Logo_print
 
সূচীপএ : এই সময়/রাজনীতি
[কথামালা] ‘বিপ্লব যে আসছে চোখে দেখ না বিপ্লব তো রাস্তা দিয়ে হাঁটে’ -সরদার ফজলুল করিম

মনস্বী চিন্তাবিদ, দার্শনিক, শিক্ষক সর্বজনপ্রিয় সরদার ফজলুল করিমের ৮৬তম জন্মদিন অনুষ্ঠানিকভাবে পালন করেন তার গুণগ্রাহীরা। ১ মে ২০১১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার স্মৃতি মিলনায়তনে এ আয়োজনে এসে আপ্লুত হয়ে ওঠেন সরদার ফজলুল করীম। গুণগ্রাহী ও স্বজনদের সকল নিষেধ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েই কথা বলা শুরু করেন তিনি। শারীরিকভাবে তিনি খুব সুস্থ নন। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ স্বজনদের অনুরোধে তাকে কথা দ্রুতই শেষ করতে হয়। খুব গুছিয়ে কথা বলতে না পারলেও মুক্তোর দ্যুতি ছড়িয়ে যায় তার দার্শনিক বয়ানে। অনেক জীবনবাদী কথা আশার কথা উপস্থিত সবাইকে প্রণোদিত করে তোলে। এক আনন্দময়তায় ভরে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। সরদার ফজলুল করিমের এ বিক্ষিপ্ত কিন্তু দার্শনিক মনস্বী টুকরো কথাগুলো শ্রুতিলিখন করে গ্রন্থনা করছেন শুভ কিবরিয়া

আজকে যদি এখানে আমাকে জোর করে না আনত, তাহলে আমি যা হারাতাম, সে হারানোর জন্য আমি আয়োজকদের বিরুদ্ধে কেস করতাম। বলতাম, আমি যা হারিয়েছে তা আমাকে ফেরত দাও। আমি ১৯৪২ সালে ঢাকায় আসি। আমার কোনো সাথী ছিল না। আমি একাই আসি। মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায় আসি।

২.
আমি মরতে চাই না। গড বলেন, ঈশ্বর বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ হচ্ছে মরি না কেন? আমি তো মরতে চাই। তবুও মরি না কেন?
এই জবাবটা কোনো ডাক্তাররাও দেন না, কোনো স্যাররাও দেন না। তবে আজকে এখানে এসে বুঝলাম যে আমার বাঁচতে হইব।
আমার প্রশ্ন হলো এখন আমি মরব কেন?
এমন ভালো ভালো মানুষ। এমন ভালো দেশ, যেখানে মেয়েরা শাসন করে, যে মেয়েদের এ রকম অগ্রগতির কথা আমাদের দেশে আমরা চিন্তাই করতে পারতাম না।

৩.
আমাকে অনেকে প্রশ্ন করে বিপ্লব কবে আসবে। আমি বলি, বিপ্লব যে আসছে চোখে দেখ না। বিপ্লব কি রাস্তা দিয়ে হাঁটে না? বিপ্লব তো রাস্তা দিয়ে হাঁটে। সকাল বেলায় তো যায় গার্মেন্টসে, সে কারা যায়? বিপ্লব যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিটুকু যদি আমার না থাকত তাহলে পরে আমি বাঁচতাম না। আমি যেভাবে বেঁচেছি এবং সেখানে ও ধস চৎড়ঁফ ড়ভ সু ষরভব. আমার জীবন নিয়ে আমি গর্বিত।

৪.
আমাকে আমার শিক্ষক হরিদাস ভট্টাচার্য যদি না ডাকত। ইংরেজি বিভাগ থেকে যখন হরিদাস ভট্টাচার্যের দর্শন বিভাগে ভর্তি হলাম তখন তিনি বললেন তুমি যে দর্শন নিছ, তুমি দর্শনে টিকবা তো! আমি সব জাগায় বলি আমি এখনো টিকে উঠতে পারিনি। দর্শন কি একটি সাধারণ কথা! জীবন দিয়ে দর্শন পড়তে হয়। জীবনেই দর্শন আছে। আমি ইংরেজি বাদ দিয়ে দর্শনে ভর্তি হলাম। স্যার যে প্রশ্ন করলেন ইংরেজি বাদ দিয়া যে দর্শন নিলা, তুমি টিকবা তো! স্যারের সে প্রশ্নের জবাব আমি আজও দিতে পারিনি।

৫.
জীবন। জীবনে দর্শন আছে। জীবনকে জানা। জীবনকে বোঝা। জীবনকে ভালোবাসা। এটাই তো দর্শন। দর্শন তো সোজা না। দর্শন যে সবাই নেয় না এবং নিলেও যে দর্শন হয় না এটা আমি বুঝতে পারছি।
৬.
যা হোক আজকে যে আমাকে আপনারা ধরে নিয়ে এসেছেন সেজন্য ধন্যবাদ। ধরে নিয়ে এসেছেন। কম্যুনিস্ট পার্টির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ সবার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ, আমাকে তোমাদের অফিসে নেও না কেন? আমাকে সেখানে নিয়ে বসাও না কেন। সেখানে আমাকে একটা স্ট্যাটাস দিতে পার না?
এই যে বরুণ রায়। আমার বরুণ রায়। বরুণ রায় মারা গেল। তাকে নিয়ে আলোচনা হলো।  সেখানে আমাকে আপনারা ডাকেন নাই। সুনামগঞ্জের বরুন রায়। বরুণ রায়ের সঙ্গে আমি সিলেট জেলে ছিলাম। আমার ভাগ্য আমি বরুণ রায়কে পেয়েছিলাম। বরুণ রায়ের স্ত্রী আমাকে চিঠি লিখেছেন। এটা তো আমার ভাগ্য।
এটা তো ভাগ্য আমি এমন সব লোকের সান্নিধ্য পেয়েছি।

৭.
আমি রিকশায় যাচ্ছি। রিকশা জ্যামে পড়ছে। সামনে এগুতে পারছে না। আমি রিকশার পা নামিয়ে বসে আছি। হঠাৎ দেখি এক ভদ্রলোক সেও রিকশায় যাচ্ছে, সেই রিকশা থেকে নাইমা আইস্যা কোনো কথাবার্তা নাই, আমার পায়ে হাত দিয়া চইলা গেল, কি একটা অদ্ভুত ব্যাপার! ভালো লাগার বিষয়!

৯.
(এরপর তিনি কথা শেষ করতে চান। দর্শকদের মধ্য থেকে দাবি ওঠে বক্তৃতা অব্যাহত রাখার। তখন তিনি আবার শুরু করেন)
আমার লেখা অনেক বই আছে আপনারা আমার বই পড়বেন। সেই বইয়ে যা ভুলভ্রান্তি আছে কাটাকাটি করবেন। কাটাকাটি কইরা সেইটা ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন। আমার বই বেরিয়েছে। শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। পাতায় পাতায় লেখা আছে শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ... ॥
তার জন্য আমি গর্বিত।

১০.
আমি তো মরতে চাই না। আমি তো জেঁতা আছি। মা বাবা যে এভাবে আমাকে রেখে গেছেন তারা তো আমাকে জেঁতা রেখে গেছেন, এখন আমি কি করব। আমাকে তো বাঁচতে হয়।

১১.
সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করে সরদার ভাই এখন কেমন আছেন? আমি বলি যে, কে ম ন এর মধ্যে ‘ম’ টা কেটে দাও। ‘ম’ টা কাইটে আমাকে জিজ্ঞেস কর। তখন বলে যে স্যার, তাহলে তো জিজ্ঞেস করতে হয় কেন আছেন?
আরে, এইটাই তো আমার কথা।
আমি কেন আছি?
১২.
আমি আমার জীবনকে এনজয় করেছি। কোনো দুঃখ করিনি। এনজয় করেছি। আমি ১১ বছর জেল খেটেছি। ও ষড়াবফ ঃযধঃ.
আমি স্যারকে বললাম (স্যারের নামটা ভুলে গেছি)। আপনি কি জেলে গেছেন? বলে যে না আমি যাইনি। বললাম, আমি তো জেলে গেছি। আমি জানি জেল কাকে বলে। আপনি তো জানেন না। এখানে তো আপনার লোকসান আমার লাভ।
 [অনেকক্ষণ হলো অনুষ্ঠানে এসেছেন, ডাক্তারদের নিষেধ, তাই তাকে বসিয়ে দেয়া হলো। বলা হলো আবার পরে শুনব কিন্তু তিনি কথা বলেই চলেছেন।]

১৩.
মানুষ মানুষকে ভালোবাসে। আবার মানুষ মানুষকে হত্যা করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার সময় স্লোগান দিল যে ‘হত্যাকারী মুজিবকে হত্যা করা হইয়াছে বাসায় বসে শুনলাম।’ আমি সেটিই আমার ডায়েরির মধ্যে লিখেছিলাম যে, ‘হত্যাকারী যেমন জানে না যে, হত্যাকারী নিজেই একজন হত্যাকারী শেখ মুজিবুরকে হত্যাকারী বলে হত্যা করে যে স্লোগান দিচ্ছে সে নিজেও তো একজন হত্যকারী। সে সেটা জানে না।
দর্শনে একটা কথা আছে যে, গধহ ঈধহহড়ঃ শরষষবফ সধহ.
মানুষ মানুষকে হত্যা করতে পারে না।

১৪.
আমি আমার জীবনকে ভালোবাসি। আমি আত্মহত্যা করতে চাই না। আমি বাঁচতে চাই। আপনাদের মতোই বাঁচতে চাই। আমার মা-বাবা যদি আজকে থাকতেন আমি বলতাম যে দেখ সবাই আমাকে কত ভালোবাসে। আমার বড় ভাই, তিনি যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে ঢাকায় আসতেন আর দেখতেন তার ভাইকে সবাই এত তাদের করে, তখন তিনি বলতেন অসাধারণ ব্যাপার।

Print
©2009. All rights reserved.