Logo_print
 
সূচীপএ : নিয়মিত বিভাগ
[পাঠকের ভাবনা] বাঙালির বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলন

পশ্চিমে রেনেসাঁ আন্দোলন, শিল্প বিপ্লব এবং আধুনিক যুগের আদলে আমাদের এই এলাকায় ইহজাগতিক জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশে কাজ করেন রাজা রামমোহন রায় এবং কাজী আব্দুল ওদুদ। এই চিন্তা ছিল মূলত “মানবতাবাদী ধারার” (ধর্মনিরপেক্ষ) চিন্তা। এর পূর্বের ধারাটি ছিল- “ঐশ্বরিক ধারা”। রামমোহন রায় সে সময়ে তার চিন্তায় আধুনিকতার কারণে ভারতের ‘এডাম স্মিথ’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন। এছাড়াও রামমোহনকে বাঙালির সামষ্টিক জন-চিন্তা চর্চার (প্র্যাকটিস অব কালেক্টিভ পাবলিক থট) জনক বলা হয়। তিনি বাঙালির “বিদ্যানুশীলন ও জ্ঞানোপার্জনের” লক্ষ্যে ১৮২৩ সালে ‘গৌড়ীয় সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। আবার হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতিকে যুক্তিসিদ্ধ (জধঃরড়হধষরুবফ) করতে তিনি ‘আত্মীয় সভা’ নামক আরেকটি তরুণ ইন্টেলেকচুয়ালদের সংগঠন তৈরি করেছিলেন। উনিশ শতকের এই সংগঠনগুলোই ছিল বাঙালির আনুষ্ঠানিক বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলনের সূচনাকারী। এখান থেকেই বাংলার রেনেসাঁর সূত্রপাত। এ আন্দোলন থেকেই পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।
পরবর্তীতে, রামমোহনের দেখাদেখি আরও কিছু সভা-সমিতি জন্মলাভ করে। তার অনুসরণে ঢাকার কতিপয় মুসলিম শিক্ষক ও ছাত্র ত্রিশের দশকে ঢাকায় মুসলিম প্রগতির কথা চিন্তা করেন। এরা ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার কলেজগুলোর খ্যাতনামা মুসলিম শিক্ষক ও ছাত্রদের নিয়ে “মুসলিম সাহিত্য সমাজ” গঠন করেন। এই সংগঠনে পাঁচজন সদস্য ছিলেন- অধ্যাপক আবুল হোসেন, এ.এফ.এম ফরিদী, আব্দুল কাদির, আনোয়ার হোসেন এবং এ. জেড নুর মোহাম্মদ। এদের মূল লক্ষ্য কিন্তু সাহিত্য রচনা ছিল না। এদের মূল লক্ষ্য ছিলÑ
-     সাহিত্য রচনার মাধ্যমে বাঙালি         মুসলিম সমাজের কুসংস্কার         দূরীকরণ,
-    মানবতাবাদী চিন্তাধারার         উজ্জীবন এবং
-    শিক্ষিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর         ভেতর যুক্তিশীল চিন্তা-ভাবনার         প্রসার ঘটানো।
মূলত এটি ছিল বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলন। মুসলমানদের প্রথম প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। এদের ধ্যান ধারণার মূল মুখপত্র ছিল ‘শিখা’ পত্রিকা। ‘শিখা’কে বলা হয়ে থাকে ‘ঢাকার যুক্তিবাদী আন্দোলন’। “মুসলিম সাহিত্য সমাজ” কতৃক প্রকাশিত “শিখার” প্রধান ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ এবং আবুল হুসাইন। এরা বাঙালি মুসলিম সমাজে ইহজাগতিক চিন্তার প্রসারে লেখালেখি করেছেন। এ আন্দোলনে পরবর্তীতে যোগ দেন স্যার এ.এফ রহমান এবং ড. মাহমুদ হোসেন, যারা উভয়েই পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি.সি হয়েছিলেন।
লক্ষণীয় হলো, এই আন্দোলনে প্রথমবারের মতো প্রতিরোধ আসে মুসলিম জমিদার শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকপুষ্ট মুসলিম সামন্ত জমিদার গোষ্ঠিভুক্ত রক্ষণশীলদের পক্ষ থেকেই আসে প্রথম প্রতিরোধ। সে সময় এই জমিদার গোষ্ঠী এ আন্দোলনকে নাস্তিক্যবাদী অমুসলিমদের আন্দোলন বলে আখ্যা দেন। শুধু তা-ই নয়, সে সময় অধ্যাপক আবুল হোসেন ও কাজী আব্দুল ওদুদকে ডেকে নিয়ে ঢাকার নবাব পরিবার রীতিমতো কঠোরভাবে শাসিয়েছিল। ফলাফলÑ আবুল হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে এরা উভয়েই ঢাকা ছেড়ে কলকাতা চলে যান।
এই আন্দোলন যদিও ১৯৩৭ সালে “শিখা” বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিভে গিয়েছিল, তথাপি এই আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। এ আন্দোলনের কারণেই দেশবিভাগ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী বাঙালি মুসলিম শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে। এ থেকে আরও পরে দুটি ধারা তৈরি হয় একটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী শ্রেণী এবং অপরটি বামপন্থী প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী শ্রেণী।
আকিব আনোয়ার
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয়তাবোধ
স্বাধীনতার মাস মার্চ। একটি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন করে কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে শুরু হয় পথচলা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আসে বিজয়।
প্রায় চার যুগ কেটে গেছে। কিন্তু আজও কাটেনি অমানিশার অন্ধকার। ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জীবাণুর ন্যায় সংক্রামিত। যেখানে স্বাধীনতার চেতনা কিংবা দেশাত্মবোধ, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর নিকট বাঙালিদের আজীবন ঋণ এবং তার মূল্যায়ন সবকিছু ভুলতে বসেছিল দেশের আপামর জনসাধারণ।
দেরিতে হলেও পরিবর্তন আসছে ধীরে ধীরে। বিগত ১৬ ডিসেম্বরের মানবপতাকা এবং ২৬ মার্চের লাখো কণ্ঠের ‘জাতীয় সঙ্গীতের মধুর ধ্বনি অনেক আশার বাণী শোনাল। সমগ্র জাতির বিবেকে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটালো সন্দেহাতীতভাবে।
ওই দিন সারা দেশের স্কুল কলেজ কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী সকলে মিলে সারি বেঁধে দণ্ডায়মান হয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার এক অপূর্ব দৃশ্য ছিল লক্ষণীয়।
সকলের মধ্যে দেশাত্মবোধের বীজ বপন ও সাম্প্রদায়িক চেতনা উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। সংস্কৃতি বিষয়ক  মন্ত্রণালয়ের নিকট সবিনয়ে নিবেদন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানের সত্যতা সবার সম্মুখে তুলে ধরার জন্য শহীদ জহির রায়হানের জীবন্ত দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ সহ অন্যান্য তথ্যচিত্রগুলো অতি দ্রুত গ্রামেগঞ্জে প্রদর্শন করা প্রয়োজন। তাহলে হয়ত কিছু অন্ধ বাঙালির পাকিস্তানপ্রীতির অবসান ঘটবে।
তমসা, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা
Print
©2009. All rights reserved.