আ ফ ম আব্দুল হাই
মৌলভীবাজার মৌলভীবাজারে অবস্থিত আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রটি জনবল শূন্যতার বৃত্তে ঘুরপাক করছে। নির্ধারিত পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র এক-চতুর্থাংশ। কোনোভাবেই শূন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। যাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পদে তারা বিভিন্ন অজুহাত তুলে থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যাবার প্রবণতা অনেক বেশি। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় তাই পিছিয়ে পড়ছে কৃষি বিভাগের গবেষণা কাজ। মিলছে না সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল। জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আকবরপুর নামক স্থানে ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। এরপর ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। এই দু’টি প্রতিষ্ঠানই কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলছে। বর্তমানে ঐ গবেষণা কেন্দ্রে সমস্যার অন্ত নেই। সঙ্কটের কারণে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সবচেয়ে প্রকট সমস্যা হচ্ছে জনবল সঙ্কট। ঐ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার পদ ৪টি। ৪ জনের স্থলে কর্মরত আছেন ২ জন কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ৮ জনের পদ রয়েছে। কিন্তু পদগুলো খালি পড়ে আছে। ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে একজনও নেই। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার অনুমোদিত পদ ১০টি। এর মধ্যে খালি রয়েছে ৯টি পদ। ১০ জনের স্থলে দায়িত্বে আছেন মাত্র ১ জন কর্মকর্তা। বৈজ্ঞানিক সহকারীর ১০টি বিপরীতে কর্মরত আছে ৩ জন। খালি পড়ে আছে ৭টি পদ। এ ছাড়া ১ জন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ৮ জন অফিস সহকারী আছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো খালি পড়ে থাকার কারণে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে সকলেই। শূন্যতার পেছনের কারণে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শূন্য পদে নিয়োগ পাবার পরও অনেক কর্মকর্তাই এখানে আসতে চান না। পাহাড়ি এলাকা আর দুর্গম হবার কারণে সরকারি নিয়োগ নিয়েও এখানে না এসে কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা তদ্বির করে পোস্টিং বাতিল করে নেন। তাদের যুক্তি মৌলভীবাজার এলাকায় স্কুল-কলেজ, চিকিৎসা, বাজার ব্যবস্থা ইত্যাদির ব্যবস্থা নেই। প্রত্যন্ত ঐ জেলায় বর্তমানে কয়েক লাখ জনগণ এমন অবস্থার মধ্যেই বাস করছে তখন সরকারি কর্মচারীদের এমন অন্যায় আবদারের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভাগ্য। জনবল সঙ্কট থাকলেও আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু হয় বিভিন্ন প্রকার ফলমূল নিয়ে গবেষণা। উদ্ভাবিত হচ্ছে উন্নত মানসম্পন্ন বিভিন্ন ফসলের জার্মপ্লাজম। এখানে মূলত অবলুপ্ত ও দুঃ®প্রাপ্য ফলের বংশ টিকিয়ে রাখতে কাজ করেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। বর্তমানে ৬৮টি বিভিন্ন প্রকার ফলের জার্মপ্লাজম, লুকলুকির ২১টি জার্মপ্লাজম, গোলাপজামের ৬টি জার্মপ্লাজম, বাতাবি লেবুর ৫৬টি জার্মপ্লাজম নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে বেশকিছু ফলের জাত ইতোমধ্যেই উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বারি কাঁঠাল-১, বারি লিচু ২ ও ৩, বারি কামরাঙা-১, বারি লটকন-১, বারি বাতাবি লেবু-১, বারি লেবু-৩, বারি পেয়ারা-২, লুকলুকি ১টি, গোলাপ জাম ১টি। এ ছাড়া কমলালেবুর ২৮টি জার্মপাজম নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। ৪ বছরের মাথায় গবেষণালব্ধ প্রায় ৫০টি গাছে ইতোমধ্যে ফলনও এসেছে। এখানে মসলা জাতীয় যেমনÑ দারুচিনি, এলাচ, তেজপাতা, লবঙ্গ, গোল মরিচ রয়েছে। এ ছাড়া শরীফা, করমচা, আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, তইকর, সাতকরা, লটকনসহ বহু প্রজাতির ফলের বাগান রয়েছে। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন বিভিন্ন প্রকার সবজির ওপর গবেষণা করা হয়। যেমন বারি ডাঁটা-১ ও ২, বারি সবুজ ডাঁটা শাক, বারি গিমা কলমী শাক, বারি পুঁই শাক ১ ও ২, বারি বরবটি-১, বারি ঢেঁড়স-১। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন টমেটো, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, লতিরাজ কচু, মুখি কচু, বেগুন, বারমাসি বেগুন ইত্যাদি শাক-সবজির চাষ করা হয়। এখানে একটি বিরল প্রজাতির শীতকালীন সবজি রয়েছে। তার নাম হলো ড্রপ শিম বা খাটো শিম। এ শিমের বৈশিষ্ট্য হলো ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার উঁচু গাছ হয় এবং ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ফলন আসে। প্রতিটি গাছে ৮০ থেকে ১২০টি শিম ধরে। গাছগুলো ৫০ হতে ৬০ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করা হয়। আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে সিলেট বিভাগব্যাপী একটি মেলার আয়োজন করা হয়। সেই মেলা থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ, শাক-সবজি, মসলা জাতীয় দুর্লভ চারা সংগ্রহ করা হয়। তারপর এই গবেষণা কেন্দ্রের এগুলোর ওপর গবেষণা করে নতুন প্রজাতির উদ্ভাবন অব্যাহতভাবে চলে আসছে। আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুনজুরুল হক সাপ্তাহিক-কে বলেন, ‘প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় গবেষণার কাজ এগিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ের ঢালু জমিতে বর্ষা মৌসুমে নালার ব্যবস্থা করে দিতে পারলে ছোট ছোট প্লটে বিভিন্ন প্রজাতির গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ফসলাদি চাষ করা সম্ভব। আমাদের সঙ্কট সমাধান করা গেলে এখান থেকে আরো ভালো কাজ আমরা পেতে পারি। কিন্তু জনবল সঙ্কট মোকাবেলা করা যাচ্ছে না।’ |