|
শুভ কিবরিয়া
রাজনীতিতে এখন বেশ উত্তাপ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে বলে সরকার জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের অনেককে গ্রেফতার করেছে। দীর্ঘ রিমান্ডের আওতায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জামায়াত নেতারা এত লম্বা সময় রিমান্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন। জামায়াতের পুরো দল এবং অঙ্গসংগঠন এখন সরকারের চাপের মুখে। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। সেই ট্রাইব্যুনালে আটককৃত শীর্ষ চার জামায়াত নেতার মামলা নেয়া হয়েছে। রিমান্ডে থাকা জামায়াত নেতারা কি বলছেন, গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তার বরাতে তা প্রতিদিনই মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে। সরকারের এই প্রস্তুতি প্রমাণ করছে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য সরকার প্রস্তুত। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও ঘোষণা করছেন দ্রুতই এই বিচারকাজ শুরু হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ চালু করতে না করতেই খুব দ্রুতভাবে সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর (যে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি আদালত কর্তৃক এখনো প্রকাশিত হয় নাই) সরকার সেই আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য তাদের ভাষায় একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি, স্বতন্ত্রÑ সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা এসব দলের সদস্যরা ছাড়াই আওয়ামী লীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টির সদস্যের নিয়ে ১৫ সদস্যের একটি সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। এই ১৫ সদস্যের কমিটিতে ১২ জন সদস্য আওয়ামী লীগের। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সভাপতি এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে গঠিত হয়েছে এই কমিটি।
২. সংবিধান সংশোধন করার জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছে তাতে বিএনপির একজন সংসদ সদস্য অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নানা অজুহাতে এবং বেশ কিছু দাবি তুলে, এই উদ্যোগে সন্দেহ প্রকাশ করে এই কমিটিতে নাম দেয়নি বিএনপি। এ কমিটিতে জামায়াতকে নীতিগতভাবে জায়গা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সরকার আদালতের যে রায়ের ওপর ভিত্তি করে সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগ নিয়েছে, সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি রায় প্রদানকারী বিচারকদের স্বাক্ষর হয়ে এখনো প্রকাশিত হয়নি। সুতরাং রায়ে প্রকৃত কি কি প্রস্তাবনা বা নির্দেশনা বা পর্যবেক্ষণ দেয়া আছে তা সম্পূর্ণরূপে জনগোচরে আসেনি। তবে অনুমান করা যায়, সরকার এবং বিরোধী দলের উচ্চমহল এ বিষয়ে অবগত।
৩. সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। ৪-৪-১৯৭৯ তারিখে এই বিষয়ে সংসদে বিল উত্থাপিত হয়। পরদিন ৫-৪-১৯৭৯ তারিখেই এই বিল সংসদে গৃহীত হয়। এই সংশোধনীর মূল বিষয়বস্তু ছিল, সপরিবারের বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৯ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক আমলের সকল কর্মকাণ্ড বৈধকরণ এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতির পরিবর্তন। এই সংশোধনীর ফলে ১৯৭২ সালে প্রণীত আদি বা মূল সংবিধানের মূলনীতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানো হয়। সংবিধানের শুরুতেই ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ ‘(দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহের নামে)’ সংযোজিত হয়। রাষ্ট্রীয় প্রস্তাবনায় যে লাইনে লেখা ছিল, ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে’ তার বদলে লেখা হয়েছে, ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে’। দ্বিতীয়ত সংবিধানের মূলনীতিতে এ সংশোধনের ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। আদি সংবিধানে যেখানে লেখা ছিল, ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ তার বদলে সংশোধিত সংবিধানে লেখা হয়, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারের সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ এখন প্রশ্ন উঠছে, সংবিধান সংশোধন করে মহাজোট কি সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ উঠিয়ে দেবে? তারা কি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করবে? যদি ১৯৭২ সালের আদি সংবিধানে সত্যি সত্যিই হুবহু ফিরতে হয়, তাহলে তো এসব পরিবর্তন অনিবার্য। কিন্তু ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে তার বক্তব্য দিয়েছেন।
৪. সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদীয় দলের বৈঠকে বলেছেন, ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ কথাটি সংবিধান সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয়। সংবিধানের বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম থাকবে না বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবেÑ এমন কোনো সংশোধনী আনা হবে না।’ তিনি বলেছেন, ‘তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধী। কারণ রাজনীতি করার অধিকার সবার রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের আইন মেনে নিয়ে তাদের রাজনীতি করতে হবে। কেউ নির্বাচন কমিশনের নীতিমালার বিরুদ্ধে কিছু করতে চাইলে তা করতে পারবে না। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত যা নেয়ার তা নেবে নির্বাচন কমিশন। জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন কমিশনের আইন মেনে রাজনীতি করতে হবে।’ আবার, এই একই বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘সংবিধানের যা কিছু পরিবর্তন আসবে, তা বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক হবে না। যদি তাই হয়, তাহলে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বানিয়ে এরশাদ সংবিধানে যে ৮ম সংশোধনী এনেছিলেন তা কি বাতিল হবে? ’৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনার একটি ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। তা যদি বহাল রাখতে হয় তবে ‘বিসমিল্লাহ্রি রহমানির রাহিম’ বহাল থাকবে কীভাবে?
৫. বাংলাদেশের সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৪টি সংশোধনী এসেছে। সংবিধান সংশোধনী করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সম্মতি লাগে। কাজেই সরকার ও বিরোধী দলের ঐকমত্য দরকার হয় অথবা ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার হয়। আমাদের সংবিধানের দশম, একাদশ, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ সংশোধনী (১৯৯০Ñ১৯৯৬) সংগঠিত হয় সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বিত সমর্থনে। এই ঐক্যের ফলেই সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা নতুন করে প্রবর্তন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব হয়। এই সংশোধনীগুলো ছাড়া বাকি সংশোধনীগুলো একক গরিষ্ঠতা বা সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার আওতায় করা হয়। সুতরাং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনপুষ্ট একক গরিষ্ঠতা অথবা সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বিত ঐক্য দরকার হয়। বর্তমান সংসদে মহাজোট সরকারের যেহেতু নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা আছে, দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন আছে সেহেতু তারা যে কোনো রকমের সংশোধনী এনে সংবিধান সংশোধন করার রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস হচ্ছে, গরিষ্ঠতার জোরের বহু কাজ পরবর্তীতে বিপরীত পক্ষ এসে গরিষ্ঠতার জোরেই তা বাতিলও করেছে।
৬. সরকার কেন এখন সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে? ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাবার কথা বললেও তাত্ত্বিকভাবে আদতে তা সম্ভব নয়। কেননা ১৯৭২-এর সংবিধান প্রণীত হবার পর আওয়ামী লীগ নিজেই চারবার সংবিধান সংশোধন করেছে। এর মধ্যে বাকশাল কায়েমও আছে। কাজেই ১৯৭২-এর সংবিধানে হুবহু ফিরতে হলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (যা দ্বারা বাকশাল কায়েম হয়) বাতিলের প্রশ্নটিও সামনে দাঁড়াবে। এসব বিষয় জানা সত্ত্বেও মহাজোট সরকার এই উদ্যোগ কেন নিচ্ছে? এর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে নতুনভাবে সংবিধান সংশোধিত হলে প্রতিপক্ষ বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য তা পীড়াদায়ক ঘটনা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘বিএনপির জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে। এ জন্যই তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না।’ বিএনপি সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিএনপিকে শিক্ষা দিতেই আওয়ামী লীগ এখন এই রাজনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে চায়। এর ফলে বিএনপির ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুমকি দিয়ে বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়ার কৌশলের বিরুদ্ধে পাল্টা কৌশল হিসেবে এটি কাজ করবে। সরকারের নানা রকম ব্যর্থতার বিষয়ে সোচ্চার হবার বিএনপির সাম্প্রতিক প্রবণতাকে মোকাবিলা করার জন্য এটি একটি যুৎসই হাতিয়ার হবে। বিএনপি এই সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে অনুপস্থিত থাকলে তার ওপর চাপ বাড়বে। কিংবা এ বিষয়ে বিতর্কে জড়িত হলে সরকারবিরোধী আন্দোলনের জায়গা থেকে বিএনপিকে বিরত রাখা সহজতর হবে।
৭. বিএনপির কৌশল কি? এই সংবিধান সংশোধনের সংসদীয় কমিটিতে শেষ পর্যন্ত তারা যাবে না। নানা শর্ত তুলে তাদের অনুপস্থিতিটা নিশ্চিত করবে। সংবিধান সংশোধনের বর্তমান কমিটিকে মহাজোটের কমিটি হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইবে তারা। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ, সংসদ সদস্য এবং সুশীল সমাজের বিএনপি ভাবাপন্ন অংশ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের নানা দুর্বল দিক তুলে ধরে প্রতিদিন বিতর্ক চালু রাখবে বিএনপি। বিএনপি জানে সংসদে যে কোনো সংশোধনী আনার পক্ষে মহাজোটের সামর্থ্য আছে। সুতরাং আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সংবিধান সংশোধনীর সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তারা অনুপস্থিত থাকবে। ভবিষ্যতে এই সংবিধান সংশোধনকে রাজনৈতিকভাবে তারা ব্যবহার করতে চাইবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ধর্ম বিপন্ন হয়, একদলীয় শাসন কায়েম হয়Ñ এই আওয়াজ তারা তোলার চেষ্টা করবে। ইতোমধ্যে সরকার কৌশলে বিএনপির কাছ থেকে জামায়াতকে দূরে সরিয়ে আওয়ামীবিরোধী ক্ষমতাকে দুর্বল করতে চাইছে, এই মনোভাব বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মাথায় সম্প্রতি এসেছে। সংবিধান সংশোধন বিষয়কে ইস্যু করে জামায়াতসহ সকল আওয়ামীবিরোধী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ করার একটা উদ্যোগ নেবে বিএনপি। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যে এই জোট কথিত, ‘ধর্ম রক্ষা’র খাতিরে নানা রকম কর্মসূচি হাতে নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য কাজ করবে। রমজান মাসে এ বিষয়ে বিএনপি সোচ্চার হবার চেষ্টা করবে। রাজনৈতিকভাবে বিএনপির একটি মহল, সরকারের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে নতুন পাওনা বলে ভাবছে। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে আসার পর বিএনপি মনোভাবাপন্ন সংবিধান বিশেষজ্ঞদের, আইনবিদদের দ্বারা একটি সমন্বিত মতামত তৈরি করে বিএনপি এই সরকারবিরোধী প্রচারণায় মাঠে নামবে।
৮. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিগত নির্বাচনে পাওয়া সংসদ সদস্যের হিসাবকেই তাদের শক্তি হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। ১৯৯০-এর পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনের ভোটের হিসাব নিলে এ কথা খুব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দেশের রাজনীতি দ্বিধাবিভক্তির দিকে এগিয়েছে। ভোটের শতকরা হার বা জনসমর্থনের নিরিখে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। দুই দলের অনৈক্য, বিভাজন এবং পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করার জিঘাংসা যখন সুস্পষ্ট হয়েছে, তখনই অগণতান্ত্রিক শাসন জেঁকে বসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য ক্ষমতায় এসে, বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কখনো এই কথাটি মনে রাখেনি। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বশেষ সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি বক্তব্যে বলেছেন, ‘অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে চাই।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা অতীতের গহ্বরেই ফিরে গেছেন বার বার। ১/১১ তারই বড় প্রমাণ। যুগের পরিবর্তনে সংবিধান বদল হবে এটাই জনপ্রত্যাশা। সংবিধান যেহেতু জনগণের সম্পদ, কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব জিনিস নয়Ñ সেহেতু এই সংবিধানের সংশোধন এমনভাবে হওয়া উচিত যাতে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকে। কিন্তু বর্তমান সংবিধান সংশোধন বিষয়ে যে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তাতে কি তার উপস্থিতি থাকছে? জনগণ কি জানে সংবিধানের কোন বিষয় সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে? তাতে জনগণের প্রকৃত কল্যাণ কতটুকু হবে? সরকার বা বিরোধী দল, এ বিষয়ে জনগণকে গুরুত্ব দেয়নি। জনগণকে অবহিতকরণের উদ্যোগ নেয়নি এখনো।
৯. সংবিধান সংশোধন করা হোক। রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ফিরে আসুক। সংবিধান সংশোধনে এ বিষয়ক সংশ্লিষ্ট সকল বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়া হোক। এ কাজে এমন সব মানুষদের দায়িত্ব দেয়া হোক যারা বিতর্কের ঊর্ধ্বে। সরকার সংবিধান সংশোধন করার জন্য ১৫ সদস্যের যে সংসদীয় কমিটি করেছে তাতে কোÑচেয়ারম্যান হয়েছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ১৯৭২ সালের সংবিধান যখন প্রণীত হয়, তখন তিনি আওয়ামীবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সে সময়ে তার ভূমিকা নিয়ে আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক মন্তব্য করেছেন, ‘সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭২-এর সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। বঙ্গবন্ধু নিজে যেখানে স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে তিনি দ্বিমত পোষণ করেছেন। আর তাকেই সেই ’৭২-এর সংবিধান পুনর্প্রবর্তনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’ সুতরাং এ রকম বিতর্ক যাতে এড়ানো যায় তাতেই মঙ্গল।
দেশের অর্থনীতি এবং রাজনীতি এক সংঘাতমুখর অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটি সুসম্পন্ন করা দরকার। দরকার গার্মেন্টস শিল্পের অস্থিরতা দূর করা। দ্রব্যমূল্য মানুষের সহনীয় জায়গায় নিয়ে আসা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কট দূর করা, দুর্নীতি-টেন্ডারবাজি-গুপ্তহত্যা, ক্রসফায়ার বন্ধ করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এখন জরুরি। আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা ঘোরপ্যাঁচে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং রাজনীতি এক জটিল সময় পার করছে। এ সময় বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে হলে চাই রাজনৈতিক ঐকমত্য। যে কোনো বিতর্কে-সংঘাতে জড়ালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও জনগণ। সকল রাজনৈতিক দলের সেই কথাটা মনে রাখা দরকার। সংবিধান সংশোধন নিয়ে ঐকমত্য না হলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এক দুরূহ সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে। সেই বিষয়টি সব রাজনৈতিক দলের মাথায় রাখা দরকার।
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী
১। সংক্ষিপ্ত শিরনামা। Ñএই আইন সংবিধান (পঞ্চম সংশোধন) আইন, ১৯৭৯ নামে অভিহিত হইবে। ২। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের সংশোধন। Ñ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে, ১৭ অনুচ্ছেদের পর নিম্নবর্ণিত নূতন ১৮ অনুচ্ছেদ সংযোজিত হইবে : “১৮। ফরমানসমূহ, ইত্যাদির অনুমোদন ও সমর্থন। Ñ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হইতে ১৯৭৯ সালের ৯ই এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ ও অন্যান্য আইন, এবং উক্ত মেয়াদের মধ্যে অনুরূপ কোন ফরমান দ্বারা এই সংবিধানের যে সকল সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন ও বিলোপসাধন করা হইয়াছে তাহা এবং অনুরূপ কোন ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ বা অন্য কোন আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত ক্ষমতাবলে অথবা অনুরূপ কোন ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে গিয়া বা অনুরূপ বিবেচনায় কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত কোন আদেশ কিংবা প্রদত্ত কোন দণ্ডাদেশ কার্যকর বা পালন করিবার জন্য উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত, বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যাধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তৎসম্পর্কে কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোন কারণেই কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।”
সংবিধানের প্রস্তাবনার আদি ও বর্তমান রূপ আদি
প্রস্তাবনা
আমরা, বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া [জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের] মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি : আমরা অঙ্গীকার করিতেছে যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলÑ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।
বর্তমান
[বিসমিল্লাহির-রহমানির রহিম (দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহের নামে)] প্রস্তাবনা
আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া [জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের] মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি : আমরা অঙ্গীকার করিতেছে যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, ‘জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারের সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে। ( পঞ্চম সংশোধনির ফলে সংশোধিত)
এক নজরে সংবিধান সংশোধনী
সংশোধনী সংসদে বিল সংসদে বিল গৃহীত সংশোধিত বিষয়ের সংক্ষিপ্তসার উত্থাপনের তারিখ হওয়ার তারিখ
প্রথম ১২-০৭-১৯৭৩ ১৪-০৭-১৯৭৩ ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত বন্দি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিচারের ক্ষমতাবিষয়ক।
দ্বিতীয় ১৮-০৯-১৯৭৩ ২০-০৯-১৯৭৩ জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান, প্রিভেনটিভ ডিটেনশন সংক্রান্ত আইন ও মৌলিক অধিকার পরিপন্থী আইন প্রণয়ন ক্ষমতাপ্রাপ্তি।
তৃতীয় ২১-১১-১৯৭৪ ২৩-১১-১৯৭৪ বাংলাদেশÑভারত সীমান্ত চুক্তি।
চতুর্থ ২৫-০১-১৯৭৫ ২৫-০১-১৯৭৫ রাষ্ট্রপ্রতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা, আজ্ঞাবাহী মন্ত্রিপরিষদ, ক্ষমতাহীন জাতীয় সংসদ, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব।
পঞ্চম ০৪-০৪-১৯৭৯ ০৫-০৪-১৯৭৯ সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৫-০৮-৭৫ থেকে ০৯-০৪-৭৯ পর্যন্ত সামরিক আমলের সকল কর্মকাণ্ড বৈধকরণ, রাষ্ট্রীয় মূলনীতির পরিবর্তন।
ষষ্ঠ ০১-০৭-১৯৮১ ০৮-০৭-১৯৮১ রাষ্টপতি জিয়া হত্যার পর নিয়োগকৃত উপÑরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার কর্তৃক রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের পদপ্রার্থীর বিষয় বৈধকরণ।
সপ্তম ১০-১১-১৯৮৬ ১০-১১-১৯৮৬ এরশাদের সামরিক শাসন আমলের সকল কর্মকাণ্ড বৈধকরণ।
অষ্টম ১১-০৫-১৯৮৮ ০৭-০৬-১৯৮৮ হাইকোর্ট বিভাগকে ৬টি বেঞ্চে বিভক্ত এবং পবিত্র ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা।
নবম ০৬-০৭-১৯৮৯ ১০-০৭-১৯৮৯ সার্বজনীন জোটে একই সাথে রাষ্ট্রপতি ও উপÑরাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যবস্থা।
দশম ১০-০৬-১৯৯০ ১২-০৬-১৯৯০ পরোক্ষভোটে মহিলাদের ৩০টি সংরক্ষিত আসনের ১৫ বছরের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় রিভিউ এর ব্যবস্থা।
একাদশ ০২-০৭-১৯৯১ ০৬-০৮-১৯৯১ উপÑরাষ্ট্রপতি পদে প্রধান বিচারপতির নিয়োগ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন সত্ত্বেও পুনরায় প্রধান বিচারপতি পদে প্রত্যাবর্তন বৈধকরণ সংক্রান্ত।
দ্বাদশ ০২-০৭-১৯৯১ ০৬-০৮-১৯৯১ সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠা।
এয়োদশ ২১-০৩-১৯৯৬ ২৫-০৩-১৯৯৬ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন।
চতুর্দশ ১৩-০৯-২০০৪ ২৯-১১-২০০৪ মহিলা আসন সংরক্ষণ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারক, পিএসসির চেয়ারম্যান, সদস্য ও সিওজির অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি এবং সংসদ সদস্যদের শপথ সংক্রান্ত বিধান। |