আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এক শেয়ালের সাধ হলো আঙ্গুর ফল খাবে। গেল আঙ্গুর বাগানে। গাছে ঝুলছে থোকা থোকা আঙ্গুর। এখন শেয়াল তো আর গাছে উঠে পেড়ে খেতে পারে না। সে মনের দুঃখে বলল, ধুর আঙ্গুর ফল টক। গল্পটা জানেন সবাই। আমার এই গল্পটা এখন ভীষণ মনে পড়েছে সাপ্তাহিক-এর ১৫ জুলাই সংখ্যায় ‘এই সময়’ বিভাগে সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার লেখাটি পড়ে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এই দেশে একজন কিংবদন্তিতুল্য সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। যার মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলতে চান একঝাঁক আলোকিত প্রজন্মÑ যারা বদলে দেবে এই জাতিকে। ১৯৭৮ সালে মাত্র ৩৫ টাকা নিয়ে স্যার তার এই কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। কত যে লাঞ্ছনা-বঞ্চনা স্যারকে সইতে হয়েছে তা বলার মতো নয়। কিছুটা বর্ণনা পাঠক পাবেন স্যারের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি গ্রন্থে। স্যার এই জাতির বইবিমুখতা দেখে চালু করেছেন মোবাইল লাইব্রেরি। আজ তার প্রতিটি মোবাইল লাইব্রেরির সামনে থাকে উপচেপড়া ভিড়। আমি এক সময় শান্তিনগর একটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। আমার অফিসের সামনেই প্রতি শনিবার বিকেল পাঁচটার দিকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বাস আসত। তার আগে থেকেই ছেলে-বুড়ো লাইন ধরে থাকত কখন বাস আসবে। এই যে বইবিমুখ জাতিকে স্যার বই পড়াতে আগ্রহ করেছেনÑ এটা দেখেই বিশ্বব্যাংক তাদের সেকেন্ডারি এডুকেশনাল কোয়ালিটি এ্যান্ড একসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট বা সেকায়েপ প্রকল্পে তার প্রতিষ্ঠানকেই এর সহযোগী হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এটা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য একটা গৌরবের বিষয়। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি এখানে পেয়েছেন দুর্নীতির গন্ধ। তারা আঙুল তুলেছেন স্যারের দিকে। কারণ এই প্রকল্পে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যত বই পাঠ্য ও পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে তাদের প্রতিষ্ঠানের বই তেমনটা হয়নি। পেলে অবশ্য তারা আর দুর্নীতির অভিযোগ তুলতেন না। বৈষয়িক ব্যাপারে স্যার যে কতখানি নির্মোহ তার একটি প্রমাণ হলো স্যার খুব সাধ করে একটি বাড়ি করেছিলেন উত্তরায়। কিন্তু সময়মতো ব্যাংক ঋণ শোধ করতে পারছিলেন না বলে বিক্রি করে ঋণ শোধ করেছিলেন। স্যার চাইলে তো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ফান্ড থেকে টাকাটা নিয়ে ব্যাংক ঋণ শোধ করে নিজের আশ্রয়টুকু বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু স্যার তা করেননি। স্যার জাতির মূল্যবোধের অবক্ষয়ে প্রচ- মানসিক যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছিলেন। ১৯৯২ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। একটি ঘটনা তাকে শিক্ষক হিসেবে এতটাই কষ্ট দেয় যে তিনি তার কয়েক বছর চাকরির সময়সীমা থাকা সত্ত্বেও চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। এর বিবরণ পাঠক পাবেন তার নিষ্ফলা মাঠের কৃষক গ্রন্থে। সেই মানুষটার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করছে যারা তারা দুর্নীতিমুক্ত সাধু-গুরু মোটেই নয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় পুস্তক কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। একটি জাতির মধ্যে হাতেগোনা কিছু লোক থাকে, যারা জাতিকে পথ দেখায়। এদের বলা হয় এল্ডার স্টেটসম্যান (Elder Statesman) আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার হচ্ছেন সেই মুষ্টিমেয় হাতেগোনা মানুষের মধ্যে একজন। এ রকম একজন মানুষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে এদের এতটুকু বাধল না, গোলাম মোর্তোজাকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে তিনি এদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। সেকায়েপ প্রকল্পের সাফল্য কামনা করি যেন এর মাধ্যমে আরো অসংখ্য ছাত্রছাত্রী আলোকিত হওয়ার সুযোগ পায়। কারণ সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে চাই আলোকিত জাতি। ডা. নওশের gm.drnowsher@gmail.com