|
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য। সংবিধান বিশেষজ্ঞ। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির কোÑচেয়ারম্যান। কথা বলেছেন সংবিধান সংশোধনী বিষয়ে। জবাব দিয়েছেন গঠিত কমিটি নিয়ে সমালোচনার। বলেছেনÑ ‘কমিটির বাইরের কোনো দল বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি যদি কোনো মতামত দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। বিরোধী দল আসতে চাইলে তাদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত আছি।’ আগের ১৪টি সংশোধনীর উদাহরণ দিয়ে বলেনÑ ‘এর আগে সামরিক ও গণতান্ত্রিক দুই উপায়েই সংবিধান সংশোধন হয়েছে। সামরিক আমলে সংশোধনের নামে সংবিধানের যে ক্ষতবিক্ষত রূপ দেয়া হয়েছে সেই কলঙ্ক থেকে জাতিকে মুক্ত করতে চাচ্ছি। আগে গণতান্ত্রিক উপায়ে যেভাবে সংবিধান সংশোধন হয়েছে আমরাও সেভাবেই কমিটি গঠন করেছি।’ সেই সঙ্গে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থেই কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন সাপ্তাহিকের সঙ্গে । সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাহরাম খান
সাপ্তাহিক : প্রথমে সর্বদলীয় কমিটির কথা বললেও শেষ সময়ে সেটা হলো না কেন? সংসদীয় কমিটি আর বিশেষ কমিটির পার্থক্য কি ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : সর্বদলীয় কমিটি, সংসদীয় কমিটি একই। এটি হচ্ছে বিশেষ কমিটি। বিশেষ কমিটি ছাড়া আর কোনো প্রভিশন নেই। বিশেষ কমিটি সর্বদল থেকেই নেয়া হয়েছে। সর্বদল হচ্ছে যারা পার্লামেন্টে রিপ্রেজেন্ট করে। আমরা জাসদকে নিচ্ছি, ওয়ার্কার্স পার্টিকে নিচ্ছি, জাতীয় পার্টিকে নিচ্ছি। বিএনপিকেও বলা হচ্ছেÑ তারা নাম দেয় নাই। সুতরাং আমরা তো তাদের জন্য বসে থাকতে পারি না। ১৬ মাস চলে গেছে। তাই কমিটি করা হয়েছে। তারপরও যদি তারা মনে করে বা নাম দিতে চায় সে পথ খোলা আছে। তারা দিতে পারে। বিশেষ কমিটির দ্বারাই সংবিধান সংশোধন হবে। অতীতেও তাই হয়েছে। আমরা যে একাদশ-দ্বাদশ সংশোধনী এনেছিলাম সেটাও এভাবেই হয়েছে। সাপ্তাহিক : জামায়াতকে নেবেন না সেটা আগেই বলেছেন। বিএনপিও আসবে না। কিন্তু এলডিপি তো সংসদের প্রতিনিধিত্ব করছে... সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : সর্বদলীয় মানেই যে একেবারে সকল দল গুনে গুনে নিতে হবে এমন না। সাপ্তাহিক : বিশেষ কমিটির কাজের রূপরেখা কি হবে? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : কাজের রূপরেখা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনী কমিটি সুপ্রিম কোর্টের জাজমেন্টে ও অন্যান্য সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কোনো সমস্যা নেই। সংবিধান তো একটাই। ’৭২Ñ ’৭৪ বলতে কিছু নেই। ’৭২-এর সংবিধানের যেগুলো সামরিক আইন দ্বারা সংশোধন করা হয়েছিল সেগুলোর পরিবর্তন করতে হবে। সেগুলোকে সরিয়ে যেটি সংবিধানে ছিল সেটিকে রাখা। যেটুকু আছে আছেই। যেটুকু নেই, সেগুলোকে অন্যভাবে দেখা যাবে। সমগ্র বিষয়টিকেই বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বিচার করতে হবে। সাপ্তাহিক : কিছু স্পর্শকাতর বিষয় আছে। সেগুলোকে কিভাবে যোগ-বিয়োগ করবেন ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : আমরা সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর হাতে কোনো ইস্যু তুলে দিতে চাই না। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সিভিল সোসাইটি বা অন্যান্য রাজনৈতিক দল যারা এই পার্লামেন্টে নেই তারাও যদি মনে করেÑ তারা এই কমিটিতে এসে মত দিতে পারবে। তারা যদি চিঠি লেখেন, আগ্রহ প্রকাশ করেন অবশ্যই আমরা তাদেরকে ডাকব। তাদের কথা শুনব। সাপ্তাহিক : আপনারা ডাকবেন নাকি তাদেরকে আগ্রহ প্রকাশ করতে হবে ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : তারা যদি আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে আমরা অবশ্যই তাদেরকে ডাকব, আগ্রহ প্রকাশ না করলে তো আর ডাকা যায় না। সাপ্তাহিক : কমিটির সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়নি। কতদিন লাগতে পারে বলে মনে হয় ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : এই কমিটির কোনো সময় নেই, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। দুই মাস তো সময় এমনিই আছে। পার্লামেন্ট যখন বসছে না আশা করি এই সময়ের মধ্যে আমরা সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি শেষ করে ফেলতে পারব। সাপ্তাহিক : আপনারা বলেছেন বিএনপি ইচ্ছে করলে একের অধিক সদস্য দিতে পারবে। সেখানে কতজন পর্যন্ত আপনারা নিতে প্রস্তুত ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : বিএনপি কতজন দেবে না দেবে সেটা বলছে না। আমরা তো বলেছি একজন তারা যদি বেশি দিতে চায় তাহলে তারা বলতে পারে। সেটিও লিডার অব দি হাউস বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু তারা তো এসব কথা না বলে মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। যেটি সংবিধানসম্মতও না, কার্যপ্রণালী বিধিতেও পড়ে না এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিগতভাবেও যুক্তিসঙ্গত না। সাপ্তাহিক : বিরোধী দল থেকে বলা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারে কিন্তু কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারে না। বিষয়টি আসলে কি ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : সুপ্রিম কোর্ট হলো সংবিধান রক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান আমরা যে সংবিধান বানিয়েছি সেই সংবিধানে সুপ্রিমেসি অব দি কনস্টিটিউশন যেমন আছে তেমনি সুপ্রিমেসি অব দি জুডিশিয়ারিও আছে। সুতরাং সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত হচ্ছে আইন। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ব্যাখ্যা যেমন দিতে পারে এবং সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত সবার ওপরে। আর্টিকেলÑ১১১ দ্বারা যা নিশ্চিত করা হয়েছে যা সবাই জানে। তারা যা বলছে হয় দুরভিসন্ধিমূলক না হয় বিদ্বেষমূলক। আর যদি তা অজ্ঞতাপ্রসূত হয় তাহলে আমার কিছু বলার নেই। সাপ্তাহিক : সংবিধান সংশোধন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দুটি বিষয়েই একসঙ্গে হাতে নেয়ার কারণ কি? এতে কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : যুদ্ধাপরাধ আর সংবিধানের বিষয়টি কিন্তু আলাদা বিষয়। যারা ওই নয় মাসে সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধাপরাধ করেছে, যারা বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, আমার ২ লাখ মাÑবোনের ইজ্জত হরণ করেছে, যারা মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে, পঙ্গু করেছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। তাদের বিচার অবশ্যই করতে হবে। এর সঙ্গে এই সংবিধান সংশোধনের কোনো সম্পর্ক নেই। সাপ্তাহিক : অনেকে বলছে সরকার যুদ্ধাপরাধের ঢালকে কাজে লাগিয়ে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। অর্থাৎ সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কেউ যদি আন্দোলনে যেতে চায় তাহলে তাদেরকে যুদ্ধাপরাধের বিচারবিরোধী বলে দমন করা হতে পারে ... সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : এগুলো রাজনৈতিক কথাবার্তা। আমরা আইন অনুযায়ী কাজ করব। আমরা আইনের বাইরে গেলে যেমন জনগণ তাদের ভাষায় আমাদেরকে সতর্ক করবে, তেমনি আইনানুগ কাজে কেউ যদি বেআইনিভাবে বাধা দিতে আসে সেসব দুষ্কৃতকারীর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এতে কোনো ঢাল ব্যবহার করার দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না। আমরা পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে হাত দিয়েছি। সব কথার শেষ কথা আইনের কথাই, এটা আজকে ৪০ বছর পরেও দেখলেন। ৪০ বছর পরও দেখা গেল ইতিহাস এত নিষ্ঠুর যে, সে আজ স্বাধীনতার ধারায়, মুক্তিযুদ্ধের ধারায়, অসাম্প্রদায়িকতার ধারায় ফিরে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আজকে প্রতিফলিত হয়েছে এটা তারা তো ভাবতে পারে নাই। সুতরাং আমি মনে করি জনগণের বিজয় হবেই। জনগণের সার্বভৌমত্ব অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে। জবরদস্তিমূলক যে সমস্ত আইন করা হয়েছিলÑ অস্ত্রের জোরে যে সমস্ত আইন করা হয়েছিল তার বিলোপ হচ্ছে। তার মানে জনগণই বিজয়ী হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় হচ্ছে, স্বাধীনতার বিজয় হচ্ছে এবং এই ধারা চলছে চলবেইÑ এটাই আমাদের ইতিহাসের ধারা, এটাই বঙ্গবন্ধুর ধারা, এটাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বাধীনতার ধারা। আবার চার মূল স্তম্ভ ফেরত আসবে। আবার বাংলার মুক্তিযুদ্ধের যে মূল ভিত্তি সেই ৬ দফার ১১ দফার ভিত্তিতে যে সংবিধান সে সংবিধানের বিজয় হবে। এটা জনগণেরই বিজয়। সাপ্তাহিক : ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময় আপনি একমাত্র ব্যক্তি, যে আওয়ামী লীগের বাইরে ছিলেন। তখন তো বেশ কয়েকটি বিষয়ে আপনি দ্বিমত করেছিলেন। আজ দীর্ঘদিন পরে এসে কি মনে হয় আপনার সেই সময়ের আশঙ্কাগুলো ফলে যাচ্ছে ? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম জনগণের পক্ষে অনেক কথা বলেছি। সব কথাই যে রাখতে হবে তা নয়। কিছু বিষয়ের সংশোধনী দেয়া হয়েছিল। কিছু রাখা হয় কিছু রাখা হয়নি। এখন আমাদের কাছে অন্য ইস্যু। আমাদের ইস্যু হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে সেই অনুযায়ী আমাদের কিছু কাজ করতে হবে। তাছাড়া ’৭২-এর সংবিধানে যেখানে বিকৃতি ঘটেছে সেগুলো দূর করে যতদূর সম্ভব আমরা ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাব। সাপ্তাহিক : প্রয়োজনে কি গণভোটের সম্ভাবনা আছে? সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : গণভোটের প্রশ্নই আসে না। কারণ এটি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে বলেই দেয়া হয়েছেÑ গণভোট আমাদের গণপরিষদ দ্বারা রচিত সংবিধানে ছিল না। এটি সামরিক আইন দিয়েই করা হয়েছেÑ সাময়িক ঘোষণা দিয়ে করা হয়েছে। সুতরাং ৫ম সংশোধনীর রায়ে এটি বাতিল হয়ে যাবে। সাপ্তাহিক : সংবিধান সংশোধনের পর কমিটি থাকবে নাকি বিলুপ্ত হয়ে যাবে ? যেহেতু সময় নির্ধারণ করা নাই... সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : এই কমিটির কাজই হচ্ছে সংবিধান সংশোধনী করা। এরপর এই কমিটি অটোমেটিক্যালি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বিশেষ কমিটির কাজই হচ্ছে ঐ বিশেষ কাজটি করার পর আর ঐ কমিটির কার্যকারিতা থাকবে না। বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সুতরাং শেষ কথা বলতে পারি যে আমাদের নীতিনির্ধারণের কালে ৫ম, ৮ম সংশোধনীর রায়সহ আরো কতগুলো সাংবিধানিক রায় আছে, সেগুলোকে অনুসরণ করেই আমরা সংশোধনী আনব। শ্রুতি লিখন : নিজাম উদ্দিন |