বিদায়, দেবদাস...
বাংলাদেশের চলচিত্রে বেশ দাপটের সঙ্গে যে কয়জন নায়ক অভিনয় করে গেছেন তাদের মধ্যে বুলবুল আহমেদ-এর নাম সবার আগে স্মরণীয়। একজন আপদমস্তক অভিনেতা তিনি। অভিনয়ের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে, টেলিভিশন বা বড় পর্দায় তার যে কোনো অভিনয়কেই নিতান্ত অভিনয় তথা কৃত্রিম বলে মনে হতো না, যেন বাস্তব জীবনেরই চালচিত্র। তার অভিনীত মহানায়ক, শুভদা, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, কলমিলতা, দুই নয়নের আলো, দেবদাসের মতো অসংখ্য চলচ্চিত্র এ দেশের দর্শকদের মনে আরো অনেকদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বেঁচে থাকতেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। গত ১৪ জুলাই এ গুণী অভিনেতা চিরকালের জন্য জীবনের নাট্যমঞ্চ ছেড়ে চলে গেছেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন আরিফুর রহমান
প্রয়াত অভিনেতা বুলবুল আহমেদের জন্ম ১৯৪১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকার আগামসি লেনে। বাবা মোহাম্মদ খলিল আহমেদ ছিলেন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ইনকাম ট্যাক্স বিভাগে চাকরি করতেন। পেশায় তিনি সরকারি কর্মকর্তা হলেও ছিলেন সংস্কৃতিমস্ক, শৌখিন নাট্যাভিনেতা। তিনি যেসব নাটক করতেন সেগুলোর মহড়া হতো বাসাতেই। সেইসব মহড়া লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতেন বুলবুল আহমেদ। ছোটদের যে মহড়া দেখার অনুমতি ছিল না তাই। মূলত সেই মহড়া থেকেই তিনি অভিনয়ের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার কয়েক বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন তারা একটা বিচিত্রা অনুষ্ঠান করবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু হলো অনুষ্ঠানের আয়োজন। সেই অনুষ্ঠানে নাচ, গান এবং অভিনয়ও ছিল। অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন বুলবুল আহমেদ। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রচুর গান শুনতেন এবং গান মুখস্থ করতেন। এক সময় মামার মাধ্যমে তার বাবা জানতে পারলেন যে, অভিনয়ের প্রতি ছেলের খুব ঝোঁক। তখন তিনি বললেন, ‘আগে লেখাপড়া শেষ কর, তারপর অভিনয় কিংবা গান করবে।’ লেখাপড়াতে খারাপ ছাত্র ছিলেন না বুলবুল আহমেদ। পড়েছেন শহরের নামকরা সব স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, নটর ডেম কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
ব্যাংকার থেকে মহানায়ক বুলবুল আহমেদের কর্মজীবন নানা বৈচিত্র্যময়। শুরুতে তিনি বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান-ঘোষক ছিলেন। বিভিন্ন কারণে বেতারের সেই ঘোষকের চাকরি বেশি দিন করা হয়নি। ১৯৬৫ সালে তিনি চাকরি নেন তৎকালীন ইউনাইটেড ব্যাংকে। সেই ব্যাংক বর্তমানে জনতা ব্যাংক নামে পরিচিত। ১৯৬৫ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি জনতা ব্যাংকের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করেন। চাকরির পাশাপাশি বুলবুল আহমেদ টিভি নাটকে অভিনয়ও করতেন। ‘জীবন নিয়ে জুয়া’ ছবিতে অভিনয় করার সময় তিনি এ চাকরির ইস্তফা দেন। বুলবুল আহমেদের মামাত ভাই প্রবীণ নাট্য ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব নাজমুল হুদা বাচ্চুর হাত ধরেই ১৯৬৩ সালে ‘উল্কা’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চ নাটকে আসা। এরপর ইডিপাস ও আর্মস এ্যান্ড দ্য ম্যান নামের মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। কলেজ জীবন থেকেই বুলবুল আহমেদ কমবেশি মঞ্চ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখানে এসে তা যেন অনেক বেশি পরিপূর্ণতা লাভ করে। ১৯৬৪ সালে তার প্রথম অভিনীত টিভি নাটক ‘বরফ গলা নদী’ প্রচারিত হয়। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন প্রয়াত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন। এরপর নিয়মিতভাবে টিভি নাটকে কাজ করা অব্যাহত রাখেন। ফিউদর দস্তয়ভস্কির ইডিয়েট নাটকটির অভিনেতা হিসেবে বুলবুল আহমেদ তখন ব্যাপক প্রশংসিত ও আলোচিত হন। ওই সময় তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে, মালঞ্চ, ইডিয়েট, মাল্যদান, বড় দিদি, আরেক ফাল্গুন, শেষ বিকেলের মেয়ে ইত্যাদি। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘এই সব দিন রাত্রি’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ১৯৭২ সালে আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের অনুপ্রেরণায় সিনেমায় কাজ শুরু করেন বুলবুল আহমেদ। ১৯৭৩ সালে আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের (ইউসুফ জহির) মুক্তি পাওয়া ছবি ‘ইয়ে করে বিয়ে’র মাধ্যমে বড় পর্দায় আগমন ঘটে তার। এই ছবিতে তিনি ছিলেন পার্শ্ব অভিনেতা। ছবিটিতে অভিনয়ের মাধ্যমেই তিনি জানান দিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রে এক শক্তিমান অভিনেতার আগমনের। ছবিটিতে তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন আরেক খ্যাতিমান পরিচালক আলমগীর কবির। প্রস্তাব দিলেন তার পরিচালিত ‘সূর্যকন্যা’ ছবিতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করার। ‘সূর্যকন্যা’ ছবিতে পর্দাকাঁপানো অভিনয় করে রীতিমতো আলোচনার শীর্ষে উঠে গেলেন বুলবুল। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে অভিনয় করতে থাকেন নামকরা বিখ্যাত সব সিনেমায়। ১৯৮২ সালে চাষী নজরুল ইসলামের ‘দেবদাস’ ছবিটি মুক্তি পায়। শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট অমর এই চরিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে বুলবুল আহমেদ আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। দেশে দেশে তার ভক্তের সংখ্যা বেড়ে যায়। পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনে এবং দর্শকদের মুখে মুখে বুলবুল আহমেদের অভিনয়ের প্রশংসা। এ একটি মাত্র ছবির মাধ্যমে ‘বাংলার দেবদাস’ হিসেবে তার খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকটি ছবিই দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ১৯৮৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’, ১৯৭৮ সালে ‘বধূ বিদায়’, ১৯৮০ সালে ‘শেষ উত্তর’-এ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তিনবার এবং ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ছবিটি পরিচালনার জন্য ১ বারসহ মোট চার বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ছবিটির মাধ্যমে বুলবুল আহমেদের চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে অভিষেক ঘটে। এই ছবিটির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালনাসহ ১২টি শাখার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। তার পরিচালিত ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ছাড়াও ‘আকর্ষণ’, ‘গরম হাওয়া’ নামে দুটি ছবিও তিনি পরিচালনা করেছেন। পরিচালকের পাশাপাশি ছবির প্রযোজকও ছিলেন তিনি। তার প্রযোজিত ছবিগুলোর মধ্যে ‘ওয়াদা’, ‘কত যে আপন’, ‘ভালো মানুষ’ এবং ‘মহানায়ক’ উল্লেখযোগ্য। তার প্রযোজনা সংস্থার নাম ছিল ‘ত্রয়ী চিত্রম’। এসবের পাশাপাশি তিনি অনেক বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছেন। অভিনয় করেছেন ৫০টির বেশি রেডিও নাটকে। সর্বশেষ ‘বাবার বাড়ি’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করেছিলেন তিনি। নাটকটি এখন একটি চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে তার দেহে বাসা বাঁধে। এর আগে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু খাকিনকটা সুস্থ হওয়ার পরই আবার বাসায় চলে গেছেন। ১৪ জুলাই বুধবার আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। তখন বড় দেরি হয়ে গেছে। পথিমধ্যেই বুঝি নিভৃতে বিদায় নিয়েছেন তিনি। চিকিৎসার প্রয়োজন রইল না আর। তিনি চলে গেলেন সকল চিকিৎসার ঊর্ধ্বে। তাকে মৃত ঘোষণা করলেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। ব্যক্তিগত জীবনে বুলবুল আহমেদ তিন সন্তানের জনক। স্ত্রী ডেইজি আহমেদ। দুই মেয়ে ঐন্দ্রিলা ও তিলোত্তমা এবং ছেলে শুভ। গত ১৬ জুলাই শুক্রবার তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে, মা-বাবার কবরের পাশে। চলে গেলেন একজন শক্তিমান অভিনেতা, কিংবদন্তির মহানায়ক, বাংলার দেবদাস...। তার প্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্রের শুধু শূন্যতা নয়, মহাশূন্যতা। তার মতো অভিনেতার আগমনের জন্য এ দেশের সিনেমা দর্শকদের হয়ত আরো অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।
এক নজরে বুলবুল আহমেদ জন্ম : ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ মৃত্যু : ১৪ জুলাই ২০১০ (রাত ১১টা) জন্মস্থান : আগামসি লেন প্রথম পেশা : বেতারের অনুষ্ঠান ঘোষক, পরে ব্যাংকার চলচ্চিত্রে পদার্পণ : ১৯৭৩ সালে ‘ইয়ে করে বিয়ে’ ছোট পর্দায় : ১৯৬৪ সালে ‘বরফ গলা নদী’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার : ৪ বার স্ত্রীর নাম : ডেইজি আহমেদ সন্তান : মেয়ে ঐন্দ্রিলা ও তিলোত্তমা এবং ছেলে শুভ সর্বশেষ চলচ্চিত্র : দুই নয়নের আলো সর্বশেষ টিভি নাটক : বাবার বাড়ি
‘সত্যিই দেবদাস আমাকে ছেড়ে চলে গেল’ চাষী নজরুল ইসলাম চলচ্চিত্র পরিচালক বন্ধু সকলেরই আছে। সকল বন্ধনে যে আবদ্ধ হতে পারে সেই হয়ে ওঠে ভালো বন্ধু। বুলবুল আহমেদ আমার বন্ধু, ভাই, আপনজন ছিলেন। তাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এ রকম ভালো বন্ধু আসলে সব সময় সবার কপালে জোটে না। এটা অনেকটাই ভাগ্যের ব্যাপার। বুলবুল আহমেদ ছিলেন সৎ, ভালো মানুষ এবং শিক্ষিত। আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে শুধু দিয়ে গেলেন। আমরা হারালাম একজন সু-অভিনেতাকে, এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। এ ক্ষতি কখনোই পূরণ হবার নয়। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা বিশেষ করে অভিনেতা, অভিনেত্রীরা বুলবুল আহমেদের মতো অভিনেতাকে খুব বেশি দেখার সুযোগ পাননি। তারা প্রয়াত শিল্পীর সাবলীল অভিনয় দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ নিয়ে অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আমার প্রযোজিত-পরিচালনায় ‘দেবদাস’-এ চমৎকার অভিনয় করেছেন। তিনি চরিত্রের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। মনে পড়ে দেবদাসের শেষ দৃশ্যের কথা। শেষ দৃশ্যে দেবদাস মারা যাবেন। সেদিন তিনি সারাদিন শূটিংয়ে কারো সঙ্গে কথা বলেননি। বুলবুল সাহেব বলে তখন তাকে ডাকতাম। আর বুলবুল আহমেদ আমাকে চাষী বলে ডাকত। জানতে চাইলাম কথা না বলার কারণ? উনি বললেন, না মানুষ নাক-মুখ দিয়ে যা বলতে চায়Ñ আমি তা চোখ দিয়ে বলতে চাচ্ছি। দেবদাসের আর একটি শূটিংয়ের দৃশ্যের কথা মনে পড়ে কবরীকে ছিপ মারার। দৃশ্যের পর দেখি দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছে। আমি তাদের সান্ত্বনা দিলাম। তারা কান্না থামাল। এই যে চরিত্রের সঙ্গে যাওয়া, এটা ক’জনেই করতে পারে। এবার সত্যিই দেবদাস আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।
‘চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি একজন প্রকৃত অভিনেতাকে হারাল’ কবরী সারোয়ার অভিনেত্রী বুলবুল আহমেদের সঙ্গে অনেক ছবিতে কাজ করেছি। দেবদাস ছবিতে সে আমার নায়ক দেবদাস ছিল, সত্তর-আশির দশকে একসঙ্গে আমরা অনেক ছবিতে অভিনয় করেছি। তিনি খুব মিশুক ছিলেন, সহজেই সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন। অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র ছিলেন। আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি একজন প্রকৃত অভিনেতাকে হারাল। |