|
সালেক খোকন
রাস্তার পাশেই জংলা কবরটি। কবরের পাশে ধান মাড়াইয়ের কাজ চলছে বিরামহীন গতিতে। ধানের খড় এসে ঢেকে দিচ্ছে কবরের খানিকটা অংশ। কবর ঘেরা ছোট্ট দেয়ালে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে কয়েকজন গ্রাম্যমজুর। ঘাম মুছে ক্লান্তির থুতু মাঝেমধ্যেই ছুড়ে দিচ্ছে কবরের দিকে। কবর ভর্তি জংলি গাছ। কে বলবে এই কবরটিতেই ’৭১-এ দাফন করা হয়েছিল ৩৩টি শহীদের রক্তাক্ত শরীর। হ্যাঁ, এটিই দক্ষিণ বহলা গ্রামে অনাদরে আর অবহেলায় পড়ে থাকা একটি গণকবর। দিনাজপুর শহরের পাশেই কাঞ্চন রেলব্রিজ। ব্রিজ পেরোতেই সুনসান নিরবতা। দু’পাশে কোনো জনবসতির লেশমাত্র নেই। পাকা রাস্তার পাশে বড় বড় গাছ। চারপাশে সবুজের হাতছানি। আঁকাবাঁকা রাস্তাটি হেলেদুলে চলে গেছে বহলার দিকে। জেলা শহরের নিকটবর্তী হলেও বহলা বিরল উপজেলার বিজোড়া ইউনিয়নের একটি গ্রাম। গ্রামের সুধীজনেরা উত্তর ও দক্ষিণ দু’ভাগে ভাগ করেছে বহলাকে। আমাদের গন্তব্য দক্ষিণ বহলা। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বিরল প্রেসক্লাবের জনাকয়েক সাংবাদিকও। কুমারপাড়া পার হয়ে বহলা গ্রামের গনির মোড়ে এসে আমরা থেমে যাই। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আব্দুল গনি। গনি বহলার হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বহলার গণকবরটিতে শায়িত আছে গনির বাবা, ভাই, নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশী অনেকেই। এ গ্রামের কৃষক তসির উদ্দিনের ছেলে আব্দুল গনি। লম্বায় চার ফিটের বেশি নয়। গ্রামের ভাষায় বামন। বয়স সত্তরের মতো। চোখেমুখে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু কথায় এখনো বেশ চটপটে আর প্রাণবন্ত। এক সময় এই মোড়টিতেই গনির একটি ছোট্ট দোকান ছিল। সে থেকেই এটি গনির মোড় নামে পরিচিতি পায়। গনির মোড় থেকে হাঁটা পথে কয়েকটি বাড়ি পার হলেই বহলা কমিউনিটি ক্লিনিক। আর এই ক্লিনিকটির ঠিক পাশেই আমরা খুঁজে পাই গণকবরটিকে। সাধারণ কবরস্থানের কবরগুলোও অনেকাংশে এরচেয়ে বেশি যতেœ থাকে। সেখানে কবরগুলোর প্রতি মানুষের সম্মানও থাকে একটু অন্যরকম। অথচ যাদের রক্তে দেশ স্বাধীন হলো সেই শহীদদের গণকবরের এমন বেহাল দশা দেখে যে কেউই ব্যথিত হবেন। গণকবরটির পাশে দাঁড়িয়ে গনির জবানিতে শুনি ’৭১-এ বহলার সেই লোমহর্ষক ঘটনাটি। ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকবাহিনী সারাদেশে আক্রমণ শুরু করলেও দিনাজপুরে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো পাকসেনা ঢুকতে পারেনি। দিনাজপুর ইপিআর হেড কোয়ার্টার কুটিবাড়ী ছিল বাঙালিদের দখলে। কুটিবাড়ীর সবচেয়ে নিকটবর্তী ও নিরাপদ গ্রাম ছিল বহলা। ফলে কুটিবাড়ী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সরানো হতো বহলার ভেতর দিয়ে। এ নিয়ে বহলা গ্রামের প্রতি পাকসেনাদের এক ধরনের প্রতিহিংসামূলক মনোভাব ছিল যুদ্ধের শুরু থেকেই। ১৯৭১-এর ১৩ ডিসেম্বর, সোমবার। পাকবাহিনীকে নিয়ে রাজাকার আর আলবদর বাহিনী সারাদেশে চালাচ্ছে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ। দিনাজপুর শহর তখনো হানাদারমুক্ত হয়নি। পাকবাহিনীর নজর তখনো বহলা গ্রামটির ওপর পরেনি। এ গ্রামের শান্তিপ্রিয় লোকেরা সবাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। কারো কারো পরিবারের যুবক ছেলেরা গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। অনেক পরিবার আবার গোপনে সহযোগিতা করত মুক্তিযোদ্ধাদের। গ্রামের সবাই ছিল নিরীহ ও সাধারণ কৃষক। নানা কারণে গ্রামটিতে বিহারীদের যাতায়াত ছিল বেশি। ফলে তাদের মাধ্যমেই পাকবাহিনী খবর পায় বহলা গ্রামের। কয়েকটি গাড়িতে পাকসেনা হানা দেয় বহলায়। প্রথমে ক্যাম্প গড়ার কথা বলে সকাল থেকেই সবাইকে নির্দেশ দেয়া হয় গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার। কিন্তু গ্রামবাসী তা আমলে নেয় না। নিজের বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে যাওয়ার কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না। বিকেল অবধি গ্রাম খালি করে না দেয়ায় পাকসেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বিকেলের পর সন্ধ্যা নামে। গ্রামের সবাই দাঁড়িয়েছে মাগরেবের নামাজে। তিন রাকাত ফরজ নামাজের পর সুন্নত পড়ার সুযোগ হয়নি কারো। মসজিদ থেকে গনিসহ সবাইকে ডেকে নিয়ে লাইন ধরে দাঁড় করানো হয় রাস্তার পাশের ডোবার সামনে। মসজিদের ইমামও রক্ষা পায়নি তাদের রোষানল থেকে। পাকসেনারা ব্রাশফায়ারের গুলিতে ঝাঁঝড়া করে দেয় গ্রামের নিরীহ নিরপরাধ মানুষের বুকগুলো। সবাই লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। মৃত্যু যন্ত্রণা আর আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে সবাই ডাকছিল তাদের আপনজনদের। দূর থেকে অসহায়ের মতো প্রিয়জনদের মৃত্যু যন্ত্রণা দেখছিল গ্রামের মহিলা ও শিশুরা। এ অনুভূতি, এ কষ্টের স্মৃতি কি কখনো ভুলতে পারবে শহীদ পরিবারগুলোই? এরই মধ্যে পেটে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েও পালাতে সক্ষম হয় আনিসুরসহ কয়েকজন। আর গুলি না লাগায় দৈবক্রমে বেঁচে যায় গনি। হত্যার পরে পাকসেনারা লাশগুলোকে স্তূপ করে খড় দিয়ে ঢেকে রাখে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বৃহস্পতিবার। দেশ স্বাধীনের দিন। বহলা ছেড়ে যাওয়ার পথে পাকসেনারা কাঞ্চন রেলব্রিজটি উড়িয়ে দিয়ে কুটিবাড়ীর দিকে চলে যায়। ঐদিন বিকেলে গনিসহ গ্রামের তমাজউদ্দিন, কালু মোহাম্মদ, কলিম আহম্মদ, আফজাল হোসেন মিলে গর্ত করে শহীদদের পচে যাওয়া স্তÍূপ করা লাশগুলোকে একত্রে মাটি চাপা দেয়। গনি জানালো পাকসেনাদের গুলিতে সে দিন বহলায় শহীদ হয় ৩৯ জন । এর মধ্যে ৩৩ জনকে দাফন করা হয় এই গণকবরে। শহীদ ফজলু, খেতু বোড়াল, খলিল উদ্দিন, জাহের মোহাম্মদ, রহিমুদ্দিন, আঃ মালেকের লাশ পারিবারিকভাবে দাফন করা হয় গ্রামেরই অন্য জায়গায়। মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পর বহলায় শহীদদের নামের তালিকা খুঁজতে হয়েছে নতুনভাবে। শহীদদের নামের তালিকা সংরক্ষণ করা হয়নি সরকারিভাবে। শহীদদের নাম জানাতে পারেনি বিরল মুক্তিযোদ্ধা সংসদও। অবশেষে শহীদ আমিন আলীর ছোট ভাই আমজাদ হোসেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য নিয়ে বহলার গণহত্যায় শহীদদের নামের তালিকা তৈরি করেন। শহীদরা হলেন : সাহের উদ্দিন, পিতা : খেতু মোহাম্মদ, মোঃ খমির উদ্দিন, পিতা : খেতু মোহাম্মদ, ওহাব আলী, পিতা : খেতু মোহাম্মদ, মছলে উদ্দিন, পিতা : তারি মোহাম্মদ, মোঃ সফিউদ্দিন, পিতা : আছির উদ্দিন, আব্দুস সাত্তার, পিতা : আঃ সোবহান, মোঃ আব্দুর রহমান, পিতা : আছির উদ্দিন, মোঃ ভুতা মোহাম্মদ, পিতা : নাটুরু সোবহান, মোঃ কালু মোহাম্মদ, পিতা : অশির উদ্দিন, মোঃ জাহের উদ্দিন, পিতা : ভদো মোহাম্মদ, আখি মোহাম্মদ, পিতা : কেরু মোহাম্মদ, মোঃ টাকরু, পিতা : আখি মোহাম্মদ, তসির উদ্দিন, পিতা : মিয়া বকস মোল্যা, মোঃ নুরু মোহাম্মদ, পিতা : তশির উদ্দিন, মোঃ সামির উদ্দিন, পিতা : আছির মোহাম্মদ, মোঃ আব্দুল লতিফ, পিতা : কিতাব শাহা, মোঃ ছপি উদ্দিন, পিতা : চেনা মোল্লা, মোঃ রবিতুল্যাহ, পিতা : জামাল উদ্দিন, মোঃ আকবর আলী, পিতা: আঃ রহমান, মোঃ আমিন আলী, পিতা : খলিল উদ্দিন, মোঃ মুন্সি আঃ জব্বার, পিতা : অজ্ঞাত, মোঃ ইসাহাক আলী, পিতা : আব্দুল আজিজ, মহসীন আলী (চেন্দেরু), পিতা : খাজির উদ্দিন মোল্লা, মোঃ জয়নাল আবেদীন, পিতা : আব্দুল আজিজ, মোঃ বারেক তুল্যা, পিতা : জয়নুদ্দীন, মোঃ রহিম উদ্দিন, পিতা : বারেক তুল্যা, মোঃ গোলাম মোস্তফা (গলো), পিতা : রহিম উদ্দিন, মোঃ আঃ করিম আলী, পিতা : আজির উদ্দিন, মোঃ সোহরাব আলী, পিতা : এয়াকুব আলী, মোঃ মোস্তাফা (মনু), পিতা : মফিজ উদ্দিন, মোঃ ওমর আলী, পিতা : মছলে উদ্দিন, মজিতুল্যাহ, পিতা : মুনির উদ্দিন, আছির উদ্দিন, পিতা : অশিব উদ্দিন। যুদ্ধের পরে বহলার শহীদ পরিবারগুলোর বেঁচে থাকার কাহিনী আরো করুণ,আরো বেদনাদায়ক। গোটা গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই হয়ে পরে পুরুষশূন্য। অনাহারে, অর্ধাহারে কাটে অনেকের জীবন। পড়নের কাপড়টুকুও কিনতে পারেনি অনেক শহীদের স্ত্রী। ছেঁড়া কাপড়ে পার করে দেয় গোটা বছর। শহীদ সামির মোহাম্মদ-এর ছেলে মাহিদুর। বাবার মৃত্যুর পর অর্থের অভাবে পরীক্ষার ফি দিতে না পারায় এসএসসি পেরোতে পারেনি সে। মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে হাত পাততে হয়েছে অনেক শহীদ পরিবারগুলোকে। এসব কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ রবিতুল্লাহর স্ত্রী জরিনা বেওয়া ও শহীদ সামির উদ্দিনের স্ত্রী লতিফা বেওয়া। উভয়েই বয়সের ভারে আজ নুয়ে পড়েছেন। তবুও মিলেনি সরকারের বয়ষ্ক ভাতাটুকুও। মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পরেও বহলার ৩৯ জন নিরীহ নিরপরাধ মানুষের আত্মত্যাগের কাহিনী তুলে ধরা হয়নি দেশবাসীর কাছে। উদ্যোগ নেয়া হয়নি গণকবরটি সংস্কারের কিংবা কোনো স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির। সরকারিভাবে স্বীকৃতিও পায়নি বহলার শহীদ পরিবারগুলো। গনি জানালো স্বাধীনের পরে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলীর পদধূলি পড়েছিল বহলায়। সে সুবাদে শহীদদের পরিবার প্রতি পায় ২ হাজার টাকা। এরপর সময় আরো এগোতে থাকে। এগিয়ে যায় দেশও। কিন্তু বহলার শহীদদের কথা কেউ মনে রাখে না। গত শীতে হঠাৎ করেই বহলার শহীদ পরিবারগুলোকে দেয়া হয় একটি করে কম্বল। কিন্তু কোনো সহযোগিতা নয়, শহীদ শামীর উদ্দিনের মেয়ে শামসুন্নাহারের দাবি জানান শহীদ পরিবার হিসেবে নিজেদের স্বীকৃতির, শহীদদের গণকবরটির সংরক্ষণ ও তাদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি, সরকারিভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে বহলার গণহত্যার দিবসটি পালনের। শহীদ পরিবারগুলো চান গোটা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হোক স্বাধীনতা যুদ্ধে বহলায় নিরীহ মানুষের আত্মাহুতির করুণ কাহিনীটি। এ দেশে কে বড়? রাজাকার নাকি মুক্তিযোদ্ধা! ’৭১-এ পাকবাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামসের লোকেরা গোটা দেশেই তৈরি করেছিল হাজার হাজার গণকবর। আর স্বাধীনের পর বিচারের পরিবর্তে সেই সব রাজাকারদের গাড়িতে উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা। অথচ বহলার মতো গণহত্যায় শহীদদের কথা কেউ মনে রাখেনি। এ বরই লজ্জার, বরই দুঃখের। অধ্যাপক ইউসুফ আলীর পরে কয়েক মাস আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য যান বহলায়। গণকবরটিতে পড়ে শ্রদ্ধার ফুল। শহীদ পরিবারগুলোকে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসেন বহলায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির। অসহায় পরিবারগুলো তাই সে অপেক্ষায় আছে। কবে সংরক্ষণ করা হবে বহলার গণকবরটিকে? শহীদ স্মরণে কবে তৈরি হবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ? শহীদের সন্তানেরা কবে দেখবে তাদের শহীদ পিতার কবরে সোভা পাচ্ছে শত শত ফুল? ছবি : লেখক masalek.khokon@gmail.com |