Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২৫ ১৪ই অগ্রহায়ন, ১৪২৫ ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
[আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার] 'স্বাধীনতা আমাদের স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছে'-স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন  

মোবাশ্বের হোসেন স্থপতি। তার চাইতেও বড় কথা সাংগঠনিক দক্ষতা তার অতুলনীয়। দেশে তো বটেই দেশের বাইরে এশিয়া, এমনকি কমনওয়েলথ দেশগুলোর স্থপতিদের সম্মিলিত সংগঠনের নেতা তিনি। সে সূত্রে পৃথিবীর বহু দেশে গেছেন, বহু সরকারপ্রধানের সঙ্গে মিশেছেন। তার বিশ্বাস বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই তার ভাগ্যে এসব জুটেছে। একাত্তরের রণাঙ্গনের লড়াকু গেরিলা যোদ্ধা  মি. মোবাশ্বেরের জীবন তাই আশা, স্বপ্ন আর কর্মে ভরপুর। যে মানুষটি একসময় ট্রাকে করে খাদ্যপণ্য পরিবহনের ব্যবসা করেছেন তার প্রতিষ্ঠিত আর্কিটেকচার ফার্ম ডিজাইন করেছে গ্রামীণ ব্যাংক ভবন, প্রশিকা ভবন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের মতো স্থাপত্য কর্ম। জীবন তাকে যশ, খ্যাতি, বৈষয়িক প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তিনিও দু’হাতে উজাড় করে ভালোবেসেছেন দেশকে।
নানামুখী চড়াই-উৎরাই পেরুনো মুক্তিযোদ্ধা ,প্রতিবাদী, স্পষ্টভাষী, বৈচিত্র্যময়, সংবেদনশীল, ক্রীড়া সংগঠক- এই মানুষটির জীবনকথায় যেমন চমক আছে তেমনি আছে বেদনাশীল রক্তক্ষরণ। এই বহুবর্ণা জীবনের নানা কথার ঝাঁপি খুলেছেন তিনি সাপ্তাহিক-এর সঙ্গে এক কথোপকথনে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শুভ কিবরিয়া

সাপ্তাহিক : আপনার ছোটবেলার কথা দিয়ে শুরু করি।
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন : জন্মের কয়েক বছর পরই আমার বাবা মারা যান। সুতরাং বুঝতেই পারছেন আমার ভবিষ্যৎ একটা অনিশ্চয়তায় মধ্যেই পড়ে যায়। আমার বয়স তখন আড়াই কি তিন বছর। আমার ছোট ভাই তখন মায়ের পেটে। আমিই বড়। নানার বংশ, দাদার বংশ- সব মিলিয়েই আমি বড় সন্তান।
সাপ্তাহিক : আপনার জন্ম কোথায়?
মোবাশ্বের হোসেন : ঢাকার ওয়ারিতে। আমার দাদা ছিলেন একজন কৃষক। প্রত্যন্ত একটা গ্রামের মানুষ হয়েও আমার দাদা তার সব ছেলেকে কেমন করে উচ্চশিক্ষিত করে তুললেন সেটা একটা বিস্ময়। সে সময় স্কুল ছিল আমাদের গ্রাম থেকে ৮ মাইল দূরে।
সাপ্তাহিক : এই গ্রামটা কোথায়?
মোবাশ্বের হোসেন : আশুগঞ্জে। এটা আমার কাছে একটা স্বপ্নের মতো বিষয়। আমাদের বাড়িতে এখন প্রায় ৮ জনের মতো পিএইচডি ডিগ্রিধারী মানুষ আছেন।
আমি আমার দাদাকে নিজের চোখে দেখেছি একেবারে নেংটি পরে কৃষিকাজ করতে। শ্রমিকদের সঙ্গে বসে একই সঙ্গে খেতে। অথচ তার ছেলেমেয়েরা সে আমলে সবাই মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। এজন্যই আমি বলি আমার দাদার চেয়ে বড় পিএইচডি ওয়ালা পৃথিবীতে আর কেউ নাই।
আমার বাবা, আমাদের এলাকায় প্রথম এম.এ পাস করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি নেন। আমার বাবার ছবি দেখেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপর মুন্সীগঞ্জে আমার নানার বাড়িতে টাইফয়েডে মারা যান।
সাপ্তাহিক : আপনার নানা কি করতেন?
মোবাশ্বের হোসেন : আমার নানা সেই আমলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ব্রিটিশ পিরিয়ডের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বড় চাকরি। নানার বাড়ি ছিল বগুড়ায়। আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন নানাকে জিজ্ঞাসা করেছি আচ্ছা, বগুড়া থেকে আশুগঞ্জে সেই আমলে কিভাবে মেয়েকে বিয়ে দিলেন?
আমার নানা এর উত্তর দিয়েছেন খুব মজার কথা বলে। তিনি বলতেন দেখ আমি যখন আমার মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে চিন্তা করেছি, আমি সবসময় খুঁজেছি, কোন পরিবারটা উপরের দিকে উঠছে। চেয়েছি সেই রকম পরিবার। আমি দেখলাম তোর দাদা মাঠে কাজ করা একজন কৃষক অথচ তার সব সন্তান লেখাপড়া করে। ঞযধঃ ধিং সু রহংঢ়রৎধঃরড়হ.
এখন বুঝি, আমার নানা কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। কেননা আমার দাদার পরিবারে এখন কতজন যে পিএইচডি আছে তা হিসাব করে বলতে হবে।
সাপ্তাহিক : আপনার বাবার পেশা কি ছিল?
মোবাশ্বের হোসেন : বাবা ফেনী কলেজে বাংলার অধ্যাপক ছিলেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে জয়েন করার কথা ছিল। জয়েন করতে পারেন নাই। জয়েন করার অব্যবহিত আগেই তার মৃত্যু হয়।
সাপ্তাহিক : আপনার মার কথা যদি বলেন।
মোবাশ্বের হোসেন : আমার মা সেই আমলের একজন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। কিন্তু ছিলেন ভীষণ রকমের স্বাধীনচেতা মানুষ। স্বামী মারা যাবার পর নিজের উপার্জনে ছেলেদের মানুষ করবেন বলে উনি নার্সিং পেশায় চলে যান। পরবর্তীতে উনি লন্ডনে যান। ৫০ বছর ওখানে থেকে আমাদের পড়াশোনার সমস্ত টাকাপয়সা যোগান দেন। ঞযধঃ রং ংড়সবঃযরহম বীপবঢ়ঃরড়হধষ.
সাপ্তাহিক : দাদার পরিবারের কথা যদি বলেন।
মোবাশ্বের হোসেন : আমার দাদার আগে বাবা মারা যান। ফলে তৎকালীন  দাদার সম্পত্তি আমাদের পাবার কথা নয়। কিন্তু আমি যখন ঢাকা কলেজে পড়ি তখন চাচারা আমাকে ডাকলেন। তারা শান্তিনগরে থাকেন। দেখি সেখানে চাচারা সবাই বসে আছেন।তারা বললেন, আমাদের জমিজমা ভাগ হবে, তোদের কোনগুলো হবে? আমি বললাম, তোমরা এটা কি বলছ! আইন অনুযায়ী আমরা  তো কোনো সম্পত্তিই পাই না। চাচারা বললেন, না, আমরা মনে করি তোদেরও পাওনা আছে। এবং আমার বাবা সেইভাবেই আমাদের তৈরি করেছেন।  তখন আমি বললাম, ঠিক আছে ভাগ করেন। চাচারা সমম্বরে বলে উঠলেন, যেহেতু তোর বাবা নাই, অতএব তোর পছন্দের জমি তুই নেয়ার পরই আমরা আমাদের অংশ নেব। এই ঘটনা আমার জীবনে আমাকে এক বিরাট প্রাপ্তি দেয়।
আবার দেখেন আমি কি সৌভাগ্যবান আমার নানার একটা সম্পত্তি ছিল ঢাকা শহরের গোপীবাগে। আজকে যার দাম প্রায় কয়েক কোটি টাকা । আমার নানা, মামা-খালাদের সবার সঙ্গে আলাপ করলেন । এক মামা পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন, জাতীয় অধ্যাপক আতাউর হোসেন, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য এবং অর্থনীতি দুটোরই বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। এক খালু ছিলেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, কর্নেল গিয়াসউদ্দিন। নানার পরিবারের সবাই ছিলেন উচ্চপদে কর্মরত। নানা বললেন, আমার এই দুই নাতির তো বাবা নাই, ওদের আমি এই সম্পত্তিটা দিয়ে যেতে চাই। সবাই সমম্বরে বললেন, কোনো সমস্যা নাই। এবং আমরা সেই সম্পত্তি নানার কাছ থেকে পাই।
সাধারণত আমাদের দেশে এইভাবে কোনো সম্পত্তি বিশেষত এরকম মূল্যবান সম্পত্তি পাবার পরে, যে পায় তার সঙ্গে বাকি পরিবারগুলোর বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। কিন্তু আমি হলাম সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিদের একজন, আমার মামা-খালা এখনো তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমার মতামত ছাড়া নেন না। তাদের সন্তানরা পর্যন্ত আমার মতামত ছাড়া এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। এটা আমার জীবনের একটা বড় প্রাপ্তি। সম্ভবত আমি নানার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা চেতনাকে আমার জীবনে ধারণ করে ব্যবহার করেছি। প্রত্যেক মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেছি। আপ্রাণ চেষ্টা করেছি সৎ এবং সত্য পথে চলার জন্য। সেটারই প্রাপ্তি হয়ত এসব।
সাপ্তাহিক : আপনার নিজের লেখাপড়া কোথায়?
মোবাশ্বের হোসেন : ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনে একবছর পড়েছি। এক বছর পড়েছি সিদ্বেশ্বরীতে। তারপর পড়ালেখার আপসেট হবার কারণে আমার নানা জোর করে নিয়ে যায় বগুড়াতে। বগুড়াতেই আমার পড়াশোনা। বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করি। আমার ছোট ভাই বগুড়া করোনেশন স্কুল থেকে পাস করে। একটা সময় এমন ছিল যে, আমি বলতাম আমার বাড়ি বগুড়া। কেননা বগুড়াতেই সারাবছর থাকতাম। বছরে একবার চাচাদের আমন্ত্রণে আশুগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে যেতাম। নানা নিজের ছেলেদের চেয়েও বেশি আদর দিয়ে আমাদের মানুষ করেছেন। মা তখন ঢাকা মেডিক্যালে নার্সিং পেশায় কর্মরত। আমরা দুই ভাই একসঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করি প্রথম বিভাগে। আমি খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। খেলোয়াড় হিসেবে নয়, সংগঠক হিসেবে।
এখন এই বয়সে এসে চিন্তা করি, যখন আমি কোনো কিছু অরগানাইজ করতাম আমি যা বলতাম আমার চেয়ে বয়সে বড় আমার মামা, খালুরা আমার কথা মেনে নিতেন। তখন কিছু বুঝি নাই। এখন যখন সংগঠক হিসেবে নানা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছি তখন বুঝেছি ছোটবেলায়ও আমার মধ্যে এমন কিছু ছিল যাতে বড়রাও আমার ওপর আস্থা রাখতে পারতেন।
 ঐ আমলে, ১৯৬০ এর দিকে, আমার নানা বগুড়াতে তার বিরাট বাড়ির একটা অংশকে ক্লাব বানালেন। কারণ তার ভাবনা ছিল, বাইরে থাকলে ছেলেমেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে নানার উদ্যোগে তার বাড়ির একটা অংশে আমরা একটা বড় ক্লাব বানালাম। সেই আমলে ১৯৫৮-৫৯ সালে সেই ক্লাবে ক্রিকেট থেকে আরম্ভ করে সব খেলাধুলা হতো। নানা তখন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে, চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। ডাকসাইটে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উনার খুব হাঁকডাক ছিল। আমার মনে আছে উনি যখন রেলস্টেশনে যেতেন, তখন টিকেট কাউন্টারে লাইন পড়ে যেতো। কেননা উনি মোবাইল কোর্টে যেতেন। রাস্তায় উনি সবসময় হেঁটে চলাচল করতেন, কোনো সময় রিকশায় চড়তেন না। উনার সঙ্গে চলে আমরা দেখেছি মানুষজন যেমন উনাকে ভয় করত তেমনি শ্রদ্ধাও করত। আমি মনে করি আমার জীবনে তার ছায়াটা সবচেয়ে বড়ভাবে এসেছে।
সাপ্তাহিক : আপনি বগুড়া থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকায় এলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : আমরা দুইভাই একসঙ্গে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। মা তখন আজিমপুরে থাকেন। স্কুল জীবন থেকেই আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমার ছোট ভাই ছিল পড়াশোনায় খুব ভালো।
সাপ্তাহিক : কোন সংগঠন করতেন?
মোবাশ্বের হোসেন : ছাত্র ইউনিয়ন। আমি সৌভাগ্যবানদের একজন, আমি যখন বুয়েটে পড়ি, আমার রুমে তখন মাথায় হুলিয়া নেয়া ছাত্রনেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ মাসের পর মাস থেকেছেন। কমরেড সাইফুদ্দীন আহমদ মানিকভাই বছরের পর থেকেছেন। পঙ্কজ দাকে দেখেছি। ঐ সময় ছাত্রনেতারা কেমন ছিলেন, সেটা আমার চেয়ে বড় উদাহরণ আর কেউ দিতে পারবেন না। রাত ১২টা পর্যন্ত উনারা ছাত্ররাজনীতি করতেন। রাত ১২ টার পর রাত ৩টা পর্যন্ত আমার রুমে বসে উনারা পড়াশোনা করতেন। সে সময়ের ছাত্রনেতা কমরেড সাইফউদ্দিন আহমদ মানিক পরীক্ষা দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার বিরুদ্ধে তখন হুলিয়া। রাত ১২ টার সময় তাকে আমরা স্কট করে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে আসতাম। উনি পরীক্ষা দিতেন। পরের দিন আবার রাত্রে ফেরত আসতেন। একদিন উনার পেছনে গোয়েন্দা লাগল। তখন কাঁটাবনের দিকে রেললাইন আর ড্রেন ছিল। উনি ওদিক দিয়ে দেয়াল টপকিয়ে পার হতে যেয়ে কাঁচ দিয়ে উনার পা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল। ঐ অবস্থায় উনি বুয়েটে আমাদের হলে এসে উঠেছিলেন। উনি থাকতেন আমার রুমে।
কমরেড ফরহাদ কিরকম উজ্জ্বল মানুষ ছিলেন তার একটা তথ্য দেই। তখন হুলিয়া মাথায় বুয়েটে আমার রুমে উনি থাকতেন। আমার রুমে একটাই বেড ছিল। উনাকে আমি কোনোদিন আমার বেডে শোয়াতে পারি নাই। এটা শুনতে হয়ত অবিশ্বাস্য লাগবে। উনি মেঝেতে শুতেন। কিন্তু কোনো দিন আমাকে আমার বিছানা থেকে সরতে দেন নাই। এই যে মানুষের মানবিক গুণ, তা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিত।
সাপ্তাহিক : আপনি ঢাকা কলেজে পড়তে এলেন কত সালে?
মোবাশ্বের হোসেন : ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলাম। ছাত্র রাজনীতিতে নামলাম। ইন্টারমিডিয়েটে দুই বছরের জায়গায় তিন বছর লাগল। ঐ সময় আমি ড্রয়িং করতাম। আমার ড্রয়িং পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছাপা হতো। স্টেটসম্যান পত্রিকায় ছাপত। এখানকার মতো তখন তো ঈদ কার্ড পাওয়া যেত না। আমি নিজে ঈদকার্ড বানিয়ে নিউমার্কেটে বিক্রি করতাম। ছবি এঁকেও কিন্তু সেসময় আমি ৫-৬ টাকা আয় করেছি। সেসময় এটা অনেক বড় টাকা!
ঢাকা কলেজে সেসময় কলেজ বার্ষিকী এবং স্পটলাইট নামে যে পত্রিকা বেরুতো তার কভার পেজ আমি তৈরি করেছিলাম। তখন শিক্ষাসপ্তাহ হতো। এসব চিত্রকর্মের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর অ্যাওয়ার্ড আমি পেয়েছিলাম জন্য।
সাপ্তাহিক : সে সময় সহপাঠী, শিক্ষক কারা ছিলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : সহপাঠীদের সবার কথা মনে নেই। তবে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি ছিলেন সহপাঠী। পুলিশের ডিআইজি হয়েছিলেন আবদুস সালাম তিনিও সহপাঠী ছিলেন। ও সময় শিক্ষক ছিলেন কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান। শওকত ওসমান স্যারের ক্লাস অসম্ভব ভালো লাগত। প্রথম দিনেই ক্লাসে এসে উনি বললেন ‘যব পলায়তি স জীবতি।’ বললেন, আমার ক্লাসে কাউকে অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হবে না, ক্লাস থেকে বের হবার জন্যও অনুমতি নিতে হবে না। যার যখন খুশি আমার ক্লাসে আসবা, ইচ্ছে হলে থাকবা, ইচ্ছে না হলে থাকবা না। পড়াশোনা কখনও জোর করে করানো যায় না। যখন তোমার নিজের সাধ জাগবে তখনই সেটা হবে। যে ক্লাস মিস করবা সেটা নিয়ে ক্লাসকক্ষের বাইরেও আলাপ করতে পারবা। এরকম অসাধারণ শিক্ষক পেয়েছিলাম আমরা।
আরেকটা মজার ঘটনার কথা বলি। আমাদের ঢাকা কলেজের অডিটরিয়ামে মেডিক্যাল কলেজের পরীক্ষা হতো। ওদের জায়গা কম থাকার কারণে। আবার পরীক্ষা হলে গার্ড দিতেন ঢাকা কলেজের শিক্ষকরা। একবার ছাত্ররা নকল করল। ঢাকা কলেজে কিন্তু নকল করার কোন সুযোগ ছিল না সংস্কৃতিও ছিল না। কেননা তখন ঢাকা কলেজ, নটর ডেম কলেজ ছিল আদর্শ কলেজ। নকল করা মানেই রাসটিকেট হওয়া। চিরতরে বহিষ্কার হওয়া।
পরীক্ষায় নকল করার কারণে ঢাকা কলেজের শিক্ষকরা মেডিক্যাল কলেজের কজন ছাত্রকে ধরে। এ নিয়ে ব্যাপক হাঙ্গামা, মারমিট হয়। ঢাকা কলেজের ছাত্ররা পরের দিন এই হাঙ্গামার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। তাদের দাবি কেন আমাদের শিক্ষকদের মারধর করা হলো। শওকত ওসমান স্যারসহ আরেকজন শিক্ষককে মারধর করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর ঢাকা কলেজের ছাত্ররা আন্দোলন করছে। বক্তৃতা দিতে উঠে এক ছেলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছে, আমাদের শিক্ষকের গায়ে হাত দেয় এত বড় সাহস! আমাদের টিচারকে যদি মারতে হয় আমরা মারব, বাইরের লোক মারবে কেন? আমাদের টিচারের গায়ে হাত তোলার কোনো অধিকার বাইরের লোকের নাই।
শওকত ওসমান স্যারের সঙ্গে পরবর্তীতে অনেকবার দেখা হয়েছে, স্যারকে এই গল্পটা আমি শুনিয়েছি। স্যার হো হো করে হাসতেন। স্যারের ছেলে ইয়াফেস ওসমান আমার বন্ধু ছিল। সেই সূত্রেও স্যারের সঙ্গে দেখা হতো। পরবর্তী জীবনে স্যারের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ একটা সম্পর্ক হয়েছিল।
সাপ্তাহিক : আপনি দুই বছরের জায়গায় তিন বছরে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলেন।
মোবাশ্বের হোসেন : হ্যাঁ, তিন বছর লাগল। আমি ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে গেলাম। ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। মেনোয়েম খানের আমলে তার বিরুদ্ধে নানারকম মিছিল মিটিং করেছি।
সেই সময় আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলেন জালালউদ্দিন স্যার। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান সাহেবের শ্বশুর। জালাল স্যার তার মেয়েদের নিয়ে কলেজের মেইন এন্ট্রি দরজার পাশেই তিনরুমে নিয়ে থাকতেন। জালাল স্যারের সঙ্গে কলেজের ছাত্রদের একটা বিরাট আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাদের সঙ্গে টেবিল টেনিস খেলতেন। উনি ইংরেজির টিচার ছিলেন।
ঢাকা কলেজে আমার একজন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন, ইংরেজির নোমান স্যার। তার কারণেই আমি রাসটিকেট হইনি।
সাপ্তাহিক : ঢাকা কলেজ থেকে পাস করে আপনি কোথায় পড়বেন এটা কি ঠিক করলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : আমার মামা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছিলেন। উনি বোঝালেন আর্কিটেকচার বলে একটা বিষয় আছে, তুই সেখানে পড়তে পারিস। তুই যেহেতু এত ভালো ড্রয়িং করিস, এত পুরস্কার পেয়েছিস তোর জন্যই আর্কিটেকচার। আর্কিটেকচার ভর্তি পরীক্ষার অনেক দেরি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসিতে ভর্তি হয়ে গেলাম। এটা ১৯৬৫ সালের কথা। ১০-১৫ দিন ক্লাস করেছি। ফজলুল হক হলে থাকতাম, আমার এক বন্ধুর রুমে।
তারপরে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বুয়েটে আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়ে গেলাম। এখানেও ইতিহাস আছে। অদ্ভুত ঘটনা। যা আগে কখনও ঘটেনি। আমি স্থাপত্য বিভাগে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি কিন্তু নির্বাচিত হই নাই। কিন্তু আমি এত দৃঢ় ছিলাম, যে কোনোভাবেই হোক বুয়েটে আর্কিটেকচারে পড়বই পড়ব। অথচ অ্যাডমিশন টেস্টে অ্যালাউ হলাম না। তখন আর্কিটেকচার এন্ড প্ল্যানিং ফ্যাকাল্টির ডীন ছিলেন রিচার্ড এডউইন ভ্রুম্যান (জরপযধৎফ ঊফরিহ ঠৎড়ড়সধহ) , আমি তার কাছে গেলাম। আমার ড্রয়িং বিষয়ে যত পুরস্কার ছিল, পত্রপত্রিকা ছিল সবসহ তার কাছে হাজির হলাম। আমি যেসব ড্রয়িং সংবাদপত্রে ছাপানোর জন্য পাঠাতাম সেখানে আমার নিজের নাম ব্যবহার করতাম না। যেহেতু আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম, সেজন্য ছদ্মনামে এসব ড্রয়িং সংবাদপত্রে পাঠাতাম। সংবাদপত্রে সেসব ড্রয়িং ‘অগ্রদূত’ ছদ্মনামে ছাপানো হতো। আমি ভ্রুম্যানকে যেয়ে বললাম, আমি এত ভালো ড্রয়িং করি, সংবাদপত্রে তা ছাপানো হয়, আমি কেন আর্কিটেকচারে ভর্তি হতে পারব না? ভ্রুম্যান বললেন, এগুলো তোমার করা? এখানে তো অন্য লোকের নাম লেখা। সৌভাগ্যবশত তখনকার ‘স্পটলাইটে’ সালাউদ্দিন জাকি আমার ড্রয়িংয়ের ওপার একপাতার একটা ফিচার লিখেছিল। সেখানে আমার নিজের ছবি ছাপা হয়েছিল। সেটাই আমাকে রক্ষা করল।

 উনাকে ওটা যখন দেখালাম তখন ভ্রুম্যান বললেন, ও ইউ আর মোবাশ্বের এন্ড ইউ আর ‘অগ্রদূত’। ওকে। আর ইউ রেডি টু সিট ফর এক্সামিনেশন? আমি উনার ইংরেজি কিছুই বুঝতেছি না। এখন যিনি প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান তিনি তখন উনার সামনে বসা। উনি ভ্রুম্যানের কথা বাংলায় অনুবাদ করে আমাকে সহযোগিতা করছেন। ভ্রুম্যান আমাকে বললেন, তুমি কি আবার পরীক্ষা দিতে রাজি আছ! আমি বললাম, হ্যাঁ। বললেন, তুমি আমার টেবিলে যেয়ে বস। বসলাম। আমাকে কাগজ, পেন্সিল, রাবার দিলেন। বললেন, ড্র এ নকশিকাঁথা। আধাঘণ্টা সময় দিলেন। আমি এঁকে যখন তাকে দিলাম, ওটা দেখে, সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি লিখলেন, অ্যাডিমিট হিম। এখনই একে আর্কিটেকচারে ভর্তি করে নাও। এটা ছিল বুয়েটের প্রশাসনিক নিয়মের ব্যত্যয়। তারপরও আমি ভর্তি হলাম। এই হলো বুয়েটে প্রবেশ করার ঘটনা।
সাপ্তাহিক : এ সময় আপনার মা কোথায়?
মোবাশ্বের হোসেন : আমার মা তখন লন্ডনে। আমি যখন ঢাকা কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি সে সময় উনি লন্ডনে চলে গেছেন। ওখানে চাকরি নিয়ে গেলেন। আমাদের দুই ভাইকে পড়াতে হলে তো টাকা দরকার। সেটা উপার্জন করার জন্যই উনি লন্ডনে চলে গেলেন। আমার মা অসম্ভব স্বাধীনচেতা মহিলা ছিলেন।
সাপ্তাহিক : বুয়েটের জীবন কেমন লাগল?
মোবাশ্বের হোসেন : একটা মজার ঘটনা বলি। আমি ভর্তি হলাম। বুয়েটের ইতিহাসে প্রথম বর্ষের কোনো ছাত্র হলের সংসদ নির্বাচনে জিতেছে এরকম ঘটনা নেই। আমি প্রথম বর্ষেই বুয়েটের আহসানউল্লাহ হলে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দাঁড়ালাম এবং জিতলাম। বুয়েটে ঢোকার পরই আমি ঘোষণা করলাম, আমরা ছাত্র ইউনিয়নের নাম দিয়েই নির্বাচন করব। তখন ‘ময়ূখ’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে নির্বাচন হতো। কাজী মোহাম্মদ শীশ, আবুল কাশেম এসব বড় ভাইকে নিয়ে বসে ঠিক করলাম ময়ূখ ছদ্মনাম ব্যবহার করে নির্বাচন করব না। ছাত্র ইউনিয়নের ব্যানারেই নির্বাচন করব। শুধু তাই নয়, সেবার আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের নির্বাচন হলো। রবিউল হুসাইন সাহেব নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন সাধারণ সম্মাদক হিসেবে। উনি তখন থার্ড ইয়ারে আর আমি ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র হিসেবেই দাঁড়িয়েছি রবিউল হুসাইন সাহেবের বিরুদ্ধে।  সেই আমলে রবিউল হুসাইন সাহেবকে সবাই  চিনত প্রখ্যাত ‘না’ পত্রিকার কবি হিসাবে।  তাকে পরাজিত করেই আমি জিতেছি।
আরও একটা ঘটনা বলি। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গানের আয়োজন হবে। আমাকে মাফ করবেন, ইতিহাসের ঘটনা বর্ণনার খাতিরে আমি এই ঘটনাটি বলছি। আমরা তখন সাবিনা ইসয়ামিনের বাসায় গিয়েছিলাম। সাবিনা ইয়াসমিন তখন অল্প বয়সের। তাকে আমাদের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য আনতে চাইলাম, উনার মা বললেন কিছু খরচ তো দিতে পার। ওকে গান শেখানোর জন্য টাকা লাগে। আমার আজও মনে আছে আমরা তাকে আনা নেয়ার জন্য খুব অল্প  টাকা খরচ করি। উনি তখন উঠতি গায়িকা। আমাদের অনুষ্ঠান মাত করে ফেললেন গান গেয়ে। তখন নামি-দামি শিল্পী ছিলেন আব্দুল জব্বার। আব্দুল জব্বারে সঙ্গে আমরা বসলাম। তিনিই আমাদের নানা আর্টিস্ট ঠিক করে দিলেন। পরে শিল্পী আব্দুল জব্বার, শিল্পী খন্দকার ফারুক আহমদের সঙ্গে আমার দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। শিল্পী খন্দকার ফারুক আহমদের বড় ভাই ছিলেন ঢাকা কলেজে আমাদের ইংরেজির শিক্ষক।
আরেকটি ঘটনা। আমি ছাত্রজীবনে রেডিওতে নিয়মিত গিটার বাজাতাম। সে আমলে ৫০ টাকা সম্মানী পেতাম। আমার শিক্ষক ছিলেন ওস্তাদ জমিরউদ্দিন। সত্যি কথা বলতে কি আর্কিটেকচার পড়তে গিয়ে কাজের চাপে এই চর্চাটা আর ভালোভাবে করা হয়নি। বগুড়াতে থাকাকালিন রাজশাহী বেতারে গিটার বাজাতাম। বুয়েটে প্রথম বর্ষে কিছুদিন রেডিওতে যেতাম এবং হলে কালচারাল সেক্রেটারি নির্বাচিত হবার পেছনে এই পরিচয়টাই মূলত কাজে লেগেছে। কারণ হলো নির্বাচনের আগে ইলেকট্রিক গিটার বাজিয়ে সবাইকে মাত করতে পেরেছিলাম। সে কারণে ভোট পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
সাপ্তাহিক : সে সময় বুয়েটে ভিসি কে ছিলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : ড. রশিদ। দ্যা জায়ান্ট। তখন কেবল বুয়েট হয়েছে। আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট করার জন্যই দুবছর আগে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বুয়েট করা হয়েছে।
সাপ্তাহিক : পড়াশোনা শেষ করলে কবে?
মোবাশ্বের হোসেন : পড়াশোনা শেষ হবার কথা মুক্তিযুদ্ধের একবছর আগে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কারণে আমরা এক বছর পিছিয়ে গেলাম। ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে আমি, ইয়াফেস ওসমান তখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্র ইউনিয়নের মিটিংগুলো তখন আমার রুমে হতো। কারণ আমাদের প্রত্যেক ছাত্রের জন্য একটি করে বেড বরাদ্দ ছিল। বুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য ড. রশীদ সাহেবের দুই ছেলে বুয়েটে পড়ত। তারা বাসায় থাকত। কিন্তু তাদের নামে আমি বেড বরাদ্দ করিয়েছিলাম। ফলে এক সময় তিন বেডের রুমে আহসানউল্লাহ হলে আমি একা থাকতাম। সেসময় ইয়াফেস ওসমানকে আমরা ছাত্র ইউনিয়ন থেকে বুয়েট ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচন করি। ইয়াফেস ওসমান বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদে একজন প্রতিমন্ত্রী।
আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় বিয়ে করি। চেনা জানা, ভালোবাসা থেকে বিয়ে। আমার গিন্নি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করে। আমি যখন ঢাকা কলেজ থেকে বেরিয়েছি তখনই আমাদের পরিচয় হয় এবং আমরা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলি। আমার চেয়ে বয়সে দু’এক বছরের বড় হবেন আমার গিন্নি ।
সাপ্তাহিক : সে সময় এরকম অ্যাফেয়ার বা প্রেম সমাজে গ্রহণ করাও তো কঠিন ছিল?
মোবাশ্বের হোসেন : হ্যাঁ। মেয়ে বয়সে বড় আর ছেলে বয়সে ছোটÑ এরকম প্রেম সচরাচর দেখা যেত না। উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে থাকতেন। আমার কারণে তার হলের সিট চলে যায়। তার অপরাধ, আমি তার সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের আগে হলে দেখা করতে গিয়েছিলাম। হল কর্তৃপক্ষের কথা, কেন একজন পুরুষ, লিস্টে যার নাম নাই, নির্দিষ্ট সময়ের আগে দেখা করতে আসবে? এ কারণে হলের প্রভোস্ট আমাকে ডেকে অনেক কিছু বললেন। যা হোক হল থেকে তার সিট চলে গেল। তিনি বাড়িতে (বগুড়া) চলে গেলেন। বগুড়াতেই তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তার শিক্ষাজীবন থেকে এক বছর ড্রপ হলো। তিনি সাধারণ ইতিহাস বিভাগে পড়তেন। তারপরে আমি যখন বুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি তখন তাকে বিয়ে করে নিয়ে আসলাম। উনি তখন মাস্টার্সের ছাত্রী। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার কলেজের ছাত্রীবাসে উনার জন্য একটা সিটের ব্যবস্থা করা হলো। উনি ওখানে থেকে দ্বিতীয় বিভাগে মাস্টার্স পাস করলেন।
আমি তখন বুয়েটের হলে থাকতাম। আর মাঝেমধ্যে আমাদের গোপীবাগের বাসাতেও থাকতাম। গোপীবাগে নানা আমাদের যে বাড়ি দিয়েছিলেন তার একটা অংশ ভাড়া ছিল এবং একটা অংশে থাকার ব্যবস্থা করি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অব্যবহিত আগে, আমি তখন ফাইনাল ইয়ারে ছাত্র, এ সময় ওখানে আমার স্ত্রীকে নিয়ে রাখার ব্যবস্থা করি। আমার শাশুড়ি এসে থাকতেন তার সঙ্গে।
সাপ্তাহিক : সে সময় আপনার ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার কি অবস্থা?
মোবাশ্বের হোসেন : এখানে সে বিকম পর্যন্ত পড়ে। তার পরে মায়ের সঙ্গে লন্ডনে চলে গিয়েছিল। লন্ডনে সে চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যানসি পড়ে। এখন লন্ডনে বিখ্যাত চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট। সে ব্রিটেনের ভ্যাট ট্রাইব্যুনালের একজন সদস্য। এটা সাধারণত এক টার্মের বেশি কেউ থাকে না। অথচ আজ পর্যন্ত পনের বছর ধরে একটানা সে ব্রিটিশ ভ্যাট ট্রাইব্যুনালের সদস্য। এটা অত্যন্ত সম্মানিত একটা মনোনীত পদ। ও এখন ব্রিটেনে নামি-দামি লোক কিংবা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট বিষয়ক বিচার করে। কিছুদিন আগে ফোন করে বলল আমি এখন ‘এনরোন’-এর বিচার করছি। সম্প্রতি সে বৃটেনের ট্যাক্স ট্রাইব্যুনালেরও সদস্য হয়েছে। তার নাম মোদাচ্ছের হোসেন। বিয়ে করেছে একজন সুইস মেয়েকে।
তার বিয়ে নিয়েও এক মজার ঘটনা আছে। আমার ভাইয়ের পছন্দ অনুযায়ী ঐ সুইস মেয়ের সঙ্গে বিয়ের সব ঠিক। হঠাৎ আমার কাছে মেসেজ আসল মেয়ের পরিবার মুসলমান ছেলের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেবে  না। কারণ, সুইজারল্যান্ডে মেয়েদের গ্রামের বাড়িতে তারা একটা ছবি পেয়েছে যেখানে একজন মুসলমানের চারজন স্ত্রীর ছবি আছে। অতএব আমার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে মেয়ের পরিবারের কেউ রাজি না। পরবর্তীতে আমি ঐ মেয়েকে বললাম, তুমি বাংলাদেশে এসে আমাদের পরিবারের সঙ্গে থাক। আমাদের আত্মীয়স্বজন সবাইকে দেখ। মেয়ে বাংলাদেশে আসল।
আমাদের বাসায় রাখলাম। আত্মীয়স্বজন সবাইকে দেখালাম। আমার এক আত্মীয়ের দুই বউ ছিল। তার সঙ্গেও পরিচয় করালাম। আমার ঐ আত্মীয়ের প্রথম স্ত্রী খুবই অসুস্থ ছিলেন। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়েই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। তাকে এ ঘটনা জানিয়ে বললাম, তোমাদের ওখানে একজন পুরুষ এরকমভাবে দ্বিতীয় বিয়ে হয়ত করতে পারবে না, কিন্তু শতজন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবে। এটাই হলো পার্থক্য। এসব দেখে মেয়েটি ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে তার বাবা-মাকে রাজি করান। তারপর বিয়ে হয়। আমি আমার এই ভ্রাতৃবধূর জন্য গর্বিত। বিদেশি বউ এবং তাদের পরিবার যে এত ভালো হতে পারে এটা আমার ভাইয়ের বউকে না জানলে বুঝতে পারতাম না। আমার ভ্রাতৃবধূ যে কোনো বাঙালি বউয়ের চেয়ে কম ভালো নন। তিনি অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ, বন্ধুবৎসল, মানবিক মানুষ।
সুইজারল্যান্ডের বিলটন বলে কৃষকদের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে ওর বাবা-মা বসবাস করেন। আমি সেখানে গেছি। ওরা যে কত ভালো তা না দেখলে বোঝা যাবে না। ওই গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবার বসবাস করে। এ গ্রামেই আমার হয়েছে এক অভিজ্ঞতা।  বিলটন গ্রামের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাপ হলো। সদ্য সমাপ্ত তার অফিস ভবন স্থপতি হিসাবে আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন। এর ফাঁকে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,আমরা শুনেছি তোমাদের প্রতি গ্রামে-শহরে পারমাণবিক আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শেল্টার  আছে। তোমাদের গ্রামেও আছে নাকি? থাকলে আমাকে অনুগ্রহ করে দেখাও না। অনেক অনুরোধের পর গ্রামের অনেকের সঙ্গে আলাপ করে আমাকে অনুমতি দেয়া হলো, এক শর্তে । পারমানবিক শেল্টারের ভেতরে তোলা ভিডিও আমি কাউকে দিতে পারব না। এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মাটির নিচে পাহাড়ের ভেতর ৩০০ পরিবারের থাকার জায়গা, আধুনিক হাসপাতাল, রেডিও স্টেশন, খাবারের স্টক (নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়), ডি-কন্টামিনেশন সেন্টার, খেলাধুলার প্রশস্ত স্থান, এমনকি গাড়ি রক্ষা করার জন্য বিশাল পার্কিং। কনক্রিটের দরজা বন্ধ করে দিলে বাইরে থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। মাটির নিচে সে এ বিশাল ব্যাপার ।
সাপ্তাহিক : আবার আপনার জীবন কথায় ফিরি। আপনার লেখাপড়া শেষ দিকে এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো?
মোবাশ্বের হোসেন : এর ভেতরে আমার মা লন্ডন থেকে দেশে এলেন। তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দেয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছোট ভাইকে নিয়ে মা ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন। তখন এয়ারপোর্টের ইনচার্জ ছিলেন উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার। তিনি মা’র আপন ফুফাত ভাই। উনার চেষ্টায় ভায়া করাচি হয়ে মা লন্ডনে গেলেন। আমাদের নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টাও করলেন। ততদিনে আমার প্রথম সন্তান জন্মেছে। গোপীবাগের বিরাট বাড়িতে তখন আমার স্ত্রী শিশুসন্তান নিয়ে একলা থাকছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার কারণে আমার শাশুড়ি বগুড়া চলে গেলেন। এর মধ্যে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলাম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার গ্রুপে। ঢাকায় অপারেশন করলাম। গোপীবাগের বাড়িতে নিয়মিত অসংখ্য অস্ত্রশস্ত্র থাকত। আমি কিন্তু ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নেইনি। বাংলাদেশেই থেকেছি, বাংলাদেশের ভেতরেই ট্রেনিং নিয়েছি। সেক্টর-২ এর অধীনে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে আমরা ট্রেনিং নিই। আমার সঙ্গে ট্রেনিং নেন বর্তমানে প্রখ্যাত স্থপতি মোস্তফা আমিন বাবুল।
সাপ্তাহিক : মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির কথা বলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : কত স্মৃতি। ট্রেনিং শেষে ঢাকার অদূরে যখন এলাম তখন তো আমরা অধিকাংশ সময় ক্যাম্পেই থাকতাম। একটা স্মৃতির কথা বলি। সে সময় প্রায় দিনই আমি গোপীবাগের বাসায় আসতাম। শিশুসন্তানটি আমার একটা বিরাট লাইসেন্স ছিল, লোকসম্মুখে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা না প্রমাণ করার। কারণ, আমার পাশের বাড়িতেই লে. জে. নিয়াজি প্রায়ই আসতেন। আমার বাসার সন্নিহিত এক বাসায় দুই পরিবার ছিল গোঁড়া মুসলিম লীগের সমর্থক। তাদের বাসায় নিয়াজি আসতেন। সেখানে নানারকম অনুষ্ঠান হতো, আসর বসত। আমি ক্যাম্প থেকে গোপীবাগের বাসায় আসলেই আমার শিশুসন্তানকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতাম। এটা ছিল ভান। সবাইকে দেখানো যে, এরকম শিশুসন্তানকে নিয়ে আমার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া সম্ভব না। আমি বাসায় আসলে আমার স্ত্রীকে বলতাম বিরিয়ানি বানাও। আর কোনো দিন খাওয়া হবে কিনা জানি না?
সাপ্তাহিক : সে সময়ের কোনো উল্লেখযোগ্য স্মৃতি যদি বলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : সে সময় আমরা ঢাকা শহরে একটা বিরাট অপারেশন করব। আমেরিকান সেন্টার (ইউসিস বিল্ডিং)সহ কয়েকটা অপারেশন করা হবে। গোপীবাগে আমার বাসায় অস্ত্র নিয়ে আসা হবে। এখন রেললাইনের ওপারে যেটা বিশ্বরোড ১৯৭১ সালে সেটা ছিল পুরা গ্রাম। গ্রাম থাকার কারণে ওপারে মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত অনেক সহজ ছিল। তখনকার রেললাইন এখনকার বিশ্বরোডের ওপরে ছিল পাকিস্তানি আর্মিদের চেকপোস্ট। সে সময় ঢাকা শহরে অস্ত্র গোলাবারুদ ঢোকাতে হলে যাত্রাবাড়ীর মানিকনগরের এসব গ্রামাঞ্চল দিয়েই আনা হতো। গোপীবাগ রেলগেট পর্যন্ত আমার এক বন্ধুর গাড়ি দিয়ে অস্ত্রগুলো আনার কথা। রাস্তার অপর পাড় পর্যন্ত অস্ত্র নিয়ে আসা হয়েছে কিন্তু যানবাহন ও অন্যান্য সুযোগের অভাবে শহরে ঢোকাতে পারছি না। আমার আজও মনে আছে সে সময় হেঁটে হেঁটে একবার গোপীবাগের বাসায় যাচ্ছি দেখতে যে, গাড়িটা আসছে কিনা? আবার ঐ জায়গায় যাচ্ছি।
হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে ১০ কি ১১ বছর বয়স হবে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলে, ‘স্যার কিছু আনন লাগবে?’ আমি তখনও তার কথার অর্থ কিছু বুঝিনি। সে আমার পেছনে হাঁটছে আর কিছুক্ষণ পরপর বলছে স্যার কিছু আনন লাগবে, কিছু আনন লাগবে? এরপরে দেখা গেল আমার যে বন্ধুর গাড়ি নিয়ে আসার কথা সে আসেনি। আমাকে অস্ত্রগুলো নিয়ে আসতে হবে। ঐ কিশোর ছেলেটি যাকে আমি জানি না, চিনি না তার ওপর বিশ্বাস করতে হবে। আমি তখন তাকে বললাম, হ্যাঁ, কিছু আনতে হবে। তখন আমি ডেসপারেট, যে কোনো প্রকারেই হোক অস্ত্র আমার বাসায় আনতেই হবে। কেননা মাত্র দুদিন পরেই আমাদের অপারেশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা আছে। তখন তো বাস্তবের অনেক অঙ্ক আমরা কষতাম না। তখন আমাদের একটাই লক্ষ্য, যেটা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করতেই হবে। কিভাবে সেটা করা যাবে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত যখন নেয়া হয়েছে তখন যে কোনো উপায়েই হোক বাস্তবায়ন করতেই হবে।
যা হোক আমি ঐ ছেলেটাকে নিয়ে আমার বাসা চিনিয়ে দিলাম। আমার অস্ত্রের ভাণ্ডার দেখিয়ে দিলাম। ঘণ্টাখানেক পরে দেখলাম একটা ব্যাগের মধ্যে ডাঁটার শাকের মাথা বের হয়ে আছে, আর ও ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাংলা সিনেমার গান গাইতে গাইতে, মানিকনগর থেকে ব্যাগের মধ্যে অস্ত্র নিয়ে দুবারে আমার বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেল। আজ পর্যন্ত আমি ঐ ছেলেটাকে খুঁজছি। কিন্তু মানিকনগরের ঐ মানিককে আজো আমি খুঁজে পাইনি।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা অনেক বাগাড়ম্বর করি। কিন্তু এই ছেলেটির মতো লোকদের অবদানের কথা বলি না। আমার নিজের মুক্তিযুদ্ধে যে অবদান তার শতগুণ করলেও এই ছেলেটির অবদানের সমান হবে না। ছেলেটির এই যে সাহস, আমার মনোভাব পড়তে পারার তার যে গুণ এবং নিঃস্বার্থভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসম্ভব বীরত্বের এই যে কাজটি করা, তার তো তুলনা হয় না। আমি নিশ্চিত আমার মতো অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সে এভাবে সহায়তা করেছে।
আমার আজো মনে আছে, কাঁধের ভেতরে ব্যাগে শাকের আঁটির মধ্যে আমাদের কিছু এক্সপ্লোসিভ, দুটো স্টেনগান নিয়ে সে বাংলা ছবির ‘সে যে কেন এলো না আমার কিছু ভালো লাগে না’ এই গান গাইতে গাইতে দু’তিনবার আমার বাসায় পৌঁছে দেয়। এরপর তাকে আর কোনোদিন দেখিনি। মাঝেমধ্যে মনে হয় সে কি মানুষ ছিল নাকি অন্য কিছু?
এই স্মৃতিগুলো আমি ভুলিনি কখনো। এই স্মৃতিগুলোই আমাকে সাহস জোগায় সৎ চিন্তা করতে, সৎ পথে থাকতে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্টেনগান কাঁধে আমার নিজের এই ছবিটা সবসময় আমার টেবিলের পাশে রাখি। অনেকে বলেন এই ছবি কেন এখানে রাখেন! আমি এই ছবিটা এখানে রাখি তার একটি মাত্র কারণ, আমার যেন পদস্খলন না হয়, প্রতিক্ষণে এই ছবিটা যেন আমাকে পাহারা দেয়।
সাপ্তাহিক : আর কোনো স্মৃতি?
মোবাশ্বের হোসেন : মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া আর আমাকে হঠাৎ একদিন একটা গ্রামে দাওয়াত দিল। দুজনকে আমরা সঙ্গে নিলাম। তারা অস্ত্রসহ আমাদের সঙ্গে গেল। কেননা তখন মাঝেমধ্যে রাজাকাররা গ্রামে আক্রমণ করে। আমি আর মায়া গ্রামের এক বাড়িতে গেলাম। দেখি বাড়িতে বড় বড় কৈই মাছ, পোলাউ মাংস রান্না করে সাজানো আছে। অত বড় কৈ মাছ আমি আর জীবনে কখনো দেখিনি। অনেক মানুষ সামনে জড়ো হয়েছে। আমরা খেতে বসে বললাম, বললাম আপনারাও খান। তখন আমাদের আমন্ত্রণকারী বলে উঠলেন, না, আপনারা খাবেন, আপনাদের খাওয়া দেখার জন্য এতগুলো লোক এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ানো হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধারা খাচ্ছে, সেটা দেখার জন্যই এতগুলো লোক এতক্ষণ ধরে বসে আছে। কিছুতেই কাউকে খেতে রাজি করা গেল না। তারা অদ্ভুত ভালোবাসা নিয়ে, অন্তরের নিগূঢ় মমতা নিয়ে আমাদের খাওয়া দেখতে লাগল। এই স্মৃতি প্রতিনিয়ত আমার মাথায় আঘাত করে।
আরেকটি হাসির ঘটনা বলি। সিদ্ধিরগঞ্জের দিকে রাস্তা দিয়ে পার হয়ে আমরা একদিন শীতলক্ষ্যা নদী পার হব। মাঝপথে নৌকা ফুটা হয়ে গেল। নৌকায় প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে। আমরা ঢাকার দিকে আসছি। এটা বোধহয় ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষে অথবা ডিসেম্বরের প্রথম দিকের ঘটনা হবে। আমাদের নৌকা ডুবে যাচ্ছে। আমরা অস্ত্র গোলাবারুদ বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছি। শেষ মুহূর্তে নৌকাটা কোনোরকমে নদীর পাড়ে এসে ভিড়েছে। নৌকা ডুবে যাচ্ছে আর আমরা অস্ত্র নিয়ে নৌকা থেকে নামছি। নদী পাড়ে যেখানে হাত দিচ্ছি সেখানেই মানুষের গু। এটা আমাদের একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
তখন আমরা মাঝরাতে কোনো বাড়িতে উপস্থিত হলে, গ্রামবাসীরা তাদের নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলাম। গ্রামে মহিলারা বাড়ির ভেতরে তাদের নিকটতম পুরুষ আত্মীয়দের দেখলে এত বড় বড় ঘোমটা দিচ্ছে। অথচ আমরা এত বড় বড় জোয়ান পুরুষ, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাড়ির ভেতর ঘোরাফেরা করছি, তাদের চলাফেরা স্বাভাবিক। কোনো জড়তা বা লজ্জা নেই। ভাবটা এরকম যে আমরা ওখানে উপস্থিত নেই। যেন আমরা ঘরের মানুষ। অথচ ভাশুর আসার সঙ্গে সঙ্গেই মহিলারা এত বড় ঘোমটা দিচ্ছে। এটা লক্ষ্য করে আমি একদিন জিজ্ঞাসা করে ফেললাম। তারা উত্তর দিলেন, আপনারা তো মুক্তিযোদ্ধা, আপনারা তো ফেরেশতা। আপনাদের দেখে লজ্জা পাবার তো কিছু নেই। এ যে স্মৃতি, অসাধারণ সব অনুভূতি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ মানুষের এ ভালোবাসাই আমাদের যুদ্ধ জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
আমরা মনে করি আমরা দু’চারজন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করে, জিতে বাংলাদেশ স্বাধীন করে এনেছি। এটা একদম ঠিক নয়। বরং মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে সাধারণ মানুষের যে ভালোবাসা, সমর্থন, সহযোগিতা ছিল তা মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তির চেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তির কারণেই কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পেরেছে। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারাই মনে করেছে আমরাই শুধু মুক্তিযোদ্ধা, বাকি দেশবাসীকে মুক্তিযোদ্ধা মনে করিনিÑ সে কারণেই বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হয়েছে। বাংলাদেশকে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে।
সাপ্তাহিক :  সেক্টর-২তে মেজর খালেদ মোশাররফ বা মেজর হায়দারের সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে?
মোবাশ্বের হোসেন : হায়দার ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। খালেদ মোশাররফের সঙ্গে হয়নি। তখন সেক্টর-২ এর এক গ্রুপ গেরিলা ছিল সাভারের দিকে। আর আমরা ছিলাম সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায়।
যাত্রাবাড়ীতে দুই পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পের মধ্যে একবার আমরা গোলাগুলি লাগিয়ে ভেগে গেলাম। ওরা সারারাত নিজেরা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি চালাল।
সাপ্তাহিক : ইউসিস বিল্ডিং অপারেশন তো একটা বড় ঘটনা। সেটা যদি একটু বিস্তারিতভাবে বলেন।
মোবাশ্বের হোসেন : আমেরিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সরাসরি বিরোধিতা করেছে। এ কারণে আমাদের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আমেরিকান সেন্টার বা ইউসিস (টঝওঝ) বিল্ডিং ব্লো করে প্রমাণ করতে হবে যে মুক্তিযোদ্ধারা আমেরিকার ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। এই বিল্ডিং উড়িয়ে দেবার দায়িত্ব দেয়া হলো আমাকে। এই বিল্ডিং তখন ছিল সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গায়। এখন যেখানে সচিবালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (তখন সম্ভবত জেলা প্রশাসকের অফিস ছিল) সেখানে আর্মি ক্যাম্প ছিল। দুই বিল্ডিংয়ের ওপরে সার্বক্ষণিক মেশিনগান নিয়ে পাহারা দিত পাকিস্তান আর্মিরা। বর্তমানে জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীতে কর্ণারে যে বিল্ডিংটা ওটা ছিল সে সময় ইউসিস বিল্ডিং। খুব রিস্ক ছিল এ অভিযানে।
গেরিলা অপারেশনের আগে আমরা এ জায়গাটা রেকি করলাম। আমাদের হিসেবে এই বিল্ডিং ব্লো-আপ করলে ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ জন লোক মারা যাবে। কোনো বিকল্প নেই। আমি কিছুতেই এটা সহ্য করতে পারছিলাম না যে, কেন এত মানুষ মারা যাবে। তখন আমার সঙ্গে মানু ছিল। ও বাইরে থেকে ট্রেনিং নেয়া হাইলি কোয়ালিফাইড। মানু বুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ত। আমাদের চেয়ে ভালো ট্রেনিং ছিল তার। সঙ্গে আমাদের এক বন্ধু জিয়াকে নিলাম। জিয়া (বর্তমানে স্থপতি)  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই প্রাইজবন্ডের পুরস্কার পেল। পুরস্কারের টাকায় একটা ভক্সওয়াগন গাড়ি কিনে ফেলল। ওই গাড়ি আমরা ব্যবহার করেছি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কাজে।
সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা একটাও মানুষ মরতে দেব না। কীভাবে? আমরা আগে ইউসিস বিল্ডিং থেকে সব লোককে বের করে দেব। মানু বলল, লোক বের করতে গেলে তো আপনাকেই গুলি করে মারবে। আমি বললাম, আই উইল টেক দ্য রিস্ক। অনেকটা আত্মাহুতি দেবার মতো চিন্তাভাবনা। আমার নিজের মধ্যে সবসময় এই আত্মঘাতী প্রবণতা ছিল, প্রটেস্ট হিসেবে।
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম গাড়ির নাম্বার প্লেট বদলাতে হবে। বদলাব কোথায়? আমি তখন ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে দেখেছি নিরাপত্তা বিবেচনায় সবাইতে দুর্বল জায়গা হচ্ছে থানার আশপাশে। থানার পাশে পুলিশ সবচাইতে কেয়ারলেস ছিল। বর্তমানে রমনা থানার যে পাশ দিয়ে রাস্তাটা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বাড়ির দিকে গেছে, থানার ওপাশে ভক্সওয়াগন গাড়িটা দাঁড় করিয়ে আমরা নম্বর প্লেট বদলালাম। ওখানে আমরা আর্মস বিতরণ করেছি। থানার পাশে। মানুষ দেখছে আমরা গাড়ি ঠিক করছি। আমার কেন জানি মনে হয়েছিল যে এ জায়গাগুলো হচ্ছে সবচাইতে নিরাপদ। এখানে কেউ সন্দেহ করবে না। অপারেশন করার পরও ওই জায়গায় এসে আমরা বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র ফেরত দিলাম। আমাদের গায়ের পোশাক পরিবর্তন করেছি ওখানেই। এগুলো এখনো অবিশ্বাস্য লাগে। হয়ত ওই বয়সে মুক্তিযুদ্ধের সময়েই এ রকম কাজ করা যায়!
যা হোক আমরা অপারেশনের প্রস্তুতি নিলাম।  ব্রিফকেসে এক্সপ্লোসিভসহ ডেটোনেটর লাগান। আমি এক্সপ্লোসিভ নিয়ে ডেটোনেট করব। আমার পেছন থাকবে মানু, অস্ত্র নিয়ে সে আমাকে কাভার করবে। সকাল ৯টায় আমরা গেছি। যাতে ইউসিস বিল্ডিং খোলার সঙ্গে সঙ্গে কাজটা করা যায়। কেননা এত সকালে ওখানে লোকজন কম থাকবে। যেয়ে দেখি ওখানে ১৫-২০ জন লোক, তারা পড়াশোনা করছে। আমরা সবাই কোট পরে ঢুকেছি।  স্টেনগান কোটের ভেতরে। ঢুকেই সবাইকে হাত তুলতে বলেছি। স্টেনগান দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সবাই হাত তুলেছে। একজন আর হাত  তোলে না। তাকে গালি দিয়ে বের করা হলো। পরে জানতে পারলাম সে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের ছাত্র সাদামী (পরবর্তীতে বিদেশে দুর্ঘটনায় মারা যায়), আমাকে চিনে। আমাকে দেখে সে ভয় পেয়েছে, যদি আমি তাকে চিনতে পারি, অন দ্য স্পট তাকে গুলি করে মেরে ফেলব। এই ভয়েই সে হাত তুলছে না। যা হোক, সবাইকে বললাম, ডানে বায়ে কেউ তাকাবেন না। ঝড়ের বেগে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে যাবেন। চলে যাবার পর ডেটোনেট কর্ডে দিয়াশলাইয়ের আগুন দেয়া হলো।  কিছুক্ষণ পর দেখি ডেটোনেটর কর্ড জ্বলে না। আমাদের শেখানো হয়েছে একবার ডেটোনেট করার পরে দ্বিতীয়বার নেভার ট্রাই। বার্স্ট হয়ে যেতে পারে। আমার মাথায় তখন এসব ভয়ডর নেই। আমি দ্বিতীয়বার আগুন দেবার পর নম্রভাবে বের হয়ে এসেছি। বাইরে গাড়ি স্টার্ট করে রাখা।
ইউসিসের অডিটরিয়ামে ঢোকার পথে রিসিপশনিস্টের মহিলার সঙ্গে গল্প করছে বন্ধু জিয়া। অসম্ভব সাহসী ছিল জিয়া। যে কোনো উত্তেজনাকর মুহূর্তে স্বাভাবিক থাকতে পারার অসাধারণ গুণ ছিল তার। স্টেনগান নিয়ে গাড়িতে বসা ছিল আরেকজন। মানু ছিল আমার সঙ্গে। আমরা সবাই যেয়ে গাড়িতে উঠলাম। উঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দ করে বিস্ফোরণ হলো। আমি এত টেনশনে ছিলাম যে, ওই শব্দও শুনতে পাইনি। খালি দেখলাম হাজার হাজার লোক চারদিকে দৌড়াচ্ছে।

সাপ্তাহিক : ওখানে কোনো সশস্ত্র পাহারা ছিল না?
মোবাশ্বের হোসেন : ওই বিল্ডিংয়ে কোনো সশস্ত্র পাহারা ছিল না। ওই বিল্ডিংয়ের পাশে সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ে প্রটেকশন ছিল। এই বিল্ডিংয়ে ছিল লাইব্রেরি ও আমেরিকান অফিস। ওদের হয়ত ধারণা ছিল লাইব্রেরিতে কে আর হামলা করবে? অপারেশন করার পর আমরা ওখান থেকে চলে গেলাম। অস্ত্র গোলাবারুদ পুনর্বিতরণ করা হলো। আমার গায়ে যে কোট ছিল সেটা আবার এক বাড়িতে রেখে আমার বাসায় চলে এলাম। বাসায় আসার পর শিশু সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করছি।  আমাদের বাসার একটা অংশে ছিল সরকারি অফিস। দেখি সেখানে অনেক পরিবারের লোক চলে এলো। পাশের বাড়ির এক অবাঙালি পরিবার ছিল, তার কর্তা দৌড়ে এসে আমাকে বলছে শুনছেন নাকি, কি হয়েছে। ডেঞ্জারাস ঘটনা। ঢাকা শহরের ভেতর এত বড় বিস্ফোরণ ঘটল! তাও দিনের বেলা সকাল ৯টায়!
এসব গল্প শুনছি, কি আর করব!
পরদিন সকাল বেলা আবার ক্যাম্পে ফেরত গেলাম। পরে আবার বাসায় ফেরত এসেছি।
সাপ্তাহিক : এর পরিণামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তরফে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলো না?
মোবাশ্বের হোসেন : ঘটনা ঘটল অন্য জায়গায়। এটার স্মৃতি আমি প্রতিনিয়ত বহন করি। বুয়েটের  যে রুমে আমরা অস্ত্র গোলাবারুদ ঠিকঠাক করে বিতরণ করেছিলাম, সে রুমে ছিল বদি, বদিউজ্জামান। বুয়েটের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র সম্ভবত। আমার আজও মনে আছে, সেই ছবি এখনো আমার চোখে ভাসে। ওকে আমরা বলেছিলাম, তোমাকে হলে থাকতে হবে। যাতে আমরা বিভিন্ন সময় যাওয়া আসা করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের কারণেই বদি বুয়েটের হলে থাকত। হলের সম্ভবত দ্বিতীয় বা তৃতীয় তলায়। ও নিচ থেকে আমাকে ডাক দিচ্ছে। বাবুল ভাই, বাবুল ভাই আমি একটু বাজার করে নিয়ে আসি। ও রুমেই হিটার দিয়ে রান্না করে খেত। সাদা একটা হাওয়াই শার্ট, সাদা একটা লুঙ্গি পরা বাজারের থলি নিয়ে যাচ্ছে। আমি রেলিং থেকে তাকে দেখছি। আমি বললাম, তুমি চলে যাও তোমার দরজাটা বাইর থেকে টান দিয়ে বন্ধ করে দেব। ওই যে তাকে দেখলাম সেটাই শেষ দেখা। আমাদের অপারেশনের পরের রাত্রেই  ওকে উঠিয়ে নেয় হানাদার বাহিনীর লোকেরা। তাকে আর পাওয়া যায়নি কোনোদিন। এই স্মৃতি জীবনে ভুলতে পারব না। মাঝে মাঝে মনে হয় সম্ভবত আমিই এর জন্য দায়ী। তার রুমে যদি আমরা অস্ত্রশস্ত্র রাখা ও বিতরণের কাজ না করতাম, তাহলে তো তার এ রকম ঘটনা ঘটতো না!
সাপ্তাহিক : আপনার নিকট বন্ধুদের মধ্যে আরও কেউ কি শহীদ হয়েছেন?
মোবাশ্বের হোসেন : গোপীবাগের ছেলে জাকির। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। শহীদ জাকির বীরপ্রতীক। সে দুবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ভর্তি হবার চেষ্টা করেছে। পারে নাই। অথচ সে মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ বীরত্ব দেখিয়ে বীরবিক্রম খেতাব পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সে শহীদ হয়েছে তার নিজের কারণে নয়, তার দলের আহত একজনকে উদ্ধার করতে যেয়ে। যাকে সে উদ্ধার করতে যায় সে প্রাণে বেঁচে গেলেও জাকির শহীদ হয়। কি আত্মত্যাগ! পৃথিবীর ইতিহাসে কয়টা দেশে এ রকম আত্মত্যাগের ঘটনা ঘটেছে?
সাপ্তাহিক : এবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। মুক্তিযুদ্ধের শেষে আপনি আবার বুয়েটে ফিরে এলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : হ্যাঁ, বুয়েটে ফিরে এসে পড়াশোনা শুরু করলাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরেই ১৮, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে মুক্তিযুদ্ধের নাম দিয়ে যে দৃশ্যগুলো দেখলাম তা তখনই আমাদের ভীষণভাবে পীড়া দিয়েছে।  আমার নিজের কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নেই। কেন নাই? আমি যখন সার্টিফিকেট নিতে যাব তার আগের দিন একজনের কাছে একটা মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট দেখলাম। যে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়নি। সে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ছিল। কিন্তু তাকে সার্টিফিকেট পেতে দেখলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এই সার্টিফিকেট কোথায় পেলে? সে উত্তর দিল, আমার এক ভাই মুক্তিযোদ্ধা, সে এটা যোগাড় করে দিয়েছে। আমি জানি পরবর্তীতে সে চাকরিতে এই সার্টিফিকেট ব্যবহার করেছে।
ওইদিনই আমার বিতৃষ্ণা হল  সিদ্ধান্ত নিলাম, মুক্তিযোদ্ধা হয়ে আলাদা কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেয়া দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।
সাপ্তাহিক : ১৯৭২ সালে তাহলে বুয়েট থেকে গ্রাজুয়েশন করলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : হ্যাঁ, আমাদের পাস করার কথা ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের কারণে আমরা ১৯৭২ সালের শেষের দিকে পাস করে বেরুলাম।
সাপ্তাহিক : পাস করার পর আপনি কি করলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : পাস করার পর গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে এক দেড় মাস সরকারি চাকরি করেছি। সেখানে ঝগড়া-ঝাটি হয়েছে অনেক। আমার পিয়নকে আমি তার বাচ্চার দুধ কেনার জন্য ছুটি দিয়েছি, সেটার ওপরে তিনদিন ধরে আমাকে রিপোর্ট লিখতে হয়েছে। কেন তাকে শাস্তি দেয়া হবে না। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার বিভাগীয় প্রধানের রুমে প্রতিদিন উনি আমাকে দুপুরে লাঞ্চ খাওয়াতেন। মতিঝিলের রূপালী ব্যাংকভবনে আমাদের অফিস ছিল। পিয়নের শাস্তির ফাইল তখন প্রতিদিন দ্বিতীয়তলা, তৃতীয়তলা ঘোরাঘুরি করছে। আমি একদিন বিভাগীয় প্রধানকে বললাম, এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এত ফাইল চালাচালি করার দরকার কি?  আমি রিপোর্ট দিচ্ছি আপনি লিখছেন, তারপর আমাকে পাঠাচ্ছেন, আমি লিখছি, আবার আপনি লিখে আমার কাছে পাঠাচ্ছেন। এর চেয়ে এক টেবিলে দুজনে বসে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেই তো চলে!
একথা বলার পরের দিন থেকে আমি আর অফিসে  যাইনি। আমার বাসায় লোক পাঠিয়ে তখন বলা হয়েছিল, আমি অফিসিয়ালি যদি পদত্যাগ না করি তাহলে জীবনে কোনোদিন আর সরকারি চাকরিই করতে পারব না। আমি তার উত্তরে বলেছিলাম, চাইলেও যেন সরকারি চাকরি করতে না পারি সেজন্য আমি অফিসিয়ালি পদত্যাগ করব না। এরপরই আমি টুকটাক প্রাইভেট কাজ করা শুরু করলাম। বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড (বিসিএল)-এ পার্টটাইম কাজ করতে লাগলাম। পরবর্তীতে আমার বাসাতেই নিজেই ‘অ্যাসোকনসাল্ট’ নামে একটা ফার্ম বানালাম।
সাপ্তাহিক : ‘অ্যাসোকনসাল্ট’  লিমিটেড শুরু করলেন কবে?
মোবাশ্বের হোসেন : অফিসিয়ালি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে ১৯৮০ সালে। কিন্তু শুরু হয়েছে ১৯৭৪-৭৫ সলের দিক থেকেই। পার্টনারশিপ হিসেবে আমি ফার্ম করলাম, স্থপতি মোস্তফা কামালের সঙ্গে। স্থপতি মোস্তফা কামাল রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ অফিস বিল্ডিং, জাতীয় মিউজিয়ামসহ আন্তর্জাতিক সব নামি-দামি বিল্ডিং ডিজাইন করেছে। পরবর্তীতে তো আমরা গ্রামীণ ব্যাংকের হেড অফিসের কমপ্লেক্স করলাম।
সাপ্তাহিক : আপনি তো একবার ট্রাকে করে শাক-সবজি ব্যবসায়ও শুরু করেছিলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : স্কুলে পড়ার সময়ই আমার মনে হয়েছিল চাকরি না করে আমি ব্যবসা করব। স্বাধীনতার পরে হঠাৎ খেয়াল হলো ট্রাকের ব্যবসা তো বেশ ভালো ব্যবসা। প্রতিদিন বিকেলে ক্যাশ টাকা পাওয়া যায়। এটা আমার মাথার মধ্যে কাজ করেছিল।
আমি যখন ছাত্র তখন থেকেই ট্রাক ড্রাইভারদের কাছ থেকে নানারকম টিপস নিতাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের উল্টো দিকে হাছিনা রেস্টুরেন্ট ছিল। ওখানে প্রায়ই আমরা দুপুরে খেতাম। দেখি ঢাকা-আলীয়া মাদ্রাসার পেছনের মাঠে একটা ট্রাক পাথর ফেলছে। তার ড্রাইভার এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক। ওই রেস্টুরেন্টের সামনে চেয়ারে পা তুলে বসে খাচ্ছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচামিঞা, মানুষ বলে ট্রাকের ড্রাইভাররা পয়সা চুরি করে। এটা কি সত্যি? আপনি তো ট্রাকের ড্রাইভার। উনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ এটা সত্যি। জিজ্ঞাসা করলাম আপনি চুরি করেন না? বললেন, আগে করতাম এখন করি না। আমি বললাম, এটা কি রকম কথা? উনি বললেন, ট্রাকের মালিকের সঙ্গে আমার একটা চুক্তি হয়েছে, সপ্তাহে একদিন ট্রাক আমার। ফলে আমি ওই ট্রাকের যতœ নেই। এখন কোনো পয়সা চুরি করি না। মাইনা বাদেও একদিনের আয় আমার।
তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা বলেন তো ড্রাইভারকে কত টাকা বেতন দিলে ও চুরি করবে না? উনি অসাধারণ একটা উত্তর দিয়েছিলেন। বললেন, সৃষ্টিকর্তা যদি ট্রাক কিনে কাউকে দেয়, সেও টাকা চুরি করবে। নগদ টাকার লোভ কেউ সামলাতে পারবে না। আমি বললাম, তাহলে কি ট্রাকের ব্যবসা করা যাবে না?  করা যাবে, তুমি ভাতিজা, এমন একজন ড্রাইভার নেবা, যে মনে করবে যে তার চুরির পয়সাও উঠে এই ট্রাক থেকে। যে ড্রাইভার তার ট্রাকের যতœ নেয়, সে কয় টাকা চুরি করল, এ নিয়ে মাথা ঘামিও না। দেখবা যে, তুমি ঠিকমতো টাকা পাচ্ছ। আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাতেও দেখলাম, ঠিক এই ঘটনাই ঘটছে।
সাপ্তাহিক : সেটা কি রকম?
মোবাশ্বের হোসেন : পাস করে চাকরিতে ঢুকে, দ্রুতই তা ছেড়ে দিলাম, তখন ভাবলাম ব্যবসা করতে হবে। অগ্রণী ব্যাংকে লোনের জন্য আবেদন করে, বাড়ি মর্টগেজ রেখে, দুটা ট্রাকের পারমিশন পেলাম। তখন সারা বাংলাদেশে যানবাহন এত  নেই। নতুন বেডফোর্ড ট্রাক রাস্তায় নামালাম। আন্তঃজেলা মালামাল পরিবহনের কাজে লাগালাম ট্রাক। কারণে তাতে ওই আমলে এক মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে।
ওই সময় এক জেলা থেকে আরেক জেলায় খাদ্যপণ্য পরিবহন করা নিষিদ্ধ ছিল। তখন গাড়িতে খাদ্যপণ্য তুললেই কিছু কিছু তথাকথিত পুলিশ চাঁদা নিত। ওই সময় উইং কমান্ডের খাদেমুল বাসার উচ্চপদে চাকরি করতেন। তিনি আমার নিকটাত্মীয়। উনার তরফ থেকে আমার ট্রাকের নম্বর দিয়ে প্রত্যেক থানায় বলা ছিল এই ট্রাক আইন ভঙ্গ করে কোনো মালামাল পরিবহন করবে না। আমার ট্রাক বগুড়া জেলার ভেতরে খাদ্যপণ্য পরিবহন করত। আমার ট্রাক থেকে আর কেউ চাঁদা চাইত না। সারাদিন একজন পাইকার বসে থাকত যে এই ট্রাকে মাল তুললে নিশ্চিন্ত মনে জায়গায় পৌঁছে যাবে। স্থানীয় বাজার থেকে মাল তুলে আড়ত পর্যন্ত পরিবহন করা হতো। আমার কড়া নির্দেশ ছিল আইন ভঙ্গ করে তোমরা কিছু করতে পারবে না।

সাপ্তাহিক : ট্রাক ড্রাইভারের অভিজ্ঞতা?
মোবাশ্বের হোসেন : আন্তঃজেলা পরিবহনের জন্য যখন ট্রাক নামালাম, তখন দেখি ট্রাক ড্রাইভার পয়সা চুরি করে। তখন আমি নিজে ট্রাকের ভেতরে থেকেছি। আরিচাঘাটে অনেকদিন ট্রাকেই রাত কাটিয়েছি। ফেরিতে করে গেছি, কিভাবে সিরিয়াল করে দেখেছি। পাটের আড়তে গেছি গাইবান্ধায়Ñ এভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিজে নিয়েছি। একটা পর্যায়ে বগুড়া শহরের মূল সড়কের পাশে একটা ওয়ার্কশপের মালিকের সঙ্গে মাসিক ভিত্তিতে চুক্তি করলাম। তাকে বললাম যখনই গাড়ি এই সড়ক দিয়ে যাবে, গাড়ি থামিয়ে গাড়ির তেল, মবিল চেক করবে যা যা সারানো লাগে সারবে। ট্রাককে টিপটপ করে রাখবে। ফলে আমার ট্রাক নষ্ট হত কম।
তখন গিয়ার ওয়েল পাওয়া যেত না। লন্ডনে মা গিয়ারওয়েল কিনে রাখত। আমার এক বন্ধু বিমানে চাকরি করত। সেই দুই ক্যান করে গিয়ারওয়েল লন্ডন থেকে আমাকে এনে দিত। এসব দারুণ অভিজ্ঞতা।
সাপ্তাহিক : ট্রাকের ব্যবসা ছেড়ে দিলেন কখন?
মোবাশ্বের হোসেন : এক পর্যায়ে আমার ফার্মের কাজ যখন বাড়ল। তখন এটা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তবে সে সময় বগুড়াতে একটা ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান কিনেছিলাম।
পরে ট্রাক বিক্রি করে দেই। ট্রাক কিনেছিলাম ৭৫ হাজার টাকায়। চার-পাঁচ বছর ব্যবহার করার পরে বিক্রি করলাম প্রায় ২ লাখ টাকায়।
তখন এ কাজের অভিজ্ঞতা কষ্টকর মনে হয়েছে। পরবর্তী জীবনে এই অভিজ্ঞতাই খুব কাজে লেগেছে। নিজের জন্য এসব অভিজ্ঞতা মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে।
সাপ্তাহিক : আপনি যখন নিজের স্থাপত্য ও নির্মাণ ফার্ম দিলেন, তারপর রাজনীতির সঙ্গে কি আপনার সংশ্রব আর থাকল?
মোবাশ্বের হোসেন : অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ন্যাপ নামের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দারুণভাবে সম্পৃক্ত থাকলাম।
সাপ্তাহিক : এটা কি খ্যাতিমান স্থাপতি মাযহারুল ইসলাম সাহেবের সূত্রে?
মোবাশ্বের হোসেন : ছাত্রজীবনেই মাযহারুল ইসলাম সাহেব আমাকে নাড়া দিয়েছিল। আমি এক সময় সিদ্বেশ্বরী স্কুলে পড়তাম। এখন যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার সেটা তখনকার পাবলিক লাইব্রেরি ছিল । এটা ছিলএক অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী একটা বিল্ডিং। এর ভেতরে একটা র‌্যাম্প আছে। সিঁড়ি নয়। এই র‌্যাম্প দিয়ে লাইব্রেরির ভেতরে দোতলায় উঠতে হয়। পুরো বারান্দা ছিল উন্মক্ত। ঘাসের যে লেবেল তার সঙ্গে মেলানো। এখন ওই বারান্দাকে ঘর বানিয়ে ফেলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
আমি হাফপ্যান্ট পরে ওই অসাধারণ নন্দনশৈলী বিল্ডিংটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ওই র‌্যাম্পটিকে আমার মনে হোত স্বর্গে যাবার সিঁড়ি। ওটার আকর্ষণ এতই ছিল যে, শুনেছিলাম ওই পাবলিক লাইব্রেরির সদস্য হতে ১৬ টাকা লাগে। মার কাছ থেকে জোর করে ওই টাকা নিয়েছিলাম। সদস্য হবার জন্য। লাইব্রেরিতে পড়ার জন্য নয়, ওই র‌্যাম্প দিয়ে উঠতে নামবে পারব এই আকাক্সক্ষায়।
শুধু ওই সময় নয়, এটা ছিল সর্বকালের এক অপূর্ব সৃষ্টি। আমরা সাধারণত দেখতাম যেকোনো  বিল্ডিং মাটি থেকে দুই ফুট উঁচু হয়। কিন্তু এই বিল্ডিংয়ের সৌন্দর্যই ছিল, এটা মাটির লেভেল থেকে ৩-৪ ইঞ্চি মাত্র উঁচু। প্রায় গ্রাউন্ড লেভেল। বিকাল বেলায় দেখতাম, ছেলেমেয়েরা ওখানে বসে আছে, ঘাসের ওপর পা দিয়ে। আমার হবু গিন্নীর সঙ্গেও আমি ওখানে বসে কত গল্প করেছি। স্বাধীনতার পর এসব অপূর্ব স্থাপত্যশিল্পকে যে কিভাবে ধ্বংস করা হয়েছে এই বিল্ডিংটি তার বড় উদাহরণ। লাইব্রেরির ভেতরের ঐশ্বর্যমণ্ডিত র‌্যাম্প এখন কোথায় আছে কেউ জানে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকরাই এ বিল্ডিংয়ের চারদিকে উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করে এ স্থাপত্যকর্মের বারোটা বাজিয়েছে। ওখানে নভেরা আহমদের অনেক সৃষ্টি ছিল। সেগুলোও ধ্বংস করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, হঠাৎ একদিন দেখি, মাযহারুল ইসলাম সাহেবের তৈরি করা এই বিল্ডিংয়ের ওপরে গ্রামীণ ফোনের টাওয়ার বসানো হচ্ছে। পরে মিডিয়া এবং আইনি চেষ্টার মাধ্যমে আমি ওই টাওয়ার নির্মাণ বন্ধ করাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করি , যা এখনো দৃশ্যমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি এবং চারুকলা ইনস্টিটিউট ছিল মাযহারুল ইসলাম সাহেবের কালজয়ী স্থাপত্যকর্ম। এটা আগামী আরও একশ বছর আধুনিক স্থাপত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে।  যাতে তাকে ফিস না দিতে হয় সেজন্য পরবর্তীতে মাযহারুল ইসলামের এই বিল্ডিং কপি করা হয়েছে এর পেছনে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মাযহারুল ইসলাম সাহেবের একটি সেরা স্থাপত্যকর্ম। এ যুগের একটা সেরা সৃষ্টি। এটার ভেতরে যেয়ে দেখবেন কত রহিমউদ্দিন করিমউদ্দিনের বিল্ডিং আছে। এভাবেই আমরা প্রতিনিয়ত মাযহারুল ইসলাম সাহেবের সেরা সৃষ্টিগুলোকে ধর্ষণ করছি।
সাপ্তাহিক : স্থপতি মাযহারুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে আপনার স্মৃতি?
মোবাশ্বের হোসেন : উনি ছিলেন আমাদের গুরু। পাস করার পর উনার ফার্ম ‘বাস্তুকলাবিদ’ এ আমরা প্রায়শই যেতাম। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পরে, মাযহারুল ইসলাম সাহেব আমাদের কজনকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার সেদিনের কথা এখনো মনে আছে। বঙ্গবন্ধু তখন বসতেন রমনা রেসকোর্সের উল্টোদিকে রাণী এলিজাবেথ যে বিল্ডিংটাতে এসে ছিলেন সেই বিল্ডিংয়ে। মিন্টু রোডের ওখানে।
মাযহারুল ইসলাম সাহেব ওনার কাছে নিয়ে গেলেন। আমি ছিলাম, ইয়াফেস ওসমান ছিলেন, রবিউল হুসাইনসহ আরো দুই চারজন ছিলাম, যারা রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ১৯৭২ সালের  শেষের দিকে হবে। অসংখ্য লোক বঙ্গবন্ধুর ওখানে। বঙ্গবন্ধু মাযহারুল ইসলাম সাহেবকে দেখে তাকে ডেকে নিলেন, এলেন সবুজ লনের মধ্যে, যেখানে লোকজন নেই। বঙ্গবন্ধু আমাদের মাথায় হাত দিয়ে দিয়ে কথা বলছেন। আমার মনে আছে, মাযহারুল ইসলাম সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বলেই চলেছেন যে, ফিজিক্যাল প্ল্যানিং থাকতে হবে। সমস্ত বাংলাদেশকে নিয়েই চিন্তাভাবনা করতে হবে। শুধু ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহর নিয়ে প্ল্যানিং করলে এটা ব্যর্থতায় পর্যবসতি হবে। বঙ্গবন্ধু তার কথায় সায় দিলেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের বললেন, উনার মতো সৎ হও। উনার মতো কাজ কর। দেশ গড়। তোমরাই তো আমার মুক্তিযোদ্ধা। তোমরাই তো এদেশ গড়বে। অনেক কথা হলো। 
বঙ্গবন্ধুর সেই বিশাল দেহ। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। কাছে থেকে না দেখলে বোঝা যাবে না। মাঝে মাঝে দেখি গ্রাম থেকে কিছু লোক আসছে, বঙ্গবন্ধু প্রত্যেককে নাম ধরে কথা বলছেন। এটা আমাকে একটা আলাদা চমক দিয়েছে। অসাধারণ স্মৃতিধর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এটা অবিশ্বাস্য ঘটনা। অল্পক্ষণ উনার সান্নিধ্য পেলাম। কোনো চেক নেই, গার্ড নেই, সশস্ত্র প্রহরার স্তর অতিক্রম করা নেইÑ এটা আমার জীবনের একটা অসাধারণ প্রাপ্তি।
সাপ্তাহিক : এবার আপনার পারিবারিক প্রসঙ্গে আসি। আপনার ছেলেমেয়ে কজন?
মোবাশ্বের হোসেন : আমার এক ছেলে এক মেয়ে। আজ আমি যে জায়গায় পৌঁছেছি এ জায়গায় পৌঁছুতে আমার গিন্নি সবচাইতে বেশি সহায়তা করেছেন। আগে আমি প্রচুর মিথ্যা কথা বলতাম। দোষ করে তা ঢাকার চেষ্টা করতাম। গিন্নি প্রতি পদে পদে আমাকে এই কাজ থেকে ফেরাতে চেষ্টা করেছেন। গিন্নিকে দেখেছি সত্য কথা যত কটুই হোক তিনি তা মুখের ওপর বলে ফেলেন। তার এই অভ্যাসটা পরবর্তীতে আমাকে চর্চা করতে তিনি বাধ্য করেছেন। আমাকে তিনি শিখিয়েছেন। সত্যি কথা বলার সাহস আমি গিন্নির কাছ থেকেই পেয়েছি। 
একটা দুঃখজনক ঘটনা হলো ১৯৭১ সালে শিশু সন্তানসহ গিন্নিকে গোপীবাগের বিরাট একটা বাড়িতে একলা ফেলে রেখে মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছিলাম। যার কারণে ভয়, আতঙ্ক, নিরাপত্তহীনতায় সম্ভবত তার মানসিক কিছু সমস্যা তৈরি হয়।
যার ফলে, স্বাধীনতার পরে তাকে কিন্তু আর কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারতাম না। বাড়ির বাইরে কোথাও যেতে তার খারাপ লাগে, সে স্বস্তিবোধ করে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু দেখতে সে পছন্দ করে না। আপনি যদি তার কাছে যেয়ে বলেন, আপনার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা, সেজন্য আপনার গর্ববোধ করা উচিত। উনি খুবই ক্ষিপ্ত হয়ে যাবেন, বলবেন যে তার বউ-বাচ্চার যতœ নিতে পারে না, সে দেশের যতœ নেবে কীভাবে? এটা তার একটাই স্লোগান। আমি এটাকেই বিরাট আশীর্বাদ হিসেবে নিয়েছি।
কেননা তার যে ত্যাগ সেটা চিন্তাও করা যায় না। অল্প বয়সের একটা মেয়ে তার শিশুসন্তান নিয়ে ওই সময়ে (১৯৭১ সালে), অতবড় বাড়িতে একলা থেকেছে। সে সময় আমার শাশুড়ি গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। বাড়ির চারপাশে জঙ্গল, গাছ-গাছালিতে ভর্তি। মাঝেমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা আসছে। সে তাদের খাবার ব্যবস্থা করছে। সে সময় আমি মাঝেমধ্যে রাতে বাসায় এসে থাকতাম। ততদিনে সামাদ ভাইকে, আলতাফ মাহমুদ ভাইকে পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। তখন রাতে বাসায় থাকলে অস্ত্রটা মাথার নিচে নিয়ে ঘুমাতাম। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম, আল্লাহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যদি বাসায় আসে, আমি যেন আমার স্ত্রী আর শিশুসন্তানকে প্রথমেই গুলি করে মারতে পারি। কেননা চোখের সামনে যদি স্ত্রী-সন্তানের ওপর নির্যাতন হয় আমি সহ্য করতে পারব না।
সাপ্তাহিক : মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আপনি কি কি অস্ত্র চালাতে পারতেন?
মোবাশ্বের হোসেন : গ্রেনেড মারা শিখেছি। এক্সপ্লোসিভ তৈরি করার শিক্ষা আমরা হাতে নাতে পেয়েছি। সেসময় এক্সপ্লোসিভ তৈরির বইপত্র বাংলায় আমাদের দেয়া হোত। সিদ্ধিরগঞ্জের ওদিকে গ্রেনেড মারার প্রাকটিস হোত। স্টেনগান খোলা- লাগানো- ব্যবহার করা , মেশিনগান ব্যবহার করা - এগুলির বিষয়ে মাত্র ১০-১৫  দিনের ট্রেনিং দেয়া হতো। সাধারণ মানুষের এসব শিখতে একটু বেশি সময় লাগত, আমরা যারা ছাত্রজীবনে ক্যাডেট কোরের  সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারা খুব দ্রুত এসব শিখে নিতাম।
সাপ্তাহিক : এরপর আপনার প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসোকনসাল্ট লিমিটেড’  কি কি কাজ  শুরু করল?
মোবাশ্বের হোসেন : আমি তখন নিজে কনসালট্যান্সি করি। আমরা গ্রামীণ ব্যাংক ভবন নির্মাণের কাজ পেলাম। বিরাট কাজ। ড. ইউনূস তখন এত বিখ্যাত হয়ে উঠেননি।
সাপ্তাহিক : গ্রামীণ ব্যাংকের কাজটা আপনি কিভাবে পেলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : আমার অফিসে সে সময় ফিরোজ নামে একজন স্থপতি  ছিলেন। যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনূস সাহেবের সঙ্গে কাজ করতেন। ড. ইউনূস একটা বিল্ডিং বানাবেন। ফিরোজ বললেন চলেন আমরা যেয়ে আলাপ করি। ইউনূস সাহেব তখন শ্যামলির এক গলির ভেতরে থাকেন। এক তলায় থাকেন আরেক তলায় গ্রামীণ ব্যাংকের অফিস। গ্রামীণ ব্যাংককে তখন কেউ সহ্য করতে পারে না। কেউ তার নামই শুনতে পারে না। আমার পরিচিত কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যাংকার বলতেন এটা তো কদিন পরেই কলাপ্স করবে। এটা তো টাকা লুটপাটের জন্যই করা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। উনার সঙ্গে শ্যামলির ওই বিল্ডিংয়েই মিটিং করলাম। সরকারের কাছ থেকে ঢাকার মিরপুরে তখন উনি পাঁচ বিঘা জমি পেয়েছেন।
উনি বললেন প্রথম পর্যায়ে এখানে একটা অফিস ও ট্রেনিং সেন্টার বানান । আর মাঝখানে জায়গা রাখেন যেখানে ভবিষ্যতে ২০ থেকে ৩০ তলা বিল্ডিং আমি বানাবো। যে সময়ে ড. ইউনূস একথা বলছেন তখন ঢাকা শহরে সর্বোচ্চ বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে কেবল শিল্প ব্যাংক ভবন। ২০/৩০ তলা বিল্ডিংয়ের কথা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারে না। এমনকি কোনো ব্যাংকও চিন্তা করতে পারে নাই যে তার ব্যাংক ভবন বহুতলা বিল্ডিং হবে। অথচ ড. ইউনূস ভাবছেন ভবিষ্যতে তিনি ২০-৩০ তলা বিল্ডিং বানাবেন। এই যে মানুষের দূরদর্শিতা , এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়।
সাপ্তাহিক : কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা বলেই কি উনি কনভিন্সড হলেন যে আপনাকে দিয়েই উনি কাজ করাবেন? তখন তো আপনি নিজেও খুব বিখ্যাত কেউ নন?
মোবাশ্বের হোসেন : ইতোমধ্যে আমরা তিন-চারটি ভালো কাজ করেছি। ড্যানিশদের একটা প্রজেক্ট ছিল মাইজদিতে, ডিজাইন প্রতিযোগিতায় ইয়াং আর্কিটেক্ট হিসাবে আমরা সেখানে অংশ নেই। ডেনমার্কে ওটা যাচাই হয়। একদিন সকালে ডেনমার্ক অ্যাম্বাসি থেকে লোকজন এসে হাজির হয়ে জানাল যে তোমরা এই কাজটা পেয়েছ। ওই প্রজেক্টটা করলাম। সেটা বেশ আলোড়ন তুলল।
 প্রথম ফেজ হিসাবে গ্রামীণ ব্যাংকের পিছনের বিল্ডিং  তৈরি হবার পর একটা আলোড়ন তৈরি হলো। কথা উঠল গ্রামীণ ব্যাংক বিলিয়নস অব ডলার খরচ করে এই বিল্ডিং তৈরি করেছে। ওই সময় ড. ইউনূস সাহেবকে অভিযুক্ত করা হয় যে প্রচুর অর্থের অপচয় করে অনেক  জায়গা ছেড়ে এরকম একটা বিল্ডিং বানানো হয়েছে। অথচ আমার এখনো মনে আছে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার উনার উপদেষ্টা ছিলেন, আমাকে ডেকে উনি বললেন ৬তলা বিল্ডিং তোমরা মাত্র ৯০০ টাকা স্কয়ার ফিটে করলা? খুলনায় আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬তলা বিল্ডিং করছি সেটার খরচ তো প্রতি স্কয়ার ফিটে ২২০০ টাকা।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তখন খবর এলো ইউনূস সাহেব অর্থের অপচয় করে এই বিল্ডিং তৈরি করেছেন। আমরা এর উত্তরে বললাম, আপনারাই বলেন  এই বিল্ডিং তৈরি করতে প্রতি স্কয়ার ফিটে খরচ কত হবে? উত্তর এলো প্রতি স্কয়ার ফিটে ন্যূনতম খরচ হবে  ১২০০-১৫০০  টাকা।এটাও বলে রাখি পরবর্তীতে ২২ তলা বিল্ডিং যেটা তৈরি হয়েছে  সব মিলিয়ে সেটার প্রতি স্কয়ার ফিটে খরচ হয়েছে মাত্র ৯৫০ টাকা। এটিই বাংলাদেশে প্রথম বিল্ডিং যেটা করা হয়েছে কম্পিউটার এডেড ডিজাইন স্ট্যাড প্রোগ্রাম (ঝঞঅঅউ চৎড়মৎধস) দিয়ে। এটার জন্য ৪৮৬ কম্পিউটার তাইওয়ান থেকে ইমপোর্ট করেছি। বুয়েটের এক শিক্ষককে গোপনে তথ্য নিতে পাঠিয়েছি বাইরে । তারপর এ প্রজেক্টটা আমরা উঠিয়েছি। আমরা শুধু এই বিল্ডিংয়ের ডিজাইন করেছি। বিল্ডিংয়ের প্রথম ফেজের কনস্ট্রাকশন কাজ করেছে কনকর্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, দ্বিতীয় ফেজের  কাজ করেছে জহুরুল ইসলাম সাহেবের কনস্ট্রাকশন কোম্পানি বিডিসি।
সাপ্তাহিক : এরপর তো প্রশিকা ভবন তৈরির কাজও আপনারা পেলেন। সেটা কিভাবে?
মোবাশ্বের হোসেন : তখন আমরা ছোটখাটো কিছু কাজ করছি। এমন সময় সিডা’র  (কানাডিয়ান সাহায্য সংস্থা) আর্থিক সহযোগিতায় প্রশিকা কর্তৃপক্ষ মানিকগঞ্জে প্রশিকার কাজ আমাদের দিল। কাজ শুরু করলাম। আমাদের কাজ, সিনসিয়ারিটি, দর, কাজের মান দেখে বিদেশিরা আমাদের অসম্ভব পছন্দ করা শুরু করল।  পরবর্তীতে প্রশিকা কর্তৃপক্ষ মিরপুরে প্রশিকা ভবন বিল্ডিংটা ডিজাইন করার জন্য দিল। প্রশিকার চাহিদা ছিল নয় তলা বিল্ডিং। আমি জবরদস্তি করে কাগজে-কলমে এটাকে দশ তলা আর আনঅফিসিয়ালি তেরো তলার ফাউন্ডেশন দিয়েছিলাম। উনাদের এ বিষয়ে কিছুতেই কনভিন্স করাতে পারিনি।
গ্রামীণ ব্যাংক আর প্রশিকা এ দুটো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে যেয়ে আমি দেখেছি একজনের অসম্ভব দূরদর্শিতা আর সাধারণ মানুষের চিন্তার ফারাক কি হয়? প্রশিকার তরফ থেকে বলা হলো তিনটা ফ্লোরের বেশি আমাদের জীবনে লাগবে না , বাকি ফ্লোর আমরা ভাড়া দেব। আমি তাদের বহু অনুরোধ করেছিলাম ২০ তলার ফাউন্ডেশন দেবার জন্য। অথচ টাকা না থাকা সত্ত্বেও গ্রামীণ ব্যাংকের বহুতল ভবনের প্রথম পর্যায়েই কিন্তু একবারেই ২৩ তলার ফাউন্ডেশন দেয়া হয়েছিল।
প্রশিকার বিল্ডিং ডিজাইনটা করেছিলাম একটু আলাদা চিন্তা থেকে। ওটা এনজিও। ওটাকে মেইনটেনেন্স ফ্রি করা যায় কিনা ? পুরো বিল্ডিংটা ব্রিকস পেস্টিং করা। ভূমিকম্পে যাতে ইট খুলে না যায় এজন্য এর ভেতরে আবার রিইনফোর্সমেন্ট করা।
সাপ্তাহিক : এরপরে আর বড় কাজ কি কি করেছেন?
মোবাশ্বের হোসেন : চট্টগ্রাম নতুন রেলস্টেশন করেছি। এটার দুঃখজনক অধ্যায় হলো সে সময়ের যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ইন্সপেকশন দেয়া শুরু করলেন। আমার আজও মনে আছে তার  সঙ্গে এক মিটিংয়ে প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও আছেন, মন্ত্রী আমাদের ডিজাইন বিষয়ে নানারকম নির্দেশনা দেয়া শুরু করলেন। বিরক্ত হয়ে এক পর্যায়ে তাকে বললাম, মাননীয় মন্ত্রী, আর্মি ফরমেশন সম্পর্কে আমি যদি এখন আপনাকে পরামর্শ দেয়া শুরু করি আপনি সেটা কিভাবে গ্রহণ করবেন?  আমি যদি বাংলাদেশের নিকৃষ্টতম স্থপতিও হয়ে থাকি  ও ঃযরহশ ও শহড়ি ধ নরঃ নবঃঃবৎ ঃযধহ ুড়ঁ. এটা বলেই আমি মিটিং ছেড়ে উঠে চলে এসেছিলাম। মন্ত্রী অবশ্য আমাদের পরামর্শ মানেননি। পরবর্তীতে উনি এখানে অনেক পরিবর্তন করেছেন। ভেঙ্গেছেন আবার আগের জায়গায় ফেরত গেছেন। অযথাই কয়েক কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছেন।
সাপ্তাহিক : প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কি আপনার?
মোবাশ্বের হোসেন : চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের বিরাট স্ট্রাকচারের কাজ তো উনিই করেছেন। উনি না হলে তো এ কাজ করা সম্ভব হতো না । আপনি যদি ছবিতে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন দেখেন তবে মনে হবে ওখানে টিউব লাইট জ্বলছে। ওগুলো টিউব লাইট নয়। ন্যাচারাল আলো ভেতরে প্রবেশ করেছে, ডিজাইন সেভাবেই করা হয়েছে। আমরা আরো জিনিস (ইউ ভি প্রটেক্ট) দিতে বলেছিলাম। অন্যত্র অতিরিক্ত খরচ করার কারণে সেটা দেয়া সম্ভব হয়নি। সেগুলো ব্যবহার করা হলে আরো পরিষ্কার আলো পাওয়া যেত। একটা আমব্রেলার মতো করে এটা ডিজাইন করা। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের একটা আদল আমরা আনতে চেয়েছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম ডিজাইনে এমন আদল আনতে যাতে করে বড় স্টেশনগুলো যেন দূর থেকেই চেনা যায়।
এখানে পানি ও ময়লা জমা হবার ফলে যেসব সমস্যা হতে পারে তার অনেক কারিগরি দিক সমাধান করেছেন শহীদুল্লাহ সাহেব। তার মতো মেধার মানুষ বলেই এসব কারিগরি সমস্যার সমাধান করা গেছেন। চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে যখন আমরা কাজ করি তখন সেখানে একটা ১০-১৫ ফুট গর্ত ছিল। তার ভেতরেই এটা করা। আর একটা কাজ আমরা করেছি। পুরান রেলস্টেশনটাকে রেট্্েরাফিটিং করে অরিজিনাল চেহারায় নিয়ে এসেছি। এটার পুরনো ড্রয়িং দিল্লী থেকে নিয়ে এসে কাজ করা হয়েছে।
আপনারা যারা এখন আহসান মঞ্জিল দেখেন, এর ভেতরে যা দেখেন, তার সবই পরে তৈরি করা হয়েছে। ভেতরের ক্রোকারিজ ছাড়া বাকি সব জিনিস রিপ্রোডিউস করা হয়েছে। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। কোথা থেকে এর আসল চেহারা পাব? তখন তো এটা গোডাউন ছিল। মানুষজন এখানে থাকত। সে সময় জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ছিলেন ড. এনামুল হক সাহেব। উনাকে বলার পরে, উনি বললেন আমি একটা চেষ্টা করে দেখতে পারি। উনি লন্ডন মিউজিয়ামে যোগাযোগ করার পর বের হলো একজন লর্ড আহসান মঞ্জিলের এই বাড়িতে কয়েকদিন থেকে গেছেন। উনি সঙ্গে করে ফটোগ্রাফার নিয়ে এসেছিলেন। সেই ফটোগ্রাফার প্রত্যেকটা ঘরের, প্রত্যেক দিক দিয়ে ছবি তুলেছিলেন। প্রত্যেকটা ফার্নিচারের, প্রত্যেকটা অ্যাঙ্গেলের ছবি তোলা হয়েছিল। সেসব ছবি লন্ডন মিউজিয়ামে জমা ছিল। সেই ছবির অ্যালবাম দেখে আমাদের অফিসের একটা ছেলে ছিল, যে ছবি দেখে অসম্ভব সুন্দর অরিজিনাল ড্রয়িং করতে পারত। ছবি থেকে ফার্নিচারের স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং করে সেই ফার্নিচার এখানে বানিয়ে আমরা আহসান মঞ্জিলে লাগিয়েছি। এই কাজটা আমাদের ফার্ম করেছিল।
গ্রামীণ ব্যাংকের মূল ভবনের কাজ করার পর মফস্বলে গ্রামীণ ব্যাংকের অনেক বিল্ডিংয়ের কাজ আমরা করেছি। ঢাকার বাইরে প্রশিকার প্রচুর কাজ করেছি। ডেনিশদের কাজ করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। মাইজদীতে ড্যানিশদের ওই প্রজেক্টে আমরা পুরস্কার পেলাম। কাজ শেষে হস্তান্তর করলাম। এটা ছিল ড্যানিডার একটা ট্রেনিং সেন্টার। যেটা পরবর্তীতে তারা বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেয়।
হঠাৎ একদিন দেখি, তিন-চারজন ড্যানিশ ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা গোপীবাগে আমার বাড়িতে এসে হাজির। কি ব্যাপার? তারা বললেন, মাইজদীতে তুমি তো ওই প্রজেক্টটা করেছ, আমরা ওই প্রজেক্টের ইন্টেরিয়ার ডিজাইন করার জন্য ডেনমার্ক থেকে এসেছি। তোমরা তো ওটার স্থপতি। কাজ করার জন্য আমরা এখন তোমার অনুমতি চাই। উনারা কি ধরনের পর্দা, ছিটকিনি লাগাবেন, কি ধরনের আসবাব ব্যবহার করবেন সে বিষয়ে ওই বিল্ডিংয়ের স্থপতি হিসেবে আমাদের নিষেধ আছে কি না সে বিষয়ে ছাড়পত্র নিতে এসেছে। আমি বললাম, বিল্ডিং তো আমি বহু আগে হস্তান্তর করেছি। তোমরা আমার কাছে এসেছ কেন? তারা বলল, না এটা তো তোমাদের ডিজাইন করা বিল্ডিং। তোমরা কি চিন্তা করে করেছ, তোমাদের কাছ থেকেই তো মতামত নিতে হবে।
ইনটেলেকচুয়াল কাজকে তারা কত সম্মান দিতে জানে, এটা শিখলাম তাদের কাছ থেকে।
আর ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, কর্তব্যক্তিরা মাযহারুল ইসলাম সাহেবের মতো স্থপতির কাজ অহরহ পরিবর্তন করছেন।
সাপ্তাহিক : এর মধ্যে আপনার সন্তানরা কে কি করছেন?
মোবাশ্বের হোসেন : আমার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে বিকম পাস করে আমার সঙ্গেই ব্যবসাতে আছে। আমার নিজের খুব আগ্রহ ইলেকট্রনিক্সের দিকে। এখন যে অত্যাধুনিক আইডি কার্ড দেখেন, এটা আমিই ১৯৭৮-৭৯ সালে বাংলাদেশে নিয়ে আসি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে দেখি যে তারা এই কার্ড ব্যবহার করে। আমার খুব কৌতূহল হলো। এটা কি ব্যবহার করে? এনবিএস নামে একটা প্রতিষ্ঠান এটা তৈরি করে। আমি আমার ছেলে এবং আরেকজনকে লন্ডনে পাঠালাম ট্রেনিং নেয়ার জন্য। সে সময় পলিথিনের প্যাকেটের মধ্যে কাগজ দিয়ে ছবি লাগিয়ে এটা করা হতো । আমি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আইডি কার্ড নিয়ে এসে এখানে প্রদর্শনী করলাম। দু’একটা প্রতিষ্ঠানকে দেখালাম। আমরা এই আইডি কার্ডের মেশিন এবং এর সবকিছুই বিক্রি করা শুরু করলাম। আমার এ কোম্পানির নাম ‘স্মরণি’।
এখন তো এ বিষয়ে অনেক ফার্ম হয়েছে, তবে আমরাই এ কাজে বাংলাদেশে পাইওনিয়ার।
গাড়ির লাইসেন্স যে কার্ডের মাধ্যমে করা হচ্ছে তার জন্য বিআরটিএ-এর কর্তাব্যক্তিকে কনভিন্স করে গাড়ির লাইসেন্স এভাবে করতে বলি। অবশ্য আমি যেভাবে বারকোড অথবা চিপস-এর মাধ্যমে সব ইতিহাস ও তথ্য সংরক্ষণ করে লাইসেন্স কার্ড করতে বলেছিলাম। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ তা করেনি।
আমি থেকে গ্রামীণ ব্যাংক ভবন ডিজাইনের জন্য আমেরিকার যে সফটওয়্যার নিয়ে এসেছিলাম, সেই কোম্পানি আমাকে বাধ্য করল এটা এখানে মার্কেটিং করার জন্য। আমরা ট্রেনিং দেয়াও শুরু করি। ‘স্মরণি’ থেকেই এসব কাজ করা হয়। ছেলে এই ব্যবসা দেখে।
সাপ্তাহিক : মেয়ে কি করেন?
মোবাশ্বের হোসেন : ছাত্র থাকাকালীন দ্য ডেইলি স্টারে পার্টটাইম কাজ করত। পরে ডেইলি স্টারে জয়েন করে। সেখান থেকে নিউএজ সংবাদপত্রে। এখন অনলাইন মিডিয়া বিডিনিউজ ২৪.কম-এ সিনিয়র কর্তাব্যক্তিদের একজন। আমার জামাই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সাংবাদিক নুরুল কবীরের শ্যালক। নুরুল কবীর এ বিয়ের ঘটকালি করেছে। তিনি একদিন এসে বললেন, আমার শ্যালকের সঙ্গে আপনার মেয়ের বিয়ে দিতে চাই। সে জাপানে এমএস করেছে। আমেরিকাতে থাকবে। আমি বললাম, আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু শর্ত একটাই ছেলে যদি দেশে থাকে তাহলে আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে। আর বিয়ের পর যদি মেয়েকে নিয়ে বিদেশে চলে যায়, তাহলে আমার সঙ্গে আর সম্পর্ক থাকবে না।
কারণ, আমার ছেলেমেয়েকে আমি বিদেশে পড়তে পাঠাইনি। আমার নিজেরই বিদেশে যাবার সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে বেশি। আমার পরিবারের প্রায় সবাই ব্রিটেনে সেটেলড করেছে। ব্রিটিশ পাসপোর্ট করার জন্য আত্মীয়স্বজন আমাকে বহু অনুরোধ করেছে। আমি তা করিনি। ছেলেমেয়েদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করিনি। আমার স্ত্রীও চাইতেন না। আমি খুব সৌভাগ্যবান এবং সম্মানিত বোধ করি, আমার জামাই আর বিদেশে যায়নি। সে কিন্তু দেশেই আছে। মেয়ে জামাইকে নিয়ে আমি ভীষণ গর্বিত ও সুখী।
সাপ্তাহিক : আপনি নিজে খেলাধুলা করতেন না। কিন্তু পরবর্তীতে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে কাজ করলেন। ক্রীড়াজগতে আপনার আসা হলো কেমন করে?
মোবাশ্বের হোসেন : বগুড়ায় থাকতে আমার নানা তার বাড়িতেই ক্লাব বানিয়েছিলেন। যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখনই আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেছি ক্লাবের জন্যে । তখন সমাজকল্যাণ বিভাগের সঙ্গে জানাশুনা হলো। ক্লাবে দুদিন দিলাম মেয়েদের। ১৯৫৮-৫৯ সালে বগুড়ার মতো একটা মফস্বল শহরে সপ্তাহে দুদিন মেয়েদের জন্য ক্লাব চালু হলো। কারণ নানাকে মানুষ খুবই শ্রদ্ধা করত। তার কারণেই মেয়েদের অভিভাবকরা সহায়তা করলেন। দেখা গেল ওই দুদিন পাড়ার সব বড়-ছোট মেয়েরা ক্লাবে আসত। প্রচুর বইপত্র আমরা সংগ্রহ করেছিলাম।
মেয়েদের ক্লাব চালু করার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সমাজকল্যাণ বিভাগে সে সময় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল। তারা তাদের ফান্ডের টাকা ব্যবহার করার জন্য ক্লাব পায় না। আমাকে দেখে প্রথমে তাদের বিশ্বাস হয়নি যে আমি ক্লাবে সংগঠক হিসেবে কাজ করতে পারি।
তারা সে সময় আমাকে দুটো সিঙ্গার সেলাই মেশিন দিল। ক্লাবে ট্রেনিং চালু করলাম। তখন তারা বলল, বয়স্কদের জন্য শিক্ষা কেন্দ্র চালু করতে চাই। এবং শিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষকদের জন্য সম্মানীও দেবে। আমি নানাকে বললাম, অবসরের পর তুমি তো ঘরে বসে শুধু আল্লাহ আল্লাহ কর। তোমাকে সম্মানী দেব। শিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষক হিসেবে কাজ কর। তখন সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে ২০ টাকা মাসিক সম্মানী দেয়া হলো। নানাকে বললাম এর অর্ধেক তুমি নেবে, অর্ধেক পাবে আমার ক্লাব।
আশপাশের প্রচুর দোকান, বেকারি ছিল তাদের যত দোকানের কর্মচারী, কাজের ছেলেমেয়ে ছিল, সবাইকে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হলো। বই, খাতা এসব সরবরাহ করত সমাজকল্যাণ বিভাগ। নানার পরিচয়ের সুবাদে সবার আস্থা পেয়েছি, ফলে সংগঠক হিসেবে এ কাজগুলো করতে পেরেছি তখন। এটা একটা বড় অভিজ্ঞতা।
আমি খেয়াল করলাম শহরে ছেলেদের এবং মেয়েদের আলাদা স্কুল। কোনো কো-এডুকেশন নেই। অথচ আমি যখন আশুগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে যেতাম, দেখতাম গ্রামে কো-এডুকেশন ছাড়া নেই। গ্রামে মেয়েদের আলাদা স্কুল নেই। ফলে মেয়েরা ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়ার পরপরই বাবা-মা তাদের স্কুলে  যেতে দিত না। তখন গ্রামে মেয়েদের জন্য আমার ছোট চাচার উদ্যোগে আমার ভাইবোনেরা মিলে স্কুল করার চেষ্টা করলাম। আমাদের বৈঠকখানায় প্রাইমারি স্কুল চালু হলো শুধু মেয়েদের জন্য।
গর্বের সঙ্গে বলি সেই স্কুল এখন হাইস্কুলে পরিণত হয়েছে। ৩৫০ জন মেয়ে সেখানে পড়ে। আমার গ্রামে কোনো ইভটিজিং নেই। স্কুলে মেয়েদের পাঠিয়ে সব বাবা-মা নিশ্চিন্তে থাকে। স্কুলে মেয়েদের রেজাল্টও খুব ভালো। তারা পাঠক্রমবহির্ভূত কার্যক্রমেই খুব ভালো করছে।
 যারা আমাদের বাড়িতে একসময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করত তাদের মেয়েরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে এখন ওই স্কুলে শিক্ষকতা করে।
আশুগঞ্জের তারুয়া গ্রামে আমাদের সঞ্চিত অর্থ, আর দাদার পাওয়া জমি দিয়ে সেখানে আমরা একটা গার্লস হাইস্কুল করেছি। একটা হেলথ কমপ্লেক্স, কমিউনিটি কমপ্লেক্স করার উদ্যোগ নিয়েছি।
সাপ্তাহিক : ক্রীড়া সংগঠক হবার কথা জানতে চাইছিলাম।
মোবাশ্বের হোসেন : আমার বসবাস তো ছিল ঢাকার গোপীবাগে। আমার অফিসও ছিল গোপীবাগ। গোপীবাগের এলাকাভিত্তিক ক্লাব ছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন। আমার ছেলে খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিল। ভালো ফুটবল খেলত। ব্রাদার্স ইউনিয়ন দলেও খেলেছে সে। একদিন আমার ছেলে আর ব্রাদার্সের এখনকার ফুটবল দলের  ম্যানেজার আমির খান এসে বলছে, আমাদের ক্লাবের নতুন প্রেসিডেন্টের খুব দরকার । আপনি আমাদের ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হন। জিজ্ঞাসা করলাম খরচ কত হবে। বলে যে, পাঁচলাখ টাকার বেশি খরচ হবে না। এটা ১৯৯৬ সালের ঘটনা।
দেখতাম যে ব্রাদার্স ইউনিয়নের মাঠে কোরবানির গরুর হাট হয়, প্রতি সপ্তাহে দুদিন করে হাউজি খেলা হয়। ব্রাদার্স ইউনিয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণ্যমাণ্য ব্যক্তিরা আমার ধানমণ্ডির বাসায় এলেন। তাদের দাবি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হতে হবে। আমি বললাম, প্রেসিডেন্ট হব, তবে শর্ত আছে দুটা। কি শর্ত? বললাম যে, ক্লাবে হাউজি খেলা চলবে না। তারা আঁৎকে উঠলেন, তাহলে ক্লাব চলবে কেমনে? জিজ্ঞাসা করলাম, হাউজি খেলে ক্লাব কত টাকা পায়? তারা জানালেন বছরে দুই-তিন লাখ টাকা। বললাম, এটা আমি ব্যবস্থা করে দেব। খেলার মাঠে গরুর হাট হয়। বললাম সেটাও বন্ধ করতে হবে। কত টাকা পান সেখান থেকে? বললেন বছরে তিন থেকে চার লাখ । বললাম, সেটা আদায়ের ব্যবস্থাও করে দেব। এর পরে আমি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হলাম।
মজার বিষয় হলো, হাউজির সঙ্গে সঙ্গে ওরা ‘ওয়ান টেন’ বলে একটা জুয়ার আসর বসাত। কিছু লোককে প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে জেতানো হতো। পরে তাকে সর্বস্ব খুইয়ে রেখে যেত হতো। জমিজমা বিক্রি করে এ টাকা জোগাতে হতো। হাউজির সঙ্গে যারা জড়িত ছিল পরে তারা আমার সঙ্গে দেখা করে বলল, আমরা ক্লাবকে আরও বেশি টাকা দেব। আমি রাজি হইনি। ক্লাব থেকে হাউজির আসর বন্ধ করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাঠ যেটা ছিল অফিসিয়ালি সেটা ব্রাদার্স ইউনিয়নের জন্য নেয়ার বন্দোবস্তু তখন করেছি।
সাপ্তাহিক : ব্রাদার্স ইউনিয়নে থাকতে স্মরণীয় আর কোনো ঘটনা?
মোবাশ্বের হোসেন : ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেট খেলোয়াড়দের জন্য ইন্স্যুরেন্স চালু করলাম। বাংলাদেশের কোথাও এটা ছিল না। স্থানীয় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর এ অভিজ্ঞতা ছিল না। দুবাই পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছে। পরবর্তীতে ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এটার ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ব্রাদার্স ইউনিয়নে ক্রিকেটারদের জন্য ইন্স্যুরেন্স চালু করা হয়। পরবর্তীতে এ প্রথা বিসিবিতে চালু হয়, তখন আমি বিসিবির একজন পরিচালক হয়েছি।
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) কীভাবে গেলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : ১৯৯৬ সালের পরে সাবের হোসেন চৌধুরী তখন বিসিবির প্রেসিডেন্ট, বিসিবিতে নির্বাচন হবে। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব থেকে আমাকে মনোনীত করা হলো নির্র্বাচন করার জন্য। কেননা তখন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ করে ব্রাদার্স ইউনিয়নের ক্রিকেট টিম তৈরি করেছি। এটা ছিল বাংলাদেশের ক্লাবগুলোর মধ্যে সে সময় সবচেয়ে দামি ক্রিকেট টিম।
ব্রাদার্স ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বিসিবিতে নির্বাচন করে জিতলাম। পরের দিন সংবাদপত্রে খবর এলো আমরা টাকা পয়সা খরচ করে নির্বাচনে জিতেছি। সেদিনই দুপুরে প্রশিকা ভবনে আমার ফার্মের অফিসে বসে বিসিবির প্রেসিডেন্ট বরাবর পদত্যাগপত্র লিখে পাঠিয়ে দিলাম। বিসিবির অফিস তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে। আমি পদত্যাগপত্রে লিখলাম, সংবাদমাধ্যমে বিসিবির পরিচালক পদে নির্বাচন সম্পর্কে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, সংবাদ মাধ্যমের খবরের প্রতি আস্থা  রেখে আমি মনে করি এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিসিবির তদন্ত করা উচিত। যেহেতু আমি সংবাদ মাধ্যমের খবরকে সত্য বলে মনে করি, সেহেতু সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আমি বিসিবির পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।
সংবাদপত্রে যে খবর বেরিয়েছিল সেটা শুধু আমাকে নিয়ে নয়, গোটা নির্বাচন নিয়েই খবরটা হয়েছিল। অন্য পরিচালকরা কেউ পদত্যাগ করেননি, বরং নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে  এ দাবি করলেন। আমার পদত্যাগের খবর মিডিয়ায় দারুণ আলোড়ন তুলল। এটা যে এত আলোড়ন তুলবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। সংবাদপত্রে আমাকে নিয়ে শিরোনাম হলো, ‘অভিযোগের প্রেক্ষিতে পদত্যাগ’। লেখা হলো আমার সম্পর্কে বিস্তারিত। আমি কে, আমার সংগঠক হিসেবে ইতিবৃত্ত সংবাদপত্রে বেরুল। ব্রাদার্স ইউনিয়নে আমি খেলোয়াড়দের জন্য ইন্স্যুরেন্স চালু করেছি, সেখানে সর্বোচ্চ টাকা খরচ করে ক্রিকেট টিম করেছিÑ এসব খবর চাউর হতে শুরু করল। পদত্যাগের কারণে মিডিয়ার কল্যাণে আমার পরিচিতি বহুগুণে বেড়ে গেল।
অন্য পরিচালকরা আমার কাছে এলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এ রকম একটা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করার জন্য। আমি অস্বীকৃতি জানালাম।
সাংবাদিকরা আমাকে বিভিন্ন সময় জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা যতদূর জানি এ নির্বাচনে তো টাকা পয়সা খরচ করা হয়েছে। তাহলে আপনি পদত্যাগ করছেন কেন? আমি বললাম, টাকা পয়সা বিনিয়োগ করলে আমি পদত্যাগ করতাম না। ঘাড় ধরেও আমাকে এখান থেকে সরাতে পারতেন না। যেহেতু নির্বাচনে আমি কোনো টাকা বিনিয়োগ করিনি সেহেতু এখান থেকে সরে আসতে আমার কোনো কষ্ট নেই। খেলার জগতে আমি ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। কিন্তু আমি চাই এটার তদন্ত হোক। এমনও হতে পারে এ নির্বাচনে আমার অজ্ঞাতসারে আমার ক্লাব থেকে টাকা খরচ করা হয়েছে। সেটা যদি ঘটে থাকে সেটারও তদন্ত হওয়া দরকার।
পরবর্তীতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে এবং অন্য আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলো।
এ সময় বিসিবির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী আমাকে টেলিফোন করলেন। তখন তার সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। তিনি বললেন, আমরা তো তদন্ত কমিটি করেছি। আপনার পদত্যাগপত্র উইথড্র করেন। আমি বললাম, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করব না। তবে, প্রত্যাহার করতে পারি এক শর্তে, সেখানে লেখা থাকবে ‘ আপনার অনুরোধে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করছি।’ উনি তখন একটু রাগান্বিত হয়ে বললেন না, এটা পারবেন না। আমি বললাম, তাহলে আমি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারও করব না। আধঘণ্টা পরে উনি আবার ফোন করলেন, বললেন, আচ্ছা। লেখেন, কিন্তু একটু পোলাইটলি লেখেন।
এসবের পরে বিসিবিতে সাবের হোসেন চৌধুরী আমাকে যে সম্মান, ভালোবাসা দিয়েছেন, যতগুলো দায়িত্ব দিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
পরবর্তীতে দুটো তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয় নির্বাচন ম্যানিপুলেশন হতে পারে কিন্তু আমার ব্যাপারে কোনো আর্থিক লেনদেন পাওয়া যায়নি।
সাপ্তাহিক : পরবর্তীতে বিসিবিতে কি আপনি থাকলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবর্তিত হলো। এসবের প্রতিবাদ করে পরের পাঁচ বছর খেলাধুলা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে আমাকে শুধু হাইকোর্টের বারান্দাতেই থাকতে হয়েছে।
সাপ্তাহিক : ক্রীড়া সংগঠকের বাইরে আপনি তো স্থপতিদের প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ (আইএবি)-এর প্রেসিডেন্ট। কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস-এর প্রেসিডেন্ট। এবং আর্কিটেক্টস্ রিজিওনাল কাউন্সিল অফ এশিয়া (আর্কএশিয়া) এর সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট। এ বিষয়ে যদি যা কিছু বলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : পরপর চার বছর আমি আইএবির প্রেসিডেন্ট, মাঝখানে এক টার্ম ছিলাম না। ভবিষ্যতে যাতে আর ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস, বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমাকে না থাকতে হয় সেজন্য আমি আইএবির সংবিধান পরিবর্তন করছি। যাতে চাইলেও আমাকে আর এ প্রতিষ্ঠানের সভাপতি করার সুযোগ না থাকে। কেননা আমি যদি আইএবিকে ভালোবাসি তাহলে আমার প্রথম কাজ হচ্ছে, আমার জীবদ্দশায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা। এ দায়িত্ব আমার ওপরেই বর্তেছে। সে কারণেই সংবিধান পরিবর্তন করছি। যাতে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নিতে পারে।
সাপ্তাহিক : এশিয়া ও কমনওয়েলথ পর্যায়ে স্থপতিদের বৃহত্তম সংগঠনগুলোতে নেতৃত্বের সুযোগ এলো কীভাবে?
মোবাশ্বের হোসেন : আমাদের স্থপতিরা সারাবিশ্বে অসম্ভব রকম ভালো দক্ষতা দেখাতে থাকে। ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস (আইএবি)-এ কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা লেজুড়বৃত্তি নেই। প্রত্যেকে প্রত্যেকের মেধার সঙ্গে নিজেকে সম্মানিত করে। মেধা দিয়ে করে এবং মেধাকে অন্যরা সম্মান প্রদর্শন করে এটা আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যে কারণে আমি সবাইকে নিয়ে কাজ করতে পেরেছি। আসলে আমি নিজে কোনো কাজ করি না। চারপাশে যারা আছে তারাই বেশি কাজ করে। দেশের যেসব স্থপতি বাংলাদেশে এখন আন্তর্জাতিকমানের কাজ করছে তাদের কারণেই আমি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি পেয়েছি যে ওদের নেতা আমি। সত্যিকার অর্থে এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো কৃতিত্ব নেই। আমি কি করেছি? স্থপতিদের কাজগুলো সারাবিশ্বে উপস্থাপন করার জন্য সবসময় চেষ্টা করেছি।

এক সময় এশিয়ান রিজিওনাল কাউন্সিল অব আর্কিটেক্টসের আমি ভাইস প্রেসিডেন্ট হলাম। পরবর্তীতে নির্বাচন করে আমি প্রেসিডেন্ট হলাম। চীন, জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার ১৭টি সর্ববৃহৎ দেশের স্থপতিদের সংগঠন নিয়ে এশিয়ান রিজিওনাল কাউন্সিল অব আর্কিটেক্টস গঠিত। এ সংগঠনের দায়িত্ব পাবার পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাবার ফলে আমি দেখলাম আমাদের দেশের স্থপতিরা বিশ্বমানের।
আমি উপলব্ধি করলাম, আমাদের ছেলেমেয়েদের জানতে হবে তারা বিশ্বমানের সন্তান। আইএবিতে আসার পর আমি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে একেবারে দশজন, বিশজন এমনকি একবার চীনে প্রায় ১০০ জন ছেলেমেয়েকে পাঠালাম। শুধু স্থপতি নয়, স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাঠালাম। কেননা শিক্ষার্থীরাই পরবর্তীতে স্থপতি হবে। এরা যখন গিয়ে দেখল যে পৃথিবীর কোনো জায়গার শিক্ষার্থীদের চেয়ে তারা কম না, তখন তাদের আত্মবিশ্বাস দারুণভাবে বাড়ল।
২০০৩ সালে এশিয়ান রিজিওনাল কাউন্সিল অব আর্কিটেক্টসের সম্মেলন আমরা করি বাংলাদেশে। আমাদের বাজেট ছিল ১ কোটি টাকা। অথচ আইএবির কাছে ১০ হাজার টাকাও ছিল না। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আমরা এটা সফলভাবে আয়োজন করি। এ সম্মেলন উপলক্ষে লালবাগ দুর্গে লাইট অ্যান্ড সাউন্ডে যেটা আমরা করেছিলাম সেটা আলোড়ন তুলেছিল ঢাকা শহরে। স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরসহ আরো দুজন আর্কিটেক্ট এটা করেছিল। যে পদ্ধতি এবং সিস্টেমে আমরা এই কনফারেন্স করেছিলাম, সেটাই এখন এশিয়ান রিজিওনাল কনফারেন্স অব আর্কিটেক্টসের নিয়ম ও রীতিতে পরিণত হয়েছে। এভাবেই আমাদের আইএবি পরিচিত হলো। আমিও একটু একটু করে পরিচিত হলাম।
এরপর কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলাম। পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কায় এই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হলাম। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেস্টসের অফিস হচ্ছে লন্ডনে। তিন বছর মেয়াদে আমি এই অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস (সিএএ)- এর  কনফারেন্স ঢাকায় বিরাটভাবে করতে যাচ্ছি। ২০০৭-০৮ সালে জরুরি অবস্থার সময় কিন্তু অনেক দেশ জরুরি অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশে আসতে অপারগতা প্রকাশ করে। তাদের বক্তব্য ছিল আইনবিহীন দেশে তারা যাওয়ার বিপক্ষে।
তবে ওই সময় স্থাপত্যের ছাত্রদের একটি আন্তর্জাতিক ডিজাইন প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সারা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ ডিজাইন জমা পড়েছিল। প্রতিযোগীদের পরিচয় গোপন করে কোড নম্বরে চিহ্নিত ডিজাইন বিচার করেছিলেন আন্তর্জাতিক বিচারকরা । শ্রেষ্ঠ ২০টি নকশা বাছাই করে যখন প্রকৃত পরিচয় বের করা হলো তখন দেখা গেল ২০টির মধ্যে ৫টিই বাংলাদেশের। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এগুলোর প্রদর্শনী করা হয়। এখান থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশের স্থপতিদের মান কোন পর্যায়ের।
UIA – International Union of Architects সারা বিশ্বের স্থপতিদের মূল প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৭ সালে এর প্রতিষ্ঠার পর এর কনফারে›েস কোনো দিন কোনো Non Architect-কে  Key Note Speaker হিসেবে বক্তৃতা দিতে দেয়া হয়নি। তৎকালীন UIA President স্থপতি গায়তান সু মালেশিয়ায় মিটিং এ আমাকে প্রস্তাব করলেন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসকে Key Note Speaker হিসাবে ইটালীর তুরীন শহরের কনফারেন্সে  নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য। তখন আমার একটি শর্ত ছিল UIA-এর President হিসেবে স্থপতি গায়তান সুকে বাংলাদেশে এসে ব্যক্তিগতভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে।
UIA President বাংলাদেশে এসে ড. ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
বিশ্বের কয়েক হাজার স্থপতির সামনে প্রথমবারের মতো একজন Non Architect কোনো প্রকার স্লাইড ছাড়া,কোনো প্রকার স্ক্রিপ্ট ছাড়াই গ্রামীণ হাউজিংয়ের ওপর বক্তৃতা করলেন। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বক্তৃতা শুনল। বক্তৃতা শেষে সমস্ত শ্রোতা দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে থাকে।  বক্তৃতা শেষে তার সঙ্গে কথা বলা ও ছবি তোলার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য কোনোদিন ভোলার নয়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়ার।
ড. ইউনূসের বক্তৃতার মূল বিষয়বস্তু ছিল - ‘গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহিতা সবাই মহিলা। গৃহঋণ নিতে হলে জমির মালিক হতে হয় স্ত্রীকে। গৃহঋণের জন্য স্বামীরা বাধ্য হলেন স্ত্রীর নামে জমি দলিল করে দিতে। গ্রামে গ্রামে কথায় কথায় তিন তালাক বলা হয়ে গেল বন্ধ। তিন তালাক বললে এখন স্ত্রীকে নয় স্বামীকেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে, কেননা  দলিলসূত্রে স্ত্রীরাই বাড়ির মালিক। ফলে স্বামীরা হয়ে গেলেন সাবধান। তিন তালাক বলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল । গ্রামীণের গৃহঋণ সমাজে নিয়ে এলো এক অন্য ধরনের পরিবর্তন।
গ্রামীণ ব্যাংকের আবাসন নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা পেয়েছে বিশ্বের একটি বিরাট পুরস্কার - Aga Khan Award in Architecture. এই গৃহ নির্মাণশৈলীর সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম । সে জন্য আমরা গর্বিত।
সাপ্তাহিক : আমার যতটুকু জানা আছে নানা বিষয়ে জনস্বার্থে আপনার মামলা করার রেকর্ড আছে। একবার গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার নিয়ে মামলা করেছিলেন। এই মামলটি নিয়ে যদি বলেন?
মোবাশ্বের হোসেন : আপনি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকান, দেখবেন সেখানে জনঅধিকার নিয়ে মানুষ সরাসরি আদালতে যাচ্ছে। আমরা কয়জন জানি যে, আইন অনুযায়ী সরকার সেলামি নিতে পারে না। সরকার নিজের আইন নিজেই ভঙ্গ করে সেলামি নিচ্ছে। দোকান বরাদ্দ দিয়ে সরকার সেলামি নিচ্ছে। আপনি রেন্ট কন্ট্রোল ল’ পড়ে দেখেন সেখানে সেলামি নেয়ার কোনো বিধান নেই। আপনি  অগ্রিম ভাড়া নিতে পারবেন না। কয় মাস পর ভাড়া বাড়ানো হবে তার নির্দিষ্ট আইন রয়েছে।
মামলা-আদালত নিয়ে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হলো, গোপীবাগে আমাদের বাসায় এক অবাঙালি ভাড়া থাকত। মূলত তাকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে প্রথম মামলা করতে হয়েছে। এই মামলা নিয়ে আমি একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি। আমার মামলা পরিচালনা করতেন যে দুইজন আইনজীবি তার একজন হচ্ছেন অ্যাডভোকেট ইদ্রিস সাহেব। আরেকজন হচ্ছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। এই মামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পরিবারের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক হয়েছিল। মজার বিষয় হচ্ছে, আজ পর্যন্ত আমি কোনো মামলায় পরাজিত হইনি।
কিন্তু গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে মামলাটি আজো শেষ করতে পারিনি। গ্রামীণফোন আমাদের যখন প্রথম সংযোগ দেয় তখন অনেক শর্ত ছিল। গ্রামীণফোন কোম্পানি একবার বলল, আপনারা যারা প্রথম সংযোগ নিয়েছেন তারা যদি সেটা সারেন্ডার করে নতুন সংযোগ নেন তাহলে অমুক দিন পর্যন্ত সুবিধা দেয়া হবে। তার মানে পূর্বের শর্তগুলো তারা অস্বীকার করতে চায়। বলা হলো ফোন রিসিভ করলে কোনো চার্জ দিতে হবে না কিন্তু ইনকামিং কলের জন্য চার্জ দিতে হবে। আমি যখন মামলা করলাম তখন গ্রামীণফোনের তৎকালীন এমডি এবং বাঙালি পরিচালক ইকবাল কাদির সাহেব আমার অফিসে এসে প্রস্তাব দিলেন এই বলে যে, মোবাশ্বের সাহেব আপনাকে আমাদের কোম্পানির উপদেষ্টা করতে চাই। আমি তাদের উদ্দেশ্য বুঝলাম। আমি ওই মুহূর্তে ড. ইউনূস সাহেবকে ফোন করে বললাম যে, দেখেন গ্রামীণফোন থেকে আমাকে ঘুষ দেয়ার জন্য আসছে।
গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা শেষ করতে পারিনি কারণ আইনজীবী পাইনি। মামলা নিয়ে যার কাছে গেছি সেই অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
আমি ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা করেছি। শেষ পর্যন্ত সব কয়টিতেই জয়ী হয়েছি। কিন্তু চেম্বার জজের মাধ্যমে একের পর এক তা স্থগিত করা হয়েছে। যে বিচারপতি তার চেম্বারে আমার মামলার রায় বারবার স্থগিত করে দিয়েছেন পরবর্তীতে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে ব্যাপক বিতর্কিত হলেন।  
সাপ্তাহিক : স্থপতি মাযহারুল ইসলাম সাহেবের ওপর একটা তথ্যচিত্র তৈরির বিষয়েও  কাজ করেছেন....
মোবাশ্বের হোসেন : আমি শুরুতেই বলেছি, মাঝে মাঝে আমার নেশা চাপে। স্থপতি মাযহারুল ইসলাম সাহেব একজন বড় মাপের মানুষ। এই মানুষটি আর দশজন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিলেন। তিনি সত্যের পক্ষে ছিলেন। যেটা ভালো মনে করতেন সেটা বলতেন। এসব কারণে তাকে আমার ভালো লাগা শুরু হলো।
 আমি যখন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ-এর সভাপতি তখন একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম যে, তার জন্মদিনে তার ওপর নির্মিত একটি ফিল্ম উপহার দেব। আমি যখন তাকে এই কথা বললাম, তিনি তখন রাগারাগি করে আমাকে তার বাসা থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি তাকে অনুরোধ করলাম, আপনার কিছুই করতে হবে না। আপনি শুধু ক্যামেরাসহ একজনকে আপনার সঙ্গে একমাস চলার অনুমতি দেবেন। আপনি কি করছেন বা কী বলছেন সে শুধু তাই রেকর্ড করবে। সে আপনাকে কোনো প্রশ্ন করবে না। এক কোণায় দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করবে শুধু। তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য স্থপতি ও ফিল্ম মেকার এনামূল করিম নির্ঝরের কথা ভাবা হলো।
সাপ্তাহিক : এ কাজের জন্য এনামূল করিম নির্ঝরকে নেয়া হোল কেন? আরও তো অনেক বড় ফিল্ম মেকার ছিলেন...
মোবাশ্বের হোসেন : এনামূল করিম নির্ঝর তখন ফটোগ্রাফির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার ইনস্টিটিউটের সবাই নির্ঝরকে পছন্দ করল না। তবে কেউ কেউ শুধু সমর্থনই করল না মূলত তারাই  এ কাজের জন্য এনামূল করিম নির্ঝরের নামটা নিয়ে এসেছেন। নির্ঝর আমার অনেক জুনিয়র। কিন্তু তার নানারকম সৃষ্টিশীল কাজ আমার কাছে ভালো লাগত। আমার নানা বলতেন, ‘যে মানুষ ওপরের দিকে উঠতে চায় তাকে কাজে লাগাও’। নির্ঝর তখন তার বিচিত্ররকম সৃষ্টিশীল কাজ দিয়ে ওপরের দিকে উঠছে। ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে কোনো টাকা দেয়া হলো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে নির্ঝরকে দুই লাখ টাকা দিয়ে বললাম, কাজ শুরু কর। যদিও আমার উদ্দেশ্য ছিল, এই তথ্যচিত্রটি ব্যক্তিগত উদ্যোগের চেয়ে ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকেই করা হোক।
পরে মাযহারুল ইসলামের ৮৫তম জন্মদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় নাগরিক সংবর্ধনায় যখন তার ওপর নির্মিত এই তথ্যচিত্রটি দেখানোর সুযোগ হলো সবাই যেন অবাক হয়ে গেলে। এক ব্যক্তির ওপরে এত সুন্দর তথ্যচিত্র হতে পারে তা কেউ চিন্তাও করতে পারেনি। সকলের আনন্দ দেখে আমার চোখে পানি এসে গেছে। আমার কাছেও বিশ্বাস হচ্ছিল না যে কাজটি এত সুন্দরভাবে হবে। পরের দিনই ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস আমার টাকা ফেরত দিয়ে তথ্যচিত্রটি গ্রহণ করে।
এখানে আমার কাছে যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে তা হচ্ছে, জীবদ্দশায় স্থপতি মাযহারুল ইসলাম এবং তার পরিবার তথ্যচিত্রটি গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে আমি তাদের মাঝে আরও বিশ্বাস স্থাপন করতে পেরেছি।
আমরা তার সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম, তথ্যচিত্রটি সিডি আকারে বের করার। এমন সময় একদিন মাযহারুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী ফোন করে আমাকে ও আমার গিন্নিকে দাওয়াত দিলেন। আমি, আমার গিন্নি এবং এনামূল করিম নির্ঝর তার বাসায় গিয়ে দাওয়াত খাই । এটা আমার জন্য এক বিরাট সম্মান। এই তথ্যচিত্রের কারণেই তার পরিবারের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলাম।
আমার মনে আছে, যেদিন জাতীয় জাদুঘর মিলনাতনে তথ্যচিত্রটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন হয় সেদিন সেখানে মিলনায়তন উপচেপড়া ভিড় ছিল। মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন তৎকালীন তথ্যপ্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ। অনুষ্ঠান চলাকালেই আওয়ামী লীগের একজন দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?  আমি বললাম কেন?   তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় কেউ যদি তার ওপর এমন একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র তৈরি করতেন! এই বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়।
সাপ্তাহিক : আপনার বয়স এখন কত?
মোবাশ্বের হোসেন : আমি ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করেছি।
সাপ্তাহিক : আপনার মৃত্যু নিয়ে ভাবনা কী?
মোবাশ্বের হোসেন : একটা মজার কথা বলি। জার্মানির বার্লিনে গেছি স্থপতিদের অ্যাসোসিয়েশনের এক কনফারেন্সে। সেখানে হঠাৎ আমার হার্ট অ্যাটাক হলো। আমার হার্টে নয়টি রিং পরানো (স্টেনটিং) হয়। এটি একটি রেকর্ড। এতগুলো রিং পরা হার্ট আপনি খুঁজে পাবেন না। অথচ তার এক মাস আগে সিঙ্গাপুরে গিয়ে চেকআপ করে এসেছি। হার্ট অ্যাটাকের কোনো লক্ষণই ছিল না।
এসব নিয়ে যখন আমার পরিবার চিন্তা করে তখন আমি তাদের বলি, যদি ’৭১-এর যুদ্ধে মারা যেতাম। আমার অনেক বন্ধুই তো মারা গেছে। আমাকে আল্লাহ হয়ত কিছু করার জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছেন। গিন্নীকে বলেছি, তোমরা ধরে নাও আমি এখন মৃত। কেননা আমার তো মারা যাবার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধেই। 
সাপ্তাহিক: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেককে হতাশা প্রকাশ করতে দেখি। আপনার অভিব্যক্তি কি?
মোবাশ্বের হোসেন : স্বাধীনতা আমাদের কি দিয়েছে তা কল্পনাও করা যায় না। দেশের বাইরে নানা জায়গায় বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বাধীনতার কথা বলি। একবার পাকিস্তানে গিয়ে আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের স্থাপত্য নিয়ে কথা বলতে বলতে মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসলীলা তুলে ধরেছিলাম। তখন এখানকার অনেকেই আমাকে নিষেধ করলেন। কিন্তু আমার বক্তৃতা শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত পাকিস্তানের তরুণ ছেলেমেয়েরা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, সত্যিই আমাদের লোকরা এই ঘৃণ্য কাজ করেছে? আমি তাদের বলেছিলাম, তোমাদের লোকরা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল যাতে করে আমরা ত্রিশ বছরের মধ্যে উঠতে না পারি। আমরা কিন্তু তোমাদের ওপর এখন প্রতিশোধ নিচ্ছি। তোমরা দেখবে, আমরা চল্লিশ বছরের ব্যবধানে তোমাদের চেয়ে ওপরে উঠেছি। আমি এখন জোর গলায় বলতে পারি, বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ভালো।
 আমাকে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট থেকে প্রফেশনাল ডেভলপমেন্টের জন্য প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা আমাকে সেই ইনস্টিটিউটের সদস্যও বানিয়েছেন। আমি যখন পুরস্কার নিতে যাই তখন দেখি, সেখানে বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়ছে। সারাপৃথিবী থেকে প্রায় তিন হাজার আর্কিটেক্ট সেখানে উপস্থিত। আমি বলেছিলাম, আমরা যদি স্বাধীন না হতাম তাহলে আজ এই মর্যাদা পেতাম না। স্বাধীনতা না পেলে বড়জোর পাকিস্তানের একজন কর্মচারী হিসেবে বেঁচে থাকতে হতো। স্বাধীনতা আমাদের স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমরা যদি চাই এবং আমাদের সরকার যদি আন্তরিক হয় তাহলে আগামী পাঁচ ছয় বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাবে।
সাপ্তাহিক: বাংলাদেশ নিয়ে আপনি এতটাই আশাবাদী?
মোবাশ্বের হোসেন : অবশ্যই। আমি পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত সম্ভাবনাময় দেশ কোথাও নেই। যদি শুধু মিষ্টি পানির কথাই বলি তাহলে দেখবেন, এরকম মিষ্টি পানি কোথাও নেই। কিন্তু আমাদের এখন পানি কিনে খেতে হচ্ছে। আপনি পৃথিবীর কোথাও একটি রাজধানী দেখাতে পারবেন যার চারপাশে নদী রয়েছে। কিন্তু আমাদের তা আছে। কিন্তু এই মিষ্টি পানিতে আমার মতো আপনার মতো শিক্ষিতরাই বিষ মেশাচ্ছে।
বাংলাদেশের স্থপতিরা প্রতিবছর পৃথিবীর নানান জায়গা থেকে আন্তর্জাতিকমানের পুরস্কার আনছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন স্থপতির কাজ এতটাই পছন্দসই হয়েছে যে সেটা ঠিক রাখতে যেয়ে মালয়েশিয়া  তাদের দেশের প্রচলিত আইন পর্যন্ত পরিবর্তন করেছে। সেই মেধাবী স্থপতির নাম রফিক আজম। এটি কিন্তু ছোটখাটো কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এই সন্তানগুলোকে আমরা বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করতে পারিনি। তারা কিন্তু এখন বিশ্বের সব জায়গা থেকেই পুরস্কার পেতে শুরু করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের আর্কিটেক্টরা যে পরিমাণ পুরস্কার এনেছেন তা কিন্তু আর কোনো সেক্টর থেকে আনতে পারেনি।
সাপ্তাহিক : এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনার অবর্তমানে আপনার প্রতিষ্ঠানের হাল ধরবে কে?
মোবাশ্বের হোসেন : আমার এখানে যারা কাজ করে তাদের বেশিরভাগই ছাত্রজীবনেই ঢুকেছে। আপনি চাইলে দ্বিগুণ বেতন দিয়েও তাদের নিয়ে যেতে পারবেন না। এই অফিসে কয় টাকা কোথা থেকে আসছে এবং কোথায় ব্যবহার করা হচ্ছে তা অফিসের একজন পিয়নও জানেন। এখানে গোপনীয়তার কিছু নেই। আমি যদি তাদের ছয় মাস বেতন নাও দেই তারা জানবে কি কারণে তাদের বেতন দেয়া হচ্ছে না। এই বিশ্বাসযোগ্যতাই আমার শক্তি। নীড় লিমেটেড এসব মানুষকে নিয়েই গড়ে উঠেছে। আমার অবর্তমানে এই মানুষরাই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরবে।
সাপ্তাহিক : আপনার মা কি এখনো বেঁচে আছেন?
মোবাশ্বের হোসেন : হ্যাঁ। আমার মা বেঁচে আছেন। লন্ডনেই তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। সেখানেই আমার ছোট ভাইয়ের কাছে থাকতেন। তারা সময় দিতে পারত না। মা আবার স্বাধীনচেতা মানুষ। এই অবস্থায় তার বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। পরে আমি ভাইকে বললাম, তোমরা মাকে পঞ্চাশ বছর ধরে কাছে রেখেছ  এখন সে আমার কাছে থাকবে। আমি মাকে লন্ডন থেকে ঢাকায় নিয়ে আসলাম। খুবই অসুস্থ অবস্থায় নিয়ে আসলাম। ওখানকার ডাক্তার বলেছিলেন, তার বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু আপনি গিয়ে দেখেন, মা এখন সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়ানোর শক্তি রাখে। মা যখন আসেন তখন তার ডায়বেটিকসের মাত্রা ছিল ২১। এখন তা ৬ থেকে ৮। এখন তিনি সারা বাংলাদেশ গাড়িতে করে ঘুরে বেড়ান।
সাপ্তাহিক : আপনার মধ্যে কি কখনও হতাশা কাজ করেছে?
মোবাশ্বের হোসেন : না। আমার মধ্যে কখনও হতাশা কাজ করেনি। ধরুন আগ্নেয়গিরির আগুন দগদগ করছে। কেউ ফুটা করেনি বলে আগুন বাইরে আসতে পারেনি। কিন্তু কেউ না কেউ ফুটা করবে। ক্ষুদিরামকে কী কেউ বলেছিল যে, তুমি বোমা ফাটালে দেশ দুই দিনের মধ্যেই স্বাধীন হবে। কিন্তু আমি মনে করি, ক্ষুদিরামের অবদানের জন্য দেশ এক ঘণ্টার জন্য হলেও আগে স্বাধীন হয়েছে। আমার কোনো কাজে দেশ এক ঘণ্টার জন্যও যদি আগে উন্নত হয় সেটাই আমার অর্জন। রাতারাতি পরিবর্তন হতে চাওয়াটাই বোকামি। একটি গাছ লাগিয়ে ফল পেতে হলে সময় দিতে হবে। 
আমি আগে একটি বিষয় চিন্তা করতাম। তা হচ্ছে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু আমি চিন্তা করলাম, একটি গরু বা ছাগলের বাচ্চা প্রসব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিতে পারে। কিন্তু মানুষের জন্মের পর হাঁটতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। তাহলে কীভাবে সৃষ্টির সেরা জীব হলো? পরে বুঝলাম, সেরা বলেই হাঁটতে শিখতে তার সময় লাগছে। মায়ের গর্ভে আসার পর থেকেই তার ওপর সকলের নজর পড়ে। সে হাঁটতে গিয়ে যতবার পড়ে যাচ্ছে ততবার তার আপনজনরা তুলে দিচ্ছে। সামাজিকভাবে বা পারিপার্শিক পরিবেশে একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়ানোই হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা। ধরুন, একটি শিশু তার মায়ের হাত থেকে কাদার মধ্যে পড়ে গেল। এখন ওই নোংরা শিশুটিকে কি মা ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন। অবশ্যই না। মানুষ কোনোভাইে একা বাঁচতে পারে না। একজন প্রতিবন্ধী শিশুকেও বাবা-মা চায় না যে সে অবহেলায় অযতেœ মানুষ হোক। আত্মীয়স্বজন তাকে আগলে রাখে। 
আমাদের দেশের গণতন্ত্রকেও কিন্তু এই শিশুর সঙ্গে তুলনা করা যায়। একে লালন পালন করা সকলেরই কর্তব্য। এখন গণতন্ত্রের যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এই অজুহাতে যদি অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ডেকে এনে ক্ষমতায় বসানো হয় তাহলে ওই শিশুর মতো ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হবে। আমরা সেটা করতে পারি না।
সাপ্তাহিক : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার কিছু স্মৃতির কথা শুনেছি। সে বিষয়ে যদি কিছু বলেন।
মোবাশ্বের হোসেন : গত বছর ‘এশিয়ান রিজওনাল কাউন্সিল অব আর্কিটেক্টস’-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে যখন পাকিস্তানে গেলাম তখন দেখলাম ১৯৭১ সালে ঢাকা শহরের যে অবস্থা ছিল লাহোরের অবস্থা সেরকম। যে হোটেলে উঠলাম সেখানে চার-পাঁচটি মেশিনগান তাক করা আছে। কুকুর দিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাহসির (যাকে পরে তার দেহরক্ষী গুলি করে হত্যা করে) আমার পাশে বসে বললেন, তোমার দেশের ছাত্রদের নিয়ে আসনি কেন? আমি বললাম, তোমার দেশে তো কোনো নিরাপত্তা নেই। যে দেশে বিদেশি ক্রিকেট খেলোয়াড়রা গুলি খায় সে দেশে কোনো ছাত্র আসতে পারে না। তখন সে বলল, না না। সবকিছুই ঠিক আছে। আমি বললাম, আজ সকালে লাহোরের ৫০ কিলোমিটার দূরে একটি মসজিদে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে তুমি কি জানো? সে বলল না। বললাম, তুমি না জানলেও আমি জানি। তোমার দেশে এই প্রোগ্রামে আসার জন্য আমি সকাল বিকাল তোমাদের জিও টিভি দেখে পরিস্থিতি মনিটর করেছি। তিনি আমার ওপর এক প্রকার রেগে গেলেন।
আমি বললাম, আমি যখন বের হচ্ছি তখন এত সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী আমাকে ঘিরে রাখছে কেন? তিনি বললেন, তোমাকে সম্মান জানানোর জন্য। আমি আবারও বললাম, তাহলে আমার পেছনে অ্যাম্বুলেন্স কেন? তখন উনি আর উত্তর দিতে পারেনি।
ওই প্রোগ্রামে ১৭টি দেশের আর্কিটেক্টরা উপস্থিত ছিলেন। আমাদের জন্য একটি ভবনে ব্যবস্থা করা হলো। ভবনটি দূরবর্তী একটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা । মনে হল, রকেট লাঞ্চার মারলেও সেখানে কিছু হবে না। আমাদের সঙ্গে একই মঞ্চে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি অংশ নিলেন। প্রায় চার ঘণ্টা তিনি সেখানে থাকলেন। অনেক আলোচনা হলো। মজার বিষয় হলো, আর্কএশিয়ার চেয়ারম্যান হিসাবে আমি পাকিস্তানের অনেক আর্কিটেক্টকে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। 
সাপ্তাহিক : শ্রীলঙ্কার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার সঙ্গেও আপনার দেখা হয়েছিল?
মোবাশ্বের হোসেন : আমি শ্রীলঙ্কার এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে সেখানেই আর্কিটেক্টস রিজওনাল কাউন্সিল অব এশিয়া (আর্কএশিয়া)-এর প্রেসিডেন্ট হলাম। এর পরের বছরই আবার শ্রীলঙ্কাতেই কমনওয়েলথ এসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টস (সিএএ)-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলাম। একটি বড় সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হলো। সেখানে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীসহ আটজন মন্ত্রী ছিলেন। আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন বললাম, আমার তো শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। এখানেই আমি আর্কএশিয়া এবং কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টস-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলাম। আমি শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় নাগরিকত্ব পেতে আগ্রহী। তখন শ্রীলঙ্কার আর্কিটেক্ট অ্যসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট দাঁড়িয়ে বললেন,  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী , মি. মোবাশ্বের কে সে সুযোগ দিলে দেখবেন একদিন হয়ত দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার দখল করে ফেলেছে! প্রায় দেড় হাজার শ্রোতার মাঝে বিষয়টি খুব হাস্যরসের খোরাক জোগায়।
ওই অনুষ্ঠানের পর স্থাপত্য মেটেরিয়ালের এক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করি। সেটি ও দেশের পত্রিকায় অনেক বড় করে ছাপা হয়। তখন চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নন। নির্বাচনে হেরে গেছেন। তবে অসম্ভব রকমের জনপ্রিয়। আমি এক আর্কিটেক্টের বাড়িতে দাওয়াতে গেছি। এমন সময় এক ভদ্র মহিলা এসে বললেন, আপনার সঙ্গে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা সাক্ষাৎ করতে চায়।  আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
 এর কিছুক্ষণ পর দেখি, চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা গাড়ি নিয়ে নিজেই ওই বাসায় চলে  এসেছেন। আমি দৌড়ে তার গাড়ির কাছে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, মি. হোসেন আমার পাশের সিটে বসুন। বসলাম। চলন্ত গাড়িতে রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হলো। বোমার আঘাতে তার একটি চোখ অন্ধ। গাড়িতে বসেই নানাজনকে ফোন করে বলছিলেন, আমি এখন কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টস-এর প্রেসিডেন্ট আর্কিটেক্ট মোবাশ্বের হোসেনের সঙ্গে প্রদর্শনীতে যাচ্ছি। তোমরা সেখানে এসো। তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। তিনি আমার সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবস্থান করে সেই প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখলেন। প্রচুর ছবি তুললেন। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে যে সম্মানটুকু দিলেন তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটি আমার জন্য বড় একটি পাওয়া ছিল।
সাপ্তাহিক : বহু কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত আপনি। কোন ক্ষেত্রটি আপনার প্রিয়?
মোবাশ্বের হোসেন : সবচেয়ে আনন্দ পাই ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি ক্রীড়া ও ক্রীড়ার উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে। আমার প্রিয় নেতাদের একজন নেলসন ম্যান্ডেলা। তার এই উক্তিটি আমাকে সবসময় প্রেরণা জোগায় ‘The sports has the power to change the world. It has the power to unite people in a way that little else does.’

ছবি : কাজী তাইফুর ও সংগ্রহ

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • ‌'রাজনীতি এখন ভোগের মহিমা শেখায়'-ড. তোফায়েল আহমেদ
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive