Logo
 বর্ষ ৩ সংখ্যা ৯ ১লা শ্রাবণ, ১৪১৭ ১৪ জুলাই, ২০১০ 
আপনি এখন পুরোনো সংখ্যায় আছেন ! তারিখ : ১৪ জুলাই, ২০১০
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
‘রাষ্ট্রধর্ম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে আমি কোনো দ্বন্দ্ব দেখি না’ -ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ  

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। সংবিধান বিশেষজ্ঞ। সাপ্তাহিক -এর সঙ্গে দীর্ঘ এক আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের কমিটি গঠনসহ নানা পদক্ষেপ সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন। বিরোধি দলের  দাবিকে অযৌক্তিক বলে বিরোধিতা করেছেন। রাষ্ট্রধর্ম থাকাটা নেতিবাচক কিছু নয় বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।  কথা বলেছেন জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়া নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
মহিউদ্দিন নিলয় ও আনিস রায়হান

সাপ্তাহিক : সরকার সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। আপনার প্রতিক্রিয়া কি?
রোকনউদ্দিন : এই কমিটি করার পেছনে সরকারের যে আন্তরিকতা দেখা গেছে সেটাই প্রধান বিষয়। সরকার কোনো ধরনের সঙ্কীর্ণতার মধ্যে না গিয়ে নিজেরাই সর্বদলীয় কমিটির কথা বলেছে। সরকার এও বলেছে যে, এই সর্বদলীয় কমিটিই সিদ্ধান্ত নেবে আসলে সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রয়োজন রয়েছে কিনা। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তার রূপ কি হবে তাও ঠিক করবে এই সর্বদলীয় কমিটি। সরকারের এই আন্তরিকতাটাকেই আমি বড় করে দেখছি। যদিও বিএনপি কমিটিতে না এসে সরকারের এই সদিচ্ছাকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। এই কমিটি সর্বদলীয় না হওয়ার জন্য তাই বিএনপিই দায়ী থাকবে, সরকারপক্ষ নয়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিরাই এই সংশোধনের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফলে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জের কোনো সুযোগ থাকছে না। কারণ জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে বড় তো আর কেউ নেই। এই বিষয়ে একমাত্র তাদেরই অধিকার রয়েছে। এই দিক থেকে দেখলেও সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করতে হয়। কারণ সরকার প্রথমেই সংসদীয় কমিটি বা জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের পথে হেঁটেছে। যা কিনা সবচেয়ে সুষ্ঠু ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত।
কিন্তু বাংলাদেশে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেও তা অনেকের মনঃপূত হয় না। এটা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের সাংস্কৃতিক সমস্যা। এখানে যারা নির্বাচন চাই, নির্বাচন চাই বলে গলা ফাটান কিছু দিন পরে যখন নির্বাচনে তারা পরাজিত হন তখন আর তারা সংসদেও যান না, কোনো সহযোগিতাও করেন না। এই ধারাটিই এখন প্রাধান্য বিস্তার করছে। যদিও এটা একটা ভ্রান্ত ধারা। এর জন্যই গণতন্ত্র বারে বারে ব্যাহত হচ্ছে। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য বা গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করার জন্য দায়িত্বটা শুধু সরকারের ঘাড়ে নয় বরং সংসদে যারা আছেন সকলেরই। বর্তমান বিরোধী দল তো আরো এককাঠি এগিয়ে আছে। তারা মধ্যবর্তী নির্বাচন চাইছে। কিন্তু কেন? আবার বয়কটের জন্য? অনেকে বলছে যে, একজন বিশেষজ্ঞ কমিটিতে রাখা উচিত ছিল। সরকার তো বলেনি যে, কমিটি বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হবে না। কিংবা কমিটির অধীনস্থ কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি যে থাকবে না এমন কথাও তো সরকার বলেনি। সুতরাং কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আর এ জন্যই এই কমিটির সমালোচনা করা বা এর বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো কিছু এখনো ঘটেনি।
আমার ধারণা, বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিয়ে সংসদীয় কমিটি তাদের মতামত বা সুপারিশ পেশ করবে। অথবা সংসদীয় কমিটি মতামত রাখার পর সরকার বিশেষজ্ঞদের মতামত সংগ্রহ করবে। এরপর সরকার সিদ্ধান্ত নেবে সংশোধন করবে কিনা। করলে কি কি করবে। এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর আবার সাংবিধানিক পদ্ধতির মধ্য দিয়েই সংসদে বিল উত্থাপিত হবে। সেটা আবার কমিটিতে যাবে। কমিটি তার ওপরে রিপোর্ট দেবে। এরপর ভোটাভুটি হবে। তারপরে আবার সংসদে আলোচনায় আসবে। এর ওপরে বিতর্ক হবে। বিএনপি যদি তখন সংসদে উপস্থিত থাকে তারাও তাদের মতামত রাখতে পারবে। এই অনুযায়ী আমার দৃষ্টিতে এই প্রক্রিয়ায় কোনো বে-আইনি পন্থা বা অসাংবিধানিক পন্থা অনুসৃত হচ্ছে না। বরং আমি বলব প্রক্রিয়া সঠিক পথেই এগুচ্ছে।
সাপ্তাহিক : বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে কমিটিতে তাদেরকে আওয়ামী লীগের সমান সংখ্যক আসন দিতে হবে। এই দাবি কতটা যুক্তিসঙ্গত?
রোকনউদ্দিন : এটা একেবারেই অযৌক্তিক একটা ব্যাপার। সংসদে যে কমিটি হবে তাকে আনুপাতিক হার মেনে চলতে হবে। এর কারণ হচ্ছে, তারা সেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আর জনগণ যাদের ম্যান্ডেট দিয়েছেন তাদেরকেই মূলত দায়িত্ব দিচ্ছেন সিদ্ধান্ত নেয়ার। জনগণ তাদের যে পার্সেন্টেজ দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি তারা কিভাবে দাবি করে। আর নিয়ম হচ্ছে এটাই যে পার্লামেন্টের কোনো কমিটি হলে তা আনুপাতিক হার মেনেই হবে। একজনের ৩০/৩২টা সিট তিনি পাবেন ১৫ আসন, অন্যজনের ২৫০-এর মতো সিট তারাও পাবে ১৫ আসন এটা কিভাবে হবে। সমতার কথা বলছেন কিন্তু এখানে তো কোনো সমতা দেখা যাচ্ছে না।
সাপ্তাহিক : ব্যারিস্টার মওদুদ বলেছেন যে, যদি বিএনপির অনুপস্থিতিতে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহলে পরবর্তীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসবে তখন এসব পরিবর্তনকে বাতিল করা হবে। মওদুদ আহমেদের এই উক্তিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
রোকনউদ্দিন : এটা গণতন্ত্রবিরোধী আচরণের বহির্প্রকাশ। এ ধরনের মনোভাব গণতন্ত্রকে ব্যাহত করে। গণতন্ত্রের চর্চাকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেয়। মওদুদ সাহেবের তো জানা থাকার কথা এই সংশোধনের উদ্যোগ কেন নেয়া হয়েছে। ’৭২ সালে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে সংবিধান প্রণয়ন করার পরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মেয়াদে সামরিক সরকারগুলো ক্ষমতায় এসে এই সংবিধানকে কাটাছেঁড়া  করেছে। সামরিক শাসকরা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সংবিধানে এসব পরিবর্তন এনেছে। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, জনগণের সংবিধানের কোনো কোনো অংশ জনগণের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে। শুধুমাত্র একটি বিশেষ পক্ষ এ থেকে লাভবান হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সরকার চাইছে যে, সংবিধানকে পর্যালোচনায় এনে এসব গণবিরোধী অধ্যায়কে মুছে দিতে। এখন এটা খুবই স্পষ্ট যে, মওদুদ সাহেব কেন ক্ষেপে গেলেন। সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে তার বিরোধ কোথায়? এমন একটি মহৎ কাজে মওদুদ সাহেবরা তো বাধা দিতেই পারেন। কারণ তারাই একসময় এই সব সামরিক শাসকদের সংবিধান পরিবর্তন করতে মদদ যুগিয়েছেন। এখন সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তাদের আনা আগের  পরিবর্তনগুলো বাদ যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই তাদের এসব হুমকি ধমকি।
সাপ্তাহিক : যে দল মেজরিটি নিয়ে আসবে সে দলই সংবিধান সংশোধন করবে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?
রোকনউদ্দিন : এটা ভিন্ন জিনিস। সংবিধান তো এমন কিছু না যে, এটা বদলানো যাবে না। কেউ মেজরিটি থাকলে তারা প্রয়োজন মনে করলে পরিবর্তন আনবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। আপনি মেজরিটি নিয়ে সংবিধানে সংশোধন করলেন। কিন্তু সেই সংশোধন কি জনগণের স্বার্থে হলো নাকি তা আপনার স্বার্থের সেবা করছে? এই প্রশ্নে জনগণ তাদের অভিমত প্রকাশ করেন। কোনো পক্ষ যদি জনগণের স্বার্থকে খাটো করে তাহলে জনগণও তাদের খাটো করে দেন। আমি মনে করি, সৎ উদ্দেশ্যে, জনগণের স্বার্থে কোনো পরিবর্তন যদি কেউ আনে তবে তা অন্য কেউ বদলাতে পারে না। যদি চায়ও জনগণ তার সমুচিত জবাব দিয়ে দেয়। এ ধরনের নজির আমরা ইতোপূর্বে অনেক দেখেছি। যেমন, সেনাশাসকরা প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি কায়েম করেছিল। যেই পক্ষ করেছে তাদের উত্তরসূরিরাও তো এখন মেনে নিয়েছে যে, তা ভুল ছিল। তারা তো এখন প্রধানমন্ত্রী পদ্ধতির পক্ষে আছে। এখানে তাহলে কি ঘটল? বিএনপি নিজেও বুঝতে পেরেছে যে, এই প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিটি জনগণের স্বার্থে প্রণীত হয়নি। এ ধরনের ভুল অনেক হয়েছে। যা সংশোধনের জন্যই এবারের উদ্যোগ।
সাপ্তাহিক : ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা হচ্ছে। এটা কি আক্ষরিক অর্থে বোঝানো হচ্ছে নাকি চেতনাগতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?
রোকনউদ্দিন : আসলে খুব সাধারণ অর্থে এই ’৭২-এর সংবিধানের কথা বলা হচ্ছে। মূলত ’৭২-এর সংবিধান বলতে বোঝানো হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিদের সংবিধান, জনগণের পক্ষের সংবিধান। ’৭২-এর পরে জনপ্রতিনিধিরা পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রয়োজনে সংবিধানে অনেক সংশোধন এনেছেন যা কিনা জনগণের পক্ষে ছিল। এগুলোকে ’৭২-এর সংবিধানের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে হবে। কিন্তু ’৭২ সালে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে জনপ্রতিনিধিরা যে সংবিধান তৈরি করেছিল নানা সময়ে অনির্বাচিত সেনাশাসনের আমলে সেই সংবিধান বিপর্যস্ত হয়েছে। এগুলো সবই ’৭২-এর সংবিধানের পরিপন্থী। তাই ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া বলতে সেই সংবিধানকেই বোঝানো হচ্ছে যার সবগুলো শব্দ, দাড়ি, কমা জনগণের পক্ষে। এর বাইরে কিছু না।
সাপ্তাহিক : ’৭২-এর সংবিধানে ফেরার প্রশ্নে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি বড় আলোচ্য বিষয়। এ ক্ষেত্রে কি ঘটতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
রোকনউদ্দিন : ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রধর্মের মধ্যে আপাত দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে একটি বৈপরীত্য দেখা যায়। কিন্তু আসলে তা নয়। একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়েও রাষ্ট্রধর্মকে চিহ্নিত করা যায়। রাষ্ট্রধর্মের অর্থ এই নয় যে, সবাইকে এই ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী চলতে হবে। বরং এটা হচ্ছে বিশ্বের দরবারে আমাদের প্রকৃতি বা চেহারাটা জানান দেয়া। অর্থাৎ আমার দেশের ৮৫ ভাগ মানুষ মুসলিম। এটা জানানোর চেয়ে বেশি কিছু রাষ্ট্রধর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। কারণ, এখানে তো বলা হচ্ছে না যে, অমুসলিম হলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া যাবে না, অমুক পদে নেয়া যাবে না, অমুক হলে ঢুকতে দেয়া যাবে না। এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা যদি রাষ্ট্রের কোথাও আরোপ না করা হয়। সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিক যদি সংখ্যাগুরু মুসলিম নাগরিকের সমান সুযোগ সুবিধা পায় তাহলেই তো রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ বলা যায়। এখানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে কোনো ধর্মকে চিহ্নিত করা হলে তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বহির্বিশ্বের দিকে তাকালেও আমরা এই একই অবস্থা দেখতে পাই। ব্রিটেনকে তো আমরা সবাই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবেই জানি। কিন্তু তাদের তুলনায় তো আমাদের ব্যবস্থা অনেক ভালো। সেখানে রাজপুত্রদের কেউ যে কিনা পরবর্তীতে রাজা হবে সে যদি ধর্মমত পরিবর্তন করে তাহলে সে আর রাজা হতে পারবে না। এ ধরনের নিয়ম থাকা সত্ত্বেও যদি ব্রিটেন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হতে পারে তবে বাংলাদেশ কেন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হবে না? বাংলাদেশে তো এ ধরনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
রাষ্ট্র তখনই ধর্মনিরপেক্ষতার বাইরে চলে যাবে যখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে ধর্মভিত্তিক কাউকে প্রাধান্য দেয়া হয়। কিংবা ধর্মীয় কোনো বৈষম্য থাকে। অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্রীয় পদে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক কোনো শর্ত থাকা বা ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধর্মের কারণে কোনো বিশেষ নিয়ম জারি করাটা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী অবস্থান। বাংলাদেশ এসব সমস্যা থেকে মুক্ত। একটি রাষ্ট্রকে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মের দ্বারা চিহ্নিত করাটা খুবই স্বাভাবিক। সার্বিয়াকে বলা হচ্ছে খ্রিস্টান রাষ্ট্র, বসনিয়া হার্জেগোভিনাকে বলা হচ্ছে মুসলিম রাষ্ট্র। এগুলো কি তাদের সংবিধানে লেখা আছে? নেই। আমাদের সংবিধানেও নেই যে, আমরা মুসলিম রাষ্ট্র। সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। সেই জনগণের ৮৫ ভাগ যদি মুসলিম হয় তাহলে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হতেই পারে। সুতরাং রাষ্ট্রধর্ম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে আমি কোনো দ্বন্দ্ব দেখি না।
সাপ্তাহিক : এরশাদের শাসনামলে সংবিধানে যে সমস্ত সংশোধনী আনা হয়েছিল তা পরিবর্তন করতে গেলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির কোনো দূরত্ব তৈরি হওয়া অর্থাৎ মহাজোটের ঐক্য বিনষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে কি?
রোকনউদ্দিন : জাতীয় পার্টির প্রতিনিধি তো এই কমিটিতে রয়েছেন। তারা অবশ্যই তাদের বক্তব্য পেশ করবে। কমিটি তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবে। কমিটি অবশ্যই তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে এমন যুক্তি দেখাতে পারবে যা জাতীয় পার্টি মেনে নেবে। কমিটি বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছালে জাতীয় পার্টির সেখানে কোনো আপত্তি থাকবে বলে আমার মনে হয় না। আর এর মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের মধ্যকার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা তো এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ আমরা এখনো জানি না কি পরিবর্তন আসছে আর জাতীয় পার্টি কোনটা মেনে নিচ্ছে, কোনটা নিচ্ছে না। সেই সময়টা আসুক। সবার বক্তব্য জানা যাক। তখন বোঝা যাবে সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তবে এমন কিছু ঘটবে বলে আমার মনে হয় না যা দ্বারা মহাজোটের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাপ্তাহিক : সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে জামায়াতের রাজনীতি থাকা না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে...
রোকনউদ্দিন : এই বিষয়ে জল্পনা-কল্পনার কোনো সুযোগ আর নেই। প্রধানমন্ত্রী নিজে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, সংবিধান সংশোধনের ওপর ভিত্তি করে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হবে না। আমরা শুনেছি আইন প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে উল্টো বক্তব্য করেছিলেন। সে যাই হোক এখন আর তার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হচ্ছে না, সেখানে অন্য কারো বক্তব্য আমলে আনার কোনো প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমি মনে করি না।
সাপ্তাহিক : তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সংবিধানে নতুন কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা আছে কি?
রোকনউদ্দিন : অনেকেই মনে করছেন এই সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করতে পারে। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। এ ধরনের কোনো বক্তব্যও এখনো সরকার পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি। এগুলো বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য বিরোধী পক্ষগুলোর প্রচারণা। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে আওয়ামী লীগ এবং ১৫ দলীয় জোটের আন্দোলনের প্রশ্ন আছে। সেই আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই এই ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে। আমরা সকলেই জানি, ’৯৬ সালের একটি নির্বাচন বাদ দিতে হলো। নতুনভাবে নির্বাচন হলো। সেই নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ এবং ১৫ দলীয় জোটকে আন্দোলন করতে হলো। তাদের দাবি মেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন হলো। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসল। সুতরাং এটাকে উড়িয়ে দেয়ার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না।
এটা বলা যায় যে, আমরা গত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে এই ব্যবস্থার মধ্যে কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করছি। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ, সুন্দর এবং প্রশ্নমুক্ত করার জন্যই এটার দরকার। তবে মৌলিকভাবে এই ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন এখনো হয়নি। এটা করা অনুচিত হবে। কারণ, যারা যখন ক্ষমতায় থাকে একটা প্রবণতা হচ্ছে তখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে। ক্ষমতার বাইরের পক্ষ আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থন করে। আমি প্রত্যাশা করি, বর্তমান সরকার এ ধরনের কোনো অসুস্থ প্রবণতায় আক্রান্ত হবে না। বরং সাহসিকতার সঙ্গে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে।
সাপ্তাহিক : সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রতি আপনার সুপারিশ বা প্রত্যাশাগুলো কি?
রোকনউদ্দিন : আমি চাই জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা সংবিধানের বিধানগুলোকে জনস্বার্থের আলোকে বিশ্লেষণ করবেন, সংবিধানে এ পর্যন্ত যত পরিবর্তন এসেছে তার যে অংশগুলো জনস্বার্থবিরোধী এবং সামরিক শাসকরা যে সমস্ত পরিবর্তন এনেছে সেগুলোকে পর্যালোচনা করে মতামত ব্যক্ত করবেন। আমি আশা করি, এর মধ্য দিয়ে সংবিধান তার স্বমহিমা ফিরে পাবে। জনগণের সংবিধান প্রতিষ্ঠিত হবে।
সাপ্তাহিক : একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারের দেড় বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার যে অগ্রগতি তা কি সন্তোষজনক?
রোকনউদ্দিন : বিচার প্রক্রিয়া যত দ্রুত হয় তত ভালো। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা দ্রুতই শুরু হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। মওদুদ সাহেব এবং জামায়াতপন্থীরা যত কথাই বলুক আমরা জানি, আন্তর্জাতিক মহলেও এর ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। আমি হয়ত বলতে পারি এটা আরো আগে করলে ভালো হতো। প্রক্রিয়া আরো দ্রুত গতিসম্পন্ন হওয়া উচিত। কিন্তু আমি তো জানি না এই প্রক্রিয়ার কোথায় কি সমস্যা আছে। সমালোচনা করাটা খুবই সহজ। কিন্তু বাস্তবতাকেও বিবেচনায় রাখা উচিত। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, যে জুতা পরেছে সেই জানে ব্যথাটা কোথায়। সুতরাং এখানে আমরা ধরে নিতে পারি যৌক্তিক কারণেই এই সময়টা ব্যয় হয়েছে। বিষয়টা অনেকখানি জটিল। যেহেতু অনেক পুরনো একটা ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। এই বিষয়টা আমাদের মনে রাখতে হবে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমরা বিশ্বের অনেকগুলো জাতির একটিমাত্র। আমাদেরকে বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। অন্যদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হয়। আমাদের যে কোনো উদ্যোগ অন্যদের কাছে ব্যাখ্যা করা, তাদেরকে সম্যক জবাব দেয়া বা সন্তুষ্ট করাটাও আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তাই শুধু দেশের জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিলেই চলছে না, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। যাতে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয়। এমনকি পাকিস্তানও এই আওতার মধ্যে পড়ে। কারণ আমরা ওআইসিতে রয়েছি। ওআইসি ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও যদি কোনোরকম প্রশ্ন থাকে তার সদুত্তরও আমাদেরকে দিতে হবে। সুতরাং আমি মনে করি না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়াটা খারাপ কিছু না।
সাপ্তাহিক : যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার এই নিয়ে একটা বিতর্ক হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
রোকনউদ্দিন : যারা একে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলছে আমি বলব এ সম্পর্কে তাদের কোনো সম্যক জ্ঞান বা ধারণা নেই। এগুলো ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত। যুদ্ধাপরাধ আইনের একটা সংজ্ঞা আছে। তার মধ্যে ৪টি উপ-পরিচ্ছেদ আছে। তার একটি হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। বাকি তিনটি হচ্ছে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধ। এই সবগুলো মিলিয়েই যুদ্ধাপরাধ। কিসের প্রেক্ষিতে বিচার হবে তা ঠিক হবে প্রমাণ অনুযায়ী। যদি কারো বিরুদ্ধে গণহত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহলে তাকে কেন শুধু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে বিচার করা হবে? কেন গণহত্যার অভিযোগে বিচার করা হবে না। এগুলো যারা বলছে তারা আসলে না জেনে বলছে।
সাপ্তাহিক : অনেকে বলছেন যে, পাকিস্তান যেহেতু মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে সেহেতু বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার করার সুযোগ নেই। যুদ্ধ তো হয়েছে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। বাংলাদেশের সঙ্গে তো যুদ্ধ হয়নি। এমন অপপ্রচার আছে...
রোকনউদ্দিন : দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যাদের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যারা স্বাধীনতার ঘোষণাকে লঙ্ঘন করেছে, বিরোধিতা করেছে তারাই যুদ্ধাপরাধী। দেশ তো গঠন হয় যুদ্ধের শেষেই। আগে তার ঘোষণা থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাও আগে ঘোষিত হয়েছে। যুদ্ধ শেষে দেশ হয়েছে। সার্বিয়াতে যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছিল তার বিচার হচ্ছে। কিন্তু তখন কি সার্বিয়া ছিল? সেখানে তো আন্তর্জাতিক বাহিনী যুদ্ধ করেছে। কিন্তু বিচারটা করছে কারা? বিচার হচ্ছে কার? সুতরাং এগুলো কোনো বিষয় না। বাংলাদেশই বিচার করবে।
বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার যে স্পৃহা, আকাক্সক্ষা তাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য যারা হত্যা, নিপীড়ন, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে আজ যখন বাংলাদেশ স্বাধীন তখন এর বিচার বাংলাদেশ ছাড়া আর কে করবে? আমাদের যে আইন আছে তা দ্বারা সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যাবে। এমনকি পাকিস্তানি জেনারেলদেরও বিচার করা যাবে। বিষয় হচ্ছে, কে হাতের মুঠোয় আছে, কে নেই। কেউ যদি হাতের মুঠোয় না থাকে তার বিচার কিভাবে করা যাবে? তবে পরে যদি কাউকে হাতে পাওয়া যায় তখনই তার বিচার করা যাবে। যদি আমরা হঠাৎ ঐ রকম কোনো পাকিস্তানি জেনারেলকে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাই তাহলে তার বিচার করে ফেলতে পারি। এটা করতে কোনো বাধা নেই।

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • ‘কাউন্সিল হবে, কেউ তো আর দশ বছর দায়িত্বে থাকতে পারবে না’ -আহমদ হোসেন
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive