Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ১৭ ২১শে আশ্বিন, ১৪২৫ ১৮ অক্টোবর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
আলী রীয়াজ- শরীরে জলের গন্ধ মেখে  
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নে তাড়িত হয়ে রাজপথে হেঁটেছেন। মিছিলে, সেøাগানে, কবিতায়, সাহিত্যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের নির্বাচনে, বন্ধুত্বতায়, দৈনিক সংবাদ, বিচিত্রা অফিসÑ সর্বত্রই ছিল সমাজ বদলের স্বপ্ন। সেই সমাজ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বদলায়নি। কিন্তু বদলে গেছে নিজের জীবন। একটা অসফল প্রেম, সুখী দাম্পত্য সম্পর্ক, আনন্দমুখর সংসার, সাফল্যময় পেশাজীবন আছে তারÑ কিন্তু হারিয়ে গেছে বন্ধুদের অনেকেই। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সাংবাদিক মিশুক মুনীর, আবিদ রহমান, চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদ, সবাই নেই আকাশের তারা এখন। হারিয়ে গেছে আরও অনেক কিছুÑডাকসুর অফিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর, প্রিয় শিক্ষকদের অনেকেই। কর্মসূত্রেও প্রবাসী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, বিবিসির রেডিওতে সাংবাদিকতা এসব পেরিয়ে থিতু হয়েছেন মার্কিন মুল্লুকের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপনায়। কিন্তু অন্তরজুড়ে আছে দেশ ও দেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা।
তার শিক্ষকতা এবং গবেষণার মূল জায়গা রাষ্ট্র ও রাজনীতি। সেই সূত্রে পলিটিক্যাল ইসলাম, ইসলামি মিলিটেন্সি, সাউথ এশিয়ান পলিটিক্স তার ফোকাসের জায়গা। এ বিষয়ে বইও লিখেছেন বেশ কয়েকটি। বাংলাদেশের অন্যরকম অপ্রচলিত ইতিহাস লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু শান্ত, স্থিতধী চেতনায় বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের সম্ভাবনায়। সেই উন্নয়ন ভাবনার চলার পথে বাধাগুলো তাই তার মাথা ঘামানোর বিষয়। গণতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদী শাসন, সামরিক শাসন, ইসলামি জঙ্গিবাদÑপৃথিবী জুড়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতির নিত্যদিনের খোঁজ রাখা মানুষটির কলম চলে দু’হাতে।
লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতি বিশ্লেষক, ডাকসুর সাবেক সাহিত্য সম্পাদক অধ্যাপক আলী রীয়াজ ঢাকায় এসেছিলেন সম্প্রতি। একটা আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার নেয়ার প্রস্তাব রাখতেই প্রশ্ন ছুড়লেন, আমি কি খুব বেশিদিন বাঁচব না বলেই ভাবছেন? পাল্টা উত্তর দিই, গত ক’বছরে যাদের এরকম সাক্ষাৎকার নিয়েছে সাপ্তাহিক তাদের মধ্যে যারা মারা গেছেন, তারা সবাই আপনার চেয়ে অনেক দীর্ঘ আয়ু পেয়েছেন। সুতরাং ভয় পাবার কিছু নেই।
না ভয় পাবার মানুষ তিনি নন। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে তার নিত্যদিনের ব্যস্ত জীবন। সেই ছোটাছুটি আর ব্যস্ততার মধ্যেও সময় দিলেন দু’দিন, প্রায় ঘণ্টা পাঁচেক ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে তাদের পারিবারিক বাসায়।
আলী রীয়াজ কথা বলেন প্যাশনেটলি। আবেগ আস্বাদিত কথার রেশ চলে যুক্তির টোকায়। কখনো যুক্তিচ্যুত হন না। ঢাকা-ইলিনয়, দুই বিন্দু ঠিক রেখে ছোটাছুটি করেন বিশ্বময়, কিন্তু ভুলে যান না বাংলাদেশই তার কেন্দ্র। সাপ্তাহিক-এর সঙ্গে সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বলেছেন একজীবনের অনেক কথা। প্রেম, বিয়ে, রাজনীতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন, প্রবাসের কর্মজীবন যেমন আছে এ কথায়Ñ আছে বন্ধুদের কথাও। বলেছেন ঘনিষ্ঠতম বন্ধু সাহিত্য আন্দোলনের সহকর্মী কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি কামাল নাসের চৌধুরীকে নিয়ে। বলেছেন বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর স্বপ্নময় সাংবাদিকতার কথা। এসেছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দেখে তার শিক্ষক হবার আকাক্সক্ষার কথা। ভালোবাসায় ছুঁয়ে গেছে আশির দশকের উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি, ছাত্রনেতাদের কথা। মধ্য পঞ্চাশের জীবন ছুঁয়ে অকপটে নিজের জীবনের কথা, সময়ের কথা বলেছেন সাপ্তাহিক-এর কাছে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও গ্রন্থনা করেছেন শুভ কিবরিয়া

পরিচিতি
অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ
ক্স    অধ্যাপক, চেয়ার অফ দি ডিপার্টমেন্ট অফ পলিটিক্স এন্ড গভর্নমেন্ট, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা।
ক্স    দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, পলিটিক্যাল ইসলাম বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃক ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’ উপাধিতে ভূষিত।
ক্স    ২০১৩-পাবলিক পলিসি স্কলার, উইড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস, ওয়াশিংটন ডিসি।
    ২০১৩-আমেরিকার কংগ্রেসে বাংলাদেশ বিষয়ক শুনানিতে অন্যতম অংশগ্রহণকারী।
    ২০০৮-ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম শুনানিতে অংশগ্রহণকারী।
    ২০০২-ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতায় যোগ দান। এখানে যোগদানের আগে আমেরিকার সাউথ কেরোলিনার ক্ল্যাফলিন বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অফ লিংকন-এ শিক্ষকতা।
১৯৯৩-১৯৯৫-সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা।
১৯৮৪-১৯৮৭-লেকচারার, সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৯৯৩-ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার ফেলোশিপের আওতায় ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই, হনলুলু হাওয়াই, আমেরিকা থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ।
১৯৯১-ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই, হনলুলু হাওয়াই, আমেরিকা থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে এমএ।
১৯৮৯-ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই, হনলুলু হাওয়াই, আমেরিকা থেকে কম্যুনিকেশনে এমএ।
১৯৮২-ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস কম্যুনিকেশন এন্ড জার্নালিজমে এমএ।
১৯৮০-ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস কম্যুনিকেশন এন্ড জার্নালিজমে বিএ (অনার্স)।
সাংবাদিকতা
ক্স    প্রডিউসার ও সিনিয়র ব্রডকাস্টিং জার্নালিস্ট হিসেবে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)-এ পাঁচ বছর কাজ করেছেন।
গবেষণার ক্ষেত্র
ক্স    ইসলামিস্ট পলিটিক্স, সাউথ এশিয়ান পলিটিক্স, কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট, পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ মিডিয়া।
ক্স    রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজ (ওঝঊঅঝ), সিঙ্গাপুর। রিসার্চের বিষয় : রোল অফ টেলিকম্যুনিকেশন ইন ইকোনমিক গ্রোথ অফ মালয়েশিয়া এন্ড সিঙ্গাপুর।
প্রকাশনা
ক্স    ইসলাম এন্ড আইডেনটিটি পলিটিক্স এমং ব্রিটিশ-বাংলাদেশিস : এ লিপ অফ ফেইথ (ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৩)
ক্স    ইনকনভেনিয়েন্ট ট্রুথস অ্যাবাউট বাংলাদেশি পলিটিক্স (প্রথমা, ২০১২)
ক্স    পলিটিক্যাল ইসলাম এন্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ (রাউটলেজ, ২০১০)
ক্স    রিলিজিয়ান এন্ড পলিটিক্স ইন সাউথ এশিয়া (রাউটলেজ, ২০১০)
ক্স    (রি)-রিডিং তসলিমা নাসরীন : কনটেক্সটস, কনটেন্টস এন্ড কনস্ট্রাকশনস (শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১০)
ক্স    ফেইথফুল এডুকেশন : মাদ্রাসাস ইন সাউথ এশিয়া (রজার্স ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৮)
ক্স    ইসলামিস্ট মিলিটেন্সি ইন বাংলাদেশ : এ কমপ্লেক্স ওয়েব (রাউটলেজ, ২০০৮)
ক্স    প্যারাডাইস লস্ট? স্টেট ফেইলিয়র ইন নেপাল (সহলেখক-শুভ বসু, লেক্সিংটন বুকস, ২০০৭)
ক্স    আনফোল্ডিং স্টেট : দ্য ট্রান্সফরমেশন অফ বাংলাদেশ (দে সিততার পাবলিকেশনস, ২০০৫)
ক্স    গুড উইলিং : দ্য পলিটিক্স অফ ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ (রোওম্যান এন্ড লিটলফিল্ড, ২০০৪)
ক্স    স্টেট, ক্লাস এন্ড মিলিটারি রুল : পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ মার্শাল ল’ ইন বাংলাদেশ (নদী নিউ প্রেস, ১৯৯৩)
সম্পাদনা
ক্স    সম্পাদক, দ্বিবার্ষিক জার্নাল, স্ট্যাডিজ অন এশিয়া।
সম্মাননা
ক্স    ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’Ñইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি (২০১২)
ক্স    পাই-সিগমা আলফা এক্সিলেন্স ইন টিচিং অ্যাওয়ার্ড (২০০৬)
ক্স    আউটস্ট্যান্ডিং কলেজ রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড (২০০৫)
ক্স    ডিন’স অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং স্কলারলি এচিভমেন্ট (২০০৪)
ক্স    ‘ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার অনার’ অ্যাওয়ার্ড (১৯৯০)


সাপ্তাহিক : ছোটবেলা দিয়ে শুরু করি, আপনার জন্ম কোথায়? আপনার বাবা, মা...
অধ্যাপক আলী রীয়াজ : ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী ২৩ নম্বর, এই বাড়িতেই আমার জন্ম। জন্ম অবশ্য ঢাকা মেডিকেলে। তখন বাড়িটা তো আর এ রকম ছিল না।  আমার জন্ম ১৯৫৮ সালে। সেই সময় ঢাকা তো অন্য রকম ছিল। এখন যে জায়গায় আপনি বিশাল একটা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং দেখছেন, তখন টিনের ঘর ছিল। সামনের দিকে একটা নতুন তিনতলা বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে মাত্র। বাবার সঞ্চিত অর্থের বিনিময়ে।
সাপ্তাহিক : আপনার বাবা কী করতেন?
আলী রীয়াজ : আমার বাবা সার্ভে অফিসে যা এখন সার্ভে অফ বাংলাদেশÑসেখানে চাকরি করতেন। ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে উনি রিটায়ার করেন। বাঙালি হিসেবে তখন তিনি এই পদের ওপরে আর উঠতে পারতেন বলে আমার মনে হয় না।
সাপ্তাহিক : উনি রিটায়ার করলেন কত সালে?
আলী রীয়াজ : আমি ছোটবেলায় উনাকে রিটায়ার্ড হিসেবেই দেখেছি। কারণ আমি হচ্ছি আমার ১০ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। প্রয়াত অধ্যাপক আলী আনোয়ার ভাই ছিলেন আমাদের সব ভাইবোনদের মধ্যে বড়। আমি ছোটবেলাতেই আব্বাকে চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত মানুষ হিসেবেই দেখেছি। আমি স্কুলে যাবার আগেই আব্বা রিটায়ার করেছেন।
সাপ্তাহিক : আপনার দাদার বাড়ি কোথায়?
আলী রীয়াজ : চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলায়। নানার বাড়ি হচ্ছে মাদারীপুরের গোপালপুরে। আমার পরিবারের খুব ইন্টারেস্টিং বিষয়টা হচ্ছে, মা এসেছিলেন পৈতৃকভাবে জমিদার পরিবার থেকে। অন্যদিকে, বাবা এসেছেন অতি সাধারণ পরিবার থেকে। তার পুঁজি হচ্ছে শিক্ষা। আমার দাদারা প্রথম জেনারেশন হিসেবে চর থেকে মূল খণ্ডে জায়গা করেছেন। এবার বুঝতে পারেন। সেখান থেকে আব্বা এবং চাচা লেখাপড়া করে ওই সময় চাকরি নিয়ে এ পর্যন্ত এসেছেন। আমার বাবা পূর্ববঙ্গের ঢাকায় আসার আগে কলকাতাতে ছিলেন। এর আগে আব্বাকে চাকরির কারণে দার্জিলিং, শিলংসহ নানান জায়গাতে ঘুরতে হয়েছে।
১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয় তখন আব্বা কলকাতাতে। সে সময় উনি সিদ্ধান্ত নিলেন উনি ঢাকায় আসবেন। কলকাতায় যে সামান্য জমি ছিল সেগুলো এক্সচেঞ্জ করে এখানে আসেন। তখন তো সিদ্ধেশ্বরী একটা গ্রাম। বাড়ির বাইরে একটা বিরাট বাগান ছিল। এমন কোনো ফলের গাছ ছিল না যা এ বাড়িতে ছিল না। কাঁঠাল, নারকেল, জাম, আম, লিচুগাছ সব গাছ ছিল। এরপর বিল্ডিং তৈরি হলে কাটতে কাটতে সব সাবাড়। ২০০০ সালে যখন আগের বাড়িটা ভেঙে ডেভেলপারের হাতে দেয়া হয় তখন আব্বা আর বেঁচে নেই। ভাইবোনেরা আমরা দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছি, তখন প্রয়োজনেই এটা করা হয়। সে সময় সর্বশেষ গাছটাও কাটা পড়ে।
সাপ্তাহিক : আপনার স্কুলের পড়াশোনা কোথায়?
আলী রীয়াজ : আমি সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে পড়েছি। এ বাড়ি থেকে দু’কদম দূরত্বে।
সাপ্তাহিক : জমিদারের পরিবার থেকে আসা একটা মেয়েকে একেবারেই প্রান্তিক কৃষক পরিবারের একটা ছেলে বিয়ে করলেন। আপনার বাবা-মার দাম্পত্য জীবন কেমন ছিল?
আলী রীয়াজ : শ্রেণী পার্থক্য তো বুঝতেই পারছেন। আব্বার পুঁজি ছিল একমাত্র ‘শিক্ষা’ (ঊফঁপধঃরড়হ), আমার মা ওই অর্থে স্কুলে যাননি। মা ছিলেন স্বশিক্ষিত। আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি মা নিয়মিত সংবাদপত্র পড়তেন। এটা তার একটা কাজ ছিল। আব্বা খুব সকালবেলায় উঠে বারান্দায় বসে সংবাদপত্র পড়তেন। ঘরে মাকে দেখতাম সংবাদপত্র পড়তেন। সংবাদপত্র পড়াটা উনি নিজের মতো করে শিখেছিলেন। বাবার চাকরিসূত্রে উনি কুমিল্লা, দার্জিলিং, শিলং, কলকাতা নানান জায়গায় ঘুরেছেন। উনার ১০ জন ছেলেমেয়ের একটা বড় সংসার। খুব সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার চালাতে হয়েছে। মা জমিদার পরিবার থেকে এসেছেন। নানার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে হলে প্রজাদের পায়ের জুতা খুলে যেতে হতো। এই রকম পরিবার থেকে এসে উনি ১০ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে সীমিত আয়ে বাবার পরিবারে স্ট্রাগল করছেন। মা আবার শিক্ষার বিষয়ে খুব আগ্রহীও ছিলেন। সে কারণে আমাদের পরিবারে সম্পদ যদি কিছু হয়ে থাকে সেটা ‘শিক্ষা’ ছাড়া আর কিছু না।
ঘটনাক্রমে একবার আব্বা বলেছিলেন, ‘তোমাদের জন্য আর কিছু থাকবে না কিন্তু। যা তুমি শিখতে পারবা, তুমি যতটুকু অর্জন করতে পারবা সেটাই থাকবে।’ আমাদের বাড়িতে ওটাই ছিল। সে কারণে আমাদের ভাইবোনেরা কোনো না কোনোভাবে ধরে নিয়েছে আমাদের যা করণীয় তা মূলত শিক্ষাটার মধ্যেই আছে।
আমার বাবার কাছে আমার একটা প্রশ্ন ছিল। অত ছোট ছিলাম বলে সেটা নিয়ে খুব বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশের সমাজে সেই সময় সন্তান ও পিতার মধ্যে যে স্বাভাবিক দূরত্ব থাকে, তা আমার ক্ষেত্রেও ছিল। তবে, এখন আমার কষ্ট হয় এটা ভেবে যে, আব্বার জীবনের যে পথপরিক্রমা (ঃৎধলবপঃড়ৎু) এটা নিয়ে তার সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করা যেত। তাহলে হয়ত সে সময়ের মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের বিকাশের একটা ধারা সম্পর্কে জানা যেত। আমার বেদনা হয়, জানা হলো না, আমার মার কাছ থেকে, যে পরিবেশ থেকে তিনি এসেছিলেন স্বামীর পরিবারে, সেক্ষেত্রে তার পথচলার অভিজ্ঞতাটা কী? তার মূল্যায়নটা কী?
সাপ্তাহিক : পিতার কাছে আপনার সেই প্রশ্নটা?
আলী রীয়াজ : আমার বোঝার বয়সে, কলকাতার কথা শুনি। জানতে পাই যে কলকাতায় আমাদের একটা বাড়িও ছিল এক সময়। সেটা ছেড়েই বা আসলো কেন? আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, কলকাতা না ছাড়লেই তো ভালো হতো। আমরা ওখানেই বড় হতাম। কেন আপনি ১৯৪৭ সালে কলকাতা ছেড়ে পূর্ববঙ্গের ঢাকায় এলেন? আব্বা বললেন, উনি হিসাব করে দেখেছিলেন তখনকার প্রেক্ষিতে আমাদের জন্য বাংলাদেশে আসাটাই ভালো ছিল। উনার ধারণা হয়েছিল, তার উত্তরসূরিদের জন্য পূর্ব পাকিস্তান ‘ভালো’। এর মধ্যে সম্ভাবনা দেখেই তিনি কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন।
সাপ্তাহিক : আপনার প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল পড়াশুনা...?
আলী রীয়াজ : সিদ্ধেশ্বরীতেই। সিদ্ধেশ্বরী স্কুল।
সাপ্তাহিক : আর্টস না সায়েন্স?
আলী রীয়াজ : সায়েন্স। সায়েন্সে পড়তে যাওয়াটা যে আমার চয়েজের ব্যাপার ছিল, তা নয়। আমার জন্মতারিখ নিয়েও কনফিউশন আছে। কাগজে কলমে আনুষ্ঠানিক যে জন্মতারিখ আছে সেটা আসলে ঠিক নয়। ওটা স্কুলের তৈরি করা। এই কাহিনীটাও খুব চমৎকার।
আমি ১৯৭৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেব। সে সময় হয়ত কোনো কারণে নিয়ম ছিল ১৫ বছরের কম হলে পরীক্ষা দেয়া যাবে না। আমাদের ফরম ফিলাপ করাই ছিল, কাগজে স্বাক্ষর করা শুধু। সব পূরণ করা থাকত। স্কুল থেকেই করা হতো। আমরা গিয়ে শুধু স্বাক্ষর করতাম। তখন আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ছিলেন আশরাফ আলী স্যার। উনি একটু কড়া প্রকৃতির ছিলেন। অন্তত ওই বয়সে আমাদের তাই মনে হতো। অফিসের মারফত আমাদের জানানো হলো যে, ফরম ফিলাপ করতে হবে। ফরম ফিলাপ করাই আছে শুধু সই করলেই হবে। তখন তো আর দেখিনি ফরমে কী লেখা আছে। কোথায় সময় এসব দেখার! এডমিট কার্ড পেয়ে দেখলাম একটা জন্মতারিখ। ক্লার্কের কাছে গিয়ে বললাম, কী ব্যাপার, এটা তো আমার জন্মতারিখ না। উনি বললেন, স্যারের কাছে যান। গেলাম। আশরাফ আলী স্যার হয়ত ততদিনে হেডমাস্টার হয়েছেন অথবা হেডমাস্টারের চার্জে ছিলেন। বললাম, স্যার আমার জন্মতারিখটা...। বললেন, ‘কই দেখি। যা, ঠিক আছে। এখানে অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিস কেন? যা পড়ালেখা কর।’
সায়েন্সে পড়তে আসাটাও এ রকম ব্যাপার। স্কুল থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সায়েন্স পড়তে পাঠানো হয়। আমাদের আগের ক্লাসের পরীক্ষার রেজাল্টের ভিত্তিতে আমাদের কয়েকজনকে জানানো হয়েছে যে আমাদের সায়েন্সে পাঠানো হয়েছে। আমরা যেন ওই ক্লাসগুলো করি। এ নিয়ে আমাদের কোনো চয়েজের ব্যাপার ছিল না! আমি ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত সায়েন্সেই পড়েছি।
সাপ্তাহিক : তাহলে আপনার এসএসসি ১৯৭৩ সালে, ইন্টারমিডিয়েট ১৯৭৫ সালে?
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ, এসএসসি ১৯৭৩ সালে। ইন্টারমিডিয়েট স্বাভাবিক নিয়মে ১৯৭৫ সালে হবার কথা। কিন্তু আমি সে বছর পরীক্ষা দেইনি।
সাপ্তাহিক : কেন পরীক্ষা দেয়া হলো না?
আলী রীয়াজ : পরীক্ষার সময়টা হচ্ছে নভেম্বর মাস। সে সময় আমি অ্যারেস্ট হই। পরীক্ষা শুরু হবার সময়ে অ্যারেস্ট হবার কারণে আর সে বছর পরীক্ষা দেয়া হয়নি।
সাপ্তাহিক : অ্যারেস্টের কারণ কী?
আলী রীয়াজ : সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী কার্ফু ভঙ্গ করার জন্য। আমি অ্যারেস্ট হই যেদিন, সেদিন ঢাকা শহরের বহু লোকই গ্রেপ্তার হয়। সে রাতে ঢাকা শহরজুড়ে জাসদের অনেক কর্মীকে অথবা জাসদের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক কর্মীকে অ্যারেস্ট করা হয়। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এর পরের ঘটনা। বাসার সামনে থেকেই পুলিশ অ্যারেস্ট করে। ঘটনাচক্রে এক বন্ধুও ছিল আমার সঙ্গে। পরে পরীক্ষার জন্য থানা থেকে আমাদের ছাড়া হলো বটে, কিন্তু এর মধ্যে একটা পরীক্ষা হয়ে গেছে। ফলে বাকি পরীক্ষা দেয়া, না দেয়া আর ম্যাটার করে না। যদিও আমি পরীক্ষা হলে গেলাম অভ্যেস রাখার জন্য। আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করি এর পরের বছরেই ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৬ সালে পাস করে আমাদের এক বছর বসে থাকতে হলো। কেননা ১৯৭৬ এবং ১৯৭৭ সালের ব্যাচ দুটোকে মার্জ (একীভূত) করে ১৯৭৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।
সাপ্তাহিক : স্কুল জীবনে কি আপনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন?
আলী রীয়াজ : না, ওই রকম ছিলাম না। বরং আমার স্কুল জীবনে সবচেয়ে বড় স্মৃতি হচ্ছে আমার একজন প্রিয় শিক্ষক জীবনানন্দ বড়–য়া। আমার একটা বই তাকে উৎসর্গ করেছি। এখন যে বাংলা লিখতে পারি বা লেখার চেষ্টা করি সেটা জীবনানন্দ বড়–য়া স্যারের কারণে। উনি আমাদের ক্লাস নাইন-টেনে বাংলা পড়াতেন। ক্লাস নাইনে অবশ্য আমি পড়ি নাই ওই অর্থে, কেননা সেটা ১৯৭১ সাল। অটো প্রমোশন পেয়েছিলাম। নানান সময়ে ডবল প্রমোশন পেয়ে আমি একটু এগিয়েই গিয়েছিলাম। ১৯৭১ সালে আমার নবম শ্রেণীতে পড়ার কথা। সে সময় আমি স্কুলে যাব না, যাইনি। বাড়ির কাছেই স্কুল থাকা সত্ত্বেও। সে সময় স্কুল কম্পাউন্ডে বোমাও ফাটানো হয়েছিল। যাতে যারা তখনও স্কুলে যায় তারা যেন আর না যায়। সে সময় আমি কখনও স্কুলে যাইনি। ১৯৭১ সালে একবার কি উৎসাহে যেন স্কুলের কম্পাউন্ডে ঘোরাঘুরি করছিলাম, তখন আমার টিচার আশরাফ স্যার বললেন, ‘এখানে ঘোরাঘুরি করিস কেন? ক্লাসে আসিস না তো, যা!’ মানে উনি বোঝাতে চেয়েছেন যদি ক্লাসে না আসিস তো এখানে আসলে বিপদে পড়ার আশঙ্কা আছে। উনি চাচ্ছিলেন, যেন আমি ক্লাসে না যাই।
সাপ্তাহিক : আপনার স্কুল জীবনের শিক্ষক বড়–য়া স্যারের কথা বলছিলেন।
আলী রীয়াজ : স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আমাদের স্কুলে সাহিত্য-সংস্কৃতি সপ্তাহ উদযাপিত হয়। এবং তার আগে থেকেই উনি আমাদের কয়েকজনকে নির্বাচিত করেছিলেন। কেন আমাদের পছন্দ করেছিলেন জানি না। মনে হয় আমাদের লেখা দেখে পছন্দ করতে পারেন। পড়াশোনার কারণে হয়ত পছন্দ করে থাকতে পারেন। অথবা অন্য কোনো কারণে। আমাদের বিভিন্ন লেখালেখি করা, আবৃত্তি করা, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া, উপস্থিত বক্তৃতাÑ এগুলোতে অংশ নেয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং প্রস্তুত করেছেন। উনার উৎসাহেই ১৯৭২ সালে স্কুলে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সপ্তাহ হয়। এবং উনি আমার বাংলা লেখা দেখে দিতেন। এটা ঠিক হয়নি, এটা পারিস না, এটা ঠিক করÑ এভাবে প্রস্তুত করেছেন। জীবনানন্দ বড়–য়া স্যার বাংলার শিক্ষক ছিলেন। স্যার স্কুলের পাশের একটা ঘরে থাকতেন। সম্ভবত উনি তখন একা। পরিবার সঙ্গে ছিল না। স্কুলের পাশে দুই তিনজন শিক্ষকের জন্য একটা জায়গা ছিল, সেখানে উনি থাকতেন। সেখানে আমাদের পিটি টিচারও থাকতেন। ফলে বড়–য়া স্যারকে সবসময়ই পাওয়া যেত। আমরা মহল্লার ছেলে, ঘোরাঘুরি করি, মাঠে খেলি, উনি আমাদের দেখেন। খেলা বাদ দিয়ে উনার সঙ্গে লেখালেখি নিয়ে কথা হয়। উনি লেখা ঠিক করে দেন। আবৃত্তি করার জন্য উৎসাহিত করেন। উপস্থিত বক্তৃতা কীভাবে দিতে হয় সে বিষয়ে কথা বলেন। ঠিক প্রশিক্ষণ অর্থে নয়, একরকম কথা বলতে বলতেই উনি শিখিয়েছেন।
স্কুলের সাহিত্য-সংস্কৃতি সপ্তাহে ভালোই করলাম এবং পুরস্কার হিসেবে বেশকিছু বই পাওয়া গেল। আমার এখনও মনে আছে, পুরস্কারের ওই বইগুলোর মধ্যে মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর একটা প্রবন্ধের বই, শামসুর রাহমানের কবিতার বই ছিল।
বড়–য়া স্যার আসলে বিশেষত আমাকে স্কুল জীবনে সাহিত্যের ব্যাপারে, সংস্কৃতির ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। এখানে আরেকটা প্রতিষ্ঠান ছিল, যেটা আমার জীবনে বড় ভূমিকা রেখেছে। আমিনবাগ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। প্রতি বছর ওরা রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী বলে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। রাজনীতিবিদ মঞ্জুরুল আহসান খানের পরিবারকে জিজ্ঞাসা করলে এটা উনারা ভালো বলতে পারবেন। বিশেষত মঞ্জুরুল আহসান খানের ভাই কামরুল হাসান খান, যিনি এখন অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন, সেই কামরুল ভাই ভালো বলতে পারবেন। উনারা অংশগ্রহণ করতেন, আমরা করতাম। দু-তিনবার এই প্রতিযোগিতায় আবৃত্তিতে পুরস্কার পাওয়ার পর, একটা মিথ তৈরি হয়, এরপর আমি দাঁড়ালেই একটা পুরস্কার পেয়ে যেতাম। মনে আছে একবার খুব খারাপ করা সত্ত্বেও আমাকে তৃতীয় পুরস্কার দেয়া হয়। আমি বিস্মিত হই। বুঝতে পারি আগের বছরগুলোতে ভালো ফলাফল করার কারণে সে বছর আমাকে আবৃত্তিতে ওই পুরস্কারটা দিয়ে দেয়া হয়। না হলে ওইবার আমার পুরস্কার পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমিনবাগ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন আমার জীবনে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।
সাপ্তাহিক : ওটা কারা চালাতেন?
আলী রীয়াজ : স্থানীয় লোকজন। যেমন ধরেন ওখানে খন্দকার আবু আহমদ সাহেব। মানে আমাদের চাচা। আব্বার বন্ধু। এলাকায় তো এত বাড়িঘর নাই। আব্বার বন্ধু হচ্ছেন খন্দকার সাহেব। ওনার ছেলেরা আমার বন্ধু। পোশাকি নাম এজাজ আহমদ, নিয়াজ আহমদ। ডাকনাম বারু। আমার চেয়ে একটু সিনিয়র। কিন্তু আমার বন্ধু। এলাকায় আমরা একসঙ্গে খেলি, ঘুরি। অবাধ যাতায়াত খন্দকার চাচার বাড়িতে। খন্দকার চাচার সঙ্গে আব্বার বন্ধুত্ব। মাঝখানে কোনো বাড়ি নাই। চাচা বাড়ি থেকে বেরিয়েই ‘হ্যালো’ বলে একটা ডাক দিতেন। ওনাকে আমরা ‘হ্যালো চাচা’ বলে ডাকতাম। ওনারা কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে এটা চালাতেন। সন্ধ্যার সময় আমাদের বাসার সামনে অথবা খন্দকার চাচার বাসায় একসঙ্গে বসে ব্রিজ খেলতেন। মার কাজ ছিল পান এবং চা সরবরাহ করা। আব্বার আবার নেশা বলতে ছিল ওই ‘চা’। সিগারেট, পান কিছুই খেতেন না।
সাপ্তাহিক : আপনার আব্বার পুরো নাম কি ছিল?
আলী রীয়াজ : মহব্বত আলী। মার নাম বিলকিস আরা। আমার হয়ে ওঠা, যতটুকু আমি হয়ে উঠেছি, আমি কিন্তু মনে করি একজন মানুষ একা হয়ে ওঠে না। সে যাই হোক, ভালো হোক কিংবা খারাপ হোকÑ কেউ একা হয় না। একা মানুষ তৈরি হয় না। আমাকে তৈরি করেছে আমার চারপাশ। চারপাশের মানুষ, চারপাশের পরিবেশ। আমার কাছে মনে হয় এই যে আমরা প্রতিদিন কথা বলি, ছোটবেলায় বলেন, বড়বেলায় বলেনÑ এগুলো দিয়েই আমরা হয়ে উঠি। আমাদের হয়ে ওঠাটা এরকম।
আমার যা অর্জন, এটা আবেগি মনে হবে হয়ত, তবুও বলিÑআমি মনে করি আমার বন্ধুরা আমাকে তৈরি করেছেন। আমার শিক্ষক আমাকে তৈরি করেছেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর আমাকে তৈরি করেছে।
সাপ্তাহিক : সেই সময় স্কুলে আপনার সহপাঠী কারা ছিলেন?
আলী রীয়াজ : সহপাঠীদের মধ্যে কারও কারও সঙ্গে যোগাযোগ আছে। যেমন, এইখানে থাকত ইউসুফ বিশ্বাস, ও এখন ওয়াশিংটনের মেরিল্যান্ডে থাকে। স্কুলে আমি ক্রিকেট খেলতাম। ফুটবলও খেলা হতো। এখন আর মাঠটা নেই। দখল হয়ে গেছে। ফুটবল খেলা আমাকে আকর্ষণ করে নাই কখনো। সেটা হতে পারে আমার অদক্ষতার কারণে। ক্রিকেট খেলায় ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে আমি ভালোই করেছিলাম। তখন আবার হায়ার করার রেওয়াজ ছিল। দু’চারবার ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে আমাকে হায়ারে খেলতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ক্লাস নাইন-টেনের ঘটনা এগুলো। এরপর চোখে সমস্যা দেখা দেয়। এসএসসি পরীক্ষার পরে আবিষ্কার করলাম যে আমার চোখটাই খারাপ। আমার ক্রিকেট পারফরম্যান্স সম্ভবত সে কারণে কিছুটা নিচের দিকে পড়ে যায়। ফলে আমারও উৎসাহ থাকল না ক্রিকেট নিয়ে এবং অন্যরাও উৎসাহ দেখাল না। পারফর্ম না করলে তো আর কেউ বেশিদিন খেলোয়াড়ের প্রতি উৎসাহ দেখাবে না। এছাড়া খেলাধুলার প্রতি আমার বেশি উৎসাহ ছিল না।
সাপ্তাহিক : আপনার ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার রেজাল্ট কেমন ছিল?
আলী রীয়াজ : ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় খুবই খারাপ রেজাল্ট করেছি। তখন আবার অন্য বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছি। জাসদ রাজনীতির সঙ্গে। জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতিই আমাকে আকর্ষণ করেছে।
সাপ্তাহিক : জাসদের রাজনীতিতে আকৃষ্ট হবার কারণ কী?
আলী রীয়াজ : সবচেয়ে বেশি যেটা আমাকে প্রণোদিত করেছিল সেটা হচ্ছে তারুণ্য। বদলে দেবার আকাক্সক্ষা। সম্ভাবনাকে অর্জন করার প্রচেষ্টা। এখন আমি এভাবেই বিশ্লেষণ করি, তখন এভাবে করিনি।
কেন অন্য দল না করে আমি জাসদের রাজনীতি করেছি? জাসদের সঙ্গেই আমার কেন ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো? এ প্রশ্নটা আমি নিজেকেও করেছি। পরবর্তী সময়ে আরও বেশি সক্রিয় হলাম। কলেজ জীবনের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রাজনীতিতে আরও বেশি অ্যাকটিভিস্ট হয়ে উঠলাম।
আমার মনে হয় আকর্ষিত হবার একটা কারণ, নতুন কিছু দেবার একটা আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল তরুণদের মধ্যে। আমি দেখতে পারতাম, বাংলাদেশে যে সম্ভাবনার জায়গা, সে সম্ভাবনার জায়গাটা হয়ত তারা বাস্তবায়িত করতে পারবে।
সাপ্তাহিক : মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে আপনি কি করেছেন?
আলী রীয়াজ : আমি মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে গ্রামে চলে গিয়েছিলাম। মতলবের গজরা গ্রামে। আমাদের বাড়ির কাছে স্কুল। স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং চলছিল। ওখানে পুলিশ এবং ইপিআরের কিছু লোক গ্রামে ফিরে যায়। তারাই ট্রেনিং শুরু করে। পরে তাদের একটা দল ভারতে যায়। ফিরে এসে তারাই স্কুল ঘরে ট্রেনিং দিচ্ছিল। আমার ভাই আলী মনোয়ার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। মনোয়ার ভাই ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) গ্রুপের সদস্য ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র। আমার দুই চাচাত ভাই খুবই একটিভভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট করা, ট্রেনিং দেবার আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা। এসব দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমিও মুক্তিযোদ্ধা হব। ভাইদের না জানিয়ে ট্রেনিংয়ের আশায় আমি গিয়ে গোপনে ওদের ওখানে হাজির হলাম। আমার শরীরের আকার-আকৃতি তখন খুবই ছোট ছিল। এখন হয়ত একটু দৈর্ঘ্যে বেড়েছি। তখন এতই ছোট ছিলাম যে, আমার এক বন্ধুর বোন আমাকে বলত, তুমি তো টোটা দিয়ে বেগুন পাড়বা।
মুক্তিযোদ্ধাদের ওই ট্রেনিং ক্যাম্পে গেলাম। ওরা আমাকে থ্রি নট থ্রি বন্দুক দেখিয়ে তার পাশে দাঁড় করিয়ে বলল, বন্দুকটা তোমার চেয়ে বড়। তুমি একটু বড় হও, বন্দুকের সমান হলে তোমাকে ট্রেনিংয়ের জন্য নেয়া হবে। ওই প্রথম আকার-আকৃতিতে ছোট থাকার জন্য খুবই হতাশা বোধ করি। লম্বা হলে হয়ত মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া হতো। এই ঘটনার আগে পর্যন্ত এ নিয়ে আমার কোনো বেদনা ছিল না।
সাপ্তাহিক : জাসদে কেন আসলেন, সে প্রসঙ্গে বলছিলেন...
আলী রীয়াজ : আমি প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারলাম না। সেটা একটা ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল। সম্ভবত সেই পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাটাই টেনেছে। তখন অবশ্য এত অঙ্ক-কষে, ভেবে রাজনীতি করি নাই। এখন ভেবে বলছি।
সাপ্তাহিক : আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন কখন?
আলী রীয়াজ : আমি ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। সাংবাদিকতা বিভাগে। সেটাও একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আগে ১৯৭৫/৭৬, বিশেষ করে ১৯৭৬ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত আমি অনেক রকম কাজ করলাম। সাংবাদিকতা এর মধ্যে একটা।
সাপ্তাহিক : দৈনিক সংবাদে কাজ করলেন?
আলী রীয়াজ : না, সংবাদে আমি অনেক পরে কাজ করেছি। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে, আমার প্রথম লেখালেখিটা শুরু হয় পূর্বদেশে। পূর্বদেশ কাগজটাতে খাদিম ভাই ছিলেন এবং সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন হেলাল হাফিজ। আমি তখন সাহিত্য নিয়ে লেখালেখি করি। তার আগে যেখানে পারি, লেখা পাঠাই পোস্টের মাধ্যমে। ‘গণকণ্ঠে’ লেখা ছাপা হয়েছে। ডাক অফিসের মাধ্যমে এসব লেখা পাঠাই। এর একটা কারণ আছেÑ আমার বদ্ধমূল ধারণা আমাকে শারীরিকভাবে দেখলে আমার গদ্য রচনা কেউ ছাপবে না। কারণ এত কম বয়সে লোকে এসব জিনিস লিখতে পারে, অনুমান হতেই পারে এটা আমি নকল-টকল করেছি। কারণ আকারে আমি ছোট তো। আমি একটু লম্বা হওয়া শুরু করি ১৯৭৪-৭৫ সালের পরে। এখন ধরুন এইচএসসি পড়া একজন স্টুডেন্ট ‘সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ’ নিয়ে একটা লেখা লিখেছে, এটা তাকে দেখে কি ছাপবে বলেন? অথচ আমি ডাকে ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় পাঠিয়েছি, লেখা ছাপা হয়েছে। এরকম লেখালেখি করি। এর মধ্যে একদিন ‘পূর্বদেশ’-এ হেলাল হাফিজের কাছে গেলাম। ভরসা করে একটা লেখা দিয়ে দেখলাম, হেলাল ভাই ছাপল। ছাপার পর হেলাল ভাই আমাকে উৎসাহিত করলেন। বললেন, মাঝে মাঝে আসো। কি কথায় আমাকে একটা বই ধরিয়ে দিলেন। বললেন, বইটার একটা রিভিউ করো। আমি ভাবলাম, ভালোই, একটা বই তো পড়া যাবে। বইটি পড়ে আমি রিভিউ করলাম। ওই রকম টুকিটাকি কাজ করতে লাগলাম।
সে সময় একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে প্রচুর সংকলন বের হতো। সংকলনগুলো পত্রিকা অফিসে দিত আলোচনা লেখার জন্য। শ’য়ে শ’য়ে সংকলন আসত। দু’কপি করে চাওয়া হতো। কোনো কোনো পত্রিকা তিন কপি করে চাইত। ১৯৭৪ সালে হেলাল হাফিজ এরকম বেশ কিছু সংকলন ধরিয়ে দিয়ে বললেন, রিভিউ করবা। একপাতা জায়গা দেয়া হবে। আমি তো মহাখুশি। এতগুলো সংকলন পাওয়া গেল। আমি ওই খুশিতেই রাজি হয়ে গেলাম। পরে বুঝলাম কাজটা অত সহজ না।
এভাবেই লেখালেখির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া। সে সময় আমি মূলত সাহিত্য বিষয়ক লেখালেখিই করতাম।
সাপ্তাহিক : আপনি তো তখনকার বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘বিচিত্রা’-তেও লিখতেন?
আলী রীয়াজ : ঘটনাচক্রে আমি বিচিত্রা’য় লেখালেখি শুরু করলাম। ঘটনাটা হচ্ছে এই, আমার ভাই আলী মনোয়ার দেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে গেলেন। উনি ছিলেন বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শাহাদত ভাইর সঙ্গে আলী মনোয়ার ভাইর একধরনের চুক্তি হলো যে, উনি আমেরিকা থেকে ‘নিউইয়র্কের চিঠি’ বলে একটা জিনিস লিখবেন। তখন তো ই-মেইল, ইন্টারনেটের যুগ নয়। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে লেখা পাঠাতেন। ১৫ দিন পরে আসত। সেটা আবার আমাকে ‘বিচিত্রা’ অফিসে নিয়ে যেতে হয়। সেই সূত্রে শাহাদত চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয়। এর মধ্যে শাহাদত ভাই সম্ভবত আমার দু-একটা লেখা দেখে থাকবেন। শাহাদত ভাই আমাকে বললেন, তুমি আর কী করো? আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বললাম, লিখি। উনি বললেন, তাহলে আমাদের এখানে লেখ। কী লিখবা?
তখন শাহাদত ভাই পরীক্ষামূলকভাবে আমাকে কী একটা অনুবাদের কাজ ধরিয়ে দিলেন। বললেন, এইটা করো।
তখন ‘বিচিত্রা’ অফিস কিন্তু বিশাল অফিস নয়। একটা ঘর। একটা টেবিলে শাহাদত ভাই বসেন। অন্যটাতে স্টাফরা শেয়ার করে সবাই। স্টাফরা আর ফ্রিল্যান্সাররা বসে। চেয়ারে ছারপোকা ছিল খুব। বেশিক্ষণ বসা যেত না। আমার ধারণা ছিল, শাহাদত ভাইরা ছারপোকার ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছিলেন। যাতে কেউ বেশিক্ষণ বসতে না পারে। তাড়াতাড়ি চলে যায়।
আমি অনুবাদটা করলাম। তারপর সেইসূত্রে যুক্ত হয়ে পড়লাম, কনট্রিবিউটর হিসেবে।
সাপ্তাহিক : এটা কোন সময়ে?
আলী রীয়াজ : আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ছি। ১৯৭৫ সাল। তারপরে ১৯৭৬-এ যেহেতু কিছু করার নেই।  ১৯৭৭ সালের ব্যাচ পাস না করা পর্যন্ত আমাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হচ্ছে না। আর কী করা! বিচিত্রায় লিখি। ছোটখাটো নানান কাগজে লিখি। তখন ‘রিপোর্টার’ বলে ট্যাবলয়েড একটা কাগজ ছিল। ট্যাবলয়েড আকারে প্রকাশিত হতো। সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম ট্যাবলয়েড পত্রিকা। প্রকৃতই ট্যাবলয়েড আকারে বেরুতো। সেটাতেও আমি কিছুদিন চাকরি করেছি। তখন কামাল ভাই এডিটর ছিলেন, পরে এরশাদ মজুমদার এডিটর হয়েছিলেন।
‘সত্যকথা’ বলে একটা কাগজ ছিল। সেখানেও ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করি। কারণ আর্থিকভাবে এটা লাভবান ছিল। বিচিত্রা’য় কাভার স্টোরি লিখে ২৫০ টাকা পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। এত্ত টাকা!
সাপ্তাহিক : কাভার স্টোরিটা কী ছিল?
আলী রীয়াজ : আমি কতগুলো কাজ করেছিলাম। একবার সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী ভাইর সঙ্গে একসঙ্গে খানিকটা অনুবাদ, খানিকটা লেখালেখি। বিষয় ছিল ‘চলচ্চিত্রের পদ্ধতিগত শিক্ষা’। তখন পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পড়ে এসেছেন টুটুল ভাই, জাকী ভাই। এরকম সময় ‘বিচিত্রা’ এই কাভার স্টোরিটা করে।
একবার পোশাকের বিবর্তন নিয়ে বিচিত্রা একটা কাভার স্টোরি করে।
প্রথমবার কাভার স্টোরি লেখার জন্য ‘বিচিত্রা’ থেকে ২৫০ টাকা পেলাম। ‘সংবাদ’-এ লিখলে ২৫ টাকা, ‘দৈনিক বাংলায়’ লিখলে ২৫ টাকা পাওয়া যায়, সেখানে ২৫০ টাকা। মানে এটা অবিশ্বাস্য! আমাকে যখন এ বিলটা দিচ্ছে, আমার মনে হলো ভুলটুল করছে বোধহয়। কিন্তু বলা ঠিক হবে না, আমি টাকা নিয়ে দ্রুত চলে এলাম। পরে দেখলাম যে, না, এটাই নিয়ম। দৈনিক বাংলার একাউন্ট সেকশনে নিয়ম ছিল, পরের মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বিল পাওয়া যেত। এটা একটা এক্সাইটিং ব্যাপার। নির্দিষ্ট সময়ে টাকাটা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পরিকল্পনা করতে পারা যায় যে, ১০ তারিখে গিয়ে আমি টাকাটা পাব, ফলে আমি এটা করতে পারব, ওটা করতে পারব। অন্য কোনো কাগজে নিয়মিত লেখকের বিল এভাবে পাওয়া হতো না। ‘রিপোর্টার’-এ যে কয়েক মাস কাজ করেছি সেখানে বেতনভুক ছিলাম। আর সব জায়গাতেই কাজ করেছি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে।
সাপ্তাহিক : এই সময় আপনার পঠন পাঠনের সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে?
আলী রীয়াজ : পাবলিক লাইব্রেরি আমাকে সে সুযোগ দিয়েছে। বাসায় আলী আনোয়ার ভাইয়ের প্রচুর বই ছিল। যদিও আলী আনোয়ার ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কারণে সেখানেই থাকতেন তবুও বাসায় প্রচুর বই রেখে গিয়েছিলেন। আলী মনোয়ার ভাই যেহেতু প্রচুর লেখালেখির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট ছিলেন, ছাত্র-ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) করতেন। ওই সময় যারা ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) করতেন, ধরে নেয়া হয় যে তারা মেধাবী ছিলেন, প্রচুর পড়াশোনা করতেন।
সাপ্তাহিক : তার মানে, আপনাদের বাসায় পড়াশোনার পরিবেশ ও উপকরণ ছিল?
আলী রীয়াজ : আসলে আমি যে ঘরে থাকতাম, মানে বাসায়, বড় হবার কারণে আমি জায়গা পেলাম মনোয়ার ভাইর রুমে। ওই ঘরের চারিদিকে ছিল শুধু বই আর বই। ফলে ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে মার্ক্সের লেখা ‘ডাস ক্যাপিটাল’ বইটি পড়ে বোঝার চেষ্টা করছি। যদিও কিছুই বুঝি নাই। এটা দেখে আলী মনোয়ার ভাই বললেন ‘ডাস ক্যাপিটাল’ বইটি পড়ে কিছুই বুঝা যাবে না যদি না তার আগে এই বইটা পড়িস! ‘ব্যাসিক অব দ্য মার্ক্সসিজম’ বলে আমাকে অন্য একটা বই ধরিয়ে দিলেন। তখন বুঝলাম আসলেই আমি একটা নির্বোধের মতো ‘ডাস ক্যাপিটাল’ দিয়ে মার্ক্সসিজম পড়া শুরু করে ছিলাম। ‘ডাস ক্যাপিটাল’ এখনো ভালো করে বুঝি না।
পরে আলী মনোয়ার ভাই আমেরিকা চলে গেলেন। তিনি সেখান থেকে লেখা পাঠান। সেই লেখা আমি ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি। সেই সূত্রে শাহাদত চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয়। সেখানে শাহাদত ভাই আমাকে কাজে লাগিয়ে দিলেন।
প্রথমে অনুবাদ করি। মনে আছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় একটি কাভার স্টোরি ছিল জ্বালানি তেলের ওপর। ১৯৭৪ সালে গাল্ফের (মধ্যপ্রাচ্যের) দেশগুলো তেল পেতে শুরু করেছে, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সেটা নিয়েই প্রচ্ছদ কাহিনী করেছে। শাহাদত চৌধুরী সেটা ধরিয়ে দিলেন। আমি আবার ঠিক আক্ষরিক অনুবাদ না করে সেটা থেকে তথ্য নিয়ে নিজের মতো করে একটা স্টোরি লিখলাম। নাম দেয়া হলো ‘তেলের টাকা যায় কোথায়’!
সুতরাং আমার পঠন পরিবেশ গড়ে ওঠে মূলত পাবলিক লাইব্রেরি, বাড়ির পরিবেশ, পরে ব্রিটিশ কাউন্সিল, প্রেসক্লাবের উল্টোদিকে ছিল আমেরিকান কালচারাল সেন্টার ইউসিস (টঝওঝ)Ñ এসব মিলিয়েই গড়ে ওঠে।
তখন আর্থিক সঙ্কট ছিল কারণ আমার পরিবার আমার পকেটে টাকা ধরিয়ে দেবে, আর আমি রিকশায় করে ঘুরে বেড়াবোÑ এ রকম সঙ্গতি ছিল না। স্টেডিয়ামে ‘ম্যারিয়েটা’ বলে একটা বইয়ের দোকান ছিল। ওটা ছিল আমার একটা প্রিয় জায়গা। ওখানে আরেকটা বইয়ের দোকান ছিল ‘কথা’ কিংবা অন্য কোনো নামে। নামটা সঠিক মনে করতে পারছি না। স্টেডিয়ামে আমি যেতাম হেঁটে। পুরানা পল্টন মোড় দিয়ে হেঁটে চলে যেতাম। এখন মনে হয় অনেক দূরের পথ। তখন মোটেই সেটা মনে হতো না। সিদ্বেশ্বরী থেকে হাঁটা শুরু করে হাউজ বিল্ডিং করপোরেশনের ঠিক পাশ দিয়ে বেরিয়ে রাস্তা ক্রস করে কোনাকুনি স্টেডিয়াম মার্কেটে যেতাম। তখন আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘শিল্পকলা’ বলে একটা লিটল ম্যাগাজিন বেরুতো। ওটা কেনার মতো পয়সা আমার ছিল না বলে এই পত্রিকার অধিকাংশ সংখ্যা বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পড়েছি। পরে আমি কিছু কিছু সংগ্রহ করেছি। সেসময় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত সাহিত্য কাগজ ‘কণ্ঠস্বর’ বেরুতো। সেটাও ওই বইয়ের দোকানেই পড়া হতো।
সাপ্তাহিক : এসব সাহিত্য, শিল্প কাগজের সঙ্গে জড়ানোর সুযোগ কী হয়েছিল আপনার?
আলী রীয়াজ : ১৯৭৬ সালে পরে একার্থে ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হই। সায়ীদ স্যারের বাসায় একটা আড্ডা হতো। সেটার সঙ্গে যুক্ত হই। সায়ীদ স্যারের বাসার ওই আড্ডায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন সুলতানা রেবু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। রেবু আপা আমাকে কী কারণে সায়ীদ স্যারের গ্রিন রোডের বাসায় নিয়ে গেলেন। যেয়ে দেখি ওখানে একটা আড্ডা হয়। আমিও এক কোণায় বসা শুরু করে দিলাম। নির্মলেন্দু গুণ, নুরুল হুদা... এদের সঙ্গে পরিচয় হলো। ইতোমধ্যে কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো। কারণ প্রবাসে থাকা আমার ভাই আলী মনোয়ার বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশের জন্য দুটো বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করে সেখানে দিতে বলেছেন। আমার কাজ ছিল যে লেখাগুলো ছাপা হয়েছে সেগুলো কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে হুদা ভাইয়ের কাছে পৌঁছানো। এই সূত্রে আমার সঙ্গে নুরুল হুদা ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ। যেকোনো কারণে হোক তিনিও আমাকে পছন্দ করলেন। আমিও হুদা ভাইয়ের সঙ্গে যথেষ্ট যোগাযোগ রক্ষা করে চললাম।
সায়ীদ স্যারের বাসার আড্ডায় নির্মলেন্দু গুণ আসেন, আবদুল মান্নান সৈয়দ আসেনÑ তাদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি হলো।
ইতোমধ্যে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সঙ্গে ১৯৭৪ এর পর আমার পরিচয় হয়েছে। আমরা একভাবে চিন্তাভাবনা করি সাহিত্য নিয়ে। কবি কামাল চৌধুরী (এখন যিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব), কবি জাফর ওয়াজেদসহ ঢাকা কলেজকেন্দ্রিক বন্ধুদের সঙ্গে এক ধরনের পরিচিত, সংস্কৃতি বলয় তৈরি হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : আপনি তো শাহাদত চৌধুরীকে মোটামুটি কাছে থেকেই দেখলেন। আপনার তরুণ বয়সে ডাকসাইটে সম্পাদক হিসেবে পেলেন। আজ পরিণত বয়সে দাঁড়িয়ে শাহাদত চৌধুরী সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করতে বলি...
আলী রীয়াজ : মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত চৌধুরী ছিলেন রক্তে-মাংসে-মজ্জায় এডিটর। কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে শাহাদত ভাই সবসময় ‘বিচিত্রা’ নিয়েই ভাবতেন। আর কিছু ভাবতেন বলে আমার মনে হয় না। ওটাই ছিল তার স্বপ্ন-ধ্যান। আমার কাছে মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরত আসার পরে শাহাদত ভাই সম্ভবত ‘বিচিত্রা’কেই মুক্তিযুদ্ধের এক্সটেশন ভেবেছিলেন। কী অর্থে? দেখেন এক হচ্ছে, নতুন কিছু করার জন্য তার নিত্য চেষ্টা ছিল। আপনি যদি ‘বিচিত্রা’-এর কাভার স্টোরিগুলোর দিকে খেয়াল করেন, ‘বিচিত্রা’র ফরমেট দেখেন তবে দেখবেনÑ এগুলো একেবারেই নতুন। দ্বিতীয় হচ্ছে, বাংলাদেশে সম্ভবত ওই প্রথম, ওই অর্থে ধারাটা তৈরি হলো, যে একটা নিউজ ম্যাগাজিন। নিউজ ম্যাগাজিনের ধারণাটা তৈরি হচ্ছে কোথা থেকে? অ্যাকাউন্টিবিলিটি বা জবাবদিহিতার ধারণা থেকে। বিচিত্রা’র মাধ্যমে আপনি প্রশ্ন করছেন, জানতে চাইছেন সমকালীন রাজনীতি সম্পর্কে।
‘বিচিত্রা’র কাভার স্টোরি একবার হয়েছিল ‘পিটিয়ে মারা’ বা লিন্চিং নিয়ে। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের নাম করে অথবা মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ রাস্তায় ছিনতাই করছে, সেই ছিনতাইকারীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। ওই কাভার স্টোরিটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কারণ, যখন পাবলিকলি ছিনতাইকারী পিটিয়ে মারাটা প্রায় এক্সসেপটেবল হয়ে যাচ্ছে, গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাচ্ছেÑ মানুষ ভাবছে যে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার অবকাঠামো অনুপস্থিত, তখন আমরাই হাতে তুলে নেব আইন, ‘বিচিত্রা’ কিন্তু তার বিরুদ্ধে বলছে। ‘বিচিত্রা’ বলছেÑনা, না, এটা উচিত নয়। ভালো নয়। বড় চুলের একটা লোক ছিনতাই করলেই সে নিজেকে যেমন মুক্তিযোদ্ধা দাবি করতে পারে না, তেমনি এরকম কাউকে ছিনতাইকারী বলে পিটিয়ে মারাটাও আপনি করতে পারেন না। এই জিনিসটা আমার কাছে মনে হয় পুরো শাহাদত চৌধুরী।
শাহাদত চৌধুরী ওই যে বসে কাগজ ছিঁড়তেন, শাহাদত ভাই সারাক্ষণ কাগজ ছিঁড়তেনÑ ওইটা আমার ধারণা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে অস্থিরতাটা তৈরি হয়েছে, সেটার একটা বহিঃপ্রকাশ এটা হতে পারে। তখন তো ছোট নিউজপ্রিন্টের প্যাড ছিল, সার্বক্ষণিক তিনি সেই কাগজ ছিঁড়তেন। আমার মনে হয় ওই কাগজ ছেঁড়ার মতোই ওনার মাথার মধ্যে আইডিয়া শাফলিং হতো যে, এটার পরে কী? এটার পর ‘বিচিত্রা’য় আমরা কী নিয়ে কাভার স্টোরি করতে পারি। ‘ফ্যাশন’ নিয়ে কাভার স্টোরি হচ্ছে, ‘পলিটিক্স’ নিয়ে কাভার স্টোরি হচ্ছে। হঠাৎ করে মনে হলো সারা বাংলাদেশের জেলাগুলো নিয়ে একটা কাভার স্টোরি করা যায় কী না? স্পোর্টস নিয়ে, এন্টারটেইনমেন্ট নিয়ে কাভার স্টোরি হচ্ছে। এই যে এত বিচিত্র বিষয় নিয়ে ‘বিচিত্রা’য় কাভার স্টোরি করাÑ সব মিলিয়ে মনে হয় শাহাদত চৌধুরী সার্বক্ষণিক ‘বিচিত্রা’মগ্ন মানুষ ছিলেন।
আরেকটা জিনিস হচ্ছে, উনি এক অর্থে ‘লিডার’। ‘লিডার’Ñ এই অর্থে উনি আসলে নিজে যতটা না করেছেন, অন্যদের দিয়ে করিয়েছেন। এটা আমার কাছে মনে হয় সংগঠক এবং নেতৃত্বের একটা বড় গুণ। আপনাকেই সব করতে হবে কেন? ফ্রিল্যান্সার কন্ট্রিবিউটর হিসেবেও আমি কাজ করছি, শাহাদত ভাই আমারও মতামত নিচ্ছেন, এটা করা যায় কি না? ওটা কি করা যায়? কী মনে হয়। উনি জিজ্ঞাসা করতেন। আমি হয়ত বললাম, করা যায়। পরে বললেন, না এটা হয়ত খুব ভালো হবে না। ওটা হয়ত পরে করলেনও না। উনার মনে হয়েছে ‘করা যায়’ কিংবা ‘করা যায় না’Ñ উনি আরেকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে চিন্তাটা ভেরিফাই করতেন। দেখতেন, যেটা ভাবছেন সেটা একটা রিয়েলস্টিক আইডিয়া কি না। অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে উনি হয়ত বলছেন, ‘এটা আমরা করব’। শাহাদত ভাই বলছেন এটা করব, মানে, আমরা এটা করবই। তারপরে দেখা গেল যে উনি ওই স্টোরিটা করলেন না। বললেন, পরে অন্য কেউ বলল যে করা যাবে না। মনে হয় ওটাই ঠিক। এই যে, এগুলোই হচ্ছে লিডারশিপের পরিচয়। আপনি একটা টিম তৈরি করে কাজ করছেন। শাহাদত চৌধুরীর সঙ্গে আমার কাজ করার যতটুকু সুযোগ হয়েছে, তা থেকে আমার এসব মনে হয়েছে।
এজন্যই আমি বলি, উনি ছিলেন রক্তে-মাংসে-মজ্জায় একজন এডিটর।
শাহাদত ভাই ‘বিচিত্রা’ নিয়েই ছিলেন। ওটাই ছিল ওনার জগত।
সাপ্তাহিক : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সম্পাদনা করতেন সাহিত্য-শিল্পের লিটল ম্যাগাজিন ‘কণ্ঠস্বর’। সেটা ঘিরে স্যারের বাসায় একটা আড্ডা হতো। আপনি সে আড্ডায় যেতেন বলেছেন। এ সম্পর্কে যদি একটু বলতেন...
আলী রীয়াজ : ‘কণ্ঠস্বর’ এর আড্ডাটা ছিল খুব ইন্টারেস্টিং। এটা হতো উইকএন্ডে। তখন সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল রোববার। সকাল ১১টার মধ্যে সায়ীদ স্যারের বাসায় সবার এসে হাজির হতে হতো। সারাদিন ওখানে আড্ডা চলত। গ্রিন রোডে স্যারের ছোট্ট বাসা। তার একটা রুমে গাদাগাদি করে বসা হতো। তখন অবশ্য ওই জিনিস কখনো মনে হয়নি যে আমরা গাদাগাদি করে বসে আছি। এক পর্যায়ে হঠাৎ করে আবিষ্কৃত হলো যে, এই যে সবাই দুপুরে খাই, এটা আসে কোথা থেকে? ভাবি একবার বললেন, এই যে তোমাদের স্যার, ওনাকে নিয়ে এক অসুবিধা, দুপুর বেলা বলে, খাইতে দেওÑ এ যে কি অসুবিধা? সায়ীদ স্যারকে কে যেন এ নিয়ে বলল। বলার পর তখন সায়ীদ স্যার বললেন, এবার থেকে তোমরা সবাই বাজার করে নিয়ে আসবা। পরের সপ্তাহে কবি নির্মলেন্দু গুণ এক বিশাল মাছের মাথা নিয়ে এসে হাজির হলো। তখন ভাবি বললেন, এ তো আরেক ঝামেলা হলো। এটা এখন রান্না করবে কে? এই রকম আর কী।
ওই আড্ডার একটা বিশাল আনন্দ ছিল। এই আড্ডায় নির্মলেন্দু গুণ, নুরুল হুদা, আবদুল মান্নান সৈয়দ আসতেন। তরুণদের মধ্যে আসত রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ইফতেখারুল ইসলাম (ওষুধ কোম্পানির বড় কর্তা ছিল, এখন কানাডায় আছে)। আমরা যারা নতুন লেখালেখি করার ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছি তারা এবং অন্যরা যেতাম। ওই আড্ডায় বিচিত্র বিষয় নিয়ে কথা হতো। সাহিত্য, সংস্কৃতিই প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল।
সাপ্তাহিক : এই আড্ডাটা আপনার জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেছে?
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ, এইভাবে আমার আমি হয়ে ওঠা। স্কুলে জীবনানন্দ বড়–য়া স্যার, কিংবা ধরুন সায়ীদ স্যারের বাসার আড্ডায় বসে থাকা, সবার কথা শোনা, কিংবা পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরÑ এইভাবেই আমরা হয়ে উঠি।
সাপ্তাহিক : আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আবার ফিরে আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করলেন কবে?
আলী রীয়াজ : ১৯৭৮ সালে আমরা ক্লাস শুরু করলাম।
সাপ্তাহিক : সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হলেন কেন?
আলী রীয়াজ : আমার খুব স্বপ্ন ছিল সোসিওলোজি (সমাজ বিজ্ঞান) কিংবা ল’তে পড়ব। আমি যেহেতু রাজনীতি করছি, আমার সমাজটা বোঝা দরকার। এবং পদ্ধতিগতভাবেই বোঝা দরকার। আমার কতগুলো টুলস এচিভ করা দরকার যাতে আমি সমাজটা পদ্ধতিগতভাবে বুঝতে পারি। ইতোমধ্যে আমি বেসিক মার্কসিস্ট লিটারেচার পড়ার চেষ্টা করেছি। তার এক্সটেনশন হিসেবে দেবীপ্রসাদ ভট্টাচার্যের ‘যে গল্পের শেষ নেই’ বই থেকে শুরু করে অধ্যাপক নাজমুল করীমের বাংলাদেশের সমাজ বিশ্লেষণ পড়ছি। আসলে অধ্যাপক নাজমুল করিমের বই আমি পড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার আগেই। সেটা হয়ত আমাকে সোসিওলোজি পড়ার জন্য খানিকটা প্রভাবিত করেও থাকতে পারে। আমি ঠিক করলাম সোসিওলজি পড়ব অথবা ‘ল’ পড়ব। তখন তো বিভাগওয়ারী ফরম তুলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়। সোসিওলোজিতে আর ল’তে ফরম তুলে ফিলাপ করে জমা দিলাম। ফরম তুললাম, পরীক্ষা দিলাম।
তখন আমরা জানতে পারলাম জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে প্রথমবারের মতো অনার্স ব্যাচে ভর্তি করা হবে। এখন জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে ফরম নিব কি নিব না ভাবছি। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. মোমিন চৌধুরী কেন যেন আমাকে ধরে বললেন, তুমি কোথায় পড়বা? স্যার যেকোনোভাবে হোক আমাকে চিনতেন। মোমিন চৌধুরী স্যারকে বললাম, স্যার, সোসিওলোজি পড়ব। উনি বললেন, কেন, তার চেয়ে হিস্ট্রি পড়। উনি বুঝালেন, তাহলে তো তুমি সমাজ আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে। আমার পরিকল্পনা কিন্তু সমাজবিজ্ঞান কিংবা আইন বিভাগে পড়া। আমার ধারণা, আমি যেহেতু ঝগড়াঝাটি ভালোই করতে পারি ফলে ল’তে ভালোই করব। ল’ বিভাগে ফরম জমা দিলাম। ভর্তি পরীক্ষাও দিলাম। কারা যেন জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে ফরম জমা দিতে গেছে শেষ দিনে। তারা জানাল জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে আমাদের ব্যাচে সর্বমোট ১৮ জনকে নেয়া হবে। তার মধ্যে ৩ জন কোটায় আসবে। শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা ও আদিবাসী কোটা। দুই ব্যাচ একত্রিত করে ভর্তি করা হচ্ছে। আমার ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট মোটেই ভালো না। কাজেই বুঝতে পারেন, আমার দ্বিধাটা কোথায়। বুঝলাম, এখানে তো চান্স পাওয়া যাবে না। আরও ভীত হয়ে পড়লাম। জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে ফরম জমা দিয়ে, অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে আসলাম মজিদ ভাইর কাছ থেকে। মজিদ ভাই ডিপার্টমেন্ট থেকে এখন অবসর নিয়েছেন। অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে হেঁটে আসলাম। খেয়াল করে দেখি আমার সিরিয়াল ১৭০০ এর ওপরে। আমি ভাবলাম কোথাও একটা ভুল হয়ত হয়েছে। হয়ত একটা শূন্য বাড়তি পড়েছে। আমি ফিরে গিয়ে মজিদ ভাইকে গিয়ে দেখালাম। বললাম, সিরিয়াল নাম্বারটা বোধ হয় ভুল হইছে। উনি বললেন, আরে, যান যান, এখনো তো দিন শেষ হয় নাই, আরও কয়েক’শ পড়বে। আরও ভীতও হয়ে পড়লাম। ইতোমধ্যে হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ইন্টারভিউ দিয়ে পাস করায় আমাকে একটা ফরমও দিয়ে দিয়েছে। আমি নিয়ে এসেছি। ততদিনে ল’ বিভাগে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। আমার ধারণা আমি ভালোই করেছি। সোসিওলজিতে আমি পরীক্ষাই দিলাম না। জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে লিখিত পরীক্ষা দিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলাম। কিন্তু একটা ভুল করেছি।
সাপ্তাহিক : তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ধরন কেমন ছিল?
আলী রীয়াজ : লিখিত পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি ছিল। জেনারেল নলেজ বলতে ছিল কিছু ক্যারেক্টার বা ঘটনা, যেটা সম্পর্কে দুই লাইন করে লিখতে হবে। একটা ইংরেজি অথবা বাংলায় রচনা লিখতে হবে। একটা প্যারাগ্রাফ ইংরেজি অনুবাদ করতে হবে। একটা বাংলা প্যারাগ্রাফ ইংরেজি অনুবাদ করতে হবে। সোসিওলজির ভর্তি পরীক্ষা হলো জার্নালিজমের আগে। ল’তে লিখিত পরীক্ষা ভালো দিয়েছি। ঠিক করলাম সোসিওলজিতে লিখিত পরীক্ষা দেব না। তখন লিখিত পরীক্ষার পর ভাইভা হতো। লিখিত পরীক্ষায় যত আসন আছে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাস করানো হতো। কিন্তু সোসিওলজি পরীক্ষার হলে বসে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, পরীক্ষাটা দেব না। আমি সাদা খাতা জমা দিলাম। এক ঘণ্টার আগে পরীক্ষার হল থেকে বেরুতে দেয় না। আমি না লিখে চুপচাপ বসে আছি। ইনভিজিলেটর এসে বললেন, লিখছ না কেন? তারা হয়ত ভাবছেন, সুযোগ পেলে নকল করবে। সে কারণেই চুপচাপ বসে আছে। আমি সাদা খাতা জমা দিয়ে এলাম। তখন আমার জন্য চয়েজের জায়গাটা হলো হিস্ট্রিতে ভর্তি হওয়া অথবা ল’য়ের জন্য অপেক্ষা করা। জার্নালিজমে পরীক্ষা দিয়ে মনে হলো চান্স হবে মনে হয়। কিন্তু ভয় ছিল ১৭শ জনের মধ্যে নেবে মাত্র ১৫ জন। সম্ভাবনা খুব কম। যা হোক, ফরচুনেটলি ১০০ জনকে সম্ভবত ভাইভাতে ডাকা হলো। আমি উপরের দিকেই ছিলাম। শওকত মাহমুদ আমাদের ব্যাচের, সুব্রত ধর আমাদের ব্যাচের। শওকত সম্ভবত আমাদের সময়ে ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিল। ফয়সাল মোকাম্মেল আমাদের ব্যাচের। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকে আছে। আমাদের সঙ্গে আরও ছিল রীনা সুলতানা। সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এএমএস কিবরিয়া সাহেবের পুত্রবধূ। একসময় শেরাটন হোটেলের জনসংযোগ কর্মকর্তা এবং পরে সংসদ সদস্য, প্রয়াত রাশেদা মহিউদ্দিন আমাদের ব্যাচে ছিলেন।
যা হোক, পরে ভাইভা দিয়ে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে চান্স পেলাম।
সাপ্তাহিক : অন্যান্য বিভাগে আর গেলেন না?
আলী রীয়াজ : না, অন্যান্য বিভাগে আর ভাইভাতে যাইনি। যদিও জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে ভর্তি নিয়ে আমার সংশয় ও ভয়ও ছিল। এত ছাত্রের মধ্যে চান্স হবে কি না? আমি আবার লিখিত পরীক্ষায় একটা ভুলও করে ফেলেছিলাম। ভুলটা আমার এখনও মনে আছে। একটা প্রশ্ন ছিল, মোশাররফ হোসেন, তার সম্পর্কে লিখতে হবে। তখন সাঁতারু মোশাররফ হোসেন ছিলেন, আর ছিলেন ডিসিএমএলএ (ডেপুটি চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর) মোশাররফ হোসেন। আমি খুব নির্দ্বিধায়, আমার মনেই হয়নি এটা সাঁতারু মোশাররফ হোসেন হতে পারে, রাজনীতির ঘোরে আমি ডিসিএমএলএ মোশাররফ, নেভাল চিফ ছিলেন তাকে নিয়ে বহু কিছু লিখে দিয়ে আসলাম। পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসার পর অন্যরা বলে যে, এটা হবে সাঁতারু মোশাররফ হোসেন। বাকি প্রশ্নের উত্তর আমি খারাপ করিনি। বিশেষ করে রচনাটাÑ কোনো পরীক্ষার খাতায় এসে (ঊংংধু) লেখে তৃপ্ত হওয়া খুব কঠিন। আমি পরীক্ষায় আসা এসে দেখে খুব তৃপ্ত হলাম। কারণ তখন আমি একটা বিষয় নিয়ে রচনা লিখছিলাম। পরে বই হিসেবে বের হয়েছে। বইয়ের নাম ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। সেখানে একটা ব্যাপার ছিল, সেটা হলো ‘বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশ’। আমি ওই লেখাটা তখন লিখছি। ঘটনাচক্রে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের ভর্তি পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষায় ‘বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত’ বলে একটা রচনা এলো। আমি তখন এ বিষয়ে কার্ল মার্কসের উদ্ধৃতি সহকারে রচনা লিখে দিতে পারি। আমার মাথার মধ্যে আছে তখন।
এতে করে আমার কনফিডেন্স বেড়ে গেল। কিন্তু পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে এসে যখন দেখলাম মোশাররফ হোসেন আসলে সাঁতারু, আমি লিখেছি ডিসিএমএলএÑ তখন মনে হলো এবার বোধ হয় আর হলো না। এটা ১৯৭৮ সালের ঘটনা। আমরা ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাস শুরু হলো ১৯৭৯ সালে জানুয়ারি মাসে। সম্ভবত ১ অথবা ২ তারিখে। প্রথম দিন ক্লাস হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখলাম, স্ট্রাইক। সেটা হচ্ছে সিরাজ শিকদারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ডাকা ছাত্র ধর্মঘট। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়েছে ছাত্র ধর্মঘট দিয়েই। কিন্তু ঘটনাচক্রে আমরা কিন্তু ৩ বছরেই অনার্স পাস করলাম। আমাদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর মাসে। রেজাল্ট হয়েছে একটু দেরিতে। এরশাদ ভ্যাকেশনের কারণে। ফলে ১৯৮৩ সালের মার্চের দিকে আমাদের মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হয়।
সাপ্তাহিক : এর মধ্যে আপনার ছাত্র রাজনীতি?
আলী রীয়াজ : অনার্সে ভর্তি হলাম। ১৯৮০ সালে ডাকসু নির্বাচন। দীর্ঘদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। আমি তখন জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আখতার ভাই (আখতারউজ্জামান, বর্তমানে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য) যেহেতু আমাদের বিভাগের ছাত্র তখন, মাস্টার্স করছিলেন। আগে ডিপ্লোমা করে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে মাস্টার্স করছিলেন। আখতার ভাইর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। মান্না ভাই (মাহমুদুর রহমান মান্না) ততদিনে জেল থেকে মুক্ত হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচন তখন শুরু হয়েছে।
সাপ্তাহিক : আপনার লেখালেখির অবস্থা কী?
আলী রীয়াজ : আমার লেখালেখির জীবনে তখন খানিকটা পরিবর্তন ঘটছে। সাহিত্যের লেখা থেকে আমি তখন একটু একটু করে বেরিয়ে আসছি। রাজনীতি বিষয়ক লেখালেখির সামান্য কাজ শুরু হয় আমার। এক অর্থে খুব আনলাইকলি জায়গায়, সচিত্র সন্ধানীতে। বেলাল ভাইর কারণে। বেলাল চৌধুরী তখন সেখানে। উনি বললেন, তুমি লেখ। বললাম, কী লিখব? উনি বললেন, যা মনে চায় তাই লিখবা। আমি কিছু লেখা লিখলাম। বেলাল ভাই ছাপান। যে পাতায় যেভাবে বেলাল ভাই ছাপাতে পারেন। একটা লেখার শিরোনাম ছিল, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। আরেকটা লেখার শিরোনাম ছিল, ‘জয়বাংলা’। আমি জাসদ ছাত্রলীগ করি। অথচ লিখলাম ‘জয়বাংলা’ শিরোনামে। এটা নিয়ে আমার দলের সহকর্মীরা আমার উপরে ঘোরতরভাবে ক্ষেপে গেল, যে আমি ‘জয়বাংলা’ লিখি।
অথচ ওই লেখায় লিখলাম, বাংলাদেশে যদি কোনো জাতীয়তাবাদী স্লোগান হয় তবে সেটা হতে হবে ‘জয়বাংলা’। লিখেছিলাম, আমি ঠিক বুঝতে পারি না এখানে কেন বলা হয় ‘রেডিও বাংলাদেশ’। এটা ‘বাংলাদেশ বেতার’ হবে। যাই হোক ইতোমধ্যে ১৯৭৯ সালে আমার প্রথম বই বেরুল, নাম ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। ১৯৭৮ সালে গ্রীষ্মকালে আমরা কয়েকজন মিলে একটা সংকলন বের করলাম, নাম ‘স্বরূপ অন্বেষা’। সাবের, আমি আর রুদ্র এডিট করলাম। চারটা লেখা ছাপলাম আমরা। একটা হচ্ছে, ‘সাম্প্রদায়িকতা’, একটা হচ্ছে ‘জাতীয়তাবাদ’। ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বিষয়ক লেখাটা লিখেছিল আবিদ রহমান (নিনি), ও পরে তো মারা গেল। আমি লিখেছিলাম, ‘জাতীয়তাবাদ’ বিষয়ক একটা লেখা। মোরশেদ শফিউল হাসান একটা লেখা লিখেছিল, আর সম্ভবত সলিমুল্লাহ খান একটা লেখা লিখেছিল। লেখা দুটোর শিরোনাম সঠিক আমার মনে নাই। সলিমুল্লাহ খানের লেখাটা বোধ হয় ‘কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা’ বিষয়ক। মূলত সমাজতন্ত্র বিষয়ে।
আসলে চারটা বিষয়। বাংলাদেশের সংবিধানের চার মূলনীতিকে সামনে রেখে লেখাগুলো তৈরি হয়েছিল।
চিন্তা করেন, ১৯৭৮ সালে আমরা এ নিয়ে আলোচনা করছি। তখন, দেশে চলছে কড়া সামরিক শাসন। কথাবার্তা কেউ বলে টলে না। আমার লেখার বিষয় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ঠিক তার ইমিডিয়েট আগে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণাটা বলা হয়েছে এবং আমি সেটা চ্যালেঞ্জ করছি। আমার বয়স তখন ২০ বছর। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। সামরিক শাসনের মধ্যে এই চ্যালেঞ্জ করছি। মূলত আমার বন্ধুদের কারণে আমি এই চ্যালেঞ্জ করার সাহসটা পাই।
এই লেখাসহ অন্যান্য লেখা নিয়ে পরে আমার একটা বই বেরুলো। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। রুদ্রের বই বেরুলো, আমার বই বেরুলো, আর মোহনের বই বেরুলো। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আলী রীয়াজ এবং মোহন রায়হানÑ তিন বন্ধু একসঙ্গে মিলে নিজেদের পকেটের পয়সা, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার ইত্যাদি করে আমরা বই বের করলাম। আমার বই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, রুদ্রের ‘উপদ্রুত উপকূল’ এবং মোহনের ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’। কাজী হাসান হাবীব আমাদের প্রচ্ছদ এঁকে দিলেন বিনা পয়সায়। ‘আলেকজান্ড্রা’ প্রেস বলে যে প্রেসটা ছিল নবাবপুরে, তখন সেখানে সবচেয়ে ভালো ছাপা হতো। কার্টিজ পেপারে বই ছাপা হলো। এগুলো আমার মনে আছে। জীবনের প্রথম বই তো! এটা তো প্রথম প্রেমের মতোই। ভোলা যায় না।
নিজস্ব উদ্যোগে বই বের করে একুশে ফেব্রুয়ারির বইমেলায় গিয়ে হাজির হলাম। তখনকার বইমেলা মানে মুক্তধারা প্রকাশনী চিত্তরঞ্জন সাহা আর কয়েকজন প্রকাশক। আমরা ছোট একটা ভাঙা টেবিল জোগাড় করে বাংলা একাডেমির বটতলায় বসে বই বিক্রি করা শুরু করলাম। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ খুব পপুলার কবি, তার বই বিক্রি হয়। আমারও কিছু বিক্রি হলো। সে কারণেই আমাদের একধরনের পরিচিতি তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
সাপ্তাহিক : এমনিতে তখন তো আপনি জাসদ ছাত্রলীগে একটিভ?
আলী রীয়াজ : একটিভ। আমার একটিভিটি হচ্ছে যে, মিছিল করা-মিটিং করা। এগুলো সবই আমি করি। কিন্তু এর বাইরে একটা অতিরিক্ত কাজও আমি করি। কাজটা হচ্ছে লিফলেট লেখা। ভাষার কারণে, ধারণার কারণে এই কাজটি করতাম। ওই অর্থে দ্রুত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের খুব কাছে আসি এবং ঘনিষ্ঠ হই। মান্না ভাই (মাহমুদুর রহমান মান্না), আখতার ভাই (আখতারউজ্জামান), হাসিব ভাই, মুনীর ভাই বলেন, মোশতাক ভাই বলেন, জাসদ ছাত্রলীগের তাবৎ কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে আসি। এদের কাছে আসতে পারি কী কারণে? আমি যখন ছাত্ররাজনীতি শুরু করি তখন এত দ্রুত কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠে আসার একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে আমি লিখতে পারি। পার্টি ডকুমেন্টস, সমালোচনা, বিবৃতি ইত্যাদি লিখি এবং লিখতে পারি। জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে আমি লিখি, তার সঙ্গে আলোচনা করি এবং তাকে দু’একটা ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করতে পারি। ডা. মুশতাক হোসেন তখন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, পরে ডাকসু জিএস হন। তার সঙ্গেও লেখালেখির কাজ করি।
সাপ্তাহিক : আপনি কি জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো পদে ছিলেন?
আলী রীয়াজ : আমি কিন্তু কখনো ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলাম না। সাংগঠনিকভাবে কখনোই কোনো পদে ছিলাম না। আমি ডাকসুর নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হওয়া ছাড়া আর কোনো পদে ছিলাম না।
সাপ্তাহিক : আপনি কোন প্যানেলের প্রার্থী ছিলেন?
আলী রীয়াজ : আমি মান্না-আখতার প্যানেলে প্রথমবার ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হই। মান্না-আখতার প্যানেলের দ্বিতীয় মেয়াদে আমি হারলাম। ১৯৮২ এর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে আখতার-বাবলু প্যানেলে আমি আবার জিতলাম।
সাপ্তাহিক : তাহলে আপনি ডাকসুতে দুইবার নির্বাচিত হয়েছেন?
আলী রীয়াজ : একবার হেরেছি।
সাপ্তাহিক : কার সঙ্গে হারলেন?
আলী রীয়াজ : জাফর ওয়াজেদের সঙ্গে। প্রথমবার আমি যখন নির্বাচন করি সেটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক পদে আমরা তিন বন্ধু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছিলাম।
সাপ্তাহিক : কে কে?
আলী রীয়াজ : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (মুজিববাদী) থেকে কামাল চৌধুরী। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আমি জাসদ ছাত্রলীগ থেকে। আমরা সারাদিন ধরে ভিন্ন প্যানেল থেকে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে ফজলুল হক হলে সন্ধ্যায় গোসল করে রাতে একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। এই ছিল আমাদের সম্পর্ক। দ্বিতীয়বার আমি হারলাম জাফর ওয়াজেদের সঙ্গে। জাফর ওয়াজেদ আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জাফর ওয়াজেদ প্রথমবার ডাকসুর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। সেবার মুজিববাদী ছাত্রলীগ মাত্র চারটা সদস্য পদে জিতেছিল। জাফর ওয়াজেদ তার মধ্যে ছিল। সেবার আমরা একটা দু’টা হল ছাড়া প্রায় সব হলের ছাত্র সংসদে জিতেছিলাম। ডাকসুতে ১৯ পদের মধ্যে ১৫টিতে জিতেছিলাম। আমাদের বাইরে মুজিববাদী ছাত্রলীগ থেকে বাকি ৪ জন সদস্য পদে জেতে। জাফর ওয়াজেদ তাদের মধ্যে একজন। জাফর ওয়াজেদ এতটাই পপুলার ছিল। এটা ছিল তার পার্সোনাল পপুলারিটি।
জাসদ ছাত্রলীগ দু’ভাগে বিভক্ত হলে আমরা ছাত্রলীগ (বাসদ) থেকে নির্বাচন করি।
সাপ্তাহিক : রাজনীতির সঙ্গে আপনাদের সাহিত্য চর্চাও তো চলছে?
আলী রীয়াজ : এতদিনে আমি রাজনীতিতে যেমন যুক্ত হয়েছি, পাশাপাশি আরেকটা কাণ্ড করছি আমরা। সেটা রুদ্র, আমি, জাফর, কামাল, সাবের, সাজ্জাদ হোসেন বলে এক বন্ধু যশোর থেকে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবÑআমরা বন্ধু-বান্ধব মিলে তখন সাহিত্য আন্দোলনের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আমাদের সাহিত্য আন্দোলন ষাটের দশকের ‘স্বাক্ষর’ ‘টিপসই’Ñ এরকম আন্দোলন না। বরঞ্চ আমরা হাইলি ক্রিটিক্যাল। এবং সেটা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। কবি রফিক আজাদ ভাইর সঙ্গে আমাদের কোথায় যেন একটা রেষারেষি আছে। আমরা ফিল করি। মানে বয়স কম হলে যা হয়। রফিক ভাই হয়ত ফিলও করেনি।
আমরা ষাটের দশকের সাহিত্য আন্দোলনের খুবই ক্রিটিক। ভীষণ সমালোচনামুখর। আমাদের বিবেচনায় ষাটের দশকের ওরা হচ্ছে খুব ডেকাডেন্ট (ফবপধফবহঃ)। আমাদের বিবেচ্য হচ্ছে কমিটমেন্ট থাকতে হবে। আমরা একটা স্লোগান তৈরি করেছি জীবনানন্দ দাশকে কপি করে। ‘রাজনীতি ও সাহিত্য একই জীবনের দুই রকম উৎসারণ’। আমরা এটা বললাম এ কারণে যে, আমরা মনে করি পলিটিক্স এবং লিটারেচার এক অর্থে সহযাত্রী। তখন আমি ওই নিয়েই লেখালেখি করি।
সে সময় আমাদের পাশাপাশি আমাদের আর অনেক বন্ধু, আরও অনেকেই সাহিত্য চর্চা করেছে। যেমন ধরুন রেজা সেলিম, তুশার দাশ, আহমদ আজিজ; এদের আবার একটা আলাদা গোষ্ঠী ছিলোÑসিম্ফনি নামে। এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল; কিন্তু আড্ডায় আমরা আবার এক। কামাল আর আমি অনেক দিন রেজা সেলিমের ফজলুল হক হলের রুমে আড্ডা দিয়ে রাত পার করেছি। ফারুক মঈনউদ্দিনÑগল্পকার, ছিল আমাদের সঙ্গেই, ঠিক কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে নয়। জাফরুল হাসান ছিল, হাফিজুর রহমান ছিলÑওরা ছিলেন সিনিয়র।
সাপ্তাহিক : আপনাদের কি কোনো মুখপত্র পত্রিকা বা সংগঠন ছিল?
আলী রীয়াজ : ‘রাখাল’ বলে আমরা একটা সংগঠন করলাম। নামকরণও ওইরকম ‘রাখাল’। কেননা আমরা নগরের রাখাল। ষাটের দশকের এরা হচ্ছে নাগরিক, ফবপধফবহঃ, বাংলাদেশের সমাজের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। এতবড় একটা আন্দোলন হয়েছে ১৯৬৯-এ, ১৯৭০-এ, তাতে তারা যুক্ত ছিল না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আসা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী জেনারেশন। আমরা মনে করি আমাদের ফিরে যেতে হবে মূলের দিকে, শেকড়ে। সেই মূল হচ্ছে আমরা ‘রাখাল’। আমরা সাহিত্যকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাই না। আমরাই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর কেন্টিনে কবিতা পাঠের আসর আয়োজন করলাম। এটা হচ্ছে আমাদের ঝুসনড়ষরপ রহঃবমৎধঃরড়হ ড়ভ ঢ়ড়ষরঃরপং ধহফ ষরঃবৎধঃঁৎব এবং কোনো কোনো কবিতায়, লেখায় আমরা এতটাই উচ্চকণ্ঠ, এই অর্থে উচ্চকণ্ঠ যে, এর কনটেন্ট তো পলিটিসাইজ। আমরা সেগুলো নিজেদের নাম না বলে পাঠ করলাম। এর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ছিল কামাল চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত পঙ্ক্তিমালা’। তখন বোধহয় ‘রক্তাক্ত পত্রমালা’ নামে লিখেছিল। প্রথম পাঠ কামাল চৌধুরীই করেছিল। কবিতার রচয়িতা হিসেবে সেই কবিতাটি পাঠ করেছিল কিন্তু আমরা বলি নাই যে, এটা কামাল চৌধুরীর লেখা। আমার মনে আছে যে, আমরা বলেছিলাম, এখানে একটা কবিতা পাওয়া গেছে, কবি কে আমরা জানি না, তবে কামাল এটা পড়লে, যিনি কবি তিনি নিজেকে শনাক্ত করলে, আমরা কবিতাটা তার কাছে হস্তান্তর করব। কারণ তখন সেনাশাসন চলছে। ফলে এসব কৌশল নিতে হচ্ছে। কৌশল করা ছাড়া তখন আমাদের উপায় ছিল না। আমাদের চিন্তা ছিল কবিতা, সাহিত্য এবং রাজনীতি এটা আলাদা হতে পারে না।
সাপ্তাহিক : এই গ্রুপে তাহলে কারা ছিলেন?
আলী রীয়াজ : আমি, কামাল চৌধুরী, রুদ্র (রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ), জাফর (জাফর ওয়াজেদ), পার্টলি সাবের (মইনুল আহসান সাবের), সাজ্জাদ অফকোর্স। তাছাড়া আরও ছিল শাহজাদি আঞ্জুমান আরা, আমাদের একমাত্র মহিলা প্রতিনিধি ওই অর্থে। খুব একটিভলি পার্টিসিপেট করেছে। আরও কেউ কেউ ছিল। এ মুহূর্তে আমার নাম মনে পড়ছে না। যেমন ‘রাখাল’-এর যে প্রথম অনুষ্ঠান করি আমরা তার উপস্থাপক ছিল মাহমুদ রেজা চৌধুরী। ওই অর্থে মাহমুদ রেজা চৌধুরী আমাদের বন্ধু, কিন্তু কবি নন, সাহিত্যিক নন। মুক্তি আর মাহমুদ রেজা চৌধুরী ওই অনুষ্ঠানটা উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু ও আমাদের বন্ধু, আমাদের কমিটমেন্টটা শেয়ার করে। তখন সে লিখত না। এখন লেখে। নিউইয়র্ক অধিবাসী, কিন্তু অধিকাংশ সময় ঢাকাতেই কাটায়। বেশ ক’টি বইও বের হয়েছে মাহমুদ রেজা চৌধুরীর।
আমরা ‘রাখাল’-এর পক্ষে সব বিচিত্ররকম জিনিস আয়োজন করি। যেমন ধরেন চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান, তার ছবির প্রদর্শনী হবে, তখন কেবল সুলতান জনসমক্ষে আবিষ্কৃত হয়েছেন। মুনতাসীর মামুন শিল্পী এসএম সুলতানকে নিয়ে ‘বিচিত্রা’য় একটি কাভার স্টোরি করেছেন কেবল। এসএম সুলতান শিল্পকলা একাডেমিতে বসে ছবি আঁকছেন। রুদ্রের মাথায় এলো আমরাও সুলতানের ছবির একটা এক্সিবিশন করতে পারি। আমি বলি, পাগল নাকি? সুলতান কেন আমাদের ছবি দেবেন? রুদ্র বলল, চল যাই জিজ্ঞাসা করে দেখি না! আমাদের প্রদর্শনীতে ছবি দেয় কিনা!
বলি, আমাদের জায়গা কোথায়? রুদ্র বলে যে, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে এক্সিবিশন করব। আমরা গিয়ে শিল্পকলা একাডেমীতে সুলতান ভাইর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। বললাম যে, আপনার কয়েকটা ছবি দেবেন? আমরা একটা কবিতা পাঠের আসর করব, তার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে এটা রাখব। আমাদের অবাক করে দিয়ে শিল্পী এসএম সুলতান বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, কয়টা লাগবে?
ওনার ছবির সাইজ তো জানেন। রিকশায় করে তো এই বস্তু নেয়া যায় না। আমাদের তো ওই সামর্থ্য নাই যে, ট্রাক ভাড়া করে সুলতানের ছবি নিয়ে যাব। রুদ্র ওই অর্থে পাগল আর কী! বলে যে, আমরা কয়েকজন মিলে হাতে ধরে ধরে ছবিগুলো নিয়ে যাব। যা হোক, শেষে কীভাবে যেন ছবি নেয়ার ব্যবস্থা হলো। সুলতানের ছবি ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে আর্টস ফ্যাকাল্টির সামনে যে গোল জায়গাটা ওখানে আমরা কবিতা পাঠের আসর করলাম। কেননা সুলতান ভাই হচ্ছেন মাটির কাছাকাছি থাকা শিল্পী।
আর্টের বিভিন্ন ফর্মের মধ্যেও এক ধরনের কনভার্সশেসন তৈরি করতে হবে। এবং সেটা কমিটমেন্ট থেকে। এই সময় আমরা লেখালেখিও করছি কমিটমেন্ট থেকে। আমার একটা লেখা সে সময় দৈনিক বাংলায় ছাপা হয়েছিল, ‘লেখকের দেশকাল’ নামে। লেখার শিরোনামটা আবার হাবীব ভাইর (আহসান হাবীব) দেয়া। এইভাবে আমি আস্তে আস্তে রাজনীতির কাঠামোর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছি।
সাপ্তাহিক : সাংস্কৃতিকভাবে ‘রাখাল’-এর ব্যানারে আপনারা যারা যুক্ত আছেন, রাজনৈতিকভাবে তো আপনারা আবার একেক দলের সঙ্গে যুক্ত। পরস্পরবিরোধী ধারায় সম্পৃক্ত। যেমন কামাল চৌধুরী মুজিববাদী ছাত্রলীগের সঙ্গে, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে, আপনি জাসদ ছাত্রীগের সঙ্গে। এটা সম্ভব হচ্ছে কেমন করে?
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ, কিন্তু আমাদের একটা জায়গায় কমিটমেন্ট আছে। এ জন্যই আমরা একত্রে কাজ করতে পেরেছি। যেটা এখন নাই। এখন কেউ ভাবতেই পারে না। আমাদের কতগুলি কমিটমেন্টের জায়গার কথা বলি। বসে আলোচনা করে দলিল তৈরি করে যে আমরা একত্র হয়েছি, তা নয়। কথাবার্তার মধ্য দিয়ে আমরা জানি যে আমাদের রাজনৈতিক ভাবনায় পার্থক্য আছে, কিন্তু আবার আমরা এ-ও জানি, কতগুলো জায়গায় আমরা ঐক্যবদ্ধ। একমত পোষণ করি। ঐক্য কী?
আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। এইটা আমরা কিন্তু তিনজনেই মনে করি এবং আমাদের অন্য সঙ্গীরাও মনে করে। আপনি যদি আমাদের তিনজনকে দেখেনÑ আমি গদ্য লিখি, কামাল কবিতা লেখে, রুদ্র কবিতা লেখে। এটা কী কখনো আমরা বসে আলাপ করেছিলাম, রুদ্র, তোমার কী মনে হয় এ বিষয়ে আমরা একমত? না, এরকম কোনো বিষয় ঘটেনি। এ আলোচনা আমাদের কোনো দিন হয়নি। কিন্তু কথা বলতে বলতে, বন্ধু হিসেবে জানতে জানতে, আমরা একত্রিত হয়েছি। আমরা ভেবেছি, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, আমরা তারই সঙ্গী। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের নির্মাণ করেছে, তৈরি করেছে। তারপরও আমাদের ভিন্নমত আছে। যে কারণে আপনি দেখবেন যে, রুদ্রের কবিতা আছে তাহের ভাইকে (কর্নেল তাহের) নিয়ে। অথচ রুদ্র ছাত্র ইউনিয়ন করে। ও কর্নেল তাহেরকে নিয়ে কবিতা লেখে কেন? অন্যদিকে যে সংকলনে কামাল চৌধুরীর শেখ মুজিব বিষয়ক কবিতা বেরিয়েছে সেটা আমি বিলি করছি। আমার মনে কোনো দ্বিধা নেই। কেননা আমি মনে করি যে তখন সেনাশাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের যে মৌলিক প্রস্তাবনা বা নীতি তা বাস্তবায়নের জন্য আমরা কাজ করছি। আজকে যদি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করি, তাহলে বলব যে, প্লুরালিটির (বহুত্বের) যে ধারণা মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কী দিয়েছে, সেটাই আমরা প্রাকটিস করছি। বলে কয়ে করছি না। কেউ আমাদের বলে নাই যে, এটা কর।
যখন অপশক্তি অপরাজেয় বাংলা ভাঙতে আসে, তখন যে কারণে দল-মত নির্বিশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই মিলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, ওই একই কারণে। এবং তার জন্য যে বিবৃতি আমরা তৈরি করি, মোরশেদ শফিউল হাসান বহু চেষ্টা করেও যে বিবৃতি ছাপতে পারে না পত্রপত্রিকায়। শেষ পর্যন্ত সেটা আমরা লিটল ম্যাগাজিনে ছাপি। ওই জায়গায় আমরা এক। এগুলো আমাদের অর্জন মুক্তিযুদ্ধের, এগুলো নষ্ট হতে দেয়া যাবে নাÑএই ভাবনায় আমরা এক।
আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একজন মুক্তিযোদ্ধা ফাঁসির কাষ্ঠে উঠছে। এখানে কামাল, আমি, রুদ্রÑ আমরা সবাই কিন্তু এক। তখন আমাদের চোখে কর্নেল তাহের জাসদের নেতা শুধু নন। একজন মুক্তিযোদ্ধা, যাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হচ্ছে। আমরা যখন খবর পাই যে, ফরহাদ মজহার এটা নিয়ে একটা গান লিখেছেন, তখন ফরহাদ ভাই সবেমাত্র আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছেন। আমরা ফরহাদ ভাইকে ধরি, বলি, আপনার এ গানটা নিয়ে আমরা একটা অনুষ্ঠান করি। আমরা সেই অনুষ্ঠান করি। ওই অনুষ্ঠানে ফরহাদ ভাই নিজে তার লেখা গানটা গাইল। কী কারণে? তখন ফরহাদ ভাইর সঙ্গে কি আমাদের মতপার্থক্য নেই! অবশ্যই আছে, কিন্তু ফরহাদ ভাই তো তখন ‘যখন সন্ধ্যেবেলা সবকিছু শেষ হয়ে যাবার রেশ/আমি সাততাড়াতাড়ি যাচ্ছি হেঁটে...’ ওইরকম একটা গান লিখতে পারছেন, গাইতে পারছেন!
এই গান তখন ফরহাদ ভাই লিখছেন এবং আমরা তার জন্য মঞ্চ তৈরি করছি। আজকে ফরহাদ ভাইর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য আছে। তখনও ছিল। এখন হয়ত সেটা আরও অনেক বড় হয়েছে। হোক। কিন্তু ওই জায়গায় তো আমরা এক ছিলাম। সে কারণেই কামাল, আমি, রুদ্র ডাকসুর নির্বাচনে ভিন্ন ভিন্ন প্যানেলে একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি অথচ রাতের বেলা একসঙ্গে বসে আলোচনা করতে পারি। এবং আক্ষরিক অর্থেই একত্রিত হই।
সাপ্তাহিক : লিখিত দলিল নেই, লিখিত আদেশ নেই, কিন্তু স্বপ্নে ভাবনায় আপনারা সমবেত?
আলী রীয়াজ : আমাদের একত্রিতার লিখিত কিছু নেই। লেখা, ভাষ্য- আমরা একটা হয়তো লিখে বের করি। যেমন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ওপর হামলা হলো। ছাত্র সংগঠনগুলো রিঅ্যাক্ট করার আগে আমরা রিঅ্যাক্ট করি। আমরা প্রতিদিন লিফলেট বের করেছি। আমরাই আহ্বান জানিয়ে ছিলাম সবাই মিলে যেন একত্রিত হই।
সাপ্তাহিক : এর মধ্যে তো আপনার একাডেমিক লেখাপড়া চলছে। অনার্স মাস্টার্সের রেজাল্ট কেমন হলো?
আলী রীয়াজ : অনার্সে আমি সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হই। ভালো, তবে এর চেয়ে ভালো রেজাল্ট হতে পারতো। আমি যদি কেবলমাত্র একাডেমিক পড়াশুনা নিয়েই থাকতে পারতাম, তাহলে হয়তো এর চেয়ে ভালো ফলাফল হতে পারত। ফার্স্ট ইয়ারে একটু পিছিয়ে পড়ার পর সেটা আমি আর কাভার করতে পারিনি। সুব্রত ফার্স্ট হলো। শওকত মাহমুদসহ আরও কয়েকজন ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল। কিন্তু এটা নিয়ে আমার খুব মাথাব্যথা ছিল না। মাস্টার্সে আমার ফার্স্ট ক্লাস ছিল। সুব্রত ফার্স্ট হয়, আমি সেকেন্ড হই। ততদিনে আবার খানিকটা সিরিয়াসও হয়ত হয়ে উঠেছি লেখাপড়ায়!
সাপ্তাহিক : আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষকদের কথা একটু জানতে চাই।
আলী রীয়াজ : আমার স্কুল জীবনে জীবনানন্দ বড়–য়া স্যারের কথা বলেছি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কিন্তু নূরউদ্দীন স্যার, একিউআইএম নূরউদ্দীন স্যারের একটা বিশেষ অবদান আছে। জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আতীকুজ্জামান সাহেব। পরবর্তীতে উনি চলে যাবার পরে, কেননা ১৯৭১ সালে আতীকুজ্জামান স্যারের ভূমিকা বিতর্কিত ছিল। স্বাধীনতার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব আসলে একিউআইএম নূরউদ্দীন স্যারই পালন করেন। অন্যদের নিয়ে এ বিভাগকে প্রসারিত করেন, টিকিয়ে রাখেন। নূরউদ্দীন স্যার ‘প্রিন্সিপ্যালস অফ কমিউনিকেশন’ (চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ ঈড়সসঁহরপধঃরড়হ) পড়িয়েছিলেন। কমিউনিকেশন নিয়ে আমার যে উৎসাহ সেটা এক অর্থে নূরউদ্দীন স্যারের কারণে। কেননা, উনি খুব সহজভাবে আমাদের পড়িয়েছেন।
আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ করি তখন সহকর্মী হিসেবে নূরউদ্দীন স্যারকে পেয়েছি। শিক্ষকতার কালে সহকর্মী হিসেবে রাজনৈতিকভাবে নূরউদ্দীন স্যারের সঙ্গে আমার মতপার্থক্য ছিল। ছাত্র হিসেবে আমি যে রাজনীতি করেছি স্যার সেটা সাবসক্রাইব করতেন না। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে উনি আমাকে ইনসপায়ার করেছেন, প্রণোদনা যুগিয়েছেন। ওই ইনসপিরশনটা উনি আমাকে করতে পেরেছেন।
সাপ্তাহিক : আমার একটা কনফিউশন আছে। আপনার কথায় ‘ইনক্লুসিভনেস’, ‘প্লুর‌্যালিটি’ এসব ধারণা দেখছি। সাধারণত আমাদের এখানকার লেফট বা বামপন্থি রাজনীতিতে এসব শব্দসম্ভার অনুপস্থিত। অথচ আপনি আবার জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতি করছেন। এটা কি বৈপরীত্য বহন করে না?
আলী রীয়াজ : সম্ভবত, সে কারণেই আমি লেফ্ট রাজনীতিতে টিকি নাই। আমি জানি না!
সাপ্তাহিক : আপনি বলছিলেন, নূরউদ্দীন স্যারের সঙ্গে আপনার রাজনৈতিক মতের মিল নেই, কিন্তু তিনিই আপনাকে ইন্সপায়ার (রহংঢ়রৎব) করেছেন?
আলী রীয়াজ :  নূরউদ্দীন স্যার আমাকে ইন্সপায়ার করেছেন, করতেন। আমি উনার কাছে শুধু কমিউনিকেশন শিখছি, পদ্ধতিগত যোগাযোগ বিদ্যা শিখছি, তা কিন্তু নয়। উনাকে দেখে আমার আরও অনেক কিছু মনে হচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকেরই তো একটা সীমাবদ্ধতা আছে, তাই না। স্যারেরও হয়ত আছে। থাকারই কথা মানুষের। তবে সীমাবদ্ধতার চেয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, শিক্ষক হিসেবে উনি আমাকে কী দিয়েছেন? আমার ধারণা নূরউদ্দীন স্যার শিক্ষক হিসেবে আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। এই যে ইনক্লুসিভনেসের কথা আপনি বললেন না, হয়ত স্যারই আমাকে সেটা শিখিয়েছেন। কেননা, স্যারকে দেখেছি তো বিভিন্ন মতামতের লোকের সঙ্গে কাজ করতে। স্যার তো একটা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করার উনি তো তা করলেন। তার মানে তিনি তো অন্যদের সঙ্গে নিতে পেরেছেন। তাহলে ওইটাই হয়ত আমি শিখলাম তার কাছে। স্যার আমাকে ক্লাসে পদ্ধতিগত যোগাযোগ বিদ্যা শিখালেন। ওইটা অন্য কেউও হয়ত শেখাতে পারতেন কিন্তু ইনক্লুসিভনেসটা শেখাতে পারতেন কি না, আমি জানি না। আমি, এভাবেই আমার মতো করে শিখেছি। তেমনি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, তাকে দেখেও আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমার শিক্ষক হয়ে ওঠার কারণ কিন্তু তিনি। আমি যে শিক্ষকতার জগতে এসেছি সেটা কিন্তু অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দেখে। এ কথাটা স্যারকে কোনোদিন বলা হয়নি।
সাপ্তাহিক : সেটা কীভাবে? সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তো আপনার সরাসরি বিভাগীয় শিক্ষক নন।
আলী রীয়াজ : আমার ডাইরেক্ট টিচার নন। কিন্তু আমি স্যারের সঙ্গে কাজ করেছি ডাকসু’র সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। উনি ডাকসু’র ট্রেজারার ছিলেন। কিন্তু সেটাও কারণ না। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমার বড় ভাইর বন্ধু। সেটাও কারণ না। উনি অনেক পরে ব্যাপারটা মিলাতে পেরেছেন যে, আমার নাম আলী রীয়াজ। ভাইয়ের নাম আলী আনোয়ার। আমি বলি নাই কোনোদিন। পরে স্যার নিজেই বুঝতে পেরেছেন।
কিন্তু যখন আমি জানি, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি ছাত্র, আমি জানি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্যারের আদর্শিক অবস্থান। জানি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু যখন আমি এটা জানি যে, তার ক্লাসে ঘোরতরভাবে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ করা একটা ছেলেও কোনোদিন বলতে পারেনি, যে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে সে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের কাছে এক নম্বর কম পেয়েছে। যখন আমি জানি, স্যার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্রিকা সম্পাদনা করেন। আরও অনেক কাজ করেন। কীইবা না করেন! কিন্তু কোনোদিন ক্লাস মিস করেননি। যখন আমি তাকে দেখতে পাই, আমি একটা রিকশা নিয়ে কলাভবন থেকে ভালো খাবারের সন্ধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ক্যাফেটেরিয়াতে যাচ্ছি, তখন দুপুর দেড়টার সময় স্যার একটা ছাতা মাথায় দিয়ে তার বাসা থেকে হেঁটে ক্লাস করতে আসছেন। তখনই স্যার আমাকে আসলে অনেক কিছুই শিখিয়ে ফেলেন। আমার মনের মধ্যে গভীরতর দাগ দিয়ে যান।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমাকে শিক্ষক হবার জন্য অনুপ্রাণিত করেন এবং অলক্ষ্যে একটা মানদণ্ডও ঠিক করে দেন। এসব নিয়ে আমরা কখনও কথা বলিনি,  আলোচনা করিনি। কিন্তু তাকে দেখে আমার মধ্যে একটা ধারণা জন্মে যায়। যে হ্যাঁ, আমি অসংখ্য কিছু করব, কিন্তু কোনোটারই ব্যত্যয় ঘটবে না। কোনোদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকার প্রকাশ কিন্তু অনিয়মিত হচ্ছে না। নিয়মিতভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ওই পত্রিকায় নিজে লিখেছেন, ‘বিচিত্রা’তে একটা নিয়মিত কলাম লেখেন, অন্য পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় লিখছেন, প্রতি বছর-দেড় বছরে তার একটা বই বেরুচ্ছে, নিয়মিতভাবে ক্লাস করছেন। এসব নিয়ে কোনো ছাত্র অভিযোগ করছে না। তার টিউটোরিয়াল ঠিকমতো হয়। স্যারের রুমে দু-একবার ঢুকতে যেয়ে দেখেছি স্যার টিউটোরিয়ালের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন। আমাকে দেখেই এমনভাবে মাথা নাড়লেন, দেখেই বুঝেছি, এখন নয় পরে।
উনি ডাকসু’র ট্রেজারার, সেই সূত্রে আমি হয়ত কখনও উনার রুমে যেয়ে দরজা ভেজানো দেখে ভাবলাম একটু উঁকি দিয়ে দেখিÑ বুঝলাম যে স্যার টিউটোরিয়ালের ক্লাস নিচ্ছেন। সব কিছুর মধ্যে উনি ওনার নিজের কাজটা ঠিকমতোই করেনÑ টিউটোরিয়াল ক্লাস নিতে ওনার কখনও দেরি হয় না। স্যারের রুমের দরজায় টিউটোরিয়ালের সিডিউল লেখা আছে। সে অনুযায়ী ছাত্ররা যায় এবং আমরা যদি কোনো কাজে ভেতরে থাকি এক পর্যায়ে স্যার আমাদের মনে করিয়ে দেন, এখন আমার ক্লাস আছে। অন্য কোনো কাজে গেলাম, কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর স্যার স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, এখন আমার ক্লাস আছে। অন্য সময় আবার আসেন। এটাই হচ্ছে শিক্ষকতা।
এই রকম বলি, বলার জন্য বলি না। আমি কিন্তু আমার জীবন দিয়ে বুঝি যে, একটা মানুষ হয়ে ওঠে কীভাবে? আমরা শিখি। প্রতিনিয়ত যদি আমরা শিখতে পারি, তাহলেই কিন্তু আমরা হয়ে উঠব। সেই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটার মধ্যে কেউ, আসলে মাত্র একজন আইডিয়াল হয়ে ওঠেন না। আমি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হইনি। হওয়ার চেষ্টাও করিনি। কারণ আমি একটা আমি হব। সেখানে নুরউদ্দীন স্যার আমাকে শেখান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার আমাকে শেখান।
এত বছর পরেও আমি তো আমার স্কুলের জীবনানন্দ বড়–য়া স্যারের কথা ভুলে যাচ্ছি না। তার মানে কী? বড়–য়া স্যারের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন, আমি কিছুই জানি না। কিন্তু উনি আসলে আমার মধ্যে আছেন, আমার মনে আছেন। এভাবেই আসলে আমরা বেড়ে উঠি, হয়ে ওঠি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ‘রাখাল’ করি, আমার বন্ধুরা আমাকে শেখান। এসএম সুলতানের ছবি নিয়ে এসে আমরা কবিতা পাঠের আসর করি, সেটা আমাকে শেখায়। আমি রাজনীতি করতে গিয়ে যাদের সঙ্গে থাকি তাদের তখনকার জীবন সম্পর্কে জানি। পরবর্তীতে তাদের অনেককে নিয়ে, অনেকের জীবন নিয়ে হয়ত সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু আমি তো জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু’র জিএস যে আখতারুজ্জামানের সঙ্গে আমি রাজনীতি করেছি, আমি জানি তার আসলে কয়টা কাপড় ছিল। কি প্রলোভন তারা সেদিন, সেই মুহূর্তে ডাকসু অফিসে বসে মোকাবেলা করেছেন, সেটা আমি জানি। মতিউর রহমান চৌধুরী জানেন সে ঘটনা যে, কি সব প্রলোভন আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল ১৯৭৯/৮০ সালে। এবং সেগুলো নির্দ্বিধায় কীভাবে মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামানরা রিজেক্ট করেছেন, সেটা আমি দেখেছি। ওটার মধ্যে আমি শিখি। এখন হয়ত এসব বদলে গেছে। অনেক কিছুই তো বদলায়। কিন্তু আমি ওই সময়টায় এসব মানুষের মধ্যে প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করার, রাজনীতির প্রতি অভিনিবেশ দেখেছি। ওইটার মধ্যে দিয়ে আমি হই। শিখি।
আমি জিয়াউদ্দিন বাবলু ভাইর সঙ্গে কাজ করে, লেখালেখি, বিবৃতির কাজ করে শিখেছি। রাজনৈতিক লেখালেখি, পার্টির ডকুমেন্ট তৈরি করা। ছাত্রলীগের দ্বিধাবিভক্তির সময়কার ডকুমেন্ট, বিবৃতিÑ এখনকার মতো বিবৃতি তো নয়, তখন একটা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক বিবৃতি তৈরি করা। দৈনন্দিন বিবৃতির পাশাপাশি এগুলো করতে গিয়ে তাদের কাছ থেকে আমি শিখেছি। রাজনীতিকে কীভাবে বিশ্লেষণ করতে হয় এগুলো আমি তখন শিখেছি। তখনকার জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলুর সঙ্গে হয়ত এখনকার বাবলু ভাইর হিসাব মিলবে না। কিন্তু সেই সময় তার কাছ থেকে তো এসব আমরা শিখেছি।
সাপ্তাহিক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময়কার উজ্জ্বল ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কেÑ যেমন সলিমুল্লাহ খান বা এ রকম আরও কারও সম্পর্কে...
আলী রীয়াজ : সলিমুল্লাহ খান এক অর্থে ছিলেন, যুক্ত ছিলেন জাসদের সঙ্গে। প্রথমবার জাসদ থেকে ডাকসুতে সলিমুল্লাহ খানকে জিএস পদেও মনোনয়নও দিয়ে দেয়া হয়েছিল। ডাকসুতে প্রথমবার এত প্রার্থী, মাহমুদুর রহমান মান্না ভাইর তখন যে ক্যারিশমা, উনি একাই গোটা প্যানেল জেতাতে পারেন। উনি যদি বলেন ভোট দেন, সবাই ভোট দিয়ে দেবে। সে সময় জিয়াউদ্দিন বাবলু, ফেরদৌস ভাই ছিলেন, দুলাল ভাই ছিলেন পটেনশিয়াল ক্যান্ডিডেট। ছাত্রলীগের সেক্রেটারি হিসেবে আখতারুজ্জামান তারও একটা দাবি ছিল জিএস পদে। মুনীর ভাই বুয়েটের কিংবা আবুল হাসিব খান তারও একটা দাবি ছিল। অনেক সমমানের নেতা ছিল। ফলে গ্রুপিং হয়ে যাওয়া বাস্তব। একে নমিনেশন দিলে ওর গ্রুপ কাজ করবে না এ রকম আর কি! কম্প্রোমাইজ হিসেবে প্রথমে জিএস পদে সলিমুল্লাহ খানকেই পছন্দ করা হয়েছে। প্যানেল ডিক্লেয়ার করা হবে। মান্না-সলিমুল্লাহ খান প্যানেল। কিন্তু ছাত্ররা সেটা গ্রহণ করেনি। মিছিলও হয়েছিল। এ রকম ঘটতে পারে এ আশঙ্কা থেকে ছাত্রলীগের সেক্রেটারি হিসেবে আখতারুজ্জামান ভাইকে জিএস পদে নমিনেশন পেপার জমা দিতে বলা হয়েছিল।
আর কিছু না হলেও এই যুক্তিতে সেটা গ্রহণযোগ্য দাবি ছিল যে, ছাত্রলীগের মতো এত বড় ছাত্র সংগঠনের সেক্রেটারি হিসেবে আখতারুজ্জামানকে যোগ্য মনে করেন তাহলে ডাকসুতে তাকে জিএস পদে যোগ্য মনে করবেন না কেন? প্রক্রিয়াটা ছিল যদি মান্না-সলিমুল্লাহ খান গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে যেন মান্না-আখতার প্যানেল হয়।
মধুর কেন্টিনে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে মুনীর ভাই ঘোষণা করলেন মান্না-সলিমুল্লাহ প্যানেল। তখন একটা মিছিল হলো। যত ছাত্র উপস্থিত ছিল মিছিলে তার অর্ধেক অংশ নিল। যত ছাত্র উৎসাহ নিয়ে এসেছিল প্রধানত কর্মীরা তারা এই প্যানেল মানতে নারাজ। তারা মান্না ভাইর সঙ্গে অন্য কেউ, সেটা হাসিব ভাই হোক, দুলাল ভাই হোক, ফেরদৌস ভাই হোক কিন্তু সলিমুল্লাহ খান নয়। কেননা, সলিমুল্লাহ খান তো রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ওই ক্যাটাগরির না। সে পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট। সে প্র্যাক্সিস জার্নাল পত্রিকা বের করে তখন পরিচিত।
সাপ্তাহিক : বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কারও কথা কী আপনার বিশেষভাবে মনে আছে?
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনে বা ছাত্র অবস্থায় যার কথা আমি বলি, ফজলুল হালিম চৌধুরীকে আমি ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) হিসেবে পেয়েছিলাম। ফজলুল হালিম চৌধুরী স্যার এক অর্থে আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পাওয়া। কিংবা আওয়ামী লীগের প্রতি তার ইনক্লাইবেশন থাকতেও পারে। কিন্তু আমাদের উনি ছাত্র হিসেবে যেভাবে ট্রিট করেছেন, ডাকসুতে নির্বাচিত হওয়ার পরে, সেটা প্রকৃতপক্ষে অকল্পনীয়। এই অর্থে যে, উনি একধরনের স্নেহ করতেন আমাদের, বকাবকিও করতেন। ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো ১৯৮২ সালের পর। তখন ফজলুল হালিম চৌধুরী আমাদের ভাইস-চ্যান্সেলর। ১৯৮২ সালের সামরিক শাসনের পরপরই, শিক্ষা দিবসকে কেন্দ্র করে ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো। ফজলুল হালিম চৌধুরী ডাকসুর জিএস আখতারুজ্জামানকে ‘আখতার’ বলে ডাকতেন না, পুরো নাম ধরে ডাকতেন। আমাকেও কেন যেন স্যার পুরো নাম ধরে ডাকতেন, বলতেন, ‘আলী রীয়াজ’ এদিকে আস। তখন তো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে। একটা ঘটনার কথা বলি, সরকারের পক্ষ থেকে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাদের ডাকা হয়েছে আলোচনার জন্য। আমাদের দ্বিধা আছে, আলোচনায় যাব কি যাব না। সংগ্রাম পরিষদের ভেতর এ নিয়ে তিন-চারদিন ধরে মিটিং চলছে। প্রস্তাবটা এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ভাইস-চ্যান্সেলরের কাছে। ফলে, ফজলুল হালিম চৌধুরীকে আমাদের জানিয়ে দিতে হবে আমরা যাব কি যাব না। সিদ্ধান্ত হলো, আমরা যাব না। আলোচনা নয় রাজপথেই ফয়সালা হবে। এ কথাটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে ভিসি স্যারকে। রাতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা সবাই গেলাম। স্যার, বললেন, যা সিদ্ধান্ত নেও, সেটা তোমাদের সিদ্ধান্ত। আমি শুধু মাধ্যম হিসেবে সরকারকে জানিয়ে দেব। আমি বলব না, তোমরা যাও, আবার এটাও বলব না যে, তোমরা যেও না। যা-ই কর, আমি জানিয়ে দেব। তবে, বিবেচনা করে, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিও।
আলোচনা শেষে স্যারের বাসা থেকে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। বেরুবার সময় স্যার ডাকলেন, আখতারুজ্জামান, আলী রীয়াজ একটু বসো। তারপর বললেন, কে কোথায় রাতটা থাকবে একটু খবরে রেখ। কী হয়, না হয়, খবরগুলো আমাকে একটু জানাইও। এই কথা বলার আগে পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিক ভিসি। ভিসিসুলভ কথাবার্তাÑ তোমরা যা বলবে, আমি সেটা কনভে (পড়হাবু) করব, তোমাদের দায়িত্ব আমি নিতে পারব না। ফরমাল ভাইস চ্যান্সেলরের কথা। তখন তো মোবাইল ফোনের যুগ না। উনি বললেন, সবাই কে কোথায় থাকবে খোঁজখবর রাইখো, আর প্রয়োজন হলে আমাকে জানাইও। এই যে অভিভাবকসুলভ, পিতৃসুলভ আচরণ, এই হচ্ছে ফজলুল হালিম চৌধুরী। পরে তিনি রিজাইন করেছিলেন। এভাবেই তাকে আমি পেয়েছি।
সাপ্তাহিক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো তখন কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক আছেন। আছেন লেখক আহমদ ছফা। তাদের সম্পর্কে কোনো স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা।
আলী রীয়াজ : ছফা ভাইর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। ছফা ভাই যখন লেখক শিবির করছেন, তখন যোগাযোগ হচ্ছে। ছফা ভাই তো ছফা ভাই। অ্যানপ্যারালাল ছফা ভাই। ছফা ভাইর সঙ্গে বিভিন্নভাবেই আমরা যুক্ত ছিলাম। লেখক শিবির, আড্ডাÑ এই যে ফরহাদ মজহারের গানের অনুষ্ঠান, চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান সব বিষয়েই জড়িত ছিলাম ছফা ভাইর সঙ্গে। ছফা ভাই তখন থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে। তার ওখানে গিয়ে ছফা ভাইর গান শুনতে হবে। ছফা ভাইর গান শুনতেই হবে। হঠাৎ করে হারমোনিয়াম একটা জোগাড় করলেন। এখন গান শুনতে হবে। হারমোনিয়ামের একটা রিড চেপে ধরে উনি গান গাইছেন। এবং সেটা শুনে হাসা যাবে না। হাসার জন্য সাজ্জাদকে তিনি ঘর থেকে বের করে দিলেন। বললেন, ‘তুমি বেরোও, বেরোও।’ কারণ সে ছফা ভাইর গানটা অ্যাপ্রিসিয়েট করতে পারেনি। ছফা ভাই এরকমই।
লেখক শিবির এক পর্যায়ে ভাগ হয়ে গেল। আমরা ছফা ভাইর সঙ্গে থাকলাম। ছফা ভাই আবার আমাদের না জানিয়ে হুমায়ুন কবীর পুরস্কার ঘোষণা করে দিলেন। আমরা ধরলাম তাকে, যে, আমাদের জানালেন না? উত্তর দিলেন, ‘জানাইলে তো তোমরা এইটাই বলতে।’ এটাই আহমদ ছফা।
সাপ্তাহিক : অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক?
আলী রীয়াজ : আমরা যখন ছাত্র, তখন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বক্তৃতা দিলেন, 'ঝঃধঃব ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হ' নামে। পরে সলিমুল্লাহ খান এটার সমালোচনা করে একটা বই লিখেছিলেন। ওটার ভূমিকাতে বোধহয় লেখাটার একটা পটভূমি বর্ণনা আছে, যে, ওতে আমার একটা ক্ষুদ্র ভূমিকা আছে। পরে সেটা আমরা তখন ছাপতে পারিনি একসঙ্গে। বক্তৃতাটা একাধিক দিন হয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিই এটার একটা চ্যালেঞ্জ হওয়া দরকার। আমরা একত্রে আলাপ করি। সলিমুল্লাহ খান তার সুদীর্ঘ সমালোচনা লেখে। কথা ছিল খান লিখবে, আমি ছাপার ব্যবস্থা করব। সলিমুল্লাহ খান ‘জাতীয় অবস্থার চালচিত্র’ নামে আবদুর রাজ্জাকের ঝঃধঃব ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হ বিষয়ক বক্তৃতার সুদীর্ঘ সমালোচনা লিখে তার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু আমি তখন সেটা ছাপতে পারি নাই। খান তার দায়িত্ব পালন করলেও আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারি নাই।
পারি নাই এ অর্থে, আমি ডাকসুর সাহিত্য সংকলনে, বড় সংকলনে বার্ষিকীতে লেখাটা বের করব, এরকম প্রস্তুতি নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই বার্ষিকী আর বের হয় নাই। দীর্ঘদিন ধরে সলিমুল্লাহ খানের লেখাটা নিজের কাছে রেখে তাকে ফেরত দিই। আমি খুশি যে, লেখাটা তাকে ফেরত দিতে পেরেছি। হারিয়ে ফেলিনি।
সাপ্তাহিক : বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তো আপনি উজ্জ্বল ছাত্র, চেনামুখ। ব্যক্তিগতভাবে প্রেম বা সম্পর্ক তো তৈরি হবার কথা। সে প্রসঙ্গে কিছু বলবেন...
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ, হওয়ার কথা। কিন্তু হয় হয় একটা অবস্থা, হয় নাই আর কী! তার একটা কারণ হচ্ছে আমার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা। আমার পছন্দ ছিল। সেটা হয়তো আপনি খোঁজখবর নিলে তখনকার অন্যদের কাছে সংবাদ পেয়ে যাবেন। আমি নিজে বলব না, তার কারণ, যার ব্যাপারে আমার পছন্দ ছিল তাকে একটু বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা হবে। তবে, হ্যাঁ, পছন্দ ছিল। শেষপর্যন্ত, অনেকের ধারণা, আমরা প্রেমই করেছি। আমিও তাই মনে করতাম। সম্ভবত, সেও মনে করত বা করত না, কে জানে!
শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা আর হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি তার একটা অন্যতম কারণ, আমার রাজনৈতিক জীবন। তখন তো আমি রাজনীতিতেই থাকব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার একাডেমিক ভালো ফলাফল বলেন, আমি ডিবেট করি কিংবা কালচারাল একটিভিস্টÑ পরে অবশ্য ১৯৮০-৮১ সালের দিকে কালচারাল অ্যাকটিভিজম থেকে সরে আসি। একটু প্রসঙ্গ পাল্টে যাবে তবুও বলি, আমার সঙ্গে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সর্বশেষ যেদিন দেখা হয়, রুদ্র সেদিন আমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। তার কথা ছিল, ‘লিফলেট লেখার জন্য তোমার জন্ম হয়েছে?’ ওর ধারণা আমি সাহিত্য যে আর লিখছি না, এটা একটা ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু আমি ততদিনে সাহিত্যের পথ ছেড়ে রাজনীতিতে সরে এসেছি। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ, আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ে বই লিখছি। আমার সমস্ত লেখালেখি তখন রাজনীতি নিবিষ্ট। আমি রাজনীতিই করব। আমার স্বপ্ন তখন রাজনীতি। এটা আসলে আমার সঙ্গে যার প্রেমের সম্পর্ক বা সম্পর্ক হয়ে ওঠা বা হয়ে উঠতে পারত বা হয়ে উঠেছেÑ যেভাবেই বলেন, তারও ধারণা হয়ে উঠেছে, আমারও ধারণা হয়ে উঠেছিলÑ সেখানে রাজনীতি বাধা হয়ে দাঁড়াল। বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
একজন সিনিয়র সাংবাদিক আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারটা জানতেন। তার নামটা আমি বলতে চাই না। উনি আমাকে বলেছিলেন যে, আচ্ছা তোমাকে ওই মেয়েটি বিয়ে করবে কেন বল তো? আমি বলেছিলাম, ‘আমি’ বলে বিয়ে করবে। কিন্তু, সমস্ত জীবন ও কেন স্ট্রাগল করবে? তুমি যা হইতে চাও, তাতে তো তাকে তার সমস্ত জীবন স্ট্রাগল করতে হবে। এবং মেয়েটির পরিবারের ক্ষেত্রেও স্ট্রাগলের ছবিটা তার দেখা আছে। সেই বিবেচনা হয়ত ওই সিনিয়র সাংবাদিকের মাথায় কাজ করেছিল। সে কারণেই উনি বলেছিলেন, তুমি ভেবে দেখতে পার, ও কেন তোমার কারণে সারা জীবন ধরে স্ট্রাগলের জীবন বেছে নেবে?
তুমি সাংবাদিকই হও বা রাজনীতি কর, দুটোই কিন্তু কষ্টকরÑ সংগ্রামের জীবন।
আমার স্বপ্ন তখন রাজনীতি করা আর পেশাগতভাবে সাংবাদিকতা। সেটা করেই বা আর কতদূর এগুনো যাবে? দুটো করতে গেলে তো কোনটাই হবে না। কিন্তু মূল জায়গা তো রাজনীতি।
পরে, আর সম্পর্কটা বিয়ে পর্যন্ত গড়ালো না। যোগাযোগ ছিল অনেক দিন। তারপরে আস্তে আস্তে যা হয়... বিচ্ছিন্নতা, যার যার নিজের মতো করে নিজের জীবনে জড়িয়ে পড়া।
সাপ্তাহিক : সেটা কী আজ এই পরিণত বয়সে যখন ভাবেন, তখন কোনো বেদনা, যন্ত্রণা হয়ে ওঠে...
আলী রীয়াজ : স্মৃতি, বেদনা...। সত্যি কথা, মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা যদি এটা এ রকম না হয়ে, যেরকম চাওয়া ছিল, সেটাই হতো তাহলে কী হতো! হ্যাঁ। এগুলো ইচ্ছে ঃযব ঢ়ধঃয বি ফরফ হড়ঃ ঃধশব. এটা হয় নাই। হলে কী হতে পারত? অনেক কিছুই হতে পারত। আবার অনেক কিছু না-ও হতে পারত। আমি এখন যেখানে আছি সেটা হয়ত হতো না। এই যে আমি আমেরিকায় গেলাম, বা এখন যা করছি এগুলো হয়ত কিছুই হতো না। হয়ত আমি রাজনীতিতেই থাকতাম। যেহেতু ওই জীবনটাই আমি তখন ভাবছিলাম, সেটাই আমি গ্রহণ করতাম, সেটাতেই থাকতাম। ফলে হয়ত আমার জীবনটা অন্যরকম হতো। আপনার সঙ্গে যখন কথা বলছি এর মধ্যে এক্ষুণি আমার মেয়ে আমেরিকা থেকে ফোন করেছিল। সম্পর্কটা থেকে গেলে হয়ত এখন যে আমার মেয়ে হয়েছে সে আমার মেয়ে হতো না! এক অর্থে যে কোনো জিনিস যখন না হয়, তখন একধরনের বেদনা তো থাকেই। যে, এটা হয় নাই। আবার না হওয়ার কারণগুলোও তো থাকে। হয় নাই তার একটা পজিটিভ দিকও তো থাকে। কিন্তু ওই সময়টার মধ্যে যে স্মৃতিটা...
সাপ্তাহিক : বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কি আপনাকে স্মৃতিভারাতুর করে?
আলী রীয়াজ : আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময় বলে আমি মনে করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন। কারণটা হচ্ছে যে, আমি সেসময় সেখানে পড়ালেখা করেছি, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে টেলিভিশন বিতর্ক দলে অংশ নিয়েছি, আমি রাজনীতি করেছি, ডাকসু নির্বাচন করেছি, সাহিত্য সম্পাদক হয়েছিÑ এমন একটা পরিবেশে আমি সময় কাটিয়েছি যেখানে কামাল, আমি, রুদ্র আমরা পরবর্তী সময়ে একসঙ্গে কাজ করতে পেরেছি, এই জিনিস তো অমূল্য। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আমি অসন্তুষ্ট নই। আরেকটু  ভালো করলে তো অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেতাম বা মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলে খারাপ হতো না। ওই মুহূর্তে এসব অনুভূতি হয়ত ছিল। এখন, এই মুহূর্তে এসব নিয়ে কোনো দ্বিধা, ব্যথা নেই। খারাপ তো করিনি!
বড় কথা হচ্ছে ফলাফলের চেয়ে আমি নতুন জিনিস শিখেছি। আমার শেখাটা হয়েছে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে। আমি কিছুই জানতাম না, সেখান থেকে শুরু করেছি, শিখেছি। ক্লাসরুমে আমি শিখেছি, শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখেছি। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার, একিউআইএম নুরুদ্দীন স্যারের কাছ থেকে শিখেছি। আমি দেখেছি সাখাওয়াত আলী খান স্যারের মতো একজন শান্ত, ধীরস্থির মানুষ। একটা মানুষ এত শান্ত থাকে কী করে! স্যারকে যখন আমি দেখি, স্যারের সাথে কথা বললেই মনের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি তৈরি হয়। এটা আমি ছাত্রজীবন থেকেই দেখছি। মিছিল করে, উত্তেজিত হয়ে ক্লাসে গিয়ে স্যারকে দেখে, ভেতরে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভূত হতো। মিছিলে ‘মানি না মানব না’, ‘করব না, মানব না’Ñ চিৎকার করে, প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে ক্লাসে গেলাম আড়াইটার সময়, স্যার এডভান্সড এডিটিং শেখাচ্ছেন, স্যারকে দেখেই দেখি, আমার ভেতরে শান্ত একটা ভাব চলে আসল। উনার ক্লাসের মধ্যে, কথার মধ্যেই এই শান্ত ভাবটা আছে। এখন যখন আমি নিজে শিক্ষক হয়েছি, তখন মনে হয় ওই রকম হতে পারলে তো ভালো হতো। ছাত্ররা ক্লাসে এসে যেন এ রকম প্রশান্তি অনুভব করে। আমি পারি না। কিন্তু আমার মনে হয় সাখাওয়াত স্যারের মতো হতে পারলে তো ভালোই হতো।
এই যে জিনিসগুলো আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখতে পেরেছি, যে কারণে আমাকে এটাকে স্বর্ণালি সময় বা গোল্ডেন এজ মনে হয়। আমরা ১৯৮২ সালের সামরিক শাসন দেখেছি, ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দেখেছি, তার পরবর্তী সময়ের অবস্থা দেখেছি। কার্যত আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যায় ১৯৮৩ সালে। তারপরে ১৯৮৪ সালে তো আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হই। ছাত্রজীবনে আমরা এত কিছু করছি, মার খাচ্ছি, হাসপাতালে থাকছি, আমার হাত ভেঙে গেছেÑ অনেক কিছু হয়েছে, কিন্তু সবকিছুর মধ্যে আবার একধরনের কনসিসটেন্সি বা ধারাবাহিকতা আছে। ধারাবাহিকতাটা কী? আমরা সবাই খুব অস্থির সময়কে রিপ্রেজেন্ট করছি। যে সময়টা খুব অস্থির এই অর্থে, একটা সেনাশাসনের বিরুদ্ধে দুঃসহ লড়াই চলছে, পাশাপাশি হচ্ছে শিক্ষার মানের প্রশ্ন, ছাত্রসংগঠনগুলো ওই সময় ভাঙতে শুরু করেছে, চিন্তার ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, পার্টির মধ্যে এক ধরনের আদর্শিক চাপ তৈরি হচ্ছেÑ সব মিলিয়ে একটা সময় যে সময়টা আমাদের ভেতরে কাজ করে, আমরা তার সঙ্গে ইন্টারএক্ট করছি, আমার কাছে মনে হয়, এ জিনিস আর কখনো হয়নি আমাদের জীবনে। বয়সও হয়ত একটা ব্যাপার। আমার ওই বয়স তো আর এখন নাই। আমি তখন ১৯/২০ বছরের তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি, অনেক কিছুই ভিন্নভাবে দেখি। সবকিছুতেই একটা ড্যামকেয়ার ভাব।
তারপরে জীবনে আমি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলাম। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলাম। কিন্তু সেরকম জীবন তো আর পাইনি। আমার মনে প্রশ্ন জাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন কী এরকম হয়? ভাবি, এরকম কি হয় ক’জন ছেলেপেলে উত্তেজিত হয়ে একটা পেইন্টিং এক্সিবিশন করে একটা কবিতা পাঠের আসর বসায়। অনেকে বলে, হয় টয় না। এটা কি সম্ভব যে আমি, কামাল, রুদ্র, জাফর কিংবা সাবের যে রাজনীতি থেকে সারাজীবন তিন হাত দূরে থাকবে, কিন্তু আমাদের সঙ্গে সারাক্ষণ চা খাবে, নাস্তা খাবে। টিপ্পনি কাটবে, কিন্তু আমাদের বেদনাটাও শেয়ার করবে। যখন আমরা একটা বই সম্পাদনা করছি, সাবের তার একজন এডিটর। সে আমাদের মতো একটিভিস্ট নয়, কিন্তু কমিটমেন্ট আছে। এগুলো কী এখন সম্ভব? জানি না! এখন মনে হয় সম্ভব না। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন হয়ত সে পরিবেশটাই নাই। হয়ত এটা বাইরে থেকে দেখি বলে এরকম মনে হয়। কিন্তু আমার কাছে এখনো ওই সময়টাকে আমার জীবনের স্বর্ণযুগ বলতে যা বুঝায় তা-ই মনে হয়।
সাপ্তাহিক : ওই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে সন্ত্রাস শুরু হলো বোধহয় বড় আকারে। সেটা কেমন ছিল?
আলী রীয়াজ : আমি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলাম ওই অর্থে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৪ সালের মার্চে আমি শিক্ষকতায় যুক্ত হই। ফলে ১৯৮৪ সালের পর থেকে ছাত্ররাজনীতিতে আমার প্রত্যক্ষভাবে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। আমি পরিকল্পিতভাবেই সেটা করেছি। আমি ছাত্র নই, সুতরাং আমি আর ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকব না। জাতীয় পর্যায়ে খুব ক্ষুদ্রাকারে আমার একটা সম্পৃক্ততা ছিল রাজনীতিতে।
সন্ত্রাসটা শুরু হয়, সেই সময়ে বড় আকারে সন্ত্রাস আমি বলব না। সন্ত্রাসটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে আরও পরে। তখন সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা যেত। সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী বলেই লোকে জানত। ছাত্রনেতা বলে চিনত না কিন্তু। এখন এ ধারা প্রচলিত। কথা আছে না, ও হচ্ছে অমুক ‘ক্যাডার’। ‘ক্যাডার’ শব্দটা আমাদের সময় ভিন্ন মানে ছিল। আমাদের সময়ে ‘ক্যাডার’ বলতে ডেডিকেটেড কর্মী, যার কমিটমেন্ট বেশি, যার একধরনের সুপিরিয়র আদর্শিক অবস্থান রয়েছে সে রকম কাউকে বোঝাত।
সে কমিউনিস্ট পার্টির ক্যাডার, মানে হচ্ছে যে, সে জানে, বোঝে। এখন দেখি ‘ক্যাডার’ শব্দটা হচ্ছে সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করার জন্য। আমাদের সময় সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা যেত এই অর্থেও, যেমন ধরেন আমরা একটা মিছিল করছি, সেটা যেকোনো ছাত্রসংগঠনেরই, আমরা কিন্তু বলতে পারতাম, ওইদিন মিছিলে না তিনটা ছেলে ছিল, এরা কিন্তু...। মানে ওর মিছিলে থাকাটাই সমস্যা। ওরা সন্ত্রাস করবে, যখন সন্ত্রাসের প্রয়োজন হবে, ওদের আমরা দেখতে পাবÑ কিন্তু এরা মিছিলে কেন? মিছিল তো হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ওর মধ্যে ওর কোনো ভূমিকা নাই। এই সেপারেশনটা তখন ছিল।
সে সময় বড় কিছু ঘটনাও ঘটেছে। যেমন ধরেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কিছু কিছু কর্মী, নীরু, অভি বা বাবলু এদেরকে আমরা জানতাম যে এরা সন্ত্রাসী। কিংবা ধরেন অন্যান্য সংগঠনের কেউ কেউ চিহ্নিত হতো, যে এরা সন্ত্রাসী। কিংবা চিহ্নিত হতো এভাবে যে, কিছু কিছু ছাত্রনেতার আবার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে বলে আমাদের জানা ছিল। সন্ত্রাসী এই অর্থে যে, ওদের রাজনৈতিক কারণে সন্ত্রাস করতে হতো। ওরা যে ব্যক্তিগত চাঁদাবাজির জন্য এটা করত, তা নয়। ক্ষুদ্রাকৃতির দু’একটা ঘটনা ঘটলে সেটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হতো। হয়ত আমরা বললাম যে, ওমুক, ছাত্রসংগঠন করে কিন্তু ও একটু মারদাঙ্গা টাইপের। ওর সাহসটা সন্ত্রাসীদের মতো। হয়ত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ আছে।
সন্ত্রাসী বলতে আমাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মনে হতো, এক ক্যাটাগরির ছিল যারা অস্ত্র নিয়ে এসে মাঝেমধ্যে হামলা করে এবং এরা একেবারে চিহ্নিত সন্ত্রাসী। এদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক ওদের প্রথম পরিচয়টা হচ্ছে সন্ত্রাসী। কিছু জনকে মনে হতো, এরা মারদাঙ্গা প্রকৃতির। এরা হলে চড়, থাপ্পড় দিয়ে দু-চারদিন ডাইনিং হলে বেশি খাবার খেয়ে ফেলে। এরাই হচ্ছে আমাদের সময়কার সন্ত্রাসী।
পরে এটা আমরা পরিবর্তিত হতে দেখি। পরিবর্তনটা কার্যত শুরু হয়, আমার বিবেচনায়, ছাত্রনেতা আর সন্ত্রাসীরা মিলে যেতে শুরু করল, সন্ত্রাসীরাও মিছিলে উপস্থিত হতে শুরু করল, ১৯৮২ সালের পরের দিক থেকে। আমি ১৯৮৪, ১৯৮৫ সালে দেখতে পাই এই সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত ছাত্র বা অছাত্র অধিকাংশই এরা ছাত্র ছিল না, এরা শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি ঘোরে। আগে সন্ত্রাসীদের নিয়ে কিন্তু নেতারা ঘোরাঘুরি করত না। কারণ, তারা মনে করত এটা তাদের ইমেজের ক্ষতির কারণ হবে। ইমেজের ক্ষতি একটা বড় বিষয় ছিলÑ কেননা তখন ছাত্র সংসদে নিয়মিত নির্বাচন হতো। ছাত্র সংসদের নির্বাচন হওয়াটা খুব জরুরি। এতে করে হতো কি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ হলে ভোট কমবে, ছাত্র সংসদে জেতার সম্ভাবনা থাকবে না এই ভয়টা থাকত।
আমাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির ওপরে, আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের একটা স্লোগান লেখা ছিল ‘আওরঙ্গ ভাইয়ের হুলিয়া, নিতে হবে তুলিয়াÑ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’। আমার মনে আছে, মাহমুদুর রহমান মান্না ভাই তখন ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী, কলাভবনের সামনে নির্বাচনের প্রার্থী পরিচিতি সভায় উনি ওই দেয়াল লিখনের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলেছিলেন, এই তারা চায়। আমরা চাই শিক্ষা ও ভাতের অধিকার। ওরা চায় আওরঙ্গ ভাইয়ের হুলিয়া, নিতে হবে তুলিয়া। এতে করে পার্থক্যটা বোঝা যায়। কেননা আওরঙ্গ পরিচিত সন্ত্রাসী। তার সঙ্গে ছাত্রলীগের যোগাযোগ। পরে আমরা দেখতে পাই, আস্তে আস্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে।
১৯৮৭ সালে আমি হাওয়াই চলে গেলাম পড়ালেখা করার জন্য। ১৯৮৫ সালে অ্যারেস্ট হলাম।
সাপ্তাহিক : ১৯৮৫ সালে অ্যারেস্ট হলেন কেন?
আলী রীয়াজ : তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমি যুক্ত। এই সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকেই অ্যারেস্ট হই। আমি, মান্না ভাই অ্যারেস্ট হই। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও সেটা আমার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেনি, আমার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে।
সাপ্তাহিক : অ্যারেস্ট হবার পর কতদিন কারাগারে ছিলেন?
আলী রীয়াজ : আমি প্রায় ৪০ দিনের মতো ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ছিলাম। ওই সময় অনেকেই অ্যারেস্ট হয়। কেননা তখন গণভোটটা করা হলো। প্রথম উপজেলা নির্বাচনটা করা হলো। তখন কার্যত যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্টই অ্যারেস্ট হয়েছে। এদের কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। সব বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক।
সে সময় মান্না ভাই, আখতার ভাই, সম্ভবত আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমদ, বিএনপির কেএম ওবায়দুর রহমান, বাম রাজনীতির তোয়াহা ভাই... অ্যারেস্ট হয়েছেন। কার্যত জেলই তখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
ততদিনে সরকার উপজেলা নির্বাচন করল। তারপর একটা ‘হ্যাঁ’, ‘না’ গণভোট করল। তার লক্ষ্য অর্জিত হলো। এরপর আস্তে আস্তে সবাইকে ছাড়তে লাগল।
সাপ্তাহিক : সন্ত্রাসের সঙ্গে রাজনীতির সম্পৃক্ততার কথা বলছিলেন?
আলী রীয়াজ : ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে সন্ত্রাস, রাজনীতিতে একটা বড় চেহারা নিতে শুরু করে। এবং আস্তে আস্তে ১৯৯০ সাল নাগাদÑ আমি ১৯৮৭ সালে দেশ ছেড়ে চলে যাই, ১৯৮৮তে ঢাকায় আসলাম, তখন অষ্টম সংশোধনী বিল সংসদে পাস হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, মূলত সিভিল সোসাইটির আন্দোলন বলে আমি মনে করি, নারীপক্ষ ওই আন্দোলনে অগ্রণী ছিল এবং ‘যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্রের কি বলার আছে?’Ñ এই স্লোগানটা ননপার্টিজান সেক্যুলার স্লোগান হিসেবে গৃহীত হয়। আমার ধারণা স্লোগানটা রাজনৈতিক দল থেকে আসেনি, এসেছে নারীপক্ষ, নারী সমিতি এসব আন্দোলনে যারা যুক্ত তাদের কাছ থেকেই।
সাপ্তাহিক : একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আপনি জাসদ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন চিহ্নিত জাসদ কর্মী। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাচ্ছেন। আপনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় জাসদ অপছন্দের সরকার। কিন্তু আপনার নিয়োগ নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এখন কিন্তু এরকম অবস্থা ভাবা যায় না। এ বিষয়ে কিছু বলবেন...
আলী রীয়াজ : আমি ছাত্রাবস্থাতেই সাংবাদিকতা করেছি ফ্রি ল্যান্সার হিসেবে, পার্টটাইমার হিসেবে। মাস্টার্সে যখন পড়ি তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই সাংবাদিকতা করব। আমি দেখলাম যে এখনই কাজ শুরু করা দরকার। প্রথম টার্গেট ছিল ‘দৈনিক বাংলা’র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হওয়া। এর আগে ‘দৈনিক বাংলা’র বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিল হাসান হাফিজ ছিল, তখন সে স্টাফ রিপোর্টার হয়ে গেছে। তার পদটা খালি হবে। ‘দৈনিক বাংলা’র তখন সর্বাধিক সার্কুলেশন। প্রেস্টিজের দিক থেকে ‘দৈনিক বাংলা’ এগিয়ে। শামসুর রাহমান সম্পাদক। এবং আমার জন্য আরেকটা আকর্ষণ হচ্ছে ‘দৈনিক বাংলা’র নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ হুমায়ূন। হুমায়ূন ভাই সিদ্ধেশ্বরীতে থাকতেন। ছোট থেকেই আহমেদ হুমায়ূন আমাকে চেনেন। চেনেন এই কারণে যে, আমি ছোটবেলায় নিয়মিতভাবে বাজার করতাম। সকালবেলা বাজার করতে উনার বাসার সামনে দিয়ে শান্তিনগরে যেতাম। মাঝেমাঝে উনার বাড়িতে গিয়ে আড্ডা দিতাম। মানে উনাকে বিরক্ত করতাম।
আমার কাছে আহমেদ হুমায়ূন খুব একটা মিস্টেরিয়াস কাইন্ড অফ লোক ছিলেন। ফিজিক্সে পড়া একজন লোক সাংবাদিকতা করেন এবং তার একটা অসামান্য বই ছিল তখন ‘বিপরীত স্রোতে রবীন্দ্রনাথ’ নামে। বইটা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। উনি সাহিত্য জানেন, ফিজিক্সের মেধাবী একজন ছাত্র, সাংবাদিকতা করেছেন এবং লেখেন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে। এবং সেই লেখা অন্য যে কারও চেয়ে ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যা আমি অন্য কারও লেখায় পাইনি।
হুমায়ূন ভাইকে গিয়ে বললাম, হাসান হাফিজ তো স্টাফ রিপোর্টার হয়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতার পোস্টটা খালি আছে। আপনি তো জানেন। বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম ওই চাকরিটা আমি চাই। বললেন, ঠিক আছে অফিসে আসেন। গেলাম। আমি যখন ‘দৈনিক বাংলা’য় গেলাম, তখন আমি আবিষ্কার করলাম আহমেদ হুমায়ূন ভাই আমাকে চাকরিটা দিতে উৎসাহী, কিন্তু নিউজরুমের লোকজন বোধহয় একজনকে পছন্দ করে ফেলেছে। এই একজন হচ্ছে শওকত মাহমুদ। শওকত আবার আমার ক্লাসমেট। কিন্তু ততদিনে শওকতের সঙ্গে একটু ভুল-বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। আমরা একসঙ্গে পত্রিকাও বের করেছিলাম। শওকত সেটার সম্পাদনাই করত। আমি সেটার পেছনের লোক হিসেবে অর্থসংস্থান, বিজ্ঞাপন, দৌড়াদৌড়ি করতাম। আমরা সবাই মিলেই পত্রিকাটা বের করতাম। ‘মন্তব্য’ নামে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য। আমরা একাধিক সংখ্যা বের করেছিলাম। ভালোই করেছিলাম। ডাকসু নির্বাচনের সময় ‘মন্তব্য’ থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বাচনপূর্ব জরিপও করেছিলাম। সেটা খুব একুইরেট হয়েছিল। আমরা তাতে খুব অবাক হয়েছিলাম যে, এতটা সঠিক নির্বাচনী জরিপ আমরা পেলাম কী করে?
সাপ্তাহিক : তারপর, দৈনিক বাংলার চাকরির কী অবস্থা?
আলী রীয়াজ : হুমায়ূন ভাইকে বলার পর উনি আমাকে ‘দৈনিক বাংলা’র নিউজরুমে তারা ভাইর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তখন চিফ রিপোর্টার ছিলেন সম্ভবত মোজাম্মেল হক। মোজাম্মেল ভাইর কাছে আমার আরেকটা পরিচয় হচ্ছে তার ভাই কামাল ভাই, আমার ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন। মোজাম্মেল ভাই সম্ভবত আমাকে পছন্দ করেন নাই। ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতেন। কিন্তু ওই কাজটা বুঝি উনি সম্ভবত শওকত মাহমুদকে দিতে চেয়েছিলেন। ইতোমধ্যে শওকতকে উনি বলেও থাকবেন কিছু কিছু রিপোর্ট করার জন্য। আমি একদিন অফিসে গিয়ে দেখি শওকত অলরেডি একটা ডেস্কে বসে ওইদিনের একটা রিপোর্ট জমা দিচ্ছে। এক অর্থে হয়ত মোজাম্মেল ভাই দেখছেন ও কাজ করতে পারে কিনা। আমাকেও আবার তারা ভাইর সঙ্গে আহমেদ হুমায়ূন ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, বললেন ওকে দেখেন। তারা ভাই আমাকে বললেন, তুমি লেখ। আমি দু’চারদিন গিয়ে বুঝলাম চাকরিটা হবে টবে না। ইতোমধ্যে এটা নিয়ে বোধহয় দৈনিক বাংলার ইউনিয়নের সঙ্গে প্রশাসনের একটা ঝামেলা শুরু হয়ে গেছে। আমি চিহ্নিত হয়ে গেছি যে, ওপর থেকে প্রশাসন আমাকে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। হুমায়ূন ভাই, নির্বাহী সম্পাদক, একটা লোক দিচ্ছেন আবার অন্যদিকে, নিচ থেকে ইউনিয়ন, মোজাম্মেল ভাই যেহেতু ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত, নিউজরুমের লোকজন একটা লোক দিচ্ছে। কোথায় যেন আমি একটা টেনশন দেখতে পেলাম। আমি দেখলাম যে, হুমায়ূন ভাইকে বিব্রত না করাই ভালো।
মনে খুব দুঃখ পেলাম যে, এরকম একটা চাকরি পাওয়া গেল না। দেখলাম যে, আমার বিষয়টা অফিসে আহমেদ হুমায়ূন ভাইকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে। আহমেদ হুমায়ূন ভাই আমাকে বললেন, না, আপনি লেগে থাকেন। আপনি তো ভালো লেখেন, আপনার পরিচয় আছে, সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রÑআপনার হবে না কেন? লেগে থাকেন। আমি তাকে বললাম, থাক, হুমায়ূন ভাই আমি বরং অন্য কোথাও চেষ্টা করি।
এরকম চেষ্টা করব ভেবে, আমি তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাংবাদিকতাটা শুরু করে দিতে হবে। কেননা ওটাই তো জীবনে করব। আমার জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে সাংবাদিকতা করব আর রাজনীতি করব। অথবা শিক্ষকতা করব আর রাজনীতি করব, এই হচ্ছে পরিকল্পনা। সাংবাদিকতা অথবা শিক্ষকতা পেশায় থাকলেই রাজনীতি করা সহজ হয়।
এ অবস্থায় হঠাৎ করে দেখলাম ‘দৈনিক সংবাদ’-এ শিক্ষানবিশ সাব-এডিটর পদের বিজ্ঞাপন। এটা দেখে আমি একটা অ্যাপ্লাই করে দিলাম। আমাকে দু’চারজন বলল যে, দৈনিক সংবাদ-এ জাসদের কর্মী কিংবা বাসদের কর্মীর চাকরি হবার কোনো সম্ভাবনা নাই। কেননা ওটা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির-কর্মীদের কাজের জায়গা। আমি তখন বললাম, দেখা যাক, না হলে হবে না। অ্যাপ্লিকেশন জমা দিলাম। মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হলো। সংবাদ অফিসে হাজির হলাম। তখন বংশাল রোডে অফিস ছিল। সংবাদ-এর মূল লোক তখন বজলুর রহমান। ভাইভায় সম্পাদক আহমেদুল কবীর সাহেব, বজলু ভাই আর মোজাম্মেল ভাই ছিলেন। মোজাম্মেল হোসেনÑউনি তখন ঠিক নিউজ এডিটর নয়, ডেস্কের চিফ সাব-এডিটর। মোজাম্মেল ভাই মারা গেছেন। সব সময় সাদা পাঞ্জাবি পরতেন। ধীর-স্থির মানুষ, শান্ত মানুষ ছিলেন। সম্ভবত তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু উনি আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। ভাইভা পরীক্ষার পর আমি তো ভাবলাম চাকরি হবে না। কিন্তু ‘দৈনিক সংবাদ’ তো বামপন্থিদের কাগজ। তখন আমাদের কাজের জন্য বাংলাদেশের দুটো পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’ অথবা ‘দৈনিক সংবাদ’। আর রক্ষণশীল হলে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ কাজ করতে পারেন। কিন্তু আমি তো ‘ইত্তেফাক’-এ কাজ করতে যাব না। ‘ইত্তেফাক’ যদিও পপুলার পত্রিকা কিন্তু আমার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সেখানে কাজ করতে চাই না।
অবশেষে সংবাদ-এ আমার চাকরিটা হলো। শিক্ষানবিশ সাব-এডিটর পদে চাকরি। বজলু ভাই ডেকে আমাকে চাকরিটা দিলেন। বললেন, তুমি তো খুব ভালো করেছো। এখন কাজ কর। দ্রুতই তো তোমার ডেভেলপ হবে। আমি তো অবাক। কেননা ‘সংবাদ’-এ তখন আমি প্রথম জাসদ কিংবা বাসদ পরিবারের লোক গিয়ে হাজির হলাম যাকে চাকরি দেয়া হলো। এটা একটা অদ্ভুত ঘটনা। এটা ১৯৮১-এর শেষে ’৮২ এর প্রথম দিকের ঘটনা।
সাপ্তাহিক : আপনি ‘সংবাদ’-এ কাজ শুরু করলেন?
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ। কাজ শুরু করলাম। সাধারণত, প্রথম যারা শিক্ষানবিশ পদে ঢোকে, তাদের দেয়া হয় দুপুরের ডেস্কে। মফস্বলের খবর যেগুলো আছে সেটা দেখা। যদিও মফস্বল সম্পাদক আছে, উনি দেখে দেন। এর বাইরে কিছু কাজ। খানিকটা দুধ-ভাতের অবস্থা। আমি এক সপ্তাহ কাজ করার পরে মোজাম্মেল ভাই আমাকে সকালের শিফটে নিয়ে গেলেন। তার ধারণা, দুপুরের শিফটে, মফস্বল ডেস্কে কাজ করাটা হচ্ছে আমার সামর্থ্যরে অপচয় করা। উনি বললেন, সকালের শিফটে চলে আসেন। আন্তর্জাতিক ডেস্কে অনুবাদের অনেক কাজ থাকে। সেগুলো করেন। আমি সকালের শিফটে আসলাম। ওখানে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। নিনি আপার সঙ্গে, মিনু আপার সঙ্গে এবং আরও অনেকের সঙ্গে। তারা প্রথম প্রথম বোধহয় একটু অসন্তুষ্টই ছিলেন, জাসদ-বাসদের ছেলেকে কেন চাকরি দেয়া হলো এই ভেবে। কিন্তু পরে তারা প্রকৃতপক্ষেই আমাকে প্রেইজ করেছেন। নিনি আপার সঙ্গে আমার এখনও যোগাযোগ আছে, নিউইয়র্কে থাকেন। মিনু আপা সম্প্রতি এতদিন পরে আমেরিকাতে গেছেন তার মেয়ের ওখানে, সেখানে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। মিনু আপা, নিনি আপা, জলি আপা এরা রীতিমতো সব অর্থেই আমার যাতে ভালো হয় সে চেষ্টা করেছেন। চমৎকার একটা পরিবেশ ছিল ‘সংবাদ’-এ।
সকালের শিফটে কাজ করলাম কিছুদিন। এরপর মোজাম্মেল ভাই বললেন, রাতের শিফটে কাজ করেন। ঘটনাচক্রে আমি একদিন মেকআপ-টেকআপ দিলাম। মোজাম্মেল ভাই এটা দেখে আমাকে বললেন, রাতের শিফটে আসতে কোনো অসুবিধা আছে? আমি বললাম, না। বরং সুবিধাই হবে। রাত আটটার দিকে এসে দুটার পর্যন্ত কাজ করব। সারাদিনটা আমি অন্য কাজ করতে পারব। রাতের শিফটে চলে গেলাম।
সাপ্তাহিক : বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন কখন?
আলী রীয়াজ : ‘দৈনিক সংবাদ’-এ কাজ করছি। রাতের শিফটে চলে গেলাম। ইতোমধ্যে পরীক্ষা পাস হবার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দফা চাকরির জন্য আমি আবেদন করি। তখন সম্ভবত লেকচারারের দুটো পদের জন্য বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল। আমাদের ফলাফলের দিক থেকে সুব্রত ভালো। ওর অনার্স এবং মাস্টার্সে দুটোই ফার্স্টক্লাস। দুটো পদে বিজ্ঞাপন দেয়ায় আমি ভেবেছিলাম চাকরিটা আমি পাব। তবে ওই দফায় শুধু একজনকে নেয়া হয়েছিল। পরে আমি যতটুকু শুনেছি, আসলে শিক্ষকরা সম্ভবত আমাদের তিনজনকে শনাক্ত করেছিলেন যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাবার যোগ্য। এর মধ্যে সুব্রত একজন, আমি আর আনিস বলে আমাদের সহপাঠী একজন। দু’জন লেকচারার নিলে, বিবেচনায় আমি ছিলাম দ্বিতীয়, কিন্তু সম্ভবত স্যাররা আনিসকেও নিতে চাচ্ছিলেন। তখন দু’জন নেয়ার বদলে একজনকে নিয়ে তারা ঠিক করেছিলেন পরে বিজ্ঞাপন দিয়ে বাকি দুজনকেই শিক্ষক হিসেবে নেবেন।
পরের বছর আবার বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। ইতোমধ্যে আমি ‘সংবাদে’ বছর খানেকের মতো কাজ করার পরে ১৯৮৩ সালে এসে আমি বজলু ভাইকে বললাম যে, আমি চাকরিটা ছেড়ে দেব। ইতোমধ্যে আমি ডেস্কে থাকলেও আসলে রিপোর্টিং করি। পরে আমাকে রিপোর্টিং এ আনা হলো। বলা হলো, তুমি শুধু ডেস্কে অনুবাদের কাজই কেন করো? তো রিপোর্টিং করি। কাগজপত্তরে তখন আমি শিক্ষানবিশ রিপোর্টার। শওকত মাহমুদ ইতোমধ্যে ঘুরতে ঘুরতে আমার আগে ‘সংবাদ’Ñ এ গিয়ে জয়েন করেছে। ঘটনাচক্রে এ রকম যে আমরা ঘুরেফিরে আবার ‘দৈনিক সংবাদ’-এ গিয়ে একত্র হলাম।
‘দৈনিক বাংলা’-তে চাকরিটা শওকতের হয়নি। আমারও যেমন হয়নি শেষমেশ ওরও হয়নি। ওইখানে পরে খায়রুল আনোয়ার মুকুল, এখন যে এনটিভিতে আছে, ও চাকরিটা পায়। এটা নিয়ে আমরা পরে জোক করতাম যে, আমি আর শওকত মিলে টানাহেঁচড়া করায় মুকুলের লাভ হয়েছে। মুকুল আবার আমাদের বন্ধু। শওকত আর আমি মিলে ‘সংবাদ’ এ কাজ করি। শওকতের সঙ্গে আমার তখনও কথা না বলার সম্পর্ক। বজলু ভাই আবার এটা নিয়ে বললেন যে, ‘তোমরা একটা পোলাপাইনা কাজ করতেছো’।
আমরা একবার একটা সিরিজ রিপোর্ট করি। শওকত একটা করে। আমি একটা করি। কিন্তু আমরা দুজনে দুজনের সঙ্গে কথা বলি না। বজলু ভাই মাঝখানে বসেন। আমি বজলু ভাইকে বলি, বজলু ভাই আমার মনে হয় এটা করা দরকার। শওকত আবার বলে, না, ওটা বোধ হয় করা ঠিক হবে না। কিন্তু সরাসরি কথা বলি না। এসব আর কি। শিশুসুলভ কাণ্ড!
সাপ্তাহিক : তো, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির কী খবর?
আলী রীয়াজ : ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার বিজ্ঞাপন দিল। প্রথমবার চাকরি হলো না। আমি একটু ব্যথিত হলাম, আহা, চাকরিটা হলো না। তো কী আর করা। আবার বিজ্ঞাপন দেবে শুনতেছি, আমি ভাবলাম যে এবার নিশ্চয়ই হবে। আমি বজলু ভাইকে বললাম, চাকরিটা ছেড়ে দেব। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে কী করবে? আমি বললাম, আমার একটু প্রস্তুতি দরকার, আমি শিক্ষক হতে চাই। শিক্ষকতার চাকরির জন্য আমার প্রস্তুতিটা দরকার। একটু পড়ালেখা ঝালিয়ে নেয়া দরকার। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলে তো আর ওই চাকরিটা ছাড়ব না। তো, দাসত্বটা নেয়ার আগে একটু স্বাধীনতাটা ভোগ করতে চাই। বজলু ভাই বললেন, দেখো, তুমি শিক্ষকতায় গিয়ে ভালো করবা কিন্তু সাংবাদিকতাই তোমার জায়গা। তুমি সাংবাদিকতায় খুব ভালো করবা। তুমি যেও না। আমি বললাম, না, বজলু ভাই আমি চাকরিটা ছেড়ে দেব। তখন বজলু ভাই বললেন, তাহলে চল একটু কবীর (আহমেদুল কবীর) সাহেবের কাছে যাই। গেলাম। কবীর সাহেবকে বজলু ভাই বললেন, ও তো চাকরি ছেড়ে দিতে চায়। কবীর সাহেব শতকরা নব্বই ভাগ ইংরেজিতে কথা বলতেন। বললেন, অল রাবিশ! আমাদের এখনকার অর্থমন্ত্রী এমএ মুহিত সাহেবের মতো। ‘রাবিশ’ কথাটা আমি প্রথম আহমেদুল কবীর সাহেবের মুখেই শুনি। কবীর সাহেব কী ভেবে যেন বজলু ভাইকে বললেন, চাকরি ছাড়তে চায় কেন? বলে যে, ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করতে চায়। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, চাকরি আমি পেয়েছি কি না। আমি বলি, না পাই নাই। বিজ্ঞাপনও দেয় নাই, দেবে, তার প্রস্তুতি স্বরূপ চাকরিটা ছাড়তে চাই। আহমেদুল কবীর সাহেব তখন বজলু ভাইকে বললেন, ওকে এক মাসের ছুটি দিয়ে দাও। মাথা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আমার তো ছুটি এত পাওনা নাই। শিক্ষানবিশ রিপোর্টারের আবার ছুটি কী? বজলু ভাই দোতলা থেকে নামতে নামতে বললেন, তুমি এক মাসের ছুটি নাও। বেতন যা পাও পাবা, তুমি এক মাসের ছুটি নাও। আমি বললাম, কাজ না করে টাকা নেয়াটা ঠিক হবে না। বজলু ভাই বললেন, আরে নেও না। আর ছুটি মানে হলো, এর মধ্যে যেদিন তোমার  মনে হবে যে ছুটি লাগবে না, সেদিন তুমি চলে আসলেই ডিউটি রোস্টারে নাম ঢুকিয়ে দেয়া হবে।
তখন আমি চলে এলাম। ঘুরি-ফিরি, খাই-দাই। বেশ কিছুদিন পর বজলু ভাইকে গিয়ে বললাম যে, বজলু ভাই আমার মন বদলায় নাই; বজলু ভাই বললেন, ঠিক আছে। মন না বদলালে তো কিছু করার নেই, কিন্তু যদি কখনও সাংবাদিকতা করতে চাও, তাহলে ফেরত এসো। ‘সংবাদ’-এর দরজা কিন্তু তোমার জন্য খোলা থাকল। আমি খুব ইমোশনাল হয়ে গেলাম।
বাংলাদেশে লিবারেল কাগজ তো তখন ‘সংবাদ’-ই। বজলু ভাই (বজলুর রহমান) বলতেছেন যে, সংবাদের দরজা তো তোমার জন্য খোলা থাকবে। ‘সংবাদ’-এ আমিই প্রথম জাসদ-বাসদ পরিবারের একজন যে কাজ করেছি। আমার কাছে মনে হলো যে এটা একটা এচিভমেন্ট। এবং বজলু ভাইয়ের মতো একজন লোক বলছেন, সংবাদের দরজা তোমার জন্য সব সময় খোলা। একটা কোনো পদ পাওয়া যাবে তোমার জন্য। ইতোমধ্যে সন্তোষ দা (সন্তোষ গুপ্ত) আমাকে পছন্দ করেন। তার সঙ্গেও নানা কথা হতো। তিনি বললেন, ‘আপনি যাবেন?’ উনি আবার সবাইকে আপনি বলতেন। বললেন, যান! কিন্তু মনে হয় ফেরত আসতে হবে, সাংবাদিকতা হলো নেশা বুঝলেন। ওইটা সিগারেট ছাড়ার মতো ব্যাপার। সকালে ছেড়ে দুপুরে ধরতে হয়। (সন্তোষদা তো চেইন স্মোকার ছিলেন)
তখন, আমি বললাম যে, দেখি কী দাঁড়ায়?
সাপ্তাহিক : এরপর কী ঘটল?
আলী রীয়াজ : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হবার বিষয়ে আপনি যে প্রশ্নটা করেছিলেন যে, জাসদের কর্মী হওয়া সত্ত্বেও আমি শিক্ষকতায় নিয়োগ পেলাম কী করে? আমাদের সময়ে এটা খুব অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ছিল না কিন্তু। মানে জাসদ করার কারণে আমার চাকরি হবে না, তা না। কারণ, বিবেচনাটা কিন্তু আমার জাসদ করাটা না। আমার একাডেমিক রেকর্ড কী। বিবেচনা সেটা। অন্যদের ক্ষেত্রেও তাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি তখন মেধার ভিত্তিতেই হয়। দু’একটা ব্যত্যয় ঘটে। ওই দু-একটা ব্যত্যয় নিয়ে কিন্তু আলোচনা হয়। এবং সেটা খুব বিব্রতকর আলোচনা। যে অমুক এই কারণে চাকরি পেয়েছে। যে ওইভাবে চাকরি পেয়েছে তার জন্যও এই অভিজ্ঞতাও খুব আনন্দদায়ক হয় না। অনেকটা সময় লাগে তার এই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়ে ওই শিক্ষক কমিউনিটির মধ্যে ঢুকতে।
আমার শিক্ষকরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যরা দেখেছে যে, আমি আমার মেধা এবং যোগ্যতাতেই এটা পেতে পারি। আমার একাডেমিক রেকর্ড তা-ই বলে। ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকায় তো শিক্ষকদের লেখা ছাপা হয়। আমি লিখে সিরাজ স্যারকে দিয়েছি, উনি দেখে বলেছেন, হ্যাঁ, এটা ছাপা যায়। আমাদের সময়ে অন্য বিভাগেও কিছু কিছু রাজনৈতিক বিবেচনায় যে একেবারে চাকরি হয়নি, তা নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরি হয়েছে মেধা-যোগ্যতার ভিত্তিতে। তখন  আমরা একই সময়ে পড়াশোনা করেছি এ রকম জনা তিরিশেক দুই বছরের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেছে। এরা প্রত্যেকেই আসলে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই জয়েন করেছে। ফলে ওটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
সাপ্তাহিক : কিন্তু পরবর্তীতে তো এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে?
আলী রীয়াজ : ১৯৮৭ সালে দেশের বাইরে চলে গেলাম। ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরি। ছয় বছর লাগল আমার মাস্টার্স, পিএইচডি করে ফিরতে। ১৯৯৩ সালে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চেহারা দেখলাম, তাতে পরিবর্তনটা দেখতে পেলাম। ইতোমধ্যে আমি বহুবার এসেছি, প্রায় প্রতিবছরই দেশে এসেছি। দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার চেয়ে যোগাযোগ, দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। এগুলো আমাকে খানিকটা হতাশ করে ফেলে। বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চেহারা দেখে আমি একটু আশাহত হলাম। ভাবলাম, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার জন্য এত আগ্রহ নিয়ে আমি পিএইচডি করলাম, যদি শিক্ষকতায় না থাকতাম, হয়ত পিএইচডিটা করতাম না। চারিদিকে যে রকম নগ্নভাবে দলীয় উঞ্ছবৃত্তি দেখলাম শিক্ষকদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণ শিক্ষক, যারা ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়, তাদের দেখে খুব আশাহত হলাম।
শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম আহমেদ কামাল, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের সঙ্গে, যেটা এক সময় পিংক দল নামে পরিচিত ছিলাম। আমি যখন দেশের বাইরে ছিলাম তখন পিংক আবার সাদা হলো। দেশে ফিরে দেখলাম শিক্ষক রাজনীতি ওই জায়গায় নেই। ওটাও দলীয় রাজনীতির প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। একসময় আমি সিন্ডিকেটের সদস্য পদে, শিক্ষক সমিতির সদস্য পদে, সিনেটেও শিক্ষক প্রতিনিধি পদে নির্বাচন করেছি। জিতি নাই। তখন শিক্ষকদের পিংক গ্রুপের অবস্থা ততটা ভালো না। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক, আমার বন্ধু মুনীর। আমি ফেরত আসার পর মুনীর আমাকে জিজ্ঞেস করল, কী করবা এখন? মুনীর তখন শিক্ষক রাজনীতিতে খুব একটিভ। সে বলল, আস মিটিংয়ে। আমি বললাম এখন সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রাজনীতি না করাটা। বলল কেন? মুনীরকে বললাম, এখন যে রাজনীতি চলছে এই রাজনীতি করাটা আমার কাছে মনে হচ্ছে সঠিক নয়।
তারপর আমি আরও দু’বছর চাকরি করলাম। ইতোমধ্যে বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জনের পর আশাহত হয়ে ঠিক করলাম যে, না এখানে আর শিক্ষকতা করব না। ঘটনাচক্রে তখন আমি বিবিসি রেডিওতে চাকরিটা পেয়ে যাই।
সাপ্তাহিক : প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাই। তার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষক অধ্যাপক আহমদ শরীফ আর ড. হুমায়ূন আজাদ স্যার সম্পর্কে জানতে চাই। আপনি তো সহকর্মী হিসেবে তাদের পেয়েছেন?
আলী রীয়াজ : শরীফ স্যারের সঙ্গে আমার যোগাযোগটা দুই ধরনের ছিল। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আমাদের সাবসিডিয়ারির সাবজেক্ট নিতে হতো। সাবসিডিয়ারিতে যারা বাংলা নেবে তাদের একটা ইংরেজি কোর্স, রিমিডিয়াল ইংলিশ কোর্স পড়তে হতো। আর যারা ইংরেজি সাবসিডিয়ারি নিবে তাদের বাংলা কোর্স পড়তে হতো। সেটা আহমদ শরীফ স্যার পড়াতেন। আমার যেহেতু বাংলা সাবসিডিয়ারি ছিল সেহেতু সরাসরি আমি শরীফ স্যারের ছাত্র নই। কিন্তু আমরা যারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিশু, সুব্রত এরা সব শরীফ স্যারের ছাত্র, সাবসিডিয়ারি সাবজেক্টের সূত্রে। আমরা আবার মাঝেমধ্যে শরীফ স্যারের ক্লাসে যেতাম। জার্নালিজমে আমাদের স্টুডেন্ট হচ্ছে সর্বমোট ১৮ জন। তার মধ্যে দুই ভাগ করে সাবসিডিয়ারির ওই গ্রুপটা হচ্ছে ছোট। শরীফ স্যার তখন বাংলা ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। দুইতলায় চেয়ারম্যানের রুমে টিউটেরিয়াল ক্লাস হতো। ওটাই ক্লাস আর কি। ওই  ক্লাসে মাঝেমধ্যে গিয়ে বসে থেকেছি। তবে শরীফ স্যারের বাসায় আড্ডাটায় আমি যেতাম।
আমার কাছে মনে হয়েছে যে আহমদ শরীফ স্যার তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। ফলে, অনেকেই শরীফ স্যারকে বুঝতে পারেননি। এটা পরে বুঝেছি। শরীফ স্যারের সবচেয়ে বড় জিনিস ছিল ওনার চিন্তার স্বচ্ছতা। উনি খুব অকপটে সত্য কথা বলতে পারতেন। এটা আমার কাছে মনে হয় যে, খুব রেয়ার কোয়ালিটি।
ড. হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে ওই অর্থে আমার খুব ঘনিষ্ঠতা হয়নি। পরিচয়, দেখা, কথাবার্তা, আমি তার লেখা পড়তাম এটুকুই। হুমায়ূন আজাদ সম্ভবত অনেক বড় কাজ করেছেন। আমার কাছে হুমায়ূন আজাদের দুটো কাজ খুব বড় মনে হয়। অন্যরা আবার সেটা মনে করবে কি না জানি না। একটা হচ্ছে উনার ‘রবীন্দ্র প্রবন্ধে রাষ্ট্র ও সমাজ চিন্তা’ বলে একটা বই আছে, সেটা। একেবারে গোড়ার দিককার বই। এ ধরনের কাজ আসলে খুব একটা হয়নি। আরেকটা হচ্ছে তার, ‘লাল-নীল দীপাবলী’ বইটি। এ দুটো আমার কাছে তার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে হয়েছে।
সাপ্তাহিক : আবার প্রসঙ্গ পাল্টাই। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আপনার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই সূত্রে কবি তসলিমা নাসরীনের সঙ্গে আপনার ওঠাবসা। চেনা...।
আলী রীয়াজ : অন্য বন্ধুদের তুলনায় আমার সঙ্গে তসলিমা নাসরীনের এক ধরনের দূরত্ব ছিল। থাকার বিভিন্ন কারণও ছিল। এর মধ্যে একটা হচ্ছে, রুদ্র তো এই বাড়িতেই থাকত একাধিক সময়। ওর কবিতার মধ্যে দেখবেন, ২৩ নম্বর সিদ্ধেশ্বরী বাড়ির কথা আছে। ও আমার সঙ্গেই থাকত। আমার ঘরেই থাকত। আমরা একসঙ্গেই থাকতাম। পরে রুদ্র পাশে বদরুল হুদা সেলিমের বাড়িতে দীর্ঘদিন থেকেছে। রুদ্র’র সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা, আমি কোনো ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কীভাবে বললে এটা বোঝানো যাবে, আমি জানি না যে কতটুকু ঘনিষ্ঠ আমরা ছিলাম। এতটুকুই ঘনিষ্ঠ যে, আমার সঙ্গে রুদ্রের শেষ যেদিন দেখা হয়, ক্ষুব্ধ রুদ্র প্রায় আমাকে মারতে আসে আর কি! বলে যে, তোমার কি লিফলেট লেখার জন্য জন্ম হয়েছে? আমি তখন রাজনৈতিক রচনা লিখি। এই হচ্ছে আমাদের সম্পর্ক।
আমরা যখন একসঙ্গে থাকি আমাদের এই বাসায় তখন তসলিমা নাসরীনের সঙ্গে ওর পরিচয়। রুদ্র তখন নিয়মিতভাবে ময়মনসিংহ যায়। ওর চিঠিপত্র আসে। চিঠি আসলে সন্ধ্যের সময় রুদ্র খুব যতেœর সঙ্গে সেটা খুলবে, পড়বে। এবং কিছু কিছু অংশ শেয়ার করবে আমার সঙ্গে। রুদ্র যখন সিদ্ধান্ত নিল তসলিমা নাসরীনকে বিয়ে করবে, ও এসে আমাকে বলল, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি বললাম, খুব ভালো করেছো। আমি আর কিছু বলি না। রুদ্র বলল, এই, তুমি আর কিছু জিজ্ঞাসা করলা না কি সিদ্ধান্ত? আমি বললাম, তুমি যখন বলার জন্য এসেছো, সময় হলে বলবা আমাকে। বলে যে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি বিয়ে করব। বললাম, এইটাও খুব ভালো সিদ্ধান্ত। আবার, কিছুক্ষণ পরে বলে, তুমি জিজ্ঞাসা করলা না আমি কাকে বিয়ে করব? আমি বললাম যে, দেখ তুমি একটা মেয়েকে বিয়ে করবে এটা আমি জানি। কে, জিজ্ঞাসা করলা না? আমি বললাম, তুমি এখন প্রেম করো, তুমি আর কাকে বিয়ে করবে?
রুদ্র আমকে সবসময় বলতো, তোমার কোনো অনুভূতি টনুভূতি নেই। আবার, মাঝেমধ্যে আমি কবিতা লেখার চেষ্টা করি। সেটা দেখে রুদ্র বলে, তোমার নাই কোনো সেনসিটিভিটি, নাই কোনো অনুভূতি, লেখ রাজনৈতিক গদ্য, তুমি আবার কবিতা লেখতে গেছো কেন?
অনেক পরে তখনও সম্ভবত বিয়ে করে ফেলেছে আসলে। আমাকে জিজ্ঞেস করলো তুমি তো আমার বিয়ের ব্যাপারে কিছু বললে না! আমি বললাম, রুদ্র, দেখো, আমি যতটুকু নাসরীনকে দেখেছি, যতটুকু তোমার কাছ থেকে শুনেছি এবং যতটুকু আমি তোমাকে চিনিÑ তুমি আমার পরামর্শ চাও? রুদ্র বলে, হ্যাঁ, বলো। আমার মনে হয় তোমার এই বিয়ে করাটা ঠিক হবে না।
কেন? আমি বললাম যে, দেখো তোমাদের দুজনেরই পার্সোনালিটি খুব স্ট্রং। আমার দেখে মনে হয়েছে তসলিমা নাসরীনের খুবই স্ট্রং পার্সোনালিটি আছে। তোমাদের বোধ হয় একটা পার্সোনালিটি ক্ল্যাশ হবে। ব্যক্তিত্বের সংঘাত বাধবে। এই কথাটা রুদ্র মানতে পারে না। রুদ্র আমার ওপর খুব ক্ষুব্ধ হয়েছে। বন্ধু হিসেবে অন্যরা যখন দু’জন কবির বিবাহ দেখতে পাচ্ছে, আমি দুইটা স্ট্রং পার্সোনালিটির মানুষের বিয়ে দেখতে পাচ্ছি।
আমাদের অন্য বন্ধুরা খুব এক্সসাইটেড ছিল রুদ্র-তসলিমা নাসরীনের বিয়ে নিয়ে। দু’জন কবির বিয়ে হচ্ছে। কবি দম্পতি তৈরি হচ্ছে। এটা খুব দুর্লভ ঘটনা। আমাদের বন্ধুরা এটা নিয়ে খুব উৎফুল্ল। কেবল ব্যত্যয়টাই হচ্ছি আমি। রুদ্র এটা নিয়ে আমার উপরে অনেকদিন অভিমান করেছিল। পরে আমার সঙ্গে নাসরীনের ওই দূরত্বটা তৈরি হয়ে যায়।
সাপ্তাহিক : আমরা যখন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে পড়ি, জানি, চিনতে চেষ্টা করি কিংবা শুনি তখন কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে একজন আত্মবিধ্বংসী মানুষ বলে মনে হয়। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আলী রীয়াজ : রুদ্র একজন অভিমানী মানুষ। অত্যন্ত অভিমানী মানুষ। ওর আত্মবিধ্বংসী প্রবণতাটা আসলো অভিমান থেকে। ওর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু কিছু ঘটনা, এখন এই কিছু ঘটনা আমি জানি, বলবো না এই কারণে যে, ওগুলো তো ও আমার সঙ্গে শেয়ার করেছে। অনেকে লিখেছে রুদ্রকে নিয়ে। আমি লিখিনি। লিখতে পারিনি। এটা আমার বন্ধুদেরÑ এই ধরেন মিশুক মুনীর, তারেক মাসুদ কিংবা ধরেন আহমেদ ফারুক হাসান; তুলনামূলকভাবে রুদ্রের ক্ষেত্রে এবং আহমেদ ফারুক হাসানের ক্ষেত্রে বা মিশুকের ক্ষেত্রেও আমি ঠিক বুঝতে পারি না যে আমি কোনটা লিখব? কোনটা আসলে আমার, আমাদের! যেটা রুদ্র কাউকে বলতে চায়নি, আমাকে বলেছে, এটা কি এখন আমার সবাইকে বলা উচিত?
রুদ্রের জীবনের বেড়ে ওঠা, বড় হওয়া ইত্যাদির মধ্যে এমন কিছু ঘটনা আছে যেগুলো ওকে, ওর মধ্যে একধরনের অভিমান তৈরি করেছে। এবং সেই অভিমানটা আসলে কখনো কখনো রুদ্র বন্ধুদের ওপরে, কখনো কখনো হয়ত প্রিয়জনদের ওপর তার প্রকাশ করেছে। অধিকাংশটাই তার নিজের অজ্ঞাতে। তার নিজের বিরুদ্ধেই সে ওই অভিমানটা ব্যবহার করেছে। এই যে ওর আত্মবিধ্বংসী প্রবণতাটা ওটা হচ্ছে ওই অভিমানেরই প্রকাশ। এবং সে কারণে কখনো কখনো, ওর সঙ্গে আমার ঝগড়াঝাটি হতো এবং আমার ঘুরেফিরে রুদ্রই হয়ত বলত, আচ্ছা দেও তো সিগারেট, দাও একটা। অনেকক্ষণ তো বকলা, এবার একটা সিগারেট দাও। ঞযধঃ ধিং ঃযব শরহফ ড়ভ ৎবষধঃরড়হংযরঢ়. রুদ্র মনে করত যে আমি যে কোনো বিষয় ইমোশন দিয়ে বিবেচনা করার চাইতে র‌্যাশনালিটি দিয়ে বিবেচনা করি। তাতে করে আমি অনেক সময় ওকে বলবার চেষ্টা করেছি যে, দেখ তোমার অনেক দূর যাওয়ার কথা; এখন এগুলোর মধ্যে যেও না। কিন্তু রুদ্রকে আবার অনেকে ওই পথে উৎসাহিতও করেছে। তার অনেক বন্ধু। আমি হয়ত ‘বন্ধু’, কোটেশনের মধ্যে বন্ধু। আমি জানি না তারাই হয়ত তার প্রকৃত বন্ধু। ওই অর্থে। পরে এদের অনেকেই রুদ্রকে নিয়ে স্মৃতিকথা লিখেছে। কিছু কিছু স্মৃতিকথায় এমন সব ভুলভাল জিনিস আছে, দেখে আমার মনে হয়, ওই সময় ওই ঘটনায় আমি তো উপস্থিত ছিলাম, আমি তো জানি ওই ঘটনা ওই রকম নয়। সেটা কামাল চৌধুরী ভালো বলতে পারবে। বদরুল হুদা যে লেখক নয় সে বলতে পারবে। রেজা সেলিম বলতে পারবে। মাঝেমধ্যে রেজা সেলিম, আমরা একত্রে বসে এসব নিয়ে হাসি। যারা এসব কথাবার্তা লিখেছে, এক অর্থে তারাই হয়ত রুদ্রকে আত্মবিধ্বংসী পথে ঠেলে দিয়েছে। আমি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি না।
রুদ্রের আসলে ছিল নিজের অভিমান, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, কেউ কেউ তাকে ওই বোহেমিয়ান কবি হিসেবেই দেখতে চেয়েছে। তাতে করে তাকে উস্কানি না বলেন, উৎসাহিত তো করেছে।
সাপ্তাহিক : এবার আবার পুরনো কথায় ফিরে যাই। পিএইচডি করে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলেন না। চলে গেলেন বিবিসি রেডিওতে। এটা কী তাহলে শেষমেশ শিক্ষকতার প্রতি অনুৎসাহ থেকেই ঘটল?
আলী রীয়াজ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের প্রতি অনুৎসাহ। শিক্ষকতার প্রতি আমার অনুৎসাহিতা তৈরি হয়নি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে বুঝতে পারলাম, এইখানে যা করতে হবে আমি সেটা করতে চাই না।
সাপ্তাহিক : বিবিসির সঙ্গে আপনার যোগাযোগ কীভাবে ঘটল? নাকি এটা পূর্ব নির্ধারিত...।
আলী রীয়াজ : বিবিসির বিষয়টা একেবারে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করেছি। কেউ আমাকে বলে নাই যে, বিবিসিতে এসে চাকরি নাও। ‘ডেইলি স্টার’ সংবাদপত্র রাখতাম আমার বাসায়। সেখানে একটা বিজ্ঞাপন দেখে আমার স্ত্রীকে বললাম।
সাপ্তাহিক : ততদিনে আপনার বিয়ে হয়ে গেছে?
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ। আমি বিয়ে করি ১৯৮৯ সালে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয় হাওয়াইতে। ও গিয়েছিল আমার আগে মাস্টার্স করতে। পেশায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার। ও গিয়েছিল মাস্টার্স করার জন্য ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার স্কলারশিপে। ওইখানে আমি যাই ১৯৮৭ সালে। আমার সঙ্গে পরিচয় হয়। ১৯৮৮-তে ও মাস্টার্স শেষ করে দেশে ফেরত আসে। আমি ১৯৮৯ সালের গোড়ার দিকে দেশে আসি। আমরা বিয়ে করলাম।
সাপ্তাহিক : বিয়ে কি পারিবারিকভাবে?
আলী রীয়াজ : না, ওই অর্থে পারিবারিকভাবে না। আমাদের বিয়েটা হচ্ছে, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করব, তারপর আমরা কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করলাম। আমাদের দু’চারজন বন্ধু-বান্ধব সেখানে উপস্থিত থাকল। আমাদের দুই পরিবার আসলে জানত না। পরে জেনেছে।
সাপ্তাহিক : পরিবার গ্রহণ করেছে?
আলী রীয়াজ : এতে কোনো সমস্যা হয় নাই। আমরা বিয়ে করে সরাসরি গিয়ে ওর মার সঙ্গে দেখা করি। বলেছি যে, আমরা বিয়ে করেছি। আমার এক ভাবি, রাবেয়া ভাবি, এটা জানতেন। যেহেতু ওই ভাবিকে আমি একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। সে আরেক কাহিনী। সেটা হচ্ছে আমি মাস্টার্স পাস করার পর স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মা উৎসাহিত করছিলেন বিয়ে করার জন্য। ভাবিরা যা করে আর কি! এই ভাবি আমার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ ছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কি বিয়ে-টিয়ে করবা না? ভাবি বিভিন্ন মেয়ের ছবি এনে দেখাবার চেষ্টা করতেন। আমি তখন বললাম যে, এই মুহূর্তে বিয়েতে আমার কোনো উৎসাহ নেই। তখন ভাবি আমার কাছ থেকে একটা প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন যে, তুমি যদি বিয়ে কর তবে আমাকে জানাতে হবে। ধুম করে বিয়ে করলে হবে না। আমি ওই প্রতিশ্রুতিটা রেখেছিলাম। আমার বিয়ের কথাটা তাই ওই ভাবিই জানতেন। পরিবারের আর কেউ জানতেন না। আমি কাজী অফিসে যাবার আগে, ভাবিকে জানিয়ে গিয়েছিলাম যে, আমি বিয়ে করছি। কাজী অফিসে আপনি আসেন। ভাবি সেখানে ছিলেন।
পারিবারিকভাবে তেমন কেউ ছিলেন না। তবে এমন কোনো নাটক হয়নি। কেননা আমাদের পরিবারে আমিই প্রথম নই যে, এরকম কাজ করেছি। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, ততদিনে আমার বাবা মারা গেছেন। মা বেঁচে আছেন। মা একটু অভিমান করেছিলেন। বাড়ির ছোট ছেলে। এর পরে তো এই বাড়িতে আর কোনো ছেলেমেয়ের বিয়ে হবে না। তোমার বাবা নাই। আমি তো বিয়েটা করাইতে পারতাম। মাকে বললাম, যা হবার হয়েছে। এখন দেখেন ছেলের বউ পছন্দ হয় কীনা!
সাপ্তাহিক : আপনার স্ত্রীর নাম কি?
আলী রীয়াজ : সেগুফতা। সেগুফতা জাবীন। মা আমার বউকে পছন্দই করেছিলেন।
সাপ্তাহিক : আপনার স্ত্রী কি তার পেশাতেই আছেন?
আলী রীয়াজ : উনি তার পেশাতেই আছেন। আমার স্ত্রী সেগুফতা জাবীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাস করে। সেখানে দু’বছর পড়িয়েছে। পরে ও স্কলারশিপে হাওয়াইতে মাস্টার্স করতে যায়। ওখানে আমার সঙ্গে পরিচয়। ফেরত এসে আমরা বিয়ে করলাম। ও চলে আসল আর আমি ছুটিতে এসে বিয়ে করলাম। ও আবার ফিরে গেল। চাকরি করা শুরু করল। এখন পর্যন্ত তার প্রফেশনাল কাজ করছে। মাঝখানে এক বছর ইংল্যান্ডে থাকার সময় চাকরি করেনি।  ও সবসময় ওর ক্যারিয়ার মেইনটেইন করেছে।
সাপ্তাহিক : বিবিসির চাকরিটা কখন হলো?
আলী রীয়াজ : ১৯৯৩-তে আমরা দেশে ফিরলাম। তখন খুবই হতাশ। এর মধ্যে ১৯৯৪-এ আমি কয়েকমাস সিঙ্গাপুরে কাটালাম ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ-এ, রিসার্চ এসোসিয়েট হিসেবে।
সাপ্তাহিক : এর মধ্যে তো আপনি জার্নালিজম থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে চলে এলেন। এই শিফটটা করলেন কেন?
আলী রীয়াজ : শিফট করার বহুবিধ কারণ আছে। এর মধ্যে একটা কারণ হচ্ছে আমি গিয়েছিলাম কম্যুনিকেশন পড়তে। কম্যুনিকেশন দু’বছর পড়লাম। কম্যুনিকেশন পলিসি নিয়ে কাজ করছিলাম। আমার উৎসাহ ছিল টেলিকমিউনিকেশন পলিসিতে। দু’বছর আমি তা-ও করেছি। তারপরে আস্তে আস্তে ওই কাজটা করার সময় পিএইচডি করার পরিকল্পনা তৈরি করলাম। আমি পলিটিক্যাল সায়েন্স কোর্স পড়লাম। আমাদের আগেও দু’চারজন স্টুডেন্ট কম্যুনিকেশন থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে গেছে। আমি পলিটিক্যাল সায়েন্সে উৎসাহী হয়ে উঠলাম। এইক্ষেত্রে দু’জন শিক্ষক, বিশেষত পলিটিক্যাল সায়েন্সের একজন শিক্ষক খুব বড় রকমের ভূমিকা পালন করেন। আমার জীবনে এরকম শিক্ষকদের একটা বড় ভূমিকা আছে। যেমন আমি কোর্স করেছি, কোর্স করে একটা পেপার লিখেছি, পেপার লিখে জমা দিয়েছি। পেপারটা আনতে যেতে হবে তো গেছি, বব স্টফারের কাছে। স্টফার খুব কড়া শিক্ষক কিন্তু মেধাবী ও সাউথ-ইস্ট এশিয়া নিয়ে কাজ করার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন। তার কাছে গিয়ে ফাইনাল পেপারটা আনতে হয়। তিনি মন্তব্য করে বুঝিয়ে দেন। আমি গিয়ে হাজির হলাম। হাজির হবার পরে আমি তো ভয়ে আছি যে, ধমক-টমক খাব। তিনি আমাকে প্রথমে জিজ্ঞাসা করলেন তোমাকে ডিপার্টমেন্টে দেখি না কেন? আমি বললাম, আমাকে এই ডিপার্টমেন্টে দেখ না, কারণ আমি এই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র না। আমি কম্যুনিকেশনের ছাত্র। উনি বললেন, কেন তুমি এই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র না? ছাত্র না, কেননা আমি তো কমিউনিকেশন পড়েছি। বলে যে, না না তোমার পেপার দেখে তো মনে হয় নাই তুমি আমাদের ডিপার্টমেন্টের ছাত্র না, তোমার এই ডিপার্টমেন্টেরই ছাত্র হবার কথা। তুমি কেন কমিউনিকেশনে গেছ? তুমি এখানে চলে আসো? তুমি কী করবা? আমি বললাম, কমিউনিকেশনে আমার মাস্টার্স প্রায় শেষ, পিএইচডি করব। বলে, আমাদের এখানে কর। তুমি অ্যাপ্লিকেশন কর। সে আবার আরেক টিচারকে বলেছে। আমার ইচ্ছাও হয়েছে ততদিনে পলিটিক্যাল সায়েন্স পড়ার। আসলে আমার চিরকালীন উৎসাহ পলিটিক্স। অন্যদিকে টেলিকমিউনিকেশন পলিসি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি যে, এর পলিটিক্যাল ইকোনমিটা বুঝতে হবে। তখন আমি ওই পলিটিক্যাল সায়েন্সে শিফট করলাম।
সাপ্তাহিক : দেশে ফিরে কয়েক মাসের জন্য সিঙ্গাপুরে গেলেন রিসার্চ প্রজেক্টে।
আলী রীয়াজ : দেশে এসে ১৯৯৪ সালে কয়েক মাসের জন্য গেলাম সিঙ্গাপুরে রিসার্চ প্রজেক্ট করতে। সাউথইস্ট এশিয়ান ফেলোশিপ নিয়ে। ফেরত আসলাম দেশে। ‘ডেইলি স্টারে’ বিবিসি রেডিওর একটা বিজ্ঞাপন দেখে অ্যাপ্লাই করলাম। লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা হলো। ওরা আমাকে চাকরিটা অফার করল। আমি চাকরিটা নিয়ে নিলাম। কারণ হচ্ছে যদি পরে সাংবাদিকতা বিভাগে ফেরতই আসি; ভাবলাম যে এটা একটা টেম্পোরারি সিচুয়েশন, দেখি আবার গিয়ে, দূর থেকে হয়ত অন্যরকম লাগতে পারে।
ভাবলাম, সেদিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিউজ অপারেশনে কাজ করার একটা অভিজ্ঞতা তো কাজেই দিবে। খানিকটা অভিমান, খানিকটা ক্ষোভÑ ইত্যাদি নিয়ে আমি চলে গেলাম বিবিসিতে। তখন আমার পরিকল্পনা আমি কিন্তু দেশে ফেরত আসব। পরবর্তী সময়ে দেখলাম যে না আর সেটা সম্ভব হচ্ছে না। কেননা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটা আমি এক বছরের মধ্যে ছেড়ে দিলাম। এর অন্যতম কারণ,পদটা আমি ধরে রাখতে চাইনি। পদটা ধরে রাখার মানে হচ্ছে যে, আরেকজনের চাকরি হচ্ছে না।
আমি এই কথাটা একজনকে বলেছিলাম যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাচ্ছি কেননা আরেকজন মেধাবী ছাত্র হয়ত সে জায়গায় সার্ভিস দিতে পারবে। সে বলছে, মেধাবী না দলের!
ওইভাবেই আমি বিবিসিতে চাকরিটা নিলাম।
সাপ্তাহিক : বিবিসিতে আপনার চাকরির অভিজ্ঞতা কেমন?
আলী রীয়াজ : বিবিসির চাকরিটাতে আমি অনেক কিছু শিখেছি। ওই সময়টা, আপনি বিবিসির ওয়েব সাইটে গেলে দেখবেন, বিবিসির ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত স্যুভেনিয়ার ‘সেতুবন্ধন’-এ আমার একটা লেখা আছে, আমার সময়টা নিয়ে।
ওই সময়টায় বিবিসিতে একটা বড় পরিবর্তন আসে। বাংলা বিভাগে এবং গোটা বিবিসিতে। বিশেষ করে বাংলা বিভাগে যে পরিবর্তন, সেটা হলো আগে অনেক বেশি ফিচার যেত। তখন হলো নিউজ ওরিয়েনটেড। একপর্যায়ে বিবিসিতে আমি বাংলাদেশ কভারেজ সমন্বয় করতাম। বিবিসির বাংলা বিভাগের অফিস ছিল ঢাকায়, কলকাতায়, দিল্লিতে এবং চট্টগ্রামে একটা ছোট অফিস ছিল। প্রধানত আমার দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের কভারেজের প্ল্যানিং এবং তার এক্সিকিউশন। সেটা অফিস মেইনটেইন করা থেকে, সেটা ফিচার তৈরি করা হোক, সার্বক্ষণিক ফলো করা, আমরা কী করব, কী করতে পারি এসব। একটা বড় জিনিস ছিল যে, সে সময় একুশে টেলিভিশন প্রথম চালু হলো, আমরা একটা চ্যালেঞ্জ ফিল করেছি। ঘরের দরজায় একটা টেলিভিশন যে ভিজ্যুয়াল দেখাবে, তখন সাড়ে সাতটা পর্যন্ত কেন লোকে বসে থাকবে বিবিসি রেডিও শোনার জন্য? আমরা কী দিতে পারব যে মানুষ বিবিসি শুনবে? দীর্ঘদিনের একটা সুনাম, গ্রহণযোগ্যতা, পরিচিতি ছাড়া আর কী আছে আমাদের? ফলে ওইটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ওইগুলো থেকে আমি শিখেছি।
সাপ্তাহিক : তাহলে বিবিসিতে আপনার জন্য অনেক নতুন জিনিস শেখার সুযোগ দিয়েছে?
আলী রীয়াজ : অবশ্যই। সাংবাদিকতার বিভিন্ন জিনিস সেখানে শিখেছি। আমি সর্বত্রই শিখেছি। দৈনিক সংবাদ-এ শিখেছি ছোট করে লিখতে। ক্লাসরুমে শিখেছি, আতাউস সামাদ স্যার ক্লাসে এডিটিং শেখাতে গিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন যে, বেশি লম্বা করে লিখলে লোকে পড়ে না। তোমার কাজ হচ্ছে লোককে পড়ানো। তুমি কাউকে ইমপ্রেস করছ না। তুমি এক্সপ্রেস করছ। স্যার সব সময় বলতেন, এক্সপ্রেস কত সহজে কীভাবে করা যায় সেটা দেখতে হবে। ইমপ্রেস করার দরকার নেই। লোকে তোমার ভাষা দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবে, ওই জিনিস দরকার নাই।
রেডিও জার্নালিজমে আবার আরও বেশি চ্যালেঞ্জ। কারণ মনোযোগ আকর্ষণের ক্ষমতা আপনার কতটুকু? কত স্বল্প সময়ে কতটুকু পড়তে পারবেন? এগুলো জায়গায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে। ফলে আমি ছোট ছোট বাক্যে লিখি। বড় বাক্য লিখলে লোকে পড়ে বলে মনে হয় না। সংবাদপত্রে অন্তত সেটা পড়ে না।
বিবিসিতে প্রীতিকর এবং অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা দুটোই আছে। বিবিসির সঙ্গে আমার সম্পর্কচ্যুতি বা সেপারেশনটা খুব সুখকর নয় আসলে। আমিই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আসলে বিবিসি ছাড়ার।
সাপ্তাহিক : বিবিসির সঙ্গে সম্পর্কটা সুখকর হলে কী সেখানে আরও দীর্ঘায়িত করতেন ক্যারিয়ার?
আলী রীয়াজ : না, সেটা করতাম না। কেননা, ততদিনে আমার পরিকল্পনা হচ্ছে শিক্ষকতায় ফেরত আসা। কিন্তু আরও প্লিজেন্টলি, সুমধুরভাবে বিবিসির সঙ্গে সেপারেশনটা হতে পারত। আমি যখন চাকরিটা ছাড়ি তখন তা চালিয়ে নিতে পারতাম। আমাকে বলাই হয়েছিল চাকরি চালিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু আমি সেটা নিলাম না। কেননা, ততদিনে ব্রিটেনে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি চাকরি পেয়েছি। কাকতালীয়ভাবে ওই চাকরিটা পাই। ফলে ২০০০ সালে যখন বিবিসি ছেড়ে আসি, তখন আমি আর বিবিসিতে থাকতাম না। তবে, ওই যে বললাম, শেষ সময়ে বিবিসিতে আমার সুপারভাইজারের সঙ্গে আমার যে সম্পর্কটা তৈরি হলো, যে টানাপড়েন তৈরি হলো, তার চেয়ে প্রীতিকরভাবে সেপারেশনটা হতে পারত।  কিন্তু তাই বলে, সম্পর্ক খারাপ হয়নি। এখন পর্যন্ত বিবিসির সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। চাকরি ছাড়ার ১৪ বছর পরও বিবিসির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। কেননা, আমি মনে করি বিবিসির অন্যদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, হৃদ্যতাপূর্ণ। তাদের বন্ধু বলেই জানি।
সাপ্তাহিক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, তারপর বিবিসি রেডিওতে সাংবাদিকতা ছেড়ে মার্কিন মুল্লুকে পাড়ি জমালেন, শিক্ষকতার সুবাদে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। এই অভিজ্ঞতা আপনার কেমন?
আলী রীয়াজ : আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে অধ্যাপনা করছি। আমি এটা এনজয় করি। আমি যা করি, আমি সত্যি সত্যি তা এনজয় করি। অনেকে প্রতিদিন অফিসে যাওয়া নিয়ে বিরক্ত থাকেন, নিরানন্দে ভোগেন, কিন্তু আমি এটা খুবই উপভোগ করি। এবং উত্তরোত্তর আমি বিভিন্ন রকম দায়িত্বও নিয়েছি। ধরেন আমি প্রথমে ব্রিটেনে এক বছর পড়ালাম, তারপরে আমেরিকায় ফেরত গিয়ে একটা ছোট প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেছি। আমি জীবনে ওই একবারই প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করেছি। বাকি সময় আমি পাবলিক সেক্টরে কাজ করেছি। আমি মূলত পাবলিক সেক্টরেরই লোক। বিবিসি বলেন, ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় বলেন, বা এখন আমি ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াই, সবই পাবলিক সেক্টর।
আমি যা করছি, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গেই করছি। যেটা আনন্দের সঙ্গে করতে পারি না, সেটা এড়াবার চেষ্টা করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমি এড়াতে পেরেছি। শিক্ষকতা এবং তার সঙ্গে যে সংশ্লিষ্টতা, এখন নানা রকম প্রশাসনিক দায়িত্ব নিচ্ছি এবং আরও অনেক বিচিত্র সব কাজকর্ম করছি। আমি আনন্দের সঙ্গে করি। এই যে লেখালেখি, লোকে অনেকে বলে, এত লেখেন কেন বা এত লেখার সময় পান কী করে? আমি আসলে আনন্দে লিখি।
বিবিসি ছাড়বার একটা অন্যতম কারণ কিন্তু ওইটা। আমি লিখতে চাই। আমি আমার মতো করে বলতে চাই। আমি এখন যে কথাটা বলতে পারি, বিবিসির স্টাফ থাকলে সেই কথাটা বলতে পারতাম না। এখন বিবিসিতেই যে কথাটা বলি, বিবিসিতে থাকলে আমি সেই কথাটা বলতে পারতাম না।
কিছুদিন আগে বিবিসি আমাকে জিজ্ঞেস করল, ইরাকে মসুলের পরিস্থিতি নিয়ে; যেহেতু আমি এসব সবসময় ফলো করি, আমি যে কথাটা বলতে পারলাম, সেটা বিবিসিতে চাকরিরত থাকলে বলতে পারতাম না।
শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও মনে করি, আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে শিক্ষকতা করি। আনন্দের সঙ্গে গবেষণা করি।
সাপ্তাহিক : আপনি জার্নালিজম পড়লেন। পরে পলিটিক্যাল সায়েন্সে কাজ করলেন। তারপর রিলিজিয়াস মিলিট্যান্সি নিয়ে আপনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। ধর্মীয় জঙ্গিবাদসহ নানান বিচিত্র বিষয়ে আপনার আগ্রহ জন্মালো কীভাবে?
আলী রিয়াজ : আগ্রহ বা ইন্টারেস্টের এই পথপরিক্রমা বা ট্র্যাজেক্টরিটা (ঃৎধলবপঃড়ৎু) একটা যাত্রা বা জার্নি। আমার একাডেমি জার্নিটা এরকম-আমি যখন পিএইচডি করি, তখন আমার বিষয় ছিল ‘স্টেট, ক্লাস এন্ড পলিটিক্যাল ইকনোমি অব মার্শাল ল’। আমি বাংলাদেশের মার্শাল ল বা সামরিক শাসনটা বুঝতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল সামরিক শাসনের ‘পলিটিক্যাল ইকোনমিটা’ বুঝতে হবে। ওটা বুঝতে গেলে আবার সমাজটাকে বুঝতে হবে। তার রাজনৈতিক পরিকাঠামো, ইতিহাস, অর্থনীতিকে বুঝতে হবে। এভাবে আমার পিএইচডি থিসিসের কাজটা করি। পরে বই আকারে সেটা বেরিয়েছে। ‘নদী’ নামে একটা প্রকাশনা বইটা বের করেছিল। তখন আমি পিএইচডি শেষ করে কেবল দেশে ফিরেছি, হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বইটা ওরা প্রকাশ করেছিল। তখন আমার আবার খুব বিদ্রোহী প্রবণতা ছিল, আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত প্রকাশনা দিয়ে বই বের করব না এরকম ভাবনা কাজ করত। ইউপিএল বা বড় কোনো প্রকাশনার কাছে যাব না। আর্ট কলেজের ক’জন তরুণ ভালো নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে, আমার কাজ হচ্ছে তাদের সহায়তা করা। আমি তো দেশেই থাকব, দেশের বাইরে ছাপার কোনো রকম পরিকল্পনা নাই। এসব চিন্তা থেকেই বইটা ‘নদী’ প্রকাশনা থেকে ইংরেজিতে বেরোয়।
সাপ্তাহিক : বইটা লেখার কাজ তাহলে আপনাকে সমাজ বুঝতে সাহায্য করেছে?
আলী রীয়াজ : আমি বাংলাদেশের সোসাইটিটা বুঝতে চাইলাম। তার থিওরিটা বুঝতে চাইলাম। সমাজটাকে বিভিন্নভাবে বুঝতে চাইলাম। বোঝার চেষ্টা করে দেখলাম, তাহলে স্টেট-সোসাইটি সম্পর্কটা বোঝা দরকার। সেটা নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম। একটা স্টেট, তার সোসাইটিতে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে, সোসাইটি কীভাবে স্টেটকে তৈরি করেÑ এগুলো নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। সেই চিন্তার ফসল হিসাবে আমি দেখলাম, স্টেটের কী কাজ? স্টেটের বিভিন্ন রকম কাজ আছে। স্টেট শুধু একটা ইনস্টিটিউশন না। শুধু জোর করে তা না। তার একটা হেজিমোনি বা কর্তৃত্ব থাকে। তার একটা আইডিওলোজি থাকে। এখন সেই আদর্শের প্রশ্নটা আমরা কীভাবে দেখি। এগুলো থেকে দেখলাম আইডিওলোজির সঙ্গে রিলিজিয়ন বা ধর্মের একটা সম্পর্ক আছে। যে আইডিওলোজিগুলোকে সে সাবসক্রাইব করে বা যেগুলোর হেজিমনি, কর্তৃত্ব কিংবা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটা দেখা দরকার। আমি রাষ্ট্রকে বলি এজেন্সি অফ হেজিমোনি (অমবহপু ড়ভ যবমবসড়হু). ওঃ রং ধহ ধমবহপু ড়ভ যবমবসড়হু. ফলে ওইখানে এসে দেখলাম ‘রিলিজিয়াস মিলিটেন্সি’ বা ‘ধর্মীয় জঙ্গিবাদ’ কিংবা রিলিজিয়ন এন্ড পলিটিক্স এগুলো নিয়ে ভাবা দরকার। সমাজে যে পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটে, তার মধ্যে ধর্মের একটা ভূমিকা থেকে যায় বলে আমার মনে হয়েছে।
সাপ্তাহিক : আপনি রাজনীতিতে ধর্মকে অ্যাড্রেস করার কথা বললেন। কিন্তু আমাদের এখানে উল্টো ঘটনা দেখি। বিশেষত যারা বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। যারা ডানপন্থী প্রগতিশীল রাজনীতির অংশ তারাও কিন্তু ‘ধর্ম’কে ঠিক গুরুত্ব দিতে চান না। ‘ধর্ম’কে বোঝার চেষ্টা করেন না। বরং ধর্ম বিবেচনার সঙ্গে অনেক বেশি সাংঘর্ষিক অবস্থান নিতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনি আবার ধর্মকে অ্যাড্রেস করার কথা বলছেন। আপনার এই উপলব্ধির ব্যাখ্যা কী?
আলী রীয়াজ : ধর্মকে অ্যাড্রেস করার বিষয়টি কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে আছে। আপনি যদি উনার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়েন তবে এটা দেখবেন। এক অর্থে আমার কাছে মনে হয়েছে তার মুসলিম আইডেনটিটিটা খুব স্ট্রং। পরবর্তীতে ১৯৭২-৭৫ সময়ে, সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ধর্মকে উনি যেভাবে দেখেছেন, তা থেকে কিংবা উনার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ যখন পড়ি তখন দেখতে পাই উনার মুসলমান পরিচিতিটা তিনি ধারণ করেছেন। তার মধ্যে একভাবে সেটা প্রকাশিত। অন্য রাজনীতির মধ্যে, যেটাকে আমরা সেক্যুলার রাজনীতি বলি, যদিও আমি সেক্যুলার বলি না, অন্যরা বলে, সেখানেও এটা আছে। কারণ সেক্যুলারাইজেশন ছাড়া সেক্যুলারিজমের পথে আপনি এগুতে পারবেন না। শেখ মুজিবুর রহমান সেদিকে গেছেন বলে আমি মনে করি না। কিন্তু উনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন অন্তত তার আত্মজীবনী পড়ে আমার ধারণা এবং পরবর্তী সময়ে তার ভূমিকা থেকেও আমি লক্ষ করি। সেটা তাজউদ্দীন আহমদ সাহেবের মধ্যেও ছিল।
আমাদের দেশে বাম রাজনীতির দুটো ব্লাইন্ড স্পট (ইষরহফ ংঢ়ড়ঃ) আছে। একটা হচ্ছে ন্যাশনালিজম। এটা বৈশ্বিকভাবেই আছে। আরেকটা হচ্ছে রিলিজিয়ন বা ধর্ম। রিলিজিয়নকে মার্ক্সের এক প্যারাগ্রাফের এক বাক্য তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। আমি দেখেছি এখানে বাম রাজনীতিতে তাই হয়েছে। ন্যাশনালিজম তো একটা ব্লাইন্ড স্পট। ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে যে বিতর্ক আমরা দেখতে পেয়েছি সেটার মধ্যে মার্ক্সসিজমের ন্যাশনালিজমের প্রশ্নে যে ব্লাইন্ড স্পটটা আছে ওটা আমরা ওখানে দেখতে পাই। ওই একই বিষয় আমরা এখন দেখতে পাই। তখন ওটাকে এত ভালোভাবে অ্যাড্রেস করে নাই, সবাই পাশে রেখে দিয়েছে, অথবা মার্ক্সসের এক বাক্য, ‘ধর্ম হচ্ছে গরিব শ্রেণীর আফিম স্বরূপ’Ñপুরো প্যারাগ্রাফও নয়, এক বাক্য দিয়েইÑ আমরা বিবেচনা করেছি।
কিন্তু একটা সমাজকে যদি আপনি দেখেন, সমাজে ধর্ম আছে। এটাকে আমি মৌলবাদও (ফান্ডামেন্টালিজম) বলি না, খেয়াল করে দেখেন। ধর্মের এই প্রশ্নটাকে আপনার অ্যাড্রেস করতেই হবে। এবং কীভাবে করবেন, সেটা নিয়ে আপনার সঙ্গে আমার ভিন্নমত আছে বা থাকতে পারে। কিন্তু আমি ধর্মকে অ্যাড্রেস করবই না, এটা হতে পারে না।
আমি আমার শুরুটা, যে আমি ধর্ম, রাজনীতি বুঝতে চাইব বলে শুরু করি নাই। আমি রাষ্ট্র বুঝতে চেয়েছি, সমাজ বুঝতে চেয়েছি, বুঝতে গিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক বুঝতে চেয়েছি। সেখানে সমাজের মধ্যে বিরাজমান বেশ কিছু প্রবণতা, ফেনোমেনা দেখতে পেয়েছি। তার মধ্যে ‘ধর্ম’ একটা বিষয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, আইডেনটিটির প্রশ্ন যখন দেখি তার মধ্যে একটা ইসলামের ভূমিকা দেখি। আবার এই ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যের ইসলাম দেখি না। আবার এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে তারও একটা প্রভাব দেখি। এগুলো আমি বোঝার চেষ্টা করি। আমার মনে হয়, না বুঝলে সমাজ বোঝা দুরূহই হবে। অসম্ভব হবে কিনা জানি না। যারা এটাকে পরিপূর্ণভাবে এড়িয়ে যান বা বিবেচনায় নিতে চান না, তাদের হয়ত একটা যুক্তি আছে। কিন্তু আমি এখনো পর্যন্ত কনভিন্সড না যে ‘ধর্ম’কে বাদ দিয়ে, এভোয়েড করে এগুনো যাবে। আমি বরং এই বিষয়টি অনেক পরে বুঝেছি, এটা আমার একটা সীমাবদ্ধতা। তবে, আমার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমি বলি যে, এটা একটা জার্নির মতো। হুট করে একদিন সকালবেলা সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়েছি যে, আমি ‘ধর্ম’ বুঝবো বিষয়টি সেরকম নয়।
সাপ্তাহিক : মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে তো আপনার গবেষণা আছে?
আলী রীয়াজ : মাদ্রাসা নিয়ে আমার একটা বই আছে। মাদ্রাসা নিয়ে আমার বেশ কিছু কাজ আছে যেগুলির অনেকটা ছাপা হয়নি। আশা করছি ছাপা হবে। কওমি মাদ্রাসা নিয়ে একটা কাজ করে রেখেছি, প্রায় সম্পূর্ণ, সেটা শেষ করতে হবে। সময়ের অভাবে পারি নাই।
মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসা শিক্ষাকে বোঝার চেষ্টা করেছি। কেন? আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাকে আপনি বিচ্ছিন্নভাবে তার লিনিয়েজটা (পূর্বসূরি) না দেখে বুঝতে পারবেন না। আবার দক্ষিণ এশিয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষার ধারা বুঝতে হলে কেন মাদ্রাসা, কোথা থেকে এসেছে, ন্যূনতম তার মৌলিক ইতিহাসটা জানতে হবে। তার ভ্যারিয়েশন্সটা বুঝতে হবে। এক অর্থে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে আমার যে বই, সেটা আসলে আমার নিজে শেখা। আমি বুঝতে চেয়েছি। বুঝতে গিয়ে বইটা লিখেছি। তারপরে আমার মনে হয়েছে যে, আপনারা পড়ে দেখেন আমি যেভাবে বুঝতে চাইলাম, সেই বুঝাটা কেমন হলো। ওইভাবেই আমি ধর্ম, রাজনীতি, ধর্ম-রাজনীতির সম্পর্ক, সমাজে এর প্রভাবÑএসব নিয়ে আমার উৎসাহ। তার একটা অফ শুট হচ্ছে মিলিটেন্সি বা জঙ্গিবাদ। বাংলাদেশে ইসলামি মিলিটেন্সি নিয়ে আমার একটা বই আছে।
পলিটিক্যাল ইসলামের বিভিন্ন ভ্যারিয়েশন আছে। ইসলাম যদি আপনি বলেন, তার রিলিজিয়সিটি আছে, যেটাকে আমি ‘সোশ্যাল ইসলাম’ বলি; আবার পলিটিক্যাল ইসলাম আছে। আবার পলিটিক্যাল ইসলামের নানা ভ্যারিয়েশন আছে। তার একটা হচ্ছে মিলিটেন্সি। একসময় বাংলাদেশে সেটা আমরা দেখতে পেয়েছি। তাহলে তো সেটা আমাকে বুঝতে হবে। না বুঝে তো আমি থাকতে পারব না। বুঝতে গিয়ে আমি দেখলাম যে, জঙ্গিবাদ বা মিলিটেন্সি তো একটা নিরাপত্তা ইস্যুও বটে। কেবলমাত্র আইডিওলজিক্যাল বা আদর্শিক নয়। একজন মিলিটেন্ট মিলিটেন্ট হয়ে উঠে কখন? কেবল আইডিওলজিক্যাল ইনডকট্রিনেশন হলেই না। তার কাছে একটা অস্ত্র থাকতে হবে। তার একটা লক্ষ্যবস্তু থাকতে হবে। সে হামলা করবে। সেগুলো সে অর্জন করতে চাইবে। তাহলে সিকিউরটাও বুঝতে হবে।
আবার আমি এর সমালোচনাও করি যে, ধর্মীয় জঙ্গিবাদের কেবলমাত্র সামরিক সমাধান হতে পারে না। এর একটা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে। কেন একটা লোক জঙ্গি হয়ে ওঠে? হঠাৎ করে তো আর কেউ হয় না। তারও তো একটা জার্নি আছে। ওই জার্নিটা কী? এই যে সমাজের জন্য সে একটা হুমকি হয়ে উঠছে, কেন হচ্ছে? কীভাবে, আমি সেটা ঠেকাতে পারি? আবার তাকেও রক্ষা করতে পারি।
সাপ্তাহিক : এবার একটা অন্য প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি। সমাজ বদলের স্বপ্নে, সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্নে ছাত্রজীবনে রাজনীতি করলেন। পেশাজীবনে এসে ক্রমান্বয়ে একটা ক্যাপিটালিস্ট বুর্জোয়া জীবন বেছে নিলেন। শুধু তাই নয়, পুঁজিবাদের রাজধানী খোদ আমেরিকাতেই জীবন কাটাচ্ছেন। এটা কি কণ্ট্রাডিকশন বা বৈপরীত্য না? এর জন্য কি কোনো বেদনা অনুভব করেন? নাকি এরও একরকম ব্যাখ্যা আছে!
আলী রীয়াজ : কন্ট্রাডিকশনও নয়। শিফটও নয়। মানুষের জীবনের বিভিন্ন রকম পথচলা হয়। আমরা শিখি, বুঝি, জানি এবং সেগুলোকে প্রয়োগ করি। সেক্ষেত্রে ১৯৭৮, ১৯৭৯ বা ১৯৮০ সালে আমার যে সংগ্রাম, আমি যেভাবে পৃথিবীকে দেখতাম, আমি কি এখন সেভাবে দেখি? দেখি না। ওইটা এক অর্থে বলতে পারেন ম্যাচুরিটির লক্ষণ। আমি খানিকটা জেনেছি এরপরে, তার থেকে বোঝার চেষ্টা করি। তার থেকে দেখার চেষ্টা করি। তখন একভাবে মনে হয়েছে যে, বাংলাদেশের সমাজ বদল বলেন, পরিবর্তন বলেন, তা বোঝাতে কনট্রিবিউট করা, আমি এখনো সেটাই করার চেষ্টা করি। এখন অন্যভাবে করি। আমার বয়স বেড়েছে। সামান্য হলেও এখন আমার জানার পুঁজি তৈরি হয়েছে। করার স্কোপ ভিন্ন হয়েছে। যেমন এখন যখন আমি ক্লাসরুমে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির তুলনামূলক আলোচনা করি, ভারত এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, পাকিস্তানের গণতন্ত্র বিষয়ে পড়াই তার পেছনে কিন্তু খানিকটা হলেও ওই ১৯৭৮-৭৯ সালের জীবন আছে।
আমি এটাকে ঠিক কণ্ট্রাডিকশন মনে করি না।
সাপ্তাহিক : কিন্তু সেই সুবিধাটা তো অন্য সমাজ পাচ্ছে। যে সমাজে আপনি বেড়ে উঠেছেন, যে সমাজ আপনাকে তৈরি করেছে সেই সমাজ তো আপনার এই কন্ট্রিবিউশনের সুবিধা পাচ্ছে না।
আলী রীয়াজ : সে কারণে আমি যতটুকু পারছি ততটা শেয়ার করার চেষ্টা করছি। আমি বাংলায় বিভিন্ন দৈনিকে লেখার চেষ্টা করছি। আমি দেশে আসি। আপনাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। আমার ফেসবুকের একটা বড় ভূমিকা হচ্ছে, আমার কোনো কোনো বাংলাভাষী নয় এমন বন্ধু বলে, তোমার ফেসবুক তো বাংলাতেই ভর্তি। আমরা তো কিছু বুঝতে পারি না। আমি বলি যে, এটা আমার একটা বাহন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে, বিশেষত যারা আমার চেয়ে বয়সের তুলনায় তরুণ, তারা কী ভাবে, সেটা একটু বুঝতে চাই। আমি এভাবেই যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। অনেকের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। যারা বয়সে কম কিন্তু চিন্তায় হয়ত একঅর্থে অপরিপক্ব কিন্তু কমিটমেন্টের দিক থেকে দ্বিধাহীন, এরকম তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। কথা হয়। বিতর্ক হয়। কখনো কখনো স্কাইপে কথা হয়। আমি বোঝার চেষ্টা করি, জানার চেষ্টা করি এবং কন্ট্রিবিউট করার চেষ্টা করি।
সাপ্তাহিক : কিন্তু সব রকমের অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আপনি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে যেতেন, আপনার যে সার্ভিস একটা বিশেষ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা পেত, সেটা তো এখন তারা পাচ্ছে না। সেটা একধরনের বাংলাদেশকে না দেয়া নয় কি?
আলী রীয়াজ : প্রবাসে জীবন খুব আনন্দের না আসলে। আনন্দের না এই কারণে যে, আপনি বুঝতে পারেন যে একধরনের দূরত্বের মধ্যে আছেন। এটা একটা বেদনার বিষয়। আবার আমি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় থাকতাম, তাহলে আমিও আনন্দিত হতাম। কিন্তু একধরনের সীমাবদ্ধতাও আবার থাকত। যে আমাকে আপনি দেখছেন, যে আমাকে আপনি বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলে আমি একটা ভূমিকা রাখতে পারতাম, সেই আমিই তো হয়ত হতাম না। আমি এখন যে ধরনের রিসোর্সটা পাই, যে লাইব্রেরিটা আমি ব্যবহার করতে পারি, যে বইটা আমার কাছে সহজলভ্য হয়, আবার ধরুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আমার বেতন সামান্য বেশি হওয়ায় যে পাঁচটা বই আমি সহজে কিনে ফেলতে পারি, সহজলভ্যতার অর্থেও ধরেন, পছন্দ হলো, আমি কিনে ফেললামÑ এটা আমি পারতাম না। ফলে যে আমি থাকতাম, তার সঙ্গে আপনার হয়ত কথাই হতো না। তখন আপনি হয়ত আমাকে দেখতেনই না। কিংবা দেখলেও দেখতেন অন্য দশজনের মতো করে। ফলে এর একটা ইতিবাচক দিক আছে, নেতিবাচক দিকও তো আছে।
তবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় থাকতে পারলে ভালো হতো। ভালো হতো এই কারণে নয় যে আমি কিছু কনট্রিবিউট করতে পারতাম। আমার দিক থেকে মনে হয়, আমি আরও অনেক বেশি জানতে পারতাম। জানতে পারতাম এই অর্থে যে, প্রতিদিন জেনেই তো আমরা জানি। এই যে গ্রাউন্ডে একটা ঘটনা ঘটে, ঘটনাটা আপাতদৃষ্টিতে ছোট বলে মনে হয়; কাছে থাকলে আপনি আরও অনেক বেশি দেখতে পান, বুঝতে পারেন। পাল্সটা বুঝতে পারেন। সেটা বোঝার জন্য আমি দেশে আসি যত ঘন ঘন পারি। যত বেশি লোকের সঙ্গে পারি কথা বলি।
আপনার প্রশ্নটার মর্মবস্তুর সঙ্গে আমি একমত। এখানে থাকলে হয়ত আমার করবার মতো কিছু একটা সুযোগ তৈরি হতো। আবার নাও হতে পারত। এটাও ভাবি। যে আমার কাছে আপনি আশা করছেন, সেই আমিই হয়ত হতাম না। ফলে আপনি আশাও করতেন না। অথবা এখানে প্রতিদিনের জীবনের সংগ্রামের মধ্যে থেকে আমাকেও এমন সব আপস করতে হতো তখন হয়ত যে আনন্দের সঙ্গে আপনার সঙ্গে আমি কথা বলছি, যে আনন্দের সঙ্গে আমি পড়াই, যে আনন্দের সঙ্গে আমি লিখি, যত দ্বিধাহীনভাবে আমি কথা বলিÑ তখন হয়ত এসবের কিছুই হতো না। তাহলে কী লাভ হতো? জানি না, এই লাভ-ক্ষতির হিসাব আমরা কোনো দিনই পাব না।
সাপ্তাহিক : আপনার সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, আপনার মধ্যে সবসময় একটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করে। সেদিক থেকে আপনার কি উচ্চরক্তচাপ বা এ ধরনের কোনো উপসর্গ আছে?
আলী রীয়াজ : শারীরিক অবস্থা আমার খুবই ভালো। সৌভাগ্যবশত আমার বড়-ছোট কোনো ধরনের সমস্যা নেই। আমি প্যাশনেটলি কথা বলি। সে কারণে আপনার মনে হতে পারে আমি উত্তেজিত। এসব বিষয় আসলে আমি খুবই এক্সাইটেড হই। অন্যথায় আমার বন্ধুরা বলে যে, আমি নাকি খুবই নিচুস্বরে কথা বলি। ধীরে ধীরে কথা বলি। আমার ছাত্রদের কাছ থেকে এবং ঃযধহশং ঃড় সু ংঃঁফবহঃং, ওই যে কোর্সের মূল্যায়ন হয়, সেখানে দেখি, স্টুডেন্টরা কিন্তু একটা জিনিস বলে, আমি খুব প্যাশনেট। আমি বুঝতে পারি কোথা থেকে বলে। আমাকে বলে আমি খুব প্যাশনেট, আমি যা বলি তা বুঝে বলি। মানে ওটাকে ওরা বলে ‘নলেজেবল’। বুঝতে পারি যে, ওরা বলতে চায় বুঝে শুনেই কথা বলি।
আমি রাজনীতির প্রসঙ্গে, বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রশ্নে খুব প্যাশনেট বা আবেগময়। বাংলাদেশ নিয়ে কথা বললে, সাউথ এশিয়া নিয়ে কথা বললে আমি খুবই প্যাশনেট। আমার ওইটাই এক্সপ্রেসড হয়। আমার এক্সাইটমেন্টটা আসলে ওই জায়গায়। একটা প্রিয় বিষয় নিয়ে কথা বললে আপনি আবেগমথিত হবেন না!
সাপ্তাহিক : ইদানীং বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথা বলছেন। নানারকম শুনানিতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আপনার স্বর শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?
আলী রীয়াজ : বাংলাদেশ, এই মুহূর্তে, একটা ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণত আমরা অনেকবার বলি, রাজনীতিবিদরা নিয়মিত বলেন, বাংলাদেশ একটা ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। আমার কাছে মনে হয়, এই কথাটা এখন সবচেয়ে এপ্রোপ্রিয়েট। বাংলাদেশ একটা খুব ক্রিটিক্যাল জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা দিয়ে শুরু করি। সম্ভাবনাগুলো কী? একটা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনসংখ্যা আমাদের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ। আমাদের তরুণদের মধ্যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করবার প্রবণতাটা খুবই ইতিবাচক। নিজেরাই নিজেদের পথ তৈরি করতে চায়। তারা অন্যের ওপর নির্ভর করে না, রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে না। শেয়ারবাজারের ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়েও তারা এগিয়ে যাচ্ছে। এই সম্ভাবনার জায়গাগুলো আছে। সামাজিকভাবে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা ভালো করছি। এগুলো যে সরকারিভাবে করা হচ্ছে তা নয়। মানুষের নিজের চেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার টিএফআর, জন্মহার কয়েক দশকে যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে সেটা শুধু পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি দিয়ে হয়েছে, সেটা মনে করবার কোনো কারণ নাই। মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। এগুলো সবই হচ্ছে, সম্ভাবনার জায়গাটা তৈরি হচ্ছে। এগুলো নিজে নিজেই কিছু করবে না। তার জন্য একটা নেতৃত্ব দরকার। নেতৃত্বটা কি? নেতৃত্বটা ইনক্লুসিভ কী না? যে মানুষ এটা করবে সে স্টেক ফিল করে কি না? সে পুরো প্রক্রিয়ার অংশীজন হিসেবে নিজেকে ভাবতে পারছে কি না? তাকে আপনি কথা বলার জায়গা দিচ্ছেন কি না? তাকে কথা বলার জায়গা দিলে সে কি মাঝে মাঝে ভুল কথা বলবে? বলবেই। তারপরেও আপনাকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। ওই রহপষঁংরাব জায়গাটা আমরা বন্ধ করে দিচ্ছি। ইনক্লুসিভ জায়গাটা যদি আপনি বন্ধ করে দেন, তাহলে সম্ভাবনাটাই আপনি বন্ধ করে দিলেন। আপনি যদি এটা আলাদা করে দেখেন যে, না, রাজনীতিতে যাই করি না অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেটা হচ্ছে এটা হবেই, তা হয় না।
আমার ধারণা সেটা হবে না।
ওই অর্থে আমি বলি, যে বাংলাদেশের ক্রিটিক্যাল জায়গাটা হচ্ছে এইখানে।
আপনি যদি কর্তৃত্ববাদী এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেন, ইনক্লুসিভ না করেন, তাহলে আপনার এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, শক্তি আপনি ব্যবহার করে আরও অর্জন করার যে জায়গাটা সে জায়গায় যেতে পারবেন না। আপনি পিছিয়েই পড়বেন।
বলতে পারেন, অন্যান্য দেশে তো হয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। আরও দু-একটা দেশের উদাহরণ হয়ত দেয়া যাবে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না সেটা ১৯৭০ এর দশকে হয়েছে। কিন্তু এখন সময়টা তো আলাদা। গ্লোবাল ডায়নামিক্সটা তো আলাদা। ওই সময় তো পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে মুহূর্তের মধ্যে আপনার টেলিফোনের মধ্যে এসে হাজির হয়নি। তখন তো এরকম সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। তথ্য মুহূর্তের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছেন এরকম মবিলিটি তো ছিল না। তখন তো চাইলেই একটা লোক দেশের বাইরে চলে যেতে পারত না। এখন অনেকে পারে। চেষ্টা করলে বৈধভাবেই অন্য দেশে যেতে পারে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানবসম্পদ তৈরি করছে। এ শিক্ষার্থীরা বাইরেও চলে যাচ্ছে। আমি যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা বলছি, ডিভিডেন্ড তো রাখতে হবে। তার একটা অংশীদারিত্ব থাকতে হবে না! আমি করব আর আমার কোনো অংশীদারিত্ব থাকবে না, তা তো হয় না। ফলে, যারা শুধু দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান দেখে বলছেন যে, কর্তৃত্ববাদী শাসন সত্ত্বেও উন্নয়ন সম্ভব, উন্নয়নের একটা ধাপ পর্যন্ত যাওয়া সম্ভবÑতারা প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারছেন না।
এটা সত্তরের দশকে সম্ভব হয়েছে। আশির দশকেই পারা যায়নি। দক্ষিণ কোরিয়াতে গণতন্ত্রায়ন করতে হয়েছে। তার মানে হচ্ছে কি? আপনাকে ওই জায়গাতেই তো আসতে হচ্ছে। ওরা ১০-২০ বছর কর্তৃত্ববাদী শাসন চালিয়ে তারপর গণতন্ত্রে ফিরতে বাধ্য হয়েছে। এখন আসেন আমরাও তাই করি। এই ভাবনায় যারা চলছেন তারা হিসাবগুলো সঠিকভাবে করছেন না। ওরা গণতন্ত্রে আসতে বাধ্য হয়েছে কারণ পৃথিবীও ওই জায়গায় চলে এসেছে। তাহলে আপনাকে ওইখানে থেকেই শুরু করতে হবে। এটা অনেকটা রিলে রেসের মতো। আমি ওই অর্থে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ক্রান্তিলগ্ন দেখি।
সাপ্তাহিক : এবার একটু আপনাদের পারিবারিক প্রসঙ্গে আসি। আপনি বলছিলেন, আপনারা ১০ ভাইবোন। তাদের পরিচয়টা যদি একটু বলতেন?
আলী রীয়াজ : আমার সবচেয়ে বড় ভাই হচ্ছেন আলী আনোয়ার। উনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর অবসর নেয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ঢাকা দু’ জায়গাতেই বসবাস করতেন। উনি লেখালেখি করতেন। নাটক নিয়ে উৎসাহী ছিলেন। ইবসেন নিয়ে লিখেছেন। গ্রামসি বিষয়ে লেখা আছে। নাটক, চিত্রকলা, শিল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে উনার উৎসাহ এবং জ্ঞান ছিল। রেনেসাঁ টাইপের মানুষ ছিলেন। উনি আসলে রেনেসাঁয় বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। ফলে উনি রেনেসাঁর মানুষ হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছেন। আমাদের সমাজের মধ্যে যতদূর সম্ভব, ততটা রেনেসাঁ মানুষ হবার লড়াই করেছেন।
তারপরের ভাই হচ্ছেন, আলী আহসান। আলী আনোয়ার ভাই মারা যাবার এক বছর আগে উনি মারা গেছেন। আলী আহসান ভাই পড়ালেখা করেছিলেন ফিজিক্সে। সরকারি চাকরি করেছেন। বাংলাদেশ স্টিল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং শিপিং করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে শেষ পর্যন্ত অবসর নিয়ে কিছুটা সময় ঢাকায়, কিছুটা সময় আমেরিকায় কাটিয়েছেন। তার ছেলেমেয়েরা কানাডা-আমেরিকায় থাকাতে উনি তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন সেখানে। তৃতীয় ভাই হচ্ছে আলী মনোয়ার। উনি একসময় লেখালেখি করতেন। এখন আর প্রায় লেখেনই না। সেটার একটা কারণ হচ্ছে উনি ফেডারেল গভর্নমেন্টের চাকরি করেন। ইকোনমিক্সে পড়ালেখা করেছিলেন। পরে উনি ডক্টরেট করেন সোশ্যাল অ্যানথ্রপোলোজিতে। তার একটা ইংরেজি একটা বাংলা বই আছে। ইংরেজি বইটা তার পিএইচডি থিসিসের বেসিসে। চতুর্থ ভাই হচ্ছে আলী নিজাম। নিউইয়র্কে থাকেন। নিউইয়র্ক স্টেট গভর্নমেন্টের চাকুরে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে। খুব রেয়ারলি দেশে আসেন। বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বোন গুলশান আরা এখানে আছেন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন সরকারি কলেজে। বোটানি ওনার সাবজেক্ট। পরে মুন্সীগঞ্জ কলেজে প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্বিতীয় বোন হচ্ছে হোসনে আরা। উনি নিউইয়র্কে থাকেন। আমাদের পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে আগে দেশের বাইরে গেছেন উনিই স্বামীর কর্মসূত্রে। হোসনে আরা যাকে আমরা মেঝপা বলি। উনি বাইরে কাজ করেছেন ব্যাংকিং সেক্টরে। তার পরের বোন সফুরন আরা। এখন ঢাকায় থাকেন। যার বাসায় আমি উঠেছি। দীর্ঘদিন, ২৭ বছর ইংল্যান্ডে লাইব্রেরিতে কাজ করতেন। শেফিল্ডেই থেকেছেন। ২৭ বছর থাকার পর আগেই অবসর নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন বেশ কয়েকবছর হলো। তার উদ্দেশ্য হলো একটা স্কুল চালানো। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটা স্কুল করার কাজ নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপরের বোন হচ্ছে মিনা ডালিয়া। স্বাধীনতার পর চাকরি করতেন। এখন দেশেই থাকে, পুরোপুরি সংসারি। একবারে ছোট বোন খোদেজা খাতুন ইভা, ও থাকে নিউইয়র্কে।
সাপ্তাহিক : আপনার ভাই কয়জন, বোন কয়জন?
আলী রীয়াজ : পাঁচ ভাই, পাঁচ বোন আমরা। ভাইবোনদের মধ্যে আমি হচ্ছি সবচেয়ে ছোট।
সাপ্তাহিক : আপনার নিজের সন্তান কজন?
আলী রীয়াজ : আমাদের একটিই মেয়ে। ও গত বছর ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় থেকে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কমপ্লিট করেছে মলিকুলার এন্ড সেলুলার বায়োলজিতে। ওর নাম ইলা স্রুতি। এ এক বছর ও বোস্টনে একটা স্কুলে টিউটরিং করছে। আমেরিকায় কিছু কিছু স্কুল আসলে এলাকার কারণে কিছুটা পিছিয়ে পড়ে, ওদের টিউটরিংয়ের কাজটা করার জন্য স্টুডেন্টরা সময় দেয়। আংশিকভাবে ভলান্টিয়ারিংই বলতে পারেন। ও নিজের থেকে উৎসাহ নিয়ে কাজটা করতে চেয়েছে। এক বছর সেটা করেছে। এই জুলাই পর্যন্ত করবে। আবার সেপ্টেম্বরে ফিরে যাবে ওর গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম করার জন্য। পাবলিক হেলথ বিষয়ে পড়ালেখা করবে ঠিক করেছে। ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানে, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক হেলথে।
সাপ্তাহিক : আপনার বয়স তো মধ্যপঞ্চাশ পেরুলো। মৃত্যু নিয়ে ভাবেন কি?
আলী রীয়াজ : ১৯৫৮ সালে আমার জন্ম। মৃত্যু চিন্তাটা ওই অর্থে হয় না। কিন্তু প্রচুর বন্ধু হারিয়েছি আমি। রুদ্র বলেন, মিশুক বলেন, তারেক মাসুদ, আহমেদ ফারুক হাসান মৃত্যুর ফাঁদে এদের হারিয়েছি। আমাদের আরেক বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন নিখোঁজ হয়ে গেল, কোথায় গেল? আবিদ রহমান মিনি আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। মরে গেল। এরকম বন্ধুদের হারিয়ে মাঝে মধ্যে শূন্যতা অনুভব করি। এবার দেশে গিয়ে এক রাতে আমাদের সহপাঠী বন্ধু শাহজাদী আঞ্জুমান আরার বাসায় একটা গেটটুগেদার ছিল। খেতে দিয়েছে। ও তদারকি করার চেষ্টা করছে। আমি বললাম বস, বসে একসঙ্গে খা। দু’দিন পরে যাব মরে, তখন কান্নাকাটি করবি আহারে একসঙ্গে বসে একবেলা ভাত খেতে পারলাম না। ওই রকম বলি। ওই অর্থে মৃত্যুভাবনা আসে। কিন্তু একে ঠিক মৃত্যু চিন্তা বলব না। আমার মনে হয় কিছু কাজ বাকি আছে। দেখি সেগুলো করা যায় কিনা?
সাপ্তাহিক : এখন আপনার ফোকাস কি, কি ধরনের কাজ করতে চান?
আলী রীয়াজ : আমি এই মুহূর্তে একটা কাজ করার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশের একটা পলিটিক্যাল হিস্ট্রি লেখা উচিত। ১৯৭১ সালের পর থেকে। ক্রনোলজিক্যাল না। মানে ১৯৭১ এ এই ঘটল, ’৭২-এ এই ঘটলÑ এরকম না। থিমেটিক্যাল একটা হিস্ট্রি। গণতন্ত্রের প্রত্যাশাটা আমাদের কী রকম? লোকজন কী ভাবে? কিংবা ধরেন আইডেনটিটির প্রশ্নটা। আইডেনটিটির সঙ্গে যুক্ত করে রিলিজিয়ন এন্ড পলিটিক্সের প্রশ্নটা।
আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যে ঘটল তার পলিটিক্যাল ইকোনমিটা কি আসলে! মানে বাংলাদেশের মিরাকল বলতে তো আমরা ওইটা বুঝি। যার নাম দিয়েছে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’। এগুলো হচ্ছে থিমেটিক্যাল। একটা ধারাবাহিক বিবরণ তো আপনি দিতেই পারেনÑ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, ১৯৭৫ সালে বাকশাল এসেছে, ১৯৭৫ সালে সামরিক শাসন, ’৯০ সালে গণতন্ত্রের আন্দোলন, ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতির শাসন থেকে আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরত এসেছি। এভাবে ইতিহাসকে দেখা হয়। আমি ইতিহাস বলতে শুধু ক্রনোলজি বা ধারাবাহিক ঘটনাক্রমের বর্ণনা বুঝি না। বুঝতে চাই তার ফেনোমেনাগুলো। উরভভবৎবহঃ ধংঢ়বপঃং ড়ভ ঃযব ঢ়ড়ষরঃরপধষ যরংঃড়ৎু ড়ভ ইধহমষধফবংয. এইটা লেখা উচিত বলে আমি মনে করি। সেইটাই আমি করার চেষ্টা করছি।
সাপ্তাহিক : এরকম একটা ইতিহাস লেখার প্রস্তুতি যখন নিচ্ছেন তখন তো এ বিষয়ে বিস্তর ভেবেছেন। আমার একটা উৎস্যুক, এই যে জাতির যাত্রাপথ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ কারা বলে আপনার মনে হয়?
আলী রীয়াজ : এই জার্নিকে আমি মানুষ চিহ্নিত করে দেখছিই না। ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আমরা ধরুন শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান এসব বলে বলে এক ধরনের ইতিহাস তৈরির চেষ্টা করছি। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমি বলতে চাই, আসলে বাংলাদেশের ফেনোমেনাগুলো কী? ফেনোমেনা হচ্ছে ডেমোক্রেসির অ্যাসপিরেশন বা আকাক্সক্ষা। এখন আকাক্সক্ষা একটা জিনিস। তাহলে মানুষ গণতন্ত্র নিয়ে কী ভাবে?
আমি দীর্ঘদিন ধরে করা বেশকিছু পাবলিক অপিনিয়ন সার্ভে সংগ্রহ করেছি। অনেকেই হয়ত এগুলো খেয়াল করেন না। এই সংগ্রহ থেকে আমি দুটো জিনিস দেখতে চাই। আমরা কী বলি আর লোকে কী ভাবে? সাধারণ মানুষ কী ভাবে? সাধারণ মানুষের ভাবনার মধ্যে গণতন্ত্রটা কি? আমি সেটা দেখার চেষ্টা করব। কিংবা ধরেন যে আইডেনটিটির প্রশ্ন। আমরা বলি যে, মুসলিম আইডেনটিটি একটা প্রশ্ন এবং কেউ কেউ বলে যে এটার সাংঘর্ষিক হচ্ছে বাঙালি আইডেনটিটি। আমার কাছে দুটো সাংঘর্ষিক মনে হয় না। তাহলে এটা নিয়ে লোকে কী ভাবে।
এক অর্থে আমাদের হিস্টোরিক্যাল ন্যারেটিভ এবং আমরা কন্ট্রাডিকশনগুলো কীভাবে দেখি। জনসাধারণ কীভাবে দেখে? ইন্টারেস্টিং হচ্ছে এগুলো নিয়ে প্রচুর পাবলিক অপিনিয়ন সার্ভে বা জনমত জরিপ আছে। সেই ১৯৬৬ সাল থেকে আছে। এর মধ্যে পরিবর্তনগুলো কি সেটা আমি দেখার চেষ্টা করব।
কিংবা ধরেন গ্রোথ বিষয়টি। আমরা খুব সংখ্যার হিসাব দিয়ে এটাকে দেখি। কিন্তু আমি বোঝার চেষ্টা করছি একটা শাসনতান্ত্রিক সঙ্কটের মধ্যেও এই যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটা অর্জিত হয়েছে সেটা কে করল? বা সামাজিক উন্নয়ন সূচকেও যে অগ্রগতি হলো, সেটা কে করল? একটা ছোট জিনিস এখানে বলে রাখি। আমি মনে করি না এটা রেজিম সেন্ট্রিক (জবমরসব ঈবহঃৎরপ). আমি গ্রাফ করে দেখেছি যে, গ্রোথ প্যাটার্নটা রেজিম সেন্ট্রিক নয়। ১৯৯১ সাল থেকে আপনি যদি দেখেন, দেখবেন যে একটা ট্রাজেক্টরি (ঃৎধলবপঃড়ৎু) তৈরি হয়েছে, সেটা বিএনপি-আওয়ামী লীগ আমল, সব আমলেই। এ জন্যই আমি শাসনকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে এই উন্নয়ন যাত্রা পথটাকে দেখতে চাই।
আপনি ভুলে যান, কে কোন সালে ক্ষমতায় ছিল? শেষ পর্যন্ত তো উন্নয়নটা বাংলাদেশেই থাকবে। খালেদা জিয়া-শেখ হাসিনা যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, আওয়ামী লীগ-বিএনপি যে-ই দেশ শাসন করে থাকুকÑ অর্থনৈতিক উন্নতিটা তো বাংলাদেশি ১৪-১৫ কোটি মানুষেরই অর্জন। আমি ওইভাবেই দেখার চেষ্টা করব। তাতে করে অর্থনৈতিক অংশটাকে শুধু প্রবৃদ্ধির অঙ্কে দেখাচ্ছি না, আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি তাহলে এটা হলো কেন?
যেমন ধরেন, কম-বেশি সব সরকারই এক অর্থে সামাজিক কল্যাণ যেটাকে বলি, সোশ্যাল সার্ভিস সেক্টর সেই সেক্টরকে গুরুত্ব দিয়েছে। যে কারণে শিশুমৃত্যু হার, জন্মহার, স্বাস্থ্য সূচকে আমরা এক ধরনের উন্নতি করেছি। শাসক শ্রেণীর বদল এই পরিবর্তনকে থামায় নাই। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বা সোশ্যাল সেফটিনেট কর্মসূচিগুলোও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। হঠাৎ করে বাড়ল আবার কমে গেল এরকম ঘটে নাই। এগুলোই আমি বলার চেষ্টা করছি। আমার কাছে মনে হলো এগুলোই এদেশের পলিটিক্যাল হিস্ট্রি। ব্যক্তি, দলকেন্দ্রিক বক্তব্য তো এসেছে। আমি এগুলো থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করছি। দেখি কী দাঁড়ায়!
আইডেনটিটির ইস্যু, ডেমোক্রেসির ইস্যু, গভর্নেন্স ইস্যু এভাবে বলা যায় কি না? আমি সেভাবেই কাজটা করার চেষ্টা করছি।
সাপ্তাহিক : আপনার কী আবেগ অনেক কম? আবেগ ছেড়ে কি একটা জিনিসকে দেখার চেষ্টা করেন?
আলী রীয়াজ : আমি আবার মাঝে মাঝে আবেগতাড়িত হয়ে কবিতা লিখি।
সাপ্তাহিক : এখনও লেখেন কবিতা?
আলী রীয়াজ :  ফেসবুকে লিখি কবিতা।
সাপ্তাহিক : সেটা তো এ রকম হতে পারে, আবেগ যেটা এসেছিল সেটাকে ঝেড়ে ফেললাম, কবিতার মাধ্যমে।
আলী রীয়াজ :  ঝেড়ে ফেলা অর্থে নয়। কিছু জিনিস যখন বলতে পারি না, আর কোনো কিছুতেই, তখন কবিতা লেখার একটা চেষ্টা করি। এটা একেবারে ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার ফেসবুকে গেলে দেখতে পাবেন। এগুলো আমি ছাপতে দেইনি। ফেসবুক আছে বলে লোকজন শেয়ার করে পড়ে, এইটুকুই। যেমন ধরেন মিশুক মুনীর এবং তারেক মাসুদের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর সারাদিন ধরে আমি যে পরিস্থিতিতে থাকলাম, তখন আমার কাছে প্রশ্নটা আসল, আসলে আমি কী করতে পারি? তখন ওইটাই আমি কবিতায় লিখলাম।
‘এই পোড়ার দেশের সোনার মাটিতে আভূমি আনত হয়ে আপনার কাছে, তোমার কাছে, তোর কাছে/ জানতে এসেছি/ আমি এখন কী করব?/ আমরা এখন কী করব?।’
ওইটা আসলে আবেগ থেকে লেখা। হতে পারে আবেগ আমার কম। আবেগ কম তা বলিই বা কী করে? প্রেম করেই তো বিয়ে করলাম।
সাপ্তাহিক : ছাত্রজীবনে আপনি তো উজ্জ্বল ছিলেন পড়ালেখায়। রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে চেনামুখ ছিলেন। আপনার তো একাধিক প্রেমে পড়বার কথা। একাধিক সম্পর্ক।
আলী রীয়াজ : খুব প্রেমের সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। তার কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনটাতে ওই একজনের প্রেমেই পড়েছিলাম। আমার ধারণা সেও পড়েছিল। ফলে একাধিক সম্পর্কে জড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। অন্যরা কেউ কেউ আমাকে বলত, অন্য কোনো কোনো মেয়ে হয়ত আমার ব্যাপারে উৎসাহী।
আমি যেহেতু রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম, আমার হাতে সময় ছিল কম। আমাদের প্রেম, আমার যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, তার নামটা বলতে চাচ্ছি না, তাতে তাকে বিব্রত করা হবে, আমাদের এই সম্পর্কটা পাবলিকলি খুব নোন (কহড়হি) ছিল। সবাই জানত।
ওইসব কারণে অনেক বেশি সম্পর্কে জড়ানো সম্ভব হয়নি। এক অর্থে সবাই যদি জানে যে একটা নির্দিষ্ট সম্পর্ক আছে, তবে...।
আবার রাজনীতি, সংস্কৃতির বাইরে একটু পড়াশোনাও তো করতাম। সময় খুব একটা হাতে বাকি থাকত না। তবে ওই সময় এটা তো ফিল করতাম যে আসলে অনেকেই আমার ব্যাপারে উৎসাহী। এটা খারাপ লাগতো না। ভালোই লাগত।
সাপ্তাহিক : আপনি কোন হলে থাকতেন?
আলী রীয়াজ :  আমি এফএইচ হল (ফজলুল হক হল)-এর ছাত্র। কিন্তু আমি মেয়েদের দুইটা হল ছাড়া সব হলেই থাকছি। তখন ১১টা হল ছিল। মেয়েদের ছিল ২টা হল। তবে ওই অর্থে এফএইচ হলের বাইরে আমার ঠিকানা এক সময় দীর্ঘদিন ছিল মুহসীন হল। আমার এক বন্ধুর রুমে থাকতাম। পরে সূর্যসেন হল। সূর্যসেন হলের ৬২৮ নম্বর রুমে থাকতাম।
সাপ্তাহিক : আচ্ছা ফিল্ম মেকার তারেক মাসুদের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?
আলী রীয়াজ : তারেক মাসুদের সঙ্গে পরিচয় হওয়াটা খুব ইন্টাররেস্টিং। তারেক মাসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়ত। তারেকের সঙ্গে আমার পরিচয় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হবার অনেক দিন পরে। যেমন মিশুক মুনীরের সঙ্গে পরিচয় আমার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হবার অনেক আগে। তারেকের সঙ্গে কে কবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এখন আর তা মনে নেই। কিন্তু তারেক মাসুদের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি। ঘনিষ্ঠ হই এ কারণে যে, তারেক আমাকে একটা জিনিস বলে, রাজনীতি বুঝতে হলে শিল্প ফিল্ম সব বুঝতে হবে। এবং ওর ধারণা হলো আমি কবিতা বুঝি, গল্প উপন্যাস বুঝি, কিন্তু ফিল্ম বুঝি না। সুতরাং ও আমাকে বগলদাবা করে সিনেমা দেখানো শুরু করল।
এর মধ্যে খসরু ভাই ছিল, ঝোলা নিয়ে সারাক্ষণ চলচ্চিত্র নিয়ে থাকত। তো, তারেক মাসুদ আমাকে বগলদাবা করে বিভিন্ন জায়গায় সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেত। ওই সোভিয়েত কালচারাল সেন্টার, গ্যোটো ইনস্টিটিউট, অ্যালিয়াঁস ফ্রাঁসেসÑ বিভিন্ন জায়গায়। বলতো, চল সিনেমা দেখতে যাই। বলতাম, কাজ আছে এখন না। ও বলতো, আর রাখ তো তোর কাজ, বলে নিয়ে যেতো। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে আমার সঙ্গে তারেকের সম্পর্কটা তুমি থেকে ‘তুই’-এ চলে আসে। সম্ভবত দুই-তিনবার কথা বলার পরে আমরা তুই তোকারি শুরু করি। তাতে করে ওর এক ধরনের অধিকার আমার ওপরে তৈরি হয়। এবং আমার এক ধরনের শ্রদ্ধা ওর প্রতি আসে।
তারেককে আমার কোনোদিন বলা হয়নি, ওর সামনে দাঁড়ালে আমাকে একটু ছোট মনে হতো। আকারে ও আমার চেয়ে বড়ই। এটা কারণ নয়। ও অনেক বিষয়ে জানে বলে আমার মনে হতো, সে কারণে; হীনমন্যতা অর্থে নয়, ভালোবাসার অর্থে মনে হতো তারেক আমার চেয়ে অনেক বিষয়ে অনেক বেশি জানে। তারেকের সঙ্গে আমার অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতার একটা গল্প বলি। তখন আমি হাওয়াইতে থাকি। হাওয়াই ফিল্ম ফেস্টিভাল হচ্ছে, সেখানে তারেক গেছে। ওখানে যাবার পেছনে আমার একটা ভূমিকা আছে। সেটা বড় বিষয় নয়। ওদের রাখা হয়েছে হিলটন হোটেলে। সব ডেলিগেটরা হিলটনে। তার একটা শর্ট ফিল্ম দেখানো হবে। সন্ধ্যার সময় তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমি থাকি তখন একটা ডরমেটরিতে। আমার রুম হচ্ছে ছোট। একটা এক বেডের রুম। আমি ওর হোটেল রুমে লাউঞ্জে অপেক্ষা করেছি। ও দেখছি ব্যাগ-ব্যাগেজসহ নেমে আসছে। আমি বললাম, তুই, ব্যাগ-ব্যাগেজসহ নামছিস কেন? বলে, না, তোর ওখানে থাকব। আমি বলি, আমার ঘর তো একবেডের, খুব ছোট। হিলটন ছেড়ে তুই ওখানে যাবি কেন? বরং আমি তোর এখানে আসি। বলে যে, না, তোর ওখানেই যাব। আমি বললাম, আমার ওখানে তো সিঙ্গেল একটা বেড আছে। তারেক বলে আরে, আমরা কি ঘুমাবো নাকি ওখানে? এবং আক্ষরিক অর্থেই ওই রাত্রে আমরা ঘুমাইনি। আমরা আড্ডা দিয়ে সারা রাত কাটিয়েছি। পরে ভোরবেলা, ওর কি একটা কাজ ছিল সেটা সেরে ও সম্ভবত নিউইয়র্কে চলে গেল। এই হচ্ছে তারেকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক।
তারেকের সঙ্গে আমার শেষ দেখা, আমি ঢাকায় এসেছি। ‘রানওয়ে’ ফিল্ম নিয়ে তারেক দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছুটছে। ফিল্ম দেখাচ্ছে। আমাকে ফোন করছে। ও সিলেট যাবে। বললো, আমার সঙ্গে সিলেটে চল; আমি বললাম, আমি এসেছি ক’দিনের জন্য। সিলেটে কয়দিন থাকবি। বলে: তিন দিন, আমি বললাম, তিনদিনের জন্য যেতে পারবো না। তারেক বলে, তাহলে তুই আমার ছবি দেখবি না। ছবি তো দেখতে চাই। বলে, তাহলে সিলেট যেতে হবে। বললাম, না, যেতে পারব না। তখন বলল, তুই তাহলে বাসায় আয়। বাসায় বড় স্ক্রিনে দেখাব। তোকে আমার এই ছবিটা দেখতে হবে, না দেখে তুই যেতে পারবি না। আমি বললাম দেখতে তো চাই। বলে যে, কালকে সন্ধ্যায় আয়। তার পরদিন সকালবেলা ও সিলেট যাবে, ওইদিন সন্ধ্যায় ওর বাড়িতে আমরা ছবি দেখলাম। সারোয়ার বলে একটা ছেলে সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের সঙ্গে তারেকের বাসায় ছিল। ও একটু অবাকই হলো তারেকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা দেখে। কেননা ও তারেককে যেখানে চেনে ফিল্মমেকার, অথচ দেখছে যে, আমি তারেককে ‘তুই’ ‘তোকারি’ করছি, তারেক আমাকে তুই-তোকারি করছে, ওর কাছে অবাক হবার মতোই ব্যাপার।
ওই হচ্ছে তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। তারেক আমাকে ফিল্ম দেখানো শিখিয়েছে। একবার কোনো একটা ফিল্ম ক্লাবের একটা সেমিনার হবে। তারেক ওদেরকে উসকে দিয়ে আমার পেছনে লাগিয়ে দিল যে, আমাকে একটা লিখিত প্রবন্ধ পড়তে হবে। ফিল্ম নিয়ে লিখতে হবে। ওরা আমাকে ধরল। আমি বললাম ফিল্ম নিয়ে তো আমি কিছু বুঝি না। ওরা বললো, লিখতে হবে, কেননা তারেক ভাই বলেছে আপনার কথা। আমি তারেককে বললাম এটা কি করলি? বলে যে, লিখে ফেল। পরে লিখলাম, প্রবন্ধ পড়া হলো। প্রবন্ধটা তারেকের কাছে ছিল। সর্বশেষ যখন তারেকের সঙ্গে দেখা হয়, তখন তারেক বলল, দোস্ত তোর ওই লেখাটা পাইছি। কোথায় পাইলি? বলে যে, আমার পুরনো লেখার বাক্স ঘাঁটাঘাঁটি করতে যেয়ে পেয়েছি। এই হচ্ছে তারেকের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা।
সাপ্তাহিক : আপনি জাসদ ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। সমাজ বদলের আকাক্সক্ষা পোষণ করেছেন। জীবনের এ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে কি আপনার মনে হয়, সেটা একটা জেনারেশনের নিছক রোমান্টিসিজম ছিল?
আলী রীয়াজ :  যেকোনো দেশের মুক্তিযুদ্ধের পরে বিভিন্ন রকম স্বপ্ন তৈরি হয়। এটাও সে রকম একটা স্বপ্ন ছিল। যেকোনো দেশের একটা বড় বিপ্লবের পরে বহুবিধ স্বপ্ন তৈরি হয়। এটাও একটা স্বপ্ন ছিল। এ স্বপ্নটা কতটা বাস্তব, কতটা যৌক্তিক ছিল, আজ ৩০-৪০ বছর পরে এসে আমরা খুব নির্মোহভাবে দেখতে পারি। কিন্তু ওই মুহূর্তে যে স্বপ্নটা ছিল সে স্বপ্নটা কিন্তু আমি মনে করি, যদিও বলা হতো এটা একটা আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্র, আসলে তো এটা ছিল খুব জাতীয়বাদী। স্পিরিটটা ছিল ভীষণ জাতীয়তাবাদী। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশটাকে অন্যভাবে দেখতে চাওয়া।
কিছু তরুণ, কিছু মানুষ, তাদের আকাক্সক্ষাই প্রকাশ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ বলে যতই বলা হোক, আসলে আমি মনে স্পিরিটের দিক থেকে এটা নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের কিছু স্বপ্নবান মানুষ একটা সম্ভাবনাময় সফল বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিল। সেই সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের একটা আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ ছিল এই রাজনৈতিক আন্দোলন। এটা কি রোমান্টিসিজম? সব স্বপ্নই তো রোমান্টিসিজম্! ওই অর্থে বাকশালও রোমান্টিসিজম। তার রিপ্রেসিভ এলিমেন্টকে নির্মোহভাবে বিবেচনা করলে আমি হয়ত অন্যভাবে দেখব। কিন্তু যে বাকশালের স্বপ্ন দেখে, সে তো ওইভাবেই দেখে, বলে আমার ধারণা। কিংবা ধরেন যারা অন্যভাবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করেছে, ওই অর্থে, আমি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফাকেও স্বপ্নই মনে করি। এগুলো এক ধরনের আকাক্সক্ষা আর কি!
সাপ্তাহিক : তাহলে এই বিপ্লবের পরিণতি কী?
আলী রীয়াজ : একটা কথা মনে রাখবেন, সব বিপ্লব শেষ অর্থে রাষ্ট্রকেই শক্তিশালী করে। রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলার স্বপ্ন নিয়ে তৈরি করা সমস্ত বিপ্লব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই শক্তিশালী করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লব বলেন, ফরাসি বিপ্লবের দিকে তাকান, চীন বিপ্লবের দিকে দেখেনÑ কী হয়েছে? সব বিপ্লবই কিন্তু শুরু হয় এই বলে যে, রাষ্ট্র ক্ষমতা বদলে দেয়া হবে, রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়া হবে। কিন্তু আপনি এখন দূর থেকে দাঁড়িয়ে কিন্তু সেটা দেখতে পাবেন না। কিন্তু ওইখানে দাঁড়িয়ে ফরাসি বিপ্লবের সময়ে যদি কাউকে বলেন, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার লড়াই এখানে চলছে। বলবে, পাগল নাকি। একটা রাষ্ট্র তারা ভেঙে ফেলছে খালি।
সাপ্তাহিক : দেশ ছেড়ে যারা প্রবাসে গেছেন, মেধাবী যারা, এক সময় বলা হতো আমাদের দেশ থেকে ‘ব্রেন ড্রেইন’ হয়ে গেছে। দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এখন অনেক দেশে এটাকে বলা হচ্ছে ‘ব্রেইন গেইন’। প্রবাসে থাকা মেধাবীরা এক অর্থে দেশের জন্য সম্পদ। এই ‘ব্রেইন গেইন’ কি বাংলাদেশকে কোনো আলাদা শক্তি দেবে? নাকি, শেষে আমাদের প্রবাসে থাকা মেধাবীরা আন্তর্জাতিক ধারায় বিলীন হয়ে তাদের অংশ হয়ে উঠবে? তাদের মধ্যে মিশে যাবে?
আলী রীয়াজ : মিশে গেলেই ভালো। মিশে যাওয়ার অর্থ কিন্তু এই না যে, আপনি হারিয়ে গেলেন। আপনাকে কিন্তু ওর মধ্যে মিশে না গেলে আপনি দেশের জন্য কিছু করতে পারবেন না। আপনি যদি বিচ্ছিন্ন থাকেন, মূলধারায় সম্পৃক্ত না হন, ওখানে গিয়ে যদি বাংলাদেশেই থাকি, তাহলে আমি কি কনট্রিবিউট করব বাংলাদেশকে? প্রবাসীর স্বপ্ন হচ্ছে দেশ বলতে সে মনে করে যে দেশটা সে ছেড়ে আসছে। কিন্তু ‘দেশ’ তো বদলে গেছে। আপনি যদি মূলধারার মধ্যে যুক্ত হন তাহলে আপনার কাজ করার একটা  জায়গা তৈরি হবে। আর আপনি যদি বিচ্ছিন্ন থাকেন, আপনি একা কিছু করলেও করতে পারেন, বড় কিছু করতে পারবেন না। বড় কিছু করতে হলে ওখানকার মূলধারাতেই আপনাকে যেতে হবে; ফলে যখন কেউ বলে ভাই আপনি মিশে যাচ্ছেন, তখন আমার উত্তর হলো, সেটাই তো আমার করার কথা ছিল। না হলে তো আমি দেশেই থাকতাম। আমি যেহেতু দেশে নাই। সেটা ঘটনাচক্রে হোক, চয়েস হিসেবে হোক, ডিফল্টে হোক, আমি তো দেশে নাই। ফলে আমি যেখানে আছি সেখানে থেকে আমি কী করতে পারি? একা কিছু করতে পারি, অথবা এখানে যা আছে তাকে কীভাবে আমার মতো করে আমার বিবেচনায় যতটুকু বাংলাদেশের জন্য করার মতো পরিবেশ তৈরি করে কাজে লাগানো যায় সেটা করতে পারি। সেটা বুদ্ধি দিয়ে হতে পারে, টেকনোলজি দিয়ে হতে পারে, বহুভাবে হতে পারে। আমি তাই ভাবি। মিশে যাচ্ছি কি না? না গেলে বরং পরামর্শ দেই। মিশে যান মূলস্রোতে।
সাপ্তাহিক : আপনি কি হতাশ হন? হতাশা আপনাকে গ্রাস করে?
আলী রীয়াজ : হতাশ তো হই। মাঝেমধ্যে হতাশা তো আছেই।
সাপ্তাহিক : সেটা কাটান কী করে?
আলী রীয়াজ : হতাশাটা কিসের জন্য? যেমন ধরেন ব্যক্তিগত জীবনের হতাশা, একটা কাজ হলো না, এগুলো ছোটখাট হতাশা। বড় ধরনের হতাশা হচ্ছেÑ কতগুলো সম্ভাবনা যখন দেখি, মনে হয়, সেটা শুধু আমার একার নয়। অন্যদের সঙ্গে কথা বলেও বুঝতে পারি দেশের এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কিন্তু শেষতক সেটা হলো না। আবার পিছিয়ে পড়লাম। এই যে পিছিয়ে পড়লাম, এই ভাবনায় কিছুটা হতাশ হই। ভালোরকম হতাশ হই।
পিছিয়ে পড়লাম, তাহলে এখন কি করতে হবে? তাহলে আবার একটা সুযোগ তৈরির জন্য কাজ করতে হবে। আবার একটা সম্ভাবনা দেখলে তাকে সাহায্য করতে হবে। আমার সীমিত সামর্থ্যে তাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে; তাতে আমার কাজটা একটু বাড়ল বৈকি! তখন হতাশাটা কাজ করে। তারপরে আমি বুঝতে চাই, আবার সম্ভাবনাটা কোথায়? এই ঘটনাটি কি ঘটবে? এই যে একটা সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলো না, বা ভিন্নপথে চলে গেল, তাহলে আবার কবে সম্ভাবনা আসবে? কীভাবে আসবে? কোথায় আছে সম্ভাবনা। এখানে নেই তো অন্য ক্ষেত্রে আছে। তাহলে সেই ক্ষেত্রটা খুঁজে বের করতে হবে। সেইখানে আমি আমার মতো করে একটু কিছু করতে পারি কি না? সেই অর্থে হতাশা।
খোঁজাখুজি করতে গিয়ে কী হারিয়েছি, কী হলো না সেটা নিয়ে আর বেশিক্ষণ চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। তাতে বেদনা থাকে। হতাশা তো থাকেই।
সাপ্তাহিক : আপনার পর্যবেক্ষণে, বিবেচনায় বক্তব্যে এক ধরনের ‘র‌্যাশনালিটি’ আছে। নির্মোহ যৌক্তিকতা থাকে। এই র‌্যাশনালিটি আপনি কি পরিবার থেকে পেয়েছেন? নাকি একাডেমিক জগত দিয়েছে? আপনার ব্যাখ্যা কি?
আলী রীয়াজ : আমি মনে করি আমরা শিখি সব কিছু থেকেই। চারপাশ থেকেই শিখি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবার কাছ থেকেই শিখি। আবেগ দিয়ে আমরা চলি বটে, কিন্তু আমার মনে হয় শেষ বিচারে আমরা যুক্তি দিয়েই চালিত হই। সাময়িকভাবে আবেগ দিয়ে জড়িত হই বটে কিন্তু শেষবিচারে যুক্তির আশ্রয় নিই। যুক্তিটা আমরা নিজেরা তৈরি করি। আপনি যা করেন, তাতে আপনার মনে একটা যুক্তি কিন্তু থাকেই।
সাপ্তাহিক : নাকি এ রকম হয়, ঘটনাকেই আমি যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করি?
আলী রীয়াজ :  না, সব সময় তা হয় না। আমার মনে হয় কি জানেন, আমরা তো করি, আমরা তো রিঅ্যাক্ট করি না সব সময়। আমরা তো অ্যাক্ট করি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রিঅ্যাক্ট করি হয়তো কিন্তু সব তো রিঅ্যাক্ট করি না। তাহলে অ্যাক্ট করি কীভাবে? আমি যে সকালবেলা উঠে নিচেই নামলাম, সিঁড়ি ধরে উপরে ছাদে গেলাম নাÑ এটা তো সিদ্ধান্ত আমার। তাহলে তো কোথাও না কোথাও সিদ্ধান্তের পেছনে একটা যুক্তি তো থাকছেই। তার অর্থ এই না যে, আমরা আবেগকে অস্বীকার করছি। আবেগ তো থাকবারই কথা। কিন্তু তুলনামূলকভাবে যুক্তিই প্রাধান্য বিচার করে। এখন যুক্তিটা কতটা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেয়া, কতটা অন্য রকম হতে পারত, এগুলো বিবেচ্য বিষয়। তাকে যদি আমি আরও বেশি তথ্য দিতে পারতাম, আরও সুযোগ দিতে পারতাম, আরও রিসোর্স দিতে পারতাম, সে যদি সবগুলো জানত তবে তার সিদ্ধান্ত, যুক্তি ভিন্ন হতো, অপশন বাড়ত। যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছে আরও শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী, সুনির্দিষ্ট ভূমিকা সে নিতে পারত। কিন্তু একেবারে যুক্তি ছাড়া মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় সেটা আমি মনে করি না।
সাপ্তাহিক : পুনর্জন্ম হলে কি আবার এই আলী রীয়াজ হতেই চাইতেন?
আলী রীয়াজ : আমি আর কী হব? সব মিলিয়ে এ জীবনটা তো খারাপ হয় নাই। এখন পর্যন্ত তো ভালোই। এ জীবন আরেকবার পেলে কিছু ত্রুটি সারিয়ে ফেলতে পারলে ভালোই হতো। আবার ভাবি কি জানেন, ত্রুটিগুলো যদি সারিয়েই ফেলতাম তাহলে তো আমি থাকতাম না। তাহলে কি আমি, ভিন্ন আমি হতে চাই। না, তা চাই না। আমার মনে হয় আরেকবার আলী রীয়াজ হয়ে জন্মালে, জেনে শুনে কিছু কাজ করে ফেলতে পারলে খারাপ হবে না। না করতে পারলেও ভালো। হ্যাঁ একটা অসফল প্রেম থাকবে, ভালোবাসার স্ত্রী ও একটা চমৎকার সংসার থাকবে। একটা মেয়ে থাকবে। যাকে নিয়ে আমি গর্ব করতে পারব। ও যাই করুক তাতেই আমি গর্ব করব। আমার বন্ধু বান্ধব থাকবে যারা আমাকে তৈরি করবে। এ যদি হয়Ñ তবে এ জীবন ভালোই।

ক্যাপশন
১. রুদ্র ও তসলিমার বিয়েতে বাঁ থেকে জাফর ওয়াজেদ, লুৎফর রহমান রিটন, আলী রীয়াজ, মোহন রায়হান, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও তসলিমা নাসরীন (বসা)
২. ডাকসু প্যানেল পরিচিতি ১৯৮১
সামনের সারিতে বসা মাহমুদুর রহমান মান্না, জিয়াউদ্দিন বাবলু, মোমিন। পেছনের সারিতে দাঁড়ানো শাজাহান সাজু, রেহানা পারভীন, মারুফ চিনু, আলী রীয়াজ, বুলবুল প্রমুখ
৩. সহপাঠী শাহজাদি আঞ্জুমান আরা ও সস্ত্রীক আলী রীয়াজ
৪. ইসতিয়াক রেজা ও আলী রীয়াজ
৫. সহপাঠী আলী রীয়াজ ও সুব্রত...
৬. কন্যা ইলা স্রুতি সঙ্গে আলী রীয়াজ
৭. স্ত্রী সেগুফতা জাবীন, কন্যা ইলা স্রুতি সঙ্গে আলী রীয়াজ
৮. মৃত্যুর দেশে তিন প্রিয় বন্ধু মিশুক মুনীর, তারেক মাসুদ, আবিদ রহমান
৯. লিংকন মিউজিয়াম
১০. পুরনো সেই দিনের কথা...
১১. আলী রীয়াজ স্ক্যান করা+তাইফুর ভাই ছবি
১২. এই আমি, সেই আমি
১৩. বিবিসির সহকর্মী মাসুদ হাসান ও আলী রীয়াজ
১৪. মেয়ের গ্রাজুয়েশন কনভোকেশন....
১৫. ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী পরিচিতি সভা, ১৯৮১
১৬. শিক্ষকতার জীবনের শুরুর দিকে, ১৯৮৭ সালে, ঢাবির সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বনভোজনে
১৭. অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর আবদুল্লাহ খালিদের সঙ্গে, ১৯৭৯ সালে মিশুক মুনীরের তোলা ছবি
১৮. মা বিলকিস আরা ও আলী রীয়াজ, ১৯৮৮ গ্রীষ্মে

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • [কর্পোরেট সাক্ষাৎকার] ‘কারিগরি শিক্ষার উপরে জোর দিতে হবে’-ইঞ্জি. এনামুল হক এমপি
  • [কর্পোরেট সাক্ষাৎকার] ‘আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজাইনিংয়ে সমস্যা আছে’-ড. হান্নান চৌধুরী
  • [কর্পোরেট সাক্ষাৎকার] ‘অনেকে বলেন, হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ের এখন আর কোনো প্রয়োজন নেই’-প্রফেসর ড. মাহফুজুল হক
  •  মতামত সমূহ
    Author : sunlife insurance
    personal loans personal loans unsecured credit loans in austin
    Author : Quick Loans
    instant loan no credit check bad credit personal loans personal loans personal loans
    Author : Online Loans
    Author : Payday Loan Online
    bad credit catalogues personal loans personal loans personal loan
    Author : Speedycash
    personal loans for bad credit personal loans personal loans personal loan
    Author : Getting A Loan
    bad credit personal loans personal loans bad credit fastest payday loan personal loans
    Author : Online Sex Cam
    payday loans online bad credit loans approved payday loan online online payday loan
    Author : Sex Video Chat
    payday loans payday loans quick personal loans payday loans
    Author : Loans
    payday loans no fax best personal loan personal loans personal loans
    Author : Pay Day Loan
    online payday loans payday now loans fastest payday loan payday loans
    Author : home insurance uk
    personal loans personal loans bad credit personal loans best personal loan
    Author : Cam Porn
    bad credit personal loans personal loans best personal loans best personal loans payday loans online payday loans payday loans small loan
    Author : Speedycash
    personal loans personal loans bad credit personal loans bad credit bad credit personal loans
    Author : Online Lenders
    online payday loans online payday loan payday loans without a checking account payday loans
    Author : affleck insurance
    payday loan online payday loans online no credit check no payday loans payday loans online
    Author : auto insurance quote
    personal loans bad credit payday personal loans bad credit personal loan
    Author : home insurance cost
    personal loan rates comparison personal loans for bad credit personal loans https://personalloans2019.com/ - debt loans
    Author : car insurance quote
    payday loans payday loans online online payday loan payday loans
    Author : Essay Writing Tip
    personal loans personal loans personal loans best personal loan payday loans payday loans online no credit check loans without direct deposit online payday loan
    Author : nationwide
    personal loans personal loans fast cash loans online personal loan
    Author : auto insurances
    money right now personal loans for bad credit personal loans personal loans
    Author : Free Live Sex Chats
    bad credit personal loans personal loan installment loan companies auto loans guaranteed approval
    Author : Loan Cash
    personal loans for bad credit christmas loan direct payday lenders bad credit loan bad credit payday loans check into cash payday loans online interest free loans
    Author : Easy Payday Loan
    payday loan no fax payday loans best place to get a personal loan payday loans calgary
    Author : Personal Loans
    payday loans pay day loans no credit check personal loans payday loans
    Author : Money Loan
    money loan personal loans personal loans personal loans
    Author : Free Bbw Webcams
    loans after bankruptcy prosper loans loans personal personal loans
    Author : Money Loan
    one hour payday loans payday loans payday loans instant approval debt relief programs
    Author : Best Payday Loan
    bad credit personal loans personal loans best personal loans personal loans
    Author : Loans Online
    best personal loan loans personal 5000 loans personal loans
    Author : auto club insurance
    best payday loans online loans installment loans online cash in one hour
    Author : My Free Web Cam
    easy payday easy payday ohio cash advance easy loans no credit check
    Author : bsgorina
    cash call payday loans quick payday loans online cash advance loans online online payday loan lenders
    Author : Online Loans
    ez loan installment loans online best payday loans online loans online direct
    Author : Pay Day Loan
    installment loans online new loan loans loans
    Author : Payday Loans
    advance cash loan christmas loan easy payday https://easypayday.us.com/ - easy payday
    Author : Loans Online
    Author : Online Loan
    personal loans online installment loans online personal loans online loans
    Author : Mature Cams
    installment loans online payday loans online cash loan lenders loans
    Author : Direct Lender Loans
    small loans with monthly payments best payday loans online loans loans online direct
    Author : auto insurances
    installment loans online best payday loans online loans best payday loans online
    Author : Quick Loan
    1 hour cash loans 1 hour cash loans loans cash in one hour
    Author : Webcam Strippers
    how to get a loan with no credit personal loans online loans online direct installment loans online
    Author : Payday Loans
    personal loans online loans personal loans online loans
    Author : KennethBow
    Author : Sex Chat Online
    easy payday easy payday loans best payday loan companies easy payday loans
    Author : Loans
    marcus loans loans loans loans
    Author : whole life insurance
    easy payday loans easy payday loan easy payday easy payday
    Author : Pay Day Loan
    loan assumption easy loans no credit check easy payday easy payday loans
    Author : Getting A Loan
    payday loans america loans best payday loans online guaranteed credit approval
    Author : CharlesAutop
    Author : Pay Day Loan
    consolidated loans loans online loan application payday loans online
    Author : Online Fucking
    easy loans easy loans loan installment bank loans personal guaranteed credit approval loans debt consolidation advice loans online direct
    Author : Loans Online
    payday loans tx payday loans in az online payday loans reviews loans
    Author : Cash Advance
    easy payday loan easy loan payday loans instant cash easy payday
    Author : Bad Credit
    loans loans online direct online loan applications online pay day loans
    Author : Cash Loan
    personal loans online loans best payday loans online no credit checks payday loans
    Author : Payday
    best payday loans online payday loans in houston texas payday loans online installment loans online
    Author : Personal Loans
    easy payday easy payday easy payday loan easy loans no credit check
    Author : Payday Loans
    loans loans online direct best payday loans online loans
    Author : Personal Loans
    loans best payday loans online loans https://loans2019.us.com/ - payday loans online
    Author : Getting A Loan
    easy payday easy payday loans cash money loans payday loans instant cash
    Author : Loans Online
    easy loans quick payday loans easy payday ohio cash advance
    Author : Loans
    low credit score loans installment loan companies loans online direct https://loans2019.us.com/ - direct payday lenders
    Author : Speedy Cash
    ohio cash advance easy payday loan legit online payday loans easy payday installment loans online payday loans america loans payday loans america
    Author : Getting A Loan
    Author : Payday Loan
    castle payday loans easy payday easy loan payday loans online instant approval
    Author : geico car insurance
    best payday loans online best payday loans online loans personal loans online
    Author : Loans Online
    sameday loans easy payday easy loans no credit check easy payday
    Author : Free Adult Sex Chat
    payday lending payday loans online cash money loans loans
    Author : Billyatilky
    cutting up cialis pills buy cialis sample of cialis cialis online grapefruit and cialis side effects
    Author : Sex Chat Room
    Author : Best Online Loans
    Author : Porn Sex Chat
    easy loans easy payday easy loans quick payday loans
    Author : Best Payday Loan
    Author : Speedycash
    easy loan easy payday easy payday loans easy payday loans
    Author : Pay Day Loan
    Author : Online Sex Cam
    personal loans online personal loans online loans loans
    Author : Lesbian Show
    large payday loans loans payday loans online payday 2 xbox one
    Author : Nylon Sex Chat
    private lenders for bad credit easy payday easy payday home loans guaranteed approval loans best payday loans online real online payday loans personal loans online
    Author : homeowner insurance
    loans payday loans online online pay day loans i need money now
    Author : Getting A Loan
    payday loans instant cash usa cash loans easy payday short loans online
    Author : Spotloan
    easy payday loans easy payday bad credit loans guaranteed approval money to lend
    Author : house insurance
    Author : Pay Day Loan
    easy payday 24 hour loan easy money payday loans easy loan
    Author : nvxEveli
    bar none payday loans can payday loan companies sue payday advance loan cash instant loan
    Author : Payday Loan Online
    denver payday loans loans for average credit easy loan title loans online
    Author : Payday Loan Online
    Author : Paydayloan
    easy payday loan easy loans no credit check payday installment loan debt relief reviews
    Author : Loans For Bad Credit
    private lenders for bad credit usa cash net 24 hour loan easy payday
    Author : Easy Payday Loan
    Author : Loans
    Author : coles home insurance
    Author : Payday Loan
    loans offer easy payday easy payday loan america payday loan
    Author : Payday Express
    installment loans online payday loans online installment loans online debt consolidation loans for bad credit
    Author : nsgOpept
    financial 30 day payday loans online cash advance loans online 500 fast cash payday loan
    Author : Payday
    easy payday loans easy loans no credit check easy money payday loans short loans online
    Author : Hot Porno Show
    personal loans online loans loans loans online direct
    Author : Loans
    loans loans i need money now payday loans online
    Author : rental car insurance
    easy to get payday loans loans loans best payday loans online
    Author : Direct Lenders
    easy money payday loans quick payday loans easy loan small personal loans online
    Author : Pay Day Loan
    Author : nrhTumma
    Author : CharlesAutop
    Author : Aaronglusy
    Author : MichaelHed
    Author : jsgorina
    best payday loan lenders debt management plans instant payday loans auto loan bad credit
    Author : nsgUnurl
    online loans no credit bank accounts actual payday loan lender loan bad credit quick easy personal loans payday loans people bad credit no credit check mortgage check cashing loan loan payday savings consolidate credit card debt military payday loans no business payday loans instant payday loans cash advance low interest rate personal loans debt relief programs
    Author : Rosendosgaupt
    viagra laced beer generic viagra online saudi king using viagra viagra mylan inc viagra
    Author : hztEveli
    no fax payday loans bc payday loan 1 hour payday loan auto payday loans
    Author : Rosendosgaupt
    cost of viagra in india 2014 buy generic viagra viagra werking wiki buy generic viagra viagra over the counter in turkey
    Author : tbyNAria
    small loans bad credit loans can payday loan companies garnish your wages quick payday loan no
    Author : imkpaicy
    same day payday loan online payday payday loan payday loans no credit check no faxing online payday cash loans
    Author : Nommiblada
    cialis for sale http://cialisles.com cialis prices cialis soft tabs 20mg pills tadalafil doha
    Author : Rosendosgaupt
    can you drink redbull with viagra http://viagrabs.com/ hard sell the evolution of a viagra salesman true story viagra online todo mundo pode tomar viagra
    Author : Fastest Payday Loan
    bad credit personal loans guaranteed approval loans guaranteed approval indian payday loans loans guaranteed approval
    Author : Bad Credit
    loans without credit checks loans online approval personal loans guaranteed approval online payday loan instant approval
    Author : Payday Loan
    guaranteed loans credit loans guaranteed approval what is a cash advance https://loansguaranteedapproval.com/ - loans pay day
    Author : Loans For Bad Credit
    poor credit loans guaranteed approval credit loans online bad credit loans guaranteed approval guaranteed loans
    Author : A Payday Loan
    guaranteed loan online loans bad credit bad credit loans guaranteed approval guaranteed loans
    Author : axa home insurance
    bad credit direct lenders bad credit personal loans guaranteed approval bad credit loans guaranteed approval loans guaranteed approval
    Author : Best Payday Loan
    bad credit personal loans guaranteed approval loan needed loans guaranteed approval loans guaranteed approval
    Author : Loan Cash
    loans guaranteed approval no fax payday loans guaranteed loan personal loans guaranteed approval
    Author : nfgexaky
    debt consolidation companies patdayloan com america payday loan easy approval personal loans
    Author : Personal Loans
    bad credit loans guaranteed approval personal loans guaranteed approval default loan guaranteed loans
    Author : lv home insurance
    payday loans no credit check no faxing loans guaranteed approval bad credit loans guaranteed approval bad credit personal loans guaranteed approval
    Author : Online Payday Loan
    bad credit loans guaranteed approval loans without direct deposit loan approval short term loan lenders
    Author : Get A Loan
    bad credit personal loans guaranteed approval multiple payday loans loans companies guaranteed loans
    Author : Easy Payday Loan
    loans pay day bad credit loans guaranteed approval loans guaranteed approval loans guaranteed approval
    Author : Payday
    no credit check payday loans credit loans guaranteed approval credit loans guaranteed approval https://loansguaranteedapproval.com/ - default loan
    Author : Online Payday Loan
    bank loan rates poor credit loans guaranteed approval bad credit personal loans guaranteed approval guaranteed loans
    Author : Money Loan
    poor credit loans guaranteed approval payday lenders loans guaranteed approval loans guaranteed approval
    Author : Quick Loans
    loans guaranteed approval loans guaranteed approval bad credit personal loans guaranteed approval bad credit loans guaranteed approval
    Author : Spotloan
    payday loan with no credit check bad credit loans uk no faxing payday loans loans guaranteed approval
    Author : bsupaicy
    viagra pills generic viagra online viagra prescription generic for viagra
    Author : Phillipascreaw
    generic cialis i don't understand the cialis commercials buy cialis cialis and l-carnitine
    Author : Nommiblada
    cheap cialis online http://cialisles.com cialis prices cialis 20 mg best price precio tadalafil 20 mg en farmacia
    Author : Sex Webcam
    personal loans guaranteed approval loans guaranteed approval payday loans no credit check no employment verification no credit check loan
    Author : Loan Cash
    bad credit loans guaranteed approval personal loans guaranteed approval bad credit direct lenders credit loans guaranteed approval
    Author : Quick Loans
    loans guaranteed approval credit loans guaranteed approval personal cash advance poor credit loans guaranteed approval
    Author : Online Loan
    bad credit loans guaranteed approval loans guaranteed approval bad credit personal loans guaranteed approval 12 month loans
    Author : Loan Cash
    personal loans apply bad credit loans guaranteed approval bad credit loans guaranteed approval bad credit loans uk
    Author : Direct Lender Loans
    bad credit personal loans guaranteed approval poor credit loans guaranteed approval real payday loans online bad credit loans guaranteed
    Author : Loans Online
    loans guaranteed approval loans guaranteed approval bad credit payday loans online personal loans guaranteed approval
    Author : Payday Loan
    immediate loans what is a cash advance loans guaranteed approval same day loans online
    Author : Payday Loans
    credit loans guaranteed approval loans guaranteed approval payday loans minneapolis credit loans guaranteed approval
    Author : nsfRuify
    order viagra viagra online generic viagra online viagra online canada
    Author : mklhoosy
    buy viagra online no prescription online viagra generic viagra online pharmacy viagra online pharmacy
    Author : mtxNAria
    viagra soft viagra generic name viagra price comparison viagra online canada
    Author : RobertasCavar
    20 years old viagra generic viagra sildenafil effects of expired viagra generic viagra at walmart where can i buy viagra in the uk
    Author : nadpaicy
    Author : nztexaky
    Author : nrgRuify
    Author : hsuNAria
    Author : nsfexaky
    Author : ntdpaicy
    free viagra when will viagra be generic viagra prescription viagra generic
    Author : Patrickihot
    cialis herkennen cialis online over the counter cialis alternatives http://cialisle.com long term dangers of cialis
    Author : oxnRuify
    generic viagra online viagra online cheap viagra soft pills generic viagra online pharmacy
    Author : bamexaky
    generic viagra cheap generic viagra online viagra substitute viagra buy online
    Author : fbxpaicy
    discount cialis online cialis tadalafil online cialis online
    Author : DomingosJaB
    damiana and viagra http://viagrabs.com/ rate of viagra in india viagra online is there any generic viagra
    Author : Ralphopils
    a pill that works like viagra http://viagrabs.com/ - generic viagra how to ask your boyfriend to take viagra
    Author : engNAria
    viagra from india cheapest generic viagra viagra alternatives online viagra
    Author : nrcpaicy
    Author : bdhhoosy
    tadalafil tablets 20 mg where to buy cialis online tadalafil dosage order cialis online
    Author : VictoraTip
    what is a good dose for cialis http://www.cialisle.com - cialis online what is the cost of cialis
    Author : nfhexaky
    buy tadalafil online pharmacy cialis generic cialis buying cialis online
    Author : Matthewsunofe
    cialis anvisa http://cialisle.com - buy generic cialis cialis best time to take it http://cialisle.com/ time between viagra and cialis buy generic cialis como tomar cialis 20mg
    Author : hecpaicy
    cialis reviews buy cialis tadalafil generic online cialis
    Author : nfhhoosy
    Author : mfhRuify
    purchase viagra online how to get viagra cheap buy viagra cheap viagra online
    Author : bdgNAria
    online cialis cialis online usa buy cialis without prescription best place to buy cialis online reviews
    Author : Bgvhoosy
    Author : nsfpaicy
    cialis pill online cialis cheap cialis cialis
    Author : nfxexaky
    viagra cheap buy viagra online price of viagra buy viagra online canada
    Author : hftRuify
    cialis tadalafil generic cialis online generic cialis cialis generic name
    Author : Patrickihot
    cialis skin rash buy cialis treating high blood pressure with cialis buy cialis cialis daily for blood pressure
    Author : jnyhoosy
    Author : olmpaicy
    viagra 100mg buy generic viagra online viagra in canada viagra generic name
    Author : MitsenkoCream
    4956 vente cialis sans ordonnance buy cialis generic cialis cialis online serios
    Author : nnqhoosy
    Author : jscpaicy
    Author : MitsenkoCream
    4956 cost of cialis us cheap cialis generic cialis cialis generika rezeptfre
    Author : Donaldopeent
    brand name of cialis http://cialisle.com - cialis obat cialis 80 mg
    Author : VolzhanovaCream
    96d0 viagra prices at kroger viagra generic viagra should teenagers take viagra
    Author : VolzhanovaCream
    96d0 2011 cost of viagra walmart cheap viagra online buy viagra acheter du viagra la marque
    Author : kkcpaicy
    buying viagra does generic viagra work viagra australia buy viagra online
    Author : FecNAria
    Author : TracyaJem
    fda approved cialis for bph http://cialisle.com - buy cialis online buy generic cialis online with mastercard buy cialis zocor and cialis generic cialis online is cialis on the pbs list
    Author : nffhoosy
    Author : bsgpaicy
    generic brands of viagra online buy generic viagra viagra online order viagra online
    Author : Btvhoosy
    Author : Brcexaky
    Author : Brchoosy
    generic brands of viagra online buy viagra online usa how to get viagra generic viagra
    Author : mxhsycle
    instant personal loans online loans no credit check startup business loans online loans no credit check
    Author : zwdSmusy
    personal loans bad credit colortyme payday loans no credit check consolidating payday loans
    Author : fvsNeday
    fast online payday loans easy online payday loans bmg group payday loan 100 payday loan
    Author : iklPhync
    payday loans people bad credit pay day loans bad credit no fax payday loan best online payday loans
    Author : Curtisblomo
    Whatever has transformed considerably in the past few years. The globalpharmacycanada.com advancement of web marketing and e-commerce has enhanced the financial arms of people. The online Canadian Pharmacy is amongst the various aspects which canada drug superstore has actually developed within this network. It has completely eliminated the pharmacy market by tornado throughout the globe as well as changed the entire scenario upside-down. Right now, people are staying clear of import of medication from the community drug stores and capitalizing on the net solution much more quickly. The on the internet medicine stores are cheap; prescriptions might be required as well as they have obtained in-house physicians in order to suggest medication based upon our demands. This setup of business is extensively utilized by the north American and also Western consumers.
    Author : vtkenemi
    instant approval personal loans 100 guaranteed payday loans bank personal loan $1500 payday loans
    Author : cctboisa
    usa payday loan store savings account payday loans online payday loan lenders cashnet usa
    Author : bbyAlort
    free debt advice australian payday loans 1 hour payday loans no credit check personal loans with bad credit
    Author : bbfSmusy
    direct lending payday loans credit card payday loans online personal loans bad credit cash supply payday loans
    Author : badsycle
    personal loans bad credit online loan bad credit installment loans instant online loans bad credit
    Author : Curtisblomo
    Every little thing has actually transformed significantly in the past couple of decades. The canada pharmacy without prescription development of web marketing and ecommerce has actually raised the financial arms of people. The on the internet Canadian Drug store is amongst the countless facets which canada med shop has established within this network. It has entirely eliminated the pharmacy sector by tornado throughout the globe and changed the entire situation upside-down. Right now, individuals are preventing import of medication from the neighborhood drug stores as well as making use of the web service far more conveniently. The on the internet medication shops economical; prescriptions might be required and they have actually obtained internal physicians in order to suggest medication based on our demands. This setup of commerce is thoroughly made use of by the north American as well as Western customers.
    Author : bstNeday
    personal loans online bad credit no fax payday loan student loan forgiveness 10 dollar payday loan
    Author : nzgenemi
    payday loan no credit check bad credit loans instant decision same day loans bad credit big payday loans
    Author : bsfPhync
    irs tax debt relief 3 month payday loans same day payday loans payday loans online same day
    Author : bdgboisa
    credit cards for bad credit cashnet usa personal loans with bad credit cash today
    Author : bdtboisa
    buy cialis without prescription when will generic viagra be available do you need a prescription for cialis buying cialis online safe
    Author : nujenemi
    Author : ndiPhync
    viagra natural buy viagra online buy viagra online at order viagra online
    Author : nolAscen
    online viagra generic viagra review viagra substitute generic viagra reviews
    Author : nsfboisa
    Author : bsfNeday
    Author : bsfPhync
    Author : TyurikovCream
    buy pfizer viagra canada buy viagra online buy viagra price for viagra 100mg
    Author : sbfAlort
    what happens if a girl takes viagra viagra generic date cheap generic viagra cheap generic viagra
    Author : szwAscen
    Author : TyurikovCream
    viagra off internet viagra online viagra coupon cialis viagra potenzmitte
    Author : bjrNeday
    viagra wholesale viagra online canadian pharmacy generic viagra online generic viagra india
    Author : bsdUnurl
    short term loan installment loans biggest cash payday loans loans with bad credit
    Author : bsdsycle
    Author : TyurikovCream
    only now lowest priced viagra viagra cheap generic viagra viagra card
    Author : snfdrump
    viagra soft tablets generic viagra canada viagra from india viagra online canadian pharmacy
    Author : sbfenemi
    viagra sales viagra online viagra purchase when does viagra go generic low cost viagra cheapest generic viagra viagra doses generic viagra without a doctor prescription viagra prescription online generic viagra reviews cheap generic viagra is there a generic viagra
    Author : LyudaCream
    generic from ordering cialis buy cialis online buy cialis cialis 5mg price australia
    Author : ndsPhync
    canadian pharmacy viagra buying viagra online discount viagra generic viagra online pharmacy
    Author : nxfAlort
    cialis pills when will generic cialis be available cialis soft tabs when does cialis go generic cialis without prescription buy cialis online safely liquid tadalafil buy cialis online reddit tadalafil liquid buying cialis online usa tadalafil reviews buy cialis online reddit
    Author : vfhAscen
    tadalafil cialis cialis online canada cialis without a prescription generic cialis online tadalafil 20 mg cialis for sale online cialis soft buying cialis online safely order cialis when will cialis go generic do you need a prescription for cialis were can i buy cialis
    Author : LyudaCream
    cheap cialis online cialis cheap buy cialis online cialis one day quanto costa
    Author : mnjLyhop
    lendup online payday loans direct lenders bad credit home loan cash advance card debt relief companies payday loan cash advance loan help debt consolidation loan online payday loans no credit check bad credit no payday loans credit card cash advance all online payday loans cash advance from credit card
    Author : kcjNeday
    viagra dose generic viagra 100mg how viagra works buy viagra online usa free viagra sample pack generic viagra 100mg sildenafil viagra when does viagra go generic viagra sales cheap viagra online cheap generic viagra when does viagra go generic
    Author : nfxsycle
    viagra online canadian pharmacy cheap viagra online canadian pharmacy buy viagra online buy viagra online usa order viagra online generic viagra online reviews lowest viagra price is there generic viagra viagra cost canadian generic viagra purchase viagra online buy viagra online
    Author : LyudaCream
    the best site cialis usa cialis sale cialis cheap can i take cialis and ecstasy
    Author : nfxdrump
    cheap viagra online generic viagra viagra for sale viagra generic name
    Author : bxcSmusy
    online payday advance loans cash advance payday loan online personal loans bad credit best online payday loans az payday loan laws advance cash day pay bad check to a mississippi payday loan cards cash advance cash credit card payday loans online no credit check instant approval guaranteed personal loans cash america cash advance
    Author : bgvboisa
    viagra prescription canadian pharmacy generic viagra effects of viagra is there generic viagra viagra uk viagra generic date viagra professional when will viagra be generic viagra alternatives viagra online no prior prescription buying viagra viagra online generic
    Author : PolikushinaCream
    cheap pharmaceutical viagra viagra online pharmacy viagra cheap can viagra shipped canada
    Author : bdcUnurl
    cialis professional when does viagra go generic cialis 20 mg buy cialis online cheap tadalafil citrate generic viagra for sale buy tadalafil order cialis online
    Author : PolikushinaCream
    go generic viagra soft tab viagra online pharmacy viagra online cialis viagra assuefazion
    Author : bsfCoarm
    buy cheap purchase uk viagra online pharmacy viagra viagra stories when will generic viagra be available viagra order canadian generic viagra discount viagra cheapest generic viagra
    Author : bczLyhop
    no credit check payday loan near me payday title loan consolidation quick cash advance instant online payday loans bad credit pay day cash advance usa payday advance card cash advance get loan bad credit cash advance with no instant online payday loan advance america cash advance
    Author : gsjNeday
    Author : PolikushinaCream
    cialis viagra venta viagra generic viagra click now viagra canadian scam
    Author : sbfenemi
    over the counter viagra buy viagra online usa free viagra samples generic viagra review cheap viagra when will viagra go generic order generic viagra cheap generic viagra buy viagra online canadian generic viagra where to buy viagra online best place to buy viagra online
    Author : whrdrump
    viagra on line http://viagrajr.com/ where to buy viagra best place to buy viagra online
    Author : ndgboisa
    do you need a prescription for cialis http://cialishe.com/ tadalafil cialis best place to buy cialis online
    Author : vdzAlort
    viagra generic https://footstepsunltd.com/ viagra information generic viagra india
    Author : vdxPhync
    viagra buy https://saresltd.com/ buy brand viagra buy generic viagra online
    Author : vfcAscen
    viagra spam http://www.viagenericahecv.com/ buy cheap viagra buy viagra online usa
    Author : bisNeday
    brand viagra https://www.viagraid.com/ viagra when will viagra go generic
    Author : bgxenemi
    cialis no prescription http://cialisfw.com/ tadalafil 20mg best place to buy cialis online forum
    Author : vdcdrump
    order viagra http://dejviagram.com/ generic viagra online generic for viagra
    Author : vdgLyhop
    24 hour payday loans online https://en.wikipedia.org/wiki/Ohio payday loans america advance cash day loan pay best online payday loan https://en.wikipedia.org/wiki/Florida auto loans bad credit cash converters cash advance debt relief https://en.wikipedia.org/wiki/California cash loan no credit check advance cash day pay payday loans no credit check no faxing https://en.wikipedia.org/wiki/Texas 1 hour payday loan advance cash on line
    Author : BrianMar
    Author : bsfboisa
    cialis no prescription http://gocialisgjb.com/ buy tadalafil purchasing cialis online
    Author : btfPhync
    viagra alternative https://viagrapbna.com/ discount generic viagra generic viagra for sale
    Author : bdgAlort
    generic viagra online http://newviagrakfv.com/ does generic viagra work generic viagra india
    Author : bfsAscen
    generic viagra http://setviagraeja.com/ natural viagra alternatives online pharmacy viagra
    Author : nvdUnurl
    cialis no prescription http://hitcialisosn.com/ buy tadalafil online buy cialis online cheap
    Author : bthCoarm
    tadalafil liquid http://hopcialisraj.com/ cialis no prescription order cialis online
    Author : thsNeday
    generic viagra rx http://genericonlineviaqra.com/ sildenafil viagra generic viagra 100mg
    Author : hwdsycle
    online order viagra http://loviagraosn.com/ how to use viagra when will viagra be generic
    Author : jmyenemi
    do you need a prescription for cialis http://valcialisns.com/ cialis canada cialis prescription online
    Author : bsfdrump
    buy viagra http://viagraveikd.com/ viagra soft tablets generic viagra online pharmacy
    Author : vhnboisa
    quick personal loans bad credit https://applygopayday.com/ lendup payday advance loans
    Author : graPhync
    cialis online http://drcialonlinedkb.com/ cialis for sale cialis
    Author : bfcAlort
    cialis soft http://cialisotjs.com/ cialis cost п»їno prescription cialis
    Author : bxeAscen
    cialis soft tabs http://cialisovnnc.com/ cialis prescription online cialis
    Author : BrianDrunk
    healthymanoviagra.ruwww.healthymanoviagra.runew healthy mannew healthy man reviewsnew healthy manbuy viagrabuying viagraorder viagra onlineviagra where to buyhealthy man viagrahealthy malePurchase Viagra Onlinehealthy men healthy men healthy men viagra .comhealthy manhealthy man viagra offerhealthy male viagrahealthy man viagra scamhealthy man complaintshealthymannew healthy manhealthy man viagra reviewshealthy men viagrahealthy man pillshealthymalehealthy man pharmacyhealthy man viagra pillshealthy man cialishealthy man reviewshealthy man viagra salesviagra healthy mannew healthy man viagrahealthy man viagra radiohealthy man radio adhealthy man generic viagrahealthy man viagra adnew healthy man viagra reviewhealthy man radio adshealthy male internethealthy meds viagrathe healthy man viagrahealthy men viagra offerhealthy male viagra scamcomplaints about healthy man viagrawww.healthy man viagrahealthy male viagra offerhealthy male viagra reviewsgeneric viagra healthy manhealthy man viagra reviewsbuying viagra online real viagra online without prescription johnson and johnsontretinoin a .05 maxifort 50 mg canadian pharmacy cialis 20mg viagra samples from pfizer supreme suppliersmumbaiindia canadian pharmacy lexapro no rx needed indian pharmacy no prescription canadian pharcharmy
    Author : vdfNeday
    order viagra online http://viagraocns.com/ sublingual viagra buy viagra online
    Author : nazsycle
    price viagra http://menedkkr.com/ viagra brands buy viagra
    Author : buhdrump
    cheap cialis http://cialpharmedi.com/ cialis online pharmacy п»їcialis 20 mg
    Author : gdtSmusy
    fast cash loan https://payday-loans.us.com/ 500 fast cash payday loan payday loans near me
    Author : vhnboisa
    bad credit auto loans https://applygopayday.com/ 30 day payday loan best online payday loans
    Author : jawAlort
    consolidating student loans https://paydayloans-online.us.org/ no fax payday loans online payday loans online
    Author : hynUnurl
    canadian payday loan https://leaderapply.com/ credit card consolidation loans payday loans online same day
    Author : gbtNeday
    are internet payday loans legal https://cashadvanceonline.us.org/ advance payday loans legitimate payday loans online no credit check
    Author : nmqCoarm
    bad credit loan payday loans payday lender bad credit loan https://greencheckngo.com/ usa payday loan store easy payday loans
    Author : bvtsycle
    american online marketing payday loan https://onlineloan.us.org/ need payday loan today payday loans bad credit
    Author : bzqenemi
    bad credit https://applygoleader.com/ best payday loan sites online payday loan
    Author : bjnSmusy
    canadian payday loan online pay day loans instant payday loans online payday loans
    Author : cvtAlort
    installment loans poor credit loan credit repair pay day loans
    Author : bndAscen
    poor credit loans payday advance consolidate debt loans payday
    Author : bfjNeday
    myaffiliateprogram bad credit loans unsecured loan pay day
    Author : bhgLyhop
    no credit check online payday loans payday advanced check cashing payday loans bad credit loans
    Author : hjjsycle
    online instant payday loans quick cash installment loans poor credit need cash now
    Author : srtdrump
    quick loans bad credit installment loans payday title loan consolidation payday advance
    Author : bhaUnurl
    payday loan payday loans 2nd payday loan cash advance
    Author : njzCoarm
    credit loan application need cash now internet payday loans bad credit loans
    Author : njdSmusy
    uk viagra https://obatpasutri-jogja.com/ buy brand viagra https://obatpasutri-jogja.com/
    Author : bdxenemi
    payday loans for fast cash credit card bad credit quick cash
    Author : umgAscen
    viagra http://viagraid.com/ viagra australia generic viagra online
    Author : kicPhync
    cheap viagra http://viagraeq.com/ discount viagra buy cheap viagra online
    Author : njsLyhop
    viagra order https://almeidacorp.com/ buy viagra without prescription https://almeidacorp.com/
    Author : bdgboisa
    prescription viagra http://viagranerrds.com/ does generic viagra work cheap viagra
    Author : njksycle
    cialis online http://cialisfw.com/ order cialis online tadalafil
    Author : nukdrump
    cost of viagra http://viagrafa.com/ price viagra viagra online
    Author : vsbNeday
    buy viagra http://viagrapfhze.com/ viagra online canadian pharmacy buy viagra online
    Author : gfhenemi
    discount viagra online http://viagrafolec.com/index.html viagra online uk viagra price
    Author : byjPhync
    sildenafil viagra http://canadiannowv.com/ name brand viagra generic viagra
    Author : olqAlort
    buy viagra online no prescription https://emtpartsstore.com/ viagra doses viagra online generic
    Author : qbtAscen
    buy discount viagra online http://viagraazmhj.com/ viagra samples viagra online generic
    Author : vhdUnurl
    generic cialis online http://cialisckajrhd.com/ tadalafil generic cialis
    Author : byjLyhop
    free viagra sample http://viagravkash.com/ viagra plus buy viagra
    Author : nhcCoarm
    cialis tadalafil http://cialiscials.com/ cialis online pharmacy cialis online
    Author : bsfsycle
    cialis coupon http://cialisoakdm.com/ order cialis online cialis generic
    Author : mmlenemi
    viagra reviews https://goal-sport.com/ viagra substitute https://goal-sport.com/
    Author : nfydrump
    buy brand viagra http://www.usa77www.com/ cheap viagra online viagra
    Author : mukSmusy
    is kamagra better than viagra cvs 24 hour pharmacy plano viagra online when is generic levitra available sildenafil piano terapeutico viagra 25 mg sildenafil citrate
    Author : bthboisa
    levitra sirve para aguantar mas kamagra bestellen goedkoop cialis buy what dosage does levitra come in losartan potasico y sildenafil online cialis swiss pharmacy
    Author : nmsPhync
    cada cuantos dias se puede tomar sildenafil uso continuo de sildenafil viagra without a prescription levitra problemi alla vista kamagra rechnung viagra without a prescription does drinking alcohol affect levitra
    Author : nydAlort
    king canadian pharmacy kamagra oral jelly testbericht viagra generic best kamagra website kamagra patong viagra online sildenafil 120 mg lacoste
    Author : bnqAscen
    pharmacy jobs michigan sildenafil citrate suppliers india generic viagra online cialis 20mg tadalafil prix effets indГ©sirables du levitra viagra online pdx pharmacy system
    Author : BrianMar
    Author : bhyLyhop
    sheefa pharmacy levitra 2.5 mg tablets online generic viagra canadian compounding pharmacy online kamagra ajanta pharma 100 mg viagra generic online sildenafil cena w aptekach
    Author : BrianMar
    Author : bfuenemi
    oral jelly kamagra mit alkohol super kamagra thailand tadalafil viagra kamagra skillnad tadalafil bulk powder cheap cialis natural alternative to sildenafil
    Author : bdzdrump
    sildenafil myocardial infarction prix levitra belgique viagra online tadalafil generico peru levitra et diabete online viagra compare levitra viagra
    Author : nygPhync
    kamagra 365 kamagra bestellen gratis viagra without a prescription citrato de sildenafil posologia levitra arginine canadian pharmacy online levitra cialis forum
    Author : btfAlort
    comparison of levitra and viagra twoja kamagra opinie sildenafil dosage costo in farmacia del levitra orosolubile usb sildenafil citrate what is clomid galloway pharmacy
    Author : bvrAscen
    diferencia entre vardenafil y sildenafil innovative pharmacy solutions cialis coupon ou acheter le kamagra pharmacy near me 24 hours kamagra vs viagra tadalafil 20 reviews
    Author : wolSmusy
    sildenafil mecanismo de accion tadalafil hcl buy cheap cialis sildenafil y trigliceridos tadalafil recommended dose cheap cialis super kamagra 160 mg
    Author : ujkboisa
    kamagra 100mg-tabletten erfahrung dose of tadalafil non prescription cialis pharmacy technician salary in ma sildenafil iquique cialis 5mg how do kamagra tablets work
    Author : ehfUnurl
    walmart pharmacy sign in levitra netzhautablösung cheap viagra bioavailability levitra tadalafil lcms viagra side effects sildenafil y eyaculacion
    Author : btgsycle
    kamagra herbal viagra kamagra w Ејelu najtaniej https://ouarzazatefilmcommission.com/ costco pharmacy issaquah sildenafil supreme suppliers https://ouarzazatefilmcommission.com/ viagra 100mg sildenafil 100mg
    Author : gdrLyhop
    kamagra probe clomiphene and vitamin c cialis phipps pharmacy levitra bph cialis tadalafil is levitra better than viagra and cialis
    Author : lloCoarm
    levitra e tachicardia tadalafil viagra buy viagra on line cvs pharmacy temecula sildenafil super aktiv erfahrungen female viagra caremark speciality pharmacy
    Author : btadrump
    kamagra in the usa levitra funziona davvero online pharmacy canada kamagra soft tabs wirkung how to buy clomiphene citrate online viagra without a doctor prescription levitra e cecita
    Author : nszAscen
    pharmacy tech jobs jacksonville fl is kamagra bad for you online viagra levitra oral jelly generika sildenafil dizziness generic viagra canadian vipps certified online pharmacy
    Author : mikenemi
    tadalafil calox indicaciones kamagra combi cialis 10mg pantherx specialty pharmacy inname kamagra cialis 10mg kamagra gel u zagrebu
    Author : fbcPhync
    kamagra kopen leiden marlboro village pharmacy canadian pharmacy meds levitra o cialis que es mejor levitra on nhs canadian online pharmacy dog pharmacy
    Author : bfsAlort
    kamagra en medicijnen food contains sildenafil citrate generic viagra levitra es mejor que viagra kamagra ne fait rien viagra generic para sirve kamagra 50 gel oral
    Author : bfcNeday
    is sildenafil a controlled substance cvs pharmacy silver spring viagra sildenafil price canada cheap levitra 20 mg buy sildenafil clomiphene patient.co.uk
    Author : qnosycle
    tadalafil venda meglio kamagra o viagra best place to buy viagra online droga similar al sildenafil levitra argentina viagra pills recommended dosage tadalafil
    Author : MixailCream
    i recommend viagra cheap pills viagra buy viagraviagra cheap prix de pharmacie de viagra
    Author : bgfdrump
    cvs pharmacy starkville ms martinez pharmacy laredo tx canada online pharmacy walgreens pharmacy pueblo co kamagra pa kvinnor online viagra sildenafil soft tablets
    Author : hnjSmusy
    levitra def50 hawaii state board of pharmacy buy viagra online usa tadalafil heartburn levitra generika in europa kaufen viagra generic name zithromax (azithromycin) interactions
    Author : MixailCream
    link for you viagra to buy cheap viagra online cheap viagra online viagra sale spain view more
    Author : nukboisa
    target pharmacy wylie olympia compounding pharmacy generic for viagra tadalafil gelenkschmerzen kamagra a nadciЕ›nienie cheap viagra online levitra dependenta
    Author : dvoenums
    online pharmacy degree kamagra apteka lublin canadian online pharmacy clomiphene sperm production levitra nose bleed canadian pharmacy does levitra make you last longer in bed
    Author : FvtAlort
    buying kamagra in pattaya mexican pharmacy near me generic viagra without a doctor prescription intimax 100 sildenafil citrate tablets sildenafil y los riГ±ones viagra online prescription free kamagra mhd abgelaufen
    Author : nnuAscen
    para sirve tabletas sildenafil sildenafil e diabete viagra generic name clomiphene generic clinical use of sildenafil in pulmonary artery hypertension teva generic viagra weis pharmacy
    Author : BrianMar
    Author : SamuelSed
    Author : JosephBog
    Author : nyjLyhop
    tadalafil ve alkol costco pharmacy hours tucson buy viagra online usa cvs pharmacy reading pa levitra bucal viagra online levitra online canadian pharmacy
    Author : bdfCoarm
    little five points pharmacy alexander pharmacy cialis generic mixing cialis and levitra levitra how works online cialis trusted online pharmacy reviews
    Author : mujNeday
    higher dose of levitra sildenafil wirkungen when will generic viagra be available sildenafil morte long term levitra use online viagra kamagra net
    Author : MariaFrify
    CVS Pharmacy It is not crucial that a Canadian pharmacy online follows cvs pharmacy all the quality requirements established by the Canadian regulatory authorities. Of the thousands of on the internet pharmacies cvs pharmacy clayton road functional in the nation, only a few are authentic as well as have the required licenses. As stated prior to the certificate for offering medicines is offered by the provincial authorities. So the first thing one should do is to examine whether the pharmacy is signed up and also has the required licenses. If of course, the certificate as well as enrollment number should be clearly presented on the Canadian drug store online site.
    Author : YaroslawCream
    wirkung von cialis 5 mg tadalafil tadalafil online genaric cialis cheap red pill
    Author : hqzblell
    cialis professional cialis price tadalafil cialis generic cialis
    Author : bgdBeash
    buy tadalafil online cialis cialis 20 mg cialis generic
    Author : WilliamGag
    healthymanoviagra.ruwww.healthymanoviagra.runew healthy mannew healthy man reviewsnew healthy manbuy viagrabuying viagraorder viagra onlineviagra where to buyhealthy man viagrahealthy malePurchase Viagra Onlinehealthy men healthy men healthy men viagra .comhealthy manhealthy man viagra offerhealthy male viagrahealthy man viagra scamhealthy man complaintshealthymannew healthy manhealthy man viagra reviewshealthy men viagrahealthy man pillshealthymalehealthy man pharmacyhealthy man viagra pillshealthy man cialishealthy man reviewshealthy man viagra salesviagra healthy mannew healthy man viagrahealthy man viagra radiohealthy man radio adhealthy man generic viagrahealthy man viagra adnew healthy man viagra reviewhealthy man radio adshealthy male internethealthy meds viagrathe healthy man viagrahealthy men viagra offerhealthy male viagra scamcomplaints about healthy man viagrawww.healthy man viagrahealthy male viagra offerhealthy male viagra reviewsgeneric viagra healthy manhealthy man viagra reviewsbuying viagra online noprescriptiondrugs retin a online maxifort online canadian pharmacies free samples viagra jellies uk order cipro online supreme suppliers canada pharmacy online no prescription pharmacy online best canadian pharcharmy online
    Author : sgfenums
    purchase cialis cheap cialis generic online cialis cost cialis generic
    Author : mklabins
    cheap cialis cialis generic cialis coupon cialis online
    Author : WilliamGag
    healthymanoviagra.ruwww.healthymanoviagra.runew healthy mannew healthy man reviewsnew healthy manbuy viagrabuying viagraorder viagra onlineviagra where to buyhealthy man viagrahealthy malePurchase Viagra Onlinehealthy men healthy men healthy men viagra .comhealthy manhealthy man viagra offerhealthy male viagrahealthy man viagra scamhealthy man complaintshealthymannew healthy manhealthy man viagra reviewshealthy men viagrahealthy man pillshealthymalehealthy man pharmacyhealthy man viagra pillshealthy man cialishealthy man reviewshealthy man viagra salesviagra healthy mannew healthy man viagrahealthy man viagra radiohealthy man radio adhealthy man generic viagrahealthy man viagra adnew healthy man viagra reviewhealthy man radio adshealthy male internethealthy meds viagrathe healthy man viagrahealthy men viagra offerhealthy male viagra scamcomplaints about healthy man viagrawww.healthy man viagrahealthy male viagra offerhealthy male viagra reviewsgeneric viagra healthy manhealthy man viagra reviewsbuying viagra online cialis no prescription johnson and johnsontretinoin a .05 maxifort zimax sildenafil 50 mg pacific care pharmacy viagra samples canadian pharmacy cialis rx4 pharmacy ontario no script pharmacy canadian pharcharmy online
    Author : NastasiyaCream
    fast cash company brandon faxless payday advance payday loans online ybs personal loan
    Author : yhbIndig
    buy tadalafil online buy cialis without prescription cialis coupon cialis no prescription
    Author : hfvGerip
    generic cialis online cialis online discount cialis cialis online
    Author : vfsSkync
    cialis cialis online tadalafil citrate cialis generic best price
    Author : bgcBeilt
    Author : bghBrita
    viagra price generic viagra free viagra sample viagra generic name
    Author : hffBeash
    viagra without prescription cheap viagra online canadian pharmacy viagra prices order viagra online
    Author : bgzenums
    viagra tablets buy viagra online sublingual viagra buy sildenafil
    Author : bfsabins
    cheap viagra 100mg sildenafil 20 mg low price viagra generic viagra
    Author : nnmblell
    order viagra online viagra online canada viagra online viagra online usa
    Author : gfnUnurl
    what would happen if a girl took viagra generic viagra what happens if a girl takes viagra generic viagra
    Author : LeonardCream
    cialis purchases in australia cialis cialis online costo cialis nelle farmacie
    Author : mhcIndig
    Author : ngcDroto
    viagra overdose buy viagra online discount viagra online viagra generic
    Author : mhvGerip
    cialis without prescription cialis online cialis without a prescription generic cialis online
    Author : nbyBeilt
    prescription viagra teva generic viagra viagra plus order viagra online
    Author : bdcGerip
    cheap viagra online viagra without a prescription buy generic viagra viagra prescription
    Author : kc9gquo
    cialis daily india lowest cialis prices generic cialis cialis coupon cialis for bph reviews tadalafil reviews when will cialis go generic order cialis cialis pricing cialis from mexican pharmacy buy cialis for daily use purchase cialis without a prescription generic cialis cialis without a doctor cost of cialis cheap tadalafil best generic cialis pharmacy cheap medical insurance cialis without a doctor prescription from canada
    Author : GaponovaCream
    ways to save money fast payday advance faxless payday advance payday loans online only no phone calls
    Author : bfdBrita
    generic viagra cheap generic viagra viagra reviews viagra sample
    Author : byhBeilt
    what is viagra female viagra viagra online buy viagra online
    Author : sffIndig
    cheap viagra canada viagra online without prescription viagra australia cheap viagra
    Author : GaponovaCream
    best personal loan with bad credit faxless payday loans online payday loans personal loan in md
    Author : btgenums
    payday loans without teletrack payday advance payday advance usa online payday advance consolidation loans
    Author : bfcSkync
    viagra sale online cheap generic viagra generic viagra soft tabs buy viagra
    Author : ZheglovCream
    mony shop advance payday loans payday loan cash advance merced
    Author : Davidher
    Author : bvhabins
    alternative viagra viagra price online viagra sildenafil
    Author : bvxblell
    cheap viagra uk sildenafil over the counter viagra sale sildenafil 100
    Author : ZheglovCream
    payday loans county line road greenwood indiana cash advance same day payday loans fast cash immediate approval
    Author : nyhCexia
    canadian payday loan association pay day loan america payday loans fast payday loans payday loans no credit check
    Author : bfcBeash
    buy viagra uk buy generic viagra viagra patent viagra prescription
    Author : LouisGex
    The world of job has absolutely transformed a great deal in the last few years. Outsourcing as well as Canadian pharcharmy online increasing quantities of joblessness have actually brought about wonderful upheavals and changes in the workplace. Also www onlinepharmacy com those that are still fully employed frequently locate themselves looking into their shoulders waiting on the axe to fall. So, how can people discover the right job? While no job is a 'certainty,' they can get ready for an in-demand, apparently bulletproof career such as drug store service technician. learn here
    Author : OlegCream
    viagra generico modo de usar viagra online viagra online cheapest viagra australia
    Author : eb9bgws
    is there a generic cialis online generic cialis cialis prices is there a generic for cialis how to buy cialis without a prescription prescription drugs online without doctor how to buy cialis without a prescription cialis vs viagra cialis com cialis 20 mg lowest price cialis without prescription tadalafil generic cialis cialis buy online cialis mail order cialis discount purchase cialis online cialis vs viagra cialis free trial
    Author : OlegCream
    online viagra safe viagra cheap viagra online pharmacy how are viagra pills made
    Author : BrianDrunk
    healthymanoviagra.ruwww.healthymanoviagra.runew healthy mannew healthy man reviewsnew healthy manbuy viagrabuying viagraorder viagra onlineviagra where to buyhealthy man viagrahealthy malePurchase Viagra Onlinehealthy men healthy men healthy men viagra .comhealthy manhealthy man viagra offerhealthy male viagrahealthy man viagra scamhealthy man complaintshealthymannew healthy manhealthy man viagra reviewshealthy men viagrahealthy man pillshealthymalehealthy man pharmacyhealthy man viagra pillshealthy man cialishealthy man reviewshealthy man viagra salesviagra healthy mannew healthy man viagrahealthy man viagra radiohealthy man radio adhealthy man generic viagrahealthy man viagra adnew healthy man viagra reviewhealthy man radio adshealthy male internethealthy meds viagrathe healthy man viagrahealthy men viagra offerhealthy male viagra scamcomplaints about healthy man viagrawww.healthy man viagrahealthy male viagra offerhealthy male viagra reviewsgeneric viagra healthy manhealthy man viagra reviewsbuying viagra online buy amoxicillin without prescription uk retin buy maxifort inhouse pharmacy australia viagra samples supremesuppliers pharmacyrxone on line pharmacy canadian pharcharmy online
    Author : nsxBrita
    cheap tadalafil cialis 10mg no prescription cialis tadalafil 20mg
    Author : Lowelllonee
    Author : SamuelFlede
    canada pharmacy online on line pharmacy india pharmacy viagra cheap ed meds online ed medicines generic for erectile dysfunction ed medications best ed medication what are the best generic ed drugs online erectile dysfunction medications ed medications compared cheap ed medication ed medications online ed drugs online best erectile dysfunction medication in canada ed drugs meds for ed erectile dysfunction medications sold in canada erectile dysfunction drugs generic ed drugs cheap erectile dysfunction drugs-canada canadian erectile dysfunction drugs ED medication order erectile dysfunction medication generic drugs for erectile dysfunction erectile meds ed drug cost comparison buy erectile dysfunction drugs generic ed medication erectile dysfunction medication prices ed meds on line cheap ed drugs best erectile dysfunction drugs for sale online erectile dysfunction drugs online meds for erectile dysfunction generic ed meds erectile dysfunction drugs canada ed drug best ed drug best deal on ED meds cheap ed meds medication from canada ed erectile dysfunction generic name for ED drugs buy erectile dysfunction drugs online cheap erectile dysfunction medication generic erectile dysfunction medications erectile dysfunction drugs comparison impotence drugs online common drugs for ed generic impotence drugs ed meds cost effective ed drugs canadian erectile dysfunction drugs medications for erectile dysfunctionerectile dysfunction drugs cheapest cialis 20mg list of legitimate canadian pharmacies buyingnizagaraonline.com overnight antibiotics online canadian pharmacy cialis 20mg
    Author : nfcIndig
    tadalafil tablets 20 mg buy tadalafil online tadalafil cialis cheapest cialis
    Author : BrianDrunk
    healthymanoviagra.ruwww.healthymanoviagra.runew healthy mannew healthy man reviewsnew healthy manbuy viagrabuying viagraorder viagra onlineviagra where to buyhealthy man viagrahealthy malePurchase Viagra Onlinehealthy men healthy men healthy men viagra .comhealthy manhealthy man viagra offerhealthy male viagrahealthy man viagra scamhealthy man complaintshealthymannew healthy manhealthy man viagra reviewshealthy men viagrahealthy man pillshealthymalehealthy man pharmacyhealthy man viagra pillshealthy man cialishealthy man reviewshealthy man viagra salesviagra healthy mannew healthy man viagrahealthy man viagra radiohealthy man radio adhealthy man generic viagrahealthy man viagra adnew healthy man viagra reviewhealthy man radio adshealthy male internethealthy meds viagrathe healthy man viagrahealthy men viagra offerhealthy male viagra scamcomplaints about healthy man viagrawww.healthy man viagrahealthy male viagra offerhealthy male viagra reviewsgeneric viagra healthy manhealthy man viagra reviewsbuying viagra online no prescription pharmacy retin maxifort zimax 100mg online pharmacy no prescription Viagra Samples canadian pharmacy no prescription rx one pharmacy on line pharmacy no prescription needed xenical canadian pharcharmy online
    Author : Lowelllonee
    Author : JuliusPlado
    Author : PashaCream
    viagra headquarters buy viagra viagra cheap viagra precio buenos aires
    Author : nbySkync
    Includes self-help information packs, therapy tapes, and online and phone counseling. student loan help loan online This pain is similar to what other patients with viral infections experience. same day payday loan get a loan If you experience any of these symptoms, consult your doctor as soon as possible. https://loanseks.org/
    Author : nybenums
    viagra story best price viagra viagra overdose free viagra
    Author : jndabins
    cialis tadalafil tadalafil best price cialis price tadalafil online
    Author : hdfCexia
    free viagra samples buy cheap viagra cheap viagra 100mg viagra soft
    Author : ngvblell
    cialis soft tabs cialis reviews tadalafil generic order cialis
    Author : PashaCream
    viagra 500mg uk rate viagra online buy viagra apotheke bester preis viagra
    Author : PashaCream
    buy a sample viagra uk buy viagra viagra canada viagra capsule price in india
    Author : PashaCream
    viagra precio buenos aires viagra cheap viagra buy cheap female viagra pills
    Author : EvelinaCream
    dose maximum is of cialis what cialis generic cialis online best cialis from india
    Author : EvelinaCream
    enter site cialis in canada cialis buy cheap cialis cialis son generique
    Author : EvelinaCream
    commander cialis 1 cialis cheap buy cialis try it cialis buy now
    Author : nyhBeash
    cialis for sale buy tadalafil online tadalafil 20 mg discount cialis
    Author : ChernyshkovaCream
    viagra no ed viagra cheap cheap viagra viagra fancy dress costume
    Author : ChernyshkovaCream
    viagra swiss buy viagra buy viagra best prices viagra 100mg
    Author : ChernyshkovaCream
    india barata viagra cheap viagra buy viagra look there cheapest viagra uk
    Author : ChernyshkovaCream
    try it mail order viagra china viagra buy viagra viagra canada real
    Author : nsfGerip
    real viagra for sale viagra pills cheap viagra viagra pills
    Author : nfvenums
    viagra free samples viagra order viagra brand name viagra for sale
    Author : LyubomirCream
    freie cialis ohne verordnung cialis cheap cialis online female cialis india
    Author : nfvabins
    Author : bfxCexia
    buy generic viagra online generic sildenafil free viagra sample viagra sale
    Author : nfvblell
    viagra plus sildenafil citrate 100mg tab viagra alternative viagra price
    Author : LyubomirCream
    link for you original cialis cialis cheap cialis online cialis 20 cheap canada
    Author : LyubomirCream
    rs cialis gnrique cialis cialis buy cialis cheap from canada
    Author : ujaBrita
    generic brands of viagra online viagra viagra purchase sildenafil 100
    Author : nbvIndig
    order generic viagra buy viagra women viagra viagra without prescription
    Author : LyubomirCream
    cialis 10 tablette cialis cheap online pharmacty cialis enter site buy cialis pill
    Author : munBeilt
    viagra for sale canada viagra price of viagra viagra
    Author : RusyaCream
    uk viagra online paypal viagra fast delivery viagra online viagra dose influence
    Author : RusyaCream
    buy single viagra uk viagra online viagra viagra usarl
    Author : nukBeash
    generic viagra viagra online viagra purchase viagra tablets
    Author : ggnGerip
    Antibiotics, antiviral medications, and vaccines are often needed. soft tabs viagra http://ekioviagencm.com/ viagra indiaHyperglycemia, or high blood sugar, is common amongst diabetics. Still, the American Cancer Society estimates that in 2008 11,070 American women developed cervical cancer and 3,870 will die from this disease. Famous Physical Therapist's Bob Schrupp and Brad Heineck descibe the test one can do to help determine whether or not the pain in your calf is from a blood clot.
    Author : WaleriyaCream
    cialis and 40mg dose cialis online discount cialis just try cialis and diarrhea
    Author : WaleriyaCream
    cialis price montreal generic cialis online cialis i recommend cialis discounts
    Author : munenums
    For both seasonal influenza and pandemic H1N1, there is antiviral therapy available, such as Tamiflu or Relenza. free viagra sample pack https://footstepsunltd.com/ generic viagra onlineOutbreaks of flu occur almost every winter in the northern and southern hemispheres, and can show up year-round in the tropics. Do a minimum of cooking and use an oven only when absolutely necessary. He will be monitored for shock, respiratory distress, kidney failure, heart abnormalities, and other complications, and treated accordingly.
    Author : SlavochkaCream
    click here viagra cheap cheap viagra buy viagra best way 2 take viagra
    Author : ggwSkync
    Try these flower essences and herbs to calm your kitty. viagra online without prescription http://alecdviagajafuk.com/ pfizer viagraTreatment options for operable stage III breast cancer are the same as those for stage I and II breast cancers. I'm spending 16-20 hours a day in bed, HELP! Abstract General Interviewing Approaches to Psychiatric SymptomsMood DisordersBorderline Personality DisorderSubstance Abuse DisordersAnxiety DisordersSomatization DisorderEating DisordersDementiaPsychotic DisordersReferencesArticle Sections Abstract General Interviewing Approaches to Psychiatric SymptomsMood DisordersBorderline Personality DisorderSubstance Abuse DisordersAnxiety DisordersSomatization DisorderEating DisordersDementiaPsychotic DisordersReferencesThe psychiatric review of symptoms is a useful screening tool for identifying patients who have psychiatric disorders.
    Author : fgjabins
    Sierra Ramsey You can take an at home text 6 days before your period. low cost viagra https://saresltd.com/ buy viagra online no prescriptionThe results reveal that how information is presented online will make a substantive difference in people's perceived risk of having a disease. Diabetes is a disease in which blood glucose levels are above normal. In bacterial pneumonia, your temperature may rise as high as 105 degrees F.
    Author : nyhblell
    There must be a person-to-mosquito-to-another-person pathway. discount viagra https://ouarzazatefilmcommission.com/ viagra soft tabsI took a test last week but got neg response. Otherwise, they are one and the same. Yes, I am generally 31 to 32 days.
    Author : kmlCexia
    Was it of a different colour, or'? cheapest brand viagra http://kaeviagraon.com/ buy viagra onlineSince LMWH does not require an intravenous line or dose monitoring it can be given on an outpatient basis. Angina or a Heart Attack? American Academy of Pediatrics, 2012.
    Author : fhgBrita
    cialis soft cialis tadalafil tadalafil cialis cialis tadalafil
    Author : SlavochkaCream
    malaysia viagra shop buy viagra generic viagra buy cheapest viagra 5 mg
    Author : kmuIndig
    order viagra viagra generic viagra online pharmacy online generic viagra
    Author : fnvBeilt
    tadalafil dosage cialis 5mg order cialis online cialis 10mg
    Author : WladlenCream
    info cialis generic cialis online cialis online enter site mexico cialis
    Author : nukenums
    generic viagra sildenafil viagra alternative viagra viagra sales
    Author : lqhabins
    buy viagra online viagra pills viagra canada viagra pills
    Author : zxdblell
    where to buy viagra online viagra order generic viagra viagra pills
    Author : gfhCexia
    brand viagra buy viagra online order viagra online discount viagra
    Author : khgfBeash
    buy viagra no prescription discount viagra buy generic viagra viagra online without prescription
    Author : RichardCog
    Every little thing has transformed significantly in the past couple of decades. The cheap canadian viagra growth of web marketing and also shopping has increased the economic arms of people. The on-line Canadian Drug store is amongst the numerous aspects which canadian family pharmacy has actually developed within this network. It has entirely taken away the drug store sector by tornado all over the world and also transformed the entire scenario upside-down. Right now, people are preventing import of medicine from the area pharmacies and taking advantage of the web service a lot more conveniently. The on-line drug stores economical; prescriptions might be required and they have got in-house doctors in order to recommend medication based upon our demands. This setting of commerce is extensively utilized by the north American as well as Western customers.
    Author : DikunovaCream
    buy cheap cialis on the net cialis cialis online cialis 20 mg beschreibun
    Author : ZhenyaCream
    viagra generico simi cheap viagra buy viagra buy viagra tab
    Author : khfBeash
    discount viagra cheap viagra purchase viagra female viagra
    Author : nujBeilt
    generic cialis online cialis without prescription cialis generic cialis tadalafil
    Author : bsfIndig
    tadalafil dosage liquid tadalafil cialis generic cialis 20 mg
    Author : hfsabins
    tadalafil best price cialis professional cheap cialis tadalafil liquid
    Author : fsfblell
    cialis brand cialis online cialis reviews buy cheap cialis
    Author : BrianDrunk
    healthymanoviagra.ruwww.healthymanoviagra.runew healthy mannew healthy man reviewsnew healthy manbuy viagrabuying viagraorder viagra onlineviagra where to buyhealthy man viagrahealthy malePurchase Viagra Onlinehealthy men healthy men healthy men viagra .comhealthy manhealthy man viagra offerhealthy male viagrahealthy man viagra scamhealthy man complaintshealthymannew healthy manhealthy man viagra reviewshealthy men viagrahealthy man pillshealthymalehealthy man pharmacyhealthy man viagra pillshealthy man cialishealthy man reviewshealthy man viagra salesviagra healthy mannew healthy man viagrahealthy man viagra radiohealthy man radio adhealthy man generic viagrahealthy man viagra adnew healthy man viagra reviewhealthy man radio adshealthy male internethealthy meds viagrathe healthy man viagrahealthy men viagra offerhealthy male viagra scamcomplaints about healthy man viagrawww.healthy man viagrahealthy male viagra offerhealthy male viagra reviewsgeneric viagra healthy manhealthy man viagra reviewsbuying viagra online propecia without prescription tretinoin cream uk maxifort 50 mg 247 overnight pharmacy canadian viagra samples from pfizer supremesuppliersa.ru canadian pharmacy cialis 20mg seroquel no prescription pharmacy canadian pharcharmy online
    Author : sdfSkync
    viagra soft pills generic viagra over the counter viagra viagra for women
    Author : GenaCream
    cialis proper dosage cialis online cialis look here online cheap cialis
    Author : JuliusPlado
    Author : GenaCream
    cialis in turkei kaufen cialis cialis online canada cialis manufactured
    Author : rnhBeash
    cialis tadalafil cialis daily cialis without a prescription non prescription cialis
    Author : sgdDemia
    buy viagra online at https://niqabsquad.com/ how does viagra work https://niqabsquad.com/
    Author : tndBeilt
    viagra women generic viagra online online generic viagra viagra samples
    Author : GenaCream
    cialis 5 mg quanto costa cheap cialis buy cialis cialis marcas genericas
    Author : ShuraCream
    viagra achat paypal buy viagra buy viagra le viagra ordonnance
    Author : gwrBeash
    cialis pills buy tadalafil online cialis cialis 20mg
    Author : hhrBeilt
    buy female viagra viagra buying viagra online viagra samples
    Author : sgdDemia
    viagra online canadian pharmacy https://niqabsquad.com/ buy viagra https://niqabsquad.com/
    Author : mikGerip
    what happens if a girl takes viagra viagra price buy viagra discount viagra
    Author : ShuraCream
    dosaggio viagra cheap viagra online viagra pfizer india viagra price
    Author : nukabins
    generic viagra viagra for sale purchase viagra viagra
    Author : nyhblell
    viagra buy viagra viagra women buy viagra
    Author : nujCexia
    online generic viagra buy viagra buy viagra online without prescription viagra without prescription
    Author : bnmBeash
    buy generic viagra buy viagra generic viagra online viagra
    Author : Juliusdruth
    Author : bdfSkync
    viagra without a prescription cheap generic viagra viagra 100mg cheap generic viagra
    Author : nazDemia
    do you need a prescription for cialis http://cialisckajrhd.com/ cialis pills cialis no prescription
    Author : BordushevichCream
    payday loan logan utah no fax payday loans faxless payday advance personal installment loan online
    Author : nyjenums
    buy female viagra http://viagraoahvfn.com/ viagra prescription what happens if a girl takes viagra
    Author : vrfabins
    tadalafil reviews http://cialiscials.com/ cialis no prescription tadalafil dosage
    Author : nygfoete
    viagra without prescription http://viagrafhvcs.com/ where to buy viagra cheap viagra
    Author : nfgProro
    alternative viagra http://viagravkash.com/ try viagra for free buy generic viagra
    Author : InessaCream
    look here order cheap cialis buy cialis cialis shipping cialis canada
    Author : hdrdiump
    brand name viagra http://viagmagik.com/ viagra brand name viagra samples
    Author : LaraCream
    only now viagra doses viagra viagra free herbal viagra samples
    Author : cbgenums
    http://ouarzazatefilmcommission.com/ gel accutane http://saresltd.com/accutane/ buy cialis online http://footstepsunltd.com/cialis/ provigil japan http://saresltd.com/provigil/
    Author : herGeamy
    does generic viagra work http://dejviagram.com/ cheapest generic viagra dejviagram.com
    Author : vnhDemia
    http://saresltd.com/kamagra/ provigil to treat insomnia http://footstepsunltd.com/provigil/ tadalafil 2.5 or 5 mg administered once daily for 12 weeks in http://saresltd.com/tadalafil/ cialis viagra melhor http://ouarzazatefilmcommission.com/cialis/
    Author : bdxabins
    http://footstepsunltd.com/ prednisone burst dosage for bronchitis http://saresltd.com/prednisone/ safe cialis online http://ouarzazatefilmcommission.com/cialis/ comprar levitra argentina http://footstepsunltd.com/levitra/
    Author : dhcclorb
    Author : kkmfoete
    http://footstepsunltd.com/prednisone/ fungsi obat lasix adalah http://saresltd.com/lasix/ online pharmacy http://footstepsunltd.com/pharmacy/ buy sildenafil citrate http://saresltd.com/sildenafil/
    Author : befProro
    http://saresltd.com/ walmart prescription prices levitra http://ouarzazatefilmcommission.com/levitra/ kamagra shop 24-7 http://footstepsunltd.com/kamagra/ clomid 1-5 ovulating http://saresltd.com/clomid/
    Author : mumWrope
    tadalafil liquid cialis online buy cialis 20mg cialis online
    Author : bsdclorb
    viagra pill viagra generic viagra price generic viagra online
    Author : fbfGeamy
    cialis coupon cheap cialis online do you need a prescription for cialis tadalafil
    Author : ndgenums
    Author : jinabins
    Author : bdcfoete
    order viagra online buy viagra online cheap viagra on line online pharmacy viagra
    Author : bjjProro
    tadalafil online buy cialis canadian buy tadalafil online buy cialis from canada
    Author : ggjdiump
    order viagra online viagra generic date generic viagra online generic viagra online
    Author : rhhWrope
    tadalafil cialis without prescription buy cialis without prescription tadalafil cialis
    Author : rbsclorb
    tadalafil 20mg cialis 5mg cialis 20 mg cialis soft tabs
    Author : cnvCaurb
    buy cheap generic viagra viagra pills buy viagra online free viagra samples
    Author : bbzvoins
    purchase viagra viagra prescription price viagra womens viagra
    Author : ndfwhoNo
    generic viagra sildenafil online viagra generic viagra review buy viagra
    Author : nnaProro
    viagra how it works cheap viagra online viagra generic viagra samples
    Author : hdfGrete
    cheapest cialis cialis cheap cialis cialis soft tabs
    Author : bxzUnurl
    Author : nffGrete
    buy viagra canada viagra samples viagra 50mg buy generic viagra
    Author : nnqclorb
    generic viagra how viagra works viagra canada buy generic viagra
    Author : ddkUnurl
    how does viagra work what happens if a girl takes viagra viagra how it works discount viagra
    Author : jjqacery
    free viagra viagra generic viagra soft tablets buy viagra
    Author : ccaglync
    get viagra generic for viagra prescription viagra viagra online
    Author : mqqJoulp
    viagra how it works buy viagra cheap viagra canada online viagra
    Author : mmyCaurb
    cialis 10mg cialis on line cialis 20mg buy cialis
    Author : mmosmuts
    viagra reviews viagra viagra natural online viagra
    Author : fnsclorb
    how to use viagra viagra pills buying viagra online buy viagra
    Author : ddauself
    cialis online no prescription cheap cialis online tadalafil online cialis
    Author : mmzclorb
    viagra samples viagra from india buy viagra generic viagra online
    Author : llmacery
    uk viagra buy viagra order viagra online cheap viagra
    Author : nmnglync
    buy cialis without prescription online cialis cheapest cialis buy generic cialis
    Author : lloJoulp
    buy cheap viagra viagra online how long does viagra last cheap viagra
    Author : bdfsmuts
    herbal alternative viagra online viagra buy viagra п»їgeneric viagra
    Author : llpuself
    account now payday loans payday loan instant online loans bad credit п»їonline payday loans
    Author : btgCaurb
    alternative to viagra online viagra generic viagra rx viagra
    Author : bthglync
    loans now online personal loans no credit check loans loans online
    Author : zzqJoulp
    low interest rate personal loans 3 month payday loans applying for payday loans payday loans online
    Author : bdsgeoma
    what is payday loan cash advance cash today online payday loans
    Author : cbbsmuts
    cash advance loan loans affiliate payday loan get loans
    Author : bdgCaurb
    where to buy viagra online viagra viagra on line viagra online
    Author : Jasonned
    can cialis lower your blood pressure cialis online is a prescription needed for cialis cialis wat is dat cialis alkoholi
    Author : ThomaserSeema
    how to get an online prescription for viagra buy generic viagra taking l-arginine with viagra generic viagra online side effects of mixing alcohol with viagra
    Author : Charlesanjaini
    cialis 5 mg chemist warehouse generic cialis kostet cialis apotheke cialis what is recommended cialis dosage
    Author : SusanBob
    B2B2B2Z Free Starbucks $100 gift card http://lockoffcupclash.com/?option=com_k2&view=itemlist&task=user&id=536170
    Author : Eveglyday
    Cephalexin Wine Permitted While Taking Medication Discount Acticin Drugs Real With Free Shipping Cod Only Buy Antabuse Disulfiram cialis Amoxicillin And Clavulanate Potassium Refrigerate
    Author : JeffToonry
    Zithromax Teva Cialis Auf Rechnung Kaufen cialis Propecia Discography Cialis Avis Medical
    Author : HaroNilm
    Cialis 20 Mg Originale levitra plus Tadacip 20 Mg Propecia O Finasterida Pastiglie Cialis
    Author : HaroNilm
    Synthroid Without Script buy cialis Canadian Pharmacy Best Rx Comprar Cialis En Gijon
    Author : HaroNilm
    Levitra Preis 10 Mg viagra Viagra Side Effects Viagra Online Canadian Pharmacy
    Author : HaroNilm
    365 Pills Viagra Bluepharma Kamagra cheap cialis Levitra O Viagra O Cialis Todler Ear Infections Amoxicillin And Augmentin Amoxicillin With Other Drugs
    Author : JeffToonry
    Discount Hydrochlorothiazide With Free Shipping Shipped Ups cialis price Viagra E Varicocele
    Author : HaroNilm
    Comprare Levitra 10 Mg best price on levitra Valtrex Where To Buy Sildensfil Citrate Online
    Author : HaroNilm
    Buy Xenical Online Us Pharmacy Propecia Generic Comparison buy viagra online Cialis Y Otros
    Author : HaroNilm
    Amoxicillin Information Sheet where to purchase low cost levitra Buy 36 Hour Cialis Online 382 Overnight 4u Sipreme Suppliers Mumbai India
    Author : HaroNilm
    Prezzi Cialis Generico Vorzeitiger Samenerguss Levitra Que Es La Viagra Femenina viagra Cialis Gunstig Kaufen Propecia De 10 Mg 24th Pharmacy Ltd
    Author : HaroNilm
    Buy Sildenafil Citrate 100mg Amoxicillin Abuse buy cialis 12 Amphs Of Keflex
    Author : KelJeltjefs
    Levitra 20mg Online generic viagra Spese Levitra In Farmacia
    Author : Chastoca
    Achat Finasteride Propecia generic cialis Keflex Swime Flu
    Author : KelJeltjefs
    12 Amphs Of Keflex viagra Can I Get Cialis Without A Perscription
    Author : Davedugh
    Cialis Cuanto Cuesta En Espana viagra Cephalexin For Dogs No Perscription
    Author : Kennnencywen
    Efectos Cialis Viagra cialis Where To But Cialis 2.5mg
    Author : Chastoca
    Viagra Prescription In Canada generic cialis Side Effects Of Cephalexin Antibiotics
    Author : Davedugh
    Peut On Acheter Cialis Sans Ordonnance En Pharmacie cialis Cephalexin Mouth
    Author : Davedugh
    Nizagara Online Canadian cialis online Children Urine Tract Infection Amoxicillin
    Author : Kennnencywen
    Cialis En Farmacias Similares viagra cialis Amoxicillin With Cancer Paitents
    Author : Davedugh
    Purchasing Legally Amoxicilina Antibiotic Low Price Medication cialis buy online Retin A Propecia
    Author : Chastoca
    Zithromax Headache buy viagra online Zithromax Medicine
    Author : KelJeltjefs
    Cialis Espanol Comprar buy viagra online Zebeta
    Author : Davedugh
    Cialis Soft Tabs Preis online pharmacy Cialis 20mg Teilen
    Author : Chastoca
    Propecia Mail Order cialis Viagra Livraison Discrete
    Author : KelJeltjefs
    Blueforce Viafra generic cialis Paying Too Much For Viagra
    Author : KelJeltjefs
    Cialis Rezeptfrei Preis buy viagra online Finasteride Svezia Propecia
    Author : KelJeltjefs
    Order Online Stendra cialis Vip Transaction Pharmacy
    Author : KelJeltjefs
    Buy Cialis Best Review Low Cost Cialis Online Cialis 20 Mg Online Kaufen
    Author : KelJeltjefs
    Generic Secure Ordering Zentel With Overnight Delivery Medicine Store Cheap Viagra Kamagra Sildenafil Citrate Cialis Fecha De Caducidad Generic For Cialis Cialis Und Aspirin Viagra Rosa Per Donne Brand Cialis Viagra Per Impotenza discount generic accutane Cheap Viagra Tablets Online Propecia Prescription Male Pattern Baldness Fish Disease Pop Eye Amoxicillin Treatment Buy Tadalafil Tadalis Sx Soft Feminin Pharmacia Cialis 20 Mg Durata Cheap Cialis And Viagra New Healthy Man Viagra Review Maximum Pediatric Amoxil Dose Levitra Kamagra Gi Acheter Amoxicillin Prescrire Eu Medicament Pharmacie Buy Oratane Cheap Viagra Fast Shipping Buy Generic Hydrochlorothiazide Congestive Heart Failure Overnight Shipping How Much Is Propecia Viagra 100mg Euro Brand Cialis Usa Brand Viagra Online Propecia Dosis Calvicie com httpwww. This service and offer are void where prohibited.b there is. best payday loans Hard money loans online for a living turbo software review jun investor complaints relating to fraudulent pour les s binaires qui savre tre une regulation and compliance.No Credit Check Instant Approval private If you have any problems throughout the process whether its during the application after you receive the money or when youre repaying the loan our team members will be on hand to help you whenever you need it most.Acquistare Kamagra Sito Affidabile Levitra Pills Online Buy Strattera Cialis Prix 10mg Propecia Pill Brand Viagra For Sale Cialis At Discount Prices Need To Order Cialis How To Get Epiduo Without Prescription Casas Propecia Cost Of Levitra Cephalexin For Dogs Propecia Grande Levitra Online Buy Accutane 5 Mg Online Usa Viagra Efectos Y Contraindicaciones cialis Viagera Gimalxina Order Viagra Viagra Pfizer Test Proviron Cheap Generic Viagra Bayer Brand Name Levitra Super Active Viagra Buy Online Kamagra Kamagra Oral Jelly Boots Side Effects To Amoxicillin In Babys Cialis On Line Comprar Cialis 20mg Espana Erection Pills At Gnc cialis Does Amoxicillin Contain Any Sulfa Generic Cialis For Sale Online Levitra Order Online Generic Viagra For Sale In Usa Child Reaction To Amoxicillin Levitra Brand Online Cialis Interaccion Con Otros Medicamentos Viagra 100 Mg For Sale Buy Tadalafil Online Metamucil Taken With Amoxicillin Does The Levitra You Can Buy Online Work The Same Cialis Pills Kamagra Gelee Achat Kamagra Le Mans Buy Levitra Discount Levitra Canada Buy Valtrex Online Uk Online Cialis Pharmacology Cephalexin Cialis 28 Compresse Da 5 Mg Levitra Buy Cialis Prezzo Online
    Author : KelJeltjefs
    Viagra Addio Can I Buy Xenical Online Need Discount Generic Macrobid Ups Cash Delivery Buy Effexor Online No Prescription Order Viagra Pills Cialis Original Gunstig Acheter Levitra Online Online Pharmacy Kamagra Che Cosa E Cialis Originale Best Price For Levitra 20mg Priligy Buy Online Uk Secure Progesterone Hormone Replacement Low Price Mastercard Nevada
    Author : CesSirl
    Prezzo Levitra In Italia cheapest levitra Buying Levitra Online Cialis En Exceso Es Malo viagra online prescription Pastillas Para Ereccion Amoxicillin Bladder Infections achat viagra en france en vannes Discount Vardenafil 20mg Topical Propecia Androgenetic Alopecia accutane 30 mg sales Beta Blockers Where To Buy Topical Propecia Thinning Hair cialis price Amoxicillin For Dogs For Sale Ordering Isotretinoin online pharmacy Cephalexin Generic Cialis Demi Vie viagra Vente Cialis Cialis Quelle Dose viagra online prescription Doses Of Amoxicillin Amoxicillin Feline Dose viagra Use Propecia On Eyebrows Lasix Usa Blog what's in fake accutane bought online? Regaxidil Y Propecia Propecia Meteo Proscar viagra cialis Buying Progesterone No Prescription Buy Generic Diflucan livraison propecia Buy Synthroid Online Without Script Precio Propecia Cialis Levitra cialis Precio Viagra Gibraltar Green Line Phmcy viagra online Cialis Zuzahlung Propecia Online Prices generic cialis Levitra Miglior Prezzo Propecia 120 Day Buy Viagra Ricetta Cialis Online Commande Cialis Pharmacie cialis online Buy Tadalis Sx Low Cost Cialis Ibuprofeno cialis Amoxicillin Tropical Fish Viagra O Cosa cialis Amoxil Tfd Vente Cialis 5 Mg cialis buy online Flagyl 500 Order Cialis 20mg Dosage viagra cialis Elife Pharmacy Free Shipping Dutasteride Internet Shipped Ups cialis buy online Direct Secure Stendra Discount No Script Needed Priligy Packaging viagra online prescription Propecia 5mg Teilen Comprar Cialis 24 Horas cialis Viagra Rezeptfrei Bestellen Gunstig Buy Phenergan Online Buy Cialis Cialis England Generic Zithromax Tablet viagra cialis Cialis Generika Online Hydrochlorot 50mg No Prescription buy viagra online Tomar Viagra Para Eyaculacion Precoz Priligy 30mg Buy kamagra india cheap Viagra Delivered In Ontario Canada Levitra Precio En Farmacia buy viagra Procurer Du Viagra Sans Ordonnance Viagra Prix Pharmacie Ordonnance buy orlistat diet pills Cheap Cialis Next Day Shipping The operator of this Web Site is not an agent representative or broker of any lender and does not endorse or charge you for any service or product. unsecured loans An appeal commenced in accordance with subsection operates as a stay of the order until disposition of the appeal..Buy Viagra Out Of Us Cheap Cialis Keflex And Boils Amoxicillin Or Antibiotic And Later Pain viagra Cialis Pharmacie Sans Ordonnance Isotretinoin Tab Internet Pharmacy With Free Shipping cialis price sale isotretinoin roacutan website cheapeast Viagra Soft Tabs Online cialis 240 Buying Amoxicillin Trihydrate 500mg Propecia Weekly Dosage cialis Tinidazole Come Assumere Levitra viagra online Generisches Cialis Erfahrungen Paypal Sildenafil cialis online pharmacy Force Reviews For Sale Progesterone Next Day Tablets Fedex Shipping Cheap Viagra Baclofene 60 Mg Tadalafil Canada cialis Clomid Apres 10 Jours For Sale Levaquin Levox C.O.D generic cialis Cephalexin For Adult Uti Cialis 36 Heures cialis Viagra Dopo Mangiato Synthroid Without A Script viagra online Black Cialis 800 Mg Best Prices
    Author : zafarwazed
    আরো অনেক তথ্য রয়েছে যা বলা হয় নি। বারুদ বের করেছিলাম ১৯৭৭সালে -
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive