Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২৫ ১৪ই অগ্রহায়ন, ১৪২৫ ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
[মন্তব্য প্রতিবেদন] একুশের মিছিলে পুলিশের গুলি : কুখ্যাত এলিস কমিশন রিপোর্ট  
রাশেদ রাহম

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের আগেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানের দুই অংশে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক শুরু হয়। নতুন রাষ্ট্রের গভর্নর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় ঘোষণা করেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ১৯৪৮ সালে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন। ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে ২১ ফেব্র“য়ারির অভ্যুত্থান তাই অনিবার্য ছিল। অনিবার্য ও সুনিশ্চিত ছিল না পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ। ৪০ এর লাহোর প্রস্তাবের চেতনায় নির্মিত রাষ্ট্রভিত্তির ন্যূনতম আয়োজনটুকুও ধ্বংস করে দেয় সেদিন বেলা তিনটায় ছাত্রদের ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনা। ছাত্রদের রক্তে সেদিন উদ্ভূত হয় একটি স্বাধীন জাতিসত্তার। গণভিত্তি পায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে সর্বস্তরের জনগণের মাঝে। ক্ষমতার রাজনীতিতে বিহ্বল সরকার ২২ ফেব্র“য়ারি আবারও গুলি চালায়। এই নিষ্পেষণে পুলিশের সঙ্গে এবার যুক্ত করা হয় ইপিআর ও মিলিটারিকে। আন্দোলনের যৌক্তিকতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে রাজনৈতিক আন্দোলন আরও জোরদার আরও সুসংহত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। গুলিবর্ষণের ঘটনার নিরপেক্ষ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের অংশগ্রহণমূলক তদন্ত কমিশন গঠন করে দোষীদের উপযুক্ত বিচার দাবি করা হয়। নৈতিকভাবে পরাজিত সরকার অবশেষে একটি প্রহসনমূলক তদন্ত কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়। যা ‘কুখ্যাত ‘এলিস কমিশন’ নামে পরিচিতি পায়।
১৯৫২ সালের ১৩ মার্চ সরকার একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে বলা হয়- ‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যে  গোলাগুলি হয়, মাননীয় প্রধান বিচারপতি কর্তৃক নির্ধারিত ঢাকা হাইকোর্টের একজন বিচারপতি কর্তৃক তার একটা তদন্ত হওয়া উচিত। এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে,-
১) পুলিশের গুলি করা অত্যাবশ্যকীয় ছিল কিনা।
২) পরিস্থিতির বিবেচনায় পুলিশের শক্তি প্রয়োগ করা যথার্থ ছিল কিনা।
১৫ মার্চ ১৯৫২ সরকার এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রধান বিচারপতি তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টে কর্মরত বিচারপতি টমাস হোবার্ট এলিসকে তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। ঞযব ঐরময ঈড়ঁৎঃ ড়ভ ইবহমধষ (ঙৎফবৎ), ১৯৪৭-এর ৯নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পূর্ববাংলায় একটি স্বতন্ত্র হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। দুইজন স্থায়ী, দুইজন অতিরিক্ত এবং একজন অস্থায়ী মোট ৫ জন বিচারপতি নিয়ে গঠিত এ্ই কোর্টের নামকরণ করা হয় ‘ঢাকা হাইকোর্ট’। অতিরিক্ত দুইজন বিচারপতির একজন এলিস ছিলেন একজন ইংরেজ। ১৭ মার্চ ১৯৫২ সরকার পৃথক আদেশের মাধ্যমে এলিসকে তদন্ত কাজ পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করে। তদন্তকাজ গোপনে পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়। ২০ মার্চ ১৯৫২ এলিস সংবাদপত্র ও রেডিও পাকিস্তানে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনে প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত বিবৃতি পাঠানোর অনুরোধ করেন।
২৩ মার্চ ১৯৫২ সাপ্তাহিক ‘সৈনিকে’ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এলিস কমিশনের বিচার্য বিষয় প্রত্যাখ্যান করেন। ২৯ মার্চ পরিষদের সভায় আনুষ্ঠানিক কমিশনকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
বয়কটের পেছনে তাদের যুক্তি ছিল তদন্তের আওতা সংকীর্ণ এবং তদন্ত অধিবেশনে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার না থাকা। এই তদন্ত প্রক্রিয়ার একটি মূল্যায়ন করেছে সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ তাদের ১৯৫২, ৩১ মার্চের সম্পাদকীয়তে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তারা কর্মপরিষদের ব্যাখ্যাটিকেই উপস্থাপন করেন। তদন্ত সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও কার্যকরী করতে তারা কমিশনে আরও ২ জন জনসাধারণের আস্থাভাজন বেসরকারি প্রতিনিধি নিয়োগ, তদন্ত প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানসহ ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন।
এইসব দাবি উপেক্ষা করে ঢাকা কমিশনার্স কোর্টের রুদ্ধদ্বার কক্ষে ৮ এপ্রিল, ১৯৫২ তারিখে তদন্ত কাজ শুরু হয়। ৩ মে শুনানি শেষ হয়। ২৭ মে সরকারকে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করা হয় এবং ৩১ মে তা প্রকাশ করা হয়।
বিচারপতি এলিস তার রিপোর্ট শুরু করেন ৩১ জানুয়ারি ৫২তে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন সম্পর্কিত বর্ণনা দিয়ে।
মার্চের ২০ তারিখ একটি নোটিশের মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের লিখিত বিবৃতি আহ্বান করেন। তাকে পাঠানো ২৮টি বিবৃতির মধ্যে পরিষদের আহ্বায়ক ও যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দুটি বিবৃতি ছিল। কিন্তু ২২ ফেব্র“য়ারি রাতেই পরিষদের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে সরকার যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়। ২৬ ফেব্র“য়ারি পুলিশ মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের তৈরি করা শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। পরিষদের পক্ষ থেকে হরতাল উঠিয়ে নেয়া হলেও সরকার ২৭ ফেব্র“য়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে স্বভাবতই পরিষদের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে তদন্ত প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। তদন্তকারী বিচারপতি এই প্রেক্ষিত বিবেচনায় নেননি।
বিচারপতি এলিসের ভাষ্যমতে, পুলিশের গুলিবর্ষণের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য সাক্ষ্য দিয়েছেন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র দেওয়ান হারুণ মু. মুনীরদ্দিন। অথচ ২১ ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যায় আন্দোলনকারী যে ছাত্রদের নিয়ে ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাদের সংশ্লিষ্ট করার কোন প্রচেষ্টা দেখা যায়নি।
চারজন ডাক্তার ও তিনজন সেবিকা ও ওয়ার্ডবয়দের সাক্ষ্য নেয়া হয়। অথচ গুলিবর্ষণের পরে ড. অ্যাংলিংটনের নেতৃত্বে মেডিকেল কলেজের একটি করিৎকর্মা ও মানবিক দল আহত ছাত্রদের বিরতিহীন সেবা প্রদান করেছিলেন। তদন্তে তার অংশগ্রহণ বা সাক্ষ্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়নি।
তদন্তের ক্ষেত্রে আটজন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার সাক্ষ্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। অথচ তাদের নির্দেশ অনুযায়ী যেসব সাধারণ পুলিশ সদস্য ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, তাদের কারও সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়নি। বিচারপতি এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন, যেহেতু তারা উপরস্থ আদেশ ব্যতীত আত্মরক্ষার্থে স্বপ্রণোদিত হয়ে গুলি করেনি, সুতরাং তাদের সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ নয়।
গুলিবর্ষণের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস. এম. হোসেনের (সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন) সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ড. হোসেন যদি ছাত্রদের ওই যৌক্তিক আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজ হাতে তুলে নেয়ার সাহসিকতা দেখাতেন, তাহলে সেদিন গুলিবর্ষণ এড়ানো যেত। ওইদিনের মতো তদন্তে সাক্ষ্য দেয়ার ক্ষেত্রেও নৈতিক সাহসিকতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন তৎকালীন উপাচার্য।
কলা অনুষদের ডিন ড. জুবেরীর কাছে থেকেও সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। ড. জুবেরী ২৪ ফেব্র“য়ারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন নিজ উদ্যোগে। এবং তুলনামূলকভাবে আপসকামী সিদ্ধান্ত নিতে অন্য শিক্ষকদের বাধ্য করেন। তদন্ত প্রক্রিয়ায়ও তিনি একই ভূমিকার পুনরাবৃত্তি করেন।
এস.এম. হলের প্রভোস্ট ড. এম. ও গণি-ও একই বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তিনি মেডিকেল কলেজের কম্পাউন্ডের ভিতরে পুলিশের গুলিবর্ষণের এক ধরনের ইতিবাচক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন। তার মতে কম্পাউন্ডের ভিতরে পুলিশের গুলি লেগেছিল ঠিক তবে তারা স্বেচ্ছায় করেননি। বরং কলেজ কম্পাউন্ড যেকোনোভাবে তাদের গুলির আওতায় পড়ে গিয়েছিল। তার বক্তব্যকে ভিত্তি করেই এলিস ছাত্রদের মিথ্যা সাক্ষ্য দানকারী হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পান। যারা দাবি করেছিল, পুলিশ  কম্পাউন্ডের ভিতরে ঢুকে গুলি চালিয়েছিল এবং কম্পাউন্ডের বারান্দাতেই গুলিবিদ্ধ হয়ে আবুল বরকত লুটিয়ে পড়েন।
এভাবে প্রশাসনিক কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল ও সরকারের কাছে দায়বদ্ধ এই তিন শিক্ষক কর্মকর্তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির অন্য কোনো সাধারণ শিক্ষকের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া ২৬ ফেব্র“য়ারি মুনীর চৌধুরী, মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীসহ যেসব  শিক্ষককে  গ্রেফতার  করা  হয়,তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্ট করার কোনো উদ্যোগও লক্ষ্য করা যায়নি।
২১ ফেব্র“য়ারি বেলা ২টার দিকে কয়েকজন আইনপরিষদ সদস্য বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন। এলিস রিপোর্টে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এটা বিবেচনায় নেননি যে বেলা তিনটার পরে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আইন পরিষদে তুমুল বিতর্ক হয়। মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে ৩৫ জন সদস্য সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। তার অনুসন্ধানে এটাও ধরা পড়েনি যে, ২২ ফেব্র“য়ারি পুনর্বার গুলি চালানোর প্রতিবাদে সদস্য আবুল কালাম শামসুদ্দীন আইন পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এলিস তার পুরো রিপোর্টে প্রমাণ করতে চেয়েছেন ছাত্ররা কীরকম মুহুর্মুহু ইট-পাটকেল ছুঁড়ছিল। এবং কোন পরিস্থিতিতে পুলিশ গুলি করতে বাধ্য হয়েছেন, পুলিশের কত সদস্য আহত হয়েছে তার অনুসন্ধানে টিয়ারশেল ও নির্বিচার লাঠিচার্জের ফলে কতজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছে, তা নির্ধারণের কোনো চেষ্টা করা হয়নি। অথচ আন্দোলনের কর্মী আহমদ রফিক বলছেন, তাদের সেবা দিতে গিয়ে ইমার্জেন্সি বিভাগের লিকুইড প্যারাফিনের রিজার্ভ স্টক পর্যন্ত শেষ হয়ে যায়।
পুলিশ পক্ষের সাক্ষীদের প্রায় প্রত্যেকের বক্তব্যে গুলিতে একজন নিহত হওয়ার উল্লেখ আছে। সব সাক্ষী একই ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে দেখেছেন, নাকি একাধিক ব্যক্তি ছিল, তদন্তে তা খোলাসা করা হয়নি। বলা হয়েছে ৪ জন নিহত হয়েছে। এক্ষেত্রে সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বেরের বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি একুশের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানতে পারেন। একুশের রাতে তিনি পুলিশের গাড়িতে ৯টি লাশ তুলতে দেখেছিলেন। ‘সাংবাদিকের রোজনামচা’ নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে তিনি বলেছেন- ‘২১ ফেব্র“য়ারি গুলিতে ছাত্র ৪ জন মরেনি; অনেক মরেছে, কিন্তু তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওইদিন হতাহত হয়েছে ৯ জন। অথচ পরদিন দৈনিক আজাদে আহতের সংখ্যা কয়েকশ দাবি করে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। বিস্ময়কর হলেও সত্য, বিচারপতি এলিস তার পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো সংবাদপত্র বা সাংবাদিকদের বক্তব্য গ্রহণ করেননি। অথচ ২২ ফেব্র“য়ারি বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের দ্বারা ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার প্রেস পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। এইসব ঘটনা এড়িয়ে বিচারপতি দায়সারাভাবে তার তদন্তকাজ সম্পন্ন করেন।
পুলিশের সাক্ষ্যে বারবার ওঠে এসেছে, গুলিতে লুটিয়ে পড়া ব্যক্তিকে ছাত্ররা সরিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু ওই রাতেই পুলিশের তত্ত্বাবধানে আজিমপুর গোরস্থানে নিহতদের দাফন করা হয়েছিল। তাদের আত্মীয়স্বজনকে জানানো হয়নি। সে কারণেই পরদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে। বিচারপতির রিপোর্টে এসব বর্বরতারও কোনো উল্লেখ নেই।
২৫ মার্চ আবুল বরকত ও ২৮ মার্চ রফিক উদ্দীন পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকা সদর মহকুমা হাকিমের এজলাসে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পুলিশ দায়িত্ব পালনের স্বার্থে গুলি করতে বাধ্য হয়েছে এই মর্মে আদালত মামলাগুলো খারিজ করে দেন। বিচারপতি এলিস তার তদন্ত প্রক্রিয়ায় এসব মামলার অভিযোগপত্র আমলে নেননি। একটি বিচারবিভাগীয় তদন্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি নথিগুলো যাচাই না করে বিচারপতি তার দায়িত্বহীনতা ও আজ্ঞাবহতার পরিচয় দেন।
এলিসের ভাষায় দুইজন বহিরাগত অলি আহাদ ও শামসুল হককে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেছে। তারা দুইজন যে যুবলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধি ও সর্বদলীয় পরিষদের সদস্য সে ব্যাপারে তদন্তকারী বিচারপতি হয়ত অজ্ঞাত ছিলেন নয়ত এড়িয়ে গেছেন। রিপোর্টে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের’ উল্লেখ আছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ প্রায় ১২টি দল ও প্রতিষ্ঠানের ৪৩ জন সদস্য নিয়ে এই পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। অথচ তদন্তে সেইসব দল ও সদস্যদের কোনো বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি।
রিপোর্টে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অনভিজ্ঞতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে, অভিজ্ঞতা কম বলে দায়িত্বপালনকালে তার কোনো মতিভ্রম হয়নি এবং তিনি কারও দ্বারা প্রভাবিত হননি। কিন্তু এই বক্তব্যে সরকারের মনোভাব গোপন করে জনগণের সন্দেহ দূর করতে যথেষ্ট ছিল না। কারণ, বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেটকে সরিয়ে একদিন আগেই উর্দুভাষী ম্যাজিস্ট্রেটকে ঢাকায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।
রিপোর্টের শেষদিকে এলিস এই হাস্যকর সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ কাপড়ের টুপি পরে দায়িত্ব পালন করছিল। যদিও পুলিশের সাক্ষ্যে ওইরকম কিছু ওঠে আসেনি। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিভিন্ন অস্ত্রসজ্জায় (ইট-পাটকেল) সজ্জিত দেখা যায়। যদি সেদিন পুলিশ যথার্থ অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত থাকত তাহলে এই তদন্তের কোনো উপলক্ষ তৈরি হতো না। কিছু সংস্থা ও সংগঠনের তদন্তকাজে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাদের অংশগ্রহণ তদন্তকে আরও কার্যকরী করত বলে মন্তব্য করেন।
বিচারপতি রিপোর্টে স্বীকার করেন পূর্ব বাংলা মুসলিম ছাত্রলীগের একটি বিবৃতির মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়ায় তার সক্ষমতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয় এবং তাতে দাবি করা হয়, বর্ধমান হাউজ থেকে আসা একটি গাড়ি থেকে পুলিশের কাছে গুলি করার লিখিত আদেশ হস্তান্তর করা হয়েছিল।
ছাত্রদের এইসব সন্দেহ আমলে না নিয়ে বিচারপতি এলিস মূলত সরকারি প্রেস নোট পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীনের রেডিও ভাষণের পুনরাবৃত্তি করেন। তার তদন্ত রিপোর্ট সরকারের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গেই একমত পোষণ করে যে, ২১ ফেব্র“য়ারি পুলিশের পক্ষে ছাত্রদের ওপর গুলি করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল এবং পরিস্থিতির বিবেচনায় শক্তি প্রয়োগ করা যথার্থ ছিল। প্রহসনের এই রিপোর্টের মাধ্যমে মূলত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আশা আকাক্সক্ষাকে আনুষ্ঠানিক অপমান করা হয়। সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আইনের শাসনের মহত্তম মূলনীতিকে অস্বীকার করে স্বয়ং বিচারবিভাগ।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.
বর্তমান সংথ্যা
পুরানো সংথ্যা
Click to see Archive
Doshdik
 
 
 
Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive