গওহার নঈম ওয়ারা
সহপাঠী চিত্তর বাবা আমাদের পণ্ডিত স্যার আজ নেই। ’৭১-এর বাগেরহাট গণহত্যার সময় দুনিয়ার অন্যতম একটা ভালো মানুষ আমাদের পণ্ডিত স্যার অবিশ্বাস্য এক নৃশংসতার শিকার হন। তাকে গুলি করে মারে সেনাসদস্যরা। যে কোনো বাগধারা, প্রচলিত প্রবচন, বিখ্যাত কবিতাংশ মনে পড়লেই আমার খুন হয়ে যাওয়া পণ্ডিত স্যারের কথা মনে হয় আর স্বাভাবিকভাবে মনে পড়ে উর্দিপরা, হাতিয়ার হাতে খুনে উন্মত্ত পাষণ্ডদের কথা। অনেক সময় উল্টোভাবেও মনে পড়ে স্যারের কথা। বন্দুক হাতে যে কোনো দেশের যে কোনো সেনা সদস্যকে দেখলে আমার মনে হয় এই বুঝি কোনো এক পণ্ডিত স্যার খুন হবে। আমার চোখে ভেসে ওঠে পণ্ডিত স্যারের চেহারা। আমার কি মনোসামাজিক কাউন্সিলিং মানে চিকিৎসা দরকার? প্রচলিত প্রবচন, বিখ্যাত কবিতাংশ অথবা বাগধারার জগতের সঙ্গে প্রথম পরিচয় আমার দাদির হাত ধরে আর পণ্ডিত স্যার সেই পরিচয়ের গাড়িতে ইঞ্জিন ফিট করে দিয়েছিলেন। মুখস্থ রচনার বদলে আমার কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং মার্কা হাতের লেখা দিয়ে ভালো ছাত্রের তুলনায় দু’-এক পাতা কম লিখে রচনায় আমি নম্বর একটু বেশিই পেতাম। নানা প্রবচন ব্যবহার করায় পণ্ডিত স্যার খুশি হয়ে নম্বর দিতেন। মাঝে মাঝে ভালো ছাত্রদের বলতেন, ‘ওর রচনায় দেখ।’ ফার্স্ট বয় শিবলী একদিন বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলেছিল, ‘স্যার ওর কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং পড়া যায় না।’ পণ্ডিত স্যারের উত্তর ছিল প্রবচনে : ‘চক চক করিলেই সোনা হয় না।’ সে কথা শুনে আমার আর মাটিতে পা পড়ে না। সেদিন বোধ হয় রেললাইন ধরে দৌড়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। হাতের লেখা সুন্দর করে আর কি হবে। স্যার তো সার্টিফিকেট দিয়েই দিয়েছেন। তবে স্যারের সার্টিফিকেটে বেশি কাজ হয়নি তা বুঝতে কারোরই কষ্ট হবার কথা নয়। কর্ম জীবনে সবাই চকচকে জিনিসই খোঁজে। আর যারা চকচকে নয় তারা পড়ে থাকে পানের ডিব্বায়। অথবা পুরনো কৌটাতে। পণ্ডিত স্যার যেদিন ব্যাকরণ ক্লাসে আমাদের ভাব সম্প্রসারণের জন্য ‘দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’ প্রবচনটি দিয়েছিলেন সেদিন আমি খতায় এর বিপরীতে প্রশ্ন তুলেছিলাম। লিখেছিলাম, কিন্তু অনেকেই বলেন ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথিও সহ্য হয়।’ এই দুটো প্রবচন পরস্পর বিরোধী। স্যার বোধ হয় খুশিই হয়েছিলেন। তারপর উনি অনেকদিন ক্লাসে একটা প্রবচন বলে তার বিপরীত প্রবচন বলতে বলতেন। আমরা সবাই মজা পেতাম। তারপর দু’পক্ষ তৈরি করে ক্লাসেই একটা বিতর্ক সভা করতেন। সবচেয়ে প্রিয় ক্লাস ছিল সেটি। একদিন ‘দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’র দল জিতে গেল। যুক্তিতে নয় ভোটে। সেটা ছিল গরমের ছুটির আগে শেষ দিনের শেষ ক্লাস। বিজয়ী দল খুশিতে আর আবেগে ঢাউস বিজয় মিছিল বের করল। অন্যান্য ক্লাসের ছেলেরাও কিছু না বুঝে যোগ দিল সে আনন্দ মিছিলে। কেউ ভাবল গ্রীষ্মের ছুটির আনন্দ মিছিল, কেউ ভাবল স্কুল ছুটির আনন্দ মিছিল, কেউ কিছু না ভেবে শুধু হুল্লোড়ের জন্যই মিছিলে ছুটল। রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। পথভাবে ‘আমি দেব’; রথ ভাবে আমি মূর্তি ভাবে ‘আমি দেব’, হাসে অন্তর্যামী। সে মিছিল এখনো ছুটছে। ‘দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’র পক্ষের মিছিল। শৃঙ্খলার নামে। নিয়ম রক্ষার নামে, পেস্টিজ রক্ষার নামে, নিজের ক্ষমতা জাহির করার নামে, গোয়াল উজাড় করার প্রক্রিয়া চলছে। গত এপ্রিল মাসে পঞ্চগড় থেকে আব্দুস সালাম খন্দকার বাবু আমার কাছে একটা চিঠি পাঠায়। বাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় রাজশাহীতে ২০০৯ সালের নবেম্বর মাসে শিশুদের এক সমাবেশে। সেখানে আমার কাজ ছিল শিশুদের সঙ্গে শিশুদের নানা অধিকারের বিষয়ে আলোচনা করাÑ বিশেষ করে শিশুদের কথা বা মতামত শোনাটা যে বড়দের একটা দায়িত্ব সেটা বুঝিয়ে বলা। উদ্দেশ্য শিশুরা যেন কোনো সময় মতামত জানাতে কুণ্ঠাবোধ না করে বরং মতামত দিয়ে যেন বড়দের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করে। শিশুরা মতামত দেয়ার ঝুট, ঝামেলা, ঝুঁকি, বাঁধা ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথা বলেছিল। আমরা সাহস দিয়েছিলাম, ভরসা দিয়েছিলাম। ঠিকানা, ফোন নম্বর বিনিময় করে ভরসার ভিতটা মজবুত করতে চেয়েছিলাম। জানিয়ে দিয়েছিলাম সরকারও তাদের সাহায্য করবে। জেনেভায় গিয়ে খাস দিলে সরকারের লোকজন কসম খেয়ে কথা দিয়ে এসেছে শিশুদের সব কাজে তারা শিশুদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবে। শিশুদের কাছে জানবে ও তাদের জানাবে। অতএব হে শিশুর দল তোমাদের কোনো ভয় নেই, তোমরা এগিয়ে যাও। সে সভায় হলুদ খাম পাওয়া দু’-একজন সরকারি লোকও ছিলেন। তারাও টেলিভিশনের টকশোর নট নটীর মতো মৃদু মাথা নেড়েছিলেন। শিশুরা ভেবেছিল তারা সম্মতি জ্ঞাপন করছেন। বাবু এপ্রিল মাসে যখন চিঠি লেখে তখন দেশের কাগজ ‘ভোলা নির্বাচনে’ ভুলে আছে। তন্ময় হয়ে পুলিশ অফিসার গৌতমের খুনি ধরতে দেশের সকল হায়দার গ্রেফতারের মোহময় সংবাদে। ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে ফরিদপুরে সাংবাদিক গৌতম হত্যার পয়লা নম্বর আসামি কোর্টভবন থেকে ‘পালিয়ে’ যাওয়ার ঘটনায়। পঞ্চগড়ের বাবুর চিঠি পড়ার আর সেটা নিয়ে চর্চা করার সময় কোথায়? স্পেস কোথায়? বাবু তার চিঠিতে জানিয়েছিল পঞ্চগড় সরকারি এতিমখানায় (লোক দেখানো ভাষায় যাকে শিশু পরিবার বলা হয়) কি রকম অরাজকতা চলছে। তার আশঙ্কা শিশুরা ক্রমশ বিশ্বাস করছে, ‘না কাঁদলে মায়েও দুধ দেয় না।’ কাজেই যে কোনো সময়ই তারা ভয়ানক কান্নাকাটি শুরু করতে পারে। ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ভেবেছিলাম সব এতিমখানার একই অবস্থা এটা আর নতুন কি? বাবু একটু নেতা নেতা ভাব দেখাচ্ছে। কিন্তু বাবুর আশঙ্কায় ঠিক ছিল। ২১ এপ্রিল শিশুরা রাস্তায় চলে আসে। পচা কুমড়া আর ভাতের থালা হাতে। প্রশাসনের টনক নড়ে ‘না কাঁদলে দুধ দেয় না।’ লাঠি হাতে ছুটে যায় সেপাইরা। শিশুরা জানায় তাদের কষ্টের কথা সুপার, কনট্র্রাক্টর আর কম্পাউন্ডারের শাস্তি দাবি করে তারা। পুলিশ সুপার জমিদার বাবু যেমন দু’বিঘা জমির মালিক উপেনকে বলেছিলেন সেভাবে শিশুদের বললেন, ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবে।’ শিশুরা আশ্বস্ত হয়ে ফিরে গিয়েছিল ব্যারাকে, বন্দিখানায়। তারপর আর কোনো খবর নেই। সংবাদপত্রে কোনো ফলোআপ নেই। ‘না কাঁদলে দুধ দেয় না’। শিশুরা আবার কাঁদছে। জমিদারের ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবে’ বচনটি যেমন ফাউ বচন ছিল তিন মাস পর শিশুদেরকে দেয়া আশ্বাসও তেমন ফাউ আশ্বাসে পরিণত হয়েছে। প্রতিবাদী শিশুদের সরকার ‘বিশ্বনিখিল লিখে দিয়েছে’ এতিম খানার ঠিকানার বদলে। বের করে দিয়েছে শিশুদের। গোয়াল শূন্য করেছে দুষ্টু গরুর খপ্পর থেকে। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে কটাক্ষ করে বাবু তার শেষ চিঠিটা লিখেছে : পাকাযোনবেষু (পাকজনাবেষু পড়–ন) নঈম আঙুল (আংকেল পড়–ন), পততরে (পত্রে) আমার হাজার হাজার সালাম গহন (গ্রহণ) করিবেন। আশা করি খোদার ফজলে ভালো আচেন। আমাদের বিয়দপি নিবেন না। মোবাইলে না পাইয়া পততর লিখিতেছি। আপনাদিগের উপর আমাদিগর অনেক ভরশা (ভরষা) ছিল। এখন সকলই ফাঁকা মনে হইতেছে। মনে হইতেছে আপনারা মরশুমী (মৌসুমী) ফেরিওয়ালা, যখন যে ফল পাওয়া যায় তখন সেটি মাথায় লইয়া ফেরি করিয়া বেড়ান। আবার সিজন চলিয়া গেলে অন্য কিছুর বাবসা (ব্যবসা) করেন। গত বৈশাকে (বৈশাখ) একটি পততর লিখিয়াছিলাম আমাদের জেলার এতিম শিশুদের রক্ষা করিবার জন্য। উত্তর জবাব পাই নাই। একন শিশুদের তাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। একন কি করিবেন। বলিয়াছিলেন শিশুদের বিরুদে (বিরুদ্ধে) কিছু ঘটিলেই আপনাদের জানাইতে। জানাইলাম। আশা করি ব্যবস্থা নিবেন। নাকি এখন অন্য চাকরি করিতেছেন। অন্য জিনিস ফেরি করিতেছেন। না পারিলে জানাইবেন। আমরা শেখ হাসিনার কাছে পততর লিখিব। পারিলে তাঁহার পায়ে গিয়া লুটাইয়া পড়িব। কিছু একটা করিবই করিব। ইতি টানিলাম সালাম পুনশ্চ : মনে রাখিবেন যাহাদের বাহির করিয়া দেওয়া হইয়াছে তাহার কেহ রাজাকার পরিবারের নয় বরং করিম, বকর, হালিম (সঠিক নাম নয়) এরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উত্তরসূরি। আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জবাবে আমি বাবুকে লিখেছি, ভাই আমার, সোনা আমার, লক্ষ্মী আমার, আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি। প্রধানমন্ত্রীর অনেক কাজ। তোমরা বরং আমার গুরু মিজান স্যারের কাছে দরখাস্ত কর উনি এখন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ার। খুব ভালো মানুষ। অনেক বড় দিল তাঁর, আমি তোমাদের দরখাস্তের দ্বিতীয় পাতায় স্বাক্ষর করে দেব। ভাই আমার শান্ত হও। পথ খুব বন্ধুর। এতিমখানা থেকে বের করে দিয়েছে তো কি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ পড়তে বল, ‘মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে, তাই লিখি দিল বিশ্ব নিখিল দু’বিঘার পরিবর্তে।’ দায়মুক্তির বচন : এ লেখার চরিত্রগুলো কাল্পনিক। কাকতালীয়ভাবে কোনো মিল পাওয়া গেলে তা পরিকল্পিত নয়। কারো কাছে মিথ্যা বলে মনে হলে আমাকে গালি দিতে পারেন। কুশীলবরা গোপনে শুধরে নিলে সমাজ উপকৃত হবে। যাদের দানা পানিতে আমার সংসার চলে তারা কেউ আমার মতামতের জন্য দায়ী নন। এমনকি ভবিষ্যতে যারা আমার জীবিকার ব্যবস্থা করে দেবেন তাদেরও কোনোভাবে আমার লেখার জন্য দায়ী করা যাবে না। nayeem5508@gmail.com |