Logo
 বর্ষ ৩ সংখ্যা ৯ ১লা শ্রাবণ, ১৪১৭ ১৪ জুলাই, ২০১০ 
আপনি এখন পুরোনো সংখ্যায় আছেন ! তারিখ : ১৪ জুলাই, ২০১০
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
[তির্যক] রঙিন রাখাল বন্ধু  

আহসান কবির

রাখাল বন্ধু ছায়াছবির কথা অনেকেরই হয়ত মনে আছে। যতদূর মনে পড়ে এই ছবির একটা হিট গান ছিল এমনÑ ‘চারা গাছে ফুল ফুইটাছে ডাল ভাইঙ্গো নারে...’ এই ছবিটি প্রথমে সাদাকালো নির্মিত হয়েছিল। সে সময়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত হবার কারণে ছবিটি পরবর্তীকালে আবারো নির্মিত হয় রঙিন রাখাল বন্ধু নামে।
রাজনীতির  রাখাল বন্ধু কে? কার কার ভেতর বন্ধুত্ব জন্মলগ্ন থেকে এখনো আলোচিত হয়ে আছে? কার কার বন্ধুত্ব এখনো অটুট? কারা কারা ও আমার বন্ধুগো চিরসাথী পথ চলার ? এই প্রশ্নের উত্তর সবাই জানেন। রাখাল বন্ধু দুজন হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
বিএনপি নামের দলটি এরশাদকে সামরিক স্বৈরাচার মনে করে। বাংলাদেশের প্রায় সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মতো বিএনপির সব নেতা এ ব্যাপারে একমত যে এরশাদের শাসনকালীন সময়ের চেয়ে খারাপ সময় বাংলাদেশে আর আসেনি। তো বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সাহেব এরশাদের মতো করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। একই কায়দায় হ্যাঁ না ভোট অতঃপর গণতন্ত্রের খাদ্য যোগান দিতে লোক দেখানো সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন তারা দুজন। জিয়াউর রহমানের সময়টাকে যদি সাদাকালো যুগ ধরা হয় তাহলে রাখাল বন্ধুর আবির্ভাব তখনই। জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগবিরোধী সব প্ল্যাটফর্ম একসঙ্গে করার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীকে পুনর্জন্ম দান করেন। নুন খাবার ঋণই নাকি মানুষ বহুদিন মনে রাখে। তো সেখানে পুনর্জন্ম। ভাবা যায়? বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর তখন থেকেই রাখাল বন্ধুত্বের শুরু। সেটা ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থাৎ সাদা-কালো রাখাল বন্ধুত্ব।
 বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের অঙ্গ সংগঠন আল বদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনী এদেশের মুক্তিকামী মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। গণহত্যা চালিয়েছিল। অবশ্য এ কাজ জামায়াত শুধু একা করেনি। ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগী হয়েছিল মুসলিম লীগ (কাউন্সিল, কনভেনশন ও কাইয়ুম), নেজামে ইসলাম ও পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি পিডিপি। সত্তরের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ এসব দলের ভরাডুবি হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়া এসব দলের মধ্যে মুসলিম লীগ কোনো আসন পায়নি, জামায়াত ও নেজামী ইসলামীর একজন করে প্রার্থী জয়লাভ করেছিল, আর পিডিবির দুজন। এ ছাড়া সাইনবোর্ডসর্বস্ব কিছু দলও ছিল যারা পাকিস্তানিদের পদলেহন করেছিল। যেমন মাওলানা মান্নানের জমিয়াতুল মোদারেসীন ও হাফেজ্জী হুজুরের দল। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীসহ এসব দল জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রাণ ফিরে পেয়ে বিএনপিকে তখন খালি হাতে ফেরায়নি। এক বন্ধু কি কখনো আরেক বন্ধুকে খালি হাতে ফেরায়? তবে মাইক্রোস্কোপ দিয়েও এখন আর মুসলিম লীগ, নেজামী ইসলামী ও পিডিপিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। অতিকায় ডাইনোসরের মতো তারা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। জেনারেল জিয়ার রাজত্বে জামায়াত প্রথম তেলাপোকা হয়ে ফিরে আসে। গোলাম আযম স্বাধীনতার পর প্রথম বায়তুল মোকাররমে গেলে মুসল্লিরা তাকে জুতোপেটা করেছিল। ’৭৯ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অংশও নিয়েছিল। সব শ্রেণীর মানুষ যারা স্বাধীনতা চেয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিল  তাদের কাছে জিয়াউর রহমানের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধা জেনারেলের এমন রাজাকারপ্রীতি  ভালো লাগেনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের মধ্যে ভয়াবহ দূরত্ব তৈরি হয় এবং জিয়ার বিরুদ্ধে কয়েক ডজন ক্যু প্রচেষ্টা হয়েছিল। ক্ষমতায় এসে সরকারের সবগুলো গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য এবং বিভিন্ন দল থেকে নেতা কিনে এনে জিয়াউর রহমান দল গঠন করেছিলেন। আওয়ামী লীগবিরোধী সব দলকে একই প্ল্যাটফর্মে আনতে চাইলেও তার দলই তার জীবদ্দশায় স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তিনি ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন বিএনপির ভেতরের পরস্পরবিরোধী এই  দুই গ্র“পের মতবিরোধ কমাতে। সেখানেই সেনাবাহিনীর একটি গ্র“পের ক্যু প্রচেষ্টা সফল হয় এবং তিনি নিহত হন। সাদাকালো রাখাল বন্ধুত্বের অবসানও সেখানে।
মাঝখানের সময়টা অর্থাৎ এরশাদের নয় বছর ছিল বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তা আর দলের ভাঙন ঠেকানোর সময়। বিএনপি ছেড়ে অনেকেই তখন এরশাদের দলে গেলেও জামায়াত এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নিয়েছিল এক মজার নীতি । নিজেদের বিকশিত করার স্বার্থে এরশাদকে না ঘাঁটানোর সিদ্ধান্ত নেয় তারা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত একটি ঢিলও ছোড়েনি। এরশাদ আমলের তুমুল আলোচিত নির্বাচনে (১৯৮৬-এর সংসদ নির্বাচন) বিএনপি অংশ না নিলেও  আওয়ামী লীগের মতো জামায়াতও অংশ নিয়েছিল। এরশাদের আমলে ছাত্রদলের সঙ্গে ইসলামী ছাত্র-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে বহুবার। এরশাদ আমলটা বিএনপি ও জামায়াতের রাখাল বন্ধুত্বের জন্য চরম এক দুঃসময়। বলা যায় বন্ধুত্বের অন্ধকার যুগ।
১৯৯১-এর নির্বাচনে তারা প্রথম অপ্রকাশ্য আঁতাত করে বিএনপির সঙ্গে। ঐ  নির্বাচনে কে জিতবে সেটা কোন এক অজানা কারণে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা করতে পারেনি। নির্বাচনে একাট্টা হলেও এর পরে এরশাদ আমলের মতো বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব তৈরি হয়। মজার ব্যাপার এই যে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে করা পাপ মোচনের জন্য কিনা জানি না ১৯৯৪-৯৫-এর বিএনপি ও খালেদাবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত হাত মিলিয়েছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। অবশ্য আলাদাভাবেই এই দুটি দল ১৯৯৬-এর নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জামায়াত ও বিএনপি হেরে যায়। এরশাদ আমলের মতো বিএনপি ও জামায়াতের রাখাল বন্ধুত্বের জন্য সেটাও ছিল এক অন্ধকার যুগ। এর পরই  রঙিন কালের শুরু।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপি চারদলীয় জোট গঠন করে যার ভেতর জামায়াতের ভূমিকা ছিল একেবারেই অন্যরকম। তারা রাখাল বন্ধুত্বের সবটা ব্যবহার করে বিএনপিকে তাদের ওপর নির্ভরশীল করার নীতি নেয়। জেনারেল জিয়ার আমলে মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের নামে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সাহায্যের টাকা রাবেতা আল ইসলামীর মাধ্যমে প্রথম ব্যবহার করা শুরু করে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের অর্থনৈতিক আগ্রাসনের শুরুটা ছিল সেখানেই। রঙিন রাখাল বন্ধুত্বের যুগে জামায়াতে ইসলামী  এরশাদ আমলের শেষ দিকে ও বিএনপি আমলের প্রথম দিকে গড়ে তোলা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাবলম্বী করার দিকে মনোযোগ দেয়। অভাবের কারণে যে সমস্ত ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করতে পারে না তাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দলে টানা এবং ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের চাকরি দেয়া বা পুনর্বাসনের জন্য তারা ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইনস্যুওরেন্স, এনজিও, ডেভেলপারস, টেলিভিশন, পত্রিকা, কোচিং সেন্টারসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। চারদলীয় জোটের মিছিল-মিটিং-এ বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও শিবিরের সদস্যরাও যেতে থাকে। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে মিছিল-মিটিং-এ জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের উপস্থিতি ঠিক থাকলেও কমতে থাকে বিএনপির সদস্যদের সংখ্যা। নিজেদের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে ২০০৭-০৮ সালে অনেক বেশি আসন দাবি করে বসে জামায়াত। যদিও বিএনপি তাদের ফাঁদে পা দেয়নি। বিএনপির একটা বড় অংশ গেলবারের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির পেছনে জামায়াতকেও দায়ী করে থাকেন।
২০০৯-১০ সালে  এসে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির বন্ধুত্বের অগ্নিপরীক্ষা চলছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের সম্মুখীন হচ্ছেন জামায়াতের প্রথম সারির কয়েক ডজন নেতা। এই আপৎকালীন সময়ে নেতাদের বাঁচাতে জামায়াতে ইসলামী তার সর্বস্ব ব্যয় করবে বলেই মনে হচ্ছে। বিএনপি আন্দোলন খুব একটা জমিয়ে তুলতে পারছে না । চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে জামাতের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল যদিও বিএনপি এই নির্বাচনে জিতেছে। রাস্তার আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত তার সর্বস্ব নিয়ে এখন আর থাকতে পারছে না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুতে বিএনপিও সরাসরি জামায়াতের পক্ষে থাকতে পারছে না। তাহলে  কী হবে রাখাল বন্ধুত্বের? বিএনপি কী ক্রমশ জামায়াতকে ছেড়ে একা একা নির্বাচন করবে? যুদ্ধাপরাধের দায় নিয়ে জামায়াতের প্রথম শ্রেণীর কয়েক ডজন নেতা যদি শাস্তি ভোগ করেন তাহলে বিএনপির ভূমিকা সেখানে কী হবে? বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি হবার পর বিএনপি কোনো বিবৃতি দেয়নি। মওদুদ আহমদ একবার মন্তব্য করলেও পরে তা একান্ত ব্যক্তিগত বলে তার অবস্থান থেকে সরে আসেন।
 শেষমেশ কী হতে যাচ্ছে? রাখাল বন্ধুত্বের শেষ কবে? নাকি রাজনীতি, প্রেম, যুদ্ধের মতো বন্ধুত্ব কিংবা শত্র“তারও শেষ বলে কিছু নেই?
theahsankabir@gmail.com

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
এই সময়/রাজনীতি
  • একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং কতিপয় অন্ধকারের কীট -গোলাম মোর্তোজা
  • [তির্যক] আবারো মানুষ গায়েব
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive