Logo_print
 
সূচীপএ : ফিচার ও অন্যান্য
[সেই সময়] জীবনেরই আরেক নাম


প্রেম-বিরহে, আনন্দ-বিষাদে, শান্তি-বিপ্লবে ও ভাবে তার কবিতা বার বার এ দেশের মানুষের সামনে এসেছে। ‘ভাত দে হারামজাদা, নয় মানচিত্র খাবো’ তার কবিতার বহুবিশ্রুত পঙ্ক্তি। কীভাবে, কোন পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন এই কবিÑ সে সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। তার আত্মজীবনী, সাক্ষাৎকার পাঠপূর্বক এবং নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে শুনে এই প্রয়াস।

স্বকৃত নোমান

১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি রফিক আজাদ। পিতা সলিম উদ্দিন খান ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসেবক এবং মা রাবেয়া খান ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। দুই ভাই-এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। বাবা-মায়ের পাশাপাশি বোন রেণুর স্নেহ পেয়েছেন ছোটবেলায়। তার কোলে-পিঠে চড়ে বড় হয়েছেন তিনি। প্রকৃতার্থে তারা ছিলেন তিন ভাই-দুই বোন। কিন্তু তার জন্মের আগে মারা যায় সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই মাওলা ও তৎপরবর্তী বোন খুকি। রফিক আজাদ যখন মায়ের গর্ভে তখন অকাল প্রয়াত বড় বোন অনাগত ছোট ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘জীবন’। রফিক আজাদ ‘জীবনের’ই আরেক নাম।
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের কালে জন্ম হলেও হাতেখড়ি পান দেশ ভাগের পরে। প্রথমে তাকে ভর্তি করানো হলো সাধুটী মিডল ইংলিশ স্কুলে। ছোটবেলায় কঠিন অনুশাসনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। একাকী স্কুলে যাওয়া সম্পূর্ণরূপে বারণ ছিল। পাহারাদার হিসেবে কাউকে না কাউকে সঙ্গে দেয়া হতো। তখন গ্রামের সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মতো কোনো স্বাধীনতা ছিল না তার। শৈশবের এই একাকিত্ব একটা বড় কাজ দিয়েছে বটে। ক্লাস ফাইভে থাকতেই সাধুটী স্কুল লাইব্রেরির সব বই তিনি পড়ে ফেললেন। তন্মধ্যে ছিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবী চৌধুরাণী, কপালকু-লা, আনন্দমঠ। তখন থেকেই তিনি বঙ্কিমের ভক্ত হয়ে ওঠেন।
সাধুটী স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষক ছিলেন ব্রাহ্মণকুলের। বাংলা পড়াতেন ক্ষিতীশ ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন খানিকটা বদরাগী এবং অত্যন্ত বিদ্বান। প্রায়ই ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়তেন। ছাত্রদের দিয়ে পালা করে তিনি মাথার পাকা চুল তোলাতেন। রফিক আজাদের পালা এলে তিনি স্যারের মাথার কাঁচা চুল তুলে ফেলে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিতেন। ফলে তাকে আর চুল তুলতে বলা হতো না। এই বিদ্যানুরাগী শিক্ষকের কাছেই প্রথম রফিক আজাদ বঙ্কিমচন্দ্রের পাঠ নিয়েছিলেন। আনন্দমঠ যে টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের ভেতরেই এক ঐতিহ্যবাহী মঠ, সে কথা জানতে পারেন।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। সাধুটী মিডল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র রফিক আজাদ। স্কুলের উপরের ক্লাসের ছাত্ররা মাথায় কালো ব্যাজ পরে নিচের ক্লাসের ছাত্রদের মাঠে জড়ো করলো। আগের দিন ঢাকায় নিহত হয়েছেন রফিক-সালাম-বরকত। প্রতিবাদে কালিহাতিতেও মিছিল হবে। মিছিল নিয়ে স্কুলের সবাইকে যেতে হবে ঘাটাইলে। টগবগ করে ওঠে কিশোর রফিক আজাদের মন। তিনিও যাবেন মিছিলে। স্কুলে আনা-নেয়ার জন্য যে লোকটি নিয়োজিত ছিল তার হাতে পায়ের স্যান্ডেল দুটি দিয়ে চলে যেতে বললেন তাকে। বাবা-মায়ের কঠিন শাসন অস্বীকার করে খালি পায়ে হেঁটে তিনি ছুটে চললেন মিছিলে।
ভাষার প্রতি এই ভালোবাসা পরবর্তী জীবনে তাকে তৈরি করেছিল একজন কবি হিসেবে, আদর্শ মানুষ হিসেবে।

৩.
রফিক আজাদের বাবা ছিলেন সমাজের মান্যগণ্য মানুষ। গ্রামের সালিশ-দরবারে থাকত তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। বাড়িতে গ্রামের সমমনা মানুষদের সঙ্গে চলত তার নিয়মিত আড্ডা। বাবার প্রভাবেই হয়ত রফিক আজাদের ভিতরও ছিল সেই আড্ডার নেশা। কৈশোর থেকেই তিনি একজন আড্ডাপ্রিয় মানুষ। এই আড্ডার জন্য কৈশোরে একবার বাবার হাতে মার খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। ১৯৫৬ সাল। তিনি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। কাউকে কিছু না বলে ঘরে রাখা কিছু টাকা নিয়ে ট্রেনে চড়ে ভারতের উদ্দেশে পাড়ি দিলেন তিনি। উদ্দেশ্য, পি.সি সরকারের কাছে ম্যাজিক শেখা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টার অল্পবয়সী একটি ছেলেকে ট্রেনে একা দেখে বিভিন্ন প্রশ্ন শুরু করলেন। বিস্তারিত ঠিকানা জেনে নিয়ে লিখে ফেললেন একটি পোস্টকার্ডে। সেই হেডমাস্টার পলায়মান রফিক আজাদের মনে একটা আবেগ সঞ্চারিত করে দিলেন। বললেন, ‘যে বাবা তোমাকে মেরেছেন তিনি কি কখনো তোমার কপালে চুমু খাননি? তুমি যখন অসুস্থÑজ্বরে ভুগছ, তোমার বাবা কি কপালে জলপট্টি দেননি, ডাক্তার ডাকেননি?... তোমার বাবা-মা কি এতক্ষণে তোমার জন্য উন্মাদের মতো ছোটাছুটি করছেন না?’ ইত্যাদি।
ততক্ষণে কুষ্টিয়া স্টেশনে চলে গেছে ট্রেন। হেডমাস্টার কিশোর রফিক আজাদকে স্থানীয় স্টেশন মাস্টারের জিম্মায় রেখে ট্রেন বদল করে দর্শনা হয়ে ভারতে চলে গেলেন। স্টেশন মাস্টারকে বলে গেলেন, দেড় ঘণ্টা পরে ময়মনসিংহগামী ফিরতি ট্রেনে যেন রফিক আজাদকে তুলে দেয়া হয়। এই ফাঁকে রফিক আজাদের ইচ্ছে হলো কুষ্টিয়া শহরটা একবার ঘুরে দেখার। স্টেশন মাস্টার একজন গার্ড দিয়ে দিলেন তার সঙ্গে। কুষ্টিয়া শহরে প্রথমবারের মতো দেখলেন টেগর লজ। গার্ড জানাল, এখানেই নাকি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও তার পুত্র দেবেন ঠাকুর ভুসিমালের কারবার করতেন! এত উপহাসের সঙ্গে সেই গার্ড কথাগুলো বলছিল যে, শুনে কিশোর রফিক আজাদের অত্যন্ত খারাপ লাগল। গার্ড আরও বলল, ‘খোকা, সময় থাকলে তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতাম যেখানে হযরত লালন শাহ শুয়ে আছেন। যার লেখা চুরি করে ওই টেগোর লজের ছেলে রবঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছে!’ সপ্তম শ্রেণীতে পড়া রফিক আজাদ ততদিনে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। গার্ডের এই ভুল তথ্য তার মনে নাড়া দেয়। শৈশবে এ রকমভাবে তার অনেক শিক্ষক তাকে ভুল তথ্য শেখান। কৈশোরে লাঠি খেলা শিখতেন নিকটাত্মীয় দেলু নামক একজনের কাছে। তিনি সম্পর্কে রফিক আজাদের দাদা। দেলু দাদা ছিলেন পাক্কা লাঠিয়াল। গ্রামে নানা কিংবদন্তির প্রচলন ছিল তার নামে। সলিম উদ্দিনের চেয়ে তিনি বয়সে বড় হলেও গা-গতর দেখলে পাহলোয়ান বলেই মনে হতো। দুই হাতে শাঁই শাঁই করে ঘুরাতেন শুকনো বাঁশের লাঠি। দেুল দাদা খুব আদর করতেন রফিক আজাদকে। বার-বাড়িতে শিক্ষা দিতেন লাঠি খেলা।
এছাড়া গুণী গ্রামের পাশেই মনিদহ গ্রাম। এখানকার ষাট শতাংশ অধিবাসী ছিল নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি। এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাই ছিল রফিক আজাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। তাদের সঙ্গে চৈত্রসংক্রান্তি, হালখাতা ইত্যাদি অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন। এতে বাবা কোনো দিনই বাধা দিতেন না তাকে। এসব ব্যাপারে তিনি স্বাধীনতা দিতেন ছেলেকে।

৪.
সাধুটী মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে ভর্তি হলেন কালিহাতি রামগতি শ্রীগোবিন্দ হাই ইংলিশ স্কুলের নবম শ্রেণীতে। বাড়ি থেকে প্রায় তিন-চার মাইল দূরত্বে স্কুল। প্রতিদিন সাত-আট মাইল পথ হাঁটা কী করে সম্ভব? স্কুলে অবশ্য হোস্টেল আছে, কিন্তু বাবা হোস্টেলে দিতে রাজি নন ছেলেকে। তার ধারণা, হোস্টেলে থাকলে ছেলেরা অতিরিক্ত স্বাধীনতা পেয়ে নষ্ট হয়ে যায়। অবশেষে স্থির হলো কালিহাতি সংলগ্ন গ্রাম হামিদপুরের এক দরিদ্র গেরস্থের বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে রাখা হবে। গৃহকর্ত্রীর হাতে প্রতি মাসে প্রয়োজনমতো টাকা ও চাল-ডাল ইত্যাদি দেয়া হবে। বিনিময়ে বারান্দার একটি কক্ষে থাকতে দেবেন রফিক আজাদকে। কয়েকদিনে মধ্যে বাবা এ ব্যবস্থা করে ফেললেন। নতুন বিছানাপত্র, জামা-কাপড় নিয়ে রফিক আজাদ উঠলেন হামিদপুরের নতুন আবাসে।
হামিদপুরে আগের মতো আর সেই বিধিনিষেধ নেই। সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবন। তবু মায়ের কথা মনে পড়ে কান্না পায় কিশোর রফিক আজাদের। গুণী গ্রামের পথ-ঘাট, অবারিত মাঠ তার চোখে স্থির হয়ে থাকে। প্রতি শুক্রবার তাই ছুটে যেতেন নিজ গ্রামে, মা-বাবার কাছে। ক্রমে হামিদপুরে মন টিকে যায়।
কালিহাতি হাই স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সতীর্থ মাঈন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে। সে ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যপাঠে আগ্রহ ছিল তার। এই মাঈনই রফিক আজাদের আড্ডার প্রথম গুরু। হামিদপুরে তার সঙ্গে শুরু হয় তুখোড় আড্ডা। তার মুখেই প্রথম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনেন। দিবারাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি প্রভৃতি উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত হন। মাঈন একদিন সন্ধ্যাবেলা ফটিকজানি নদীর তীর ঘেঁষা ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি পুরো আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তাকে। সেই কবিতা শুনে স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন কিশোর রফিক আজাদ।
অবাধ স্বাধীনতা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে নবম শ্রেণীতে ভালোভাবে পাস করতে পারলেন না আড্ডাপ্রিয় রফিক আজাদ। মাঈনও প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে চলে আসে। আড্ডার অন্য বন্ধুদের অনেকেই একাধিক বিষয়ে ফেল করে বসল। সারা বছর অহেতুক আড্ডা দিয়ে পরীক্ষায় এই দশা।
অবশেষে ব্রাহ্মণশাসন হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন।
ছবি : রাশেদুজ্জামান

Print
©2009. All rights reserved.