Logo
 বর্ষ ৩ সংখ্যা ১০ ৮ই শ্রাবণ, ১৪১৭ ২২ জুলাই, ২০১০ 
আপনি এখন পুরোনো সংখ্যায় আছেন ! তারিখ : ২২ জুলাই, ২০১০
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র- সেকায়েপ প্রকল্প : আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে  

সৌরভ রহমান ও মুনীর মম্তাজ

আগামী ১৫ আগস্ট থেকে দেশের ২১টি উপজেলার প্রায় এক হাজার স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে সৃজনশীল বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। বই পড়ার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে জীবনের বিকাশ আর উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ‘সেকেন্ডারি এডুকেশনাল কোয়ালিটি এ্যান্ড এ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প শুরু করেছে। প্রকল্পের প্রধান ৬টি কার্যাবলীর মধ্যে একটি হলো পাঠ্যসূচির বাইরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপযোগী বিষয়ে পাঠাভ্যাস তৈরি করা। এই কর্মসূচির নামকরণ করা হয়েছে  ‘পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি’। কর্মসূচির প্রকল্প পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বই পড়া কর্মসূচি আয়োজক প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বয়সোপযোগী বাংলা ও ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব হলে উভয় ভাষায় শিক্ষার্থীরা পারদর্শী হয়ে উঠবে। চিন্তা-চেতনা আধুনিক ও মানবিক হবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে উন্নত মানসম্পন্ন বাংলা ও ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে বলে বিশ্বাস করেন সমাজের বিদগ্ধজনরা।

সেকায়েপ
২০০৮ সালের সাত জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সেকায়েপ প্রকল্পটি অনুমোদন করেন। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার শিক্ষণের গুণগত মানোন্নয়ন।  মাধ্যমিক শিক্ষায় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করার ব্যাপারে কাজ করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এবং পাঠ্যসূচির বাইরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপযোগী বিষয়ে পাঠাভ্যাস তৈরি করা।
প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৮১ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সরকার শিক্ষার মানোন্নয়নে জুলাই ২০০৮ থেকে জুন ২০১৪ পর্যন্ত এই প্রকল্প পরিচালনা করবে। সরকার এ খাতে ব্যয় করবে ১৯০ কোটি ৩৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর বাকি টাকা প্রকল্প সাহায্য হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ওউঅ)। আইডিএ এই প্রকল্প বাবদ মোট ৯৯১ কোটি ৩৯ লাখ ২ হাজার টাকা দেবে। ২০০৮ সালের ১৪ আগস্ট আইডিএর সঙ্গে এ সংক্রান্ত ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
দেশের কোনো স্কুল বা মাদ্রাসায় লাইব্রেরিয়ানের পদ না থাকায়। এ ধরনের কাযক্রম স্কুলগুলোর মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। আর এ কারণেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সেকায়েপের মাধ্যমে এই পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি
বাংলাদেশের স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মূলত পাঠ্যপুস্তকনির্ভর। জীবনের সার্বিক বিকাশ ও উৎকর্ষ ঘটানোর উপযোগী বিচিত্রমুখী শিক্ষার সুযোগ তাদের কম। শিক্ষা জীবনের এই শূন্যতা পূরণ করতে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি সৃজনশীল বই পড়া প্রয়োজন। আর এগুলো না পড়তে পারলে একজন সত্যিকারের মানুষ হওয়া যায় না। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে নানা ধরনের বই পড়ায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার জন্যই এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, দেশ ও কৃষ্টি প্রভৃতি  বিষয়ে কিশোর উপযোগী সুখপাঠ্য ও মননশীল বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। যা তাদের সুষ্ঠু মানসিকতার বিকাশ ঘটাবে এবং শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনে শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক হবে।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে বই বিতরণ ও কর্মসূচি পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একজন করে শিক্ষক এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ পাবেন। যা তার পরবর্তী পেশাগত জীবনে সহায়ক হবে।

কার্যক্রম
সারাদেশের ১২১টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। মোট ৪ হাজার ৫০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় আসবে। এর জন্য আট লাখ ৬৪ হাজার বই পাঠ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে।
এই কর্মসূচির আওতায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত- এই পাঁচটি শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বই পড়তে পারবে। প্রতিবছর তারা তাদের উপযোগী ১৬টি বাংলা ও চারটি ইংরেজি রুচিসম্মত ও উন্নতমানের বই পড়ার  সুযোগ পাবে।
প্রতি সপ্তাহে কর্মসূচির সদস্যরা একটি করে বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এক সপ্তাহের মধ্যে বইটি পড়া শেষ করে পরের সপ্তাহে ফেরত দিয়ে নতুন বই বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবে। এভাবে ২৪ সপ্তাহে তারা বইগুলো পড়বে। বই পড়া শেষ হলে প্রতিটি স্কুলের সদস্যদের জন্য আয়োজিত হবে একটি মূল্যায়ন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে কোন শিক্ষার্থী কতটি বই পড়েছে। বই পড়াকে উৎসাহিত করতে সদস্যদের জন্য রয়েছে পুরস্কারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। যেসব শিক্ষার্থী নির্ধারিত বইগুলোর মধ্যে পাঁচটি বই পড়বে তারা ‘স্বাগত পুরস্কার’ হিসেবে পাবে একটি বই। যারা নয়টি বই পড়তে পারবে তারা পাবে ‘শুভেচ্ছা পুরস্কার’। শুভেচ্ছা পুরস্কারে বইয়ের সংখ্যা স্বাগত পুরস্কারের বেশি থাকবে। যে সব শিক্ষার্থী ১১টি বই পড়ে শেষ করবে তারা পাবে ‘অভিনন্দন পুরস্কার’। আর ১৪টি বই পড়লে পাওয়া যাবে ‘সেরা পাঠক পুরস্কার’। যে শিক্ষার্থী সেরা পাঠক পুরস্কার পাবে তাকে চারটি বই এবং সার্টিফিকেট দেয়া হবে। পুরস্কার হিসেবে শিক্ষার্থীদের মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার বই দেয়া হবে।
প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন করে শিক্ষক অর্গানাইজার হিসেবে কাজ করবে। ঐ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদেরসহ মোট ৯ হাজার শিক্ষককে ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস  মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুরস্কার দেয়া হবে।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে বই পড়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। যা শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসম্পন্ন বাংলা ও ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠায় সহায়ক হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প পরামর্শক
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এই পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি কার্যক্রম শিক্ষা বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানসমূহের বিদ্যমান জনবল কাঠামো দ্বারা বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। আর এ কারণে প্রকল্পে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সেকায়েপের অধীনে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পের পক্ষ থেকে প্রথমে পত্রিকার মাধ্যমে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। তাদের আহ্বানের প্রেক্ষিতে দেশি-বিদেশি ১৩টি প্রতিষ্ঠান (যারা এ বিষয়ে কাজ করছে) আবেদন করে সেখান থেকে সর্বোচ্চ নম্বরের ভিত্তিতে দুটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রকল্প পরিচালনা এবং পরামর্শক হিসেবে মনোনীত হয়।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিগত ৩১ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়া কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী এই বই পড়া কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বই পড়ছে। এ ছাড়াও ৪৫টি জেলায় প্রায় ৬০ হাজার পাঠক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। সেকায়েপ প্রকল্পের পাঠাভ্যাস কর্মসূচি মূলত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচিরই সম্প্রসারিত রূপ। ৪ বছরের এই প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র পাবে ৩৮ লাখ টাকা।  বই কেনা বাবদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে দেয়া হবে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ২ হাজার ২৩০ টাকা।

বই নির্বাচন কমিটি
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও বই নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকার ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে এই প্রকল্পের বই নির্বাচন করা হয়। ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে উপদেষ্টা করে এই কমিটি গঠিত হয়। আহ্বায়ক করা হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর মহাপরিচালক। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেনÑ বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক  শামসুজ্জামান খান, এনসিটিবির চেয়ারম্যান মোস্তফা মোঃ কামালউদ্দিন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান মুস্তাফা মনোয়ার, ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আব্দুল ওহাব খান, তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান সৈয়দ মুজিবুল হক, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ নূর হোসেন তালুকদার, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক রফিক আজাদ এবং সেকায়েপের প্রকল্প পরিচালক মোঃ বদিউল আলম। ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস ঘোষণায় কমিটির সদস্যদের নাম জানানো হয়। এর পরদিন অর্থাৎ ২১ ডিসেম্বর সেকায়েপের প্রকল্প পরিচালক বদিউল আলম বই নির্বাচন কমিটির সদস্যদের চিঠির মাধ্যমে কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির কথা জানান।
বই নির্বাচন প্রক্রিয়া
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, কমিটি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের পাঠাভ্যাস উন্নয়নের জন্য বয়স ও মেধার ভিত্তিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ ৯৬টি বই নির্বাচন করবে এবং নির্ধারিত বাজেট মূল্যে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি শ্রেণীর জন্য ১৬টি বাংলা ও ৪টি ইংরেজি বই, দশম শ্রেণীর জন্য ১২টি বাংলা ও ৪টি ইংরেজি বই নির্বাচন করবে। পুরস্কারের জন্য ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি শ্রেণীর জন্য ৮টি বাংলা ও ২টি ইংরেজি বই নির্বাচন করবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯-এর ২৯ ডিসেম্বর সেকায়েপ আয়োজিত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বই নির্বাচন কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় প্রত্যেক সদস্য নিজ নিজ মতামত এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট বইয়ের কথা তুলে ধরেন।
সভায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গত ২৫ বছর ধরে মাধ্যমিক স্কুলসমূহে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর জন্য একটি বই পড়া কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি পুস্তক তালিকা রয়েছে এবং বইগুলো পড়ে ছাত্রছাত্রীরা আনন্দ লাভ করছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই তালিকার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবনী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই সংযোজন করা যেতে পারে বলে তিনি প্রস্তাব করেন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক রফিক আজাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের তালিকাটিকে স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত তালিকা বলে অভিহিত করেন।
চিত্রকলা শিক্ষার একটি অপরিহার্য বিষয় উল্লেখ করে শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার এই তালিকায় এ বিষয়ে বই রাখায় প্রস্তাব করেন। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রস্তাবিত তালিকা স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত। এর সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের ব্যাকরণ ভীতি দূর করার জন্য ব্যাকরণ বিষয়ক বই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় প্রস্তাব রাখেন।
আলোচনা শেষে সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র উপস্থাপিত তালিকার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প, উপন্যাস বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও চিত্রকলা বিষয়ক বই সংযোজন করায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নোমান উর রশীদের সভাপতিত্বে কমিটির আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জানান, গত সভার সিদ্ধান্তের আলোকে পাঠ কর্মসূচি ও পুরস্কারের জন্য বইয়ের খসড়া তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই তালিকায় স্কুল ছাত্রছাত্রীদের উপযোগী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই সংযোজন করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। বইগুলো বিবেচনার জন্য সভায় উপস্থাপন করা হয়। সব ক’টি বই এবং এর লেখকের নাম সদস্যদের  অবহিত করা হয়। কমিটির সদস্যবৃন্দ বইয়ের গুণগত দিক, লেখক এবং বিষয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিভিন্ন সদস্যের মতামত থেকে অনেক বইয়ের নাম পাওয়া যায়। সেগুলো সম্পর্কে সভায় সকলে আলোচনা করেন।
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক নূর হোসেন তালুকদার বেশ কিছু বইয়ের নাম প্রস্তাব করেন। আলোচনা শেষে কিছু বই পুরস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নূর হোসেন তালুকদার আরো বেশি কবিতা এবং ছড়ার বই সংযোজন করার আহ্বান জানালে সকলের সম্মতিক্রমে বেশ কয়েকটি ছড়াÑ কবিতার বই পুরস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মুস্তাফা মনোয়ারের প্রস্তাবনার আলোকে পাঠাভ্যাস কার্যক্রম এবং পুরস্কারের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আরো কিছু বই সংযোজন করা হয়। শিল্পকলা ও চিত্রকলা বিষয়ক বই অন্তর্ভুক্ত করা সঠিক হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভালো বই নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বাজেট যেন বাধা হিসেবে দেখা না হয় এ বিষয়ে জোর দেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। তিনি কয়েকটি ছোটদের উপযোগী বইয়ের নাম প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাবিত কিছু বই আলোচনা শেষে পুরস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সভাপতি মহোদয় সদস্যগণের সকলের মতামত জানার পর এবং সম্মিলিত আলোচনার ভিত্তিতে বইয়ের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নে সকলের সম্মতির বিষয়টি অবহিত হন। সবশেষে পাঠাভ্যাস কর্মসূচির জন্য ৯৬টি টাইটেলের বই এবং পুরস্কারের জন্য ১০০টি টাইটেলের বই নির্বাচন করে তালিকা প্রণয়ন করা হয়।
বই নির্বাচন কমিটির কার্য পরিধি অনুযায়ী পুরস্কারের জন্য প্রতি শ্রেণীতে ১০টি করে পুস্তক নির্বাচনের কথা থাকলেও প্রতি শ্রেণীতে পুরস্কারের জন্য ২০টি বইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। দেশের সুযোগ্য লেখক ও শিশুসাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে এর সংখ্যা বৃদ্ধি করার সুপারিশ করা হয়। ষষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণীতে চারটি করে মোট ২০টি ইংরেজি বই নির্বাচনে বাজারে গুণগত মানসম্পন্ন বই না থাকায় এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ২০টি বই তালিকাভুক্ত করা হয়।

স্কুল বাছাই প্রক্রিয়া
সেকায়েপ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে দেশের ১২১টি উপজেলায়। এই ১২১ উপজেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব ছিল না। আর এ কারণে কিছু শর্ত পূরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে। শর্ত হিসেবে বলা হয়েছিল যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী সংখ্যা অবশ্যই ২৫০-এর বেশি হতে হবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরির সুযোগ নেই তাদের যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর সঙ্গে পরামর্শ করে স্কুলগুলোকে বাছাই করা হয়েছে। ঐ সমস্ত স্কুলকেই প্রকল্পের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সারাদেশে ১২১টি উপজেলার চার হাজার ৫০০ স্কুলকে বাছাই করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলার কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকে এ প্রক্রিয়ার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন প্রকাশনীর ১৯৬ বই
পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য ইতোমধ্যেই ১৫টি প্রকাশনীর মোট ৯৬টি বই নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই রয়েছে ৬২টি, নওরোজ সাহিত্য সম্ভারের ছয়টি, পাঁচ করে বই রয়েছে নালন্দা ও প্রজাপতি প্রকাশনীর, আজকাল প্রকাশনীর চারটি, প্রতীক ও পলাশ প্রকাশনীর যথাক্রমে তিনটি ও দুটি করে বই নির্বাচন করা হয়েছে। একটি করে বই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এমন প্রকাশনীগুলোর মধ্যে রয়েছে সময়, আগামী, পুঁথি, পাণ্ডুলিপি, কাকলী, বিজয়, প্রতীতি, বর্ণায়ন ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমী।
এ ছাড়া পুরস্কারের তালিকায় আছে ৩৩টি প্রকাশনীর ১০০টি বই। এ তালিকায় ৩১টি বই রয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের। অনুপম প্রকাশনীর রয়েছে আটটি বই। চারটি করে বই রয়েছে প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা, সময় প্রকাশন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, মুক্তধারা ও আগামী প্রকাশনীর। অনন্যা প্রকাশনীর রয়েছে তিনটি বই। আরো তিনটি করে রয়েছে এমন প্রকাশনীগুলো হলো বিজয় প্রকাশ, সাহিত্য প্রকাশ। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, সুবর্ণ, নালন্দা, দিব্য প্রকাশ, মাওলা ব্রাদার্স, অবসর, অন্যপ্রকাশ ও বর্ণনা প্রকাশনীর দুটি করে বই নির্বাচিত হয়েছে।
একটি করে বই তালিকাভুক্ত হয়েছে মীরা প্রকাশন, নওরোজ সাহিত্য সম্ভার, আদিগন্ত, সাহিত্য বিলাস, বাংলা একাডেমী, বিশ্বসাহিত্য ভবন, কাকলী প্রকাশনী, চারুলিপি প্রকাশন, পাণ্ডুলিপি, সন্ধানী প্রকাশনী, স্টুডেন্ট ওয়েজ, গীতাঞ্জলি, মুক্ত প্রকাশ এবং খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানির।

বর্তমান অবস্থা
ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচির কার্যক্রম। প্রথম বছরে প্রাথমিকভাবে ২৬টি উপজেলার আওতাধীন এক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করা হবে।
প্রথমে প্রতিটি উপজেলার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের জন্য প্রকল্পের পক্ষ থেকে কর্মশালার আয়োজন করা হবে। কর্মশালার মাধ্যমে প্রকল্পের কর্মসূচি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেয়া হবে। ইতোমধ্যেই এসব কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। উপজেলাগুলোতে চলছে কর্মশালা। এসব কর্মশালায় অংশ নিচ্ছে অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি এব স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ২৬টি উপজেলার এই কর্মশালা শেষে আগামী ১৫ আগস্ট থেকে পাঠাভ্যাস কার্যক্রম শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ শুরু হবে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই এক হাজার স্কুলে প্রথম সপ্তাহের বই দেয়া হয়ে যাবে এবং তা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে। এভাবে আস্তে আস্তে চার বছরে চার হাজার ৫০০ স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
সব ভালো কাজের পেছনেই সমালোচনা থাকে। ভালো কাজ করতে গেলে কারো কারো স্বার্থে আঘাত লাগে। পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যবসা না করতে পারায় দু’-একজন সুবিধাভোগী প্রকাশকই মনে কষ্ট পেয়েছেন। তারা নিজেরা যেহেতু লাভবান হতে পারছেন না, তাই পুরো প্রকল্পটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন। ‘সেকায়েপ’ প্রকল্পের মতো একটি মহৎ উদ্যোগকে বিতর্কিত করার দুরভিসন্ধি নিয়ে মাঠে নেমেছে একটি চক্র। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির পদ-পদবি ব্যবহার করে দু’-একজন রয়েছেন এই চক্রের নেতৃত্বে। যিনি অতীতে নানা অপকর্ম করে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন। অপকর্ম করে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। এমন অসৎ ব্যক্তি আবারো অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছেন। যদিও প্রকাশকদের বড় অংশ তার এই অপতৎপরতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। সাপ্তাহিক-এর অনুসন্ধানে তেমনটাই বেরিয়ে এসেছে।
সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওসমান গনি। তিনি আগামী প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী। তিনি ‘সেকায়েপ’ প্রকল্প নিয়ে বেশ কিছু কথা বলেছেন, অনিয়মের প্রসঙ্গ এনেছেন। প্রসঙ্গটি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ওসমান গনির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন সময়ের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়গুলো সম্পর্কেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। সে কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো রিপোর্ট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি ফিরে আসলে ‘সেকায়েপ’ প্রকল্প ও তার নিজের কর্মকা- নিয়ে সাপ্তাহিক তার বক্তব্য জানতে চাইবে এবং প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সাপ্তাহিক-কে বলেন, ‘প্রকাশক সমিতির সভাপতি হিসেবে এর আগে ‘সেকায়েপ’ প্রকল্পের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে আমি যে বক্তব্য দিয়েছি সেটি সমিতির বক্তব্য, আমার নিজের নয়। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। এটা একটা ভালো প্রকল্প। এই প্রকল্প বিষয়ে আমার অন্য রকম কোনো বক্তব্য নেই।’

‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিটিকেই এর অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
সাপ্তাহিক :  বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সাম্প্রতিক সরকারের ‘সেকায়েপ’ প্রকল্পের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে। সেখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচি কিভাবে যুক্ত হচ্ছে?
 আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : গত পঁচিশ বছর ধরে আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিসহ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ জ্ঞানপিপাসুদের জন্য বই পড়ার নানান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। প্রায় আড়াই লাখ জ্ঞানার্থী বর্তমানে এই কর্মসূচিগুলোতে অংশ নিচ্ছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘সেকায়েপ প্রকল্পে’র আওতায় হুবহু একই ধরনের একটি ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে যার উদ্দেশ্য মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের গুণগত মান বাড়ানো। সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কোয়ালিটি বেসড্ বিচার পদ্ধতিতে প্রথম হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে ও কার্যত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিটিকেই এর অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে।
সাপ্তাহিক : এই কর্মসূচির আওতায় যেসব বই নির্বাচন করা হয়েছে সেখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অনেকগুলো বই নেয়া হয়েছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অধিকসংখ্যক বই নির্বাচিত হওয়ার যুক্তি কি?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : এই কর্মসূচির আওতায় ছাত্রছাত্রীরা যেসব বই পড়বে তা ক্রয়ের দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘সেকায়েপ প্রকল্পে’র। তারা সে কাজ শুরু করে। বই নির্বাচনের জন্য দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে (জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কবি রফিক আজাদ, পাবলিক লাইব্রেরীর পরিচালক আলম তালুকদার ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা) একটি উঁচুমানের কমিটি গঠন করা হয়। প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে আমি নিজেও ওই কমিটির সদস্য ছিলাম। যেহেতু ‘সেকায়েপ প্রকল্পে’র বইপড়া কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছাত্রছাত্রীদের গুণগত মান বৃদ্ধি করা এবং ছাত্রছাত্রীরা যেসব বই পড়বে তা কোনো মতে নিম্নমানের হয়ে গেলে যেহেতু প্রকল্পের সেই উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে, তাই বইয়ের মান যেন কোনোমতেই খারাপ হতে না পারে সে ব্যাপারে কমিটির সবাই ছিলেন আন্তরিক। অন্যান্য সদস্যের পাশাপাশি কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিতে ছাত্রছাত্রীদের যেসব বই পড়াই তার একটি তালিকা কমিটির সামনে তুলে ধরি যে বইগুলো কিশোর-কিশোরীদের মন ও বয়সের উপযোগী বাংলা ভাষার সেরা বই এবং বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে দেশের বিশিষ্ট লেখকদের পরামর্শ নিয়ে যে তালিকা বহু বছর ধরে তৈরি হয়েছে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইগুলোর উন্নতমান স্বাভাবিকভাবেই কমিটির উচ্চ প্রশংসা পায় এবং এ তালিকার বেশ কিছু বই পরিবর্তন করলেও অধিকাংশ বইকে ‘সেরা’ বিবেচনায় প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা হয়। বইগুলোর মধ্যে এখানকার প্রকাশকদের প্রকাশিত বইয়ের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত বইও ছিল উল্লেখযোগ্যসংখ্যক। এর কারণও ছিল। স্কুলের শিশুদের উচ্চতর বিকাশের জন্য তাদের যেসব বই পড়ানো দরকার তার একটা বড়সংখ্যক বই বাজারে না পাওয়া যাওয়ায় আমরা সেগুলো বিশেষভাবে তৈরি বা অনুবাদ করে আমাদের প্রকাশনা থেকে বের করেছিলাম। বইগুলো নির্বাচিত বইয়ের তালিকায় পড়ে যাওয়ায় আমাদের বইয়ের সংখ্যা বাড়ে।
সাপ্তাহিক : ইংরেজি শিক্ষার জন্য এই প্রকল্পে কিছু বই নেয়া হয়েছে। ইংরেজি বইগুলো কিভাবে নির্বাচিত হলো?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : গ্রামÑগ্রামান্তের সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েরা যাতে নিজে নিজে পড়ে সহজে ইংরেজি শিখতে পারে সেজন্য আমরা বেশ কিছুকাল আগেই এমন ধরনের ২০টি ইংরেজি গল্পের বই ও কিশোরপাঠ্য উপন্যাস তৈরি করেছিলাম, যেগুলোতে বাক্যাংশ বা শব্দের পাশে পাশে শব্দ বা বাক্যাংশের অর্থ উচ্চারণ এসব দেয়া আছে, যাতে তারা সেগুলো সহজে পড়তে পারে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি মান উন্নত করা সেকায়েপ প্রকল্পের ও দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বাধ্যবাধকতা থাকায় এই বইগুলোও কমিটির সামনে উপস্থাপিত হয় ও বাজারে এ জাতীয় বইয়ের বিকল্প না থাকায় বিশেষ ও প্রয়োজনীয় বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে নির্বাচিত হয়।
সাপ্তাহিক : এই প্রকল্পের আওতায় বইপড়া কর্মসূচির পুরস্কারের জন্য বেশ কিছু বই নির্বাচিত হয়েছে। সেখানে অন্যান্য প্রকাশকের বই রয়েছে। আবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইও আছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইও কি আপনারাই সরাসরি সরবরাহ করবেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : ছাত্রছাত্রীদের পড়ার বই ছাড়া আর এক ধরনের বই প্রকল্প থেকে কেনা হচ্ছে। সেগুলো হলো, বইপড়া কর্মসূচির পুরস্কারের বই। এগুলোর পরিমাণ কর্মসূচির বইয়ের পরিমাণের চেয়ে বেশি। ভালো বই নির্বাচনের লক্ষ্যে এই বইয়ের বাছাইও প্রকাশের নাম দেখে করা হয়নি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিতে কেন্দ্র প্রকাশিত যেসব বই পুরস্কার হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের দেয়া হয়, ‘উন্নতমানের বই’ হিসেবে বিবেচনা করে সেগুলো থেকেও কমিটি ৩১টি বই নির্বাচন করেন। পুরস্কারের মোট ১০০টি বইয়ের বাকি ৬৯টি বই অন্যান্য প্রকাশকদের।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিকেই যেহেতু ‘সেকায়েপ প্রকল্পে’র মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে তাই পুরস্কারের বইয়ের মধ্যে কেন্দ্রের এই বইগুলোর অন্তর্ভুক্ত প্রথমে আমার কাছে অযৌক্তিক লাগেনি। কিন্তু পরে ভেবে মনে হয়েছে পুরস্কারের বইয়ের মধ্যে কেন্দ্রের বই থাকার জরুরি প্রয়োজন নেই, কেননা পুরস্কার দেবার মতো মোটামুটি ভালো বই বাংলাদেশের প্রকাশকদের কমবেশি আছে। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এ জন্য পরবর্তীতে আমরা ঠিক করি যে পুরস্কারের ৩১টি সরবরাহ থেকে আমরা নিজেদের প্রত্যাহার করে নেব। জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির অন্যতম সদস্য ‘সাহিত্য প্রকাশ’-এর স্বত্বাধিকারী মফিদুল হকের সঙ্গে আমি এ নিয়ে কথা বলি ও তাঁকে প্রায় মাস দেড়েক আগেই আমাদের সিদ্ধান্তের কথাটা জানিয়ে দিই। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তৃপক্ষকেও তা অবহিত করি।

কবীর চৌধুরী
শিক্ষাবিদ
উপদেষ্টা, বই নির্বাচন কমিটি

বয়সের কারণে যদিও আমি এই কমিটিতে থাকতে চাইনি, তারপরও সবার অনুরোধে আমাকে থাকতে হয়েছে। আমি যতটুকু জানি বই নির্বাচন কমিটির সভায় সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই বই নির্বাচন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে বই পড়া পাঠাভ্যাস কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে। তাই বই নির্বাচন তালিকায় তাদের বইগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ সারাদেশের শিশু-কিশোররা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়ে উপকৃত হয়ে আসছে।

মুস্তাফা মনোয়ার
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ শিশু একাডেমী
সদস্য, বই নির্বাচন কমিটি

পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে নির্বাচিত বইগুলোর সব কটিই মূল্যবান এবং শিশু-কিশোরদের উপযোগী হিসেবে নির্বাচিত। বই নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য নির্বাচিত কমিটির সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বইয়ের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। অন্যদের সঙ্গে আমার প্রস্তাবিত রবীন্দ্রনাথের বই চিত্রকলা ও সঙ্গীত বিষয়ক বইও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচিত পাঠ্যসূচি ও পুরস্কারের বইয়ের তালিকা নির্বাচক কমিটির ঐকমত্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যাদের ওপর বই নির্বাচনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাদের ওপর অবশ্যই সরকারের আস্থা ছিল। তা না হলে দায়িত্ব দেয়া হলো কেন। আমি বিশ্বাস করি আমরা কমিটির পক্ষ থেকে যে বই বাছাই করেছি তা দেশের শিশু-কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য করেছি।

মোঃ নূর হোসেন তালুকদার
পরিচালক
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, ঢাকা
সদস্য, বই নির্বাচন কমিটি

পাঠাভ্যাসের উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বই নির্বাচন কমিটিতে আমি ছিলাম। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির মাধ্যমে বইগুলো বাছাই কারা হয়েছে। তালিকা প্রস্তুত করার আগে প্রত্যেক সদস্য তাদের নিজেদের পছন্দের কিছু বইয়ের সুপারিশ করে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যেহেতু দীর্ঘদিন এ ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তাদের তালিকাকৃত বইগুলো তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত, তাই আমি এগুলোর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত বই ও বঙ্গবন্ধুর জীবনী সম্পৃক্ত করে চূড়ান্ত তালিকা করার প্রস্তাব রাখি। সকলের সিদ্ধান্তের পরেই বই নির্বাচন করা হয়েছে। আমার মনে হয় এ তালিকায় নির্বাচিত বইগুলো নিয়ে কারো ক্ষেত্রে অভিযোগ থাকা উচিৎ নয়।

মোস্তফা কামাল উদ্দিন
চেয়ারম্যান, এনসিটিবি
সদস্য, বই নির্বাচন কমিটি

দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ মিলে সেকায়েপ প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বইয়ের তালিকা প্রণয়ন করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটিতে আমিও সদস্য হিসেবে ছিলাম। এবং কমিটিতে আর যারা সদস্য ছিলেন তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক চূড়ান্ত বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বই নির্বাচন কমিটিতে যারা ছিল তাদের দৃষ্টিতে বইগুলো শিশু-কিশোরদের উপযোগী এবং সেরা। আমার বিশ্বাস বইগুলো শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস উন্নয়নে সহায়তা করবে।

বদিউল আলম
প্রকল্প পরিচালক, সেকায়েপ
সদস্য, বই নির্বাচন কমিটি

সেকায়েপ প্রকল্পের বইয়ের তালিকা প্রণয়ন কমিটিতে ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট গুণীজনেরা। তারা তাদের বিবেচনামতে শিশু-কিশোরদের জন্য বইয়ের তালিকা তৈরি করেছেন। কোন বই উপযোগী আর কোনটি উপযোগী নয়, তারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অসংখ্য ভালো বই থাকলেও তালিকায় যেহেতু সীমাবদ্ধতা ছিল, তাই সবচেয়ে ভালো বইগুলো বাছাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কারো অভিযোগ থাকা উচিৎ নয়। তার পরও বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির পক্ষ থেকে আমার কাছে দাবি জানানো হয়েছিল তালিকায় যেন তাদের বই রাখা হয়। কমিটি তাদের পছন্দের মধ্যে যতগুলো পড়েছেন সেগুলো রেখেছেন। তার পরও তাদের পক্ষ থেকে এই কমিটির বই নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। যা খুবই অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক।

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রতিবেদন
  • জলদস্যু : দক্ষিণাঞ্চলের আতঙ্ক
  • প্রযুক্তি ও আর্থিক লেনদেনে : এগিয়ে যাচ্ছে ডাক বিভাগ
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : নেতৃত্বহীন জামায়াত নির্বাসিত শিবির
  • [ফলোআপ] ইউনিভার্সিটি ডেন্টাল কলেজ : অনিয়ম-দুর্নীতি এখনো থামেনি
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive