Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ৩০ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
ট্রানজিট নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে  

ভারতকে ট্রানজিট সুবিধার নামে এখন বিনা মাসুলে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিতে তৎপর হয়ে উঠেছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি মহল। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির যে সমীক্ষা প্রণয়ন করেছে, তাতে লাভালাভকে স্ফীত করে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। আবার ভারতকে ট্রানজিট দিলেও নেপাল-ভুটানকে সম্পৃক্ত করার জন্য বাংলাদেশের দিক থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ...
লিখেছেন তানিম আসজাদ

প্রতিবেশী ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করার বিষয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক লেগেই আছে। এই ধারার সর্বশেষ সংযোজনটি হলো নৌপথে ট্রানজিটের শুল্ক বা মাসুল আদায় নিয়ে জটিলতা। খোদ সরকারই এখন বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। সরকারের একটি অংশ মনে করে বিনা শুল্কে কিংবা বিনা মাসুলে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কোনোই অবকাশ নেই। আরেকটি অংশ মনে করে, কোনো ধরনের শুল্ক বা মাসুল আদায় করা হবে মহা অন্যায় কাজ।
বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান দ্বিতীয় পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি যেভাবে কোনোরকম শুল্ক বা মাসুল ছাড়া ভারতকে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন, তাতে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে যে তার বা তাদের এহেন তৎপরতার উদ্দেশ্য কী? ট্রানজিট ফি নিয়ে গোলমাল বাধার তো কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু এই উপদেষ্টার এক চিঠিই গ-গোলের সূত্রপাত করেছে। কেউ কেউ এমন প্রশ্ন তুলেছেন যে, তিনি ভারত সরকারকে এই ধরনের চিঠি দিতে পারেন কি না? তার আইনগত সে ক্ষমতা আছে কি না? এই চিঠি দেয়ার মাধ্যমে অবশ্য একটা বিষয় জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে কে বা কারা ভারতকে অতি উৎসাহী হয়ে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা দিতে তৎপর, তা প্রকাশ পেয়েছে। সুতরাং এখন থেকে তাদের প্রতিটি কর্মকা-, তা যৌক্তিক বা অযৌক্তিক যাই হোক, যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখা হবে।

গোলমালের সূত্রপাত
গত ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে নৌপথে খুলনার শেখবাড়িয়ায় গৌরীগঙ্গা ও কাবেরী নামে দুটি ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ ৭৫০ মেট্রিক টন করে মোট ১৫০০ মে. টন ফ্লাই অ্যাশ আসে। কিন্তু বাংলাদেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ শুল্কায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে গেলেই আপত্তি তোলা হয়।
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ট্রানজিট মাসুল ছাড়াই শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জাহাজ দুটি ছেড়ে দেয়ার  জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে চিঠি দেয়। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টার একটি চিঠির সূত্র টেনে বলা হয়, যেহেতু ট্রানজিট মাসুল প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে, তাই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেন ট্রানজিট মাসুল আদায় করা না হয়। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, মশিউর রহমান এনবিআর, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এক চিঠিতে বলেছেন, ভারতকে ট্রানজিট মাসুল প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। তাই কোনো সিদ্ধান্ত পর্যন্ত যেন ট্রানজিট মাসুল নেয়া না হয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় হাইকমিশন উপদেষ্টার এই চিঠিকে কাজে লাগিয়েছে। অথচ এর কিছুদিন আগেই আগস্ট মাসে আরেকটি ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ যথারীতি ট্রানজিট মাসুল দিয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গিয়েছে।  ৬০০ মেট্রিক টন পণ্যের বিপরীতে প্রায় ৬ লাখ টাকা ট্রানজিট ফি আদায় করা হয় সে সময়।
ভারতীয় কমিশনের চিঠির জবাবে এনবিআর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেয় যে ট্রানশিপমেন্ট ও ট্রানজিট পণ্যের কাস্টমস বিধিমালা ২০১০ অনুযায়ী ট্রানজিট মাসুল আদায় করতে হবে। এই মাসুল রহিত করার বিষয়ে সরকারের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাংক গ্যারান্টি সাপেক্ষে পণ্যবাহী জাহাজ দুটিকে ছাড় করা যেতে পারে বলে এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ১৫০০ মে. টন পণ্যের বিপরীতে ট্রানজিট মাসুল যেহেতু ১৫ লাখ টাকা, সেহেতু সমপরিমাণ অর্থই ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে দিতে বলা হয়।
কিন্তু ভারত এই প্রস্তাবেও রাজি হয়নি। বরং তারা মাসুল অব্যাহতির জন্য চাপ তৈরি করতে থাকে। খোদ ড. মশিউর রহমান এ বিষয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেন। তিনি এনবিআরের কর্মকর্তাদেরকে তিরস্কার করেন। এমনকি সংবাদ মাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে এমনও বলেন যে, কোনো সভ্য দেশ এভাবে ট্রানজিট মাসুল আদায় করতে পারে না। এই অবস্থায় একপর্যায়ে এনবিআর মৌখিকভাবে ট্রানজিট মাসুল স্থগিত করে। তবে ভারতীয় জাহাজ দুটিকে ব্যাংক গ্যারান্টি ও মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

বিধিমালায় যা আছে
ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে গত ১০ জুন ট্রানশিপমেন্ট ও ট্রানজিট পণ্যের কাস্টমস বিধিমালা ২০১০ জারি করা হয়। বিধিমালাটি গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, সড়কপথে বা রেলপথে প্রতি ২০ ফুট কন্টেনারের জন্য ১০ হাজার টাকা, কাভার্ড ভ্যান বা ট্রাকে প্রতি টনে এক হাজার টাকা এবং বাল্ক পণ্যে প্রতি টনে এক হাজার টাকা ট্রানজিট মাসুল নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রানজিট মাসুল ছাড়াও স্ক্যানিং চার্জ, শুল্ক ব্যতীত অন্য চার্জ বা টোল প্রযোজ্য হবে।
এখন এই বিধিমালা তো সরকারই জারি করেছে। সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সম্মতি ছাড়া এটি প্রণীত ও জারি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টাও বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকেবহাল। তাহলে তখন তিনি আপত্তি জানাননি কেন? আর এখন হঠাৎ করেই নিজে ভারতকে চিঠিপত্র লিখে ট্রানজিট মাসুল প্রত্যাহারের কথা জানাচ্ছেন কোন ক্ষমতাবলে? তার এত আগ্রহ ও উৎসাহ কেন?
লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যখন দেশে নেই তখনই এই ঘটনাগুলো ঘটেছে। অর্থমন্ত্রী প্রায় দেড় মাসের জন্য দেশের বাইরে ছিলেন (১৬ সেপ্টেম্বর-১৯ অক্টেবর)। তাহলে কী উপদেষ্টা এই সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়েছেন?
অবশ্য অর্থমন্ত্রী দেশে ফেরার পর একটা বিষয় স্পষ্ট করেছেন যে, ট্রানজিটের জন্য মাসুল নেয়া হবে। বিনা মাসুলে কোনোভাবেই ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার অবকাশ নেই। কিন্তু মাসুল আদায় সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন, তা আবার উদ্বেগজনক। তিনি বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের নদী ও রেলপথ ব্যবহারের জন্য মাসুল দেয়ার বিধি থাকলেও সড়কপথের জন্য কোনো বিধি নেই। সড়কপথ ব্যবহার করতে হলে কি হারে মাসুল দিতে হবে, তার জন্য বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে।
মনে হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী জুন মাসে জারিকৃত ট্রানশিপমেন্ট ও ট্রানজিট পণ্যের কাস্টমস বিধিমালা ২০১০ সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত নন। অথবা ঐ বিধিমালাকে সংশোধনীর মাধ্যমে আরও নমনীয় করে ভারতকে ন্যূনতম ট্রানজিট মাসুল দেয়ার জন্য আবারও বিধিমালা তৈরির চিন্তা করছেন। কারণ, বর্তমান বিধিমালায় নৌপথ ও রেলপথের পাশাপাশি সড়কপথে ট্রানজিটের বিষয়েও বলা আছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন যে, ট্রানজিটের ওপর কোনো শুল্ক হয় না। বরং যা আদায় হয়, তা হলো মাসুল বা ফি জাতীয় কিছু অঙ্ক। অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন তা ঠিক। ট্রানজিটের ওপর কোনো শুল্ক হয় না। কিন্তু এনবিআর শুল্ক আদায় করতে যায়নি। গিয়েছে মাসুল আদায় করতে যা বৈধ ও আইনগতভাবে স্বীকৃত। এখানে শুল্কের বিষয়টি আসছে কেন?
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিও বিনা মাসুলে ভারতকে ট্রানজিট না দেয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। ঈদের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ফি বা মাসুলের বিনিময়েই ট্রানজিট দেয়া হবে। তবে তিনিও বলেছেন যে এ বিষয়ে বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। এটি তৈরি হলে পরে ভারতের সঙ্গে চুক্তি হবে বলেও তিনি জানান।
মনে হচ্ছে, এখানে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও কিছুটা গোলমাল করে ফেলছেন। ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হলে ইতোমধ্যে যে বিধিমালা জারি আছে, তার আওতায়ই মাসুল আদায় করা যায় এবং এনবিআর যে মাসুল ধার্য করেছে তা ন্যূনতম। তারপরও কেন নতুন করে বিধিমালা করা এবং মাসুলের হার নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলাদা করার চুক্তি আসছে?
এভাবে অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকারান্তরে ভারতকে ট্রানজিট মাসুল থেকে অব্যাহতির পথকেই প্রশস্ত করতে চাইছেন কি না তা বোঝা প্রয়োজন। আর দেখার বিষয় যে শেষ পর্যন্ত কে প্রকৃত ক্ষমতাবানÑ প্রধানমন্ত্রী, উপদেষ্টা নাকি দেশের দুইজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী?

মাসুলের পক্ষে-বিপক্ষে
উপদেষ্টা মশিউর রহমানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন দেশের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ। তারা বিভিন্নভাবে বলে বেড়াচ্ছেন যে এভাবে মাসুল নেয়া আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির পরিপন্থী। এই বক্তব্যের সপক্ষে তারা আবার একাধিক উদাহরণও টেনে আনছেন। তবে তাদের এই প্রচারণা ও বক্তব্যে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে। অথচ তারা কিন্তু বাড়ির কাছের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছেন না। বলছেন না যে নেপাল যখন ভারতের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা নেয়, তখন কি ধরনের মাসুল দিতে হয়। ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যেতে (পশ্চিমবঙ্গ, বিহার বা উত্তর প্রদেশ) নেপানি পণ্যবাহী ট্রাককে রাজ্যকর দিতে হয় যা ট্রানজিটের ডব্লিউটিও নীতির পরিপন্থী। এমনকি ভারতে আকস্মিক শ্রমিক ধর্মঘট বা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করতে না পারলে নেপানি ব্যবসায়ীদের জরিমানা গুনতে হয়। আবার নেপাল ট্রানজিট অ্যান্ড ওয়্যারহাউজিং কোম্পানি লিমিটেড (এনটিডব্লিউসিএল) বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা/ফুলবাড়ী সীমান্ত এলাকা হয়ে নেপালে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সিআইএফ মূল্যের দশমিক ৩৫ শতাংশ ও নেপাল থেকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সিআইএফ মূল্যের ক্ষেত্রে দশমিক ২৫ শতাংশ হারে ক্লিয়ারিং চার্জ আরোপ করে থাকে। এনটিডব্লিউসিএল নেপাল সরকারের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান যে কিনা নেপানি আমদানি-রপ্তানিতে ট্রানজিট সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল করে থাকে।
অন্যদিকে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ ট্রানজিট মাসুলের পক্ষে জোর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মূল কথা হলো, বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যবহার করতে হলে তার জন্য কিছু মাসুল দিতেই হবে। আর বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা যখন নেপালে বা ভুটানে পণ্য রপ্তানি করতে যান, তখনও তাদেরকে এরকম মাসুল দিতে হয়।
এমনকি ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্টের লাভ-ক্ষতি নিরূপণের জন্য যেসব সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তার প্রতিটিতেই ট্রানজিট মাসুল থেকে প্রাপ্তি বিবেচনায় নিয়ে লাভালাভের বিষয়টি নির্ণয় করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যে সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাতে বলা হয়েছে, শুরুতে প্রতিবছর ট্রানজিট মাসুল থেকে আয় হবে ৫ কোটি ডলার বা ৩৫০ কোটি টাকা। ৫ বছরের মধ্যে যদি ট্রানজিটের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে পরবর্তী বছরগুলোতে আয় হবে ৫০ কোটি ডলার বা ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর দীর্ঘমেয়াদে এই আয় বেড়ে দাঁড়াবে ১০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
বস্তুত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গ্যাটের (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড) ৫ম অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া আছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত তাই একে অপরকে এই নির্দেশনা অনুযায়ী ট্রানজিট সুবিধা দিতে পারে। বাস্তবে অবশ্য তা হচ্ছে না। বরং  বর্তমানে নৌপথেই শুধু ভারতীয় পণ্য ট্রানজিট হয়ে থাকে। ১৯৭২ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত নৌপ্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রটোকলের আওতায় নৌরুটে ভারতীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য নিয়ে যায়। নদীর নাব্য ঠিক রাখতে প্রতিবছর বাংলাদেশকে পাঁচ কোটি টাকা দেয় ভারত। কয়েকটি নৌরুট ট্রানজিট সুবিধার আওতায় থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত রুট শেখবাড়িয়া থেকে চাঁদপুর ও আশুগঞ্জ হয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ রুটটি বেশি ব্যবহƒত হয়।
গ্যাটের ৫ম অনুচ্ছেদ অনুসারে, কোনো দেশই ট্রানজিটের জন্য কোনো শুল্কারোপ করতে পারে না। কিন্তু পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বা ট্রানজিট সুবিধা দিতে গিয়ে ট্রানজিট প্রদানকারী দেশ যে সেবা প্রদান করছে ও ব্যয়ভার বহন করছে, সেজন্য প্রশাসনিক মাসুল আরোপ করতে পারে। তার মানে ডল্লিউটিওর বিধান অনুসারে ট্রানজিটের জন্য কোনো দেশ পরিবহন ও প্রশাসনিক ব্যয় মাসুল আদায় করতে পারে। তবে এই মাশুল একেক দেশের জন্য একেক রকম হতে পারবে না। আর রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস হিসেবে ট্রানজিট মাসুল বা শুল্ক আরোপ করা যাবে না। উপদেষ্টা মশিউর রহমানসহ যারা ট্রানজিট মাসুল মওকুফের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, তারা ডল্লিউটিওর বিধানের আংশিক দিক তুলে ধরছেন। বলছেন যে ট্রানজিট বাণিজ্য সহজীকরণের একটি উপায়। আর ট্রানজিট মাসুলের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।
ডব্লিউটিওর বিধান মেনেই বাংলাদেশ সরকার প্রশাসনিক সেবা মাসুল ও পরিবহন মাসুল আদায় করতে পারে যা একত্রে ট্রানজিট মাসুল নামে অভিহিত হলে কোনো ক্ষতি নেই। সেক্ষেত্রে এই মাসুল আদায়ের দায়িত্ব কার হবে তা হয়তো ভেবে দেখা যেতে পারে। যেহেতু ট্রানজিটযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রেও কাস্টমস তল্লাশি ও কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় আছে, সেহেতু যুক্তিসঙ্গতভাবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষই এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্নকরণপূর্বক মাসুল আদায়ের দায়িত্ব পেতে পারে। আর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মাসুল আদায় করলেই তা শুল্ক হয়ে যায় না।

ট্রানজিট নাকি করিডর
ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার বিষয়টি নিয়ে যেভাবে কথাবার্তা হচ্ছে, তাতে ট্রানজিটের মূল বিষয়টি নিয়েও এক ধরনের অসস্পষ্টতা রয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।
ঢাকায় ১৩তম সার্ক সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তার বক্তৃতাতেও এই কথাই বলে গেছেন। তিনি বলেছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশ একে অন্যকে তৃতীয় দেশের জন্য ট্রানজিট সুবিধা দিতে পারে। এর মানে হলো, বাংলাদেশ যদি ভারতকে তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে মিয়ানমারে যেতে দেয়, তাহলে তা হবে ট্রানজিট। আর কলকাতা থেকে ত্রিপুরা যাওয়ার জন্য অর্থাৎ ভারতের এক অংশ থেকে আরেক অংশে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি ভূখ- ব্যবহার করা হলে তা হবে করিডর। একইভাবে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ যদি নেপাল বা ভুটানে যেতে পারে অথবা নেপাল-ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাক বা রেল বাংলাদেশে আসতে পারে, তাহলে তা হলো ট্রানজিট। আর তাই, ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ মূলত ভারতকে করিডরের সুবিধা দিচ্ছে যাকে সরলীকৃতভাবে ট্রানজিট বলা হচ্ছে। এই বিষয়টি মাথায় রাখলে ট্রানজিট সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই কেটে যাওয়া উচিত। ভারতের সঙ্গেও আলোচনার বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত যে করিডর সুবিধা (তা ট্রানজিট বা যে নামেই হোক) ব্যবহার করার জন্য ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশ নির্ধারিত মাসুল দিতে হবে।
আরেকটি বিষয়েও নজর দেয়া প্রয়োজন। হাসিনা-মনমোহন যৌথ ঘোষণা অনুসারে ইতোমধ্যেই আশুগঞ্জ নৌবন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের জন্য ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণার সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই সম্মতিপত্র বাংলাদেশ-ভারত অভ্যন্তরীণ নৌ বাণিজ্য ও ট্রানজিট প্রটোকলের অংশ হিসেবে গণ্য হবে। আশুগঞ্জকে পোর্ট অব কল ঘোষণার বিনিময়ে ভারতও আসামের শিলাঘাটকে পোর্ট অব কল ঘোষণা করেছে। এ দুটি বন্দর আপাতত ত্রিপুরার পালাটানায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহার হবে। কিন্তু এই ঘোষণায় কোথায় বাণিজ্যিকভাবে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা প্রদান করবে, এমন কোনো কথা নেই। অন্যদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) গ্যাট ১৯৯৪-এর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুসারেও বাংলাদেশ ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা দিতে বাধ্য নয়। 

ট্রানজিটের লাভ-ক্ষতি : দুটি সমীক্ষা
ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার লাভ-ক্ষতি নির্ণয় করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইতোমধ্যে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। এই সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট দেয়ার জন্য বাংলাদেশ মোট ১৪টি করিডর বা পথ ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে আটটি সড়ক, পাঁচটি রেল ও একটি নৌ-পথ। ইউএন-এসকাপের সাবেক পরিচালক ড. রহমতউল্লাহ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. মুহাম্মদ ইউনুস যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের উপযোগী অবকাঠামো না থাকায় এসব করিডর বা পথকে ট্রানজিট উপযোগী করতে হবে। এজন্য আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে ৩৪৭ কোটি ডলার বা ২৪ হাজার ২৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পর বছরে বাংলাদেশ ৫০ কোটি ডলার বা প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে। অর্থাৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ৫ বছর পর থেকে বছরে এই আয় আসবে। অবশ্য এর আগে  শুরুতে প্রতি বছর মাসুল থেকে আয় হবে ৫ কোটি ডলার বা ৩৫০ কোটি টাকা। এডিবির হিসেব অনুসারে দীর্ঘমেয়াদে এই আয় বেড়ে দাঁড়াবে বছরে ১০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
ট্রানজিট সংক্রান্ত বিনিয়োগগুলো হবে মূলত পথ ও রেলের উন্নয়ন, মেরামত এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার কাজে। আর তা সম্পন্ন করতে হবে ট্রানজিট সুবিধা চালুর পাঁচ বছরের মধ্যেই। এই অবকাঠামোগুলো তৈরি হয়ে গেলে তা দেশীয় পণ্য চলাচলের ক্ষেত্রেও বড় রকমের সুফল মিলবে। অবকাঠামো দুর্বলতায় এখন খুব বেশি পণ্য পরিবহনের সুযোগ নেই। তাই এডিবি মনে করছে, প্রথমদিকে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্টের মাধ্যমে বছরে মাত্র ১৮ লাখ টন পণ্যের চাপ নিতে পারবে বাংলাদেশে। পাঁচ বছরের মধ্যে যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টন পণ্য চলাচল সম্ভব হবে।
এডিবির সমীক্ষা অনুসারে, ১৪টি করিডরের মধ্যে ১২টি ব্যবসায়িক বিবেচনায় লাভজনক হবে। দুটি সড়ক করিডর (চট্টগ্রাম বন্দর-তামাবিল ও মংলা-বুড়িমারি) ব্যবসায়িক বিবেচনায় সফল হবে না। বরং পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক স্থানে আছে রেল ব্যবস্থায়। কলকাতা বন্দর থেকে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দরের সরু রাস্তা এবং নৌপথ দীর্ঘদিন অব্যবহƒত থাকায় রেলের সুবিধা বেশি। রেল লাইনগুলো দ্বৈত লাইনে রূপান্তর করার আগ পর্যন্ত কন্টেনার পরিবহনের জন্য মোট ১৪০টি কন্টেনার ওয়াগান (ফ্ল্যাট কার) সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে ৭০টি মিটার গেজ ও ৭০টি ব্রড গেজ। এসব কন্টেনার পরিবহনের জন্য দুটি ব্রড গেজ এবং দুটি মিটার গেজ ইঞ্জিন লাগবে। রাজধানীর কমলাপুরে অভ্যন্তরীণ কন্টেনার ডিপোতে (আইসিডি) মিটার ও ব্রড গেজ উভয় সুবিধা থাকায় রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না বলেও এডিবির সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সড়কপথে পণ্য পরিবহনের জন্য ভারতীয় কাভার্ড ভ্যান বা কাভার্ড ট্রাক প্রবেশ করার পরিবর্তে যৌথ উদ্যোগে একটি মালামাল পরিবহন কোম্পানি গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছেÑ যার মালিকানায় ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের যৌথ অংশীদারিত্ব থাকতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) পলিসি রিসোর্স প্রোগ্রামের (পিআরপি) আওতায় পরিচালিত ‘ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ এ্যান্ড দ্য নর্থইস্ট : ট্রানজিট এ্যান্ড ট্রান্সশিপমেন্ট-স্ট্র্যাটেজিক কনসিডারেশন’ (বিআইডিএস-পিআরপি ওয়ার্কিং পেপার-০৬) শীর্ষক একটি গবেষণায় ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ লাভ সীমিত হবে বলে দেখানো হয়েছে। বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক কেএএস মুরশিদ এই গবেষণাটি করেছেন।
এডিবির সমীক্ষার সঙ্গে বিআইডিএসের সমীক্ষার যে জায়গাটিতে মিল রয়েছে, সেটি হলো রেলপথের মাধ্যমে ট্রানজিট প্রদানে অগ্রাধিকার দেয়া। কারণ বাংলাদেশে রেলওয়ের যে অবকাঠামো বিরাজমান তা বহুলাংশে ব্রিটিশ আমল থেকেই ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের রেলওয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর তাই বিদ্যমান অবকাঠামোয় পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করলে এবং অবকাঠামোর সংস্কার সাধন করা হলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে, অন্যদিকে ট্রানজিটের সত্যিকারের সুফল পাওয়া যাবে।
তবে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার বিনিময়ে এডিবি যে বিরাট অঙ্কের লাভালাভের কথা বলছে, বিআইডিএসের গবেষণা তা পুরোপুরি সমর্থন করতে পারছে না একাধিক কারণে। এডিবির সমীক্ষায় শুধু ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বহনে করার বিপরীতে বাংলাদেশ কি পরিমাণ অর্থ মাসুল হিসেবে পাবে, তাই নির্ণয় করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার রাস্তার দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটারে নেমে আসলে ভারতীয় উৎপাদকদের পণ্য বহনে খরচ কমে গিয়ে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোয় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যকে কতটা প্রতিযোগিতার মুখে ফেলবে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি রপ্তানি হ্রাস পাবে না কি বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে, সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়নি।
ভারতকে ট্রানজিট বা করিডর সুবিধা দেয়া হলে, বর্তমানে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে যে পরিমাণ পণ্য যায় ও সেখান থেকে যে পরিমাণ পণ্য আসে, তার কতখানি বাংলাদেশের দেয়া করিডোর দিয়ে যাবে, তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে ট্রানজিট থেকে আর্থিক লাভালাভের বিষয়টি। এডিবির সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে আসামমুখী বাণিজ্যের ৩৫% ও মেঘালয়মুখী বাণিজ্যের ৫০% বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সম্পন্ন হবে এই করিডর বা ট্রানজিট সুবিধা গ্রহণ করে। কিন্তু বিআইডিএসের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আসামের বাণিজ্য কেন্দ্রীয় সরকারের ভর্তুকি পেয়ে থাকে। রাজনৈতিক কারণেই এই ভর্তুকি স্পর্শকাতর। আর তাই আসামমুখী পণ্য পরিবহন বাংলাদেশ ও নেপালের সীমান্তের মধ্যে সংকীর্ণ ভারতীয় ভূখ-ের শিলিগুড়ির (যা কি না ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত) ওপর দিয়েই অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসামমুখী বাণিজ্যের জন্য গুয়াহাটি-ডাউকি /তামাবিল-পাটুরিয়া ফেরি-বেনাপোল/পেট্রাপোল-কলকাতা ও শিলচর-সুতারকান্দি-পাটুরিয়া-বেনাপোল/পেট্রাপোল-কলকাতা সড়ক পথদ্বয় এবং শিলচর-মহিশ্মশান/শাহবাজপুর-ঢাকা (ধীরাশ্রম)-দর্শনা/গেদে-কলকাতা রেলপথ ব্যবহƒত হতে পারে। তবে আসামের রাজ্য সরকার এই পথ গ্রহণে কতটা আগ্রহী হবে সেটাও বিবেচনার বিষয়। বিশেষ করে ত্রিপুরা রাজ্য সরকার যেখানে বারবারই বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহী, সেখানে আসামের দিক থেকে তেমন কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। আর আসামের দিক থেকে এ বিষয়ে সক্রিয়তা দেখা না গেলে আসামমুখী বাণিজ্যের কতটা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সম্পন্ন হবে তা নিয়ে দ্বিধা থেকেই যাচ্ছে।
শুধু আসাম নয়, উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের বাকি ছয়টি রাজ্যও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ভর্তুকি পেয়ে থাকে। কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিবহন খরচের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রথম এই পরিবহন ভর্তুকি প্রবর্তন করা হয়। ট্রানজিট বা করিডর সুবিধা পেলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নেবে কি না তা নিশ্চিত নয়।
বিআইডিএসের সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে, ভারতের প্রধান অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর পণ্যবহন রেলপথনির্ভর এবং আসামকেন্দ্রিক। ২০০৮ সালে রেলপথে এই রাজ্যগুলোতে ভারতের পশ্চিমাংশ থেকে যে ৬৮ লাখ ৪৭ হাজার মে টন পণ্য ঢুকেছে এবং এখান থেকে ৯০ লাখ ৮৬ হাজার মে. টন পণ্য বেরিয়েছে। এর যথাক্রমে ৭৯.৭% ও ৯৭.৭%-ই সম্পন্ন হয়েছে আসামের সঙ্গে। আর সড়কপথে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে একই বছরে তিন কোটি ৯০ লাখ মে. টন পণ্য আনা-নেওয়া হয়েছে। ফলে সড়ক ও রেল মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়েছে ২০০৮ সালে।
আসাম উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে। বাকি রাজ্যগুলোতে সাধারণত আসামে পণ্য খালাস করার পর তা স্থানান্তর করা হয়। বলা যেতে পারে আসাম থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট করা হয়। আর তাই ভারতকে ট্রানজিট দিলে এই পরিমাণ পণ্যের কতখানি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বহন করা হবে, তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিআইডিএসের সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুরের ক্ষেত্রে প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশের ওপর দিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মেঘালয়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা পণ্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আনা-নেয়া হবে। এভাবে বছরে সমন্বিতভাবে ৩৩ লাখ মে টন (১০ লাখ মে টন রেলপথে ও ২৩ লাখ মে টন সড়ক পথে) পণ্য পরিবহন হতে পারে ট্রানজিটের আওতায়, যা বর্তমানের সাড়ে পাঁচ কোটি মে টন পণ্য আনা-নেয়ার বাজারের অতি ক্ষুদ্র অংশ। আর তাই বিআইডিএসের সমীক্ষায় রেল অবকাঠামো উন্নয়নে ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বছরে দেড় কোটি ডলার থেকে তিন কোটি ডলার পর্যন্ত বাংলাদেশের আয় হতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এটি তেমন বড় কোনো আয় নয়।
তবে অর্থ হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাই আসুক না কেন, অর্থের বাইরে বাংলাদেশ আর কী কী সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনায় নিতে পারে, সেদিকে মনোযোগ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বিআইডিএসের সমীক্ষায়। বিশেষত উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ ব্যবহার করে বাংলাদেশের শিল্পায়নে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করার যে সুযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্র“য়ারি মাসে (২৪-২৫ ফেব্র“য়ারি, ২০০৯) ঢাকায় যে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর বাণিজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তাতেও এসব রাজ্যের পক্ষ থেকে এই সুযোগ গ্রহণের আহবান জানানো হয়। সম্মেলনে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাঙ্গমা বলেন, ‘মেঘালয়ের রয়েছে প্রচুর খনিজ সম্পদ, কিন্তু শিল্প উৎপাদনে তেমন ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এই সম্পদ ব্যবহার করে শিল্প বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারেন।’
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো এডিবির গবেষণা সমীক্ষাটি এখনো জনসমক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংবাদপত্রের মাধ্যমে এই গবেষণার মূল বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়েছে। এডিবির গবেষণায় অনেক বিস্তারিত হিসেব-নিকেশ দেয়া হয়েছে, যা আবার বিআইডিএসের গবেষণায় নেই। তারপরও এডিবির গবেষণা প্রতিবেদনটি কেন এখনো গোপন রাখা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। যেহেতু এটি সরকারি নীতি নির্ধারণে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ প্রভাব রাখবে, তাই এডিবির গবেষণা প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে আলোচনা ও বিতর্কের জন্য দ্রুত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বিআইডিএসের সমীক্ষায় ট্রানজিটের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে যা কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়। বস্তুত উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশ সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক ও বিরূপ ধারণা বিরাজমান। বলা যেতে পারে এসব রাজ্যের অধিবাসীরা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষকে যৌক্তিক-অযৌক্তিক কারণে সন্দেহের চোখে দেখে থাকে। অবশ্য ত্রিপুরায় তুলনামূলকভাবে এই মনোভাব কম। আর আসামের অধিবাসীদের মধ্যে এই মনোভাব প্রকট। এসব রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (বা স্বাধীনতাকামী) প্রশ্রয় দেয়া, বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিদের এসব রাজ্যে তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়া, অবৈধভাবে বাংলাদেশিদের অভিবাসনসহ বিভিন্ন কারণে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং এসব রাজ্যের সরকারগুলো কম-বেশি বাংলাদেশের প্রতি বিরূপ হয়েছে। যদিও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ সরকার এসব জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে যথেষ্ট সক্রিয়তা দেখিয়েছে এবং অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর নেতা-কর্মীদের ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু অবিশ্বাসের দোলাচাল এখনো বন্ধ হয়নি।
তাছাড়া এসব রাজ্যের জনগণের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের বিশেষত কেন্দ্রের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। কেন্দ্রীয় সরকার সবসময় যথাযথভাবে এসব পশ্চাৎপদ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির দিকে মনোযোগ না দেয়ায় অবিশ্বাসের বীজও বপন হয়ে গেছে। এসব মানুষের অনেকেই মনে করে যে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট বা করিডর সুবিধা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের ওপর আরও জোরেশোরে চেপে বসবে। তাদের মধ্যে এমন আশঙ্কাও কাজ করে যে তাদের আবহমান জীবনযাপনের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়ে যাবে। বিপরীতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারসহ প্রধান অংশের মধ্যে চিন্তা আছে যে ট্রানজিট বা করিডরের মাধ্যমে ভৌগোলিক যোগাযোগের দূরত্ব কমিয়ে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ কমিয়ে আনা যাবে। মূল ভূখ-ের সঙ্গে নৈকট্য প্রতিষ্ঠা করা যাবে। অর্থনৈতিক উন্নতিও বাড়বে। তাহলে ধীরে ধীরে ভারতের প্রধান অংশের প্রতি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অনাস্থা বা অবিশ্বাসের মাত্রা কমে আসবে।
সর্বোপরি সুদূরপ্রসারী চিন্তায় ভারত তার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে চীন ও আসিয়ানের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এজন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডর বা ট্রানজিট সুবিধা প্রয়োজন। ভারতের এই প্রয়োজনকে কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদিভিত্তিতে চিন্তা করতে হবে। করিডর বা ট্রানজিটের বিষয়টিকে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা ও অর্থনৈতিক গ-িতে দেখলে চলবে না। ভারত যদি চীন ও আসিয়ানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে সেখানে বাংলাদেশও যেন কিছুটা হিস্যা পেতে পারে, সেজন্য দক্ষতার সঙ্গে এখন থেকেই আলোচনা বা দরকষাকষি শুরু করা উচিত।

প্রসঙ্গ নেপাল ও ভুটান
বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যবাহী ট্রাক ভারতীয় ভূখ- ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে যেতে পারে না। একইভাবে নেপাল ও ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশের ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। এর ফলে নেপাল বা ভুটানের পক্ষে বাংলাদেশের মংলা বন্দর ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। অদূর ভবিষ্যতেও পাবে, তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে যৌথ ঘোষণায় নেপাল ও ভুটানকে মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকার অবশ্য নেপাল ও ভুটান সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে যেখানে দেশ দুটি কিভাবে বাংলাদেশি বন্দর (মংলা ও চট্টগ্রাম) ব্যবহার করতে পারে, তা নিয়ে কথাবার্তা চলছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ভারতের ইতিবাচক সম্মতি ছাড়া কিছুই সম্ভব হবে না।
বস্তুত মংলা বন্দর ব্যবহার করতে না পারায় নেপাল ও ভুটানকে ভারতের কলকাতা/হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কলকাতা/হলদিয়া বন্দর ব্যবহার দেশ দুটির জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। বিকল্প না থাকায় দেশ দুটিকে এই সময় ও ব্যয় মেনে নিতে হয়। এডিবির হিসাব অনুসারে কলকাতা দিয়ে বছরে নেপাল-ভুটান সমন্বিতভাবে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য আনা-নেয়া করে। ভারতের অনুমতি পেলে মংলা বন্দর দিয়ে এর প্রায় পুরোটাই সম্পন্ন করা সম্ভব।
নেপালী ট্রাক তিনমাস অন্তর নবায়নযোগ্য পারমিট নিয়ে ভারতীয় ভূখ-ে প্রবেশ করতে পারে এবং নির্দিষ্ট কিছু স্থানে যেতে পারে। এর বিপরীতে ভারতীয় ট্রাকে নেপালের যে কোনো স্থানে যেতে পারে। তবে নেপালে প্রবেশের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসতে হয়। অন্যদিকে ভারত ও ভুটানের ট্রাক একে অন্যের সীমান্ত অবাধে অতিক্রম করতে পারে।
কিন্তু নেপাল বা ভুটানের ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করতে ভারত অনুমতি দেয় না। নেপালের ক্ষেত্রে শুধু বাংলাবান্ধা রুট দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পণ্য খালাস করতে পারে। যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে যে নেপাল ও ভুটানের পণ্যবাহী যান সীমান্তের জিরো পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ২০০ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করতে দিতে ভারত সম্মত। অথচ বাংলাদেশের ভেতরে কোন পর্যন্ত নেপাল-ভুটানের যান যাবে তা নির্ধারণের এখতিয়ার এককভাবে বাংলাদেশেরই হওয়ার কথা। এখানে ভারত কোনো সীমা টেনে দিতে পারে না। বোঝাই যাচ্ছে, মংলা বন্দর যেন ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্যই এই সীমা টেনে দিয়েছে ভারত। অবশ্য এজন্য ভারতকে দোষারোপ করার কোনো মানে নেই। বাংলাদেশের পক্ষে যারা আলোচনা বা সমঝোতা করেছেন, তারা এই বিষয়ে কোনোই দক্ষতা দেখাতে পারেননি।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও)  সদস্যপদ লাভের জন্য ১৯৮৯ সালে নেপাল যখন আবেদন করে, তখন তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সংস্থাটির ট্রানজিট বিষয়ক বিধি-বিধানের সুযোগ গ্রহণ করা। তখনও অবশ্য ডব্লিউটিও আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেনি। তাই নেপাল আবেদন করেছিল গ্যাটের (জেনারেল এগ্রিমেন্টস অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড) অন্তর্ভুক্তির জন্য। সেসময় ভারত নেপালের ওপর ১৪ মাসের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে যা বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভূআবদ্ধ নেপালের সব ধরনের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ করে দেয়। ফলে নেপাল হাড়ে হাড়ে টের পায় যে ভারতের ট্রানজিট দেয়ার মর্জির ওপর নির্ভর করা কতোটা বিপজ্জনক। কিন্তু ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই এখন পর্যন্ত ভারতের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে নেপালকে। আর তাই বাংলাদেশ বহু আগেই নেপালকে মংলা বন্দর ব্যবহার করে অন্য দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগ প্রদান করলেও তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।
নেপালের কাঁকরভিটা সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা সীমান্ত পর্যন্ত দূরত্ব ৫৩ কিলোমিটার যার পুরোটাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে পড়েছে। নেপালী ট্রাক কার্যত ভারতীয় প্রহরার বাংলাবান্ধা সীমান্তের জিরো পয়েন্টের ৫০০ মিটার আগে এসে থামে। সেখানে পণ্য খালাস করে। এরপর সেগুলো আবার বাংলাদেশি ট্রাকে তোলা হয়। তারপর তা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তবে দিনের আলো থাকতে থাকতেই পণ্য খালাসের কাজ শেষ করতে হয়। আর প্রায়শই ভারতীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশমুখী নেপালী পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি করে যাতে সময় নষ্ট হয়। একইভাবে নেপালে রপ্তানির জন্য বাংলাদেশি ট্রাক ভারতীয় সীমান্তের জিরো পয়েন্টে পণ্য খালাস করে দেয় যা আবার নেপালী ট্রাকে তুলে তারপর নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুটান থেকে পণ্য আমদানি ও সেদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। নেপাল ও ভুটান এখন চাচ্ছে বাংলাবান্ধার পাশাপাশি বুড়িমাড়ি স্থলবন্দর ব্যবহার করার জন্য। বাংলাদেশের তরফ থেকে তেমন কোনো আপত্তি না থাকলেও ভারত এ ব্যাপারে এখনো কোনো সম্মতি দেয়নি।
ভারত সরকার অবশ্য বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে রেলপথে পণ্য বহনের জন্য রোহনপুর-সিঙ্গাবাদ রুট ব্যবহার করতে দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।  এটি বর্তমানে নিষ্ক্রিয় রাধিকাপুর-বিরল রুটের বিকল্প হিসেবে চালু করা হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে কলকাতার তুলনায় মংলার সঙ্গে বিরাটনগর/যাবগনি সীমান্তের দূরত্ব ৩৯ কিলোমিটার কমে যাবে।
অন্যদিকে ভুটানী পণ্যবাহী ট্রাক এখন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত এলাকা ডাউকি দিয়ে বাংলাদেশের সিলেট জেলার তামাবিল স্থলবন্দরে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে। ইতোমধ্যে ভুটান থেকে কমলা নিয়ে ট্রাক এই রুট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। তার মানে হচ্ছে, ভারতের দিক থেকেও নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট সুবিধা সম্প্রসারণ করে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
এখানে বলা দরকার যে অক্টোবর মাসেই বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ভারত সফর করেছে। এই সফরকালে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশের ক্ষেত্রে বর্তমান সীমা শিথিল করা। এই চুক্তির ফলে পণ্য পরিবহনে ভারত ও নেপালের ট্রাক সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের ভেতরে ২০০ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারবে। একইভাবে বাংলাদেশি ট্রাকও ভারতীয় সীমান্তের ২০০ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারবে। এর ফলে গুদামের কাছে এসে পণ্য খালাস করা সম্ভব হবে।
তবে এসব পদক্ষেপের গতি আরও বাড়া দরকার। বিশেষ করে নেপাল ও ভুটান যেন বাংলাদেশের মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে পারে, ভারতের উচিত তা নিশ্চিত করা। মনে রাখা প্রয়োজন যে ভূআবদ্ধ দেশ দুটির সামগ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই কম। ফলে তাদের বাণিজ্য যদি এই দুই বন্দর ব্যবহার করে শতভাগও বৃদ্ধি পায়, তা ভারতের বাণিজ্যের তুলনায় কিছুই নয়। এডিবির সমীক্ষাতে বলা হয়েছে যে বর্তমান কলকাতা বন্দরের মাধ্যমে নেপাল-ভুটানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমুখী পণ্য আনা-নেয়ার বার্ষিক পরিমাণ ১০ লাখ টনেরও কম। ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের মংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা পেলে যে এর পুরোটাই বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না।  নেপাল যদি সড়কপথ ব্যবহার করে তাহলে রুটটি হবে কাঠমান্ডু-কাঁকরভিটা-ফুলবাড়ি/বাংলাবান্ধা-মংলা বন্দর। এটির দূরত্ব বর্তমানের কাঠমান্ডু-কলকাতা সড়ক পথের চেয়ে মাত্র ১১ কিলোমিটার কম হলেও এতে সময় লাগবে ১৬০ ঘণ্টা যেখানে কলকাতা-কাঠমান্ডু পথে সময় লাগে ২৫০ ঘণ্টা। তাই কাঠমান্ডু-মংলা সড়কপথে খরচ অনেক কম হবে। তবে রোহনপুর হয়ে বীরগঞ্জ-মংলা রেলপথের দূরত্ব বর্তমানের বীরগঞ্জ-কলকাতা রেলপথের চেয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেশি। কিন্তু প্রথম পথে সময় লাগবে ১৩৭ ঘণ্টা যেখানে বর্তমান রেলপথে সময় লাগে ২৫০ ঘণ্টা।
অন্যদিকে ভুটান যদি ভারতীয় ট্রানজিট পেয়ে মংলা বন্দর ব্যবহার করে তাহলে সড়কপথটি হবে থিম্পু-ফুন্টসোলিং/জাইগান-বুড়িমারি-মংলা। এই পথের দূরত্ব ৮৮০ কিলোমিটার ও সময় লাগবে ১৫৬ ঘণ্টা যেখানে থিম্পু-কলকাতা সড়কপথের দূরত্ব এক হাজার ৩৯ কিলোমিটার ও সময় লাগে ২৩৯ ঘণ্টা। সুতরাং, সময় ও খরচ বাঁচাতে সড়কপথে নেপাল ও ভুটান বাংলাদেশের মংলা বন্দর ব্যবহার করলে সবদিক থেকেই লাভবান হবে। প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে ভারত কী এমনভাবে ট্রানজিট মাসুল আরোপ করবে যেন কলকাতা বন্দর ব্যবহার থেকে যে রাজস্ব বা মাসুল পেতো, তা তুলে নেয়া যায়? যদি তাই হয়, তাহলে প্রকারান্তরে মংলা বন্দর ব্যবহারে দেশ দুটিকে নিরুৎসাহিতই করা হবে।
আসলে ভারতের এখন সেই সনাতনী ও আধিপত্যমূলক চিন্তা থেকে সরে আসা প্রয়োজন যে বাংলাদেশি বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেলে নেপাল-ভুটানের ভারত নির্ভরতা কমে যাবে। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই দেশ দুটির পক্ষে এই নির্ভরতা কমানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। বরং ভারত যদি কিছুটা সহায়তার হাত সম্প্রসারণ করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অবস্থানই শক্তিশালী হবে।

শেষ কথা
ভারতকে ট্রানজিট বা করিডর সুবিধা দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের দিক থেকে কোনো দ্বিধা থাকার অবকাশ নেই। এটি নিয়ে অপরাজনীতি বা ভারতীয় আগ্রাসনের ধুয়ো তোলাও নিতান্তই অর্থহীন বিষয়। বরং এই ট্রানজিট বা করিডর সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ কিভাবে লাভবান হতে পারে, সেদিকেই সর্বাত্মক নজর দেয়া প্রয়োজন, প্রয়োজন ভারতের সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষি করা।  ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতকে এটাই বোঝাতে পারে যে সুপ্রতিবেশীসুলভ সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। তবে এই সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকেও সমধর্মী মর্যাদাসম্পন্ন আচরণ প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। আর ভারত যদি সেই প্রত্যাশা পূরণে ইতিবাচক মনোভাব দেখায়, তাহলে নিজেদের প্রত্যাশার তালিকাটিতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর যথাযথভাবে প্রতিফলন ঘটাতে হবে। নিজেদের বোকামীতে বা স্বার্থান্বেষী কোনো কোনো মহলের তৎপরতায় এসব কাজে ব্যর্থ হলে বছরের পর বছর তার দুর্ভোগ এদেশের মানুষকেই পোহাতে হবে, ভারতকে নয়।     

তথ্যসূত্রসমূহ
১. বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) পলিসি রিসোর্স প্রোগ্রামের (পিআরপি) আওতায় পরিচালিত India, Bangladesh and the North-East: Transit and Transhipment-Strategic Consideration শীর্ষক গবেষণা সমীক্ষা (বিআইডিএস-পিআরপি ওয়ার্কিং পেপার-০৬, ২০১০)
২. ADB- Estimate of Gains from Developing Functinal Corridors for Transit Traffic through Bangladesh (preliminary draft report, 2010)
৩. Trapped in Transit Travails by Paras Kharel। বিস্তারিত দেখুন : http://www.myrepublica.com/portal/index.php?action=news_details&news_id=1581.
৪. ডব্লিউটিও-র প্রাসঙ্গিক বিধিবিধান ও এতদসংক্রান্ত বিশ্লেষণের জন্য বাংলাদেশ চেম্বারের উপদেষ্টা ও ফেয়ার ট্রেড এডভোকেসি সেন্টারের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ কর্তৃক প্রস্তুতকতৃ Modalities for Regional Connectivity, Transit and Transhipment (March 12, 2010)

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
এই সময়/রাজনীতি
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.
বর্তমান সংথ্যা
পুরানো সংথ্যা
Click to see Archive
Doshdik
 
 
 
Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive