Logo_print
 
সূচীপএ : প্রতিবেদন
উত্তরে চিনিশিল্প ঝুঁকির মুখে

একই সময়ে সর্বনিম্ন পরিমাণ চিনি উৎপাদিত হয়েছে ১৯ হাজার ৬০৪ মেট্রিক টন ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে যুদ্ধ পরবর্তীকালে। স্বাধীনতার পর হতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন লোকসান গুনেছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সুপরিকল্পিতভাবে লোকসানের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে দেশের ভারি চিনিশিল্পকে। সরকারের উদাসীনতা, কাঁচামাল সংকট, কারখানার যান্ত্রিক ত্র“টিসহ অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের সম্ভাবনাময় চিনিশিল্প আজ হুমকির মুখে। এ মৌসুমে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন, সব মিলিয়ে লোকসানের বোঝা দেড় হাজার কোটি টাকা পেরিয়েছে, যা দেশের চিনিশিল্পের দুরবস্থা বিস্তারিত অনুসন্ধান করে জানাচ্ছেন সাপ্তাহিক-প্রতিনিধি শরিফুল ইসলাম পলাশ

দেশের সর্ববৃহৎ চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উত্তরের জয়পুরহাট চিনিকল। ১৯৬৩ সালে জয়পুরহাট শহরের পার্শ্বে স্থাপিত এ চিনিকলের বার্ষিক চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৩২০ মেট্রিক টন। প্রায় এক হাজার জনবল  আর আখচাষীদের  নিয়ে এখনো হতাশার মাঝেও বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে জয়পুরহাট চিনিকল। বিগত ২০০৮-২০০৯ ইং মৌসুমে ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৯ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের আশা নিয়ে ২০০৮ সালের ২৮ নবেম্বর শুরু হয়েছিল আখ মাড়াই। প্রয়োজনীয় সংখ্যক আখ না পেয়ে মাত্র ৮৩ দিন চলার পর বন্ধ হয়ে যায় জয়পুরহাট চিনিকল। ওই মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক চিনি উৎপাদন করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। চার হাজার নয়শ পঁয়তাল্লিশ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করেও ন্যায্য বাজার পায়নি। প্রতিকেজি চিনি উৎপাদনের জন্য খরচ প্রায় ৪২ টাকা হলেও চিনি বিক্রি করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৩৩ টাকা।
চিনিকল দেশের উত্তরের সীমান্ত জেলাগুলোর মধ্যে ঠাকুরগাঁও। এখানে রয়েছে  ভারি শিল্প কারখানা ঠাকুরগাঁও চিনিকল। ঠাকুরগাঁও চিনিকলের বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতা বিশিষ্ট এ কলটি পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৯৫৮-৫৯ সালে। বাণিজ্যিকভাবে ১৯৫৯-৭০ সালে উৎপাদন শুরু করার পর ৩১তম মাড়াই মৌসুম শেষে ২০০৯ সালে এসে এ প্রতিষ্ঠানের লোকসানের পরিমাণ এখন ১২২ কোটি টাকা। বিগত বছরের শেষ হওয়া মাড়াই মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ চিনি উৎপাদিত হয়েছে। ১ হাজার ১৪০ মেট্রিক টনের স্থানে মাত্র ৩ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। এক মৌসুমেই ঠাকুরগাঁও চিনিকল লোকসান গুনেছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। অথচ কেবলমাত্র চিনি উৎপাদনের জন্যই ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি টাকা। আর উৎপাদিত চিনির বাজারমূল্য ১১ কোটি টাকা। ঠাকুরগাঁও চিনিকলের কাছে আখচাষীদের পাওনা রয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। অন্যদিকে উৎপাদিত চিনির সিংহভাগ পড়ে আছে অবিক্রীত অবস্থায়। চিনির দাম প্রতি কেজি ৪২ টাকা হলে এ মৌসুমে ঠাকুরগাঁও চিনিকল লাভের মুখ দেখত। কিন্তু চিনির দাম কম (প্রতিকেজি ৩৩ টাকা) , আখ মাড়াই প্রবণতা বৃদ্ধি ও এক মৌসুমে ২০১ ঘণ্টা যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লাভের খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছে উত্তরের এ চিনিকলটি।
১৯৩৩ সালে রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলার গোপালপুরে এ চিনিকলের আখের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখতে স্থাপন করা হয় নিজস্ব খামার ব্যবস্থা। নর্থবেঙ্গল চিনিকলের বর্তমানে ১৫৫ একর আখের পরীক্ষামূলক খামার রয়েছে। বাণিজ্যিকভিক্তিতে আখ উৎপাদনের জন্য আছে ৪ হাজার ৭০৪ একর জমি। আখ সংকটের পাশাপাশি যান্ত্রিক অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখ দেখছে না। নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস-এর সর্বশেষ লোকসানের পরিমাণ প্রায় পৌনে দু’শ কোটি টাকা। সূত্র জানিয়েছে, দেশের প্রথম স্থাপিত চিনিশিল্পের ভাগ্য পরিবর্তনের অবশ্যই কারখানার আধুনিকায়ন (বিএমআরআই) করতে হবে। কারখানার আধুনিকায়নের সাথে আখের দাম বৃদ্ধি করা ও আখ মাড়াই রোধে ব্যবস্থা নেয়া গেলে বেঁচে উঠবে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস। বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস-এর বর্তমান জনবলের পরিমাণ এক সহস্রাধিক। দেশে সর্বশেষ স্থাপিত পাবনা সুগার মিলস্ লিমিটেড পাবনার দাশুড়িয়ায় বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এ চিনিকলটি ১৯৯৬-১৯৯৭ অর্থবছরে যাত্রা শুরু করে। দেশের অন্য চিনিকলের মতো এ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আখ চাষযোগ্য জমি নেই। ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত পাবনা সুগার মিলস্ সর্বমোট লোকসান গুনেছে ৬৩ কোটি টাকা। চাষীদের আখ চাষে কম আগ্রহ, আখ মাড়াই বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট আখ সংকটের কারণে এ চিনিকলটি লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারছে না। এ কারখানায় যান্ত্রিক ত্রুটি না থাকার পরও কেবলমাত্র আখ সংকটের কারণে দেশের সর্বকনিষ্ঠ এ চিনিকলটি বিগত মাড়াই মৌসুমেও কাক্সিক্ষত পরিমাণ চিনি উৎপাদন করতে পারেনি। আগামী ২০০৯-২০১০ মাড়াই মৌসুমেও পাবনা সুগার মিলস লোকসান গুনবে। কারণ রংপুর জেলার একমাত্র ভারি শিল্প শ্যামপুর সুগার মিলস। রংপুর জেলার প্রত্যন্ত পল্লীতে ১৯৬৫ সালে স্থাপিত শ্যামপুর চিনিকলের বার্ষিক চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার মেট্রিক টন। যাত্রা শুরুর পর হতে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক ছিল। ১৯৯২ সালে প্রথম লোকসানের খাতায় নাম ওঠে শ্যামপুর চিনিকলের। তারপর আর এগিয়ে যেতে পারেনি। এ চিনিকলের ৪২ মাড়াই মৌসুম শেষে সর্বমোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। প্রতিবছর এ মিলের মিলজোন এলাকায় রংপুরের মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ উপজেলার বেশ কিছু স্থানে প্রশাসনের কর্তাদের চোখের সামনে আখ মাড়াই করা হয়। সরকারিভাবে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপর আখ মাড়াই রোধে  ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ চিনিকল কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন জনবল সংকট ও সমন্বয়হীনতার কারণে আখ মাড়াই রোধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। অপরদিকে মাড়াইকারীরা অভিযোগ করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। তাদের দাবি সময়মতো আখের মূল্য না পাওয়া, আখের দাম কম হওয়া আর বিকল্প না থাকায় তারা আখ মাড়াই করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে আখের দাম বৃদ্ধিসহ হয়রানি রোধ করা গেলে তারা আখ যতটা সম্ভব চিনিকলে সরবরাহ করবেন। কর্তৃপক্ষের দাবি আখচাষীদের হয়রানি আগের মতো নেই। অনেক কমেছে। যে যার স্থান থেকে নিজেদের মতো করে বলছে। আখচাষী আর কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমঝোতা পারে আখ সঙ্কট অনেকটা মোকাবেলা করতে।
ফরিদপুর জেলার মধুখালীতে অবস্থিত ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড। পাবনা  সুগার মিলস্ স্থাপনের ঠিক ২০ বছর আগে এটি চালু হয়। ১৯৭৬ সালে চালু হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি ৩২টি মাড়াই মৌসুমের মধ্যে ফরিদপুর সুগার মিলস্ মাত্র ৯টি মৌসুমে লাভের মুখ দেখে। ২৩টি মাড়াই মৌসুমে মোট লোকসান গুনেছে  প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ২০০৮-২০০৯ মাড়াই মৌসুমে এ চিনিকল লোকসান গুনেছে ১০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সদ্য সমাপ্ত ২০০৮-২০০৯ মৌসুমে সর্বোচ্চ কার্যদিবসেও এ চিনিকল তার কাক্সিক্ষত পরিমাণ চিনি উৎপাদন করতে পারেনি। অবাধ আখমাড়াই ও যান্ত্রিক ত্র“টি এ চিনিকলের দুর্দশার কারণ।
কেবল জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, নর্থঙ্গেল, শ্যামপুর, পাবনা ও ফরিদপুর সুগার মিলস্-ই নয়, নানা প্রতিবন্ধকতা লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়েছে দেশের ভারি চিনিশিল্পকে। সরকারের উদাসীনতা, কাঁচামাল আখ সংকট, কারখানার যান্ত্রিক ত্র“টিসহ অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের অধীনস্ত দেশের সম্ভাবনাময় চিনিশিল্প আজ কারণে হুমকির মুখে। বিগত  মৌসুমে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের লোকসানের বোঝা দেড় হাজার কোটি টাকা পেরিয়েছে, যা দেশের চিনিশিল্পের দুরবস্থার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ক্রমশ লোকসান গুনতে গুনতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের বেহাল দশা। চিনিশিল্পের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এ কর্পোরেশন থাকলেও এটি চিনিশিল্পের ইতিবাচক পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।  আজো পুরনো নীতিমালার বৃত্তে ঘুরপাক করতে গিয়ে এ শিল্পের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। সাপ্তাহিক-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য।
বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের জন্য বার্ষিক চিনির চাহিদা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যার বিপরীতে দেশের ১৫টি চিনিকলের বার্ষিক চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার ৪৪০ মেট্রিক টন। দেশের মানুষের বার্ষিক চিনির চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিবছর ১০ লাখ মেট্রিক টন চিনি আমদানি করতে হয়। দেশের মানুষের এ চাহিদা পূরণের জন্য আরো অর্ধ শতাধিক চিনিকল স্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সরকার সেদিকে তাকাচ্ছে না। সরকারের উদাসীনতা, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের ব্যর্থতা আর চিনি আমদানির নীতিমালা পরিবর্তনের পাশাপাশি আখ ও চিনির মূল্য বৃদ্ধির না করার কারণে দেশের চালু ১৫টি চিনিকলই কালক্রমে পরিণত হয়েছে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে। যার ফল হিসেবে বিগত ২০০৮-২০০৯ আখ মাড়াই মৌসুমে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের অধীনস্ত দেশের ১৫টি চিনিকলে ২২ লাখ মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আখ পাওয়া গেছে ১৪ লাখ ৪ মেট্রিক টন। যে কারণে ১ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন চিনির স্থানে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৮০  হাজার মেট্রিক টন চিনি। বহু বছর ধরে আখ চাষীদের হয়রানি, অদক্ষ জনবল দ্বারা কারখানা পরিচালনা, কারখানার যান্ত্রিক ত্র“টি, কাঁচামাল সংকট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতি, চিনির উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, চিনি দাম কম হওয়ার কারণে চিনিকলগুলো লোকসান গুনছে। সরকারিভাবে এসব সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি। বরং লোকসানি এসব প্রতিষ্ঠানকে বিরাষ্ট্রীয়করণ করার ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের পথে ঠেলে দিয়েছিল বিগত সরকারগুলো। সরকারের একটি শ্রেণীর হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় চিনি আমদানিনীতি পরিবর্তন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিনিকল চালুর অনুমোদন দেয়ার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে চিনিশিল্প কর্পোরেশনকে।

লোকসানের নেপথ্যে
সাপ্তাহিক-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, চিনিশিল্পের লোকসানের অন্যতম কারণ হলো আখ সংকট। এ সংকটের কারণে চিনিকলসমূহ পর্যাপ্ত চিনি উৎপাদন করতে পারছে না। আখ সংকটের কারণ হলো আখের কম মূল্য (প্রতি কেজি ১ টাকা ৫৫ পয়সা), আখচাষীদের হয়রানি, আখ মাড়াাই প্রবণতা বৃদ্ধি ও কর্মকর্তাদের অনিয়মন-দুর্নীতি। আখচাষীদের প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদানে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে চাষীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে আখের মূল্য প্রতি মণ ৬২ টাকা। ২০০৯-১০ রোপণ মৌসুমের উৎপাদিত আখ আগামী ২০১০-১১ মাড়াই মৌসুমে প্রতি মণ ৮০ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে সম্প্রতি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এর গবেষকদের মতে, আখ চাষের অধিভুক্ত জমির পরিমাণ ঠিক রেখে কেবল মাত্র উন্নত ও লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আখ উৎপাদন আরো ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভ^ব। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ২১৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ে ৩ বছর মেয়াদি এ্যাকশন প্ল্যান কৃষি মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। কিন্তু সেটি আজো আলোর মুখ দেখেনি। আখের উৎপাদন কম হওয়ার কারণে প্রতি একর জমি আখ চাষ করতে গিয়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার টাকা কম আয় হয়। এছাড়া গুড়ের দাম প্রতি কেজি ৪২ টাকা আর চিনি প্রতি কেজি ৩৩ টাকা। তাই উৎপাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ না করে স্থানীয়ভাবে মাড়াই করে গুড় তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-এর হিসেব মতে, প্রতিবছর সারাদেশে গড়ে ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আখ রোপণ করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের আওতায় ০.৭৫ হেক্টর জমিতে এবং মিলজোন বহির্ভূত ০.৭৫ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়। বর্তমানে মিলজোন এলাকায় বার্ষিক ৩৬ লাখ ও নন মিলজোন এলাকায় ৩০.৭৫ লাখ মেট্রিক টন আখ উৎপাদিত হয়। ২০০৮-০৯ মৌসুমে সারাদেশে মিলজোন এলাকায় ৪৫ লাখ ও নন মিলজোন এলাকায় ৩৮.৪৪ মেট্রিক টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অর্জিত হলে  লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক লাখ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করা যাবে। কিন্তু সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
দেশের মিলজোন এলাকায় প্রতিবছর আখ স্থানীয়ভাবে মাড়াই করা হয়। আইনগতভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আখ মাড়াই করা অপরাধ। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসন আখ মাড়াইকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। আখ সংকট মোকাবেলা করতে আখের দাম বৃদ্ধি (সর্বনিম্ন প্রতি মণ ১০০ টাকা), আখচাষী হয়রানি রোধ, আখচাষীদের ভর্তুকি মূল্যে সার-কীটনাশক প্রদান, যথাসময়ে আখের মূল্য পরিশোধ, আখ মাড়াই প্রতিরোধ, অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ, আখ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সঠিক আখচাষী ফেডারেশনের নেতারা সম্প্রতি ৮ দফা দাবিতে দেশব্যাপী প্রচারণা চালাচ্ছে।

কারখানার যান্ত্রিক ত্র“টি
দেশের প্রথম স্থাপিত চিনিকল নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ ও সেতাবগঞ্জ সুগার মিল এর বয়স ৭৫ বছর। চুয়াডাঙ্গার কেরু এ্যান্ড  কোম্পানির ৭৫ বছর। গাইবান্ধা জেলার রংপুর চিনিকল্পের ৫৫, ঠাকুরগাঁও ও জামালপুরের জিলবাংলা সুগার মিলসের ৫১, জয়পুরহাট চিনিকলের ৪৭, রাজশাহী ও কুষ্টিয়া চিনিকলের ৪৪, ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ ও রংপুরের শ্যামপুর চিনিকলের ৪২, পঞ্চগড় চিনিকলের ৪১, ফরিদপুর চিনিকলের ৩৪, নাটোর চিনিকলের ২৫ বছর ও সর্বশেষ স্থাপিত পাবনা চিনিকলের ১৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। চিনিকলগুলোর যান্ত্রিক অবস্থা নাজুক। যে কারণে প্রতিটি চিনিকলই মাঝে মধ্যেই বিগড়ে যায়। কারখানার যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে ব্যাহত হয় উৎপাদন কাজ। বাড়ে উৎপাদন খরচ। বছরের পর বছর ধরে সংস্কার না করার কারণে দেশের প্রায় চালু ১৫টি চিনিকলের যান্ত্রিক অবস্থা নিতান্তই খারাপ। যে কারণে নেমে এসেছে চিনি উৎপাদনের হার। নব্বইয়ের দশকে চিনি আহরণ হার ছিল ৮ দশমিক ৭৭ এখন তা নেমে এসেছে। বিগত মাড়াই মৌসুমে এ হার ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত নেমেছিল। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চিনি আহরণ হার ১২ শতাংশের ওপরে। আমাদের দেশে চিনি আহরণের হার ৯-১০ শতাংশ হলেও চিনিশিল্প লাভজনক হবে। 
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
আখচাষীদের দাবি মেনে দেশ ও মানুষের স্বার্থে চিনি শিল্পকে লাভজনক করতে হবে। এজন্য চিনি কলসমূহের সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার করতে হবে। চিনিকলের সম্পদ বছরের ৯ মাস পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। যার যথাযথ বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে। সামান্য কিছু অবকাঠামো গত পরিবর্তন করেই দেশের ১৫ চিনি কলের সম্পদ ব্যবহার করে বার্ষিক প্রায় সাড়ে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন শ্যামপুর চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সরকার ডাব্লু। তিনি আরো বলেন, ‘চিনি শিল্পকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন বা দিন বদল করা সম্ভব নয়। আখচাষী ও শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য দ্রুত আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি উঠেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সরকার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের সমস্যা সমাধানের কথা বাদ দিয়ে দাতা সংস্থার পরামর্শে  বিরাষ্ট্রীয়করণের চিন্তা করে থাকে। এ নিয়ে শ্রমিকদের অনেক আন্দোলন করতে হয়েছে। দেশের স্বার্থে এ খাতকে রক্ষা করা দরকার।’
বাংলাদেশ আখচাষী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আক্কাছ আলী সাপ্তাহিক-কে বলেন, ‘প্রতি বছর চিনিশিল্প যে পরিমাণ লোকসান করছে (বর্তমানে প্রায় পৌনে ২০০ কোটি টাকা) তার অর্ধেক অর্থ দ্বারা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের আওতাধীন  ১৫ চিনিকলের কারখানা আধুনিকায়ন করা সম্ভব। আখের দাম ১০০ টাকা করতে হবে। কিন্তু সরকার সম্প্রতি আখের যে মূল্য ঘোষণা করেছে তা ২০১০-১১ মৌসুমের বদলে আসন্ন ২০০৯-১০ মৌসুম হতে কার্যকর করা হলে চাষীদের আগ্রহ বাড়বে। দেশের ২৫টি মিলজোন এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার আখচাষী। আখচাষীদের উন্নত পদ্ধতিতে আখ চাষ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা গেলে স্বল্প জমিতে আখ চাষ করেই কাক্সিক্ষত পরিমাণ আখ চাষ করা যেতে পারে। চিনি শিল্পকে রক্ষা করা না গেলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। বেকার হয়ে পড়বে শ্রমিকরা।’

Print
©2009. All rights reserved.