Logo_print
 
সূচীপএ : প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
[ইতিহাসচিত্র] লাকি ফটোগ্রাফার

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সত্তরের সাধারণ নির্বাচন এবং ফলাফল, অসহযোগ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধপরবর্তী হাহাকার, আহাজারি, কান্না, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, মানবিক অনুভূতি, নারী আন্দোলন ও বিভিন্ন সংগ্রাম তিনি তার ক্যামেরার মাধ্যমে মানুষের সামনে আবেদনময় করে উপস্থাপন করেছেন। মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে জাগ্রত করে তুলেছেন। বিখ্যাত, বহুল প্রচারিত ও মুদ্রিত এসব ছবি ইতিহাসের সত্যতাকে ধারণ করছে যুগ যুগ ধরে। নিজের এসব ছবি সম্পর্কে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি শুধু একটি কথাই বললেন। ‘আই এ্যাম এ লাকি ফটোগ্রাফার।’ এমন সব ছবি তিনি তুলেছেন, যা দেখলে মনে হবে আসলেই ভাগ্য তার সহায় ছিল। ভাগ্যবান এই আলোকচিত্র শিল্পীর নাম রশীদ তালুকদার। তার কিছু ছবি
পরিচয়সহ তুলে ধরেছেন আনিস রায়হান

জনসমুদ্র

’৭১-এর মতো অস্থির সময় এদেশে আর কখনো আসেনি। পাকিস্তানিদের শোষণ ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ বাঙালি জাতি তখন চরম বিক্ষুব্ধ। পাকিস্তানের মোহ কেটে গেছে অনেক আগেই। মানুষের তখন একটাই আকাক্সক্ষা স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু ততদিনে হয়ে উঠেছেন বাঙালি জাতির মুক্তির প্রতীক। তার মুখ থেকে স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা শুনতে ’৭১-এর ৭ মার্চে রমনার রেসকোর্স ময়দানে নেমেছিল লাখ লাখ মানুষের ঢল। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু, প্রতিবন্ধী সব শ্রেণীর মানুষই হাজির। প্রত্যেকের চোখেমুখে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর সমুচিত জবাব দেয়ার দৃঢ় কঠিন শপথ। রশীদ তালুকদার তার ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন সেদিনের প্রতিবাদী জনতার এক শৈল্পিক রূপ। অসাধারণ এ ছবিটি আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে রশীদ তালুকদারের অসামান্য দক্ষতার পরিচয় বহন করে। এ ধরনের ছবি সারা বিশ্বে আর কোথাও দেখা যায়নি।

৭ মার্চের ভাষণ

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বিশাল সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর আঙ্গুল উঁচিয়ে ভাষণদানের মুহূর্তটি রশীদ তালুকদার অসাধারণ দক্ষতায় ক্যামেরায় বন্দি করে ফেলেন। বঙ্গবন্ধুর ছবিটি তার তেজোদীপ্ত আত্মপ্রত্যয়, দৃঢ় অবস্থান, কঠিন সংগ্রামের শপথকে যেন প্রকাশ করছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি এ ছবির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে আসছে। ৭ মার্চের আরো একটি ছবি আছে রশীদ তালুকদারের। ছবিটিতে বঙ্গবন্ধুর পেছন দিকটা দেখা যাচ্ছে। তিনি ভাষণদানরত। সামনে অগণিত জনতা। প্রখ্যাত এই আলোকচিত্রী দাবি করেন ‘এই ছবিটি নিয়ে এক ধরনের প্রতারণা চালু আছে এদেশে। আমার তোলা দুটো ছবিতেই বঙ্গবন্ধুর সামনে রাখা হাই টেবিলটি একটি সাদা কাপড়ে ঢাকা। আর অন্যদের তোলা ছবিটিতে কি করে যেন সাদা কাপড়টি উধাও। টেবিলটি অনাবৃত। এই ছবিটি যারা ৭ মার্চের বলে চালিয়ে দিচ্ছেন তারা আসলে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছেন। আসলে অনাবৃত টেবিলের এই ছবিটি হচ্ছে ১৯৭১-এর ৪ জানুয়ারির সমাবেশের ছবি।’

আসাদের শার্ট

‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।’
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি স্বৈরাচার আইয়ুব খানের পুলিশ বাহিনীর গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদ শহীদ হন। আসাদের মৃতুর খবর সারা শহরে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শহীদ আসাদ হত্যা প্রতিবাদে তার রক্তরঞ্জিত শার্ট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশাল মিছিল বের হয়। দুই মাইল লম্বা সেই মিছিল ছিল ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ মিছিল। রশীদ তালুকদার তার ফ্রেমে বন্দি করেন আসাদের শার্ট। ছবিটি দেখে শামসুর রাহমান ‘আসাদের শার্ট’ অমর কবিতাটি লেখেন।

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

গণঅভ্যুত্থানের সময় মিছিলে সেøাগানরত নিহত টোকাইয়ের ছবি। কালজয়ী এই আলোকচিত্রটির আবেদন কখনো ফুরোবার নয়। গণঅভ্যুত্থানের শেষ মিছিল ছিল এটি। আইয়ুব খানের ছবিতে জুতার মালা পরিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের এই মিছিলটি যখন শিক্ষা ভবনের মোড়ে এসে পৌঁছায় তখন রশীদ তালুকদারের চোখ আটকে যায় এই শীর্ণ টোকাইয়ের ওপর। টোকাইটির চোখের ও মুখের প্রতিবাদী ভাষা সারাদেশের নিপীড়নের কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্যকে প্রতিবাদ করতে আহ্বান জানায়। অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ডাক দেয়। এ ধরনের আহ্বান শাসকগোষ্ঠীর কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করে তিনি পেছন ফিরে ঘুরে দাঁড়াতেই ইপিআর কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ছেলেটি নিহত হয়। কিন্তু রশীদ তালুকদার তাকে হারিয়ে যেতে দেননি। তার ক্যামেরার ফ্রেমে সেই সময়ের নির্ভীক সাহসী প্রতিবাদ জীবন্ত হয়ে আছে, থাকবে।

রায়েরবাজার বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। চারদিক থেকেই খবর আসছিল মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় খুব বেশি দূরে নয়। গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরের অলি-গলিতে প্রতিটি মানুষই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থেকে মুক্তির প্রতীক্ষা করছিল। এ সময় পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার প্রকল্প হাতে নেয়। হিটলিস্টে যাদের নাম ছিল তাদের ১৫ নবেম্বর থেকেই ঘরবাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা শুরু করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর  এদেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকার, আলশামস। ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর এমনকি ১৬ ডিসেম্বরও ঘাতকরা বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছে। ওরা মেরেছে কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলীসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে। রশীদ তালুকদারের তোলা ছবিগুলো সেই বীভৎসতার ইতিহাস প্রতিনিয়ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

Print
©2009. All rights reserved.