Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২৫ ১৪ই অগ্রহায়ন, ১৪২৫ ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
 জলছবি'র বিস্তারিত সংবাদ
[স্মৃতিকথা] ‘চিত্রালী’র চিত্রাবলী -রশীদ হায়দার

কী বিপুল আশায় জিয়া ভাই আমাকে ঢাকায় আনলেন; রেজাল্টের ঠিক নেই, পাস করি না ফেল মারি কে জানে, কিন্তু জিয়া ভাই আগেই হাজারী ভাই, পারভেজ ভাই, হক ভাইকে বলে রেখেছিলেন : আমার ছোট ভাইটিকে আমার জায়গায় নিতে হবে, যাতে ও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারে।
তারা রাজি হয়েছিলেন। তারা অর্থাৎ আবদুল গনি হাজারী, ম্যানেজিং ডিরেক্টর আল হেলাল গ্রুপ অব পাবলিকেশনস; সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ, সম্পাদক, সাপ্তাহিক চিত্রালী ও সৈয়দ শামসুল হক, সহ-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চিত্রালী। আজ অকপটে বলি, জিয়া ভাই যদি আমাকে হাত ধরে ঢাকায় না আনতেন তাহলে আমি হয়তো হতাম জজকোর্টের কেরানি না হয় একজন ছোটখাটো ঠিকাদার কিংবা মামলাবাজ জোতদার। আরও স্পষ্ট করে বলি, হতাম আবদুর রশীদ, নামের পাশে হয়ত লিখতাম বিএ। এই হওয়া-না-হওয়ার পেছনে একটি ইতিহাস আছে। আজ লেখক পরিবার হিসেবে আমাদের সামান্য যে পরিচিতি, তা কখনই সম্ভব হতো না যদি না জিয়া ভাই ম্যাট্রিক পাস না করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, ঢাকায় স্থায়ীভাবে আমাদের ভাইবোনদের না আনতেন। মূল কারণটি হচ্ছেÑজিয়া ভাই আমাদের বংশের প্রথম ম্যাট্রিকুলেট। তিনি আমাদের কাছে ঈশ্বরতুল্য। আমি লিখিতভাবে যে তিনজনের কাছে পিতৃঋণের কথা স্বীকার করেছি, তার প্রথম ও শ্রেষ্ঠজনই হচ্ছেন জিয়া ভাই; দ্বিতীয়জন পারু ভাই-ই অর্থাৎ এসএম পারভেজ ও তৃতীয়জন সরদার মামা অর্থাৎ সরদার জয়েনউদ্দীন। আজ তিনজনই পরলোকে।
চিত্রালী অফিস তখন ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশে, কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি বিল্ডিংয়ে। ভিক্টোরিয়া পার্ক এখন বাহাদুর শাহ পার্ক নামে নামাঙ্কিত। তবে বহুলোক এখনো রানী ভিক্টোরিয়ার প্রেম ভুলতে পারে না বলে ভিক্টোরিয়া পার্কই বলে। ওই পার্কে বাহাদুর শাহ-এর নামে যে মনুমেন্ট, সেটা তৈরি হলো আমাদেরই চোখের সামনে। সালটা মনে নেই। দোতলায় চিত্রালী অফিস। জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে উঠে গেলাম, গিয়ে দেখলাম মূল দরজার সামনাসামনি একটা ভালো চেয়ারে একজন মোটাসোটা ব্যক্তি, তিনি এসএম পারভেজ; তাঁর ডান পাশে একজন রোগা পাতলা মানুষ, তিনি সৈয়দ শামসুল হক; পারভেজ সাহেবের উল্টো দিকে দেয়াল ঘেঁষে যিনি কাজ করছেন তিনি কাইয়ুম ভাই। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। এই তিনজনের কথাই বেশি মনে আছে। উত্তরদা, অর্থাৎ এটিএম হাই তখন উপস্থিত ছিলেন কিনা মনে নেই।
তবে মনে আছে হক ভাইয়ের চাহনি। তিনি চশমার ওপর দিয়ে আমাকে দেখলেন, জরিপ করলেন এবং ঠোঁটে সামান্য হাসি খেলিয়ে আবার লেখায় মগ্ন হয়ে গেলেন। জিয়া ভাই সবার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর বললেন, পারু ভাই, ওর কথাই বলেছিলাম।
হক ভাইয়ের প্রথম চাহনির মাজেজা জেনেছিলাম অনেক পরে। তিনি বলেছিলেন : রশীদ প্রথম যেদিন চিত্রালীতে এলো, সেদিন ওর গায়ে ছিল কটকটে নীল রঙের ফুল হাতা জামা, জামার দুই পাশে ঝোলানো পকেট, ঢোলা পাজামা, পায়ে মোজা ছাড়া অক্সফোর্ড জুতো, আর মাথায় চপচপে শর্ষের তেল। বেশ চকচক করছিল। হুঁ, সেই রশীদ আর এখনকার রশীদ। হক ভাইয়ের সেই পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নকে আমি খুব, খুবই মূল্য দিই। কারণ একজন লেখকের যে তৃতীয় একটি নয়ন থাকতে হয়, তা তিনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন আমাকেই উদাহরণ হিসেবে নিয়ে। আর এই চিত্রালীতেই চাকরির সুবাদে হক ভাই আমাকে সাহিত্য বিষয়ে একটি মূল্যবান পাঠ দিয়েছিলেন। পাঠটি আমি এখনো ভুলিনি। আমি মনে করি, বর্তমান নবীন প্রজন্মের যারা গল্প-উপন্যাস লিখছে, তাদের কথাটাও মনে রাখা প্রয়োজন।
মূল ঘটনা হচ্ছে, চিত্রালীতে গল্প লেখা।
সম্ভবত ১৯৬১-এর শেষদিকে কিংবা ১৯৬২-এর প্রথম অংশে সিদ্ধান্ত হলো চিত্রালীতে গল্প ছাপা শুরু হবে। ইতোমধ্যে ফজল ভাই, ফজল শাহাবুদ্দিন, চিত্রালীতে যোগ দিয়েছেন। তিনি তখন কবিতার পাশাপাশি গল্পও লিখছেন। ফজল ভাইয়ের গল্পই প্রথম ছাপা হয় চিত্রালীতে। নাম : ‘জার্নি’। দ্বিতীয় গল্পটিই আমার। শিরোনাম সম্ভবত ‘পিছিয়ে গেল বলেই’। কিন্তু এই গল্প নিয়ে আমি ছিলাম প্রচণ্ড টেনশনে। ছাপা হবে কি হবে না। গল্প ছাপার সিদ্ধান্ত যখন হয়, তখনই হক ভাই আমাকে ‘রশীদ, তুমি গল্প দেবে’ বলেছিলেন। হক ভাই গল্প চেয়েছেন? আমার আর মাটিতে পা পড়ে না। দিলাম গল্প, কিন্তু বাতিল। তখনো হতাশা পেয়ে বসেনি। দ্বিতীয়বার গল্প দেয়ার পর তিনি যখন সেটাও বাতিল করলেন, তখন আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। আবার নতুন করে বুক বাঁধলাম। লিখলাম তিন নম্বর গল্পটি। এবারে গল্প লেখা পরীক্ষায় পাস। তখন হক ভাই বলেছিলেন, কেন আগের দুটো গল্প তিনি ছাপেননি। না ছাপার কারণ হচ্ছে, গল্পগুলো ছিল প্রচণ্ড আবেগে পরিপূর্ণ। বলেছিলেন তিনি : দেখ, তোমার এই বয়সে মনে প্রচণ্ড আবেগ কাজ করে, সেই আবেগ প্রেমের গল্পে এত প্রচণ্ডভাবে এসেছে যে মূল গল্পই মার খেয়েছে। মনে রাখবে, প্রেমের গল্প-কবিতা লেখা সবচেয়ে কঠিন। কেন কঠিন, সেটাও বলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন : প্রেম এমন একটি বিষয়, যা শত শত বছর ধরে চলছে এবং চলবে। এই প্রেমের যে আবেগ তা প্রধানত সীমাবদ্ধ থাকে দুটি ছেলেমেয়ে, নর-নারীর মধ্যে। তৃতীয় ব্যক্তির ভূমিকা এখানে গৌণ। কিন্তু একজন লেখক যদি এই প্রেমের মধ্যে নতুনত্ব কিছু না আনতে পারে, তাহলে শ্রোতা অর্থাৎ পাঠকের কাছে এর মূল্য নেই। এসব কথা বলে হক ভাই শেষে বলেছিলেন, তোমার ওই আবেগ যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বিষয়ে সঞ্চারিত করতে পার, তাহলে বুঝব তুমি ভবিষ্যতে লিখতে পারবে।
কথাগুলো আমি শিরোধার্য করেছিলাম। লিখছি, কিন্তু লেখক হতে পেরেছি কিনা জানিনে। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। করে যাব।
চিত্রালীর প্রাণপুরুষ পারু ভাই। আমরা পারু ভাই বলি, অনেকে বলেন পারভেজ ভাই। সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ। ঢাকার অত্যন্ত বনেদি ঘরের সন্তান তিনি। লুলু বিলকিস বানু, লায়লা আর্জুমান্দ বানু, মালেকা পারভীন বানুদের আপন চাচাত ভাই। সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর বংশের একমাত্র পুত্রসন্তান। বেশ মোটাসোটা, চলেনও হেলেদুলে। মুখে সবসময় একটা হাসির আভা। এই চিত্রালী ছিল তার সন্তান। শুনেছি, আল হেলাল গ্রুপ অব পালিকেশনস-এ যোগ দেয়ার আগে পারু ভাই একাই এই সিনেমা পত্রিকাটি বের করতেন। কিন্তু এর খরচ কুলিয়ে উঠতে না পারায় আল হেলাল গ্রুপ, অর্থাৎ অবজারভার গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেন। এই গ্রুপের কর্ণধার ছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী। একসময় ছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল আইনজীবী হিসেবে, সমগ্র পাকিস্তানে তার সমকক্ষ আইনজীবী ছিলেন হাতেগোনা।
হামিদুল হক চৌধুরীর পরিচয় এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। আজ এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই হামিদুল হক চৌধুরীর সমস্ত অর্জন ফিকে হয়ে গেল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে। সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন তিনি; পাকিস্তানের পক্ষে সাফাই গাইতে ইউরোপ, আমেরিকাও ছুটে গিয়েছিলেন এই হামিদুল হক চৌধুরী। আমার চিত্রালীর চাকরিজীবনের সুপ্রিম বস, যদিও তিনি আমাকে চিনতেন না, তার পাকিস্তান অবজারভার, পল্লীবার্তা, চিত্রালী, আর হেলাল প্রেস, হাইকোর্ট ইত্যাদি মিলিয়ে শত শত কর্মী, কতজনকে চিনবেন তিনি? তার বাড়ি ছিল নোয়াখালী জেলায়। সেজন্য আল হেলাল গ্রুপে নোয়াখালীর কর্মীর সংখ্যা ছিল সর্বাধিক। কখনো কখনো নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা শুনতে শুনতে মনে হয়েছে ঢাকায় আছি, না নোয়াখালীতে?
হামিদুল হক চৌধুরী সম্পর্কে একটা কথা বেশ চালু ছিল। লোকটি পেনি ওয়াইজ, পাউন্ড, ফুলিশ। পেছন দিয়ে হাজার হাজার টাকা বেরিয়ে যায় তিনি টের পান না, কিন্তু সামনে এক ফুট দেড় ফুট অব্যবহৃত নিউজপ্রিন্ট মেঝেয় কিংবা অযতেœ কোথাও পড়ে থাকলে, আর সেটা তার নজরে পড়লে রক্ষে নেই। নোয়াখাইল্যা ভাষায় গালাগাল শুরু করে দিতেন। যাক, হামিদুল হক চৌধুরীর কথা থাক এ পর্যন্তই। তবে ওই চিত্রালী অফিসেই তার ছেলে খালেদ হামিদুল হককে দেখেছিলাম একটা মূর্তিমান অপছন্দের মানুষ হিসেবে।
খালেদ ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়ছেন। তিনি এসেছেন বাপের সাম্রাজ্য দেখতে; মাঝে মাঝেই আসতেন। এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়াতেন, নোয়াখাইল্যা-ঢাকাইয়া মিশিয়ে বাংলা বলতে চেষ্টা করতেন। তবে ইংরেজিটা বলতেন মাতৃভাষার মতো। সেই খালেদ একদিন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটা কথা বলে আমাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন : আমি টেগোর পড়েছি।
সম্ভবত পারু ভাই কিংবা হক ভাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাংলায়?
নো নো! ইন ইংলিশ। হি ওয়াজ এ গুড রাইটার। হবু ব্যারিস্টার খালেদ হামিদুল হক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, শুনে উত্তরদা এটিএম আবদুল হাই, আমরা বলি এ্যাটম হাই, নিচু গলায় বললেন,
শালাকে ভেজা জুতা দিয়ে পেটানো উচিত।
পরে জানতে চেয়েছি,
ভেজা জুতা কেন?
ওতে গায়ে লাগে বেশি, দাগও পড়ে ভালো।
Bookmark and Share পিছনে

Warning: require_once(/home/content/s/h/a/shaptahik/html/v2/comments/c_comments.php) [function.require-once]: failed to open stream: No such file or directory in /home/content/26/13292126/html/v2/main/sup_details.php on line 49

Fatal error: require_once() [function.require]: Failed opening required '/home/content/s/h/a/shaptahik/html/v2/comments/c_comments.php' (include_path='.;C:\Program Files\VertrigoServ\Smarty') in /home/content/26/13292126/html/v2/main/sup_details.php on line 49