Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২৫ ১৪ই অগ্রহায়ন, ১৪২৫ ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
[শ্রদ্ধাঞ্জলি] অনন্য প্রতিভা হবীবুল্লাহ বাহার  

পলাশ মজুমদার

‘সৌম্যদর্শন বাহার, সুন্দর স্বাস্থ্যবান বাহার, খেলোয়াড় বাহার, সুন্দর কথকতা করার বাহার, সাহিত্যিক বাহার, সাংবাদিক বাহার, বক্তা বাহার, হাস্যরস রচয়িতা বাহার, আর মন্ত্রী বাহার কতভাবে জীবননাট্যের কত রঙ্গমঞ্চেই তাহাকে দেখিয়াছি। বস্তুত একাধারে এতগুলি গুণের আধার কোনো মানুষেই দেখা যায় না।’
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন যার সম্পর্কে এতগুলো অভিধা দিয়েছেন তিনি হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। জন্মেছিলেন ১৯০৬ সালে নোয়াখালী জেলাধীন তৎকালীন ফেনী মহকুমার পরশুরামের উত্তর গুথুমা গ্রামে।
১৯০৯ সালে পিতা মোহাম্মদ নুরুল্লা মৃত্যুবরণ করলে সংসারে নেমে আসে দৈন্যের ছায়া। এ পর্যায়ে মাতামহ খান বাহাদুর আবদুল আজিজ বিএ (যিনি অত্রাঞ্চলের প্রথম মুসলিম বিএ ডিগ্রিধারী, যার নামে গুথুমা হাই স্কুল নামকরণ হয়েছে) তাদের সকল দায়িত্ব নেন। তার একমাত্র বিদূষী ভগ্নি শামসুন নাহার মাহমুদ (যার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের একটি হলের নামকরণ হয়েছে। তিনি ছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার একনিষ্ঠ অনুসারী) তাঁর জন্মের দু’বছর পর, ১৯০৮ সালে একই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
গুথুমা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হবীবুল্লাহ বাহারের শিক্ষাজীবন শুরু হলেও মাতামহের ইচ্ছায় তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে এবং এখানে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন । কারণ মাতামহ খান বাহাদুর আবদুল আজিজ ছিলেন তখন চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্কুল পরিদর্শকের মতো উচ্চপদে আসীন। স্নেহভাজন দৌহিত্রকে তিনি নিজ সাহচর্যেই রাখতে চেয়েছিলেন। তারপর বাহার চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে আইএসসি এবং কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে বিএ পাস করেন।
সহজাত নেতৃত্বের ভাব জেগে ওঠে তার ছাত্রজীবনেই। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্ভুক্ত এই বাংলাদেশে তখনও আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মূলত হিন্দুদেরই আধিপত্য। সেই আধিপত্যের ঊর্ধ্বে উঠে বাহার তার নিজ যোগ্যতা ও বলিষ্ঠতায় নেতৃত্ব করায়ত্ত করতে সক্ষম ছিল। এ অবস্থায় তিনি সংস্পর্শে আসেন তৎকালীন বিশিষ্ট রাজনৈতিক, কবি, সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন গুণী ব্যক্তিদের। ১৯২৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডুর সুনজর পতিত হয় হবীবুল্লাহ বাহারের ওপর। ছাত্র অবস্থাতেই তার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব নাইডুকে মুগ্ধ করে। আর এ থেকেই তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। এই প্রেক্ষিতে বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামে আসেন। ওই সময় তিনি বাহার সাহেবদের তামাকুমুণ্ডীর বাড়ি ‘আজিজ মঞ্জিল’-এ অবস্থান করেন। নজরুলের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসার কারণে তিনি তখন কবির বিশেষ অনুরাগী হয়ে ওঠেন। কবির ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যের কবিতাগুলির জন্ম হয়েছে চট্টগ্রামে, বাহার-নাহারদের বাড়িতে। নজরুলের বিখ্যাত ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতাটিও সেখানেই রচিত। বাহারের পাশাপাশি নাহারও কবির ভক্ত হয়ে ওঠেন। কবি বিভিন্ন জায়গায় এই দুই ভাইবোনের আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কবির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল আমৃত্যু অটুট। সেই সঙ্গে তাঁদের দু’জনের জীবনেও পড়েছে নজরুলের গভীর প্রভাব। তাদের মাঝেও জেগে ওঠে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ।
বাহার-নাহারের যুক্ত সম্পাদনায় ‘বুলবুল’ নামে সাহিত্য পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪০ সালের বৈশাখ মাসেÑ আজ থেকে দীর্ঘ ৭৮ বছর আগে, কলকাতা থেকে। এই ‘বুলবুল’ পত্রিকার  সঙ্গে কবি নজরুল ছিলেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পত্রিকার প্রায় প্রতি সংখ্যাতেই তার কোনো না কোনো লেখা প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটির ওপর নজরুলের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। এমনকি পত্রিকাটির নামকরণও হয়েছিল তার অকাল প্রয়াত পুত্র বুলবুলের স্মৃতিকে উদ্দেশ্য করে। এই পত্রিকা সম্বন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও ভূয়সী প্রশংসা করেনÑ ‘বুলবুল পত্রিকাখানি পড়ে আশান্বিত হলুম। আনন্দের সঙ্গে আমি আমার অভিনন্দন প্রেরণ করছি। কৃতজ্ঞ দেশের আশীর্বাদে তোমাদের উদ্যম জয়যুক্ত হোক।’ অনেক খ্যাতিমান লেখক-সাহিত্যিকের লেখায় ‘বুলবুল’ পত্রিকাটি সেসময় খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেছিল।
হবীবুল্লাহ বাহারের ছিল মূলত ত্রিবিধ নেশা - খেলাধুলা, সাহিত্য ও রাজনীতি। এসবের প্রতি তার ছিল স্বভাবজাত আকর্ষণ। তবু এই তিনের মধ্যে সাহিত্যই হয়তবা ছিল তার প্রাণের সম্পদ, তাই তার সাহিত্যিক মন ও শিল্পী মন সব রকমের ব্যস্ততার মাঝেও অটুট ছিল। আর তারই ফলশ্রুতিতে তিনি লিখে গেছেন - আমীর আলী, ওমর ফারুক, কবি ইকবাল, পাক জীবন, পাকিস্তান ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্সহ নানা গ্রন্থ। ‘বুলবুল’ পত্রিকা সম্পাদনা তার সাহিত্যপ্রীতির অনন্য নিদর্শন। নিজে লেখার চেয়ে লেখক সৃষ্টির প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড ঝোঁক। সে সময় মুসলমান সম্পাদিত পত্রিকা ছিল হাতেগোনা কয়েকটি  এবং মুসলমান লেখকের সংখ্যাও ছিল কম। ’বুলবুল’ তার মধ্যে শীর্ষে ছিল। তার যত গুণই থাক না কেন, বুলবুল পত্রিকা সম্পাদনার কৃতিত্ব তার আর সব গৌরবকে ম্লান করে দিয়েছে।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হবীবুল্লাহ বাহার খেলাধুলার ক্ষেত্রেও ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান। কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে ‘বি’ ডিভিশন থেকে ‘এ’ ডিভিশনে উন্নীত করার পেছনে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তারই। ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত বাহারের অক্লান্ত পরিশ্রম, উদ্দীপনা ও নির্ভীক নেতৃত্বে মোহামেডান স্পোর্টিং টিমে যে জাগরণ এসেছিল তারই ফলে ক্লাবটি ১৯৩৩ সালে প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়। সর্বদিকে অবহেলিত তৎকালীন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এই সাফল্য এক নবজাগরণের সূত্রপাত করে। অবশ্য, ছাত্রজীবনেই দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে তার নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩২ সালে হবীবুল্লাহ বাহার ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চট্টগ্রামে অবস্থানকালীন সময়ে মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে পুলিশ সার্ভিসে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তার সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত না হওয়াই হয়ত তাকে টেনে এনেছিল রাজনীতিতে। ১৯৪৫ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজের যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর তারা স্থায়িভাবে ঢাকায় চলে আসেন। এসময় তিনি ফেনী মহকুমার পরশুরাম থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে নোয়াখালী অঞ্চল পরিদর্শন করেন যার স্মৃতিচিহ্ন আজো ‘গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট’-এর অধীনে নোয়াখালীর চৌমুহনী এবং ফেনীর মুন্সীরহাটে রয়ে গেছে। তাছাড়া ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগের সময় সিলেট প্রশ্নে (সিলেট ভারত নাকি পাকিস্তানের অংশ হবে) রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য সর্বসাধারণের প্রত্যক্ষ গণভোটে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের প্রথম যে বঙ্গসাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেই অভ্যর্থনা কমিটির প্রধান ছিলেন হবীবুল্লাহ বাহার। ১৯৫১ সালে তার নেতৃত্বে ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়া সংস্থা’ প্রথম স্থাপিত হয় এবং পরে তিনি এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
সমাজসেবা, দেশপ্রীতি ও মানবপ্রেম তার চরিত্রে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। মহান উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে। কারণ পরাধীন দেশে দেশপ্রেমের জোয়ারের অভিঘাত তাকেও স্পর্শ করেছিল। শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যোগ দিয়েছিলেন কৃষক-প্রজা পার্টিতে। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক  নির্বাচনে হক সাহেবের মন্ত্রিসভায় হবীবুল্লাহ বাহার মনোনীত হন। কিন্তু ক্ষমতালিপ্সুদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অবশেষে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। পরে শেরে বাংলা  মুসলিম লীগে যোগ দিলে তিনিও তার পথ অনুসরণ করেন। নতুন এ দলে তিনি  কার্যকরী সমিতির প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৪৩ সালে তিনি ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনর্জাগরণ সমিতি ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় মুসলমানদের অভিন্ন আবাসভূমি নির্মাণে তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নীতি অনুসরণ করেছিলেন। অবশ্য সেটা ছিল যুগের চাহিদা। প্রকৃতপক্ষে তিনি চেয়েছিলেন বাংলার মুসলমানদের মুক্তি। দেশভাগের পর  তিনি ’৫২র ভাষা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলা, বাঙালি ও বাংলা ভাষার মুক্তির জন্য তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ববাংলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য। ঢাকার ইতিহাস-অখ্যাত মশার আক্রমণ থেকে ঢাকাবাসী রক্ষা পেয়েছিল তারই কিছু পদক্ষেপের জন্য। কথিত আছে Ñ বাহার সাহেবের আমলে আদতে ঢাকায় কোনো মশা ছিল না। উল্লেখ্য, ঢাকার শান্তিনগরে অবস্থিত হবীবুল্লাহ বাহার কলেজটি তার নামে প্রতিষ্ঠিত।
দীর্ঘ ১৩ বছর রোগ-ভোগে নিদারুণ যন্ত্রণায় কেটেছে এই মহান পুরুষের দিন। ১৯৬৫ সালের শেষ ভাগে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। অবশেষে ১৯৬৬ সালের ১৫ এপ্রিল, বাংলা ১৩৭৩ সালের পহেলা বৈশাখ শুক্রবার নববর্ষের সূচনায় মাত্র ৬০ বছর বয়সে রাজনীতিক, ক্রীড়াবিদ, সাহিত্যিক, সমাজসেবী হবীবুল্লাহ বাহার তার ঢাকায় শান্তিনগরের বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি পাঁচ কন্যা ও এক পুত্রের জনক ছিলেন। তার একমাত্র পুত্র ইকবাল বাহার চৌধুরী বর্তমানে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র বাংলা বিভাগে কর্মরত। দেশের জন্য তার অবদানের কথা চিন্তা করে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
pmazumder1979@yahoo.com

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.
বর্তমান সংথ্যা
পুরানো সংথ্যা
Click to see Archive
Doshdik
 
 
 
Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive