Logo_print
 
সূচীপএ : সাক্ষাৎকার
‘পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়েই সরকার একটা ভালো সিগন্যাল দিল’ - রাশেদ খান মেনন

শিক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। সাপ্তাহিক-এর মুখোমুখি হয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগস্ট বিদ্রোহ, ফুলবাড়ী আন্দোলন, জ্বালানি সম্পদ সুরক্ষা, পার্বত্য শান্তি চুক্তি, নেপাল-ভারতের মাওবাদী রাজনীতি বিবিধ বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভ কিবরিয়া


সাপ্তাহিক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত আগস্টের ঘটনা নিয়ে হঠাৎ করে শিক্ষাবিষয়ক সংসদীয় কমিটি পুনর্তদন্তের কথা বলছে কেন?
রাশেদ খান মেনন : এটা হঠাৎ করে কোনো বিষয় নয়। আপনারা জানেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে যে ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭-এর আগস্টে, এটা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। একটা খেলার মাঠের ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই সময়ের সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছিল। এত তুচ্ছ ঘটনা থেকে এ ধরনের আক্রমণ এটা কল্পনা করা যায় না। এটা হতো যে আমরা একটা বিরোধী বা বিজাতীয় শাসনের মধ্যে আছি তাহলে এটা গ্রহণ করা যেত। যেমন আমরা ষাটের দশকে বহুবার সামরিক বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। আমাদের হলগুলোকে ঘেরাও করা হয়েছে। ক্যান্টনমেন্টে তুলে নিয়ে গেছে। আমরা ’৭১ সালে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে ছাত্র নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা হয়েছে।
কিন্তু এই সেনাবাহিনী তো আমাদের সেনাবাহিনী। খেলার মাঠের একটা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেবল ছাত্র নয়, শিক্ষকদের ওপরেও যে জুলুমটা করা হলো এবং যে ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করা হলো এটা তো অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এটা আনন্দের যে সেই সময়ের ছাত্র-শিক্ষকরা এটা সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে। এবং করেছে বলেই শেষ পর্যন্ত সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার তড়িঘড়ি করে এদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, যদিও ছাড়ার প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। আগের দিন নিয়ে গিয়ে সকালে তাদের সাজা দেয়া হয়। আবার বিকেলেই তাদের কাছ থেকে দরখাস্ত লিখিত না নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় বিচারের কাজটি ছিল পূর্বনির্ধারিত। আগের সাজানো, নির্ধারিত। সেই সময়ের ঘটনা যদি আমরা স্মরণ করে দেখি দেখব কিভাবে রাতের বেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের ফ্যাটগুলো থেকে ছেলেদের বের করে নিয়ে আসে সেনাবাহিনী।  সে সময় বিবিসির সাক্ষাৎকারে মহিলারা বলেছেন যে কি নির্মম আচরণ তাদের সঙ্গে করা হয়েছে। এমনকি মহিলা যারা  বের হয়ে এসেছেন তাদের রক্ষা করতে তারাও নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। এই ঘটনাগুলো জানতে হবে। কারও হাতে ক্ষমতা থাকলে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার এভাবে করা যাবে এবং এটা কেউ জানবে না এবং এটার কোনো বিচার হবে না, শাস্তি হবে না এটা হতে পারে না।
ছাত্র-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যে সাজানো মামলা ছিল তার প্রমাণ এই মামলা থেকে তাদের খালাস করে দেয়া হয়েছে।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক, শিক্ষকদের দশদিন রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল। শিক্ষকদের রিমান্ডে নেয়া হতে পারে না। কারণ তারা তো ক্রিমিনাল নন। প্রতিবাদ করেছেন। যদি সে জন্য জরুরি আইন ভঙ্গ হয় জরুরি আইনের বিধানে তাকে সাজা দেয়া যেত কিন্তু তাকে চোখ বেঁধে অত্যাচার করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের জবানবন্দি এবং বইয়ের মাধ্যমে ভিকটিমরা বলেছেন সেইসব কাহিনী। এটা তো হতে পারে না। এই যে প্রক্রিয়া তার একটা জবাবদিহিতা আসা উচিত।
আমরা এখনো তদন্ত কমিটিতে যাইনি। আমরা বলেছি সে তথ্যগুলো কি তা জানানো হোক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আমরা জিজ্ঞেস করেছি ঘটনাটা কি ছিল তারা বলতে পারলেন না। তারা কেবল এইটুকু অংশ জানে যেটুকু তাদের ফাইলে লেখা আছে সাজা মওকুফ করার বিষয়ে, যার কারণে এটা সংসদীয় কমিটিতে এসেছে। একটা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিশনের রিপোর্টগুলো প্রকাশিত হয়নি। আমরা সেটা দেখতে চাই। এর বাইরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক তাদেরও তো বলার কথা রয়েছে, তারা বলুক। আমরা চাই অতীতের এই বিষয়গুলো আজকে জনসম্মুখে আসুক। আর কিছু না হোক, শাস্তি দিতে পারি বা না পারি আমরা চিহ্নিত করতে চাই অপরাধের উৎসটা কোথায়।

সাপ্তাহিক : তাহলে আপনারা কী নতুন করে কোনো তদন্ত করবেন?
রাশেদ খান মেনন : আমরা এটি  কোনো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করার জন্য করছি না। আমরা জনগণকে সেই আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ঘটেছিল সেটা জানাতে চাই। ইতোমধ্যেই ঢাবির সিনেট ২৩ আগস্টকে কালো দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই কালো দিবস দিনের পর দিন, বছরের পর বছর পালিত হবে। কেন কালো দিবস। এই বিষয়টাতো আমাদের জানতে হবে। এই বিষয়টা সত্যিকার অর্থেই একটা পার্মানেন্ট ক্ষত হয়ে থাকবে কি না, নাকি ক্ষত দূর করা যাবে এটা দেখার বিষয় আছে। আমরা বলেছি যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রতিবেদন দিক আমরা এর পরে যারা ভিকটিম এবং সংশ্লিষ্টদের ডাকব। তারপরে এটার কি আইনগত দিক আছে, কোর্টে এখনো মামলা আছে কি না এ সব দেখার পরে আমরা ঠিক করব যে আমরা কি করব।

সাপ্তাহিক : মানে আপনারা ক্ষতিগ্রস্তদের কথা নতুন করে শুনবেন?
রাশেদ খান মেনন : এই ক্ষতের পেছনে যে কান্নাগুলো লুকিয়ে আছে, যে কারণগুলো, যে অন্যায়গুলো লুকিয়ে আছে, এটাকে উদ্ঘাটন করে মানুষের সামনে প্রকাশ করা দরকার। কি ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষকদের কেন একটা অসহায় অবস্থার মধ্যে থাকতে হলো এটা আমরা জানতে চাই।

সাপ্তাহিক : সেখানে সব পক্ষকে ডাকা হবে?
রাশেদ খান মেনন : আমরা পদ্ধতিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে এগুবো।

সাপ্তাহিক : আর কী কাজ করবে শিক্ষাবিষয়ক এই সংসদীয় কমিটি?
রাশেদ খান মেনন : অনেক কাজ। শিক্ষা সম্পর্কিত আইনগুলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। সেগুলোকে বাছাই করা, মতামত নেয়া, নিজেদের মতামত দেয়া, সংশোধন করা, সংযোজন করা। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজগুলোর ভালোমন্দ দেখাশোনা করা। তাছাড়া পার্লামেন্ট হতে বা জনগণের কাছ হতে যে বিষয়গুলো আসে সেগুলোর পর্যালোচনা করা।

সাপ্তাহিক : জনগণ কী তাহলে যে কোনো অভিযোগ বা মতামত নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আসতে পারে?
রাশেদ খান মেনন : জনগণ এটা সবসময়ই পারে। যেমন সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে অভিভাবক মহলের অভিযোগ ছিল। আমরা সেটাকে নিয়ে এসে আলোচনা করলাম। তারপর অভিভাবক, ছাত্র, শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ, কর্মকর্তাদের ডাকলাম। এরকম দুটো দিকেই পর্যবেক্ষণ করার পরেই পরবর্তীকালে একটা সমাধানে আমরা পৌঁছলাম। এটা জনগণের কাছ থেকেই এসেছে। এখন যেমন সাধারণ শিক্ষকদের কাছ থেকে আসছে। তাদের অনেক সমস্যা। এ সমস্যাগুলো আমরা আলাপ করছি। এবং একটা সাবকমিটি করে দিয়ে ইতোমধ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এমনকি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমস্যা নিয়ে আমরা আলাপ করছি।

সাপ্তাহিক : শিক্ষা বিভাগের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে কী কাজ করবে এই কমিটি?
রাশেদ খান মেনন : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।

সাপ্তাহিক : এই যে কাজ করছেন, সংসদীয় কমিটির লোকবল বা লজিস্টিক সাপোর্ট কি পর্যাপ্ত? 
রাশেদ খান মেনন : আমরা তো কোনো ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি না।  যে কোনো অভিযোগ এলে আমাদের কাজ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সেটা তদন্ত করতে বলা। আর যদি মনে করি আমরা প্রাথমিক তদন্ত করব তাহলে সংসদীয় সাবকমিটি করে তা করা। তারপর রেফার করব সংশ্লিষ্ট জায়গায়।

সাপ্তাহিক : পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তির আলোচনার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপনার সম্পৃক্ততা ছিল। শান্তি চুক্তি নিয়ে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, জনসংহতি সমিতি বলেছে তা পর্যাপ্ত নয়। আপনার পর্যবেক্ষণ কি?
রাশেদ খান মেনন : আমার কথা হলো সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে সেটার একটা ধাপ অতিক্রম হলো। তবে এটাই সম্পূর্ণ না। কারণ আমাদের কথাই ছিল যে পাহাড়ে এবং সারাদেশেই বেসামরিক প্রশাসন প্রাধান্য পাবে। কিন্তু পাহাড়ে এখনো সেনা প্রশাসনের প্রাধান্য বিদ্যমান। এটা অনাবশ্যক সংকট ও সমস্যার সৃষ্টি করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়েই সরকার একটা ভালো সিগন্যাল দিল। এবং চুক্তির একটি অংশ পূরণ করল। কিন্তু এটাও সত্য, সার্বিকভাবে যে সমাধান প্রয়োজন সেটা কিন্তু এখনো হয়নি।

সাপ্তাহিক : কিন্তু সেখানকার বাঙালি সেটেলাররা তো তাদের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছে?
রাশেদ খান মেনন : তারা বলবেই। দুর্ভাগ্যবশত আমরা তাদেরকে পাঠিয়েছি একটা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। তারা মোটেই দোষী নয়। কিন্তু আমি তো মনে করি না নিরাপত্তাহীনতার কোনো কারণ আছে।
কেননা সেখানে তো সরকার আছে, প্রশাসন আছে। ক্যান্টনমেন্ট তো উঠে যাচ্ছে না। ক্যান্টনমেন্ট তো থাকছে। ঢাকাতেও তো ক্যান্টনমেন্ট আছে কিন্তু ঢাকার কাজ কি  ক্যান্টনমেন্ট দেখে। খুলনার কাজ কি ক্যান্টনমেন্ট দেখে। তেমনি হিলট্রাকসে ক্যান্টনমেন্টের কাজ তদারক করা নয়। তাদের কাজ হচ্ছে সেনা দায়িত্বে এবং পরিধিতে যেটুকু কাজ সেটুকু করা। সেখানে যদি নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে গবর্নমেন্ট সেটা দেখবে। এটাত এমন না যে এটা একটা আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে। এখানে গবর্নমেন্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এবং তা থাকবে। সুতরাং সিকিউরিটির অভাবের কোনো কারণ আছে আমরা তা মনে করি না। এখন আপনি যদি অন্যের জমি দখল করে বসে থাকেন, সেই জমি উদ্ধার করতে গেলে মানুষ যদি বলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, এটা ভিন্ন ব্যাপার। আমার বাড়িটা আপনি দখল করে রাখবেন আর আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই বলবেন আমি ইনসিকিউরিটি ফিল করছি, এটাতো হয় না।

সাপ্তাহিক : আর কি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার?
রাশেদ খান মেনন : ভূমি কমিশন। এখন বহুদিন পরে একজন ভূমি কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ভূমি কমিশন কার্যকর করলেই প্রাথমিকভাবে এটা কার্যকর হবে। এর জন্য সেনা নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করতে হবে। এখানে সেনাবাহিনীর কোনো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। যারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে তাদেরকে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। কিন্তু প্রশাসনিকক্ষেত্রে পার্বত্য আঞ্চলিক যে কমিটি সেখানে রয়েছে, যে আঞ্চলিক পরিষদ রয়েছে তারা কাজ করবে। তার মানে জাতীয় ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকাঠামোর যে অংশগুলোয় অন্য জায়গার মতো সেনা থাকা প্রয়োজন সেখানেও তারা তেমনভাবেই থাকল।

সাপ্তাহিক : এটি আগস্ট মাস। ২০০৬ সালের আগস্ট মাসেই জ্বালানি সম্পদ রক্ষার বিষয়ে ফুলবাড়ী আন্দোলন ঘটে। জ্বালানি বিষয়ে সরকারের বর্তমান পদক্ষেপ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?
রাশেদ খান মেনন : সরকার জ্বালানি বিষয়ে হাফ-হার্টেট পদক্ষেপ নিচ্ছে। কেননা ফুলবাড়ী চুক্তি সমর্থন করেছিলেন আমাদের এখনকার প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং সেই চুক্তি অনুসারে প্রধান যে বিষয় ছিল এশিয়া এনার্জিকে বহিষ্কার করা। সেটা করা হয়নি। এটা পরবর্তীতে বহুভাবে প্রমাণ এশিয়া এনার্জি আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে কোনো কাজ করে নাই। বেআইনিভাবে তারা এ কাজটা পেয়েছিল। সেজন্য প্রথম কাজটা ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বের করে দেয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখছি এশিয়া এনার্জি কেবল আছে না, এশিয়া এনার্জির পক্ষে ফুল ক্যাম্পেইন চলছে। এমনকি পার্লামেন্টেও তাদের মেম্বাররা প্রকাশ্যে বলতে সাহস পাচ্ছেন না কিন্তু প্রকারান্তরে সেই কথাগুলো বলছেন। এই সরকার দুর্ভাগ্যজনকভাবে কয়লানীতির যে বিষয়টি ফয়সালা করার ছিল সেটা এতদিনে করতে পারেনি। এই সরকারের আমলে অনাবশ্যকভাবে যমুনা রিসোর্টে যে ঘটনাটা ঘটল এটার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই ঘটনাগুলো এই সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে।
এটা ঠিক আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লা উত্তোলন করতে হবে, তেল উত্তোলন করতে হবে, গ্যাস উত্তোলন করতে হবে। কিন্তু সেই কয়লা, গ্যাস, তেল যেটাই উত্তোলন করি না কেন সেটা যদি আমাদের স্বার্থে না হয়, সেটাতো দেশের কোনো কাজে লাগবে না। সুতরাং যখন আমি বলি আমার দেশের মাটির তল হতে কয়লা বের করে নিয়ে আসতে হবে। কার জন্য বের করে নিয়ে আসব এটা কিন্তু আগে নিশ্চিত হতে হবে।
এই যে যমুনা রিসোর্টে কিছুই বলতে পারলেন না শুধু এটুকু বললেন প্রয়োজনীয় কয়লা রপ্তানি করা যাবে। অথচ বাজেটেই লেখা আছে কয়লা আমদানি করছি আমরা। বাজেটের বইতে দেখেন যে সাবহেডিং করা আছে কয়লা আমদানি করার প্রয়োজনীয়তা বাবদ।  তার মানে আমরা কয়লা উত্তোলন করছি বিদেশে বিক্রি করে দেয়ার জন্য। দরকারটা কি? আমি এত লোকজন সরিয়ে বিদেশে কয়লা বেঁচতে যাব কেন? সেই জায়গা থেকেই আমি বলব যে এখন পর্যন্ত সরকারের পদক্ষেপ জিনিসটাকে স্বচ্ছ করে তুলছে না। ফলে সন্দেহ অবিশ্বাসগুলো এখনো বিদ্যমান।

সাপ্তাহিক : মহাজোটের শরিক দল হিসেবে এ বিষয়ে আপনারা কি আপনাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসছেন?
রাশেদ খান মেনন : আপনারা জানেন যে, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিতে আমরা আছি। তাছাড়া আমরা দলগতভাবে গত মাসেই এই ইস্যুতে মিছিল করেছি এবং ২৬ আগস্ট আমরা ফুলবাড়ী যাব। আমি নিজেও যাওয়ার ইচ্ছা রাখি। এবং সারাদেশেই ২৬ তারিখে ফুলবাড়ী দিবস পালনের কথা বলব। এরকমভাবে আমরা আমাদের দাবিগুলো জানিয়ে আসছি। আমাদের যে কমিটমেন্ট এ বিষয়ে তা অব্যাহত আছে। সেটা আমরা সরকারের সঙ্গে আছি কি না এটা কোনো বিষয় না।

সাপ্তাহিক : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
রাশেদ খান মেনন : এ বিষয়ে এ পর্যন্ত যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে আমি মনে করি ঠিকই হয়েছে। ঠিকই হয়েছে বলতে বুঝাচ্ছি আরও কম সময়ে হলে খুশি হতাম। ঘটনা হচ্ছে যে কতগুলো প্রক্রিয়া কিন্তু আপনাকে শেষ করতে হবে। কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে একটা আইনের প্রসঙ্গ সেটার সমাধান হয়ে গেছে। প্রসিকিউটর নিয়োগ করতে হবে। আপনারা জানেন যে জামায়াতে ইসলামী কোটি কোটি টাকা তুলেছে এটাকে নস্যাৎ করার জন্য। সেখানে প্রসিকিউটর যদি আমি পরীক্ষিত লোক না দিতে পারি তাহলে মামলা দাঁড়াতে পারে না। তেমনি ট্রাইব্যুনালগুলো নিয়ে মেরুদ  সোজা থাকতে হবে। কারণ এখানে যদি নরম মেরুদে র লোক থাকে তাকেও প্রভাবিত করতে অসুবিধা হবে না। সবমিলিয়ে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে এগুনোই ভালো। কারণ এর বিপরীতে জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে বহুরকম কার্যক্রম রয়েছে। সুতরাং আমাদের দিকে প্রস্তুতি ভালো করেই কেবল এগুতো হবে।

সাপ্তাহিক : আওয়ামী লীগের সদ্যসমাপ্ত কাউন্সিলকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
রাশেদ খান মেনন : ভালো দিক হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ তারা জচঙর বিধানটাকে মেনেছে। যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতদিন পর্যন্ত আমরা নিবন্ধনের কথা বলে এসেছি। সেই আইন আমরা তৈরি করলাম আমরাই আবার সে আইন ভাঙব এটা সঠিক নয়। এই ক্ষেত্রে মনে করি আওয়ামী লীগ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। কাউন্সিলের যে উপস্থিতি আওয়ামী কাউন্সিলের গণতান্ত্রিক হওয়ার কথা বলে। কারণ এ কাউন্সিল তারা তৃণমূল থেকে করে এসেছে আগে। সেদিক থেকে আপনি এটাকে অগণতান্ত্রিক বলতে পারবেন না। কিন্তু এটাও সত্য এই কাউন্সিলও আবার দলের কমিটি নির্বাচনে পুরো দায়িত্ব সভানেত্রীকে দিয়ে দিয়েছে। এটাকে বিধশহবংং ড়ভ ঃযব ড়ৎমধহরুধঃরড়হ বলা চলে। আমি মনে করি এখানে একটি খুত রয়েছে।

সাপ্তাহিক : বিএনপির বর্তমান রাজনীতিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাশেদ খান মেনন : তারা চেষ্টা করছে তাদের একটা জায়গায় দাঁড়াতে। ইলেকশনের খাদটা পূরণের জন্য। তাদের দলের একটা যে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন অবস্থা রয়েছে এই জায়গাটা তারা সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি মনে করি না যে এর মধ্য দিয়ে খুব বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক জায়গায় অগ্রগতি তারা করবে। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে তাদের অবস্থানটি স্ববিরোধী। ২০০৫ সালে যখন তারা ক্ষমতায় ছিলেন তখন আমি তো এ বিষয়ে গোলটেবিল আলোচনা করেছি। তখন তো তাদের কথা বলতে শুনিনি। তারা যদি ২০০৫ সালে কথা না বলে এখন বলে তাহলে আমি মানব কেন। আমি নিজের হাতে মেজর হাফিজকে টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে কাগজ তুলে দিয়েছি। তারা তো সে নিয়ে তখন কথা বলেননি। আজকে তারা এই কথা বলছেন। এই কথার মধ্যে যতখানি না টিপাইমুখ নিয়ে বিষয় আছে তার চেয়ে বেশি আছে ভারতবিরোধিতার একটা রাজনীতি।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ পাশের দেশ ভারতে রয়েছে। আমার কাজটা কি। আমার কাজটা হলো এই জায়গায় বাংলাদেশের স্বার্থটা রক্ষা করা। এবং সে স্বার্থ রক্ষা করার জন্য আমাদের প্রচুর ইনস্ট্রুমেন্ট আছে। একটি ইনস্ট্রুমেন্ট হচ্ছে গঙ্গা চুক্তি। গঙ্গা চুক্তি যদি আমি কার্যকর করতে পারি বা কার্যকর রাখতে পারি তাহলে টিপাইমুখ বাঁধের প্রশ্নে তারা আমাদের সঙ্গে চুক্তিতে আসতে বাধ্য। কিন্তু আপনি চিৎকার করলে তো সমাধান করতে পারব না। চুজ ইয়োর ফ্রেন্ডস বাট ইউক্যান নট চুজ ইয়োর নেবার।
বাংলাদেশের ৫৪টি নদীর উৎসমুখ ভারত বা এর উপরিস্থল। নদীর প্রবাহ নিয়ে নানা সমস্যা আছে। আমার কাজটা কি? আমার কাজটা হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ক্ষেত্রে আমার যে হিস্যাগুলো রয়েছে সেটাকে আদায় করা। সেই ক্ষেত্রে অবস্থানটা এমনভাবে গ্রহণ করা যেন আমি আমার স্বার্থটা আদায় করতে পারি। আমি মনে করি এটা নিয়ে নেগোসিয়েশন ছাড়া কোনো পথ এখানে নেই। আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তঃআঞ্চলিক সেটেলমেন্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে আন্তঃআঞ্চলিক উদ্যোগ খুব জরুরি।

সাপ্তাহিক : সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগকেই কী গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন আপনি?
রাশেদ খান মেনন : আমি মনে করি যে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক সব উদ্যোগ দরকার। আমরা যখন গঙ্গা চুক্তি করেছি গঙ্গার চুক্তিতে যেমন রাস্তায় আন্দোলন ছিল কিন্তু পাশেই ছিল নেগোসিয়েশন আন্দোলন।

সাপ্তাহিক : এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসিÑ ভারতে ও নেপালে মাওবাদীরা যে রাজনীতি করছেন, তার যে পরিণতি তাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
রাশেদ খান মেনন : আমি মনে করি মাওবাদীরা যে পথে যাচ্ছেন সে পথ সঠিক না। নেপালের মাওবাদীদের কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক স্ট্রাগলের মধ্যে আসতে হয়েছে। তাদেরকে সরকারে যেতে হয়েছে। এবং সেখান থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে। বেরিয়ে এসে খুব একটা কিছু করতে পারেনি।
ভারতের ক্ষেত্রে মাওবাদীরা যে রাজনীতি করছিলেন এটা আমি সঠিক মনে করি না। এই রাজনীতি পরীক্ষিত হয়েছে পেরুর ক্ষেত্রে, এ রাজনীতি পরীক্ষিত হয়েছে ল্যাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে। আজকে সেখানে কমিউনিস্টরা হীনবল হয়ে গেছে। অবশ্য সেখানে নতুন ধরনের সমাজতন্ত্রীরা এসেছে। কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু হীনবল হয়ে যাচ্ছে। এখানেও কিন্তু আমি দেখব যে এই মাওবাদী উত্থান নেপাল এবং ইন্ডিয়ায় এরা কিন্তু কমিউনিস্ট আন্দোলনকে হীনবল করছে।

সাপ্তাহিক : এটা কেন বলছেন?
রাশেদ খান মেনন : চোখের সামনে দেখছি আমরা। যে স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে নেপালের মতো একটা হিন্দু রাষ্ট্র সেক্যুলার রাষ্ট্র ঘোষণা করল। রাজতন্ত্র যেখানে বিলুপ্ত হয়ে গেল সেখানে তো আরও অনেক এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল যে সেখানে সবকিছু গুবলেট হয়ে গেল। আমি মনে করি যে এটা টিক না। ভারতে যাদের নিয়ে এবং যেভাবে মাওবাদীরা রাজনীতি করছেন তাও দুর্ভাগ্যজনক। পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তো মাওবাদীরা একত্রিত হতে পারে না। এটা কিন্তু খুব দুর্ভাগ্যজনক যে তৃণমূল কংগ্রেস আর মাওবাদীরা এক হয়ে আজকে বামপন্থীদের সঙ্গে লড়াই করছেন। এই যে লালগড়ের ঘটনাটি, এটা তো ধ্বংসাত্মক পথ। ধ্বংস করা হচ্ছে কাকে? কংগ্রেসকে না, জোতদারকে না, করছেন কমিউনিস্টদেরকে, বামপন্থীদেরকে।

অনুলিখন : হাসান ধ্রুব

Print
©2009. All rights reserved.