলনের চরিত্র অনুধাবনে সে ব্যাপারটি তো খুবই স্পষ্ট। এখানে দুই দৃষ্টিহীনের ঐক্য। কিন্তু শুধু দৃষ্টিহীনতায় নয়, ঐক্যবদ্ধ তারা দৃষ্টিভঙ্গিতেও। যিনি রায়টবাদী তিনি এ আন্