Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ৩০ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
[নিবন্ধ] সঙ্গীত সাধক মনোমোহন ও তাঁর গুরুকুল -বাবু রহমান  

বাঙালির প্রাচীন রাগাশ্রিত গীতিকবিতা ‘চর্যাপদ’। রাগ-রাগিণীর ব্যবহার যদি সে সময়েই হয়ে থাকে তাহলে কেন বলা হয় মোগল শাসনের সময় এসবের সৃষ্টি। তবে সংস্কার ও মিশ্রণ হয়েছে একথা বলা যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১)’র এ পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে ২০০৭ এ। চর্যাপদের বিষয়বস্তু নদী, খাল, নৌকো, পাল, প্রেম, নিত্য ব্যবহার্য জিনিস। তবে সুর যে গ্রামীণ নয়, রাগ-রাগিণীর ব্যবহার থেকে তা বোঝা যায়। গ্রামীণ সুর কোনো না কোনো রাগে; কিন্তু শিরোনামে এর ব্যবহার এবং শব্দ চয়নে বোঝা যায় এর সুরছন্দ উচ্চাঙ্গের।
মীরাবাঈ, কবির, সুরদাস যে ভজন গানের স্রষ্টা সেই গানের বিষয়বস্তু ঈশ্বর ভজন, বন্দনা। এই সময়টি চর্যাপদের পর মধ্যযুগের পূর্বে। ভাষা মৈথিলী, সংস্কৃত ও হিন্দী ভাষা। কিন্তু আমাদের গল্পের নায়ক আরও পরের- মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯)। তাঁর ভাষা বাংলা। বিষয়বস্তু প্রার্থনা প্রভুর জন্য।
মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদাবলীর সুরছন্দ ক্ল্যাসিক। আমাদের পৌরাণিক ভাস্কর্য দেখে যেমন মনে হয় গৌড়ীয় বাংলার নিজস্ব উচ্চাঙ্গ নৃত্য প্রাচীন। ঠিক তেমনি আমাদের বাংলা গানেরও ক্ল্যাসিক রূপ রয়েছে। তার সার্থক রূপ হলো কীর্তন। একে আমরা বলতে পারি ‘ক্ল্যাসিকো ফোক্’। চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস যে বহমান স্রোতের ফুল। সেই ধারা দশম-একাদশ শতকে ধর্ম, সাহিত্য ও সঙ্গীতে বৌদ্ধ বজ্রয়ান ও সহজয়ান সম্প্রদায় নতুনভাবে শুরু করেছিল। চৈতন্য দেব (১৪৮৬-১৫৩৩) এ ধারাকে বেগবান করেছিলেন। তবে কয়েকটি প্রকারে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল কীর্তনের প্রকার। গরানহাটি, মনোহরশাহী ইত্যাদি ইত্যাদি। একটি কথা সত্যি যে, নিরাকার ঈশ্বরের চেয়ে সাকার কালী, রাধা-কৃষ্ণসহ অন্যান্য দেব-দেবীর লীলা এখানে মুখ্য।
বাংলার ‘ক্ল্যাসিকো ফোক্’ এই কীর্তনের পাশাপাশি আরও কয়েকটি গ্রামীণ ধারা লোক মুখে মুখে প্রবর্তিত হয়। রামপ্রসাদ সেন (১৭৭২-১৭৮২) একটি ধারার প্রবর্তক। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০-১৭৮২) এর মুহুরীগিরি ছিল তাঁর পেশা। ‘কালীকীর্ত্তন’ তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম। বহু ঈশ্বর যুগের এক শক্তি কালীর সাধনা ও ভজন রামপ্রসাদের রচনার বিষয়। তাঁর রচিত গানকে ‘রামপ্রসাদী গান’ বলা হয়। সাথে সাথে সংস্কারবাদী আর একটি সহজিয়া বাউল ধারা। তার অগ্রপথিক বাউল সম্রাট লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০)। এক সময় বিশাল এক জনগোষ্ঠী তার পতাকা তলে সমবেত হয়েছিল। সংস্কৃত শব্দের উচ্চকোটির বাংলা পদাবলী কীর্তনের পাশাপাশি বাংলার গ্রামে গ্রামে লোকজধারা কবিগানের সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের ঢাকা, ফরিদপুর, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, যশোর, পাবনাজুড়ে একদল কবিয়াল গড়ে ওঠে; সেই সাথে সাথে রচিত হয় কবিগান। রাজা রামমোহন (১৭৭২-১৮৩৩) যখন থেকে ব্রাহ্মধর্মের কথা বলছেন তখন থেকেই তাঁর বাণী নিয়ে বিখ্যাত সনাতন ধর্মের সংস্কারক কেশব চন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪) এর আবির্ভাব। তখন পূর্ববঙ্গ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। ঠিক সেই সময় জন্ম মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯)’র।১
বৃহত্তর ত্রিপুরা অঞ্চল স্থানীয় শক্তিপূজার আধার। নানা অঞ্চলে বিভিন্ন শক্তির উদ্ভব। ত্রিপুরা মহারাজার এলাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদার গড়ে উঠেছে সেই সময়। মহারাজার ভজন ও তৈল মর্দনের জন্য জমিদারে জমিদারে নানা বিনোদন গোষ্ঠী তৈরি করতে থাকল। রাজ্য রক্ষার জন্য চলল যুদ্ধ। সৈনিকদের উৎসাহ দেবার জন্য প্রয়োজন হলো-বাদ্যযন্ত্রীর। প্রকৃতির কাঠ, বাঁশ, বেতের সাথে সংযুক্ত হলো চামড়া। চামড়া সংগ্রহ ও বাদ্যযন্ত্রের নির্মাতাদের বিশেষণ নাক্কার্চি বা নাগারচি। এটি ফার্সি শব্দ। লোকজ ভাষা নাগারচি। তারা যুদ্ধে নামল নাকাড়া ও টিকাড়া নিয়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় ভাষায় এদের বলে বাজাইন্যা। নিম্নশ্রেণীর অনেক সম্প্রদায়ের মাঝে এ বাজাইন্যাডির চরিত্র অসাম্প্রদায়িক। বারো মাসে তের পার্বণে পেশায় ওরা ব্যস্ত। নির্যাতিত মানুষের ভগবান মা কালী। তার পুজো ও নামাজ আদায় সমভাবে তারা পালন করছিল। সেই সমাজের শ্রেষ্ঠ পিতা সাধু মিয়া। তার জ্যেষ্ঠ সন্তান সমীর উদ্দিন, ফকীর আফতাব উদ্দিন (১৮৬৯-১৯৩৩), উস্তাদ আলাউদ্দিন (১৮৮১-১৯৭২), নায়েব আলী, উস্তাদ আয়েত আলী (১৮৮৪-১৯৬৭), তাদের পূর্বপুরুষ দীননাথ দেবশর্মা। এ নাগারচি বংশের প্রায় সবাই কালীসাধক। এদের শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি উস্তাদ আলাউদ্দিন। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর সৃষ্ট রাগ-রাগিণীতে। যেমন মুহম্মদ, সরস্বতী, দুর্গেশ্বরী, ভগবতী ইত্যাদি।২ মেজদা ফকির আফতাব উদ্দিনের প্রভাব পড়েছে উস্তাদ আলাউদ্দিনের জীবনে। মনোমোহনের সুরের সাথী ছিলেন ফকীর আফতাবউদ্দিন।
সাতমোড়ার ‘ময়লা’র সদস্য লবচন্দ্র পাল (১৮৮২-১৯৬৬)। তিনি একজন বিএসসি ডিগ্রিধারী শিক্ষক। এই দুই শিষ্যের মধ্যে আফতাবউদ্দিন জ্যেষ্ঠ। তারপর মনোমোহন দত্ত (১৮৮২-১৯৬৬) এবং লবচন্দ্র পাল (১৮৭৭-১৯৬৬) সর্বকনিষ্ঠ। সর্বজন কথিত মনোমোহনের ‘ম’, লবচন্দ্রের ‘ল’ এবং আফতাবউদ্দিনের ‘য়া’ নিয়ে ‘মলয়া’ গীতিগ্রন্থ। এর অর্থ শান্তির হাওয়াও হতে পারে। ১৯১৬ সালে ‘মলয়া’ গীতিগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সাতমোড়ার আনন্দ আশ্রম এবং প্রকাশনার সাথে লবচন্দ্র পাল আত্মিকভাবে সম্পৃক্ত। এতে ২৮৭টি গান ছিল। এ সকল গানের শ্রেণীর মধ্যেÑ শ্যামা, কৃষ্ণ, শিব, গৌরাঙ্গলীলা, গুরু আনন্দ স্বামীর তিরোভাব, পিতার মৃত্যু, ইসলামি, গাথা ইত্যাদি। এতে ভাব ও বিবিধ শ্রেণীর গান সংগৃহীত ও মুদ্রিত। আমরা লক্ষ্য করছি তার গানেÑ ‘শ্যামা’ বিষয় উঠে এসেছে। এছাড়া তাঁর গুরু আনন্দস্বামীর মানস বিগ্রহ ‘দয়াময়ী’র নিরাকার প্রতিমা উদ্ভাসিত। গান রচনার বিষয়বস্তুতে সে সময় যে সামাজিক অবস্থা বিরাজ করছিল তার প্রমাণ মেলে গানে। বাংলা অসম অঞ্চলের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর গানে। সনাতন সমাজে অবস্থিত ধর্মীয় দর্শন নয়, সচেতন শ্রেণীর মধ্যে সর্ব ধর্মের সমন্বয়িক রূপ প্রতিভাত। বহু ঈশ্বরীয় ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়। তবে একদম র‌্যাডিকাল পরিবর্তন নয়। ধর্মের সমন্বয়ের চেষ্টা মনোমোহনকে তাড়িত করেছে।
লবচন্দ্র পাল তাঁর শিষ্য। আবার তাকে মনোমোহন শ্রদ্ধাও করতেন। তাই তাকে এক চিঠিতে মনোমোহন লিখেছেনÑ ‘তুই আমার গুরুতুল্য শিষ্য’। আর তার গানের রূপকার আফতাবউদ্দিন। মনোমোহনের সব গানের সুরকার আফতাবউদ্দিন। এরা ব্যান্ডদল নিয়ে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় চুক্তিতে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। বিশেষ করে সমবেত বাদন। তাদের জীবিকার একটি উদাহরণ নীরদচন্দ্র চৌধুরী (১৮৯৭-১৯৯৯)’র কথায় ফুটে উঠেছে। তাঁদের কিশোরগঞ্জের বাড়িতে একদিন বিয়ে হচ্ছিল। সেই স্মৃতির কথা বলেছেন- তিনি তাঁর ‘আমি একাধারে বাঙালি ও ইংরেজ’ শীর্ষক লেখায়। শারদীয় দেশ-১৩৯৭ (পৃষ্ঠা-১১০, আনন্দ পাব)-এর বিশেষ সংখ্যায়। উল্লিখিত লেখা থেকে অবশেষে উদ্ধৃত করছি :
“১৯৭০ সনের শেষে আমি আমার এক জ্ঞাতি সম্পর্কে ভাইপো’র বিবাহ দেখিবার জন্য পৈত্রিক গ্রাম বনগ্রাম যাই। ভাইপো হইলেও সে আমার অন্তত বারো বছরের বড় ছিল, আমার বয়স তখন সবে দশ হইয়াছিল, ভাইপো আমাদের শরীকের দিকের, তাহার বিবাহ অতিশয় ধুমধাম করিয়া হইতেছিল। অন্য আমোদ-প্রমোদের মধ্যে গান-বাজনার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র ভাই আফতাবউদ্দিকে আনা হইয়াছিল। তিনি বাঁশি বাজাইতেন এবং গানও শুনাইতেন। আমি আসরে বসিয়া তাহার মধুর বাঁশি বাজানো শুনিলাম। তিনি হঠাৎ বাঁশি বাজানো বন্ধ করিয়া এক হাতে বাঁশিটি ঘুরাইতে ঘুরাইতে গাহিয়া উঠিলেনÑ
পুরান কথা জাগাই দে-রে,
নতুন হইয়া উঠুক দেশে।
আমি পুরাতন কথাকেই নতুন বলিয়া প্রচার করিতেছি। উহা আমার কল্পিত কথা নয়।”৩
শ্যামাসঙ্গীত রচনার বংশপরম্পরা ঐতিহ্য ছিল মনোমোহনদের। পিতামহ বৈদ্যনাথ দত্তের রচনাÑ
কালী কালী বলে যে তার কিসে ভয়,
দীনহীন প্রতি যদি তব দয়া হয়।
তবে মা করিব পূজা মনে করি সার,
দরিদ্র হইলে বৃথা জীবন তাহার।
মানস করিয়া আছি মনে ভাবি দুঃখ,
কামনা করিলে পূর্ণ যাবে সব শোক।৪
এ অবস্থা থেকে অবশ্য মনোমোহনের গানের বিষয়বস্তুতে অনেকটা উত্তরণ হয়েছিল। যেমনÑ
যাবি যদি মন ফকির হাটা,
মুর্শিদাবাদ গিয়ে তবে, পরওয়ানা লও মোহর আটা।
ধরিয়ে পীরের কদম,
খেদমতে কর নরম
যতক্ষণ থাকে দম,
  ভুলনা সেই ঐ কথাটা ॥
. . . . . 
সার করিয়ে জঙ্গলা-ঝোপ
দিল দরিয়ায় মারলে ডুব
মনোমোহন কয় ছাড়লে লোভ
কিঞ্চিত পাওয়া যায় ফকিরির বাটা ॥৫
মনোমোহন দত্ত তার অধ্যাত্ম জীবন গড়েছেন ও সাধনা করেছেন সাধক মহাপুরুষ মহারাজ আনন্দচন্দ্র নন্দী (১৮৩২-১৯০০)’র শ্রীপদতলে। আনন্দ পরবর্তীকালে স্বামী উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর পিতা রামদুলাল নন্দী ত্রিপুরা মহারাজের দেওয়ান। তিনি প্রতিদিন ফুল দিয়ে মালা গেঁথে কালী প্রতিমাকে পরাতেন আর একটি করে সঙ্গীত রচনা করতেন। তাঁর রচিত মালসী গান জনসাধারণের নিকট প্রিয় ছিল। তার প্রিয় মালসী গান:
জানি না মা তারা, তুমি জান ভোজের বাজী
যেভাবে যে তোমায় ডাকে, তাতে তুমি হও মা রাজী।৬
কাজেই গান রচনার প্রভাব আনন্দ স্বামী পেয়েছেন পিতার কাছ থেকে। তিনি দেওয়ান থাকাকালে প্রচুর অর্থব্যয়ে সরাইল থানার কালীকচ্ছ গ্রামে একটি প্রাসাদ গড়েছিলেন। গুরু সেবায় তা উৎসর্গ করলে ত্রিপুরাধিপতি তাকে গুরুর বাড়ির কাছাকাছি আর একটি বাড়ি নির্মাণ করে দেন। এ বাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান। মনোমোহন কার কাছ থেকে জ্ঞান ও সঙ্গীত রচনার দীক্ষা পেলেন- সেই গুরুদেবের পরিচয় সমাজসেবা, সঙ্গীত সাধনা ও উদারতা জানলে মনোমোহনকে জানা হবে। সেই আলোকে এই নিবন্ধের অবতারণা।
নন্দী বংশের ইতিহাস সুপ্রসিদ্ধ। কালীকচ্ছ বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ গ্রাম। এদের পূর্বপুরুষের প্রধান ব্যক্তি মহীধর নন্দী। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে দুই’শ বছর আগে কালীকচ্ছে এদের আগমন। কাওলাত, জমিদার ও স্থানীয় বিচারক হিসেবে এদের অবদান রয়েছে। স্থানীয় অধ্যক্ষ দ্বিজদাস দত্ত মহাশয় প্রথম কৃষিবিদ্যা অর্জন করতে ইংল্যান্ডে যান। মহীধর নন্দীর পর রাজীন্দ্র নারায়ণ নন্দী ছিলেন কালীকচ্ছ নন্দী পরিবারের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। জলের জন্য দিঘী ও প্রার্থনার জন্য শিব প্রতিষ্ঠা তার অন্যতম কীর্তি। এই দিঘীর দুই পাড়ের পূর্বপাশে পুত্র শিবপ্রসাদ নন্দী ও গণপতি নন্দী পশ্চিম পাড়ে বাস করতেন। কালীকচ্ছে গণপতি নন্দীর বংশধরের উত্তর প্রজন্মের উত্তরাধিকারীগণ বিখ্যাত। বংশপরম্পরা এসেছেন সাধক শ্যামরাম নন্দী। বংশের পরবর্তী কালীসাধক রামদয়াল নন্দী। রাম দুলালের ষোলো বছর বয়সে পিতা শ্যামরাম নন্দী মারা যান। তার রচিত ধর্মসঙ্গীতে বিচিত্র তাল ও রাগরাগিণীর প্রভাব পরিলক্ষিত। তার প্রিয় ছিল রাগ-মালশ্রী। বাংলা, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতার জন্য তিনি মুন্সি উপাধি লাভ করেন। পূর্বেই বলেছি তিনি জমিদারির সময় বিশাল বাড়ি তৈরি করেন; কিন্তু ১৮৪৮ (১৬ বৈশাখ, ১২৫৪) সালে তাঁর গুরুকে সমস্ত সম্পত্তি দানপত্র করে দেন। ১৮৫২ সালে (২৪ অগ্রহায়ণ, ১২৫৮) তিনি কলকাতার ভাগীরথী তীরে গণ্ডশীলা (কণ্ঠে কর্কট) রোগে প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘদিন পর ১৮৯৩ (১৩০০) সালে স্ত্রী কাশীতে মারা যান।৭
তাদের পুত্র আনন্দচন্দ্র নন্দী চৌদ্দ বছর বয়সে দীক্ষা নেন। কুড়ি বছর বয়সে বেজুরা এলাকার কাশীনাথ চৌধুরীর কন্যা জয়দুর্গা দেবীর পাণি গ্রহণ করেন। তিনি বহুভাষাবিদ ছিলেন। তিনিও সঙ্গীত রচনায় পিতার উত্তরসূরি ছিলেন। কাজেই ১৮৯৭ (শ্রাবণ, ১৩০৩) সালে যখন মনোমোহন কালীকচ্ছে দীক্ষা নিতে আসেন তখন তাঁর সঙ্গীত প্রতিভা তাঁকে প্রভাবিত করে। তাঁর রচিত গানে ইমন-কল্যাণ, মালকৌশ, খাম্বাজ, রামপ্রসাদী সুর, জয়জয়ন্তী, বৃন্দাবনী-ভৈঁরো প্রভৃতি রাগে গান রচনা করতেন। এছাড়া ঐ সব গানে তিনি, ঠুমরী, রূপক, ডগরমালা, তেওট, যৎ, চৌতাল, কাওয়ালী তালগুলি ব্যবহার করেছেন। ১৮৭৮ (জ্যৈষ্ঠ, ১২৮৪) মাসে দুই কন্যার একজনকে কুমিল্লার গুরুদয়াল সিংহের সাথে এবং দ্বিতীয় কন্যাকে তৎকালীন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বিলেত ফেরত কৃষিবিদ দ্বিজদাস দত্তের নিকট বিয়ে দেন আনন্দ স্বামীর ছেলে ডা. মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী। উল্লেখ্য যে, কুমিল্লার পণ্ডিত অজয় সিংহ রায় গুরুদয়াল সিংহেরই বংশধর।
বাংলা ১২৩৯ সালের ১১ বৈশাখ আনন্দচন্দ্র নন্দী জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামদুলাল আরবি, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শেখার জন্য পুত্রকে শিক্ষক রেখে দেন। পনের বছর বয়সে আনন্দ একজন ভাষাবিদ ও সঙ্গীত বিশারদ হয়ে ওঠেন। এখনও কালীকচ্ছের এই বাড়িতে সন্ধ্যাবেলা সুরের জলসা বসে। সঙ্গীত, জ্ঞান ও ধর্মচর্চায় তিনি সিদ্ধহস্ত হন। ব্রাহ্ম সমাজের পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’ পাঠ করে সনাতনপন্থীদের মূর্তিপূজার প্রতি বিরাগ জন্মে। কলকাতা গেলে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪) ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। ১৮৬৬ সালে ঢাকায় পূর্ববাংলা ব্রাহ্মসমাজ মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন ভাই কৈলাসচন্দ্র নন্দীসহ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। ফিরে কালীকচ্ছে ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করে ধর্মে মন দেন। স্থানীয় সনাতনপন্থীদের বাধা ও বিরূপ সমালোচনাকে উপেক্ষা করে তাঁর সংগ্রাম এগিয়ে নেন।
কালীকচ্ছের আর একটি পরিবার। রাজপুতানা থেকে বঙ্গদেশে আসেন। এঁদের পূর্বপুরুষ মহারাণা প্রতাপের একজন সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। মহারাণার চিতোর হারানোর পর ত্রিপুরা মহারাজার সৈন্যদলে চাকরি নিয়ে বঙ্গদেশের সংস্কৃতি পুরোপুরি গ্রহণ করেছিলেন তারা। দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করায় মহারাজা মেঘনার বিস্তৃত চরাঞ্চলের জমিদারি তাদের দান করেন। সেই পরিবারের সন্তান বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ অজয় সিংহ রায় (২১ নভেম্বর, ১৯২০Ñ১৫ মে, ২০০০)। তাঁর পিতামহ কট্টর সনাতনপন্থী গুরুদয়াল সিংহ। তিনিই বিশিষ্ট সমাজসেবক গুরুদেব আনন্দ স্বামীজীর কন্যাকে বিয়ে করেন। বিদেশে যাওয়ায় তাঁকে মস্তক মুণ্ডন করে গোবর খাইয়ে শুদ্ধি করে ঘরে উঠানো হয়েছিল।
অজয় সিংহ রায়ের ঠাকুরদা গুরুদয়াল সিংহ, আর ঠাকুরমা কালীকচ্ছের আনন্দস্বামীর কন্যা গুণময়ী নন্দী। গুণময়ীরা ব্রাহ্মসমাজের হওয়ায় চটি পরে যখন শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম করেন সেই অপরাধে তাদেরকে ঐ পাল্কিতেই ফেরত পাঠাতে বলেন। চর অঞ্চলের জমিদার শ্বশুরের এই আদেশের বিরুদ্ধে কান্নাকাটি করেন শাশুড়ি। আর বিদেশ ফেরত নব্য শিক্ষায় শিক্ষিত পুত্র তার পিতার আদেশ পালন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্রাহ্মসমাজভুক্ত হয়ে স্ত্রীসহ কুমিল্লায় বাস করতে থাকেন। অজয়ের মাতৃকুল-পিতৃকুল উভয়েই ব্রাহ্মধর্মের লোক। পিতার নাম কমনীয় কুমার সিংহ। তিনি স্বদেশী আন্দোলনের সকল কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। মাতুল আনন্দস্বামীর পুত্র সমাজসেবক ডা. মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী। তাঁকে ‘টলস্টয় অব বেঙ্গল’ বলা হতো। কুমিল্লার মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য সৎ ব্যবসায়ী, দানবীর, পরোপকারী, সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাব্রতী। আনন্দস্বামীর প্রতিভায় মনোমোহন দত্ত যেমন আলোকিত, তেমনি পরিবারের সকল সদস্য ছাড়াও বঙ্গের বহু পরিবার তার আলোকে প্রভাবান্বিত হয়েছে। অজয়সিংহের পিতা কমনীয় সিংহ নয় বোনের তিনিই একমাত্র ভাই। অজয়ের পিসিমাগণ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। সবাই প্রায় নারী নয়, মানুষ। এদের প্রায় সবাই কুমারী। মেজ পিসিমা ক্ষণপ্রভা বিহারের গিরিডিতে ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সেজ পিসি নবনীতকোমল ফরিদপুর গার্লস স্কুলের শিক্ষক। সাত-আটবার স্বদেশী আন্দোলনের কারণে কারাবন্দী হয়েছিলেন। ছোট পিসি ‘প্রেমমালা’ উত্তরপ্রদেশ কানপুরের একটি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষা ছিলেন। এই কানপুরে লিভার ব্রাদার্সের চাকরি নিয়ে বিখ্যাত শিল্পী কে. মল্লিক (১৮৮৮-১৯৬১) এসেছিলেন। তিনি এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন। অতএব, কানপুর হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের তখন তীর্থক্ষেত্র। অজয়ের পিসি প্রেমমালা লক্ষেèৗয়ের উস্তাদদের নিকট ঠুমরী, গীত ও গজলের তালিম নিয়েছিলেন। তিনি কণ্ঠসঙ্গীত ছাড়া পিয়ানো, অর্গান, বাঁশি ও সেতার বাজাতে পারতেন। অজয়ের সঙ্গীত মানস তৈরি করতে এই পিসির অবদান অপরিসীম। কারণ মাতামহ আনন্দস্বামী ছিলেন অসাধারণ সঙ্গীতগুণী। কাজেই তার নাতি-নাতনি তো সঙ্গীতশিল্পী হবার যথেষ্ট পরিবেশ পেয়েছে। তাই মনোমোহনও শুধু ধর্মতত্ত্ব নয় জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় বিচরণ করে সাতমোড়ার অন্ধসমাজে আলোর আভা ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন।
মনোমোহন ছোটবেলায় শুনেছেন পিতৃব্য বসন্তচন্দ্র দত্ত কাইতলার জমিদারিতে চাকরি করতেন। সেই জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রোগের আরোগ্যের জন্য আনন্দস্বামীর নিকট তিনি যান। আনন্দস্বামী জানান তার রোগ ভালো হবে না উপরন্তু সাতমোড়ার গোপাল সাধুকে দেখা করতে বলেন। ঘনিষ্ঠতার এক সময়ে গোপাল সাধুও তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমন্ত্রণে আনন্দস্বামী সাতমোড়ায় এলে মনোমোহনের পিতা পদ্মনাথ দত্ত পিত্তশূল থেকে মুক্তি পাবার জন্য শিষ্য হন এবং তার ব্যবস্থানুযায়ী রোগমুক্ত হন।
ঐ সময় যখন মনোমোহনের তিন চার বছর বয়স তখন মা হরমোহিনী পুত্রকে নিয়ে সাতমোড়ায় আনন্দস্বামীর পদধূলি ও আশীর্বাদ নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য পিতার সাথে মনোমোহন কালীকচ্ছে এসেছিলেন। দারিদ্র্যের কারণেও লেখাপড়ার উচ্চদ্বারে পৌঁছুতে না পেরে ১৮৯৬ সালে পুনরায় মনোমোহন কালীকচ্ছে আসেন দীক্ষালাভের জন্য। গুরু সতের দিন থাকার নির্দেশ দিলেন। নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে তাকে নিয়ে। পুরনো চিন্তার মানুষ ধীরে ধীরে উদার মানুষ হতে যাচ্ছেন। ভেতরে ভেতরে পাল্টে যাচ্ছেন তিনি। তাই মনোমোহন লিখেছেনÑ
“আমি একজন নতুন মানুষ হইয়া পড়িয়াছি-কেবল ভাবনা, ঐ চিন্তা, ঐ আলাপ,....নূতন নূতন অলৌকিক লীলা দর্শন, নূতন নূতন ভাব সকলই আমার পক্ষে তখন নূতন ও অমিয়মাখা বোধ হইতে লাগিল।”৮
গুরুগৃহে উনচল্লিশ দিন কঠোর সাধনায় কেটে গেল। ঐ বছরই (১৩০৩ শ্রাবণ মাসে) তাঁর গান রচনার সূত্রপাত। কলমের ডগায় উঠে এলোÑ
নাথ তোমা বিনে এ ভব ভুবনে
  যত কিছু কিছু নয়,
তুমি মূলাধার সর্ব্ব সারাৎসার
  তুমি হে ব্রহ্মাণ্ডময়।৯
এভাবে কবিতার সাথে সাথে গান রচনা। ভাববাদী গানে সে সময় পুরনো কবিরা যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন-তার আধুনিক রূপকার রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০)। তারপর রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) ব্রাহ্মসমাজের জন্য প্রচুর পূজার গান রচনা করেছেন। পাশাপাশি ব্রাহ্মসমাজের কালীকচ্ছের এ কেন্দ্রে নয় পুরো ত্রিপুরা রাজ্যে সর্বধর্মের সমন্বয় করার উৎসাহ ও প্রেরণা পেলেন তারা। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৫৬) এর সার্থক উত্তরপুরুষ রবীন্দ্রনাথ। আর উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর (১৮৬৩-১৯১৫) পৌত্র সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২)। এভাবেই বংশপরম্পরা কয়েক পুরুষের প্রচেষ্টার ফসল একেকজন মহাপুরুষ। তেমনি কালীকচ্ছের উত্তরপুরুষ মহেন্দ্রনাথ নন্দী। তাঁর সম্বন্ধে আলোচনা না করলে মনোমোহনের গুরুকুলের এক মহামানবের কথা অজ্ঞাত থেকে যাবে। বিভিন্ন লেখক ও গবেষক মনোমোহনের কথা আলোচনা করতে গিয়ে ফকির আফতাব উদ্দীনের কথা আলোচনা করেছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে মনোমোহনের গুরুকুল নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। আর নন্দী পরিবারের মহাপুরুষ মহেন্দ্রনাথ আরও অন্ধকারে।
নানা সমস্যা নিয়ে মনোমোহন বেশ কয়েকবার কালীকচ্ছ এসেছেন। নানা অঞ্চলের মানুষের সাথে তাঁর ভাব বিনিময় হয়েছে। এ আশ্রমে দ্বারকানাথ, ফরিদপুরের প্রিয়নাথ দত্ত, চৌদ্দগ্রামের গিরিশ চন্দ্র চৌধুরী, হরেন্দ্রচন্দ্র দাশ যখন অবস্থান করেছেন তখন তিনি এখানে দীর্ঘদিন ছিলেন। গুরুমাতা জয়দুর্গার (আনন্দস্বামীর মা) পৌরহিত্যে তিনি উপাসনা করেছেন। এ তাঁর কাছে পরম পাওয়া। নবীনগড়ের জমিদার মোহিনী বাবু আনন্দস্বামীর শিষ্য। ১৩০৫ সালের আষাঢ় মাসে তাঁর আয়োজিত এক ধর্মসভায় মনোমোহন ভক্তগায়ক রামদয়াল মালী এবং হরিমোহনকে নিয়ে যোগ দেন। সেই ধর্মসভায় অন্যদের সাথে উপস্থিত ছিলেনÑ গুলমোহাম্মদ, কৃষ্ণশীল ও উদয় সরকারের মতো বিশিষ্ট সঙ্গীত সাধকগণ। আরও মনোমোহন আচার্য। এঁদের অনেকেই গুরু আনন্দস্বামীর শিষ্য। কালীকচ্ছে অনেকবার যাবার সূত্রে গুরুপুত্র পণ্ডিত ও সঙ্গীতজ্ঞ ডা. মহেন্দ্র নন্দীর সাথে তাঁর বহুবিধ আলাপ হয়েছে।
মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী অজয় সিংহ রায়ের মাতামহ। তিনি একজন সিতারী, সুরকার ও মিউজিকোলজিস্ট। যৌবনে কণ্ঠসঙ্গীতে তালিম নিয়ে কণ্ঠপীড়ায় আক্রান্ত হন। পরে যন্ত্রসঙ্গীতে তালিম নিতে শুরু করেন। প্রথম গুরু আয়েত আলী পরে ওস্তাদ আলাউদ্দীনের কাছে সিতারে তালিম নেন। গুরুভাই ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (২৪.০৪.১৯২২-১৯.০৬.২০০৯), পণ্ডিত রবিশঙ্করের চেয়ে অতিমন্দ্রসপ্তকে তান বাজাতে পারতেন। বন্ধু কুমিল্লার সুরেশ চক্রবর্তী (০৯.০৯.১৯১৫-২১.১১-১৯৮৬) ও নিহারবিন্দু চৌধুরীর সাথে ‘ওহসঁংরপধ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ ‘কালপুরুষের দর্পণে ও পূর্ব বাংলার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত’ গ্রন্থটি। সেখানেই কুমিল্লার ব্রাহ্মসমাজ ও কালীকচ্ছের নন্দী পরিবারের ইতিহাস তুলে ধরেন। পূর্ববঙ্গের সঙ্গীত ইতিহাস পূর্বে আর কেউ এতো বিস্তারিত তুলে ধরেননি।
এবার আসা যাক আনন্দস্বামীর পুত্র ডা. মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দীর কথায়। নীরদ সি, চৌধুরী (২৩.১১.১৮৯৭-১২.০৭.১৯৯৯) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ-’এ অটোবায়োগ্রাফি অব আননোদন ইন্ডিয়ান’এ মহেন্দ্র নাথের কথা বলেছেন। পেশায় ডাক্তার হলেও তাকে গান্ধীর (১৮৬৯-১৯৪৮) চেয়ে বড় সমাজসেবক হিসেবে তুলনা করেছেন। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর খ্যাতি দেশজোড়া। এ খ্যাতির বিড়ম্বনায় লোকজন বহুদূর হতে কখনো কখনো মরার পর লাশ নিয়ে হাজির হতেন। তাদের বিশ্বাস ডাক্তার মহেন্দ্র নন্দী তা ভাল করে দিতে পারবেন। তার চিকিৎসা ছিল স্বদেশী ও বিজ্ঞানমুখী। তিনি চিকিৎসা ছাড়াও দেশলাইসহ ক্ষুদ্রশিল্প তৈরির কারখানা খোলেন। এখানে হাত দা, বটি ও সুপারি কাটার জাতি বিখ্যাত ছিল। স্থানীয় তাঁতি ও কর্মকারদের সমবায়ে উদ্বুদ্ধ করেন। তার ধর্মমত- ‘সর্ব ধর্ম আশ্রম’। বেলা একটা থেকে তিনটা পর্যন্ত ঘণ্টা বাজিয়ে সর্বধর্মের লোকদের (৩০০/৪০০ জন) আহারে ডাকতেন। তিনি জীবিত কিংবদন্তী ছিলেন এখন তো মিথ। তার সঙ্গীত প্রতিভা ছিল কিংবদন্তীতুল্য। পিতার মৃত্যুর পর এটি আনন্দ আশ্রম হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। তখন পিতার প্রতিষ্ঠিত ‘দয়াময়ী’ সেøাগানটি তার প্রচেষ্টায় দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আর স্বামীজীর কর্ম, জীবন ও রচিত গান গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হতে থাকে। তার রচিত প্রথম গ্রন্থে ভূমিকা ছিল না। দ্বিতীয় গ্রন্থের ভূমিকায় পুত্র মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী যা বলেছেন, তা এখানে তুলে ধরছি-
‘এই সঙ্গীত বহির প্রথম সংস্করণের কোনো ভূমিকা দেয়া হয় নাই। সেই সময়ে ভূমিকা লিখিবার কথা আমার মনেও আসে নাই। কারণ এই সকল সঙ্গীত মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিযোগে প্রকাশিত হয় নাই; এই সকল সঙ্গীতের মধ্য দিয়া ঈশ্বরীয় বাণী জগতে প্রকাশিত হয়েছে। যাহারা এই সকল সঙ্গীত লিখিত হওয়ার সময় বাবার সম্মুখে বসিয়া দেখিয়াছে তাহারা আমাকে বলিয়াছে এই সকল সঙ্গীত লিখিবার সময় চক্ষু মুদিত করিয়া ধ্যানস্থ হইয়া থাকিতেন এবং চক্ষুর সাহায্য ব্যতিরেকেই তাহার হস্ত এই সকল সঙ্গীত লিখিয়া যাইত। এই সকল সঙ্গীতের কোনটাতেই তাঁহার নিজ নামের ভণিতা নাই বরং কোনো কোনো সঙ্গীত, তাঁহার যে কোনো শিষ্যকে উপলক্ষ করিয়া সঙ্গীতটা লিখিত হইয়াছি তাহার নাম ভণিতার মধ্যে আছে। এই সকল গানের অধিক সংখ্যক ১২৯১ সনে প্রাত্যহিক উপাসনার সময় লিখিত হইয়াছে। ১২৯১ সনের ২৮শে ভাদ্র উপাসনার সময় যে গান রচিত হইয়াছিল সেই গানটা এই বহির প্রথমে সন্নিবেশিত হইয়াছে। ইহার পূর্বে গান সকল প্রথম ভাগের শেষ অংশে লিখিত আছে। ১২৯১ সনে এইরূপে লিখিত উপাসনা এবং সঙ্গীতকে ‘সাধন তত্ত্ব’ নামে নিজেই নামকরণ করিয়া দিয়াছেন। এই সকল সঙ্গীত অধ্যাত্ম ঈশ্বরীয় যোগের সঙ্গীত কিঞ্চিৎ পরিমাণে ও যোগ যুক্ত না হইয়া কেবল ভাষা জ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তা দ্বারা বুঝিয়া লওয়া অসম্ভব। একটি গানেতে লিখা আছেÑ
‘কুশাগ্রীয় বুদ্ধি যারা ভ্রমেতে পড়িল তারা,
জানিল না বুদ্ধি হারা, হ’ল মা তোমার কারণে।’
(সর্বধর্ম গীত, ১ম ভাগের ১৫২ নং গান)
বিস্তৃত ভূমিকা লিখিয়া কাহাকেও এই সকল সঙ্গীতের মর্ম বুঝাইয়া দেওয়া অসম্ভব, সুতরাং ঐ চেষ্টা হইতে বিরত রহিলাম। নিজ জীবনে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি দ্বারা ইহাই বলিতে পারি যে নাম দ্বারা হৃদয় ঈষৎ উন্মেষিত হওয়ার পূর্বে এই সকল সঙ্গীতের মর্ম কিছুই বুঝিতে পারি নাই; এবং আমার মনে হয় নাম জপাদি দ্বারা ঈশ্বর প্রেম কিয়ৎ পরিমাণে লাভ না করিলে এই সকল সঙ্গীতের মর্ম কেহ বুঝিতে পারিবেন না।”
শ্রীমহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী১০
ডা. মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী সম্বন্ধে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী বলেছেনÑ
“As soon as I heard of Mahatma Gandhi and characteristic activities soon after his return from south Africa. I involuntarily recalled Mahendra babu.”১১
গান্ধীর স্বাদেশিকতা ও মহেন্দ্রর পার্থিব সমাজবাদের সঙ্গে পার্থক্য ছিল। মানিকতলার বোমা মামলার অশোকচন্দ্রের মৃত্যুর পরপরই নীরদবাবু তাকে যেভাবে দেখেছেন তা লিখেছেন এভাবেÑ
“At no time did I find him without his usual serenity. Yet his inner being was volcanic. It was swept, if I may say so, fiery typhon, which was his patriotism.”১২
সিলেটের বিশিষ্ট বিপ্লবী বিপিন চন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২) বলেছেন- ‘গান্ধীজি গধমরপ-এ বিশ্বাস করেন, কিন্তু মহেন্দ্র চন্দ্র খড়মরপ-এ।১৩ তাঁকে সবাই বাবা সম্বোধন করতেন। মহেন্দ্রচন্দ্র নিগৃহীতা, নির্যাতিতা, অবহেলিতা নারীদের শিক্ষার মাধ্যমে স্বনির্ভর, আধুনিক, প্রগতিশীল মানুষে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। বিদেশে থেকে আধুনিক যন্ত্র এনে তাঁত, ম্যাচ ও প্লাইউড তৈরির শক্তিচালিত যন্ত্র নিজের বাড়িতে বসিয়ে স্থানীয় লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। মহিলাদের এতে সম্পৃক্ত করেন। কৃষকদের সমবায় আন্দোলনে শরিক হবার আহ্বান করেন। উন্নত চাষ, যন্ত্র নির্মাণ, উন্নত বীজ, বণ্টন ব্যবস্থা, গবাদিপশুর উন্নতি সাধনে গোয়ালাদের সমবায়ে নিয়ে আসেন। ফকির আফতাব উদ্দিন, ওস্তাদ আলাউদ্দীন ও আয়েত আলীকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করে সর্বধর্মের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। এ থেকে তাদের গোষ্ঠী, পূজা ও নামাজ একসাথে করতে দ্বিধা করেননি।
বাবা আনন্দস্বামীর সমাধির পাশে বসে মানুষের কল্যাণ চিন্তা করতেন। কুটিরশিল্পে ও গ্রামীণশিল্পের প্রতি বিবি রাসেলের যে চিন্তা তার অগ্রপথিক তিনি। তাই নীরদ সি. চৌধুরী লিখেছেনÑ
“He was spending all his fortune in setting up machinery and workshops in his house. Whenever we went there we found to our intense interest and excitement, some machine or other working. For being rustics we had very little acqu