Logo_print
 
সূচীপএ : সাক্ষাৎকার
[আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার] বিস্মৃত নিয়তি-কে. বি. এম. মাহমুদ


কে. বি. এম. মাহমুদ ১৯৬৪ সালে খুলনা থেকে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা, ইংরাজি সাপ্তাহিক ‘দ্য ওয়েভ’ (পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত)-এর প্রকাশক ও সম্পাদক। ওয়েভ শুরু থেকেই এক অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন পত্রিকা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্র্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনে মূল্যবান ভূমিকা রাখে।
 ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আগ্রাসন শুরু করার পর কে বি এম মাহমুদ এক সম্পাদকীয় বিবৃতির মাধ্যমে ‘দ্য ওয়েভ’-এর প্রকশনা বন্ধ করে দেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে মাহমুদ মুজিবনগর সরকারের সাথে সমন্বয় রক্ষা করে বিভিন্ন বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং জুলাই ’৭১ পরবর্তীকালে দেশের অবরুদ্ধ এবং মুক্তাঞ্চলে বিদেশি সাংবাদিকসহ সফর করে বিভিন্ন সময়ে অবরুদ্ধ ও মুক্তাঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যা ‘টাইম’, ‘নিউজ উইক’, লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’সহ বিভিন্ন বিদেশি প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন বিদেশি মাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণই সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখেছিল।
স্বাধীনতার পর সাপ্তাহিক ‘দ্য ওয়েভ’ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে ঢাকা থেকে পুনঃপ্রকাশিত হয়। জুন, ১৯৭৫ সালে সরকার কর্তৃৃক প্রকাশনা বন্ধ হবার পূর্ব পর্যন্ত সম্পূর্ণ দলনিরেপেক্ষ অবস্থানে থেকে ‘ওয়েভ’-এর একনিষ্ঠ এবং মূল এজেন্ডা ছিল সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবায়ন, যা মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল এবং পরবর্তীতে সাংবিধানিক লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। সম্পাদক মাহমুদ বিশ্বাস করতেন এবং সে বিশ্বাস এখনও অপরিবর্তিত আছে যে, বাংলাদেশের বাস্তব আর্থসামাজিক অবস্থায় অর্থনৈতিক সুষম বণ্টনের প্রয়োজনে সমাজতন্ত্রের বিকল্প আর কোনো পথ নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা আর একটি অপরিহার্য পথ, যা ছাড়া সেই ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সৃষ্ট অনেক ভ্রান্তি ও অন্যায়, যা উপমহাদেশের ইতিহাসকে কলংকিত করেছে তার সংশোধন সম্ভব নয়।
সম্পাদক মাহমুদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ¯েœহধন্য হওয়া সত্ত্বেও ওপরে উল্লেখিত নীতিদ্বয়ের বাস্তবায়নের প্রশ্নে ‘ওয়েভ’-এর অবস্থান তৎকালীন সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এর ফলে পত্রিকাটি তৎকালীন সরকারের কতিপয় মহলের বিরাগভাজন হয় এবং ১৯৭৩ সালের শেষ নাগাদ ‘ওয়েভ’ এবং মাহমুদ উভয়কেই সরকারের বৈরী আচরণের সম্মুখীন হতে হয়।
১৯৭০ সালের জুন মাসে সরকারের (Annulment Order)-এর আওতায় ‘ওয়েভ’ এর প্রকাশনা বন্ধ হওয়া ও ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুর নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর কে বি এম মাহমুদ পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভীষ্ট লক্ষ্যে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমাজতন্ত্রের রোডম্যাপ জনিত আশ্বাসের বিনিময়ে মাহমুদ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। বর্ণিত কার্যক্রমের চূড়ান্ত অংশে জাসদের অনুরোধে মাহমুদ ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে জাসদ-জিয়াউর রহমান সমঝোতার মূল বেনিফিশিয়ারি জেনারেল জিয়াউর রহমানই তাকে কারারুদ্ধ করেন। জুন/জুলাই ১৯৭৬-এ কর্নেল তাহের, আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিল ও অন্যান্য জাসদ নেতাসহ কে বি এম মাহমুদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে বিশেষ গোপন ট্রাইব্যুনালে বহুল আলেচিত “কর্নেল তাহের ও অন্যান্য” মামলার অন্যতম আসামি হিসাবে কাঠগড়ায় যান। ওই মামলায় কর্নেল তাহেরের ফাঁসি ও অন্য আসামিগণের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে কারামুক্ত হবার পর কে. বি. এম. মাহমুদ পুনরায় সাংবাদিকতায় প্রত্যাবর্তন করার চেষ্টা করেন কিন্তু জিয়াউর রহমানের সরকার ‘ওয়েভ’ পুনঃপ্রকাশের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই পর্যায়ে মাহমুদ লন্ডনের ‘সাউথ ম্যাগাজিন’ (South Magazine) ও ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড কোয়ার্টারলি’ (Third World Quarterly) পত্রিকাদ্বয়ে এবং আরও পরে মালয়েশিয়ার ‘ডেইলি স্টার’ (Daily Star)-এর বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করেন।
বর্তমানে কে বি এম মাহমুদ অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে একজন অনিয়মিত ব্লগার। লেখালেখি এবং শহীদ পিতার নামে উৎসর্গিত, যশোরের গ্রামে স্থাপিত একটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের তদারকিতে সময় কাটান। সাক্ষাৎকার গ্রহণ : আসাদুজ্জামান

সাপ্তাহিক : আপনার জন্ম থেকেই শুরু করি। আপনার জন্ম কোথায়, কীভাবে বড় হয়েছেন এবং কিছু পারিবারিক তথ্য দেবেন কি ?
কে. বি. এম. মাহমুদ : আমার জন্ম সেপ্টেম্বর ১৯৩৮, তখন আমার বাবা ব্রিটিশ ভারতে দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। বাবা (শহীদ) মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল আমার সর্বকনিষ্ঠ দু’ভাই জিন্নাহ ও মোসাদ্দেকসহ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে যশোর শহরে আমাদের নিজস্ব বাড়িতে নিহত হন। আমার মা খায়েরুনন্নেছা ১৯৪১ সালের ৬ মে কুষ্টিয়াতে মাত্র একুশ বছর বয়সে মারা যান। আমার বাবা আমার সবচেয়ে বড় গর্ব ও আলোকবর্তিকা। আমি যদি এমন কিছু দেখতে পাাই যা চোখে দেখা যায় না, তা আসলে আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে (সম্ভবত ১৮৯৭ সালে) যশোরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যবিত্ত সংসার থেকে পালিয়ে গিয়ে কলকাতায় আলিয়া মাদ্রাসার এতিমখানায় আশ্রয় নেন এবং সেখানে থেকে পড়াশুনা করে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন।
আমার বাবা এক অসাধারণ স্পষ্টভাষী মানুষ ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। আদর্শের প্রশ্নে তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাকে তার ধর্মের অংশ মনে করতেন। কলেজ জীবনে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাহচর্যে তার আদর্শ, রাজনৈতিক চেতনা ও গন্তব্য নির্ধারণের সূচনা হয়েছিল। অন্যদিকে বাবা এক অত্যন্ত নিবেদিত মুসলমানের কর্তব্য পালনের সাথে সাথে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে এবং সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাস করতেন। মায়ের মৃত্যুর সময়, ১৯৪১ সালে, বাবা সাব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।
তখন আমার বয়স ছিল পৌঁনে তিন বছর এবং ছোট ভাইয়ের বয়স ছিল দশ মাস। মাকে আবছা মনে পড়ে। আমাদের মাঝে এক বোন ছিল জন্মের মাত্র এগার দিন পর সে মারা যায়।
এত ছোট ছিলাম, কিন্তু আশ্চর্যের কথা, আমার মায়ের সাথে কয়েকটা মুহূর্তের কথা এখনো মনে পড়েÑ মায়ের সঙ্গে খেলছিলাম, একটা মাটির খেলনা ভেঙে ফেলেছিলাম। তখন মা আমার দিকে কীভাবে যেন আড়চোখে তাকিয়ে ছিলেন। এরকম টুকিটাকি আরও কিছ মুহূর্তের কথা মনে আছে। আমার মায়ের দাম্পত্য জীবন ছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরের। যখন মারা যান তখন তার বয়স ২১ বছরও হয়নি। পরবর্তীতে আমার বাবার তৃতীয় সংসারে বা আমার অন্য মায়ের গর্ভে আসে পাঁচ ভাই ও তিন বোন।
আমার নিকটতম সহোদর প্রয়াত অধ্যাপক এ বি এম খালেদ। ২০০৫ পাঁচ সালের ১৭ জুলাই আকস্মিকভাবে বাথরুমে পড়ে গিয়ে অর্ন্তধান হন। মৃত্যুকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Accounting Department and Information Systems বিভাগের জেষ্ঠ্যতম শিক্ষক ছিলেন। আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে খালেদ আমাদের বাবার নিকটতম অনুসারী প্রমাণিত হয়েছিলেন। খালেদ সুপরিচিত ছিলেন তার সহকর্মী ও সতীর্থ মহলে তার বিভাগীয় ও বিশ^বিদ্যালয়ের যেকোনো ইস্যুতে নীতির প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস না করার জন্য। স্বাধীনতার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ অসংখ্য বিদেশি বিশ^বিদ্যালয়ের ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও তার বিভাগের উন্নয়নের প্রচেষ্টায় রত ছিলেন। একাধিক কর্পোরেট গোষ্ঠী খালেদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্পে যা প্রচলিত দৃষ্টান্ত অনুযায়ী খালেদের জন্য অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সিঁড়ি হতে পারতো কিন্তু খালেদ তাতে আকৃষ্ট হননি।
খালেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগে সর্বপ্রথম ইভিনিং এমবিএ প্রোগ্রাম চালু করেন এবং তিনি এই প্রোগ্রামের প্রথম পরিচালক ছিলেন। মৃত্যুর সময় খালেদের বিভাগে মোট ৪৮জন শিক্ষক ছিলেন, যার মধ্যে ৪৪ জনই ছিলেন তার ছাত্র।
অন্য এক ভাই প্রয়াত আক্তারুজ্জামান একজন শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী এবং ১৯৬৯-৭১ সালে চট্টগ্রামে লালদীঘি আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আক্তারুজ্জামান ১৯৭১ মার্চে কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন।
আমার তৃতীয় ছোট ভাই আলী তারেক মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রেস সেক্রেটারি এবং রাজনৈতিক কমকর্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে কার্যরত অবস্থায় জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী ও প্রাক্তন বামপন্থী নেতা ক্যাপ্টেন হালিমের সাথে তারেকের ব্যক্তিত্বের সংঘাতের একটি ঘটনা ঘটে। এরপর তারেক আমাদের পারিবারের আপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও জিয়াউর রহমানের মনোনয়নে যশোর-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং জিয়াউর রহমানের সংসদে এমপি নির্বাচিত হন। ঘটনাটি আমাদের পরিবারের জন্য একটি বড় ব্যতিক্রম ছিল, যা তারেক পরবর্তী জীবনে স্বার্থকভাবে সংশোধন করতে সক্ষম হন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে তারেক আকস্মিক মস্তিস্কের রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন।
একমাত্র ভাই বেঁচে আছেন, অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লে. সালউদ্দিন মো. রহমতউল্লাহ। তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে জিডি পাইলট হিসেবে কমিশন পেয়েছিলেন। বিচিত্র কর্মজীবনের অধিকারী সালাউদ্দিন শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। উল্লেখ্য, বাবার অবসরপ্রাপ্ত দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক অপ্রতুলতার মধ্যে সালাউদ্দিন ও আমার কনিষ্ঠতম দুই ভাই যারা বাবার সাথে শহীদ হয়েছিলেন, অনেক কষ্টে লেখাপড়া শেষ করেন। স্বাধীনতার পরে সালাউদ্দিন প্রথমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে মিগ-২১, পরে বাংলাদেশ বিমানে ডিসি-১০ বিমানের পাইলট হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কতর্মরত আছেন।  
বোনদের মধ্যে বড় ফতিমা মমতাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতোকোত্তর সম্পন্ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত এক মাধ্যমিক স্কুলে প্রায় ১৫ বৎসর যাবৎ সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকার পর সম্প্রতি অবসর গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয় বোন একজন ফার্মাসিস্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতেকোত্তর করেছিলেন, একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কর্মরত আছেন। তৃতীয় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতোকোত্তর করেছেন, মূলত গৃহবধূ ও দুই সন্তানের জননী এবং একজন বৈমানিকের স্ত্রী।
সাপ্তাহিক : আপনার কথায় মনে হলো আপনার বাবা আপনার জীবন দর্শনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন, একটু বিস্তারিত বলবেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : আগেই বলেছি, আমার বাবা এক অসাধারণ স্পষ্টভাষী মানুষ ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। দেশপ্রেম ও আদর্শের প্রশ্নে আমরা কেউই তার সমান হতে পারিনি।
কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে লেখাপড়ার সময় বাবা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাহচর্য লাভ করছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বাবার অঙ্কে একটু দুর্বলতা ছিল। সুভাষ চন্দ্র বসুর তত্ত্বাবধানে কিছুদেন লেখাপড়ার পরে বাবা সেই সংকট কাটিয়ে ওঠেন। আসলে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাহচর্যে বাবা কিন্তু অঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি কিছু পেয়েছিলেন।
লেখাপড়া শেষ করার পর, যদিও তখনকার ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের চাকরি পাওয়া খুব কঠিন ছিল, বাবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে চাকরি পেয়েছিলেন এবং ১৯৪৪ সালের দিকে ব্রিটিশ আমলেই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ ও পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরিরত অবস্থায়, সহজে অনুমেয় কারণেই বাবার পক্ষে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।
চিন্তায় তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন এবং বাংলাদেশের সার্বিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করতেন। সন্তানদের প্রতি তার দৈনন্দিন কথাবার্তা, নির্দেশ ও ক্রিয়ার মাধ্যমে শহীদ রহমতউল্লাহ তার সন্তানদের আদর্র্শ ও লক্ষ্যের ভিত্তি তৈরি করতে শুধু সাহায্যই করেননি; বরং, আমার মনে হয়, তাঁর মৃত্যুর দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তিনি তার সন্তানদের জন্য তার শেষ নির্দেশ (Last Command) রেখে গেছেন।
একটা ঘটনা আপনার সঙ্গে শেয়ার করব। তখন ১৯৭০ এর নির্বাচন হলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন। মার্চের প্রথম সপ্তাহে সংসদ অধিবেশন ডাকা হলো কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষলগ্নে হঠাৎ সেটাকে স্থগিত করা হলো। তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ বারুদের মতো ফেটে পড়ল। আমি তখন খুলনায়। তখন পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। আমার ছোট ভাই সালাউদ্দিন তখন পশ্চিম পাকিস্তানের মাশরুর বিমান ঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন ফ্লাইট লেফটেনেন্ট হিসেবে। একটি গুজব শুনতে পেলাম মার্চের ৩ তারিখে; পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে যত বাঙালি আছেন তাদের মেরে ফেলার পরিকল্পনা বিবেচনাধীন রাউয়ালপিন্ডিতে। ক্লাবে বিলিয়ার্ড খেলছিলাম এবং খবরটা শুনে ভেঙে পড়লাম। নিয়মিত সময়ের আগে বাসায় ফিরে গেলাম। আমার স্ত্রী আমার উদ্বিগ্ন চেহারা এবং সময়ের পূর্বে বাসায় ফেরায় আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। সালাউদ্দিনের ব্যাপারে আমার উদ্বেগ ও প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থা দেখে স্ত্রী বললেন, তোমার বয়স মাত্র ৩৩ বৎসর আর আমাদের বাবার (আমার বাবা) বয়স ৮১ বৎসর এবং তিনি অসুস্থও। তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে বাবাকে দেখবে কে? স্ত্রীর মন্তব্যটি চাবুকের মতো কাজ করলো। মাত্র কয়েকদিন আগেই তো বাবাকে বেশ শীর্ণ দেখে এসেছিলাম যশোরের বাড়িতে। ঠিক করলাম পরদিন সকালে যশোরে যাব বাবাকে কোনো মনগড়া কথা বলে চাঙা করতে।
যশোরের বাড়িতে আমি পৌঁছে দেখি বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। উৎফুল্ল ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে তাকে। কারণ কী হতে পারে ভেবে পাচ্ছিলাম না। কয়েক মুহূর্ত পরেই জবাব পেয়ে গেলাম। বাবাকে অতিক্রম করে দরজার কাছে পৌছানোর আগেই বাবা বললেন, আর তোমাদের কোনো সংশয়ের কারণ নেই। তোমরা ধরে নিতে পারো আমরা এখন মুক্ত হয়ে গেছি, পাকিস্তান আর আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এমনকি আওয়ামী লীগ চাইলেও আর কোনো আপস করতে পারবে না। The die is cast. তবু একটা স্বাধীনতাযুদ্ধ হয়ত তোমরা এড়াতে পারবে না। তার জন্যে প্রস্তুত হও।
এরপর প্রায় পনের মিনিট ধরে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে তার বিশ^াসের ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। একবারও কোনো ছেলে বা সন্তানের খবর জানতে চাইলেন না। তখন, যেমন বলেছি, সালাউদ্দিন করাচিতে অন্য ভাই খালেদ ঢাকায়, আমি খুলনায়, জামান চট্টগ্রামে। অর্থাৎ তার যে সকল ’দুর্বলতা’ সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তা তাঁকে সামান্যই উদ্বিগ্ন করেছে। তিনি উদ্বিগ্ন একমাত্র বাংলাদেশ নিয়ে। মা দাঁড়িয়ে হেলান দিয়ে মনোযোগসহকারে শুনছিলেন। আর ভিতরে ভিতরে আমি লজ্জায় মরে গেলাম। ঐ ৮১ বছরের অশীতিপর বৃদ্ধের তুলনায় আমিই আসলে কত ‘বৃদ্ধ’, তার চেয়ে আমি কত দুর্বল!
পরে আমি প্রসঙ্গটিকে তুললে বাবা বললেন, ভাই সালাউদ্দিনকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ো না। সত্যিই যদি তোমার কোনো উৎকণ্ঠা থাকে তা হলে সব সালাউদ্দিন যারা অবরুদ্ধ হয়ে আছে, তাদের জন্য উৎকণ্ঠিত হও। তোমার ভাইয়েরা যে যেখানে থাকে তারা যেন তাদের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সঠিক কাজটি ও তাদের কর্তব্যটি পালন করে।
আমার দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে বহু মনীষীর সাথে মেশার সুযোগ পেয়েছি, অনেকের কাহিনি বইয়ে পড়েছি কিন্তু সবার কাছে অজানা এই বৃদ্ধ পুরুষের সাহস ও প্রেরণার সমান্তরাল কোনো উদাহরণ এখনো পাইনি।
বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম ২৪ দিন পর। ২৫ মার্চ ১৯৭১ গণহত্যা শুরুর পর তখনও সারাদেশে ফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। আমি ঢাকায়, তারিখটি ছিল এপ্রিলের ২৮। আব্দুল ওয়াহেদ যিনি ‘ওয়েভ’ এর প্রকাশের লগ্ন থেকে একজন নিঃস্বার্থ বন্ধু এবং ভাইয়ের ভূমিকায় সব সময় আমার পাশে ছিলেন, তার মাধ্যমে। ধানমন্ডিতে খালেদের বাসার নিচ তলার সিঁড়িতে দেখা হল ওয়াহেদ ভাইয়ের সঙ্গে। পাকড়াও করলাম। আজ আমাদের সাথে খেতে হবে। গম্ভীর মুখে বললেন, খাওয়া পরে হবে, ওপরে চলুন, কথা আছে। ওয়াহেদ ভাই ব্যাংকের কাজে খুলনা এবং যশোর গিয়েছিলেন। ওপরে বসার ঘরে পৌঁছানোর পরে বললেন, YourFather, Jihanha and Mossadak have been shot. In Khulna, your house has beenraided. The army has been looking for you. Some of their people belive that youhave already crossed the border. পাশে খালেদ হঠাৎ কান্না শুরু করে দিল। আমি এত বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম যে, হতবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম ওরা এখন কোথায়? কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে পেলাম, খালেদকে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে দেখে। তার কিছু পরে আমিও কাঁদলাম। যদিও আমি কাঁদতে ভালোবাসি না।
সাপ্তাহিক : আপনি বলেছেন কলেজ জীবনে সুভাষ চন্দ্র বসু আপনার বাবার চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিলেন।
কে. বি. এম. মাহমুদ : প্রেসিডেন্সি কলেজে সুুভাষ চন্দ্র বসু বাবা থেকে এক বা দুই ক্লাস ওপরে ছিলেন। ওই সময় সুভাষ বসুর সাথে আমার বাবা নিজেকে পরিচিত করান। যদিও তখনো তিনি ইতিহাসের সুভাষ বসু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেননি, কিন্তু তখনই তার কতগুলো মৌলিক দর্শন প্রকাশ পেয়েছিল। সুুভাষ চন্দ্র বসু’র সাহচর্য অবশ্যই বাবার আদর্শ, রাজনৈতিক চেতনা ও গন্তব্য নির্ধারণে সহায়ক হয়েছিল।
বাবার কাছ থেকে কলেজে অধ্যয়নরত সুভাষ চন্দ্র বসুর যে চিত্র পেয়েছি, তা এরকমÑ
এক. তিনি সম্পূর্ণভাবে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। দুই. তিনি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কোনো রকম আপসরফা করা সম্ভব, এটা মনে করতেন না। তিন. সুভাষ চন্দ্র বসু তখনই বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষের মুক্তি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের সাথে সম্মুখ সমর বা প্রতিরোধ ছাড়া সম্ভব নয় ।
সাপ্তাহিক : সংক্ষেপে আপনার শিক্ষা জীবন এবং পরবর্তীতে পেশাগত অর্থাৎ সাংবাদিকতা জীবন সম্পর্কে শোনা যাক?
কে. বি. এম. মাহমুদ : পারিবারিক কিছু ভুলবোঝাবুঝির কারণে আমি ও আমার নিকটতম সহোদর খালেদ খুব অল্প বয়সেই গৃহত্যাগ করি এবং তারপর বলতে পারেন, আমরা দুই ভাই একরকম মুক্ত আকাশের নিচেই আল্লাহতালার একান্ত কৃপায় বড় হয়েছি।
স্কুলে আমি প্রথম শ্রেণিতে কখনও ভর্তি হইনি। আমার প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমা শহরে, যেটা এখন ভারতের একটা অংশ। পরে বাবা ১৯৪৪ সালে যশোরে বদলি হন, যখন সর্বপ্রথম নিজের জেলা, অর্থাৎ যশোরের সাথে আমার সত্যিকার অর্থে পরিচয় হয় । ১৯৪৬ সালে আমি যশোর জেলা স্কুলে ভর্তি হই এবং ১৯৫৩ সালে প্রবেশিকা স্তর অতিক্রম করি। স্কুলে অন্যতম সহপাঠীদের মধ্যে মনে পড়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের ছোট ভাই আমিনুর রহমান ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও সুপরিচিত কবি ড. মনিরুজ্জামানের কথা। এরপর দৌলতপুর বি. এল. কলেজে পড়াশুনা করি। বি. এল. কলেজে আনোয়ার জাহিদ আমার সহপাঠী ছিলেন। কলেজ জীবনে আনোয়ার জাহিদ যথেষ্ট প্রগতিশীল ও একজন সম্ভাবনাময় তরুণ ছিলেন। পরিণত বয়সে অবশ্য আরও অনেক বামপন্থী ব্যক্তির মতো তারও মতি ও গতি প্রতিক্রিয়াশীল এবং ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। বি এল কলেজে এক বছর কাটানোর পর আমি যশোর কলেজে চলে আসি। যশোর কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি। পরে জগন্নাথ কলেজ থেকে বি কম পাস করি।
আমার বিয়ে হয় ১৯৫৮ সালে। স্ত্রী দওলত বেগম পিতার প্রথম সন্তান হওয়ায় অনেকে আদরে বড় হয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ে হল এমন এক ব্যক্তির সাথে যাকে অসম এক জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে বহুবার। দওলত কিন্তু বিন্দুমাত্র অভিযোগ ছাড়াই আমার যুদ্ধযাত্রার সঙ্গী ছিলেন (যার অংশবিশেষে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়া, আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনযাপন ও দেশদ্রোহী মামলায় অভিযুক্ত হওয়া, যেক্ষেত্রে কর্নেল তাহেরের সাথে আমারও ফাঁসি হতে পারতো)। দওলত আমার ওই সব কষ্টের দিনগুলো অসাধারণ ধৈর্যের সাথে মেনে নিয়েছেন।
সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসার কিছু পরে, যখন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ইংরেজি পত্রিকা ‘পাকিস্তান অবজারভার’এ যোগদান করি ১৯৫৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে। সেই বছরের জুনে অবজারভারের মূল ঢাকা অফিসে স্টাফ করেসপনন্ডেন্ট হিসেবে যোগদান করি। আরও কিছু পরে, অবজারভার-এ কর্মরত অবস্থায়, পরবর্তীতে ‘হলিডে’ প্রসিদ্ধ এনায়েতুল্লাহ খান ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শহীদুল হককে সহকর্মী হিসেবে পাই। জানুয়ারি ১৯৬১ সালে আমাকে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে খুলনায় পাঠানো হয় এবং আমি খুলনায় ‘অবজারভার’ এর অফিস স্থাপন করি। ‘অবজারভারে’র অফিসই সে সময়ে খুলনায় যেকোনো পত্রিকার প্রথম অফিস ছিল।
অবজারভার-এর জীবনটি আমার সাংবাদিকতা পেশার স্বর্ণযুগ বলে আমৃত্যু মনে রাখব। আমার কয়েকজন ’শিক্ষক’ সুপিরিয়রদের যাদেরকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেকদিনই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি: তাদের মধ্যে ছিলেন সম্পাদক আব্দুস ছালাম, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আব্দুল গণি হাজারী ও বার্তা সম্পাদক এবিএম মূসা। আব্দুস ছালাম ছিলেন একজন স্বল্পভাষী সম্পাদক যাকে একজন দার্শনিক বললে অত্যুক্তি হবে না। আব্দুল গণি হাজারী ছিলেন এক অত্যন্ত সুচারু এবং কুশলী পত্রিকা ব্যবস্থাপক, কবি, লেখক এবং সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সাংবাদিক। হাজারী সাহেব ১৯৬০-৬৫ কালে ইউপিআইএর পাকিস্তান প্রতিনিধি ছিলেন। মূসা ভাই ছিলেন এক অত্যন্ত তেজি মানুষ, বার্তা সম্পাদক হিসেবে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশক এবং সমাজের নিষ্পেষিত শ্রেণির প্রতি সংবেদনশীল মনের অধিকারী একজন সাংবাদিক। যদিও অন্যান্য কাগজের মতো (এখনকার মতই) ‘অবজারভার’ও একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ছিল, পত্রিকাটির অন্যতম মৌলিক নীতি ছিল (এবং যা আমাদেরকে আসলেই পালন করতে হতো ): শ্রমিক ও অবহেলিত শ্রেণির পক্ষে অবস্থান নেয়া, যা সেই পর্যায়ে ও পরবর্তীকালে আমার সাংবাদিক হিসেবে কর্তব্য, অগ্রাধিকার ও লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
প্রথমে আমি খুলনায় যেতে চাইনি। খুলনার নোনা পানি এবং মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে একটু অন্য ধারণা ছিল। কিন্তু হাজারী ভাই বললেন, ‘খুলনার বেশ কিছু সমস্যা আছে, এছাড়া একটি বড় জাতীয় ইসুতে ‘অবজারভার’-এর ভূমিকা রাখার প্রয়োজন আছে। ইসুটি হচ্ছে মংলায় একটা নৌবন্দর স্থাপন করার লক্ষ্যে একটি গণসচেতনতা গড়ে তোলার জন্যে কাজ করতে হবে। আমার বিশ^াস, মাহমুদ, কাজটি আপনিই ‘সবচেয়ে ভালো পারবেন’। যদিও আমার সাংবাদিকতা পেশায় অভিজ্ঞতার দৈর্ঘ্য তখন ছিল মাত্র দু বছরের, হাজারী ভাই-এর মন্তব্যে আমার প্রতি যে আস্থার প্রকাশ ছিল কিছুটা সে কারণে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি মংলায় স্থায়ী বন্দর স্থাপনের ইসুটিতে যে চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন ছিল, তা আমাকে আকৃষ্ট করলো। সুতরাং মত বদলাতে হলো।
মংলায় বন্দরের ব্যাপারে পাকিস্তানের একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল যে তারা পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় বন্দর দেবে না। বন্দরের ক্যাম্পেইনটি ‘অবজারভারে’র মাধ্যমে স্বার্থকভাবে শুরু করেছিলাম, কিন্তু স্থায়ী বন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্ত অর্জন সম্ভব হয় ১৯৬৪ পরবর্তীকালে যখন আমি ‘ওয়েভ’ পত্রিকার প্রকাশনা ও সম্পাদনা শুরু করেছি। খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় মংলায় স্থায়ী বন্দরের সপক্ষে যুক্তি ও যথার্থতা উপস্থাপন করা ছাড়াও খুলনা ও খুলনার পেছনের অঞ্চল যা উত্তরবঙ্গ বলে পরিচিত ছিল সেখানে জনমত সৃষ্টি করার পেছনে একজন মানুষের অবদান চিরদিন মনে থাকবে। পত্রিকায় মংলা বন্দর সম্পর্কে লেখালেখি শুরু করার পর কোথা থেকে যেন এক অদ্ভুত মানুষের আবির্ভাব হলো, খুলনা অবজারভার অফিসে, নাম মহিউদ্দিন। অত্যন্ত সাধারণ বেশভূষায়, একজন ততোধিক সাধারণ ব্যক্তি। যিনি মংলা পোর্ট আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে চান। প্রথমে সন্দেহের দৃষ্টিতে অনেক প্রশ্ন করলাম, বুঝতে চাইলাম প্রকল্পটিতে মহিউদ্দিনের স্বার্থ কোথায়?
বুঝতে সময় লেগেছিল। একজন সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থপর ব্যক্তি উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজনে আমার সাথে হাত মেলাতে এসেছিলেন। মহিউদ্দিনের সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। ওই সময় বিভিন্ন চেম্বারস অব কমার্স থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয় করা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র মহিউদ্দিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই। অবশেষে ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সরকার মংলায় স্থায়ী নৌবন্দর স্থাপনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিল। আন্দোলনটি সফল হওয়ার পর হঠাৎ একদিন মহিউদ্দিন হারিয়ে গেলেন, যেভাবে এসেছিলেন সেভাবেই অন্তর্হিত হলেন। পরে জেনেছি মহিউদ্দিন ১৯৬০ দশকের গোড়ার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। সেখানেও তাঁর ভূমিকা একই রকম নিঃস্বার্থ ছিল।
আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সময় মহিউদ্দিন ভাইয়ের মতো অনেককে দেখেছি যাঁরা কোনো সনদের বা তাঁদের নামে রাস্তা নামকরণের জন্য যুদ্ধ করেননি।
সাপ্তাহিক : আপনার ‘সাপ্তাহিক ওয়েভে’র প্রকাশনা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : ওয়েভের প্রকাশনার ইতিবৃত্ত কিছু বলব। অবজারভার পত্রিকায় আমার শেষের দিনগুলোতে অনুভব করলাম পত্রিকার মালিক হামিদুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক স্বার্থ প্রণোদিত কিছু নির্দেশ আমার পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। ‘অবজারভার’ ছাড়তে হবে অথচ এমন কোনো পত্রিকা ছিল না যার নীতি বা পেশাগত মানের সঙ্গে সহাবস্থান করা চলে। সুতরাং খুলনার প্রথম পত্রিকা প্রকাশের সাহস সঞ্চয় করলাম।
অত্যন্ত অপ্রতুল আর্থিক অবস্থার মধ্যেও ওয়েভের প্রথম প্রকাশনা সম্ভব হলো ১৯৬৪ সালের জুনের ১৩ তারিখে। কিন্তু এক অবিশ্বাস্য দ্রুত সময়ে পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা খুঁজে পেল পেশাগত মান, খুলনার পাঠক ও ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থনে। অবশ্য অত্যন্ত সততার সাথে বলতে পারি প্রকাশনার প্রথম থেকে শেষ দিনটি পর্যন্ত ‘ওয়েভ’ একটি নীতি পালন করে এসেছিল তা হলো, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূত অর্থসহায়তা গ্রহণ না করা। ‘ওয়েভে’র কোনো সাংবাদিককে যেকোনো ব্যক্তি বা বাণিজ্যিক স্বার্থ থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে কখনো পত্রিকার বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয়নি, যে নীতি আজকের বাংলাদেশের বৃহত্তম সংবাদপত্রেরও জানার বা মানার ইচ্ছা নেই।
এক বছরের মধ্যেই পত্রিকাটির নিজস্ব প্রেস স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল ‘ওয়েভ’ এর অর্থনৈতিক সাফল্য এবং একজন বিশেষ বন্ধুর সহায়তায় যিনি সিকিউরিটি ছাড়া ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি ছিলেন তখনকার মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের (বর্তমানে রূপালী ব্যাংক) খুলনা শাখার ব্যবস্থাপক, প্রয়াত আব্দুল ওয়াহেদ। ওয়াহেদ আমৃত্যু আমার একান্তই শুভাকাক্সক্ষী এক গুরুজন, অগ্রজ ও পারিবারিক বন্ধু ছিলেন, যার ঋণ আমার জন্য মর্ত্যরে অন্য যেকোনো ব্যক্তির তুলনায় ছিল সর্বোচ্চ।
খুলনায় ঐ সময়কালের সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের পরিসরে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং অথচ অর্জনমূলক ও উপভোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। অবজারভার ও পরবর্তীতে ওয়েভ এর লেখক/সাংবাদিক হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও অন্যান্য সামাজিক ও গেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিকূলতার সম্মুখীন হই। তৎকালীন খুলনার একচ্ছত্র নেতা মুসলীম লীগের খান এ সবুরসহ অনেক শক্তিশালী মহলের বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে অনেক দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। সবুর সাহেবের অনুগ্রহ প্রাপ্ত ব্যক্তিদের একটি বড় চোরাচালান (ঝসঁমমষরহম) ও অন্যান্য দুষ্কর্মের নেটওয়ার্ক ছিল। সে সম্পর্কে আমি অনুসন্ধান শুরু করেছিলাম এবং অনেক ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন ছেপে চোরাচালান চক্রটিকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। সে সময় খুলনার অবস্থা এমন ছিল যে, খান এ সবুরের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ বা তার ক্রিয়াকলাপ সমালোচনা করার মতো অবস্থা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্পনাতীত ছিল। কিন্তু ওই সময় খুলনার নেতৃস্থানীয় ছাত্র ও যুবশক্তি আমার পাশে ছিল। সে কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘ওয়েভ’ এর প্রচেষ্টা সফল হওয়া এবং খুলনার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বের সাথে ওয়েভ এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার একটি সেতুবন্ধন রচনা সম্ভব হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে প্রাক ১৯৭১ এর আন্দোলনের সময় অর্থবহ ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৭১ মার্চের আগে ‘ওয়েভ’ এর প্রায় সাত বছরের ইতিহাসে অন্য উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক দেশের পূর্ব ভূ-খণ্ডটির শোষণ সম্পর্কিত অসংখ্য গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ। এ প্রসঙ্গে, আশ্চর্য হলেও সত্যি, একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ সম্পর্কিত গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনগুলো বেশির ভাগই এসেছিল ‘ওয়েভ’ এর তিনজন একনিষ্ঠ কলামিস্ট সাংবাদিকের কলম থেকে, যাদের দুজনই ছিলেন অবাঙালি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের স্থায়ী বাসিন্দা। যাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন প্রয়াত সৈয়দ নজীউল্লাহ, যিনি রাওয়ালপিন্ডিতে ‘পাকিস্তান অবজারভারের’ স্থায়ী প্রতিনিধি এবং ‘ওয়েভ’ এর নিয়মিত কলামিস্ট ছিলেন। অন্যজন (এখনও জীবিত আছেন), করাচি নিবাসী এম বি নাকভী, যিনি তখনই একজন প্রখ্যাত কলামিস্ট ছিলেন এবং নজীউল্লাহর নেতৃত্বে একটি বিশেষ ’সেল’ এর অংশ ছিলেন যেটি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা ও প্রচারকার্য সম্ভব করেছিল।
আমাদের তৃতীয় সহকর্মী ছিলেন চট্টগ্রামের পাকিস্তান অবজারভারের প্রতিনিধি এবং ওয়েভের সংবাদ পরিবেশনায় অপর অন্যতম মূল উদ্যোক্তা ও সংগঠক প্রয়াত ফজলুর রহমান। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের শেষ পার্লাামেন্টে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি মৌলবী ফরিদ আহমেদ, মাহবুবুল হক ও মশিউর রহমান (জাদু মিয়া) এদের মাধ্যমে পশ্চিম-পূর্র্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অর্থনীতিতে ২২-পরিবারের লুন্ঠন সম্পর্কিত তথ্যাদির সিংহভাগই আসে কথিত সৈয়দ নজীউল্লাহ ‘সেল’ এবং আমাদের কিছু অর্থনীতিবিদের প্রচেষ্টায়। ওই সময় অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান সম্পাদিত ‘ফোরাম’ (সাপ্তাহিক) পত্রিকাটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাপ্তাহিক ওয়েভ খুলনার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখে। ওয়েভ তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বাংলা সংস্কৃতির বিরোধী অবস্থানের কঠোর সমালোচনা এবং দেশে ছায়ানট প্রমুখ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়। এর ফলে খুলনায় ‘সন্দীপন’ নামে একটি সার্থক প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও একটি খুলনাভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা সম্ভব হয়।
ওই পর্যায়ে খুলনার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ছিলেন নাজিম মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক, সাধন সরকার, মোস্তাফিজুর রহমান এবং আমিও একজন ছোটখাটো অংশীদার ছিলাম। এখানে সাধন সরকারের একটা অসাধারণ অবদান ছিল। ওই সময়টা ছিল এমন যে পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ ও আমলাদের রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা বোধ ছিল। যে কারণে এখানে আন্দোলন করতে হয়েছিল ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনদের। খুলনায় সন্দীপন গোষ্ঠী ওয়াহিদুল হক সনজীদাদের আন্দোলনের সম্পূরক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। আমার সুহৃদ নাজিম মাহমুদ ‘ওয়েভে’ও কিছুদিন সম্পাদনা করেছিলেন। নাজিম মাহমুদ ছিলেন আব্দুল হাকিম সাহেবের ছেলে, যিনি পূর্ব পাকিস্তান এসেম্বিলিতে স্পিকার ছিলেন এবং অত্যন্ত উচ্চ চিন্তার মানুষ ছিলেন।
সাপ্তাহিক : খান এ সুবরকে তো আপনি প্রথম থেকে দেখেছেন। এক পর্যায়ে আপনাদের সম্পর্ক তিক্ততায় গড়ায়। একটু খোলাসা করে বলবেন কি?
কে. বি. এম. মাহমুদ : ‘অবজারভার’ এর প্রতিনিধি হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, চালনায় স্থায়ী বন্দর করার গুরুত্ব উত্তর বাংলা (উত্তর বাংলা বলতে চূড়ান্ত উত্তর থেকে খুলনা পর্যন্ত ধরা হতো) এটা প্র্রকাশিত হতো। খান এ সবুর তখন অতটা পাদপ্রদীপের আলোয় আসেনি। আমি যখন খুলনা গেলাম তার কিছুদিন পরে তিনি খুলনা শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি হলেন। তিনি নিজে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন তার প্রচার করার জন্য। ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে যা প্রকাশ করা উচিত তা আমরা প্রকাশ করতাম।
আইউব খান বেসামরিক রাজনীতিতে আসার শুরুতেই সবুর খানকে যোগাযোগমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। খুলনায় প্রথম জনসভায় তিনি অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয়ভাবে উসকানিমূলক কথা বললেন। ‘আমি জানি আমাদের সমন্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আইউব খানের সরকারে বিরুদ্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে কিন্তু কেউ যদি মনে করে আমাদের এ সরকার একটি মেয়ে মানুষের সরকার, তা হলে ভুল করবে।’ জনসভায় সবুর খানের এই কথা বলার পরে মাঠের মধ্যে শেম শেম ধুয়ো ধ্বনি উঠল। মনে হয় খান এ সবুর আগে ভাগে আঁচ করেছিলেন যে সভায় কিছু প্রতিবাদ শব্দ শোনা যাবে। পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ করেছিল এবং বেশ কিছু মানুষ আহত হলো। আমি স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন প্রতিবেদন পাঠালাম। পরের দিন তিনি ঢাকা হয়ে পিন্ডি যাবেন। তাকে ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকরা ধরেছে এবং খুলনার ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। তিনি বলেছিলেন কোনো ঘটনা ঘটেনি, সভায় কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। কেউ প্রমাণ দিতে পারলে আমি পদত্যাগ করব। আপনাদের প্রতিনিধি মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। রাতে মূসা ভাই শ্লেষাত্মকভাবে বললেন, আপনার তো চাকরি থাকছে না। আপনি তো গল্প বানিয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। সবুর খানের সভায় কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। আমরা এটাকে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করব, প্রমাণ পাঠান। আমি লেগে পড়লাম। কাগজ খুলনায় আসে দুপুরে, আমি সকালে সোজা গেলাম হাসপাতালে এবং দ্বিতীয় প্রধানকে পেলাম। একটু ভান করে বললাম, সবুর সাহেবের সভায় যারা আহত হয়েছে তাদের চিকিৎসা দেননি। লোকে গিয়ে অভিযোগ করেছে। বলল, কী বলেন স্যার, এই যে আমাদের নথি দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে খাতা খুলে দিয়েছে। পরপর দু পৃষ্ঠা ভর্তি নাম। বুঝিয়ে হাসপাতালের নথিতে আহত ব্যক্তির চিকিৎসা সেবার লেখ্য প্রমাণ নিলাম। আমার যে ছবি তোলা ছিল সেগুলো যতœ করে পরিস্ফটুন করলাম। তৈরি করে ফেললাম সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে। যশোর দুটো উড়ান ছিল। একটা সকালে আর একটা দুপুরে। সকালের উড়ানে খুলনায় এসেছেন মাহমুদ আলী চৌধুরী কাসুরী। পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি। তার সফরসঙ্গী মাহমুদ আলী। মাহমুদ সাহেব অবজারভারে ছিলেন। আমি বললাম জনাব কাসুরী আপনার জরুরি সহায়তা দরকার। কাসুরী বললেন, I know you need my help . I Know I will have to carry a packet from you. আসলে কাগজে সবুর খানের যে দম্ভোক্তি ছাপা হয়েছে তিনি তা অনুপুঙ্খ পড়েছেন। আমি তার হাতে রিপোর্টসহ প্রমাণাদি দিয়ে দিলাম। ঢাকায় যেয়ে নিজের হাতে অবজারভার অফিসে পৌঁছে দিলেন তিনি। পরের দিন অবজারভার পুরো এক পাতাজুড়ে সচিত্র ও বার্তা সম্পাদকের মন্তব্যসহ প্রতিবেদন বেরুল। পরে আমি সবুর খানের বিঘোষিত শত্রুতে পরিণত হলাম।
সাপ্তাহিক : সাপ্তাহিক ওয়েভ-এর সম্পাদক ছিলেন নাজিম মাহমুদ। কিন্তু আপনি সম্পাদক হলেন কেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : নাজিম মাহমুদ ১৯৬৭ পর্যন্ত ছিলেন ওয়েভের সম্পাদক ছিলেন। তিনি মানুষ ভালো; ভালো গাইতেন, নান্দনিক গুণ ছিল। কিন্তু সাংবাদিকতায় যেটা প্রয়োজন সেটা হলো সাহস এবং সততা ও বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা। আমার নিরুপণে তার বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা ও সততা ছিল কিন্তু সাহস ছিল না। বিশেষ করে খুলনার ওয়েভ যখন সংবাদপত্রের সাথে সংগ্রাম করে যাচ্ছে সে সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। সবুর খানের যারা অনুসারী তাদের চোরাচালানি এবং অসদুপায়ে অর্থ উপার্জনের চক্র যেটা সে সম্পর্কে আমরা খবর প্রকাশ করলাম। বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি সচিত্র। তারপরে খান এ সবুর সাহেব ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন এবং আমাদের ওপরে বিরাট বিপদের সম্ভাবনা এল। দুর্নীতি সম্পর্কিত খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে খুলনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল হোসেনের স্ত্রীর সামজিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে একটা খবর প্রকাশ করা হলে ক্ষমতা দেখানোর জন্যে প্রশাসনিক আদেশ বলে তিনি কাগজ বন্ধ করে দেয়।
সে সময় মূসা ভাই আমাকে সাংঘাতিকভাবে সহায়তা দিয়েছেন। ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আমি তখন সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে কতগুলো সাবধানতা অবলম্বন করেছি। যেমন আমার মালিকের স্বার্থকে কখনই সম্পাদকের কর্তব্যের ওপরে অগ্রাধিকার দেইনি।
সাপ্তাহিক : আপনার সঙ্গে খুলনায় কর্মরত কর্নেল শামসের কথা কাটাকাটি হয়েছিল?
কে. বি. এম. মাহমুদ : অগ্নিগর্ভ উনসত্তরে বয়স্ক নেতৃত্বের চেয়ে যুব নেতৃত্ব অনেক বেশি সক্রিয় ছিল। বি এল কলেজে একটা মিছিলে ওপর গুলি হয় যাতে কয়েটা আদম খোয়া যায়। আমার যে একটা রিসিভার ছিল আমার ভাই কিনে দিয়েছিল এটা মূলত রাশিয়ার তৈরি রেডিও। তখন রাশিয়ার প্রযুক্তি অনেক উন্নত ছিল। যা দিয়ে অনেক ফ্রিকুয়েন্সি এবং বার্তা ধরতে পেরেছি। আমি জানতে পারলাম যে ঘটনাটি কি হয়েছে। ওখানে যে অধিনায়ক ছিলেন কর্নেল শামস একজন পাঠান। তার স্ত্রীর সঙ্গে আমার স্ত্রীর সামাজিক সম্পর্ক ছিল। বার্তা ধরে জানতে পারলাম কর্নেল শামস নির্দেশ দিয়েছেন শুট টু কিল। তিনি তখন অবস্থান করছেন খুলনার সার্কিট হাউসে। আমি সার্কিট হাউসে গেলাম আমার এক গোত্রীয় ভাইকে নিয়ে। সেখানে শামসের সঙ্গে একটা বাতচিত হল। বললাম তোমাকে তো সবাই ভালো জানে তুমি পাঠান, পাঞ্জাবি না। তুমি জান ঘটনাটা কি? Peoples are writting your name on paper and spitting on it.
কিউ কিউ। What? Because you have unleashed your army to kill.  বলল নেহি নেহি। পাশেই বসে ছিল ওনার সেকেন্ড ইন কমান্ড কর্নেল হিশাম যিনি পরে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হয়েছিলেন। বলল ওI have handded over the command to Mr. Hisham. So whatever is happening Hisam is responsible. পরিহাস এই যে হিশাম রা করলো না। কিন্তু ফল হলো এই যে ২৭ মার্চ আমার বাড়িতে হামলা হয়; আমার ছাপাখানা গুঁড়িয়ে দেয়। যে টেপগুলো রেখেছিলাম তা নিয়ে যায়। যেটা আমি ঢাকায় বসে ওয়াহিদ ভাইয়ের কাছে আমার বাবার মৃত্যু সংবাদসহ শুনেছি।
সাপ্তাহিক : আপনি মার্চে ঢাকায় কেন এলেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : আমি মুজিব-ইয়াহিয়ার সংলাপ প্রতিবেদন রচনার কাজে ঢাকায় এসেছিলাম। স্ত্রীকে ১০০ টাকা দিয়ে ১২ মার্চে আমি ঢাকা চলে আসি। বললাম, তিন-চারদিন পরে চলে আসব। আমাকে আমার স্ত্রী ২১ তারিখে বললেন, আমাকে ১০০ টাকা দিয়ে গেলে আর ৩/৪ দিন পরে ফিরবা বলে গেলে কিন্তু আমারতো টাকা শেষ। আমি বললাম, একটা কাজ কর মনে হচ্ছে আরও দেরি হবে এবং খুলনায় এখন আর না থেকে বরং কারও কাছ থেকে একটা গাড়ি চেয়ে নিয়ে গোয়ালন্দ চলে আস। ফেরি পার হয়ে আমি তোমাকে আরিচা থেকে নিয়ে নেব। আমার স্ত্রী কিছু টাকা নিলেন। খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলের যিনি সর্বাধিনায়ক ছিলেন তাকে ফোন করলেন এবং গাড়ি দিয়ে সহায়তা চাইলেন এবং তিনি এটুকু করেছিলেন। আমার তখন সাত ছেলে মেয়ে (৪+৩)। একজন সদ্যপ্রসূত বাচ্চাও রয়েছে।
সাপ্তাহিক : যশোর জাগরণ যেটা মার্চে হয়েছিল সে সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : যশোরে যেটা শুরু হয়েছিল ২৭ মার্চ ১৯৭১। বিমানবন্দরে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ছিল। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস যোগদান করে। ২৭ তারিখ থেকে ১ এপ্রিল তারা যশোরকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখে। তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মরক্ষা করেছিল এবং সেনানিবাসের মধ্য থেকে বের হয়নি। আমাদের যশোরের বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে ছিল ইপিআর ক্যাম্প। আবার বাবা এবং দু ভাই ইপিআর ক্যাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করেছিল এবং আমাদের বাড়ি থেকে ইপিআর ক্যাম্পে খাবার সরবরাহ করা হতো। সে এক বিশাল গণপ্রতিরোধ। এবং ১ এপ্রিলের পরে যখন পকিস্তানি সৈনিকেরা নিজেদেরকে পুনর্সংগঠিত করে পুনর্দখলের জন্য হামলা করে। তারা শেলিং করলো বিভিন্ন্ জায়গায়। এর মধ্যে ইপিআর ক্যাম্প ছিল । দুই তারিখে মোটামুটি তারা সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে যশোর শহরে ঢুকল এবং সেখানে একটা গণহত্যা করেছে। আমি নিশ্চিত আমার বাবা ও দু ভাই ওদের বিশেষ করে যারা সাচ্চা পাকিস্তানি পরিবার তাদের চক্ষুশূল হয়েছিল। আমাদের পাশের বাড়ির শামসুর রহমান একজন আইনজীবী সারা জীবন আমাদের সাথে শত্রুতা করেছেন। মুসলিম লীগার ছিলেন। তিনি এই বাছাই হত্যাকাণ্ডের খোজারু।
সাপ্তাহিক : আপনি তো ২৫ মার্চে ঢাকায়? অবরুদ্ধ ঢাকা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : ২৫ মার্চ সম্ভবত শুক্রবার ছিল। ২৭ তারিখ অল্পক্ষণের জন্যে সান্ধ্য আইন তোলা হয়। আমি ক্যামেরা নিয়ে ঢাকা হলে গেলাম। পরে শহীদ মিনারে গেলাম। শহীদ মিনার পুরোটা ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি ইকবাল হলে গেলাম যা পরে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল হয়েছে। সেখান থেকে আমি প্রেসক্লাবের দিকে গেছি। মূসা ভাই আমার হাতে ক্যামেরা দেখে রাগারাগি করেছিলেন। প্রেস ক্লাবে আতাউর রহমান খান ছিলেন। যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলছিলেন, ‘আচ্ছা বলতো কোথায় যাওয়া যায়, কোন জায়গাটা নিরাপদ।’
 আমি সান্ধ্য আইনের পাস নিতে বেরুলাম। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লিয়াজোঁ অফিসার ছিলেন মেজর সিদ্দিক সালিক, তার সাথে আমার ভালো পরিচয় ছিল। গিয়ে দেখলাম তিনি অফিসে নাই। ওর স্টাফ বলেছে ও তো আভি নিক্যালি গ্যায়া। কোথায় গেলেন। কোথাকার একটা লোকেশনের কথা যেন বললেন। ও যে স্পটের কথা বললো সেখানেও গেলাম। সেখানেও গিয়ে শুনি আভি আভি নিক্যাল গ্যায়া। তখন আমার ভেতরকার প্রবৃত্তি বলছে আমার আর মেজর সালেকের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। আমি বুঝতে পেরেছি যে মেজর সালেক তখন তার সমস্ত নেটওয়ার্কে আমার সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছে। খবর দিয়েছে যে, কে. বি. এম. মাহমুদ খুলনা থেকে পালিয়েছে।
এর পরে ২৮ এপ্রিলে আমি খবর পেলাম, আমার কাছে রিসিভার ছিল। আমি একটা মেসেজ পেলাম। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার যত আসামি ছিল তাদের সবাইকে গ্রেফতার কর। আমার জীবনের ঘনিষ্ঠতম মানুষ ছিলেন রুহুল কুদ্দুস সাহেব। ছয় দফা প্রণয়নের হোতা ছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে তিনি মুখ্য সচিব হয়েছিলেন। তিনি ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডে ২০ নম্বর বাসায় থাকেতেন। ২৫ এপ্রিল তারিখে আমি তার বাসায় পৌঁছুলাম এবং বললাম আপনাকে সরে যেতে হবে। বললাম এই এই ঘটনা। আগরতলা মমলায় যারা জড়িত আছেন তারা সরে যান। খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমরা। সিদ্ধান্ত হল পারষ্পরিক। ২৭ তারিখ রাতে আমি স্ত্রীকে নিয়ে ২০ নম্বর রোডে চলে যাবো। আমি ও আমার স্ত্রী ওখানে থাকবেও তিনি সরে যাবেন। এই সিদ্ধান্ত হল ২৬ এপ্রিল তারিখে সন্ধ্যায়। ২৭ তারিখে আমি মিটফোর্ড রোডে গেলাম। ২৭ নম্বর রোডে আমার শ্বশুর বাড়ি ছিল, শাশুড়িকে বললাম, আমি ও আমার স্ত্রী (যার নাম ছবি) আমরা ২০ নম্বর রোডে থাকব। রুহুল কদ্দুস ভাই টাঙ্গাইলে কিছু দিন থেকে প্রবাসী সরকারের কাছে পৌঁছেছিলেন।
সাপ্তাহিক : আপনারতো তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে একটি আস্থার সম্পর্ক ছিল। তার সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
কে. বি. এম. মাহমুদ : তাজউদ্দীন আহমদ একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানুষ ছিলেন। খুব একটা চালাক রাজনীতিক ছিলেন না। পরিশুদ্ধ মানুষ। তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিনিয়োগ নয়। এই একটাই মানুষ ছিলেন খাঁটি মানুষ। হৃদয়ে বাংলাদেশ। মানুষই ছিলেন। যিনি আক্ষেপ করে বলতেন, আমার মুক্তিযুদ্ধে মারা যাওয়া উচিত ছিল। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম না। তার কাজের জন্য আমাকে খুঁজেছিলেন। এই সময় এপ্রিলের শেষের দিকে একটা খবর পেলাম যে আমাকে মুজিবনগর সরকারে প্রয়োজন আছে। তাজউদ্দীন সাহেব তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। ড. কামাল হোসেন আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। বাকি আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কেজো সম্পর্ক ছিল। আমার কাজের মাধ্যমে জানতেন।
এর আগে আমার কাছে একটা বার্তা এসেছে আমি নিজে একটা প্রচেষ্টা নিয়েছিলাম ভারতে যাওয়ার। কর্নেল নুরুজ্জামানের মেয়ে লুবনা, ওরা যে কাফেলায় গেছে সেখানে ওয়াহিদুল হকের যাওয়ার কথা। সেখানে শাহীন সামাদও ছিল। তখনও ও বেনুর বউ হয়নি। ইডেনের পিছন থেকে রওনা হল। ওখানে যেয়ে দেখলাম লুবনা বোরখা পরেছে ঠিকই কিন্তু যে জুতা পরে আছে তাতে বিপদের সম্ভাবনা আছে। জুতা দেখে বুঝে যাবে যে ঠিক বোরখাধারী না। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ধরা পড়েছিল লুৎফার জুতার জন্য। আমি তখন ওয়াহিদ ভাইকে বললাম, আমি যাব না। কারণ আমি ধরা পড়তে রাজি না। বলে আমি ওখান থেকে ভোর বেলায় চলে এলাম।
আমি আলী তারেককে তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে পাঠালাম। যেদিন যাবে আমি ওকে গাড়িতে করে নিয়ে ডেমরা নদীর ফেরি পার করে দিলাম। ওখানে গিয়ে আমার সান গ্লাসটা খুলে দিয়ে বললাম, প্রখর রৌদ্রের সময় এটা পরে যাও। তাকে বললাম, ভারতে তুমি পৌঁছেছ কিনা তুমি এম আর আখতার মুকলকে গিয়ে বলবে যে কোনো একদিন চরমপত্র শুরু করবে এই বাক্য দিয়ে ‘আউক্যা- পাকি সেনারা আর ক্যান্টমেন্ট থেকে বেরুতে সাহস করছে না। তারা বিচ্ছুর ভয়ে ক্যান্টমেন্টের মধ্যে রয়ে গেছে।’ আমি চরমপত্র তো রোজ শুনি। যেদিন এই কথা দিয়ে চরমপত্র শুরু হবে তখন বুঝব যে ও পৌঁছে গ্যাছে। গেরিলা বুদ্ধি। তারেককে আরও বললাম, তাজউদ্দীন সাহেব কে বলো যে, আমি বার্তা পেয়েছি। আমি অত্যন্ত খুশি যে তিনি আমাকে আসতে বলেছেন। একটা বিকল্প প্রস্তাব আছে। যদি আমাকে যোগাযোগের মাধ্যমে একটু বলে দেন আমি অবরুদ্ধ ও অধিকৃত অঞ্চলে থেকে বিদেশি যত সাংবাদিক আসবে (আমার প্রচুর বিদেশি সাংবাদিক পরিচিত ছিল), আমি এখান থেকে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় রাখব। যখন প্রয়োজন হবে মুক্তাঞ্চলে নিয়ে গিয়ে ওদের সাক্ষাৎকার নেয়ার ব্যবস্থা করাব। একটা কর্মপরিকল্পনা দিলাম। বললাম, আমাকে একটা যোগাযোগের পথ বলে দিতে হবে। যদি তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন যে পরিমাণ ঝুঁকিই হোক না কেন আমি তা নিতে রাজি আছি।
তাজউদ্দীন সাহেব তারেককে বললেন, ঠিক আছে আপনি বরঞ্চ আমার সঙ্গে থাকেন। আপনি আমার সঙ্গে কাজ করবেন। তারেককে তার প্রেস সচিব করে নিলেন। আমি সময়মতো বার্তা পেলাম আমাকে কী করতে হবে। বহু সাংবাদিক যেমন, Clare Holin Warth, Lorean Jekins, Sydeny Sawanbarg আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সোয়নবার্গসহ সবাইকে আমি নিতে পারি নাই। ক্লেয়ার হলিন ওয়ার্দকে নিতে পেরেছিলাম। এদের জন্যে প্রচুর সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেছিলাম। অধিকৃত এলাকায় তারা যে আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত এটা বিদেশিদের কাছে প্রতীয়মান হওয়ানোর প্রয়োজন ছিল। আমি লরেন জেনিংসকে নিয়ে আব্দুর রব চৌধুরীর সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।
সাপ্তাহিক : মুক্ত বাংলাদেশে আপনি ‘ওয়েভ’ ঢাকা থেকে বের করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সে সময় ভারতের প্রবীণ সাম্যবাদী নেতার সঙ্গে আপনার একটির গুরুত্বপূর্র্ণ কথোপকথন হয়। যদি একটু বিস্তৃত বলেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : সোজা কথা আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করার পরে ফ্রেব্রুয়ারি মাসে সারা পৃথিবী থেকে মানুষ ছুটে এসেছে - যে এখানে এটা কী করে সম্ভব হলো। আমরা জানতাম যে পাকিস্তানের একটা অংশ এটা যেখানে মেরুদণ্ডহীন মানুষ বাস করে। তারা নয় মাসে একটা দেশ কীভাবে স্বাধীন করে ফেলল। সে সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একজন শ্রদ্ধেয় নেতা ডাঙ্গে যিনি মারা গেছেন বাংলাদেশে এসেছিলেন। এবং পূর্বাণী হোটেলে উঠেছিলেন। তখন আমার ‘ওয়েভ’ বাংলাদেশে পুনঃপ্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। আমি দেখলাম ভালো সুযোগ ডাঙ্গে এসেছেন। ওনার একটা সাক্ষাৎকার নিই, যেটা আমার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশ করব। এটা ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। এখন আর এটার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে থাকেনি। তিনি বললেন, তুমি তো একজন সক্রিয় কর্মী। তোমাদের সামনে কী কাজ আছে? এখন তো তোমরা বুদবুদের ওপর ভাসছ। এই করবো আমরা সেই করবো। এটা প্রাসঙ্গিক না। রসিকতা করে উনি প্রশ্ন করলেন, বাংলাদেশ কোন গন্তব্যে যাবে? তামাশা মনে হবে। The projection I am giving you about our future. Man you are seemed to have been amusedby some of my observation. তিনি বললেন, Franklyspeaking Mr. Mahamud you are right. ডাঙ্গেও জানতেন যে Pakistanwas a system exoplitaed by 22 families. বললাম Youlook like amused by some of my comments. বলল In fact I am. তোমাকে বেশি বলব না একটা ছোট্ট কথা বলি। ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছো। আমি তো দেখতে পাচ্ছি আমার অনুমান বলে, তোমরা খুব শিগগিরই ২২০০ বা ২২ হাজার পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হবা। ফেব্রুয়ারির ১০ কি ১১ তারিখে এই কথা বলেছিলেন। এই বিবৃতি দিয়ে তিনি আমার সম্পূর্ণ আশা ও ভবিবষ্যত পরিকল্পনা ভেঙেচুরে দিয়েছিলেন। এই করব, সেই করব সমাজতন্ত্র অর্জন করব। সমাজতন্ত্র অর্জন করবা, না এগুলো পরিবারের প্রভুত্ব চলবে। যার বিরুদ্ধে তোমরা অসহায়ভাবে সংগ্রাম করবা।
সাপ্তাহিক : আপনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল এবং আপনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন সেটার অবশ্য আরেকটি উপ্যাখান। এখন মামলার বিষয়বস্তু বলবেন কি?
কে. বি. এম. মাহমুদ : এটা ‘ওয়েভে’র একটি প্রতিবেদন সংক্রান্ত। সেটা সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি এবং তা নিয়ে সংবাদ ভাষ্য ছিল। যা সেনাবাহিনীর প্রাধান্য পরম্পরার জন্য ক্ষতিকর ছিল। এ জন্যে মামলা হয়েছিল এবং রমনা থানার একজন পুলিশের পরিদর্শক সে একদিন জানিয়েছিল মামলা হয়েছে। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করেছি এবং সে সময় তোয়াব খান সেখানে ছিলেন। এটা অনেক বড় বিষয়। তবে ‘ওয়েভ’ বন্ধ হয়নি।
সাপ্তাহিক : সংকটকালীন আপনি মানুষের ভীরুতা এবং আপসকামিতা দেখেছেন আবার সাহিসিকতাও দেখেছেন। আপনি যদি মূল্যায়ন করেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : যাদের সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন কর্নেল তাহের এবং দ্বিতীয় তাজউদ্দীন আহমদ। 
সাপ্তাহিক : সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে আপনি কাজ করেছেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) বা জাসদ এক সময়ে আমাকে সমজাতে সক্ষম হয়েছিল যে তারা একটা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন করছেন। একটা দৃশ্যমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৭৬ সালের প্রথমার্ধে একটি অভ্যুত্থান হওয়ার কথা। এর চরিত্রটা ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে অগ্রসর হবে। এতে সশ¯্র বিশ্বস্ত অনুচররা এবং সেনাবাহিনীতে জাসদের সশস্ত্র ক্যাডারা অংশ নেবে। গণবাহিনীর আকার বা পরিকল্পনা হয় ১৯৭৩ সালে। এ গণঅভ্যুত্থানের পর একটা মোর্চা সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। যেটাতে জেএসডি কৃষি ও স্বরাষ্ট্র এই দুটো মন্ত্রণালয় নেবে। অন্যান্য প্রগতিশীল উপাদান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ মোর্চা সরকার চালাবে। জেএসডির লক্ষ্য হবে একটি বিশ্বস্ত অনুচর সৃষ্টি করা। যারা চূড়ান্ত একটা আচমকা প্রবল ধাক্কা দেবে তিন চার বছর পর। এটা একটা পরিষ্কার পরিকল্পনা যেটা ১৯৭৩ এর শুরুতে বিশ্বাস করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা ছিল।
জিয়ার সঙ্গে দুটো অধিবেশনে গিয়েছিলাম তার মধ্যে এক বসায় আ স ম আব্দুর রব উপস্থিত ছিলেন এবং আমার সহযোগিতা চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম তোমাদের গন্তব্যস্থল যা সেটা যদি সত্য হয়- আমার ধারণা তাহলে আমরা কোনো একটা জায়গায় আমাদের মধ্যে সংযোগ বিন্দুতে পৌঁছাতে পারব। তোমার গন্তব্য স্থল যদি তুমি যা বলছ তা হয় এবং আমার গন্তব্য স্থল যদি আমি যেটা বলছি তা হয় এবং আমরা এটা ধরে রাখতে পারি। তারপর একটা পর্যায়ে সিরাজ সিকদারের গুপ্ত হত্যারও ছয় সাত মাস আগে। ১৯৭৪ এর শেষ দিকে। সিরাজুল আলম খান আমাকে অনুরোধ করলেন মাহমুদ ভাই আপনার বন্ধু জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একটু আলাপ শুরু করেন। বস্তুনিষ্ঠভাবে জিয়ার সঙ্গে স্বাধীনতার পরে পরিচয় হলেও ওই সময় সেনবাহিনীতে যে প্রধান্যক্রম ছিল তার মধ্যে জিয়ার দুর্নীতি ছিল না। জিয়ার সাথে সম্পর্কের উদ্দেশ্য কী-যদি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে থাকে তাহলে এক সময়ে আমাদের গণবাহিনীতে আসবেন আর যদি সমাজতন্ত্রের শত্রু হন তাহলে তাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। আর যদি নিরপেক্ষ হয় নিরপেক্ষ জায়গায় রেখে দেবো ছোঁবো না। এটাই রণকৌশল ছিল।
সাপ্তাহিক : আপনাকে সত্তরের দশকে জাসদের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ও একজন সক্রিয় সহোযোগী মনে করা হয়। ওই সময় আপনি ঐতিহাসিক কর্নেল তাহের মামলায় একজন আসামিও ছিলেন। পেছনে তাকিয়ে জাসদের উত্থান এবং জাসদ ও কর্নেল তাহেরের ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত করেছে সে সম্পর্কে কি বলবেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : জাসদের ইতিহাস ও বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর তার প্রভাব, বিশেষ করে দেশের বাম রাজনীতিকে জাসদ যেভাবে ভিন্ন খাতে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে সম্ভবত আমাদের স্বাধীনতাত্তোর ইতিহাসে সেটি এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়।
আমার রাজনৈতিক পাঠ শুরু হয় ১৯৫৩ সালে যখন আমার কলেজ জীবন শুরু হয়। কলেজ জীবনে আমি ছাত্রলীগের সদস্য ছিলাম। কিছুটা সেই কারণেই ষাটের দশকের মাঝের দিকে (তখন আমি সাংবাদিক) ছাত্রলীগের নেতা সিরাজুল আলম খানের সাথে পরবর্তীতে যিনি জাসদের কারিগর হন, পরিচয় হয়। সিরাজুলের অসামান্য মেধা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বিশেষভাবে অনুভূত হয় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ৬-দফা ঘোষণা দেওয়ার পর যখন শ্রমিক ফ্রন্টে রাতারাতি বিশেষত তেজগাঁও ও আদমজীতে শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করে সিরাজুল আলম খান শ্রমিক লীগ এবং আওয়ামী লীগের শক্তি বৃদ্ধি করেন।
সাংবাদিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক ব্যক্তির সাথে আমার প্রায়ই আলাপ হতো। দেশকে কীভাবে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্ত করা যাবে এবং কীভাবে মূলত দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের এই ভূখণ্ডটিতে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সম্ভব হবে, এ দুটি প্রশ্ন আমাকে পীড়া দিত। ভৌগোলিক অবস্থান ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় ঐ সময়, ষাটের দশকে, আমার মনে হতো প্রথমে ঔপনিবেশিক শোষণমুক্ত হওয়ার প্রয়োজনটি ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মওলানা ভাসানীর প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু আমাদের কোন সমস্যাটিকে প্রধান বিবেচনা করতে হবে এবং একটা সুষম সমাজব্যবস্থার জন্য জনগণকে কীভাবে সংগঠিত ও পরিচালনা করতে হবে সে প্রশ্নে মওলানা ভাসানীসহ তৎকালীন বাম নেতৃবৃন্দকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়েছে। এমনকি ১৯৬৮-৬৯ এর গণআন্দোলনের সময়ও তাদের ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার’ মতো কথাবার্তা বা সিদ্ধান্তহীনতা লক্ষণীয় ছিল।
ফলে, আমি যদিও নিশ্চিতভাবে যে কোনো একক রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার সিদ্ধান্তে সব সময়ই অটল ছিলাম, তবুও আওয়ামী লীগে ও সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি আমার কাছে ওই সময় তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণয্গ্যো মনে হয়েছিল। একই সময়ে অন্য একটি কারণে সিরাজুল আলম খানের প্রতি গভীরতর আস্থার সূচনা হলো। সিরাজুল আলম খান ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের সময় দেশের ভবিষ্যৎ সমন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে আমাকে বলেছিলেন, (১) বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যার সমাধানের জন্য সমাজতন্ত্র অপরিহার্য এবং (২) প্রয়োজনে আমাদেরকে অস্ত্রের সংগ্রামের পথই বেছে নিতে হবে।
সেই পর্যায়ে তার কথায় মনে হয়েছিল যদিও আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতৃত্ব সমাজতন্ত্রের মতো রেডিক্যাল (Radical) সমাধানের কথা ভাবেন না, তবু অচিরেই বাংলাদেশের আর্থসমাজিক বাস্তবতার বাধ্যবাধকতা এবং সিরাজুল আলম খানের অনুসারী তরুণদের প্রভাবে আওয়ামী লীগকে চূড়ান্ত পর্যায়ে সমাজতন্ত্রের পথ বেছে নিতে হবে।
সবকিছু সেভাবেই এগুচ্ছিলো। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে (Manifesto) প্রথমবারের মতো সমাজতন্ত্র একটি লক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। আমার সাথে সিরাজুল আলম খানের সম্পর্ক এই পর্যায়ে আরও নিবিড় হয়।
একটি তথ্য সর্বজনবিদিত যে ১৯৭১ মার্চ এর প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের যুবশক্তির মধ্যে দুটি ধারা বর্তমান ছিলো। একটি ধারা ছিল নূরে আলম সিদ্দিকী কেন্দ্রিক যাদেরকে Liberal বা মোটামুটিভাবে দক্ষিণপন্থী মনে করা হতো। অন্য ধারাটিকে চিহ্নিত করা হতো তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীল বা Radical Group বলে, যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান এবং সামনে ছিলেন আ স ম রব - প্রমুখ নেতৃত্ব।
সে সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা; বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার পূর্বে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয় আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে সংলাপে যাবে (যা দেশের বৃহত্তর জনমানবের ইচ্ছার পরিপন্থী ছিল)। যার পেছনে আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত নমনীয় ও আপসমুখী কিছু নেতার ও ছাত্রলীগের দক্ষিণপন্থী গ্রুপের প্রভাব ছিল। যদিও অবশেষে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যার পেছনে সিরাজুল আলম খান ও ছাত্রলীগের রেডিকাল অংশের অবদান ছিল।
২৫ মার্চের পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্বর হামলা শুরুর পর প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই সিরাজুল আলম খান সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করেন ঢাকার উপকন্ঠে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে। আমার ব্যক্তিগত তথ্যমতে, স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার পর প্রথম তিন মাস, মোটামুটিভাবে জুন একাত্তর পর্যন্ত সব কিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হওয়ার আরও কিছু পরে যখন বহির্বিশ্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাংলাদেশে সত্যসত্যই একটি সর্বাত্মক সশস্ত্র প্রতিরোধ দানা বেঁধে উঠেছে, তখন থেকেই আমাদের মুক্তি আন্দোলনকে সত্যিকারেরœ পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক শক্তির নানা কৌশল ও চাপের Cross Currents এর সম্মুখীন হতে হলো। তখনই, সিরাজুল আলম খান কেন্দ্রিক যুব ধারাটির মধ্যে নতুন একটি Equation এর অনুপ্রবেশ। নতুন কিছু সমীকরণ এবং “ধারার মধ্যে ধারার” সূত্রপাত হয়েছিল যার দায়িত্ব জাসদ নেতৃত্বের বিশেষত একজনেরই ছিলেন, জাসদের পরবর্তীকালের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
এখানে প্রাসঙ্গিক একটা ঘটনা উল্লেখ করব। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে বিখ্যাত আমেরিকান অনুসন্ধানী রিপোর্টার জ্যাক এন্ডারসন (Jack N. Anderson)-এর সাথে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। জ্যাক এন্ডারসন ওই সময়ে নিক্সন প্রশাসন ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ সংক্রান্ত একটি গোপন চুক্তির বিষয়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। পরবর্তীতে জ্যাক ১৯৭২ সালে তার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সম্পর্কিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পুলিৎজার (Pulitzer) পুরস্কারে ভূষিত হন।
জ্যাক আগস্ট মাসের শেষের দিকে তখনকার ঢাকা ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলের বারে ১৯৭১ এর যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের গেরিলারা যুদ্ধে ভালোই অগ্রগতি করছে।’ সাথে সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সংবেদনশীল এই গবেষণাকারী সাংবাদিক এও বললেন, ‘তবে একটা দুশ্চিন্তার ব্যাপার আছে। আমার কাছে তথ্য আছে যে নিক্সন প্রশাসন তোমাদের বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও গেরিলা নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ স্থ্াপন করতে সক্ষম হয়েছে যার পরিণতি কী হবে তা ঠিক এই মুহূর্তে আন্দাজ করা যায় না।’ জ্যাকের এই সতর্কবাণী শোনার পর আমার তাৎক্ষণিকভাবে মোশতাকের কথা মনে হলেও তখন কিন্তু ঘুণাক্ষরেও সিরাজুল আলম খান বা তখনকার ছাত্রলীগ (পরে জাসদ) বা কোনো যুব নেতৃত্বের নাম আমার সন্দেহের আবর্তে আসেনি। যদিও অনেক পরে বোঝা গিয়েছিল নিক্সন প্রশাসনের অনুপ্রবেশের মাত্রা কি ছিল।
জ্যাক এন্ডারসন তার মিশনে কতখানি সাফল্য লাভ করেছিলেন তার আরেকটা উদাহরণ পাই অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আমাদের আরেক সাক্ষাতে। আমার আ্রয়োজনে সেদিন সবেমাত্র অবরুদ্ধ ঢাকায় একজন বড় আমলার সাথে জ্যাকের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করে হোটেলে ফিরে গেছি। জ্যাক সেই মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক অবস্থান ও অগ্রগতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে তোমাদের যুদ্ধের সাফল্য পেতে খুব বেশি দেরি নেই (তার ভাষায় বড় জোর তখন থেকে তিন বা চার মাস)। তবে একটা উদ্বেগজনক তথ্য আছে যাতে মনে হচ্ছে স্বাধীনতা হয়ত তোমরা পাবে কিন্তু তোমাদের মতো অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তি সেটা দেখতে পাবে না। (Manybright fellows like you may not live to see it!)। একটু সাবধান থেকো।’ আমি কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে কারণটা জানতে চাইলাম কিন্তু জ্যাক এর বেশি বলতে চাইলেন বা পারলেন না।
অনেক পরে, ১৩ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর মদদপুষ্ট জামায়াত বদর বাহিনী কর্তৃক নৃশংস বুদ্ধিজীবী নিধন ঘটনাটির পর, জ্যাকের মন্তব্যের অর্থ বুঝতে পেরেছিলাম। পরাজয় নিশ্চিত জেনে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা যে অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল তা জ্যাক এন্ডারসনের অনুসন্ধানী চেষ্টায় ধরা পড়ে গিয়েছিল। সম্ভবত জ্যাক পরিকল্পনার মৌলিক পরিকল্পনার কথা জানতেন কিন্তু আমার সাথে আলাপের সময় বিস্তারিত কিছু বলার মতো তথ্য তার কাছে ছিল না।
জ্যাক এন্ডারসন পরে ১৯৭৩ সালে AndersonPapers নামে একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন যাতে ’৭১ পাক-ভারত যুদ্ধ ছাড়াও তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন ফ্রন্টে নিক্সন প্রশাসনে গোপন কার্যক্রমের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল, যা আমার ডঅঠঊ পত্রিকায় ধারাবািহকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে যুদ্ধকালীন ইতিহাসের কতগুলো ঘটনা উল্লেখযোগ্য :
এক. ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন যা ভারতের একটি বিশেষ সামরিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় ও তত্ত্বাবধানে সংগঠিত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য বা রাজনৈতিক লক্ষ্য তাজউদ্দীন বা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কাছে স্পষ্ট ছিল না। দুই. ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিক্স্রন-কিসিঞ্জার Axis of Evil এর পরাজয়; যার পূর্বাভাষে যুক্তরাষ্ট্র ও নিক্সন প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের পরাজয়ের বিপক্ষে একটি Contingency Plan এবং প্রতিশোধ এর পথ খুঁজতে। প্রসঙ্গত উল্লেযোগ্য যে, নিক্সন প্রশাসন যা হেনরী কিসিঞ্জারের মতো সুচতুর ও ঝানু Asset সমৃদ্ধ ছিল, ঐ সময়ে অন্য কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো অপদস্থ (Humiliated) হয়নি। অতএব বাংলাদেশের পরাজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে Retaliation এর পথ খুঁজে বের করা নিক্সন প্রশাসনের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল, বিশেষত উপমহাদেশে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ ও তংকালীন মার্কিন-সোভিয়েট Cold War-এর স্বার্থে।
এ লগ্নেই নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে সুচতুর হেনরি কিসিঞ্জার এমন একটি দুষ্ট নক্ষত্রের অনুপ্রেবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন যার অনেক উদাহরণ এর আগে লাতিন আমেরিকা ও পৃথিবীর অন্যান্য অংশের ইতিহাসে পাওয়া যাবে; এবং যার পরিণতিতে ১৯৭১ যুদ্ধে আমাদের বৃহত্তম পরাশক্তি পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় জীবনে একটি Successful Retaliation ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।
যুদ্ধের সময় মুজিব নগরে মোশতাক -তাহের ঠাকুর- মাহবুব আলম চাষী প্রমুখ ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এটা মনে করা নির্বুদ্ধিতার সামিল হবে যে ওই সময় বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধে সব ধরনের ষড়যন্ত্র, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো সম্বন্ধে আমাদের সম্যক ধারণা ছিল বা সত্য কথা বলতে কি, সে সম্পর্কে আজও আমাদের কাছে এখনও কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র আছে! আসলে জাতি হিসেবে স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে আজও বাংলাদেশ যে কোনো বৃহৎ শক্তির সাথে এসব ব্যাপারে সামর্থ্যে ও মোকাবেলার প্রশ্নে এখনও সেই ‘সিংহ ও মেষশাবকের’ সমীকরণের পর্যায়েই আছে।
আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের অবিশ্বাস্য সাফল্যে হেনরি কিসিঞ্জার তাদের কন্ট্রোল রুমে নিশ্চিতভাবে অনুভব করেছিলেন যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে এক অত্যন্ত শক্তিশালী তরুণ প্রজন্মকে জন্ম দিয়েছে তাকে যদি ধ্বংস না করা যায় তা হলে এমন এক প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটতে পারে যা পুরো উপমহাদেশেকে গ্রাস করবে এবং Cold War context-এ এমন একটি বিপজ্জনক ঘটনা হবে যা আমরিকা ১৯৭০’এর ক্রান্তিকালে মোটেই নিতে পারত না।
তখন সত্যিকার অর্থে অবস্থা দাঁড়াল, আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে তো অস্ত্রের অসম সংগ্রামে অবিশ্বাস্য কম সময়ে জয়ী হলাম কিন্তু ততক্ষণে অন্য এক অদৃশ্য যুদ্ধের কৌশল আমাদেরকে গ্রাস করলো, যার অভিজ্ঞতা আমাদের তরুণ প্রজন্মের যোদ্ধাদের এমনকি জাতীয় নেতৃত্বেরও ছিল না। আমরা যখন মাঠে যুদ্ধ জয়ের পর মুক্ত বাংলাদেশে আনন্দে মত্ত ছিলাম, ততক্ষণে পৃথিবীর অনেক অন্য ফ্রন্টের মতো কিসিঞ্জার সন্তর্পণে এবং সুকৌশলে আমাদের যুব শক্তির মধ্যে অনুপ্রবেশে সক্ষম হয়েছেন।
এরই বিভিন্ন form বা রূপের মধ্যে একটি হচ্ছে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আত্মপ্রকাশ। আত্মপ্রকাশের ধরন ও পন্থা থেকে শুরু করে আমাদের জাতীয় জীবনে শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জাসদের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে এ রূঢ় বাস্তবতার trace খুঁজে পাওয়া যাবে।
আমার স্বীকার করতে সংকোচ নেই যে, স্বাধীনতা-পূর্বকালে স্থাপিত বিশ্বাস ও সম্পর্কের ভিত্তিতে জাতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লগ্ন ও ধাপে (Stage and Phase) জাসদের বিশেষ কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এর পেছেনে যে দৃঢ় বিশ্বাস কাজ করেছিল, তা হচ্ছে জাসদ এবং সিরাজুল আলম খান এই দুই সত্তাই সমাজতন্ত্রের পথে বিশ্বাসী। কিন্তু আজ যখন জাসদ বহুবিভক্ত হয়ে এবং নিশ্চিহ্ন (Decimated) হয়ে প্রায় অস্তিত্ববিহীন অবস্থায় গেছে এবং দেশে পুঁজিবাদ এবং বাজার অর্থনীতি এক সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে দেশের আর্থ সামজিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে, যে ক্ষেত্রে জাসদের কোনো অংশেরই কোনো প্রতিবাদী ভূমিকা বা কর্মসূচিতে সমাজতন্ত্রের নাম নেই, তখন জাসদ সম্বন্ধে আমার পুরনো চিন্তার বা অবস্থানের কোনো স্থান নাই। বরং মনে করি জাতির ভবিষ্যৎ জীবনে ত্রুটি সংশোধনের প্রয়োজনে জাসদের পিছনের ইতিহাস বিস্তৃত ব্যাখ্যার ও সবার অবগতির প্রয়োজন আছে। এ ব্যাপারে আমার নিচের বর্ণিত সারাংশটি সম্ভবত গ্রহণযোগ্য Margin of Error এর মধ্যেই থাকবে:
জাসদের মূলধারার নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের সিংহভাগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে শতভাগ সততা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ চলাকালে বা যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু পরে ওই নেতৃত্বের একজন বিশেষ ব্যক্তি, যিনি ঐ সংগঠনকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন, তার সাথে হেনরি কিসিঞ্জার network এর একটা ফবধষ হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল :
এক. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সৃষ্ট প্রচণ্ড যুবশক্তি যাদের সাংগঠনিক শক্তি ও বিপ্লবী প্রেরণা এক আকাশচুম্বী মাত্রা লাভ করেছিল, তাদেরকে কৌশলে করায়ত্ত করা এবং সঠিক সময়ে ধ্বংস করা বা সাগরে নিক্ষেপ করা;
দুই. উক্ত লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ স্লোগানটিকে উচ্চতম স্বরে ব্যবহার করে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের অন্য বাম শক্তিগুলোকে ও প্রগতিশীল মেধাকে সংগঠিত হতে না দেয়া;
তিন. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যিনি স্বাধীনতা পূর্বকালে একজন লিবারেল ডেমোক্রেট বলে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু ১৯৭১-এ অস্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি যাতে রেডিক্যাল চিন্তায় রূপান্তরিত না হন (যা আশা করা অস্বাভাবিক ছিল না), সেজন্য আওয়ামী লীগের যুবশক্তি অর্থাৎ ছাত্রলীগের মধ্যে জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে একটা মিলিট্যান্টবিরোধী ধারার সৃষ্টি করা, যাতে বঙ্গবন্ধুকে আরও দক্ষিণপন্থী পথে ঠেলে দেওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য জাসদের গণবাহিনী সংগঠন সৃষ্টি করা, তাই বঙ্গবন্ধু সরকারকে ঠেলে দেওয়া এমন একটি সংঘাতের দিকে যাতে মুজিব সরকারের দৃষ্টি বাংলাদেশের চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পরিবর্তে রেডিক্যাল অথচ দেশপ্রেমিক শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় ।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর সিরাজুল আলম খানের নিয়ন্ত্রণে জাসদের চরিত্র ক্রমে পরিষ্কার ও প্রকাশিত হতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাসদের কর্মকাণ্ড স্তিমিত হতে থাকে, একমাত্র গণবাহিনী সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম যা লোকচক্ষুর আড়ালে করা হতো তা ছাড়া।
শেখ মুজিবের হত্যার পর জাসদ রাতারাতি তার স্লোগান ‘জয় বাংলা’ থেকে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ এ রূপান্তরিত করে, যা মোশতাকের Work Book থেকে নেয়া।
ঠিক ওই সময়েই (১৫ আগস্টের পর) সিরাজুল আলম খান আমাকে কতগুলো ফোরাম গড়ে তোলার ব্যাপারে সাহায্য চেয়েছিলেন। তিনি এই প্রসঙ্গে, অন্যদের মধ্যে সফিউল আজম, যিনি একজন চিহ্নিত জামায়াতি ও দক্ষিণপন্থী আমলা ছিলেন এবং ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন যিনি মোশতাকের একজন ঘনিষ্ঠতম সহচর এবং অবশ্যই দক্ষিণপন্থি ছিলেন, এঁদেরকে যোগাযোগ এবং অন্তর্ভুক্ত করতে অনুরোধ করেন।
এর কিছু পরে, ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ সালের অভিযানটির পর, যেটিকে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান বলে চিহ্নিত করা হয়, আমি সিরাজুল আলম খানকে অনুরোধ করেছিলাম খালেদ মোশাররফ ও শাফায়েত জামিলÑ যারা মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক ছিলেন এবং যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভবন থেকে কর্নেল রশিদ, মেজর ডালিম, মেজর নূর, কর্নেল ফারক গং-এর নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা এবং সামরিক বাহিনীতে Chain of Command পূর্ণ বহাল করা। আমি বলেছিলাম ওই মুহূর্তে, বিশেষত জেলখানায় মোশতাক কর্তৃক চার নেতার মর্মান্তিক ও নারকীয় হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে খালেদ মোশাররফ ও সাফায়েত জামিলের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বৃহত্তর দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য ও একটি রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করা। সিরাজুল আলম খান আমার সেই পরামর্শ তো গ্রহণ করেনইনি বরং এরপর প্রায় ৩৬ ঘণ্টা আমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছিলেন, যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় খালেদ মোশাররফ ও সাফায়েত জামিলের সাথে কোনো রাজনৈতিক বোঝাপড়া বা সমন্বয় করা সিরাজুল আলম খানের এজেন্ডাবহির্ভূত ছিল।
অতঃপর ৭ নভেম্বরে অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে সিরাজুল আলম খান আমাকে ও কর্নেল তাহেরকে অভ্যুত্থান সম্পর্কিত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনামূলক যে চিত্র দিয়েছিলেন, যথাসময়ে তা বৃহদাংশেই ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছিল। বরং দেখা গেল, অভ্যুত্থানের পর জাসদের ক্যাডারদের তুলনায় সামরিক বাহিনীর মোশতাক সমর্থক কিছু ঞধংশ ঋড়ৎপব মাঠে অনেক বেশি সক্রিয় ছিল, যারা খালেদ মোশাররফ ও অন্য মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। অথচ ওই সময়ে অত্যন্ত সুকৌশলে এই গুজবটি ছড়ানো হয়েছিল যে কর্নেল তাহেরের নির্দেশেই মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে। এটা ছিল এক ঢিলে দুই পাখি মারার একটি সার্থক চক্রান্ত। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদেরকে হত্যা করা হলো এবং দায়ভারও বর্তানো হলো এমন একজনের ঘাড়ে, যিনি শুধু মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না বরং একজন বিপ্লবীও ছিলেন।
 ৭ নভেম্বরে সকালে অভ্যুত্থানের পরে, অপ্রত্যাশিতভাবে মোশতাকের ঞধংশ ঋড়ৎপব রাস্তায় এমনভাবে সক্রিয় ছিল যা থেকে আমার মনে হয়েছে জাসদের ৭ নভেম্বরের পরিকল্পনা সম্পর্কে মোশতাক জ্ঞাত ছিলেন।
বস্তুত, অবস্থাটি এমন এক পর্যায়ে গিয়েছিল যে সকাল পৌনে সাতটার দিকে আমার একটি অনুরোধে কর্নেল তাহের তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হস্তক্ষেপ না করলে সকাল সাঁড়ে সাতটা নাগাদ খন্দকার মোশতাক রেডিও স্টেশন নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একটি ঘোষণা দিতে সমর্থ হতেন। মোশতাক রেডিও স্টেশনে মাহাবুব আলম চাষী ও সামরিক টাস্কফোর্স পরিবৃত অবস্থায় তার ঘোষণাটির পাণ্ডুলিপি প্রায় সমাপ্তই করেছিলেন যে সময় কর্নেল তাহের তাকে একক প্রচেষ্টায় ঘোষণালিপি প্রস্তুত প্রত্যাহার ও রেডিও স্টেশন ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এ ঘটনাটি না ঘটলে ৭ নভেম্বর অভুত্থ্যান-পরবর্তী ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো, ঠিক যেভাবে ১৫ আগস্টের পর মোশতাককে বঙ্গভবনে দেখা গিয়েছিল।
এর অনেক পরে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কারাগারে যখন আমি কর্নেল তাহেরের সাথে বিচারাধীন তখন তার সাথে আমার একান্তে কিছু কথা হয়। তার কতগুলো মন্তব্যে আমার মনে হয়েছিল জেলে যাওয়ার পর রিঃয যরহফংরমযঃ তিনি অনুভব করেছিলেন ৭ নভেম্বর আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দ্বারা যা ঘটানো হয়েছিল তার টষঃরসধঃব উদ্দেশ্য ছিল আমাদের অজান্তে একটি প্রতিবিপ্লব ঘটানো।
সতীর্থদের জন্য তাহের অত্যন্ত মিষ্টভাষী এবং বিনয়ী মানুষ ছিলেন, সতীর্থদের সমালোচনা করতে সাধারণত পছন্দ করতেন না। কিন্তু প্রায় স্পষ্টভাবে তিনি আমাকে যা বলেছিলেন তা হলো, ইতিহাস যাতে ৭ নভেম্বরকে প্রতিবিপ্লব বলে চিহ্নিত না করে তার জন্য একটা কিছু করতে হবে। আমার বিশ্বাস নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি সে কর্তব্যটি পালন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আমাদের একটি কথোপকথন ছিল এমন:
কর্নেল তাহের court proceedings-এর শুরুতে একদিন আমার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় জিজ্ঞেসা করলেন; Mr. Mahmoud, what are the chances that (our) 7th November would go down in the history as a Counter- Revolution ?
আমি বলেছিলাম : ‘In fact, because of the outcome as it stands today (June, 1976), there is a good possibility that it will.’
কর্নেল তাহের কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর মন্তব্য করেছিলেন, Is there a way we can prevent it from happening? আমি তাৎক্ষণিকভাবে কী উত্তর দিতে পারি তা বুঝতে পারিনি। চুপ করে ছিলাম।
কর্নেল তাহেরও চুপ ছিলেন বেশ কয়েক মুহূর্ত, কিন্তু কি যেন গভীরভাবে ভাবছিলেন। প্রায় তিন মিনিট পরে একটা লম্বা শ^াস ত্যাগ করলেন, তারপর মাথা নিচু করে দৃঢ়স্বরে বললেন: ‘I am going to do something about it’
তখন বুঝতে পারিনি তাহের কী ভাবছিলেন বা ‘Do something’ বলে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। অবশ্য পরবর্তী কয়েক দিনের কোর্ট প্রসিডিংস-এ তাহেরের দৃঢ় অবস্থান ক্রমশই পরিষ্কার হয়ে উঠছিল, তাহের ফাঁসির কাঠগড়ায় যাবার জন্য যে প্রস্তুত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তা ক্রমে পরিষ্কার হয়ে উঠল। যাতে তার জীবনের বিনিময়েও অন্তত ৭ নভেম্বরের ‘Counter–Revolution’ চরিত্রটি কিছু পরিমাণে হলেও মুছে ফেলা যায়।
তাহের তাঁর জবানবন্দিতে জিয়াউর রহমান সম্বন্ধে মন্তব্য করতে যেয়ে বলেছিলেন : ‘There is only one parallel in our history of the betrayal (by Ziaur Rahman), was that (the betrayal) of Mir Zafar in the battle of Palassy, which put us in the bondage for two hundred years under the British’
৭ নভেম্বর আমরা কি ঘটাতে যাচ্ছি তার পূর্ণ রাজনৈতিক উপলব্ধি কর্নেল তাহেরের ছিল না এবং অবশ্যই তা মার্জনীয়। কারণ তিনি ছিলেন একজন কমান্ডো সৈনিক এবং গণবাহিনীপ্রধান। তাকে যেটা করতে বলা হয়েছিল তিনি সেটাই করেছিলেন। রাজনৈতিক Consequence কী হবে, উদ্দেশ্য কী, একমাত্র ৭ নভেম্বরে আগে জাসদের মূল নিয়ন্ত্রক সিরাজুল আলম খানই জানতেন। কর্নেল তাহের বা আমাকে, এমনকি সম্ভবত জাসদের বৃহত্তর অংশকে তা নির্ণয় করতে সময় লেগেছে, অনেক মূল্য দিয়ে। আমার বক্তব্যটা এই বলে শেষ করবো যে ...... যখন পিছনে তাকিয়ে দেখি ..... অসংখ্য তরুণ activists ও গণবাহিণীর সৈনিক সদস্যদের কথা মনে পড়ে যাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। প্রথম আমলে রক্ষীবাহিনীর হাতে অথবা পরে জিয়াউর রহমানের সামরিক বাহিনীর হাতে তারা নিহত হয়েছিলেন, নিজেদেরকে উৎসর্গিত করেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের পতাকা সমুন্নত রাখতে।
অবিশ্বাস্য কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে একটি যুবশক্তির উদ্ভব হয়েছিল- যারা ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। যারা তাদের শ্রেণি চরিত্র ভুলে সংগঠিত হয়েছিলেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এদেশে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে। ওই সময় পৃথিবীর কোনো দেশেই এত অল্প সময়ে এই মাপে ও কলেবরে কোনো বিপ্লবী শক্তির উত্থান হয়নি, যা বাংলাদেশে সম্ভব হয়েছিল, কারণ আমাদের তরুণরা কোনো আদর্শের সন্ধান পেলে তার জন্যে মরতে ভয় পায় না।
দুর্ভাগ্য এই যে, বাংলাদেশের এই অবিশ্বাস্য উত্থানের যে কারিগর ও রূপকার ব্যক্তিটি, তিনিই আমাদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে পর্দার অন্তরালে এক নীলনকশার কাছে আত্মসমর্পণ করে ছিলেন। যার দায় মেটাতে অবশেষে নিজেই যবনিকা টানেন বাংলাদেশের প্রথম প্রগতিশীল যুব আন্দোলনের, সেই নীলনকশার Charted Course অনুযায়ী। সফলভাবে নিক্ষেপ করেন এক প্রজন্মের পুরো যুবশক্তিকে বঙ্গোপসাগরে যার সাথে তুলনীয় হ্যামিলনের বংশীবাদকের সেই কাহিনিটি।
সাপ্তাহিক : কীভাবে সিরাজুল আলম খান বাংলাদেশের রাজনীতিতে চূড়ান্তভাবে যেটা অর্জন করতে চেয়েছিলেন সেটা অর্জন করতে পেরেছিলেন, এ সম্বন্ধে আপনার বক্তব্য?
কে. বি. এম. মাহমুদ : সিরাজুল আলম খান যে ক্যাডারদের সংগঠিত করেছিলেন তাদের পূর্ণ ও অবিচল সমর্থন ও আস্থা তিনি ১৯৭১ সালের আগে থেকেই অর্জন করেছিলেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের দ্বিতীয় সারির নেতাদের ওপরও তার নিয়ন্ত্রণ একই রকম ছিল। সিরাজুল আলম খান দলের অন্যান্য সম্পদ বা সহকর্মীদের, যেমন প্রসিদ্ধ অর্থনীতিবীদ ড. আখলাকুর রহমান ও আমার মতো ছোটখাট ব্যক্তি, যারা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের লক্ষ্যে বিশ^াস করতেন, তাদের আস্থাও অর্জন করেছিলেন।
সাপ্তাহিক : আপনিতো জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ৭ নভেম্বরে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এখনো সম্পূর্ণভাবে রহস্যাবৃত। এ রহস্য সম্পর্কে যদি আলোকপাত করেন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : এটা আমি আগে বলেছি, বিশেষত জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি। পরবর্তী সময়টাতে আমাদের যেটা শর্তাবলি ছিল। সেটা আমরা নিবিড়ভাবে আবিষ্কার করেছি। ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলেছি। জানার ক্ষমতা বা পরিধি একেবারে খোলা। ওনার একটা চরিত্র ছিল। তিনি অত্যন্ত চালাক ও কেস্তাদুরস্ত ছিলেন। যেকোনে প্রশ্নের জবাব একটু অদ্ভুত উপায়ে দিতে পারতেন। সমাজতন্ত্রের ব্যাপরে যে সব গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছিলাম, কিছু নথিপত্র দিয়েছিলাম। বললেন তার কোনো আপত্তি নেই। তবে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দিতেন। আমাদের সঙ্গে মীরজাফরী করেছেন। আমার ওপর মধুর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে আমার ভাই আলী তারেকে বিএনপির মনোয়ন দিয়েছিলেন যশোর-১ আসন থেকে। যেটা পারিবারিকভাবে আমরা কখনই পছন্দ করিনি। জিয়াউর রহমান কৌতুক করে এবং হাস্যরসের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিতেন। পরে বুঝেছি গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করার জন্যে তার এই মানস কাঠামো তৈরি হয়েছিল। জিয়াউর রহমান অনেক রাজনৈতিক কথা বলতেন যেটাতে বোঝা যেত পড়াশুনা করেছেন। চীন সম্বন্ধে মূল্যায়ন করেছিলেন। যা মনে করা হয় জিয়া তার থেকে অনেক বেশি পড়াশুনা করেছেন।
সাপ্তাহিক : ৭ নভেম্বরে এই অসম্পূর্ণ তৎপরতা তাহলে রাষ্ট্রটিকে একটি উল্টো রথযাত্রার দিকে ঠেলে দিল। আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলুন?
কে. বি. এম. মাহমুদ : ৭ নভেম্বর এবং কর্নেল তাহের সম্পর্কে কোনো সঠিক ব্যাখ্যা হয়নি। আমি আজও তাহেরের চরিত্র দ্বারা বিমোহিত। আামরা যারা জড়িত ছিলাম তারা হৃদয় দিয়ে জানতাম যে আমরা এটা সম্পন্ন করতে যাচ্ছি। আমরা শতভাগ বিশ্বাস করেই নেমেছিলাম। তখন আমার সাতটা সন্তানের মধ্যে মেয়ে চারটা কিশোরী। আমার বাড়িতে দু’মাস খাওয়ার পয়সা নেই। আমি বিপ্লবে একটা ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছি। কর্নেল তাহেরও সেটাই করেছেন। পিছনে যে কাঠিটা নেড়েছে সে তো কাঠিটা নেড়েছে আমেরিকার চক্রান্ত পূর্ণ করার জন্য। ফলে সেটা তখন আওয়ামী লীগ উৎসাহী হয়ে পড়ে যেহেতু খালেদ মোশারফকে মারা হয়েছে। তারা সেরকমভাবে ৭ নভেম্বরের ব্যাখ্যা দেন। খালেদ মোশাররফকে মারতে তো কর্নেল তাহের বলেননি। খালেদ মোশাররফকে মেরেছে-মুক্তিযোদ্ধাদের মেরেছে মোশতাকের কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়েজিত সেনাবাহিনীর ঞধংশ ঋড়ৎপব যার নেতৃত্বে ছিলেন একজন সারোয়ার। এখন আমার এটা বের করতে বাকি আছে, মোশতাকের সঙ্গে খালেদ মোশাররফের কি পরিমাণ যোগাযোগ ছিল। এটা বের করতে পারব কি না জানি না। কিন্তু অবস্থা বিচারে কোনো কিছু ইঙ্গিত করে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে কোনো প্রমাণ বহন করে না।
আমার বাড়ি থেকে যেয়ে তাহের সাহেব জিয়াকে মুক্ত করলেন বললেন, স্যার কর্মসূচি এই। সামরিক রীতি অনুযায়ী তিনি জিয়াউর রহমানকে স্যার বলতেন। জ্যেষ্ঠতার জন্য। তাহের জিয়াকে বললেন, এই সময় এই হবে। সকাল বেলায় শহীদ মিনারে আপনি বক্তৃতা দেবেন। আপনার কাছ থেকে আমরা বার্তা ধারণ করে সম্প্রচার করব। জিয়াউর রহমান শেষ পর্যন্ত আসলেন না।
আমি প্রথম সাইফুল বারীর বাড়ি গেলাম। তিনজন না চারজন সৈনিক আমার গাড়িতে ছিল। আমি বললাম, বারী ভাই চলেন বেতার খুলতে হবে। তখন চারিদিকে নানা রকম গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে। বারী ভাইরের সহধর্মিণী আমার পায়ে জড়িয়ে ধরে বলেন, ভাই আমার তিনটে বাচ্চা পিতৃহারা হবে। আপনি মাফ করে দেন। ওনাকে মাফ করে দেন। আমি বললাম, ভাবী আমার সাতটা বাচ্চা যদি পিতৃহারা না হয় আপনার তিনটে বাচ্চাও পিতৃহারা হবে না। মুখে বললেন ছেড়ে দেন ওনাকে।
সৈনিকরা বলছে ধরে নিয়ে যাব। আমি বললাম, না থামেন উনি আমার বড় ভাইয়ের মতো। পেশায় দু বছরের জ্যেষ্ঠ ছিলেন। একসঙ্গে চাকরি করেছি। আমি তখন বললাম, বারী আমাকে বলেন কী করা যাবে। বললেন, তুমি একটু মহাপরিচালক জামান সাহেবকে অনুরোধ কর। আমি বললাম আমার তো ওনার সাথে কোনো পরিচয় নেই। বলল, আমি ফোন লাগিয়ে দিচ্ছি তুমি কথা বলো। তিনি ফোন লাগিয়ে দিলেন জামান সাহেবকে। তিনি থাকেন ওই ঢাকা কলেজের বিপরীতে। আমি ওনাকে বললাম, ভাই আমি মাহমুদ বলছি। বললাম, একটা আকস্মিক ঘটনা আছে। বাংলাদেশ বেতার খুলতে হবে। বলে আমি একটু সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলাম। বললেন হ্যাঁ ঠিক আছে। তিনি বললেন, আমার তো পরিবহন নেই কী করে যাব। বললাম, আসছি আপনাকে এগিয়ে নিতে। গেলাম ওনাকে বেতারকেন্দ্রে নিয়ে যেতে। ততক্ষণে শামসুদ্দিন বলে একটা ছেলে ছিল গণকণ্ঠে চাকরি করত ও আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। ওখানে বসে আমরা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে একটা ক্রুকে পাঠালাম জিয়াউর রহমানের বক্তৃতা ধারণ করার জন্য। অপেক্ষা করলাম। সিরাজুল আলম খান দূরালাপনীতে আমাকে শ্রুতিলিপি বলে দিলেন যেটা আমি সম্প্রচার করিনি। কোনো যৌক্তিকতা নেই। আগে যে সব কথা হয়েছে সেগুলো বাদই দিতে হয়। এখন আমি বুঝি ওটা কেন বলেছিল। একবারে সম্পূর্ণ কোষকেন্দ্রের সবাইকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। একবারে নির্বিচার নৃশংস হত্যাকাণ্ড হতো এজন্যই করেছিল। তারপরে যে একাধিক হত্যা প্রচেষ্টা কর্নেল তাহেরের ওপর হয়েছে সেগুলা আমি মনে করি এ ধরনের ষড়যন্ত্রের অংশ বিশেষ।



Print
©2009. All rights reserved.