Logo_print
 
সূচীপএ : সাহিত্য সংস্কৃতি
[বইপাঠ] বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা

ইফতিখারুল ইসলাম

বিনয় ঘোষ বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা গ্রন্থে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলার সামাজিক গতিধারার বিভিন্ন দিক আলোচনা করেছেন। তার এই বইটি ১৯৫৯ সালে গৃহীত ‘সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র’ গ্রন্থের ধারাবাহিক গ্রন্থমালার উপসংহার খণ্ড। দীর্ঘ দশ বছর গবেষণা করে ঘোষ এই মহৎ কাজটি সম্পন্ন করেন। এতে তিনি বিভিন্ন সাময়িকপত্র ব্যবহার করে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা তুলে ধরেন। সাময়িকপত্রগুলোর মধ্যে সংবাদ প্রভাকর, বেঙ্গল স্পেক্টেটর, বিদ্যাদর্শন, সর্বশুভকরী পত্রিকা, সোমপ্রকাশ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। লেখক গ্রন্থটিকে পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত করে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উনিশ শতকের বাংলা তুলে ধরার প্রয়াস পান।
শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকা কম গতিশীল। শহরের প্রভাবেই গ্রামীণ পরিবর্তন সাধিত হতে থাকে। শহর এলাকায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের হাওয়া গ্রামীণ এলাকায় এসে পড়ে। এ-হাওয়া গ্রামীণ মানুষের গায়ে লাগে এবং তারাও শহরমুখী হয়ে ওঠে। এতে করে গ্রামীণ পরিবেশের পরিবর্তন হতে থাকে, যদিও এ-পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত মন্থর। আধুনিক যুগকে মধ্যযুগ থেকে আলাদা করতে তিনি দুটি প্রাণীর কথা উল্লেখ করেন। হাতি ও ঘোড়া। মধ্যযুগ ছিল হাতির যুগ। হাতি হলো স্থূল ও স্থবিরতার প্রতীক। আধুনিক যুগের প্রতীক হলো ঘোড়া, যা ঠক ঠক শব্দে বাংলার মানুষের ঘুম ভাঙে। মধ্যযুগে গ্রামীণ পরিবেশ ছিল পিরামিডের মতো গতিহীন স্তরবদ্ধ। রাজার সঙ্গে প্রজার দীর্ঘ দূরত্ব ছিল। দুজনের মধ্যে চোখাচোখি হওয়ারও সুযোগ ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) মাধ্যমে বাংলায় একটি জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি হয়। এই জমিদার শ্রেণির ফলে প্রজা ও শাসকের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পায়। মূলত এই জমিদার শ্রেণির ভিত মুর্শিদ কুলীর আমলেই তৈরি হয়, ব্রিটিশ শাসন এসে একে অধিকতর সুসংগঠিতভাবে একটি রূপ দেন। তাদের ধারণা ছিল যে, রাজস্ব নির্দিষ্ট করে দিলে জমিদাররা তাদের দায়িত্ব পালন করতে উৎসাহ পাবে। বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জমিদাররা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। তাদের দায়িত্ব ছিল অর্পিত নির্দিষ্ট এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ করা, রায়ত ও কৃষকদের প্রতি ন্যায্য বিচার করা এবং কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। এতে তারা কিছু সুযোগ-সুবিধা পেত। জমিদাররা শতকরা এক-দশমাংশ রাজস্ব ভোগ করতেন এবং কিছু জমিও ভোগ করার অধিকার পেতেন। এসব সুযোগ-সুবিধা কোনোভাবেই কম নয়। ব্রিটিশ শাসনপূর্বে গ্রামীণ অর্থনৈতিক ভিত ছিল অন্যান্য দিকের মতোই স্থবির। এ সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলে আলাদা করার সুযোগ নেই। কেননা পুরো সমাজ ছিল কুলবৃত্তি এবং তাদের সামাজিক প্রভাব ছিল না। এ কারণে ব্রিটিশপূর্ব যুগে যে মধ্যবিত্ত ছিল সেটাকে আলাদাভাবে মধ্যবিত্তশ্রেণি বলা যায় না।
বিনয় ঘোষ বাঙালির শিল্পোদ্যম বিষয়টি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। ১৮৫৩ সালে রাজেন্দ্র দত্ত আমেরিকা থেকে সেলাইয়ের কল নিয়ে আসেন। এ নিয়ে ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ খবর প্রকাশিত হচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে এসব বিষয় জনসাধারণের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে শ্রীরামপুর কাগজের কল প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৮২০ সালে রানীগঞ্জে প্রথম কয়লাখনি খোঁড়া হয়, ১৮৩৯ সালে বাংলাদেশে ‘মেকানিকস্ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৮৫৪ সালে শ্রীরামপুরে প্রথম পাটকল স্থাপন করা হয়। বিনয় ঘোষ সেসময়ের বাঙালির শিল্পবাণিজ্যের প্রতি বিরাগের সমালোচনার প্রমাণস্বরূপ বিভিন্ন সাময়িকপত্র থেকে উদ্ধৃতি নিয়েছেন। বাঙালি-চরিত্র তিনি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। বাঙালি কোনো ধরনের বাণিজ্যজ্ঞান ব্যতিরেকে ব্যবসা শুরু করে এবং একটু আঘাত পেলে তথা লোকসান হলে সবকিছু বস্তাবন্দী করে ঘরে আবদ্ধ থাকে। সন্তানদের প্রতি বাঙালি মায়েদের অত্যধিক স্নেহকাতরতা বাঙালি পুরুষদের ঘরকুনো স্বভাবের জন্য দায়ী। তাছাড়াও তিনি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে বাংলার শিল্পের অন্তরায়ের দিকগুলো উল্লেখ করেন। এসব কারণগুলোর মধ্যে তিনি বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, একান্নবর্তী পরিবারের কথা উল্লেখ করেন।
বিনয় ঘোষ লেখেন, মুসলমানদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হলো জাতিগত অভিমান, আধুনিকতা ও পাশ্চাত্য ভাবাদর্শের প্রতি ধর্মগোঁড়ামিজনিত বিরূপ মনোভাব এবং হিন্দুদের তুলনায় নিজেদের পশ্চাদগতির ফলে নৈরাশ্য ও হীনম্মন্যতাবোধ। উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত এই অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ১৮৩৫ সালের বেন্টিঙ্ক-মেকলের প্রস্তাবে সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি গৃহীত হয়। এতে মুসলমানদের মধ্যে প্রায় ৮০০০ লোক এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ লিপি পেশ করেন। অথচ এ সময়ে হিন্দুদের মধ্যে একটি ইংরেজি শিক্ষিত গোষ্ঠী তৈরি হয়।
বিনয় ঘোষ ১৮০০-১৮৬০ পর্যন্ত সময়কাল পতিত জমি আবাদযোগ্য করে তোলা ও বীজ বপন করার মতো এবং ১৮৬০-১৯০০ বীজ অঙ্কুরে পরিণত হচ্ছে এবং সমাজ-জীবন জটিল ও কলরবমুখর হয়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেন। বিনয় ঘোষ বলেন, প্রথমত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব; দ্বিতীয়ত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে শাসক শ্রেণির সংঘাত।
Print
©2009. All rights reserved.