Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২৫ ১৪ই অগ্রহায়ন, ১৪২৫ ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
‘জীবন বাজি রেখেই জনযোদ্ধারা অংশ নিয়েছিল জনযুদ্ধে’ -মাহবুব আলম  
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মাহবুব আলম জড়িয়ে পড়েন জনযুদ্ধে। যুদ্ধক্ষেত্রই তাকে বানিয়ে দেয় গেরিলা কমান্ডার। গেরিলা যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে প্রতিদিনের অপারেশন, দিনযাপন, স্মৃতি টুকে রাখতেন নিজের ডায়েরিতে। পরে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতিতে এই স্মৃতিকথন নিয়ে লেখেন ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ নামের দুই খ-ে এক বৃহৎ গ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থমালায় সে এক অসামান্য সংযোজন।
 সাপ্তাহিক-এর সঙ্গে এক আলাপচারিতায় গেরিলা কমান্ডার, জনযোদ্ধা, লেখক মাহবুব আলম যুদ্ধদিনের কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ
সাপ্তাহিক : শুরুতেই আপনার মুক্তিযুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি সম্পর্কে যদি বলেন?
মাহবুব আলম : যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা তো একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার। রংপুর থেকে যুদ্ধে যাওয়াটা। ২৫ মার্চে রংপুর ক্র্যাক ডাউন হয়ে গেল। তারপর চারপাশে হত্যাযজ্ঞ শুরু হলো। ৪ এপ্রিল দখিগঞ্জ শ্মশান থেকে শুরু এ হত্যাকা-ের। তারপর একে একে পায়রাবন্দ, দমদমা বধ্যভূমির গণহত্যা। এ অবস্থায় আমি এলাকার আরো ৪ জনকে নিয়ে ঠিক করলাম যুদ্ধে যাব। কিন্তু যাওয়াটা সহজ ছিল না। প্রথমে চারজন একমত হলেও পরে তিনজন পিছটান দিল। তারা আর গেল না। সে সময় আমাদের এক প্রতিবেশী শহর থেকে সদরের চন্দনপাট নামের একটি গ্রামে চলে যায়।
তাদের সঙ্গে সেখানে গিয়ে আমি খুব কাছ থেকে একটি গণহত্যা দেখি। রাতের বেলা হেডলাইটের আলোতে লাহিড়ীরহাট এলাকায় লাইনে দাঁড় করিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়। আমি প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে ঐ ঘটনা দেখি। এটা ভয়াবহ একটা অভিজ্ঞতা। আমি রংপুরের নুরপুরে আমার বাসায় চলে এলাম। বাসায়  এসে দেখি যে, আমাদের নুরপুরের চারজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে দমদমা বধ্যভূমিতে হত্যা করেছে পাকিস্তানিরা। নুরপুরের দিকে যখন ওরা হাত বাড়াল তখন  বুঝলাম আর রংপুরে থাকা ঠিক হবে না। তখন আমরা আবারো গোপনে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিলাম।
সাপ্তাহিক : ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন...
মাহবুব আলম : আমি, আমার প্রতিবেশী মাহতাব, মোহাম্মদ আফজাল হোসেন আর সাইফুল আলম মুন্না। আমরা চারজন একদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে দুটো বাইসাইকেলে করে বদরগঞ্জ রোড় দিয়ে পাগলাপীর এলাকা হয়ে তিস্তা নদী পার হয়ে কাকিনা-হাতীবান্ধা দিয়ে ভারতের সিতাই বর্ডারে চলে গেলাম। সেখান থেকে আমরা চলে গেলাম জলপাইগুড়ি হয়ে শিলিগুড়ির কাছে। সেখানে আফজাল সাহেবের বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। প্রায় ৪শ’ মাইল সাইকেল চালিয়ে প্রথমে সেখানে গিয়ে উঠলাম। কারণ তখন শরণার্থী শিবিরে থাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। লাখ লাখ মানুষ সেখানে ছিল। মানবেতর দিনযাপন করছিল তারা। থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। রাস্তার ধারে শুয়ে আছে। গাছের নিচে শুয়ে আছে। শরণার্থীদের এমন দুরবস্থা দেখে আমার মনোবল দৃঢ় হলো। আমরা যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিয়েই গেছি। তারপরও আমাদের দেশের নাগরিকদের মানবেতর  দিনযাপন আমাদের এক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছে।
সাপ্তাহিক : মুক্তিবাহিনীতে যেভাবে যোগ দিলেন? সেটা যদি বলেন...
মাহবুব আলম : আমরা বর্ডার পার হয়েছি ১৬ মে। তার পরদিন ১৭ মে বাংলাবান্ধায় মুক্তিবাহিনীতে লোক নেয়া হলো। প্রথমে অনেকেই যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহ দেখিয়েছিল। কিন্তু পরে লোকজন কমে গেল। তখন সাতজন গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। তেঁতুলিয়া থেকে একদল ছেলে আসল। ঐ ছেলেগুলো লাইনে দাঁড়াল। এভাবে আমরা প্রায় দেড়শ জন প্রশিক্ষণ নেবার জন্য যোগ দিলাম। বাংলাবান্ধা থেকে আর্মির এক কর্নেল আসলেন। বাংলাদেশেরও কিছু বিডিআর-আর্মির লোকজন ছিল। তারা সব ঠিকঠাক করে দিল। আমরা লরিতে বসে চলে গেলাম ভর্তি ক্যাম্পে। প্রায় তিন হাজার ফুট ওপরে। জলপাইগুড়ি এলাকায় ভুটানের কাছাকাছি। ২০ মে আমরা সেখানে পৌঁছলাম। তারপর ট্রেনিং শুরু। ট্রেনিং ছিল মূলত চার সপ্তাহের। আমরা ছিলাম পাঁচ সপ্তাহ। আমরা ট্রেনিং শেষ করার পর বাংলাদেশের প্রথম কমিশন কর্মকর্তা ব্যাচ শেখ কামালসহ অন্যরা ট্রেনিং করেছিলেন তিন সপ্তাহের। ট্রেনিং শেষে আমাদের দলকে ৪টা ভাগে ভাগ করে দেয়া হলো।
একটা দলকে পাঠাল পঞ্চগড়ের সম্মুখভাগে। সেটার নাম দিল চাউলহাটি ইউনিট বেইজ ক্যাম্প। আরেকটা দলকে পাঠায় দিনাজপুরের উত্তর দিকে ওকড়াবাড়ি এলাকায়। আরেকটা পাঠাল প্রেমকুমারী  এলাকায়। শেষ দলটাকে পাঠানো হয়েছিল সোনাহাট এলাকায়।
আমি দায়িত্বে ছিলাম চাউলহাটি ক্যাম্পে। সেখানে একজন কমান্ডার, একজন সেকেন্ডম্যান কামান্ডার আর তিনটা কোম্পানি ছিল। আমি ছিলাম সেকেন্ড ইন কমান্ডার। আমরা প্রথমে ৯০ জন ঐ ক্যাম্পে গেছি। পরে ধীরে ধীরে আরো লোক আসল ট্রেনিং শেষ করে। এছাড়া আরো কিছু সাধারণ মানুষ আমাদের সঙ্গে ছিল। আমরা সেখানে প্রায় সাড়ে তিশ জন ছিলাম। সেখানে কোনো বিডিআর, আর্মি সদস্য ছিল না। যারা ছিল তারা সবাই জনযোদ্ধা। গেরিলা দল।
সাপ্তাহিক : প্রথম অপারেশন সম্পর্কে আপনার...
মাহবুব আলম :  আমরা অপারেশন শুরু করি ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে। এটাকে বলা হয় ইনফিলট্রেশন। তারপরে আমরা চাউলহাটিতে একটা পুকুরের পাড়ে আমাদের ক্যাম্প স্থাপন করি। ওখানে একটা অপারেশনের পরে আমাদের ইউনিটকে আরো চার ভাগে ভাগ করা হয়। আমি একটা দল নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকি। আমার পাশেই আরেকটা দল নিয়ে ছিল পানোয়ার হোসেন ভূঁইয়া পিন্টু। এ দুটি দল সবসময় পাশাপাশি ছিলাম। আরেকটা দল নিয়ে আসে হায়দার। অপর দলের নেতৃত্বে ছিল বদিউজ্জামান মাস্টার।
এ চারটি দলের এলাকা বোদার মাডেয়া এলাকা থেকে পঞ্চগড়ের অম্বরখানা পর্যন্ত ছিল। লম্বায় ঐ এলাকাটা ছিল প্রায় একশ কিলোমিটারের মতো। আমাদের লক্ষ্য ছিল পঞ্চগড় পাকিস্তানি আর্মি স্টেশন, ঠাকুরগাঁও আর্মি স্টেশন। ঐ এলাকায় আর্মিদের স্থাপনায় হামলা চালাতে হবে। টেলিফোন লাইন, রাস্তা, ব্রিজ ধ্বংস করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। কোনো বিদেশি আসলে তাকে গুলি করে মারতে হবে। পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসর রাজাকারদের ওপর আঘাত হানতে হবে। পাকিস্তানপন্থী কোনো লোক থাকলে তাদের মারতে হবে। আমাদের মূল দায়িত্বটা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া। যাতে তাদের ক্ষমতা কমে যায়।
সাপ্তাহিক : গেরিলা যুদ্ধের পদ্ধতিটা কেমন ছিল? কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন কিনা?
মাহবুব আলম : গেরিলা পদ্ধতির প্রথম কথা হলো ‘হিট এ্যান্ড রান’। এভাবেই সামনে এগিয়ে যাওয়া। প্রথম দিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছেলেদের সমস্যা তো একটু হবেই। শক্ত প্রতিপক্ষ পাকিস্তান আর্মির সামনে স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ আর সীমিতসংখ্যক অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে একটু সমস্যা হয়েছিল। আমাদের অস্ত্র ছিল খুব কম। দশজনের একটা দলকে অপারেশনের জন্য আমাদের দিত তিনটা রাইফেল, একটা স্টেনগান আর দশ রাউন্ড করে গুলি। আর বাকি সঙ্গীদের কারো হাতে থাকত কোদাল, কারো হাতে কুড়াল আর হ্যান্ড গ্রেনেড। এ সীমিত অস্ত্র দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা সহজ কাজ ছিল না। যোদ্ধাদের মনোবল আর দেশপ্রেমের শক্তির কারণে জীবন বাজি রেখেই জনযোদ্ধারা অংশ নিয়েছিল জনযুদ্ধে। কারণ বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা পাকিস্তানিদের সামনে দাঁড়ানোর সাহস করেছিল এবং বিজয় অর্জন করেছিল।
সাপ্তাহিক : ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা কখন নেতৃত্বে এলেন?
মাহবুব আলম : যুদ্ধগুলো নবেম্বর মাস পর্যন্ত পরিচালনা করেছে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা। আমাদের চাউলহাটি ইউনিটের ইউনিট ইনচার্জ ছিলেন মেজর দর্জি, মেজর শংকর,  কর্নেল কোব্বাদ এই ধরনের সেনা কর্মকর্তারা। তারা আমাদের দিকনির্দেশনা দিতেন। তারা রেশন দিতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সে সময় পঞ্চাশ টাকা করে ভাতা দেয়া হতো। সেই টাকাটা ওনারা এনে দিতেন। মাঝেমধ্যে কিছু কাপড় পাওয়া যেত। সেগুলো এনে দিতেন। কাপড়-চোপড় দেয়াটা নিয়মিত ছিল না। শীতের সময় সোয়েটার, লুঙ্গি পাওয়া যেত। আমাদের ইউনিফর্ম ছিল লুঙ্গি আর তিন পকেটওয়ালা জামা। জামাটা উজ্জ্বল রঙের নয়। তাহলে রাতে দেখা যাবে। পায়ে কিছু থাকত না। খালি পায়ে চলতে হতো।
দিনের বেলা ছেলেরা কখনো অপারেশনে যাবে না। রাতের বেলায় অপারেশন। মূলত শত্রুর লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত করে দৌড়ে চলে আসা। শত্রু এলাকায় মাইন বসানো একটা বড় কাজ। এক্সপ্লোসিভ দিয়ে শত্রুর বাঙ্কার, টেলিফোন লাইন, ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার কাজ গেরিলারা করত। চোরাগোপ্তা হামলার কাজ গেরিলা যোদ্ধাদের করতে হয়েছে। সেই সময় সীমিত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের কয়েকটি ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। যে যুদ্ধে আমরা আমাদের সহযোদ্ধাদের হারিয়েছি। পাকিস্তানিদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে।
সাপ্তাহিক : এ ধরনের দু’একটি যুদ্ধের হতাহতদের কথা...
মাহবুব আলম : এ ধরনের একটি যুদ্ধ হয়েছিল টোকামারা এলাকায়। টোকামারার যুদ্ধে রংপুরের রানীপুকুরের ছেলে গোলাম গউস শহীদ হয়। সে রংপুর কারমাইকেল কলেজে বিএসসি-তে পড়ত। গণি ভাইয়ের ছোট ভাই। মধুমারার ভয়াবহ যুদ্ধে আক্কাছ মারা যায়। অম্বরখানার যুদ্ধে মতিয়ার শহীদ হয়। কালিয়া গঞ্জের যুদ্ধে হাসান সাংঘাতিকভাবে আহত হয়। সে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এখন রংপুর চিড়িয়াখানার দারোয়ান। অনেক কষ্টে তাকে ঐ চাকরিটা নিয়ে দেয়া হয়েছে। পঞ্চগড়ের জহির সমস্ত শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। খালেক যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তান আর্মি স্টেশন দখলের যুদ্ধে আমাদের সঙ্গে ছিল। সে সেখানেই শহীদ হয়েছে। এ রকমভাবে আমরা অনেকজনকে হারিয়েছি বিভিন্ন সময়ে।
সাপ্তাহিক : সম্মুখযুদ্ধে যেভাবে গেলেন...
মাহবুব আলম : আমাদের উল্লেখযোগ্য কিছু স্মৃতি রয়েছে। ২০ নবেম্বর ঈদের দিন ছিল। ঐ দিন আমরা পাকিস্তানিদের অম্বরখানা ঘাঁটি দখল করি। সর্ব উত্তরে অম্বরখানায় ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি। ওরা সেখানে কংক্রিটের বাঙ্কার করেছিল। বেশ শক্ত স্থাপনা ছিল সেটা। আমরা সেদিন সেই শক্তিশালী ঘাঁটি দখল করে এগিয়ে যাই। এই যুদ্ধটা ছিল আমার প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ। এভাবেই আমরা গেরিলা যুদ্ধ ছেড়ে সম্মুখ যুদ্ধে চলে আসি।
পরে জয়পুরহাটের কাছে চৈতন পাড়ায় পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। তিনদিন তিন রাত ধরে ঐ যুদ্ধ হয়েছে। ভয়াবহ এক সম্মুখ যুদ্ধ ছিল সেটা। সেখানে একরাতেই আমাদের পক্ষের প্রায় ১৭ জন যোদ্ধা শহীদ হয়। পাকিস্তানিদের অনেক সৈন্য প্রাণ হারায় সেই সময়। চতুর্থ দিন আমরা শত্রুদের পরাস্ত করতে সক্ষম হই। জায়গাটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পরাজিত পাকিস্তানিরা পঞ্চগড়ের কাছে অলরাউন্ড ডিফেন্স গড়ে সেখানে চলে যায়। আমরাও ধীরে ধীরে অগ্রসর হই ওই ঘাঁটির দিকে। ২৮ তারিখ রাতে এ্যাটাক করে আমরা সিংহপাড়ার ডিফেন্সটা দখল করে নিতে সম্মত হই। ২৯ নবেম্বর ভোরে আমরা পঞ্চগড় শহরে প্রবেশ করি। পঞ্চগড় আমাদের দখলে এসে যায়।
পঞ্চগড় দখলের পরে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সদস্যরা তাদের ট্যাঙ্ক বাহিনী নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর ময়দানদীঘি আমাদের দখলে আসে। ভারতীয়রা যোগ দেয়ায় আমাদের শক্তি অনেকগুণ বেড়ে যায়। আমাদের ওপর চাপও কমে যায়। পুরো ঝুঁকিটা তখন চলে যায় মিত্রবাহিনীর হাতে। আমরা একে একে ময়দানদীঘি দখল করি। তারপর বোদা থানা দখল করি। ৩ ডিসেম্বর বিকালের দিক সন্ধ্যার একটু আগে আমরা ঠাকুরগাঁও দখল করি। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে ৪ কিলোমিটার এগিয়ে যে সেগুন বাগানটা পাওয়া যায়, সেখানে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম।
পরদিন ৪ তারিখ সকালবেলা দেখি বাগডোকরা বিমানবন্দর থেকে বিমানগুলো খুব নিচু হয়ে আসছে। সৈয়দপুর, রংপুর, বগুড়ার দিকে তারা যাচ্ছে।  আমরা বুঝতে পারি যে, ভারতীয়রা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ৬ তারিখে রাতে আমরা আকাশভাঙ্গা নামে একটা জায়গায় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেবার পর আমরা জানতে পারি যে, ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ঐ দিনই পঁচিশমাইল নামে একটা জায়গায় ভয়াবহ একটা সম্মুখ যুদ্ধ হয় আমাদের। সেখানে ভারতের একজন ক্যাপ্টেন মারা যায়। মুক্তিযোদ্ধাদেরও কয়েকজন সেখানে মারা যায়। পাকিস্তানি বাহিনীরও অনেক ক্ষতি হয়। ওরা পঁচিশমাইলে একটা ব্রিজ ছিল সেটা ভেঙ্গে দিয়ে সেখানে বীরগঞ্জে অবস্থান নেয়। সেদিন শ্বাসরুদ্ধকর একটি অপারেশন থেকে ফিরে রাতেই আমরা সুখবরটি পাই।
আমরা ৬ তারিখে বীরগঞ্জে প্রবেশ করি। বীরগঞ্জ দখলে এসে যায়। বীরগঞ্জ থেকে আমাদের অভিযান চলে দিনাজপুরের খানসামার দিকে। তারা ভাতগাঁও ব্রিজটা ভেঙে দিয়েছিল। যে কারণে এগোনো যাচ্ছিল না। ওখানে শক্ত ডিফেন্স ছিল। ১৩ তারিখে একটা অভিযান হয়েছে দিনাজপুরের দিকে। দিনাজপুর অর্ধেক এলাকা শত্রুমুক্ত করার পর পেছন থেকে পাক আর্মিরা পাল্টা আক্রমণ করে। ওখানে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী কিছুটা ক্ষতি হয়। এর প্রতিশোধ নেবার জন্যই আমরা ১৪ তারিখে খানসামা দখল করি। খানসামা দখল করার পর সৈয়দপুরের দিকে আমাদের যাত্রা। সেখানে পাকিস্তানিদের শক্ত ক্যান্টনমেন্ট ছিল। সেখানকার ব্রিগেডিয়ারের সঙ্গে টেলিফোন লাইন স্থাপন করে আমরা তাদের আমাদের অবস্থান নেবার কথা জানাই। আত্মসমর্পণ করতে বলি। কিন্তু ঢাকা থেকে অনুমতি না পেয়ে ওরা আত্মসমর্পণ করবে না। আমরা আরো অগ্রসর হয়ে সৈয়দপুরের কাছে চলে আসি। ওখান খেকে মিত্রবাহিনী আমাদের আর এগোতে দেয়নি। কারণ সৈয়দপুর থেকে পাক আর্মি আর বিহারীরা একটা আভাস দিয়েছিল যে, তারা আত্মসমর্পণ করবে মুক্তিবাহিনীর কাছে। তাদের একটা ভয় ছিল মুক্তিবাহিনী সৈযদপুরে ঢুকলে প্রতিশোধ হিসেবে বড় ধরনের হত্যাকা- চালাতে পারে। মিত্রবাহিনীর চাপের কারণে আমরা ফিরে এলাম বীরগঞ্জে।
সাপ্তাহিক : পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমপর্ণের খবর আপনারা কখন পেলেন?
মাহবুব আলম : বীরগঞ্জে ফিরে আসার পর বিকাল বেলা আমরা খবরাটা পেলাম। আমাদের যে অফিসার ছিলেন তিনি ওয়্যারলেসের মাধ্যমে খবরটা পৌঁছে দিলেন। তিনি জানালেন ঢাকার সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। রাতে যদি পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে আসে তাহলে তোমরা ছেলেদের কাছে পৌঁছে দাও। তবে আজকে কেউ কোনো আনন্দ করবে না। আমি আর পিন্টু খবরটা পৌঁছে দিলাম ছেলেদের কাছে প্রত্যেক বাঙ্কারে বাঙ্কারে। বললাম আজকে কেউ কোনো আনন্দ করবে না। তারা খবর পাবার পর আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। আমাদের নিষেধাজ্ঞার কোনো বাধ থাকল না। তারা আনন্দে মেতে উঠল। তখন ছিল শীতকাল। সবাই বাঙ্কাবের ছাউনির চালে আগুন ধরিয়ে দিয়ে উল্লাস করল। আনন্দের মধ্যে দিয়ে কাটল সেই স্মরণীয় বিজয়ের রাত।
দীর্ঘ ৯ মাস ধরে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে যে জয় এলো সেটা ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। অনেক ত্যাগের পরে যখন আমরা সেই জয় পেলাম তখন চারাপাশে আনন্দের বন্যা। পিন্টু আর আমি এ বাঙ্কারে থাকতাম। আমি তখন পিন্টুকে বললাম ম্যাচের কাঠি জ্বালাতে। কাঠির আলোতেই প্রতিদিনের মতো সেদিন ভোররাতে ডায়েরি লিখলাম। ১৭ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরে সেই লেখার মধ্যে দিয়ে শেষ হলো ডায়েরি লেখা। এভাবেই সেই রাতটা কাটিয়েছি।
সাপ্তাহিক : সেই ডায়েরির পাতা থেকেই আপনার লেখা মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধের’ সূত্রপাত?
মাহবুব আলম : আমি নিয়মিত ডায়েরি লিখেছি, যুদ্ধের সেই দিনগুলোতেও। ডায়েরি লেখার সময় পুরো ঘটনা যতদূর পর্যন্ত সম্ভব গুছিয়ে লিখে রাখার চেষ্টা করেছি। সেই ডায়েরির লেখাগুলোকেই পরে বই আকারে প্রকাশ করেছি। ১৯৯২ সালে সাহিত্য প্রকাশ থেকে দুই খ-ের এ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বইটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সবার কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আমি লেখক হিসেবে বই লিখিনি। আমি শুধু যুদ্ধদিনের স্মৃতির কথা নতুন প্রজন্মের জন্য লিখে রাখতেই বইটি প্রকাশ করেছি। আমরা গেরিলা হিসেবে যে যুদ্ধ শুরু করলাম সেই যুদ্ধটা অনেক সীমাবদ্ধতা আর আশা-নিরাশার মধ্য দিয়ে শেষ হলো সম্মুখযুদ্ধের মাধ্যমে। সেই প্রতিদিনকার যুদ্ধের ঘটনা ফুটে উঠেছে বইটিতে।
সাপ্তাহিক : সফল যুদ্ধ শেষ করার পর ঘরে ফিরলেন কবে?
মাহবুব আলম : যুদ্ধ শেষে বাড়িতে ফিরেছি জানুয়ারি মাসের ৭ কি ৮ তারিখে। সব ছেলেদের নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ছিলাম। ঠাকুরগাঁও পিটিআই, জিলা স্কুল, পুলিশ লাইনে থাকল মুক্তিফৌজ। আর অফিসাররা থাকলেন ওয়াপদা গেস্ট হাউসে।  তাদের মধ্যে ছিলেন সালেহ্ উদ্দিন আহম্মেদ, লে. মতিন, লে. মাসুদ। তারপর আমরা যখন ফিরে এলাম তখন জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ।
সাপ্তাহিক : উত্তরাঞ্চলের আলোচিত হত্যাকা-ের সহযোগী সম্পর্কে আপনার ধারণা ছিল কিনা?
মাহবুব আলম : কিছু তো ছিলই। যুদ্ধের সময় কিছু কালপ্রিটকে শেষ করা হয়েছিল। ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় এলাকায় কিছু রাজাকারের কথা মনে আছে। ঠাকুরগাঁওয়ে একজন ছিলেন তমিজ উদ্দিন মওলানা। পঞ্চগড়ে ছিল চেয়ারম্যান সামাদ। তাকে পরে ধরা হয়েছিল। খৈয়মুদ্দিন সাহেবসহ আরো অনেকে ছিল পাকিস্তানিদের সঙ্গে। আমরা পরে জেনেছি কোথায় কিভাবে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। রংপুরে এসে দেখলাম রংপুর টাউন হলের পেছনে, পাবলিক লাইব্রেরির পেছনে মানুষ হত্যার চিহ্ন। পাকিস্তানিরা তাদের দোসরদের সহায়তায় উত্তরাঞ্চলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
সাপ্তাহিক : এই যে যুদ্ধ এটাকে আপনি কোন ধরনের যুদ্ধ বলবেন?
মাহবুব আলম : এটা একটা বৃহৎ আকারের জনযুদ্ধ। এখানে আমাদের কয়েকটা রেজিমেন্ট যোগ দিয়েছিল। ক্যাপ্টেন রফিকের অধীনে বিডিআর, শফিউলের অধীনে একটা রেজিমেন্ট, শাফায়েত জামিলের অধীনে একটা রেজিমেন্ট যোগ দিয়েছিল। আর একটা রেজিমেন্ট ছিল খালেদ মোশাররফের অধীনে। এর বাইরে পূর্বাঞ্চলে যেমন বেঙ্গল আর্মি যুদ্ধ করেছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলে ও উত্তরাঞ্চলে এমনটা হয়নি। এখানে মূল শক্তি ছিল ইপিআর। ক’জন আর ইপিআর ছিল। তার সঙ্গে মূল শক্তিটা ছিল জনযোদ্ধা। যারা একেবারেই সাধারণ মানুষ। তারা ছিল গেরিলা দলের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে ছিল সাধারণ মানুষ। প্রথমদিকে সাধারণ মানুষ আমাদের পুরোপুরি সমর্থন দেয়নি। ধীরে ধীরে সবাই চলে এসেছে আমাদের সঙ্গে। যুদ্ধের সময় বলা হতো একটা লোকালয় জয় করা মানে একটা ব্রিগেডকে পরাজিত করা। ঐ গ্রামবাসীরা খাদ্য দেবে, আশ্রয় দেবে এবং শত্র“র সন্ধান দেবে। আমি এ যুদ্ধকে জনযুদ্ধ বলছি কারণ জনগণ যখন বুঝতে পারল যে, বাঙালিদের জয় হবেই। আর এ জয়টা খুব জরুরি। তখন আমরা জনগণের সহায়তা পেয়েছি। তাদের ভালোবাসা পেয়েছি। সকলের সম্মিলিত প্রয়াস আর দেশাত্মবোধের কারণে আমরা শেষ পর্যন্ত জয়টা পেয়েছি।
সাপ্তাহিক : আপনারা যে প্রত্যাশা আর স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন সেই স্বপ্ন কতটুকু পূরণ হয়েছে?
মাহবুব আলম :  আমরা চেয়েছিলাম একটি মানচিত্র। স্বাধীন একটি ভূ-খ-। যেখানে শোষণ-বঞ্চনা মুক্ত একটি দেশ। আমরা মানচিত্র পেয়েছি। পরাশক্তির হাত থেকে মুক্ত হয়েছি। বিশ্বে আমাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পেরেছি। প্রাপ্তি এটাই। দেশ এগিয়েছে অনেক দূর। কিন্তু পুরোপুরি অর্থে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো আসেনি। সেই স্বপ্নটা সম্পূর্ণ রূপে পূরণ হয়নি। স্বাধীন দেশে হাসানের মতো সাহসী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি দিচ্ছে। সেটা স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হলে ভালো হবে। সিভিল সার্ভিসে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ যে কোটা রয়েছে সন্তানদের সেই পদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।
সাপ্তাহিক : ৩৯ বছর পরে এসে সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য আমাদের করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
মাহবুব আলম : অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেক কিছু করার সময় চলে গেছে। তারপরও আমি যেটা মনে করি আমরা সবাই অর্থাৎ দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি যার যার অবস্থান থেকে দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করতে পারি তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে। এজন্য দেশপ্রেম দরকার। মাটি ও মানুষের প্রতি সত্যিকার ভালোবাসা দরকার।
সাপ্তাহিক : এতদিন পর যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে...
মাহবুব আলম : যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্ক করার কিছু নেই। সেই সময়েই তো সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পাকিস্তানের দোসরদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে বিচার কাজ বন্ধ করা হয়েছে। অতএব যুদ্ধাপরাধের বিচার নতুন কোনো কিছু নয়। একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার করা হোকÑ এটা সবাই চাইবে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার জন্য দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা হলে এখন আর এ নিয়ে বিতর্ক হতো না।
ছবি তুলেছেন কাজী তাইফুর
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • ‌'রাজনীতি এখন ভোগের মহিমা শেখায়'-ড. তোফায়েল আহমেদ
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive