মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন
ফেনী
ফেনী পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে-গোপনে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সম্প্রতি এ দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠেছে। মেয়র কাউন্সিলর দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে হুমকি-পাল্টা হুমকি এমনকি থানায় পাল্টাপাল্টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। গত ৬ জুলাই পৌরসভার বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক কাউন্সিলর অনুপস্থিত ছিলেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পৌরসভার উন্নয়ন বৈষম্যকে কেন্দ্র করেই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। বিভিন্ন সময় কোনো কোনো কাউন্সিলর প্রকাশ্যে এ বৈষম্যের প্রতিবাদ জানালেও অনেকেই ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছেন। আগামীতে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পৌরসভা সূত্র জানায়, বর্তমান পৌরসভা পরিষদের শুরু থেকেই চলছে মেয়র-কাউন্সিলর টানাপোড়েন। শুরুতেই টাউন সার্ভিস বাস বণ্টন নিয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। এ সময় মেয়র কোনো কোনো কাউন্সিলরকে একাধিক বাস নামানোর সুযোগ দেন। অনেক কাউন্সিলর একটি বাসও নামানোর সুযোগ পাননি। এ নিয়ে বঞ্চিত কাউন্সিলররা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিগত পৌর নির্বাচনের সময় নুরুল আবসারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমকে সমর্থন দেয়ায় গোড়া থেকেই উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল কাউন্সিলর হারুনুর রশিদ মজুমদারের ১২ নং ওয়ার্ড। দেড় থেকে দু’বছর এ অবস্থা চলার পর কাউন্সিলর হারুন বিক্ষুব্ধ কাউন্সিলরদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে বিদ্রোহী কাউন্সিলরদের এক সভা ট্রাংক রোডের উদয়ন মাল্টিপারপাস অফিসে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮ জন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। আরো ৩ কাউন্সিলর সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও ওই সভার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। সভায় কাউন্সিলররা মেয়রের দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু এ সময় দু’জন মেয়রপন্থী কাউন্সিলর এসব বিষয়ে মেয়রের কাছে সর্বশেষ বারের মতো কৈফিয়ত তলব করা হবে বলে কিছুদিনের মতো কর্মসূচি স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। এরপর বিক্ষুব্ধ কাউন্সিলরদের কেউ কেউ মেয়রের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে সুবিধা আদায় করেন। ফলে সবাই একমত থাকতে পারায় সংবাদ সম্মেলনটিও আর হয়নি। পৌর পরিষদে বিভিন্ন সময় উন্নয়নবঞ্চিত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ১০, ১১, ১২ নং ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলর আমেনা মজুমদার মানিক। এ বিষয়ে তিনি ফেনী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনেরও আয়োজন করেন। কিন্তু মেয়রপন্থী একটি পক্ষ তা ভ ুল করে দেয়। শহরের ১৮ নং ওয়ার্ডে খাজা আহম্মদ ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণকে কেন্দ্র করেও দীর্ঘদিন ধরে মেয়র-কাউন্সিলরদের মাঝে দ্বন্দ্ব চলে। ১৮ টি ওয়ার্ডের জন্য আসা ১৮ লাখ টাকার টিআর মেয়র পুরোটাই ওই টার্মিনালের জায়গা ভরাটের জন্য বরাদ্দ দিতে চান। এর প্রতিবাদ জানান কাউন্সিলররা। তারা পুরো বরাদ্দটি ১৮ ওয়ার্ডে ভাগ করে দেয়ার দাবি জানান। পরবর্তীতে কাউন্সিলরদের চাপের মুখে মেয়র ওই বরাদ্দ ভাগ করে দিতে বাধ্য হন। শুরুর দিকে ৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন বাবুলের সঙ্গেও মেয়রের চরম দ্বন্দ্ব ছিল। ফেনী পৌরসভার প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কান্তি গুহের সঙ্গে বাবুলের দ্বন্দ্বের জের ধরে সে সময় ধর্মঘটের হুমকি দেন পৌর পরিষদের কর্মচারীরা। তখন এ বিশৃঙ্খলার পেছনে পৌর মেয়রের ইঙ্গিত ছিল বলে পৌর সূত্র জানায়। পৌরসভার ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচনকালে নানাভাবে চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুল আবসারকে সহায়তা করেন। পরবর্তীতে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মেয়র ১৫ নং ওয়ার্ডে উন্নয়ন বরাদ্দ না দেয়ায় উভয়ের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এর জের ধরে বিভিন্ন সময় জিডি-পাল্টা জিডি, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ঘটনা ঘটে। এখনো নুরুল আবসার ও সাখাওয়াতের মাঝে দ্বন্দ্ব চলছে। দ্বন্দ্বের ফলে অনুন্নতই রয়ে গেছে ১৫ নং ওয়ার্ড। কাউন্সিলর সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সম্প্রতি ওই এলাকায় রাস্তার গর্তে গাড়ি পড়ে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। যা তিনি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে জানিয়েছেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মেয়র তার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেছেন। এমনকি তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সাখাওয়াতও থানায় পাল্টা জিডি করেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পৌরসভার ১, ২, ৩, ৪ ও ১০ নং ওয়ার্ডে প্রায় ১ কোটি টাকার উন্নয়নের দরপত্র আহ্বান করা হয়। অথচ মেয়রের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হওয়ায় ১৫ নং ওয়ার্ডে কোনো বরাদ্দ মেলেনি। উন্নয়ন বৈষম্যের কারণে ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে মেয়র আবসারের দ্বন্দ্বের কথা প্রায় সকলেরই জানা। অবশ্য নিজ ওয়ার্ডের উন্নয়নের স্বার্থে বর্তমানে মেয়রের সকল আচরণ মেনে নিয়ে কাউন্সিলর মোশাররফ তার সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। শহরের ৮ নং ওয়ার্ড, ১৩ নং ওয়ার্ড, ১৪ নং ওয়ার্ড, ১৬ নং ওয়ার্ড ও ১৭ নং ওয়ার্ডেও উন্নয়ন বৈষম্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন কাউন্সিলর জানান, তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে চেষ্টা তদ্বির করে পকেটের টাকা খরচ করে নিজ ওয়ার্ডের জন্য কিছু উন্নয়ন বরাদ্দ এনেছিলেন। কিন্তু মেয়র এ ব্যাপারে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে অপারগতা জানান। তিনি জানান, বরাদ্দটি সকল ওয়ার্ডে ভাগ করে দেয়া হবে। ওই কাউন্সিলর যুক্তি দেখিয়ে বলেন, আমার ওয়ার্ডটি অবহেলিত ও উন্নয়নবঞ্চিত। এ বরাদ্দটি আমার ওয়ার্ডে রাখুন। কিন্তু এতে রাজি হননি পৌর মেয়র। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব চলছে। |