Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২৫ ১৪ই অগ্রহায়ন, ১৪২৫ ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
‘পৃথিবীর সব দেশ এই বর্জ্যযুক্ত জাহাজ ভাঙা বন্ধ করে দিয়েছে’ -সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান  

হাইকোর্টের রায়ের আলোকে বিধিমালা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ভাঙার জন্য বর্জ্য জাহাজ আমদানি নিষিদ্ধ করেছে আদালত। একই সঙ্গে জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে ৬টি নীতিমালার আলোকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে সম্প্রতি এ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, ২০০৯ সালে হাইকোর্ট ৬টি নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। নীতিমালাগুলো হলোÑ রাসেল কনভেনশন আইন ১৯৮৯, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, শ্রম আইন ২০০৬, মেরিন ফিশারিজ আইন ১৯৮০, টেরিটোরিয়াল ওয়াটার এ্যান্ড মেরিটেন জোন এ্যাক্ট ১৯৭৪ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭।
বাংলাদেশ পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।
রিট আবেদন দায়েরকারী বেলার পক্ষে শুনানি করেন নির্বাহী পরিচালক এ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। অপরদিকে জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিকদের এ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে শুনানি করেন  ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, এ্যাডভোকেট আনিসুল হক এবং ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। রায় ঘোষণার পর সাপ্তাহিক-এর মুখোমুখি হন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভ কিবরিয়া সহায়তায় শরিফুল ইসলাম পলাশ

সাপ্তাহিক : জাহাজভাঙা শিল্পের ব্যাপারে হাইকোর্ট যে রায় দিল- এটা সম্পর্কে কিছু বলেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : মূলত আমরা ওই মামলাটা করেছিলাম জাহাজভাঙা শিল্প যে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেটার উপরে। আমরা এমন কিছু নির্দেশনা চেয়েছিলাম যে নির্দেশনাগুলো পেলে এবং সরকার সেগুলো মানলে জাহাজ ভাঙা শিল্পকে একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা সম্ভব হবে। কারণ আপনি জানেন যে, এখানে ইয়ার্ডগুলোতে আমাদের ঢোকার কোনো উপায় নেই। এটা আসলে একটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বর্জ্য চলাচলের বিষয়। কারণ এ জাহাজগুলো একটাও কিন্তু আমাদের জাহাজ নয়। এগুলোর বেশিরভাগই ইউরোপীয় জাহাজ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাপান এবং আমেরিকার দু’একটা জাহাজ আসে। যখন এ জাহাজগুলোর জাহাজ হিসেবে ব্যবহার শেষ হয়ে যায়, তখন তারা এগুলোকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয় ভাঙার জন্য। বিশ্বের মাত্র তিনটা দেশ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জাহাজ ভাঙে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান। ভারতে ভাঙে শুধু গুজরাট। মুম্বে একসময় ভাঙত পরে বন্ধ করে দিয়েছে। পাকিস্তান তখনই জাহাজ ভাঙতে পারে যখন বাংলাদেশে জাহাজভাঙা বন্ধ থাকে।
অন্য প্রতিযোগিদের টপকে বাংলাদেশিরা অনেক বেশি দাম দিয়ে এসব জাহাজ কিনে আনে।
সাপ্তাহিক : এত বেশি দাম দিয়ে জাহাজ কেনার পেছনের কারণটা কী?
 সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : এর পেছনের দর্শনটা হলো  এদের চার্জটা কম। এরা সবকিছু বিক্রি করে। এমনকি এ্যাজবেস্ট-এর গুঁড়াগুলো পর্যন্ত তারা বিক্রি করে। এই এ্যাজবেস্ট গুঁড়াটা মানুষের মধ্যে ক্যান্সারের জন্ম দিতে পারে।
সাপ্তাহিক : আপনারা কেন এ শিল্পটাকে নিয়ন্ত্রণের কথা বললেন?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : আমরা এ শিল্পকে নিয়ন্ত্রণের কথা বলছি এ কারণে যে, মূলত এ শিল্পটা বাংলাদেশে চলে দুটো যুক্তির ভিত্তিতে। একটা হলোÑ এটা বাংলাদেশের লোহার চাহিদা মেটায়, আরেকটা হচ্ছে  এটা কর্মসংস্থান করে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এ দুটো যুক্তি আসলে খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এ জাহাজগুলো যে পরিমাণ লোহা সরবরাহ করে সেটা দেশের মোট লোহার চাহিদার ২৫ ভাগ। বাংলাদেশ মোট চার ভাবে লোহা আনে। একটা হচ্ছে সরাসরি রড নিয়ে আসে। দ্বিতীয়ত সে বিলেড এনে সেখান থেকে রড বানায়। তিন নম্বর হচ্ছে স্ক্র্যাপ আনে । স্ক্র্যাপ থেকে রড বানায়। আর চার নম্বর জোগান হচ্ছে জাহাজভাঙা শিল্প।
আমাদের যুক্তি হচ্ছে মাত্র ২৫ ভাগ লোহার জন্য বিদেশি এই বর্জ্যটাকে গ্রহণ করা কেন দরকার। আমার সমুদ্র সৈকত এলাকাকে কেন নষ্ট করা দরকার। কেন আমার কোস্টাল ফিশারিকে ধ্বংসের মুখে ঢেলে দেয়া দরকার। কেন আমাদের জেলেদের তার জীবিকা থেকে বঞ্চিত করা দরকার। কেন আমার এতগুলো মানুষকে মৃত্যুর মুখে রাখা দরকার।
আপনি এ বিষয়ে যে বই-ই পড়বেন সেখানেই লেখা আছে ‘ইট ইজ এন ইনভায়রনমেন্টলি ডেঞ্জারাস ইন্ডাস্ট্রি...।’ একসময় উন্নত দেশে সবাই জাহাজ ভাঙলেও গ্রাজুয়্যালি এগুলো এমন সব দেশে চলে গেছে যে, দেশগুলো পরিবেশ ও শ্রম আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে খুবই দুর্বল। এটার জন্য তো জাতি হিসেবে অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, আমাদেরকে বিশ্ব এভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা কোনো আনন্দের বিষয় না। তাও যদি এই শিল্পটা জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো শিল্প হতো, যদি চাহিদার ৮০ শতাংশ লোহার জোগান দিত তাহলে কিন্তু আমরা এভাবে বলতাম না। যেখানে আমরা প্রমাণ পেয়ে গেলাম যে এরা ৮০ ভাগ না, মাত্র ২৫ ভাগ লোহার চাহিদার জোগান দেয়। তাও  আবার নিম্নমানের লোহা। বুয়েটের একটি রিপোর্টে আছে যে, এই লোহা কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যবহার করা উচিত না।
২০০৮ সালে যখন লোহার দাম প্রচণ্ড বেড়ে গেল তখন সরকার তদন্ত করে বলল এরা কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে। তারপর বেশি দামে লোহা বাজারে ছাড়ে। এরা এটা করতে পারে কারণ এদের অনেকেই আবার রি-রোলিং মিলের মালিক। ফলে ওখানে গিয়ে প্রডাকশন কস্টটা ডাউন করে দেয়। বাজারে সরবরাহটা কমিয়ে দেয়। এসব বিবেচনা করে আমাদের যুক্তিটা হলো যে, আসলেই কী লোহার জন্য এ শিল্পের আমাদের দরকার? দুই নম্বর হচ্ছে এখানে কর্মসংস্থান হয়। মৃত্যুর ঝুঁকিতে ভরা জাহাজভাঙা শিল্প যদি কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হয় তাহলে দাসত্বকে আপনি কেন এমপ্লয়মেন্ট বলবেন না।
জাহাজভাঙা শিল্পে স্থানীয় শ্রমিক নেই। এদেরকে উত্তরবঙ্গ থেকে নিয়ে আসা হয়। এদের দুর্দশার সুযোগ নিয়ে মঙ্গাপীড়িত মানুষগুলোকে দিয়ে দু’মাসে একটা জাহাজ ভাঙানো হয়।
আমরা তখন আদালতে গিয়ে বললাম এই যে জাহাজগুলো আসে এগুলোতে ইনবিল্ড অনেক বর্জ্য থাকে। যেগুলো ভাঙার প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে এ্যাজবেস্টজ। ১৫ থেকে ৩০ বছরের পুরানো সব জাহাজেই এটা থাকে। ঐ এ্যাজবেস্টজের একটা ফোঁটা গায়ে গেলে আপনার ক্যান্সার হতে পারে।
আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেকদিন জাহাজ আসতে পারেনি। এখনো সে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে। কিন্তু সরকার ভিন্ন রকম আইন করে আবার জাহাজগুলোকে ঢুকাচ্ছে। আদালতের নির্দেশ কিন্তু এক ইঞ্চিও বদলায়নি। কিন্তু সরকার আইনগুলো ভিন্নভাবে করে এই অপকর্ম করছে।  তার বিরুদ্ধেই আমরা আবার গিয়েছিলাম আদালতে। গত এক বছরে মারা গেছে ৩০ জন শ্রমিক। আর পঙ্গু হয়েছে ২৫ জন শ্রমিক।
আমরা কোর্টে গেছি মূলত এটা বলতে যে, জাহাজগুলো উন্নত বিশ্বের। এগুলো কীভাবে ভাঙা হবে, কীভাবে বর্জ্য নিষ্কাশন করা হবে সেই দায়িত্ব উন্নত বিশ্বের। সে দায়িত্ব আমার না। আমাকে কেন নিতে হচ্ছে। আমার নাকি লোহা লাগবে। বিশ্বে দেশ আছে ১৯৫, লোহা আছে ১৪টার। বাকি দেশগুলো কেমন করে লোহার চাহিদা মেটায়। ওরাও তো মেটায়। শ্রীলঙ্কা মেটায় না, নেপাল মেটায় না? বাংলাদেশের পরে শ্রীলঙ্কায় এসব জাহাজ নেবার কথা ছিল। শ্রীলঙ্কার সরকার সাফ বলে দিয়েছে আমরা এটা নেব না। 
সাপ্তাহিক : আপনারা এর আগে মামলা করেছিলেন, প্রত্যয়ন চেয়েছিলেন বর্জ্যযুক্ত জাহাজ দেশে ঢোকার আগে প্রি-ক্লিনিং বা শিল্পবর্জ্য পরিষ্কার হবার নিশ্চয়তা।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : ওরা কিন্তু প্রি ক্লিনিং সার্টিফিকেট আনে। সেগুলো ভুয়া। আমরা তো সত্যায়িত প্রতিষ্ঠানের প্রি-ক্লিনিং চাই। তখন পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখা হলো যে, উদীয়মান শিল্প বিকাশের স্বার্থে এই আমদানি নীতিমালা বদলে দেয়া হলো। এর ফলে জাহাজের যাবতীয় ইনবিল্ড দ্রব্যাদি নিয়ে চলে আসছে। আমাদের মামলাটাই তো ছিল ইনবিল্ড এর বিরুদ্ধে। আদালত জাহাজের কোথায় কোথায় ইনবিল্ড থাকে সেগুলোর ছবি দিয়ে ওই ইনবিল্ড মানুষের শরীরের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে সেগুলো লিখেই রায়টা দিয়েছেন। আমার মূল বিষয়টাই ছিল ইনবিল্ড। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর আপস করে ফেলল ইনবিল্ড এর সঙ্গে। আদালতের প্রথম আদেশটা প্রাকটিক্যালি এভাবে অবমাননা করল। আমদানি নীতিমালা বদলানোর পরে বিচারপতি ঈমান আলী সাহেব আবার বললেন যে, না বর্জ্য নিয়ে কোনো জাহাজ বাংলাদেশে আসতে পারবে না। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের আমদানি নীতিমালা আর বদলাল না। 
সাপ্তাহিক : এসব নিয়ে বিতর্ক চলা অবস্থাতেই তো তারা জাহাজ আনা অব্যাহত রাখল। তাই তো....
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : রোজার ঈদের সময় দুটো জাহাজ তারা ঢুকিয়ে ফেলল। তখন আমরা আদালত অবমাননার একটা নোটিশ দিলাম। সেই নোটিশের পরে আদালত বলল যে, তোমাকে তো আমি বলেছি প্রি-ক্লিনিং সার্টিফিকেট লাগবে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগবে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে আমরা কোনো ছাড়পত্র দেইনি। তুমি কেন ঢুকলা? তখনও বলল, আরেক কোর্ট থেকে আমাদের নির্দেশ দিয়েছে জাহাজ ঢুকাতে। কিন্তু আরেক কোর্ট  তো নির্দেশ দিয়েছে দেশের আইন মেনে জাহাজ ঢুকাতে। দেশের আইনের মধ্যে জুডিশিয়াল অর্ডারও শুনলে না কেন? আরেক কোর্ট তো বলেনি ঐ তারিখের মধ্যে জাহাজ ঢুকাতে। তোমার জাহাজ ঢুকানোর তাড়াটা কি ছিল।  তোমার কাছে যদি মনে হয় দুটো কোর্টের রায় দু’রকম। তাহলে তুমি তো আদালতে আসবে। ক্লারিফাই করবে। তুমি তো সেটার ক্লারিফাই করলে না। তুমি এই কোর্টের অর্ডার মেনে দিয়ে দিলে। আমারটা রায়, ওরটা আদেশ। আদালত অবমাননার মামলায় ৬ জনের মধ্যে ৪ জনকে মাফ করে দিল আদালত। ডিজি শিপিং ও চিফ কেমিস্ট ডিপার্টমেন্ট অব শিপিংকে মাফ করল না। না করে বলল যে তোমাদেরকে কেন শাস্তি দেয়া হবে না সেই শো-কজ নোটিশের জবাব দাও। সেকেন্ড কনটেম্পট রুল ইস্যু হলো।
এরপরে এরা ২ জন অফিসে গিয়ে আরো ২২টা জাহাজ আনবার অনুমতি দিলেন এবং আবারো পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ৩ জনের একটা কমিটি করে দিল। সেই কমিটি জাহাজগুলো যখন আসবে সেই জাহাজগুলোকে পরীক্ষা করে সেগুলো ভাঙার ব্যাপার সরকারকে সুপারিশ করবে। এই কমিটির টিওআর এ কিন্তু কমিটি ছাড়পত্রের ব্যাপারে সুপারিশ করবে এই কথাটি বলা নেই। তার মানে পরিবেশ মন্ত্রণালয় নিজেকে নিরাপদে রেখে অন্য মন্ত্রণালয়ের কাঁধে বন্দুক রেখে কাজগুলো করে যাচ্ছে। তখন আমরা বললাম যে, আপনারা কীভাবে এই অনুমতি দিলেন। তখন ডিজি শিপিং বলল, ১৬টা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডকে তারা ছাড়পত্র দিয়েছে। এই  ১৬টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডকে জাহাজ আনার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন হলো ১৬টা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডকে তোমরা কেমন করে ছাড়পত্র দেবে। কারণ আদালত বলছে কোনো শিপব্রেকিং ইয়ার্ড যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত না করবে, পরিবেশ দূষণ মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডকে ছাড়পত্র দেয়া যাবে না। শর্তসাপেক্ষে ছাড়পত্র একদমই দেয়া যাবে না। কারণ আইনে কন্ডিশনাল ছাড়পত্র দেয়ার কোনো বিধান নেই। তারপরেও ১৬টা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডকে শর্তসাপেক্ষে ছাড়পত্র দেয়া হলো। শিপব্রেকারদের আচরণটা হলো, আমরা সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলব। আদালতের আদেশ মানব কেন? আমরা সরকারের আমদানি নীতিমালা বদলে ফেলব।
সাপ্তাহিক : এখানে রাজনৈতিক দিক থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলে কি?
সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান : আর্থিক দিক থেকে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী। যেহেতু তাদের অর্থ আছে, কিছু কিছু রাজনীতিবিদের কাছে তারা পৌঁছে যায়।
আমরা কারখানা বন্ধ করব না। তাই বলে শিল্পে মানুষ মারুক, গাছ কাটুক, পরিবেশ দূষণ করুক তারপরেও আমরা শিল্প চালাব। আমার মনে হয় সরকারের মধ্যে এমন মন্ত্রীরা আছেন যারা এটা চান না।
পৃথিবীর সব দেশ এই বর্জ্যযুক্ত জাহাজভাঙা বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ করে দেয়ার ফলেই আপনার দেশে এসেছে। এ বাস্তবটা সব বইতেই লেখা আছে। আপনি এটা পড়েন না কেন। পড়ে বোঝেন না কেন। বোঝেন না কারণ এখানে অনেক অর্থের ব্যাপার। আদালত কন্ডিশনাল ক্লিয়ারেন্স দিতে নিষেধ করেছে। তাও তারা কন্ডিশনাল ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে।
সাপ্তাহিক : আজকে আপনারা যে রায়টা পেলেন...
সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান : আজকে যে আদেশটা পেলাম সেই আদেশে আদালত আবারো বলেছে হাইকোর্টের প্রথম রায়ে যা যা বলা আছে সব মানতে হবে। যদি সেরকম জাহাজ হয় যাতে ইনবিল্ড টকসিক থাকবে না সেটা আসবে। বাধা নেই। তাছাড়া জাহাজ আসতে পারবে না। দু’নম্বর হলো তিন মাসের মধ্যে বিধিটা করতে বলল। সেটা এই এই আইন মেনে করার কথা বলল।   যে ছয়টা আইনের কথা রায়ে বলা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে আর একটা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি করতে হবে। আমলাদের কমিটি না। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি।
সাপ্তাহিক : অতীতে নানাভাবে উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আপনার জন্য পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে আপনি মনে করছেন?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : আমাদের সরকারের মধ্যে এই কনফিডেন্সটা আনতে হবে যে, কেন হাইকোর্ট বারবার জনস্বার্থে একটা অবস্থান নিচ্ছে। সরকার পক্ষের বক্তব্যের পরেও বিচারকরা যখন একটা অবস্থান নেয় তখন সরকারকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে যে, নিশ্চয়ই এই অবস্থান নেয়ার পেছনে একটা কারণ আছে।
আমরা যারা পরিবেশ আন্দোলন করি সাংঘাতিক শক্তিশালী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকি, অনেক কিছু ঝুঁকির বিনিময়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সরকারকে এটা দেখতে হবে। আমাদের বিরুদ্ধে তারা মিথ্যা মামলা করছে, তারা উচ্চ আদালতের সামনে বিশাল লোক দিয়ে মানববন্ধন করছে। বলছে যে, বেলাকে (ইঊখঅ) অবাঞ্ছিত ঘোষণা কর। আমার ও আমার এক সহকর্মীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার দাবি তুলছে। তারা আদালতে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করল। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার এগুলো না বোঝে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি আমি যতই বলে যাই তারা বুঝবে না।
সাপ্তাহিক : এখানে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একটা ভূমিকা থাকার কথা। কারণ এটা মূলত একটা পরিবেশ বিষয়ক সমস্যা তৈরি করছে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : আদালত পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে নীতিমালা করতে বলে ওরা করে গাইডলাইন। বিধিমালার খসড়া করে ফেলে রাখে আর গাইড লাইনচূড়ান্ত করে। গাইডলাইন করবার জন্য যে কমিটি করে  সেই কমিটির টিওআর (টার্মস অব রেফারেন্স)-এ বলে রাখে এই গাইডলাইন সদ্য প্রণীত বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হইতে হইবে। বিধিমালা কী এখানে? সেটা তো প্রণীতই হয়নি।
সাপ্তাহিক : তাহলে কী পরিবেশ মন্ত্রণালয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করছে?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান :   অবশ্যই উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজ করছে। ঘটনা প্রবাহ তো সেটাই নির্দিষ্ট করছে। উদ্দেশ্য কি তা আমরা বলতে পারি না। বারবার বলা হচ্ছে লোহার দাম বেড়ে যাবে। লোহার দাম কেন বেড়ে যাবে। লোহা হচ্ছে একটা অত্যাবশকীয় পণ্য। এ ধরনের পণ্যের যথেষ্ট পরিমাণ মজুদ বাজারে রাখা হচ্ছে সরকারের দায়িত্ব।
শিপব্রেকাররা লোহার দাম বাড়ানোর ভয় দেখাল আর অমনি আপনি সব জাহাজ এনে দিলেন। আর মানুষকে মেরে ফেলবেন এটা তো হবে না। এটাও তো সরকারের দায়িত্ব যে, শ্রমিকদেরকে সে নিরাপদ রাখবে।
সাপ্তাহিক : এখানে তো দুটো বিষয়। অনেকের বক্তব্য আপনি উন্নয়নের বিরোধিতা করছেন। দ্বিতীয়ত বিদেশি ফান্ড এনে আপনি দেশের ক্ষতি করছেন? আপনার বক্তব্যটা কি?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : প্রথম কথা হচ্ছে গোটা বাংলাদেশের বাজেটের কত শতাংশ বিদেশি টাকায় চলে। বিদেশি ফান্ড আনা যদি অপরাধ হয় তাহলে বাংলাদেশ নিজেই এ অপরাধে অপরাধী। আমরা যে টাকাটা আনি সেটা হচ্ছে এক দেশের জনগণের টাকা আরেক দেশের জনগণের জন্য যা দাতা সংস্থা এনজিওদেরকে দেয়। কোনো কোম্পানির টাকা আমাকে দিচ্ছে না।
আমাদের এ আন্দোলনে দেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে? বিদেশের বিষাক্ত বর্জ্যযুক্ত জাহাজ এনে যারা উপকূলীয় পরিবেশ দূষিত করছে, শ্রমিক হত্যা করছে। তারা দেশের ক্ষতি করছে না, আমরা যারা এ শিল্পটাকে নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলছি তারা দেশের ক্ষতি করছি।
আমরা এমন একটা শিল্প নিয়ে কথা বলছি না যার কোনো নিরাপদ বিকল্প নেই। আমরা নিরাপদ বিকল্পের দিকেও সরকারকে পথ দেখিয়েছি। সরকারকে বুয়েট বলেছে এ লোহার মান অত্যন্ত নিম্ন।  যে কটা বিশ্বাসযোগ্য সংস্থা আছে সবাই কিন্তু এর বিরুদ্ধেই কথা বলছে। কেউ পক্ষে কথা বলেনি।
আমরা দেশের উন্নয়ন বন্ধ করছি এটা  অসাড় যুক্তি। পৃথিবীতে যে কটা দেশ উন্নয়নে প্রচণ্ড এগিয়ে গেছে তার মধ্যে কেউ লোহা ভাঙেনি। তার কেউই জাহাজ ভাঙেনি। উন্নয়নের জন্য লোহার দরকার। উন্নয়নের জন্য জাহাজ দরকার না। জাহাজ ছাড়া লোহা পাওয়া যাবে না এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।
সাপ্তাহিক : ব্যারিস্টার রোকনউদ্দীন মাহমুদ, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, এ্যাডভোকেট আনিসুল হক জাহাজভাঙা শিল্প মালিকদের পক্ষে আদালতে দাঁড়িয়েছেন। আপনার বিপক্ষে দেশের খ্যাতিমান আইনজীবীরা লড়ছেন। ব্যক্তিগতভাবে আপনি এই চ্যালেঞ্জগুলোকে কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : আসলে শক্তিমানরা আমার পক্ষে নেই এটা আমি বুঝি। খ্যাতিমান এসব আইনজীবীরা যখন আদালতের সামনে যায়, এটা হচ্ছে বিস্ময়কর ব্যাপার। একটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমার জন্য যেটা আসল ব্যাপার সেটা হচ্ছে এই বাড়তি চাপটাকে আদালত আমলে নেন নাই। ওনারা কোর্টের সামনে যা বলেন, পরে কিন্তু আমাদেরকে বলেন, তোমার কাজটাই ঠিক কাজ। তুমি যা করেছ তা ঠিক। কিন্তু আসলে কী একটা চালু শিল্প তো বন্ধ করে দেয়া যায় না। সবার আত্মরক্ষার একটা অধিকার আছে। শিপব্রেকারদের এ অধিকারের দিকে সম্মান দেখিয়েই ওনারা শিপব্রেকারদের দিকে যান।
আর আমার বক্তব্য হলো, যাদের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমুন্নত রাখতে আর কোনো উকিল পাওয়া যাবে না। আমার দায়িত্ব হচ্ছে তাদের পাশেই দাঁড়ানো। আত্মরক্ষার অধিকার শ্রমিকদেরও আছে। আমি মনে করি তাদের অবস্থানটা অনেক বেশি দুর্বল। আমাদের মতো সংগঠনগুলো যদি শ্রমিকদের পক্ষে না দাঁড়ায় তাহলে তাদের পাশে কে দাঁড়াবে? আজকে তো শ্রম মন্ত্রণালয় দাঁড়ায়নি ওদের পাশে। শিল্প মন্ত্রণালয়, এমনকি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও দাঁড়ায়নি তাদের পাশে। আমরাও যদি না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে ওদের পাশে।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে সিনিয়র আইনজীবী যাদের নাম আপনি বললেন তারা যদি শিপব্রেকারদের পক্ষে নাও দাঁড়ায় শিপব্রেকারদের কিন্তু সিনিয়র আইনজীবী পেতে অসুবিধা হবে না।
সাপ্তাহিক : এটা নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। জাহাজভাঙা শিল্প মালিকরা আপনাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। আপনি এইসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করার প্রস্তুতিটা নিচ্ছেন?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : এখনো আমরা যারা সহকর্মীরা আছি বুঝবার চেষ্টা করছি। আমাদের দেশে এ রকম হয়, আমাদের দেশ বলে না, পৃথিবীজুড়েই এমন হয়। বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পড়েছিলেন। এ দেশে যখনই ভালো কিছু করতে যান তখনই ভিন্ন একটা গোষ্ঠী যারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। ভরসার বড় জায়গা হচ্ছে এখনো পর্যন্ত যেসব গণমাধ্যমকে মানুষ বিশ্বাস করে তারা আমাদের পক্ষে আছে। গণমাধ্যমের একটা অংশ চলে গেছে জাহাজভাঙা শিল্প মালিকদের পক্ষে। গণমাধ্যমের ইতিবাচক অবস্থানটা আমাদের দিকে আছে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে এ অবস্থা সরকারকেও নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলে। সরকারকে এখন ঠিক এবং বেঠিকের মধ্যে একটাকে ব্যবহার করতে হবে। আমার এটা একটা ভরসা সরকার অবশ্যই রাজনৈতিক বিবেচনার কথা চিন্তা করবে। ঠিক পথটাকেই বেছে নেবে। আমি কখনোই মনে করি না যে, হন্তারক একটা শিল্পকে সরকার নিরন্তর সমর্থন দেবে। যেখানে এই শিল্পের নিরাপদ বিকল্প বিদ্যমান। আমি মনে করি সরকারের মধ্যে শুভশক্তি আছে। আমাদের এ যুদ্ধটা হয়ত তাদেরকেও কিছুটা আন্দোলিত করবে। তারা আমাদের পক্ষে অবস্থান নেবে।
চাপটা কোন দিক থেকে আসবে বুঝতে পারি না। সরকারের যে গোষ্ঠী শিপব্রেকারদের পক্ষে আছে তাদের কাছ থেকে আসতে পারে। শিপব্রেকারদের দিক থেকে সরাসরি আসতে পারে। যেটা চলে এসেছে। আরেকটা চাপ হতে পারে দাতাগোষ্ঠীর দিক থেকে। কারণ অনেকগুলো জাহাজ কিন্তু বিদেশের। বিদেশিরা এটা জানে যে বাংলাদেশ জাহাজভাঙা বন্ধ করে দিলে এ শিল্প বর্জ্যময় ক্ষতিকর জাহাজগুলো আমরা কোথায় নিয়ে যাব।
আঘাত যখন আসবে তখনই আমরা চিন্তা করব। শিপব্রেকাররা যখন আমাদের আঘাত দিচ্ছে আইনগতভাবে আমরা সেটা মোকাবিলা করছি। আগে থেকে আঘাত নিয়ে বেশি চিন্তা করলে কাজের স্পৃহাটা হয়ত কমে যাবে।

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • ‌'রাজনীতি এখন ভোগের মহিমা শেখায়'-ড. তোফায়েল আহমেদ
  •  মতামত সমূহ
    Author : LarCubswads
    Billig Cialis viagra vs cialis vs levitra reviews Comprar Cialis 20 Mg Buy Cipro Online No Prescription
    Author : LarCubswads
    Dutasteride Avolve Bangor How To Get Cialis In Canada 40mg Tadalafil viagra Viagra Se Baja Levitra Mit Paypal Bezahlen
    Author : LarCubswads
    Cheap Viagra Online Canada Pharmacy Cialis Daily Vergleich Acheter Du Viagra En Europe buy viagra online Finasteride 1 Mb Propecia
    Author : LarCubswads
    Viagra Wirkung Nicht Viagra Info cialis buy online Sublingual Viagra Farmacia Kamagra Vendita Antibioticss For Uti Keflex
    Author : LarCubswads
    Acheter Viagra A Marseille http://cialtobuy.com - cialis buy online Venta De Cialis Tadalafil Cialis 20 Prix Need Fedex Acticin Internet Medicine Macrobid Can I Purchase Cialis Levitra Sildenafil cialis Viagra Vs Cialis Vs Levitra Samples
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive