Logo_print
 
সূচীপএ : প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
[জীবন স্মৃতি] কিংবদন্তি জ্যোতি বসু

শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার নাম জ্যোতি বসু। সারা জীবন কাজ করেছেন মানুষের জন্য। বাবা লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন ব্যারিস্টার হবার জন্য। ছেলে ফিরেছিলেন কমিউনিস্ট হয়ে। আর পেছন ফিরে তাকাননি। মিশে গিয়েছিলেন হতদরিদ্র মানুষের জীবনের সঙ্গে। মানুষ তার প্রতিদান দিয়েছে।
জ্যোতি বসুর ইমেজের ওপর ভর করেই পশ্চিম বাংলায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থেকেছে বামফ্রন্ট। এক সময় নিজের ইচ্ছায় মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষ মানতে চায়নি। অশ্রু ফেলেছে...। ভালোবাসার অশ্রু। পশ্চিম বাংলার জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ দেবতা আর জ্যোতি বসুকে আলাদা করে দেখে না। সেই পশ্চিম বাংলায় এখন বামফ্রন্টের পতন শুরু হয়েছে। বড় বেশি অনুভূত হচ্ছিল
জ্যোতি বসুর প্রয়োজনীয়তা...।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সর্বভারতীয় রাজনীতিতেই অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসু। তার কাজ, জীবন নিয়ে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘যতদূর মনে পড়ে’। তার কিছু অংশ সাপ্তাহিকের পাঠকদের জন্য...

ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবলে অনেক কথাই মনে আসে। যতদূর মনে এসেছে, এ লেখা ততটাই। এই সময়কালে বহু মানুষের সাহচর্য পেয়েছি, তাঁদের সকলের কথা উল্লেখ করা তো সম্ভব নয়। শুধু এইটুকু বলতে পারি, এদেশের সাধারণ মানুষের জন্য লড়াই করেছি, ইতিহাসের বহু বাঁক ও মোড় পেরোতে হয়েছে। এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষই আমার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। অতীতের কথা লেখা খুব কঠিন। দিন সন ঘটনা পরম্পরা মনে থাকে না। তা ছাড়া নিজের কথা এসে যাবে। যে কথা বলতে আমি দ্বিধা বোধ করি।

ছেলেবেলা
জন্মেছিলাম ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই। কলকাতার হ্যারিসন রোডের একটি বাড়িতে। এখন নাম বদলে গেছেÑ মহাত্মা গান্ধী রোড। আমার বাবা-কাকা জ্যাঠামশাইÑ এঁরা থাকতেন আসামের ধুবলিতে। ঠাকুরদা ওখানে চাকরি করতেন। সেই সূত্রেই আসামে প্রবাস। দুই জ্যাঠামশাই ওকালতি করতেন। রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের তেমন সংযোগ ছিল না বললেই চলে।
পৈত্রিক বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বারদিতে। মার দিক থেকে দাদুর বাড়িও বারদি। মায়ের পরিবার ছিল অবস্থাপন্ন তালুকদার। সে তুলনায় বাবা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের। মা তাদের পরিবারের একমাত্র কন্যা। আমার বাবা, নিশিকান্ত বসু, ডিব্রুগড় মেডিকেল স্কুল থেকে ডাক্তারি পাস করেছিলেন। তারপর ঢাকায় কিছুদিন প্র্যাকটিস। তারপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান আমেরিকায়। ছয় বছর ছিলেন সেখানে। আমেরিকায় কিছুদিন চাকরি করে ফিরে এলেন দেশে, বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে। বাবা ও-দেশে থাকতে এক কাকাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে। কাকা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কিছুদিন ওখানে চাকরি করে বছর তেরো বাদে দেশে ফিরলেন।
আগেই বলেছি, রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের যোগ ছিল না বললেও চলে। কিন্তু বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা ছিল। সেটা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষিত হতো না। মার কাছে শুনেছি মদনমোহন ভৌমিক নামে এক বিপ্লবী আমাদের বারদির বাড়িতে বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল ঢাকা জেলার ডুমনিতে। ১৯০৫ সালে তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। ১৯১৩ সালে প্রথম গ্রেপ্তার। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল স্কুলের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। সাক্ষ্য সাবুদ যোগাড় করতে না পেরে পুলিশ শেষ পর্যন্ত মামলা তুলে নেয়। এরপর তিনি আত্মগোপন করলেন। ১৯১৪ সালে অসুস্থ অবস্থায় আবার গ্রেপ্তার হলেন। দ্বিতীয় বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর দশ বছর সাজা হয়। আন্দামানে দ্বীপান্তরে থাকার সময় তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়েও তিনি বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে কাটান। ১৯৫৫ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।
এই মদনমোহন ভৌমিক ১৯১৩-১৪ সালে যখন আত্মগোপন করেছিলেন, তখন প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার মাকে মা বলে ডাকতেন। ওঁর কাছে সব সময় অস্ত্র থাকত। আমাদের বাড়িতে মাঝে মধ্যে লুকিয়ে রাখতেন। একদিন আমাদের বাড়িতে পুলিশ খানাতল্লাশি চালাল। মা তখন অস্ত্রটিকে নিজের শাড়ির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
আমার যখন ছয় বছর বয়েস, আমাকে ভর্তি করা হলো লরেটোতে। লরেটো কিন্ডার গার্টেনে আমার পাঠ্যক্রম ছিল চার বছর। একটা ডাবল প্রমোশন পেয়েছিলাম। সময়টা দাঁড়াল তিন বছর। ওই স্কুলে ফার্স্ট স্ট্যান্ডার্ড থেকে কোনো ছেলেকে ভর্তি করে না। তখন ওটা সম্পূর্ণ মেয়েদের স্কুল। বাবা চেষ্টা করলেন সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি করাতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানালেন সে বছরের মতো অ্যাডমিশন কমপ্লিট। নামটা লেখা থাক পরের বছরের জন্য। বাবা এবার চেষ্টা করলেন মিডলটন রোডের লরেটোতে। ওই স্কুলে মাদার ইনচার্জ জানালেন, ফাস্ট স্ট্যান্ডার্ডে ওরা ছেলেদের ভর্তি করেন না। এবার ফিরে গেলাম ধর্মতলার লরেটোতে। মাদার ইনচার্জ অবস্থাটা বুঝে আমাকে নিয়ে নিলেন। ওই ক্লাসে আমিই একমাত্র ছেলে। বাকি সব পড়–য়া মেয়ে। বাবা বললেন, শুধু শুধু একটা বছর নষ্ট করবে কেন? ওখানেই পড়। পরের বছর ভর্তি হলাম সেন্ট জেভিয়ার্সে সেকেন্ড স্ট্যান্ডার্ডে।

সেন্ট জেভিয়ার্সে অনেক সময় কাটল। সিনিয়র ক্যামব্রিজ (নাইনথ্ স্ট্যান্ডার্ড) পাস করলাম। ইন্টার মিডিয়েটেও ওই কলেজে। তারপর ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম প্রেসিডেন্সি কলেজে। ইন্টার মিডিয়েট এবং বিএ পড়ার সময় আমাকে বাংলাটা বেশি পড়তে হতো। শিখতে হতো। কেননা তার আগে বাংলা পড়ার সুযোগ ছিল না পাঠ্যক্রমে।
১৯৩০-৩১ সালে আমি সেন্ট জেভিয়ার্সে এইটথ স্ট্যান্ডার্ডের ছাত্র। তখন গোটা বাংলাজুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈপ্লবিক জোয়ার। খবর পাচ্ছি চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার দখল করেছেন। দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের বদলা হিসেবে খুন হচ্ছে ব্রিটিশ রাজপুরুষরা। সে এক অসম যুদ্ধ চলছে। একদিকে সশস্ত্র ব্রিটিশ রাজশক্তি, আরেকদিকে সহায় সম্বলহীন দেশপ্রেমিক। তাদের শক্তি কেবল দেশপ্রেম এবং মৃত্যুকে জয় করার ইচ্ছা। এই যে ঘটনা, এর থেকে আমাদের মতো পরিবারও মুক্ত থাকতে পারেনি। দেশপ্রেমের চোরাস্রোত ক্রমশ প্রকাশ্য অবয়ব নিতে শুরু করেছে। তারিখটা মনে নেই, তবে ১৯৩০ সালের শুরু। একদিন শুনলাম গান্ধীজী অনশন শুরু করেছেন। মনটা কেমন ভার লাগল। বাবাকে বললামÑ আজ স্কুলে যাব না। বাবা আপত্তি করলেন না। বাবার সঙ্গে চলে গেলাম তাঁর চেম্বারে।
ওই ১৯৩০ সালেই একদিন শুনলাম সুভাষ বসু অক্টরলোনি মনুমেন্টে (শহীদ মিনার ময়দান) ভাষণ দেবেন। আমি আর আমার এক জেঠতুতো ভাই ঠিক করলাম যাব। আমরা তখন খদ্দর পরতাম না। কিন্তু সেদিন একটা আবেগ পেয়ে বসল। দু’ভাই খদ্দর পরে গেলাম। গিয়ে দেখি ঘোড়সওয়ার পুলিশ, লাঠিধারী পুলিশ, সার্জেন্টে গোটা তল্লাট যেন রণক্ষেত্র। সার্জেন্টরা যখন তাড়া করল, আমরা ঠিক করলামÑ পালাব কেন? পালাব না। পালানো মানে ভয় পেয়েছি। আমাদের গায়ে দু-এক ঘা লাঠি পড়ল। আমরা দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। চলে এলাম বাবার চেম্বারে। আমাদের এক জেঠতুতো দাদা আমেরিকায় জয় প্রকাশের সঙ্গে ছিলেন। ডেন্টিস্ট হয়ে তখন ফিরে এসেছেন। কাউকে না, এমনকি ওই দাদাকেও নাÑ কিছু বললাম না। বাড়িতে এসে মাকে বলতে মা চুন হলুদ লাগিয়ে দিলেন। সেটাই বোধহয় রাজশক্তির বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ।
আমাদের আত্মীয়া ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন শান্তি নিকেতনে আচার্য নন্দলাল বসুর ছাত্রী। ইন্দুদি প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়িতে। পুঁটুদির (সুহাসিনী গাঙ্গুলির) বান্ধবী। ইন্দুদির পিসিমার ছেলে ছিলেন বেঙ্গল ল্যাম্পের কিরণ রায়। কিরণ রায়ই ইন্দুদিকে বিপ্লববাদে আকৃষ্ট করেছিলেন। পরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যা হয়েছিলেন। পার্টি ভাগ হওয়ার পরে ইন্দুদি যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে। নারী শিক্ষা মন্দিরে অধ্যক্ষ ছিলেন বহুদিন। আমার তরুণ বয়সে ইন্দুদিও ছিলেন ব্যতিক্রমী মানুষ।
ক্ষুব্ধ স্বদেশ, বিপ্লবীদের মরণপণ সংগ্রাম, ইংরেজ রাজপুরুষদের নৃশংস অমানবিকতা, বাবার নিরুচ্চার স্বদেশ অনুভূতি, ইন্দুদিÑ এই সব মিলিয়ে আমার তরুণ বয়স যেন ডিসট্যান্ট সিগনালের মতো দেখতে পেতাম ভবিষ্যতের পথ-নির্দেশ। যদিও তা খুব স্পষ্ট ছিল না তখন।
বাবার যে দাদা মারা গিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আমাদের জ্যাঠাইমা এবং তাঁর তিন ছেলে দুই মেয়ে আমাদের সঙ্গে থাকতেন। এই জ্যাঠাইমা ছিলেন স্বদেশী মানসিকতার। তাঁর কাছে মাঝে মধ্যে আসতেন কিরণ রায়, বিজয় মোদক প্রমুখ। এঁরা যাদবপুর টেকনিক্যাল স্কুলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন। এঁদের দেখতাম। কিন্তু তখনো কিছু সচেতনভাবে বুঝতাম না।
আমার জ্যাঠামশাই নলিনীকান্ত বসু তখন হাইকোর্টের বিচারপতি পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি ভুগছিলেন ডায়াবেটিসে। ওই সময় মেছুয়াবাজার বোমার মামলা বিচারের জন্য সরকার একটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন। মূল অভিযুক্ত ছিলেন নিরঞ্জনদা (নিরঞ্জন সেন) এবং অন্যরা। জ্যাঠামশাইকে বলা হলো ওই স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের জজ হতে। বাবার তীব্র আপত্তি ছিল। বললেনÑ কেন এই সমস্ত গোলমালের মধ্যে আপনি যাচ্ছেন? তা ছাড়া আপনার শরীরও সুস্থ নয়। কিন্তু চিফ সেক্রেটারি নিজে আমাদের বাড়িতে এসে জ্যাঠামশাইয়ের সম্মতি আদায় করলেন। আমরা যখন শুনলাম, খুব খারাপ লাগল। বিপ্লবীদের পথ ও মত সম্পর্কে আমার তখন স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু এটা তো বুঝতাম ওরা দেশের জন্য প্রাণ দিচ্ছেন। বহু বাঙালি পরিবার হয়ত সরাসরি সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে তারা রেখে দিয়েছিল এই সমর্পিত প্রাণ বিপ্লবীদের জন্য শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। যাই হোক জ্যাঠামশাই ট্রাইব্যুনালের জজ হলেন। পুলিশ সেই সময় তল্লাশি চালিয়ে বহু বই বাজেয়াপ্ত করত। সেই সমস্ত বই জ্যাঠামশাইয়ের টেবিলে সাজানো থাকত। উনি যখন কোর্টে যেতেন, আমরা গোপনে বইগুলো দেখতাম। আবার ফেরার আগে যথাস্থানে সাজিয়ে রাখতাম। এভাবেই আমার নিষিদ্ধ রাজদ্রোহী সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় এবং পরিণয় ঘটেছে।
১৯২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত হলো শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’। ওই বছরই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বইটি নিষিদ্ধ হয়ে গেল। গোপনে সংগ্রহ করে বইটি আমি পড়েছিলাম।
আমার জ্যাঠতুতো দাদারা এসব ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। আমার এক জ্যাঠতুতো দাদা ছিলেন পবিত্রকুমার বসু। এক সময়ে লন্ডনে ছিলেন। ওঁর ছিল খুব আগ্রহ। পরে মারা যান। একদিন বিজয় মোদক ও আরো কয়েকজন পবিত্রদার কাছে একটা রিভলবার জমা রাখেন। আমাদের বাড়িটা বিবেচিত হয়েছিল নিরাপদ স্থান। কেননা জ্যাঠামশাই তখন স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের জজ। পবিত্রদা কাপড়ে মুড়ে একটা বাক্সের মধ্যে রিভলবারটা রেখে দিতেন। আর প্রতিদিন কাপড় মোড়া রিভলবারটা নিয়ে একবার স্নান ঘরে যেতেন। হয়ত বিজয় বাবুরা বলেছিলেন দৈনিক ওটা পরিষ্কার করতে হবে। পবিত্রদার পরের ভাই একদিন ব্যাপারটা দেখে ফেলল। খুব কৌতূহল হলো তার। পবিত্রদা একদিন কলকাতার বাইরে বেড়াতে গেছেন। ভাই তখন বাক্স খুলে দেখে রিভলবার। বাবা-মা আমরা সবাই জেনে গেলাম। জ্যাঠামশাই তো ঘাবড়ে একশেষ। উনি রোজ প্রাতঃভ্রমণে বেরোতেন। সঙ্গে থাকত পুলিশ। বাবাও যেতেন সঙ্গে। জ্যাঠামশাই এক ভোর বেলা এক ডোবার মধ্যে রিভলবারটার সদ্গতি করে মুক্ত হলেন। পবিত্রদা যখন ফিরে এলেন আমরা জিজ্ঞাসা করলাম ব্যাপারটা কি? সে তো খুব রেগে গেল। ‘আমার বাক্স খুলেছ কেন?’ কিন্তু বেশি উচ্চবাচ্য করা সম্ভব নয়। পরে জানলাম রিভলবারটা বিজয় মোদকরা রাখতে দিয়েছেন। এদিকে তখন জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ির সামনে আর্মড পুলিশ ক্যাম্প বসে গেছে। ওদিকে আমাদের খুব উৎসাহ। মনে হলো যেন ক্রমে আমরাও দেশমুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়ে ফেলেছি।
জ্যাঠামশাই যে ট্রাইব্যুনালের জজ হয়ে স্বদেশীদের বিচার করতে বসেছেন সেটা আমরা ভাইরা কখনো মেনে নিতে পারিনি। আমার আর এক জ্যাঠতুতো দাদা দেবপ্রিয় বসু আর আমি একদিন বাড়ির বাইরে একটা জায়গায় গেলাম। সেখানে দু’জনে মিলে একটা ইংরেজি চিঠির মুসাবিদা করলাম। নিজেরাই চিঠিটা টাইপ করলাম। ‘আপনি অন্যায় করেছেন। আপনি বাঙালি হয়ে যাঁরা দেশভুক্ত তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন। এটা গুরুতর অন্যায়। আপনার জীবন বিপন্ন হবে।’ জ্যাঠামশাই যে দিন চিঠিটা পেলেন সেদিনই আমরা জানতে পারলাম। আমরা একসঙ্গে সবাই খেতে বসেছি। দেখি বাবা-মা সবাই কেমন চিন্তিত। বাবা খুব নিচু গলায় আস্তে আস্তে মাকে বলেছেন, ‘দাদাকে বারণ করেছিলাম স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের জজ হতে। শুনলেন না। এদিকে আজ চিঠি পেয়েছেন ওর জীবন বিপন্ন।’
বাড়িতে গার্ড বেড়ে গেল। প্রাতঃভ্রমণ বন্ধ। বাবা এবং জ্যাঠামশাই দু’জনেরই বাজার করার খুব শখ। একসঙ্গেই যেতেন। তাও বন্ধ হয়ে গেল। আমরা তো মনে মনে হাসছি।

বিলেতে
১৯৩৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ অনার্স নিয়ে পাস করলাম। বাবা ঠিক করে রেখেছিলেন এর পর আমি বিলেতে যাব এবং ব্যারিস্টার হয়ে ফিরব। আমারও আপত্তি ছিল না। বাবা বললেন, ‘যখন বিলেত যাচ্ছ তখন আইসিএসটাও একবার চেষ্টা কর।’ ১৯৩৫-এ পরীক্ষার ফলাফল বেরুবার পর বিলেতে রওনা দিলামÑ ওই বছরের শেষাশেষি পৌঁছেও গেলাম। সেখানে ব্যারিস্টারির পাঠ নয়, অন্য কোনো মহত্তর উপলব্ধি অপেক্ষা করে ছিল আমার জন্য।
অবশেষে লন্ডনে পৌঁছলাম। আমার নিকট আত্মীয়রা চেয়েছিলেন পুরোদস্তুর ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরব। আমি নিজেও তাই ভেবেছি। তবে বাবা চেয়েছিলেন আমি আইসিএস পরীক্ষাটায় বসি। পরের বছর পরীক্ষায় বসলাম, কিন্তু সাফল্য পেলাম না। ব্যারিস্টারি পড়তে থাকি।
লন্ডনে গিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পট আমার চোখে বেশ স্পষ্ট করে উন্মোচিত হলো। গোটা ইউরোপে অস্থির আলোড়ন।
১৯৩৬-এ ভূপেশ গুপ্ত পড়তে এলেন লন্ডনে। ভূপেশ যখন বহরমপুর জেলে, তখন কারাবন্দি থেকেই বিএ পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলো। ভূপেশ ছাত্র হিসেবে ছিলেন খুব মেধাবী। লন্ডনে এলেন ব্যারিস্টারি পড়তে।
লন্ডনের একটি বাড়িতে ভূপেশের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। কথা বলে বেশ উৎসাহিত বোধ করি।  দেশ থেকে ভূপেশ গ্রেট ব্রিটেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। প্রায় একই সময়ে স্নেহাংশু আচার্য এসে উপস্থিত লন্ডনে। দেখা করলাম ব্রিটেনের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা হ্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত, বেন ব্র্যাডলে প্রমুখের সঙ্গে। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ ইন্ডিয়া লীগ এবং ভারতীয় ছাত্রদের সক্রিয় সমর্থন করছিলেন।
আমি ব্রিটিশ পার্টির দুজন নেতার কথা বিশেষ করে বলব। বেন ব্র্যাডলে এবং মাইকেল ক্যারিট। বে ব্র্যাডলে ভারতে এসেছিলেন এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সাহায্য করতে। শ্রমিক আন্দোলনেও তিনি বিশেষ ছাপ রেখেছিলেন। তিনি একজন  ইংরেজ। কিন্তু ইংরেজ রাজশক্তি তাঁকে গ্রেপ্তার করে, মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় বেশ কিছু দিন কাটিয়েছেন ভারতের কারাগারে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, সাম্যবাদী আন্দোলনের সম্প্রসারণে এই ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতার কথা ভুলতে পারি না। মাইকেল ক্যারিট, আর একজন নেতা, ইনি ইমপিরিয়াল সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) বড় রকম অফিসার। অবিভক্ত বাংলাদেশে তিনি গবর্নরের সচিব হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন। পরে তাঁর সত্যিকারের পরিচয় উদ্ঘাটিত হলে গেলে তিনি ইস্তফা দেন। এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে তিনি কি ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁর আংশিক পরিচয় মিলবে ওঁর লেখা ‘মোল ইন দ্য ক্রাউন’ পড়লে।
এঁদের কাছে বিলেত প্রবাসী ভারতীয় ছাত্ররা পেয়েছেন অকৃপণ সাহায্য।
ব্রিটেন থেকে ইতোমধ্যে দেশে ফিরে গেছেন হীরেন মুখার্জি, সাজ্জাদ জাহির, ড. জেড এ আহ্মেদ, নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার প্রমুখ। এঁরা চলে যেতে বিলেতে ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বেশ অভাব অনুভূত হচ্ছিল। কর্মতৎপরতায় পড়েছিল ভাটা। আমরা উদ্যোগী হলাম শূন্যতা পূরণে। লন্ডন, ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্ররা কমিউনিস্ট গ্রুপ গড়ে তুললেন। ব্রিটিশ পার্টি নেতারা আমাদের জানালেন প্রকাশ্য সভা না করতে। কেননা ভারতে ইংরেজ রাজশক্তি তখন কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করেছে। আমরা মার্কসবাদী পাঠচক্রে যেতে শুরু করলাম। আমাদের পড়াতেন হ্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত, ক্লিমেন্স দত্ত এবং ব্র্যাডলের মতো নেতারা। গোটা বিশ্ব তখন তপ্ত থেকে তপ্ততর। স্পেনে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। ফ্রাঙ্কোর স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রীদের সংগ্রাম নজর কাড়ছে সমস্ত প্রগতিশীল মানুষের। ফ্যাসিস্তদের বিরুদ্ধে স্বাধীন চিন্তার এই যুদ্ধে শামিল হতে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড। রালফ ফকস্, ক্রিস্টোফার কডওয়েলের মতো বিখ্যাত কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীরা স্পেনে যেতে শুরু করেছেন। আর্নস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘ফর হুম দি বেল টোলস’ এই সংগ্রাম নিয়েই লেখা। আমি ভেতরে ভেতরে প্রবল আলোড়িত। মার্কসবাদী সাহিত্য পাঠ আর সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ আমাকে দ্রুত রাজনীতির মূল প্রবাহে টেনে নিচ্ছে।

লন্ডন মজলিস
এই সময় ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে গড়ে ওঠে লন্ডন মজলিস। আমিই ছিলাম তার প্রথম সম্পাদক। ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে মত গঠন করা এবং চাঁদা সংগ্রহ ছিল আমার কাজ।
পুনর্গঠিত হলো ব্রিটেনের ভারতীয় ছাত্রদের ফেডারেশন। তারই মুখপত্রÑ ‘ভারতীয় ছাত্র ও সমাজতন্ত্র’ প্রকাশ পেতে থাকে।
আগে উল্লেখ করেছি লন্ডন, ক্যামব্রিজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্রদের কমিউনিস্ট গ্রুপ গঠিত হয়েছিল। সব সদস্যদের নাম স্মরণে নেই। তবে মনে করতে পারছি রজনী প্যাটেল, পি এন হাকসার, মোহন কুমারমঙ্গলম, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, রেণু চক্রবর্তী, এন কে কৃষ্ণাণ, পার্বতী মঙ্গলম (পরে পার্বতী কৃষ্ণাণ), নিখিল চক্রবর্তী, অরুণ বোসের নাম।
তিনটি গোষ্ঠী মাঝে মধ্যে যুক্ত সভায় মিলিত হতো। ইন্ডিয়া লীগের সক্রিয় নেতা ছিলেন ফিরোজ গান্ধী। লন্ডন মজলিসেও ফিরোজকে আমরা সক্রিয় সদস্য হিসেবে দেখেছি। ফিরোজ অবশ্যই ভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিটি সভায় উপস্থিত হতেন। স্নেহাংশুও এই সব সভায় আসত। আগেই ভূপেশ এবং স্নেহাংশুর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
লন্ডন মজলিসের অন্যতম একটি কাজ ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ লন্ডনে এলে তাঁদের সংবর্ধনা জানানো। এভাবেই আমরা জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী প-িত, কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের (সিএসপি) নেতা ইউসুফ মেহের আলি প্রমুখকে সংবর্ধনা জানিয়েছি।
ইন্ডিয়া লীগের নেতা কৃষ্ণ মেননই নেহরুর সঙ্গে আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। লন্ডনে নেহরুর বাসস্থানে কৃষ্ণ মেনন আমাকে নিয়ে যান। আমি নেহরুকে বলি, ‘আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী।’ নেহরু উত্তরে বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন প্রধান কাজ ভারতের জন্য স্বাধীনতা অর্জন। এ বিষয়ে তোমরা আমার সঙ্গে একমত কি?’ আমি বলি, ‘আমরা একমত।’ আমি নেহরুকে সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাই।
লন্ডনে থাকার সময় ভারতের যে নেতাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ছিল, জওহরলাল নেহরু তাঁদের অন্যতম। হিটলার মুসোলিনি প্রমুখ ফ্যাসিস্ত নেতাদের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব নেহরু প্রত্যাখ্যান করেছেন। এবং ফ্যাসিস্ত ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে সাধারণতন্ত্রী স্পেনে চলে গেছেন এই ঘটনা লন্ডনে বসবাসকারী ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে প্রভুত উৎসাহের সৃষ্টি করে।
শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী প-িত সম্পর্কেও ছিল আমাদের ভারতীয় ছাত্রদের একটা গর্ববোধ। হিটলার ও তার নাৎসি পার্টি যখন ফতোয়া জারি করছে, নারীদের স্থান রান্নাঘরে, তখন শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু সমেত আরো অনেক ভারতীয় মহিলার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ  সত্যি সত্যিই গর্বের বিষয় ছিল।
লন্ডনে পড়াশোনা করার সময়েই আমরা কয়েকজন মনস্থির করে ফেলি যে, ভারতে ফিরে গিয়ে সারাক্ষণ পার্টিকর্মী হিসাবে কাজ করব।
একবার জাতীয় কংগ্রেসের একজন শীর্ষনেতা সুবক্তা ভুলাভাই দেশাই লন্ডনে এলে আমরা তাঁকে সংবর্ধনা জানাই। ভুলাভাই দেশাইকে আমরা বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হিসেবেই গণ্য করতাম। সে সময় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন চালু হয়েছে এবং ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে ভারতের বেশিরভাগ প্রদেশে জাতীয় কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। কৃষকদের ওপর গুলি চলেছে। আলোচনাকালে এ কথা ভুলাভাই দেশাইয়ের কাছে আমরা উল্লেখ করি। উত্তরে ভুলাভাই দেশাই বলেন, ‘কৃষকরা কংগ্রেসকেই সমর্থন করেন।’
সুভাষচন্দ্র বসুকে আমরা বাম আন্দোলনের নেতা হিসেবে গণ্য করতাম। তিনি যখন ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন, তখন আমরা লন্ডন মজলিস থেকে তাঁকে এক অভিনন্দনবার্তা পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। স্থির হলো, লন্ডনের একটি হলে সমাবেশ করা হবে। আমরা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে ফিরোজ গান্ধীকে আমন্ত্রণ জানাই। ফিরোজ গান্ধী বলেন, তাঁর সমর্থন আছে, তিনি সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন, কিন্তু কোনো ভাষণ দেবেন না। সমাবেশে তিনি এলেও ভাষণ দেননি। দু’জন বক্তা ছিলাম। এন কে কৃষ্ণাণ আর আমি। সমাবেশ থেকে সুভাষচন্দ্র বসুকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলো।

আমরা লন্ডন মজলিসের উদ্যোগে সভা-সমাবেশ সংগঠিত করেছি এবং তাতে বামশক্তিগুলো জোরদার হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন যুদ্ধ ঘোষণা করল।
আমরা লন্ডনে থাকতেই হিটলারের বিমানবাহিনী বোমাবর্ষণ শুরু করে দিল। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমাদের সবাইকে গ্যাস-মুখোশ পরতে হতো। নির্দেশ ছিল প্রত্যেককে সব সময় গ্যাস-মুখোশ নিয়ে চলতে হবে।
আমাদের কয়েকজন ভূমধ্যসাগর দিয়ে জাহাজে করে ফিরে আসার পরই ভূমধ্যসাগারে হিটলারের নৌবাহিনী র্টপেডো ব্যবহার করতে শুরু করেÑ ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যায়। ভূপেশ গুপ্ত, ইন্দিরা (নেহরু) গান্ধী, ফিরোজ গান্ধী প্রমুখরা আটকে পড়েন। পরে তাঁরা ঘুর পথে ভারতে ফেরেন।
ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারা আমাদের ওয়াচ করছে ফলে সন্দেহ হয়। তাই আমরা সতর্ক হয়ে যাই। ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস’ বইখানা এক মহিলার কাছে গচ্ছিত রাখা হলো। এই মহিলাও আমাদের সঙ্গে ভারতে ফিরছিলেন। বাকি বইগুলো আমাদের সঙ্গেই রইল।
আমাদের সন্দেহ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল। জাহাজ বোম্বাইয়ে পৌঁছলে গোয়েন্দারা খানাতল্লাশি করে অন্য বইগুলো আটক করল, তবে সিপিএসইউ-র ইতিহাসটি রক্ষা পেল।
আমরা কয়েকজন লন্ডনে থাকতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ভারতে ফিরে গিয়ে সারাক্ষণ পার্টিকর্মী হিসেবে কাজ করব। আমরা কয়েকজন (আমি, ভূপেশ গুপ্ত, মোহন কুমারমঙ্গলম, অরুণ বোস প্রমুখ) ১৯৪০ সালে বোম্বাইতে গিয়ে আমাদের সেই সময়কার পার্টি-নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। আমাকে তাঁরা বললেন, কৃষক নেতা স্বামী সহজানন্দের এক জনসভায় যেতে। আমি গেলাম। সেটা ছিল এক বিশাল সমাবেশ।

দেশে ফিরলাম
১৯৪০ সালেই কলকাতা ফিরে আমি এখানকার পার্টি-নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। পার্টির নির্দেশ অনুযায়ী আমি আন্ডার গ্রাউন্ডে গেলাম নাÑ তবে আন্ডার গ্রাউন্ড সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ছিল আমার অন্যতম একটি প্রধান কাজ।
আমি ব্যারিস্টার হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টেও নাম লিখিয়েছিলাম। কিন্তু প্র্যাকটিস করিনি কোনোদিনই। কারণ আমরা (ভূপেশ, আমি এবং অপর কয়েকজন) লন্ডনে থাকতেই পার্টির সারাক্ষণের কর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য মনস্থির করে ফেলেছিলাম। তবে এতে বাবা খুশি হলেন না; তিনি চেয়েছিলেন আমি প্র্যাকটিস শুরু করি, রোজগার করি। বাবার অবশ্য মনোভাব উদার ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন নাÑ প্র্যাকটিস করে রাজনীতি করা যাবে না কেন? দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস যদি ব্যারিস্টারি আর রাজনীতি এক সঙ্গেই করতে পারেন, তাহলে আমি কেন পারব না?
এই সময় একটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে গেল। হঠাৎ একদিন তিন আত্মগোপনকারী নেতাÑ কাকাবাবু, সরোজবাবু ও পাঁচুগোপাল ভাদুড়ি আমার হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতে এক মিটিংয়ে এসে বললেন, তাঁদের ডেরাতে ওয়াচার বসেছে, তাই এখনই ওখান থেকে সরতে হবে। তখনই আমি তাঁদের নিয়ে ডোভার লেনে আমাদের এক বন্ধুর (যিনি পরে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক সংস্থার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন) বাড়িতে নিয়ে গেলাম। তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। তিনি ভালোই ব্যবহার করলেন, আত্মগোপনকারীদের অতিথি হিসেবে রেখেছিলেন। পরে নিরাপদ স্থান স্থির করার পর তাঁদের সরিয়ে নেয়া হয়।
বাবা ইতোমধ্যে আমার বিবাহের জন্য আলোচনা করে রেখেছিলেন। আমি বিবাহের কথা গুরুত্ব দিয়ে তখন ভাবতাম না। কেননা আমি মনে করতাম যে আমাদের কঠিন সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হবে। যাই হোক না কেন, আমি বিবাহ করলাম। আমার শ্বশুরের নাম ছিল শ্রীঅনুকূল ঘোষÑ এই পরিবারেরই একজন ছিলেন অধ্যাপক প্রফুল্ল ঘোষ; ইনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। বিবাহের অল্পদিন বাদেই আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়। ১৯৪১ সালে আমার মায়ের মৃত্যু হয়। আমি সেই সময় হাইকোর্ট বার লাইব্রেরিতে বসে আছি। বাবা টেলিফোনে আমাকে খবর দিলেন। শ্রাদ্ধের কাজ আমার দাদাই করলেন। বাবাই আমাকে বললেনÑ আমাকে নিরামিষ খেতে হবে না, তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি অবশ্য ওসব কিছুই করতাম না। বাবা এটা বলাতে আমি জোর পেলাম।
লন্ডন থেকে ফেরার কিছুদিন বাদেই সারাক্ষণের কর্মী হিসেবে আমার পার্টি জীবন শুরু হলো। বেআইনি যুগে (ব্রিটিশ শাসনকালে) আমাদের হিন্দুস্থান রোডের বাড়িতেও পার্টির গোপন বৈঠক হতো, আত্মগোপনকারী পার্টি-নেতাদের আশ্রয় দেয়া হতো। বাবা ও মা সব কিছুই বুঝতেন, কিন্তু কিছু মনে করতেন না।
ব্রিটিশ শাসনে বেআইনি ঘোষিত পার্টির সারাক্ষণের কর্মী হিসেবে আমার অন্যতম একটি দায়িত্ব ছিল আত্মগোপনকারী পার্টি-নেতাদের ও কর্মীদের জন্য আশ্রয় স্থান ঠিক করা, পার্টির গোপন বৈঠকের স্থান ঠিক করা, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ইত্যাদি।
লন্ডনবাসের শেষের দিকে কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন একজন ব্যারিস্টারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। কলকাতায় ফেরার পর সেই যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হয়। ইনি বেআইনি যুগে ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন আত্মগোপনকারী পার্টি-নেতাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ইনি পার্টির বাইরের যোগাযোগও রাখতেন। এঁদের নামে দক্ষিণ কলকাতায় একটি বাড়ি নেয়া হয়েছিল; এই বাড়িটি ছিল পার্টির একটি গোপন কেন্দ্র। কিন্তু মাস কয়েক বাদে আমাদের এই ব্যারিস্টার বন্ধু ঘাবড়ে গেলেন। আমরা বুঝলাম, ইনি আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এঁকে আমরা সরিয়ে দিলাম; যে বাড়িটি এঁর নামে নেয়া হয়েছিল, তা আমরা ছেড়ে দিলাম। তার পর এই ব্যারিস্টার বন্ধু আর রাজনীতিতে থাকেননি।
এই সময় আমার একটি দায়িত্ব ছিল পার্টির জন্য চাঁদা সংগ্রহ করা। কয়েকজন পার্টি-দরদি, যাদের মধ্যে দু-একজন উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসারও ছিলেন। আমার মাধ্যমে গোপনে পার্টির তহবিলে চাঁদা দিতেন।
পার্টি-নেতৃত্ব আমাকে পার্টি-ক্লাস নিতে এবং বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতেও পাঠাতেন।

শ্রমিক সংগঠনে
আমার যতদূর মনে পড়ে, ১৯৪৪ সালে পার্টির নেতারা আমাকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করার জন্য পাঠান। প্রথম দিকে আমি বন্দর ও ডক শ্রমিকদের সংগঠিত করার জন্য যাতায়াত শুরু করি। বন্দর ও ডক শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের বিশেষ কোনো সংগঠন ছিল না। এদের মধ্যে আমরা ঢুকতে পারিনি।

অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেনস ফেডারেশন তখন সংস্কারপন্থী নেতৃত্বের দখলে। আমরা দাবি জানালাম আমাদের ইউনিয়নকে ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। ওরা প্রাণপণ চেষ্টা করে আমাদের উপেক্ষা করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হলাম। এর আগেই পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত এসআইআর ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন এআইআরএফ-এর অন্তর্ভুক্তি হয়েছিল। আমি আরো কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে এর পরে জড়িয়ে পড়ি।
মাঝে মধ্যে মুখোমুখি হই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনার। সংগ্রামের কঠিন কঠোর দিনলিপিতে নথিবদ্ধ হয়ে যায় কিছু সজল স্মৃতি। তখন ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন শ্রী ভা-ারকর। ওঁর ছেলে ছিলেন কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন। ক্যামব্রিজে শিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে একটি মার্কেন্টাইল ফার্মে বড় চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্ত অকালে চলে যান। মৃত্যুর সময় তাঁর সঞ্চয় ছিল ১০,০০০ টাকা। ওঁর বাবা ভা-ারকর সে টাকা আমাদের হাতে তুলে দিলেন। বললেন, ছেলের রাজনৈতিক মতবাদ তিনি জানতেন। তাই মনে করেছেন পুত্রের সঞ্চয় আমাদের হাতে তুলে দেয়াই শ্রেয়।
রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের সংগঠন শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্নেই শ্রমিকদের সংগঠিত করেনি। প্রয়াস চালিয়েছে, নিরন্তর রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে। সেই সময় রেলওয়ে শ্রমিকরা রাজনৈতিক বিষয়ে ধর্মঘট ও সংগ্রামে শামিল হয়েছেন।

বাংলাদেশ সফরে
পুরনো স্মৃতির কথা বলতে গিয়েই সাতাশির জানুয়ারি বাংলাদেশ সফরের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণেই সস্ত্রীক সেখানে গিয়েছিলাম। সফর ছিল দিন পাঁচেকের। ২৯ জানুয়ারি বিকালে ঢাকায় যাই। কলকাতায় ফিরে আসি ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে। একচল্লিশ বছর পর ঢাকায়। হাজার হাজার মানুষের সোচ্চার অভ্যর্থনায় আমি অভিভূত  হয়ে পড়েছিলাম।
ঢাকায় যাওয়ার পরদিন গিয়েছিলাম আমার পৈত্রিক বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বারদিতে। হেলিকপ্টারে মেঘনা নদী পেরিয়ে। সকালে হেলিকপ্টার নামার পরই সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষ এসেছেন, আমাকে দেখতে। তাঁরা আমাকে মনে রেখেছেন! গাঁদা ফুলের পাশাপাশি গোলাপ ফুলের তোড়ায় চাপা পড়ে যাওয়ার যোগাড়।
বুক ভরা ভালোবাসা আমাকে যেন শৈশবে পৌঁছে দিয়েছিল। ওখানে আমাদের পুরনো দোতলা বাড়ি। ছোটবেলায় ছুটির সময় বাবার সঙ্গে বারদির বাড়িতে যেতাম। সেই বাড়ি, ঘর, বারান্দা। পাল্টে যাওয়া চারপাশ। সে এক আলাদা অনুভূতি। আমি আর আমার স্ত্রী দোতলায় উঠি। বারদির বাড়িতে দেখা হয় হবিবুল্লাহ আর তাঁর নব্বই বছরের মা আয়াতুন্নেসার সঙ্গে। উনি আমাকে ছোট বেলায় দেখেছেন। বারদিতে ইউনিয়ন অফিসে আমরা দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। বিকালে ঢাকায় ফিরে আসি।
ঢাকায় রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার তো ছিলই। মনে আছে, বৈঠক হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান, উপরাষ্ট্রপতি এ কে এস নুরুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। কথা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। পরে আরো একবার বাংলাদেশ গিয়েছি। কিন্তু সাতাশির বাংলাদেশ সফর সেবার ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল। দেশ ভাগের আগের স্মৃতি যাঁদের আছে তাঁদের সকলেই বোধহয় আমার মতো অবস্থা।

আবার বাংলাদেশে
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওঁরা আমায় বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। ওঁদের বিদেশমন্ত্রীও কলকাতায় এসে আমাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন সময় করা যাচ্ছিল না। অবশেষে ২৭ নবেম্বর আমি ঢাকায় গেলাম। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং অসীম দাশগুপ্ত গিয়েছিলেন আমার সঙ্গে। সরকারিভাবে ওদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের আতিথ্যের কথা নতুন করে বলার নয়। সে দেশের মানুষ আমার প্রতি, আমাদের রাজ্য সরকারের প্রতি যে শ্রদ্ধা ভালোবাসা দেখিয়েছেন তাতে আমি অভিভূত। এবারো আমি বারদিতে গিয়েছিলাম। ছোট বেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে যেখানে তার টানই আলাদা। ওই বাড়িটাকে আমি অবশ্য বাংলাদেশ সরকারের হাতেই তুলে দিয়েছি। আমি বলেছিলাম, সাধারণ মানুষের কাজে লাগে এমন কোনোভাবে বাড়িটাকে ব্যবহার করা হোক। ওঁরা কথা দিয়েছেন, তাই হবে।
বাংলাদেশ সফরে স্বাভাবিকভাবেই জলবণ্টন নিয়ে আমাকে হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সাংবাদিকরা তো ছাড়তেই চান না। আমি বললাম, চুক্তি করতে হবে তো দিল্লির সঙ্গে, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। আমি চাই, পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রেখে জলবণ্টন চুক্তি করা হোক। আমাদের স্বার্থ দেখতে হবে। ওদের ব্যাপারটাও দেখতে হবে। দু’দেশের সুসম্পর্ক গড়তে হবে। জনগণ তাই চান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও তাই বললাম।

জলবণ্টন চুক্তি
বাংলাদেশ থেকে ফিরে ডিসেম্বরের গোড়ায় আমি দিল্লি গেলাম। সেখানে প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে কথা হলো। বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন আলোচনা হলো। তার পরদিনই শেখ হাসিনা দিল্লিতে এলেন। প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে ওনার কথা হলো। আমার সঙ্গে হলো। তারপরই ১২ ডিসেম্বর (১৯৯৬) স্বাক্ষরিত হলো জলবণ্টন নিয়ে সেই ঐতিহাসিক চুক্তি।
কিন্তু এই চুক্তি নিয়েও কিছু কিছু মহল উস্কানি দিচ্ছিল, দু’দেশেই। এ রাজ্যে কংগ্রেসীদের একাংশ ব্যাপারটা নিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে। ওদের সঙ্গে বিজেপিও ছিল।  ওদের তো কোনো দায়িত্বজ্ঞান নেই। তাই ওই চুক্তির তাৎপর্য ওরা বুঝতে চাননি। তা না চান, সাধারণ মানুষÑ দু’দেশেই, জলবণ্টন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। সেটাই বড় কথা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক জোরদার করতে ওই চুক্তিকে আমি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলব। এর ফলে দু’দেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।
তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই এই চুক্তি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমি বলব যে, ওই চুক্তির পর দিল্লি থেকে ফিরেই আমি প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার কাছ থেকে একটা চিঠি পাই। প্রধানমন্ত্রী লিখিতভাবে আমাকে প্রতিশ্রুতি দেন কলকাতা বন্দরের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে কেন্দ্র নিজের খরচে পলিমাটি সরানোর কাজ করব। এ জন্য বছরে খরচ হয় ২২০ কোটি টাকা। আগে কেন্দ্র দিত এর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা। এছাড়া, এক্ষেত্রে স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও কেন্দ্র সাহায্য করবে বলে দেবগৌড়া জানিয়েছিলেন। চিঠিতে দেবগৌড়া আরো জানিয়েছিলেন যে, কলকাতা বন্দর যাতে আরো ১৩ হাজার কিউসেক জল পায় সেজন্য সঙ্কোশ প্রকল্প নবম যোজনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ভুটানের সঙ্কোশ নদী থেকে খাল কেটে  তিস্তায় জল আগের একটা প্রকল্প আগেই তৈরি হয়েছিল। এই প্রকল্প রূপায়িত হলে আমরা বাড়তি জল পাব। তাছাড়া, চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎও উৎপাদন হওয়ার কথা। পরিবেশ রক্ষা করেই এসব করা হবে। প্রধানমন্ত্রীকে আমি বলেছিলাম, কাজ যেন দ্রুত শেষ হয় দেখবেন। তবে আমি বলব যে, এই প্রথম কোনো কেন্দ্রীয় সরকার কলকাতা বন্দরের স্বার্থরক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার কথা ঘোষণা করল। কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকারের আমলে কেউ তো প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত দেয়নি।
দেবগৌড়া সরকারের আমলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির জন্যও পদক্ষেপ নেয়া হয়। আমি যেদিন বাংলাদেশে রওনা দিই তার পরের দিন (২৮ নবেম্বর) চীনের রাষ্ট্রপতি জিয়াঙ জেমিন ভারত সফরে আসেন।
দেবগৌড়া সরকারের আমলে পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ প্রশ্নেও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারত দৃঢ় ভূমিকা নেয়। সাম্রাজ্যবাদী চাপের কাছে মাথা নত করেনি। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের মঞ্চেও নতুন করে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে ভারত।

Print
©2009. All rights reserved.