Logo_print
 
সূচীপএ : নিয়মিত বিভাগ
[সেই সময়] তেপান্তরের বয়সে দীপান্তর

ছেলেবেলার স্বপ্নকে চাপিয়ে বড় হয়ে ট্রেন-ড্রাইভার না হয়ে তিনি হয়ে গেলেন কবি। তার নাম কবি বেলাল চৌধুরী।
এ দেশের কবিতার ইতিহাসে অনিবার্য তার নাম। তিনি একাধারে সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক এবং সম্পাদক। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি কবি। কাব্য আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার জল বিষুবের পূর্ণিমা, স্বপ্নবন্দী, যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে, বত্রিশ নম্বর, সেলাইকরা ছায়া ইত্যাদি কাব্যের কথা এ দেশের কবি মাত্রই অবগত আছেন। কেমন ছিল এই কবির শৈশব-কৈশোর জানা যাক সেই বিষয়ে।

স্বকৃত নোমান

ফেনী থানার অন্তর্গত শর্শদি গ্রাম। সমান্তরাল রেললাইন চলে গেছে গ্রামের উপর দিয়ে। সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা এবং সারা রাত নানা ট্রেনের যাতায়াত। গ্রিণএ্যারো, উল্কা, বাহাদুরাবাদ, ঢাকা-মেইল, চট্টগ্রাম-মেইল, মালগাড়িসহ নাম না জানা কত ট্রেন। গ্রামে ছোটখাটো একটা স্টেশন আছে বটে, তবে সব ট্রেন থামে না সেখানে। দীর্ঘ হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় দূর-দূরান্তের শহর-বন্দরে।
ট্রেনের আসা-যাওয়া, ছুটে চলা, কালো ধোঁয়ার উদ্গিরণ, ডালাখোলা জ্বলন্ত ফার্নেসে বেলচা ভরে খালাসিদের কয়লা ঢালা, গার্ডের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানো, চলন্ত ট্রেনের যান্ত্রিক হুঙ্কার ইত্যাদি দেখে ছেলেটির চোখের সামনে খুলে যেত এক অচিন দুনিয়ার জানালা। মাথায় ফেটটি বাঁধা ট্রেনের ড্রাইভারকে দেখে ছেলেটি স্বপ্ন দেখত বড় হলে একদিন ট্রেন-ড্রাইভার হওয়ার। মনে হতো, না জানি কোন সুদূর কল্পলোকের রাজপুত্তুর এই ড্রাইভার। কত্তো ক্ষমতা তার! যে কিনা পঙ্খীরাজ ছুটিয়ে পাড়ি দেয় দেশ থেকে দেশান্তরে।
শর্শদি গ্রামের নিমতলি বাড়িতে ১৯৩৮ সালের ১২ নবেম্বর জন্মগ্রহণ করেন বেলাল চৌধুরী। পিতা রফিকউদ্দিন আহমাদ চৌধুরী ও মা মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরানী। চার ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
বাবা রফিকউদ্দিন আহমদ চৌধুরী আসাম-বেঙ্গল রেল কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে বেলাল চৌধুরীর শৈশবের প্রথমার্ধ কেটেছে পাহাড়বেষ্টিত সমুদ্রবিধৌত শহর চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামকে ঘিরে আছে তার নানা স্মৃতি-বিস্মৃতি। নিরুদ্দেশ হাওয়ায়, হাওয়ায় শীর্ষক তার আত্মজীবনীমূলক রচনায় তিনি চট্টগ্রামের একাধিক মজার স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছেন।Ñ বেলাল চৌধুরীর বয়স তখন এক কি দেড় বছর। সবেমাত্র হাঁটি হাঁটি পা পা। নন্দনকাননের এক দ্বিতল বাড়িতে থাকতেন তারা। বাসার খাটের নিচেÑ যেখানে হাঁড়ি-পাতিল রাখা হতোÑ সেখানে ছিল শিশু বেলালের খেলার জায়গা। খেলার জায়গা বলা যাবে কি? ঠিক খেলা নয়, বলা যায় খুব সহজে ঐ বয়সেই লুকোচুরি খেলতে মজা পেতেন। হয়ত এটাই তার উত্তর জীবনের বাউণ্ডুলেপনার বীজ। এক গ্রীষ্মের দুপুরে বাড়ির কেউ কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না বেলালকে। সবাই দিশেহারা। কোথায় গেল এই এতটুকু দুষ্ট ছেলে! ছেলেধরা নিয়ে গেল না তো আবার! অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে তাকে পাওয়া গেল সেই আধো-অন্ধকার স্থানটিতেই। দিগম্বর শরীরের এখানে-ওখানে লেগে আছে কবুতরের মাংসের ঝোল। হামাগুড়ি খেতে খেতে তরকারির পাতিল উল্টে এই হাল!
আরেকদিনের ঘটনা। শিশুকে কোলে নিয়ে অষ্টাদশী মা সিনেমা দেখতে গেলেন চট্টগ্রামের এক সিনেমা হলে। কাননবালা আর সায়গল অভিনীত ছবি। যথাসময়ে শো শুরু হয়েছে। নায়ক সায়গলের কলা খাওয়ার দৃশ্য দেখে শিশু বেলাল বায়না ধরল কলা খাওয়ার। সিনেমা হলে কোথায় পাবে কলা! শুরু হলো তারস্বরের ভ্যাঁ...ভ্যাঁ...। একটা নিদারুণ অস্বস্তির ভাব।

দুই.
হাতেখড়ি হয়েছিল শর্শদির স্কুলে। পাগলা মুনশি নামের এক অদ্ভুতুড়ে ওস্তাদের হাতে। অপরিচ্ছন্ন চালচলনের কারণে তাকে সবাই এই নামে ডাকত। শর্শদি বাজার লাগোয়া গ্রামের স্কুলে যার হাত ধরে যেতেন তিনি ছিলেন চাচা সম্পর্কীয়। দলিল চাচা বলে ডাকতেন তাকে। এই চাচার মাধ্যমেই শৈশবে প্রথম বিড়ির স্বাদ নিতে গিয়ে চোখেমুখে সর্ষেফুল দেখেছিলেন বেলাল চৌধুরী। তখন তিনি সবেমাত্র প্রথম শ্রেণীর ছাত্র। শার্টের পকেটে একদিন তার মা বিড়ির গোড়ালি আবিষ্কার করে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে উদ্বেগাকূল হয়ে উঠলেন। এইটুকুন ছেলের পকেটে বিড়ি! মা ছেলের ভবিষ্যত ভেবে শঙ্কিত। এভাবে চললে সঙ্গ-দোষে বখে যাবে তার প্রথম গর্ব-আহ্লাদের সন্তান। তাই ভালো পরিবেশে ভালো লেখাপড়ার স্বার্থে সঁপে দিলেন বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা প্রায় নিরক্ষর ফুফুর হাতে। অন্যদিকে উদারচিত্ত বিদ্যোৎসাহী ফুফা কাজী সফিউদ্দিন আহমদ তখন সমুদ্রমেখলা সন্দ্বীপের সাব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের আট সন্তানের মৃত্যুর পর ফুফুর ভাষায় যমের আঁইটা (এঁটে) বাকি দু’জনের মধ্যে মাত্র দ্বাদশ বর্ষীয়া কন্যা রওশনের বিয়ের পর তার স্থলাভিষিক্ত বেলালকে বেছে নেন। একদিন ফুফুর সঙ্গে শর্শদি থেকে রাত নটার ট্রেনে আলো ঝলমল লাকসাম জংশন পেরিয়ে জাহাজে দীপান্তরিত হলেন সন্দ্বীপে।
ভর্তি করানো হলো সন্দ্বীপের কার্গিল হাই স্কুলে। অল্প বয়স, গ্রামের অবারিত জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা, তদুপরি মায়ের কোল ছাড়া ছেলের কিছুতেই মন টেকে না ফুফুর কাছে। সারাক্ষণই মন খারাপ। কিন্তু উপায় নেই। লেখাপড়ার জন্য এখানে থাকতেই হবে। ঠিক এমনই মুহূর্তে স্কুলের এক শিক্ষক যোগেশচন্দ্র পাঠকের স্নেহ-মমতায় সব ভুলে মনোনিবেশ করলেন লেখাপড়ায়। একটি প্রায় নির্বাসিত শিশুর বেড়ে ওঠার নেপথ্যে সহায়ক শক্তি হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। সন্দ্বীপের সামুদ্রিক পরিবেশ, নৌকা, সাম্পান, স্টিমার, জোয়ার-ভাটা ইত্যাদির দারুণ প্রভাব পড়েছিল তার শৈশব মনে। আড়াই কি তিন বছর পর ফুফা ওখান থেকে বদলি হলেন কুমিল্লায়। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ পর্ব। কিশোর বেলার প্রথমার্ধ কাটে কুমিল্লা শহরে।

তিন.
পারিবারিকভাবেই পড়াশোনার একটা পরিবেশ ছিল দেশের বাড়িতে। সেকালের রীতি অনুযায়ী বড় কাঠের সিন্দুক ঠাসা থাকত বইপত্র। বাবা প্রচুর বই-পুস্তক কিনতেন এবং পড়তেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং ত্রিশের কবি-সাহিত্যিকদের লেখকদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্রও বাদ যেত না। অপরদিকে শৈশবে পিতৃমাতৃহারা মা মনীর আখতার খাতুন বা চানধন বিয়া ছিলেন অসাধারণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন। ভারতচন্দ্র থেকে শুরু করে হেম-মধু-বঙ্কিম-নবীনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল এবং যতীন্দ্রনাথ-সত্যেন দত্ত প্রমুখ কবিদের কবিতা ছিল তার ঠোঁটস্থ। মুখে মুখে ছড়া কাটবার একটা সহজাত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন সেই মহীয়সী নারী। পরিবারের কারো বিয়েশাদী, মুখে ভাত, খাতনা কিংবা হাতেখড়ি অনুষ্ঠানে মুখে মুখে অনবরত কবিতা বানিয়ে সবাইকে অবাক ও মুগ্ধ করে তুলতেন। এ ছাড়া বাবার চাকরির সুবাদে বাসায় আসত নানা পত্রপত্রিকাÑ দেশ, প্রবাসী, ভারতবর্ষ, বসুমতী, সচিত্র ভারত, শনিবারের চিঠি, চতুরঙ্গসহ আরও কত কি...।
এদিকে শৈশবে যার সংসারে থেকে বেলাল চৌধুরী বেড়ে উঠেছেন সেই ফুফা কাজী সফিউদ্দিন আহমদ ছিলেন সংস্কৃতিমনা, সেক্যুলার মানুষ। ইংরেজি ভাষায় ছিল তার যথেষ্ট দখল। সন্দ্বীপে থাকাকালীন বাসায় নিয়মিত রাখতেন স্টেটসম্যান এবং অধুনা মুম্বাই থেকে প্রকাশিত ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া, দৈনিক আজাদ ইত্যাদি পত্রিকা। সে হিসেবে পত্রপত্রিকার সঙ্গে বেলাল চৌধুরীর সম্পর্ক আশৈশব। পত্রিকাগুলোতে ছিল শিশুদের জন্য আলাদা পাতা। যেমন স্টেটসম্যান-এর ‘বেনজি লীগ’, ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়ার ‘আওয়ার ইয়াং ফোকস লীগ’, আজাদের ‘মুকুলের মাহফিল ইত্যাদি। ফুফার উৎসাহে তখন বেলাল চৌধুরী উল্লিখিত প্রায় সব কটি বিভাগেরই সদস্য হয়েছিলেন। সদস্যদের নাম ছাপা হতো সেসব পাতায়। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হতো বেলাল চৌধুরীর মন। ভুলে যেতেন ছেড়ে আসা আপনজনদের জন্য মন কেমন করা, বায়বীয় ব্যথা-বেদনা, মনস্তাপ।
পড়–য়া বাবা-মা আর ফুফার প্রভাবেই শৈশব থেকে বেলাল চৌধুরীর পাঠাভ্যাস গড়ে উঠেছিল। যখন কুমিল্লায় থাকতেন তখন স্কুলের পাঠ্যবইয়ের চাইতে বাইরের সাহিত্য পাঠের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। সেকালে ওসব বইকে বলা হতো ‘আউট বই’ এবং তা ছোটদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ। সেই নিষিদ্ধ পাঠেই ছিল তার ঝোঁক। নিষিদ্ধ সব কিছুর প্রতি কারইবা লোভ না থাকে। সেই আদম-হাওয়ার কাল থেকে...। শহরের পাড়ায় পাড়ায় ছিল পাঠাগার আর লাইব্রেরি। জামতলায় পড়ার ঘর, চর্থা দারোগা বাড়িতে জাগরণী সংঘ, বসন্ত ও অমূল্য স্মৃতি পাঠাগার, অভয় আশ্রম, রামমালা বোর্ডিং, কান্দিরপাড় টাউন হলে বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুর লাইব্রেরি ইত্যাদি। এসব লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করে চুপিসারে পড়তেন তিনি। কেউ টের পাবে বলে লুকিয়ে ফেলতেন বিরাট সাইজের জ্যামিতি বইয়ের আড়ালে। সেসব বইয়ের মধ্যে ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের ছিন্নমস্তার মন্দির, আবার যখের ধন, শিল্পী প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা রাতের অন্ধকার ছিঁড়ে ভয়াল চিনে দস্যু হোয়াংয়ের আর্তনাদ সংবলিত সব রহস্য-রোমাঞ্চকর বই।

চার.
বেলাল চৌধুরীর বয়স তখন দশ কি এগারো। শুরু হলো দেশ বিভাগের আন্দোলন। দেবতুল্য স্কুলের স্যার, বজ্রপুর, নানুয়ার দীঘিরপাড়, দিগম্বরীতলার বাল্যকালের বন্ধু-বান্ধব, চেনা-জানারা সব চলে যেতে শুরু করলেন ঘরের কাছে আরশি নগর আগরতলায়, সুদূর কলকাতায় এমনকি আসামেও। বাল্যবন্ধু সন্ধ্যা, অতসী, মানস, পরীক্ষিত, মিতাদের হারিয়ে কেমন যেন একা হয়ে পড়লেন কিশোর বেলাল। ওদের কেউ কেউ আগরতলা, কৈলাশহর, ধর্মনগর, কেউ কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি আসাম রাজ্যেও গিয়ে বসতি গড়তে শুরু করল। বন্ধু হারানোর বেদনায় এক ধরনের বোহেমিয়ান স্বভাব এসে ভর করল বেলাল চৌধুরীর ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। তার এক জামাইবাবু সরকারি চাকরি সূত্রে পোস্টিং পেয়েছিলেন মানকুণ্ডু সিভিল সাপ্লাইতে। তার বাসা ছিল অদূরে চন্দননগরে। যার জন্য বেলাল চৌধুরী প্রথমবার কলকাতা গিয়েছিলেন হাওড়া স্টেশন হয়ে।
তার এক সম্পর্কিত দাদু আব্দুর রশীদ খান সাহেবের পার্ক সার্কাস ময়দানের সামনে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর বাড়ির লাগোয়া তার নিজস্ব পাঁচতলা ফ্ল্যাট বাড়ির তিন তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন কর্পোরেশন স্কুলের শিক্ষক বেলাল চৌধুরীর এক মামা। সুতরাং মামার ওখানেই ডেরা বাঁধলেন। এভাবেই শুরু হয় কবি বেলাল চৌধুরীর বোহেমিয়ান জীবনের আদিপর্ব।

Print
©2009. All rights reserved.