Logo_print
 
সূচীপএ : প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
[অপ্রকাশিত রচনা] শহীদুল্লাহ কায়সার কারাবাসে থাকাকালীন অপ্রকাশিত একখানা চিঠি ও প্রাসঙ্গিক কথা


ভূমিকা : পান্না কায়সার
কল্যাণীয় জব্বারের কথা ফেলতে পারলাম না। আমার ভেতরের কষ্টটা তো ওকে বোঝাতেও পারছি না।  শহীদুল্লাহ্ কায়সারের নিজের হাতের অপ্রকাশিত লেখা চেয়ে বার বার আমাকে আন্তরিক তাগাদা। শহীদুল্লাহ্ কায়সারের পাণ্ডুলিপির প্যাকেটটা সযতেœ তুলে রেখেছি। মাঝে মাঝে চাড়মোছ করে আবার সযতেœ রেখে দেই। এতেও যে কত কষ্ট  সে কেবল আমি-ই বুঝি। একটি মানুষ হারিয়ে গেছে সে কত দিন আগে। মহৎ স্মৃতি নিয়ে বুকে পাথরচাপা কষ্ট নিয়ে, বেঁচে থাকার বেদনা নিয়ে আজো বেঁচে আছি। সুখের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা যে কী কষ্টের, যে ভুক্তভোগী সেই  বোঝে। একজন প্রাজ্ঞ মহৎ ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘ বছর কাটাতে পারলাম না। দুই বছর দশ মাস আমাদের সুখের সংসারে আনন্দে কেটেছে। ওকে যত দেখেছি তত মুগ্ধ হয়েছি। তত অনুশীলন গ্রহণ করেছি। প্রতিনিয়ত ওকে নতুন নতুন রূপে আবিষ্কার করেছি। এত মহত্ত্ব! এত বিরাটত্ব! বিশালত্ব! সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ! অমায়িক ব্যবহার! হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল এমন পুরুষের সান্নিধ্যে আশা ভাগ্যের ব্যাপার। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে ওকে অনুসরণ করেছি। রক্ষণশীল পরিবার থেকে আসা স্ত্রীকে হাতে ধরে কিছু শেখায়নি। আমি-ই ওর মহত্ত্বের কাছে নিজেকে সম্পন্ন করে কেবল ওকে অনুসরণ করেছি।
আমার সঙ্গে ওর দেখা কাকতালীয়ভাবেই। পরের দিন-ই সরাসরি নিজেই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির। মায়ের আপত্তি, আত্মীয়দের আপত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওঁর দুটি উপন্যাস (সংশপ্তক, সারেং বৌ) আমি পড়ে ওর অনুরক্ত ভক্ত হয়ে উঠলাম তখন থেকেই। প্রিয় সে ঔপন্যাসিক আমাকে বিয়ে করতে চায়। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। মধ্যবিত্তের মেয়েরা কিছু মুখ ফুটে বলতে পারে না। এ নিয়মরীতির বাইরে গিয়ে শহীদুল্লাহ্ কায়সার সবার সামনে আমার হাতখানা ধরে বলল, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। সবার সামনে তোমাকে তোমার ইচ্ছার কথাটি বলতে হবে। আমি পোড় খাওয়া মানুষ। জেল খেটেছি। আত্মগোপনে থেকেছি। করি নিষিদ্ধ রাজনীতি। করি সাংবাদিকতা। আগামী দিনগুলো তোমাকে নিয়ে সাজাতে চাই। তোমার একটি ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর ওপর আমার সবকিছু নির্ভর করে। এত সুন্দর এবং দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বলেছেÑ ওর ব্যক্তিত্বের প্রভা দিব্যদৃষ্টিতে আমাকে মুগ্ধ করেছে। মা-বোনের সামনেই মুখ ফসকে বলে ফেললাম ‘এ বিয়েতে আমার আপত্তি নেই।’ শহীদুল্লাহ্ কায়সার সঙ্গে সঙ্গে মা ও বড় বোনকে সালাম করে বলেই ফেলল, বিয়ের দিন ধার্য হোক ১৭ ফেব্রুয়ারি। মা আর আপা বললেন, মাত্র পাঁচদিনে আয়োজন সম্ভব? যাক, অনাড়ম্বরভাবে পাঁচ দিনেই আয়োজন সম্পন্ন। ১৬ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যাকাণ্ডে সারাদেশে কারফিউ। মা ফোনে জানিয়ে দিলেন ‘এ বিয়ে হবে না।’ শহীদুল্লাহ্ কায়সার নাছোড়বান্দা। বললেন, কাল কারফিউ পাস নিয়ে আসব সঙ্গে কাজীও নিয়ে আসব।
১৭ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ কারফিউর মধ্যে আমার বিয়ে হয়ে গেল। পুলিশ আর্মির টহল দেয়া শূন্য খা খা করা রাস্তা পেরিয়ে বউ সেজে উঠে এলাম ২৯ বিকে গাঙ্গুলি লেনে। আমার জীবনের নবযাত্রা শুরু। ছোট গণ্ডি থেকে বৃহৎ এবং মহৎ গণ্ডিতে আমার চৈতন্যে  আলোর বিচ্ছুরণ। প্রতিদিনই আমার কাছে নতুন মনে হতো। শহীদুল্লাহ্ কায়সারের চমক লাগানো ব্যবহার, দেশ এবং মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আমাকে নিয়তই ওর দিকে টেনেছে। চাঁদনি রাতে ছাদে বসে গল্প, ভালোবাসা বা প্রেমালাপ নয়। ওঁর সংগ্রামী জীবনের কথা শুনতে শুনতে শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়েছে। আমি বললাম, তোমার উপযুক্ত স্ত্রী হয়ে আমি কী তোমাকে সুখী করতে পারব? উত্তরে বলত ‘উপযুক্ত হয়ে কেউ জন্মায় না, যোগ্যতা অর্জন করতে হয়, যদি ইচ্ছে থাকে। যোগ্যতা অর্জনের জন্য লাগে সততা, নিষ্ঠা, হিংসা-বিদ্বেষহীন মনন ও মানসিকতা। তুমি পারবে। এ রকম কত কথা গাড়ি চালাতে চালাতে বা বিকেলে চা খেতে খেতে খোলা বারান্দায় চাঁদনি রাতে ছাদে বসে কেটেছে কত সময়। এ কথাগুলো যে একদিন সে হীন আমার জীবনে কাজে লাগবে আমি কি জানতাম। কথাচ্ছলে কত দীক্ষা পেয়েছি ওঁর কাছে। ওর অবর্তমানে এ দীক্ষাই আমার একাকী পথচলার অনুপ্রেরক শক্তি।
’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে ঢাকায় বিভিন্ন বাসায় জায়গা বদল করে কত কষ্টের জীবনযাপন। একদিন ওর সমস্ত পাণ্ডুলিপিগুলোর প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বলল, সযতেœ রেখ। বাচ্চাদের আমার আদর্শে বড় করবে। আমি রেগে বললাম, তুমি কোথায় যাবে? সঙ্গে আমিও যাব। আমার হাতটা ওর হাতে তুলে গভীর মমতায় বলল,  তুমি আমার জীবনের সবটুকুজুড়ে। কিছুই তো তোমার কাছে গোপন রাখিনিÑ রাখছি না, রাখবও না। দেখছ না মুক্তিযোদ্ধারা ছদ্মবেশে আমার কাছে আসে। ডা. রাব্বি সারা সপ্তাহ ওষুধের সামগ্রী যোগাড় করে রাখে। সুফিয়া কামালের কাছে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় অনেকে রেশন কার্ড দিয়ে গেছে। উনি সপ্তাহের রেশন তুলে মজুদ করে রাখেন। আমি আর নুরুল ইসলাম (গণতন্ত্র পার্টি চেয়ারম্যান, যিনি কিছুদিন আগে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন) ওগুলো সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে গোপনে তুলে দেয়াই আমাদের কাজ। দেখছ না আলবদর-রাজাকারদের দৌরাত্ম্য কীভাবে বেড়েছে। এক জায়গায় বেশিদিন থাকা যাচ্ছে না। মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করেই তো আমার জীবনযাত্রা। এখন সঙ্গে তুমি। মৃত্যুকে পরোয়া করি না। দেশের জন্য প্রাণ দেয়াও মহৎ কাজ। তুমি শক্ত হও। স্বাধীনতা ঠেকাতে পারবে না ইয়াহিয়া। শুধু সময়ের ব্যাপার। আমি ভয়ে ভেতরে ভেতরে কুচকে যেতাম। ওকে কিছু বুঝতে দিতাম না।
মায়ের কাছে নভেম্বরে আমাকে ডেকে বলল, চলো ২৯ বিকে গাঙ্গুলিতে যাই। পুরান ঢাকায় আলবদর-রাজাকারের দৌরাত্ম্য নেই। আমি ওর কথার অবাধ্য কোনোদিন হইনি। সেদিনও হতে পারিনি। নভেম্বরের শেষের দিকে ফিরে এলাম ২৯ বিকে গাঙ্গুলি লেনে। শহীদুল্লাহ্ কায়সারকে বেশ উৎফুল্ল মনে হতো তখন। আমি হাসতে হাসতে একদিন বলেই ফেললাম এত উৎফুল্ল কেন? হাসতে হাসতে উত্তর দিল ‘পাকবাহিনী পিছু হটছে। আমাকে বড় একটা কাগজ দেখিয়ে বলল, দ্যাখ। দেখলাম বড় বড় অক্ষরে লেখা সংবাদের জন্য হেড লাইন নানা ভাষায়। এই হেড লাইনগুলো দেখে আমিও আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। ভাবলাম আমার স্বামী রাজনীতিবিদ, নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে সবই জানে। দেশ স্বাধীন হয়েও যাচ্ছে আনন্দের বিষয় তো বটেই।
ডিসেম্বরের তিন তারিখে  মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে পাকবাহিনীর ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ চালায়। শহীদুল্লাহ্ কায়সারের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কীভাবে দেশকে সাজানো যায়Ñ এ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ফোন শুধু ফোন। সংবাদের জন্য হেড লাইন এডিটরিয়েল এসব নানা বিষয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ১২ ডিসেম্বর  সকালে নূরুল ইসলাম (গণতন্ত্রী পার্টির চেয়ারম্যান যিনি নির্বাচনের আগে আগুনে পুড়ে মারা যান) আমাদের বাসা খোলা বারান্দায় অনেকক্ষণ শহীদুল্লাহ্র সঙ্গে কথা বলে চলে গেল। ওরা রাজনীতি বিষয়ে কথা বলছে ভেবে আমি সামনে যাইনি। দূর থেকে ইসলাম ভাইকে সালাম জানিয়েছি কেবল। ইসলাম ভাই চলে যাওয়ার পরে জানতে চাইলাম ইসলাম ভাই কি বলল? শহীদুল্লাহ্কে যেন চিন্তিত মনে হলেও আমার প্রশ্নের জবাবে বলল, কালই আমাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলল। সোভিয়েত দূতাবাসে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমার ভেতরটা আঁতকে উঠল কেন জানি না মুখ ফসকে বলে ফেললাম তবে আজই যেতে। শহীদুল্লাহ্ আমার কপালে হাত রেখে বলল তুমি আমাকে আজই যেতে বলছ কেন? বাসা থেকে দ্রুত তাড়িয়ে দিতে চাও বুঝি? সান্ত্বনা সুরে বলল, কাল যাব। রাতে আমার ব্যাগটা গুছিয়ে দিও। যাওয়াটা যে কেন দেশ তো স্বাধীন হয়েই গেছে প্রায়। আবার নিজেই বলল, যুদ্ধ শেষে সব দেশেই বিপদের আশঙ্কা থাকে। যাক, যথারীতি ১৩ তারিখ কারফিউ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শহীদুল্লাহ্ মায়ের পায়ে সালাম করে আমার হাতে মৃদ চাপ দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল। কেন যে আমার এত কান্না পেল জানি না। ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু থেকেই টানা কারফিউ। প্রতিদিন আধ বা এক ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেয়া হয়। আমি শাশুড়ির কাছে ৬ মাসের ছেলে-দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকলাম। ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। বিয়ের পর থেকে ওকে ছাড়া একদিনও থাকিনি। কবে দেশ শত্রুমুক্ত হবেÑ বাংলাদেশ স্বাধীন হবে কে জানে। এসব ভাবতে ভাবতেই তন্দ্রায় চোখ বুজে আসতেই শহীদুল্লাহ্র কণ্ঠস্বর কানে এলোÑ আমার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে একেবারে আমার মাথার কাছে এসে দাঁড়াল। আমি হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলাম। বললাম, তুমি ফিরে এলে যে? ও নেমে বলল, ওরা আমাদের সবার জন্যই ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাই ভাবলাম, কাল তোমাকে, মাকে ও বাচ্চাদের নিয়েই যাব। কাল কারফিউ উঠলেই আমরা চলে যাব।
কখন কাল আসবেÑ এ চিন্তায় রাতে ছটফট করি। শহীদুল্লাহ্ রাতে সিগারেটের প্যাকেটের সাদা জায়গাটুকুতে কি যেন লিখছে দেখলাম। এটি ওর সহজাত স্বভাব ছিল। এক টুকরো কাগজ পেলেও কিছু একটা লেখা ওর অভ্যাস। আমি ওর পাশে দাঁড়াতেই চিরকুটটা আমার হাতে দিয়ে বলল, তোমাকে প্রেমপত্র লিখলাম। চিরকুটটা নিয়ে আমি পড়ে রেগে বললাম, এটা কি প্রেমপত্র? যত অলুক্ষণে  লেখা। চিরকুটটায় লেখা ছিল ‘যদি কোনোদিন দূরে বহুদূরে চলে যাই বাচ্চাদের আমার আদর্শে বড় কর। আমার পাণ্ডলিপিগুলো সযতেœ রেখ। মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার চেষ্টা কর। কারো করুণা নিয়ে নিজকে ছোট কর না। এ পর্যন্ত পড়েই আমি চিরকুটটা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। বাকি লাইন কটা পড়া হলো না। আমি অভিমানে বললাম, এটি কি প্রেমপত্র? তুমি দূরে কোথায় যাবে? কাল তো আমরা কি সঙ্গেই যাচ্ছি। শহীদুল্লাহ্ আমার হাতটা ওর হাতে তুলে বলল,  দূরে আর কোথায় যাব। চিরকাল তোমার পাশেই থাকব। ওকে আর কষ্ট দিয়ে কথা না বলে বললাম, আমি একটা স্যুটকেস গুছিয়ে রেখেছি। কাল কারফিউ উঠলেই চলে যাব; কিন্তু তোমার পাণ্ডলিপির প্যাকেট আলমিরাতে যতেœ রেখেছি।
১৪ ডিসেম্বরে কারফিউ তুলে নেয়াই হয়নি। সারাদিন অপেক্ষা। দিন গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। বাড়ির সবার মন খারাপ। শহীদুল্লাহ্রও। সন্ধ্যায় সিঁড়ির পাশেই বসার ঘরে শহীদুল্লাহ্ সোফায় বসে বিবিসি সোনার চেষ্টা করছিলÑ পাশে ৬ মাসের ছেলে অমিতাভ, আমি নিচে পাতা কার্পেটে বসে শমীকে শিশিতে দুধ খাওয়াচ্ছিলাম। কারফিউ ব্ল্যাক আউট মর্টার মেশিন গানের কানফাঁটা শব্দ। মুখে কালো কাপড় বাঁধা ৪/৫ জন টপটপ সিঁড়ির ওপরে বসার ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন শহীদুল্লাহ্ কায়সারকে? শহীদুল্লাহ্ গর্বের সঙ্গে বলল, আমিই শহীদুল্লাহ্ কায়সার। এ কথা বলতেই ওরা ওকে হাত ধরে টেনে বারান্দায় নিতেই আমি চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে ডাকতে শমীকে কোল থেকে ফেলে ছুটে গেলাম বারান্দায়। শহীদুল্লাহ্র আরেক হাত টেনে ধরলাম। ফাঁকে বারান্দার বাতি জ্বালিয়ে একজনের মুখের কাপড় হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেললাম। পাশের ঘর থেকে আমার ননদও ছুটে এসে ভাইকে আটকাতে চেষ্টা করেও পারল না। ওদের হ্যাঁচকা টানে আমার হাতখানা ওর হাত থেকে ছুটে গেল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফিরে। আবার অজ্ঞান। ওকে আলবদর বাহিনীর লোক ধরে নিয়ে যাওয়ার বিশদ বর্ণনায় গেলাম না। বিবরণ দিতে হলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা চলবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। আশা করি আমার স্বামীর হত্যাকারীরও বিচার হবে।
স্নেহাস্পদ জব্বারের কথা ফেলতে পারলাম না বলেই বুকের রক্তক্ষরণ সামাল দিয়েও লেখাটা লিখে ফেললাম। লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেল। জব্বারের শহীদুল্লাহ্ কায়সারের অপ্রকাশিত যে কোনো একটা লেখা চেয়ে বার বার অনুরোধটা ফেলতে পারলাম না। শহীদুল্লাহ্ কায়সার রচনাবলীতে ওর সব লেখাই সন্নিবেশিত হয়েছে। ২/১টা চিঠি  (যা শহীদুল্লাহ্ জেলখানায় বসে লিখেছিল, যা আমারও অজানা ছিল। শহীদুল্লাহ্ কায়সার রচনাবলী প্রকাশের পর ওর বন্ধু রাজিয়া খান আমিন ক’টা চিঠি (যা জেলখানায় বসে ওকে লিখেছিল) আমাকে দিয়ে চোখের জলে ভেসেছে। আনোয়ারুল আমিন খান ও তার স্ত্রী রাজিয়া খান আমিন শহীদুল্লাহ্ কায়সারের পরম বন্ধু ছিল। জেলখানায় বসে রাজিয়া খানকে লেখা একটি চিঠি আমার এ ক্ষুদ্র লেখার সঙ্গে তুলে ধরলাম।
জানতে চেয়েছ আমার ক্রিয়াকলাপ। প্রথমে বলে রাখি ক্রিয়াও নেই। আমার প্রি-প্রাক (উৎপত্তি অর্থে) উৎপত্তি সৃষ্টি ছাড়া জীবনে। এই পৃষ্ঠা ছাড়া (?) জীবনে। আছে শুধু কতগুলো ঘটনা যা জানানোর বা জানবার মতো নয় আদৌ। কেননা ওতে নেই কোনো গৌরব। তবু জানবার ইচ্ছা তোমার সন-তারিখসহ জানাচ্ছি।
১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত কারাবাস। এরি মাঝে পঞ্চাশ সালে মাসেকের জন্যে কেন যেন ছেড়ে দিয়েছিল তদানীন্তন সরকার। বোধহয় পথ পাওয়া বদলের ব্যবস্থা হিসেবে। সেই মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে নতুন ঢাকার প্রশস্ত কোনো পথের মোড়ে শান্তর জন্য দেখা হয়ে গেছিল রাজু নামের মেয়েটির সঙ্গে দেখলাম, তোমারই যার মুখে ছিল সূর্যের কোনো বেদনার ছায়া বেশ বড় হয়েছে ও। আর ছিলে প্রশান্ত এক সৌন্দর্য নিয়ে অনন্যা হয়েছে।
ছাপ্পান্নোর সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সাংবাদিকতার বৃত্তি নিয়েছিলাম, সেই সঙ্গে নিজের বিষয়টাও অর্থাৎ অর্থনীতি নিয়ে টুকটাক লেখা পত্রপত্রিকায়।
১৯৫৮ সালের ১৪ অক্টোবর মধ্যরাতে গ্রেফতার যথা পূর্বং কারাগারে প্রত্যাবর্তন। সেই থেকে চালানো অতিথ্য আর নিঃসঙ্গতার দুঃসহ পেশায় ছটফটিয়ে জীবনের কঠিনতম দিনগুলোকে টেনে চলেছে।
তখনকার ক্রিয়াকলাপ, সকালে লেপের উমো শুয়ে শুয়ে চা পান (ইদানীং তেঁতুল পাতা সেদ্ধ হলো)
৭৮/৬  টোস্ট মার্কা ডানলপের ধারায় পাড়ি দিয়ে ছিঁড়ে খাও আর খেতে খেতে গল্প করার কখন ভাগ্যে জুটেছিল নরম ছেঁকা রুটি। তারপর পত্রিকাগুলোর উপরে রাখা গল্পগুলোই চিঠিপত্র লিখি। দুপুর এ চাপ যায়। একটু গুমোট খাওয়ার পর বিকেলে চললাম, নামি সাড়ে ৪টায়, তার সঙ্গে আধর চলাচলের পরিচর্যা পানি ঢালা একটু যা ঘুরনী চালানো।
সাপ আদরের  সঙ্গে সঙ্গেই (যারা সাধন অনুযায়ী যব ঢ়ড়ঁৎ ংঁহংবঃ) ‘লক আপ’ অর্থাৎ গোয়ালে তালা। কিছুক্ষণ তাস পিটাই অথবা বসি দাবার ছক নিয়ে। তারপর খাওয়া সেরে বসি খাতা-কলম নিয়ে। লিখি যতক্ষণ ভালো লাগে যত লিখি তার চেয়ে কাটি বেশি।
কি করলাম যে, বারবার জেল খাটি? কি জবাব দেব তোমার এ প্রশ্নে। তোমার সহানুভূতির অন্ত নেই তাই প্রশ্ন এসেছে তোমার মনে। আটকের কারণ লেখা আছে সরকারি দপ্তরে, যা আমার জানার ইচ্ছা নেই। আমাকে দেয়া হয়েছে একটি টাইপ করা কাগজ, তার মূল বক্তব্য হলো আমার  স্বাধীনতা জনস্বার্থেও নিরাপত্তার পক্ষে হুমকিস্বরূপ তাই জননিরাপত্তা অর্ডিন্যান্স মোতাবেক সংকুচিত পক্ষের স্বাধীনতা আমার কি মনে হয়, জানো? এ আমার কপালের লিখন অথবা কালের লিখন আমার কপালে। নইলে গোটা যৌবন বছরগুলো যা নাকি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, সেই যৌবনটা যৌবনের প্রকট এক দুর্যোগপূর্ণ মাঝে কাটবে কেন?
ভাগ্যের কথা টেনে আসলাম বলে মুচকি মুচকি হাসছেন। না?
আমার ছোটবেলার একটা ঘটনা শোনাই তোমাকে, ম্যাট্রিকে আমি সবচেয়ে কম নম্বর পেয়েছিলাম ভূগোলে। আমার একটুও ভালো লাগত না ভূগোলের বইটা। তবু কলেজে যখন ভর্তি হলাম আমার পয়েলা পড়সনঁংঃরড়হ ংঁনলবপঃ  হলো ভূগোল। কেন যে ওই উদ্ভট কাণ্ডটি করেছিলাম আজো তা আমি বুুঝি না।
কারাবাসটা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তবু মনে হয় এত তেমন একটি উদ্ভট কিছু যা আমি বুঝি না।
দুঃখের নাকি কথাটা এর ঘৃণা করি আমি, আচ-আচার্য তোমার শুভেচ্ছা কেউ তা আমার পুনরুদ্ধ কান্না আর বেদনার উৎসটাকেই যেন খুলে দিয়েছে। মানবীয় স্তন আর অনুভূতিগুলোকে বুঝি এখনো ছোট ফল হবে পারনি তুমি। তাই দুঃখ দেখলে তোমার চোখে অশ্রু গড়ায়। আর্দ্রতায় ভরে ওঠে হৃদয়টা। পার্থিব আর সার্থকতা যাদের থেকে আনা সেই শক্ত মায়েদের মতো বলতে পার না তুমি যিবৎ মহযযরপয. যিবৎব সড়ঁংঃ সবহযধষ ঃধংয? পার না, কেননা তোমার তন্ত্রীতে কাজে অর্কিয়সের কী না।
রাজু, আমার মনের কথাটা কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টো, যদিও ভীতি গভীর কোনো বেদনাবোধ  নিয়েই ভাবি। তবু দুঃখের নিরানন্দের কথা একটুও লিখতে চাইনে তোমাকে। লিখতে চাই খুশির কথা, শোনাতে চাই আনন্দের গান। ওটাই যে সত্য কেননা বেদনার সমুদ্র মসৃণ করে যে গরল তুলেছি আমি তার ভাগিদার করতে চাই না কাউকে, তোমাকে তো নয়-ই, এমনিতেই অনেক কষ্ট তোমার।
তুমি তো জান দুঃখ বিলাসী আমি নই। যে দ্বন্দ্ব সে দ্বন্দ্বের ক্ষত বিপ্লব নিজের মনের অলিখিতকে জয় করেছি আমি অনেক পূর্বে। অফুরান বিদগ্ধ জনের হাসির ঘোরাক, কিন্তু পরিহাসের অন্তরালে তার যে বেদনাবোধ সে বেদনাবোধের প্রতিধ্বনি পেয়েছি লিঙ্গের হাজারো ইচ্ছায় কর্মে। আর তাই অনির্বচনীয় কৌতুক থাকে আমরা বলি জীবনবোধ বেদনার মাঝেও সেই কৌতুক অন্তঃশালীলা এক খুশির স্রোতের মতো আমায় নিপতিত করেছে। প্রাণের অফুরন্ত ফোয়ারা।
এতো সমগ্র লোকও আছে, দেখি ওদের ১ খাঁচার দণ্ডে তাদের প্রয়োজন হয় না হৃদয় নামক পদার্থটির সেই নিত্য রোগের প্রবাহটি অনুভব করে সেটাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার আত্মার সাথীকে সে সম্পদটাই যে দিতে চাই। অন্য কিছু নয়।
একটা হাস্যকর ব্যাপার মনে পড়ল। মাঝে মাঝে যখন কলম নিয়েও আমি চমকে উঠি তন্ময়তা,  দেখি ঘণ্টায় একটি শব্দও বেরিয়ে আপনি ঝলক থেকে। ভেবে দেখি আমি যেন কার সঙ্গে কথা বলছিলাম। অনেক কষ্ট করে ফুটিয়ে তুলি তার চেহারাটা। আবার চমকে উঠি। কেননা লোকটা সেই ফরাসি নায়ক যে দুনিয়ার সমস্ত বেদনার বোঝা কাঁধে নিয়ে কেঁদেছিল। (মাঝেমধ্যে মনে হয় ............... হয়ে যাচ্ছি কি?)
এখন বোধহয় মধ্য রাত গড়িয়ে গেছে। ধবধবে জ্যোৎস্নায় নেমেছে সিমেন্ট করা সারা আহ্বানে। নিম গাছে রাত জাগা পাখির পাখা ঝাপটানি, কাক জ্যোৎস্না বুঝি অস্থিরতার আগুন ধরিয়েছে ওদের সর্বাঙ্গে। কার পায়ের যুদ্ধ বাতাসে ও ফুলের সৌরভ, নতুন ফোটা হাসনাহেনার মধ্যরাতের জ্যোৎস্না প্লাবনে গন্ধমুখর। এমন রাতে গরাদের দুঃস্বপ্ন যায় ভেঙে। ই্চ্ছা করে দু’হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন এই ছড়ানো রাতের মায়াময় এই রূপটিকে।
একটা আমাকে আর সেই আশার অমৃত যন্ত্রণাকে বুকে ধরে কেমন পরাজিতের মতো লেপের তলায় মুখ ঢাকি।
তারিখ ১৪ জানুয়ারি ১৯৯৬

আচ্ছা সমাজ কি হচ্ছে বল...?
প্রীতি বন্ধুত্ব সমতা, সর্বাধিক মানবীয় গুণগুলোকে কি ‘ঝেঁটিয়ে তাড়িয়ে দূর দেশে নির্বাসন দিতে বসেছি আমরা।’ নিঃস্বার্থবাদিতা, সহৃদয় উদারতা কোমল আবেগ ওসবের কোনো মূল্য নেই যেন। সব যেন যন্ত্রের মানুষ, স্বার্থের মানুষ, হিসেব করে গুনে গুনে পা ফেলার। মানুষ গোটা শরীর আর স্নায়ুগুলো আমার বিষিয়ে ওঠে। মরিয়ম চিঠি দিয়েছিলাম সে-ই পথে, জবাব পাইনি। অবাক হইনি। (একটু বুঝি) ওর দেখা কি? ওর তো মানব মামলা, একান্ত নিকটের বলে ভাবতাম তারাই তো কেমন ব্যস্ততার ভান করে একের পর এক সরে গেল দূরে। এত বুঝি জীবনের সুন্দর  দান, অগ্রাহ্য করি না এ দান। জীবনের সব দেয়াকে হাত ভরে নেয়ার ক্ষমতা ক’জনের আছে, রাজু।
সেদিন এসেছিল কবির। অনেকক্ষণ গল্প করলাম। তিনটে উপন্যাস বেরুলো ধারাবাহিকভাবে। শিগগিরই বোধহয় বই আকারে বেরুচ্ছে। ওর প্রকাশ ভঙ্গিটা সহজ বলেই বোধহয় বলিষ্ঠ আর তাই গভীর তার আবেদন।
মনের উপরও যে সত্য আছে রাজু। সে সত্যের মানুষকে অনেক সময় মন নামক পদার্থটিকে ‘থেঁতলে’ গুঁড়িয়ে চলতে হয়, সেটা মানে? এছাড়া তুমি মানো না। তোমার কাছে হৃদয়ের সত্যটাই পরম সত্য। আমি তা অস্বীকার করি না। কিন্তু বলতে পারে স্বয়ম্ভূ হৃদয় বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে কি এ জগতে?
(চিঠিটি অবিকৃতভাবে ছাপা হলো)

Print
©2009. All rights reserved.