|
স্পিনের সম্রাট বললেও তাকে বেশি বলা হবে না। শ্রীলঙ্কার প্রতিটি জয়েই রয়েছে তার প্রচ্ছন্ন অবদান। বর্তমান সময়ে টেস্ট এবং ওয়ানডে-তে তিনিই সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক। ৮০০ উইকেট শিকারি ঘোষণা দিয়েছে বড় পরিসরের ক্রিকেট থেকে বিদায়ের। ক্রিকেট এই সম্রাটকে বিদায় জানিয়েছে রাজকীয়ভাবে। এই বীর তার জীবনে পাড়ি দিয়েছেন অনেক প্রতিকূল সময় । সাফল্য-ব্যর্থতা যাই এসেছে সদা হাস্যোজ্জ্বল এই বিরল প্রতিভা কখনো খেই হারাননি। কিংবদন্তি মুরালিধরনের টেস্ট ঐতিহ্য নিয়ে লিখেছেন মেরাজ মেভিজ
শ্রীলঙ্কায় তখন গৃহযুদ্ধের বিভীষিকা। মানুষ মরছে, ঘর জ্বলছে। এর মাঝেও বিশ্বের দরবারে তারা পরিচিত ছিল ক্রিকেটের জন্য। দেশীয় ব্যর্থতা এবং ক্রিকেটীয় সাফল্যের এমন সময়ই হাজির এক ক্রিকেটার। তার জোরালো দাবি তিনিও তার অবদান রাখতে চান ক্রিকেটে। তৎকালীন সময়ের সেরা ক্রিকেটারদের সরিয়ে দলে ঠিকই নিজের স্থান পাকা করে নিলেন। কিন্তু ক্রিকেটীয় ভবিষ্যতদ্রষ্টারা তাকে নিয়ে খুব একটা উচ্চাশা করেননি। মুরালিও এ নিয়ে খুব একটা চিন্তায় ছিলেন না। তিনি পরিশ্রম ও অপেক্ষা করেছেন এবং বিদায় নেয়ার আগে নিজেকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে তার সতীর্থদের শুধু তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। শুধু শ্রীলঙ্কার নয়, তিনি এখন ক্রিকেটবিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। ১৯ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে সমালোচিত হয়েছে বহুবার। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। এমন সময়ও গেছে যখন তিনি নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে খেলতে যেতেন না। এই সমালোচনার সবচেয়ে বড় দিক ছিল তার বোলিং এ্যাকশন। এ ছাড়াও কথা শুনতে হয়েছে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাওয়া উইকেটগুলো নিয়ে। তাকে ছোট করার সুযোগ পেলে ছাড় দেননি কেউই। কিন্তু মাত্র ১৩৩ টেস্টে ৮০০ উইকেট নিয়ে তিনি তাদের মুখে চুনকালি দিয়েছেন। এখন বিদায় বেলায় সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শুভেচ্ছা জানাতে ব্যস্ত এই বিদায়ী বীরকে। সব ভুলে গেলেও মুরালি কিভাবে ভুলবেন মেলবোর্নের সেই বক্সিং ডে টেস্ট ম্যাচের কথা। শুধু মেলবোর্ন কেন, অ্যাডিলেড এবং ব্রিসবেনেও তো তাকে হজম করতে হয়েছিল অপমান। অস্ট্রেলিয়ার সেই আম্পায়ার তাকে বার বার নো-বল ডেকেছেন। সঠিক নিয়মে হাত সোজা রেখে বল না করার জন্য। ব্রিসবেন এবং এ্যাডিলেডেও যখন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আইসিসি তখন তার এ্যাকশনের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। ফলাফল মুরালি জয়ী। আইসিসি ঘোষণা করেছে তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী মুরালির এ্যাকশন ছিল বৈধ। যদিও এর কিছু দিন পর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল বোলিং এ্যাকশনের নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন আনে। বীর যোদ্ধা ঠিকই টিকে থাকলেন আর সেই আম্পায়ার এখন ডাইনোসরের প্রজাতিভুক্ত। মুরালির সে দু:সময় বেশিরভাগ প্রাক্তন স্পিনারাই ছিলেন তার বিপক্ষে। সবচেয়ে বেশি তাকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন সাবেক ভারতীয় স্পিনার বিশেন সিং বেদী। জ্যাভলিন (বর্শা) থ্রোয়ার হিসেবে মুরালিকে আখ্যায়িত করেছিলেন। সংশয়ের সে মেঘ দূরিভূত হয়েছে। এরপর তিনি চলেছেন, রাস্তা নিজেই তৈরি হয়েছে। আর সে চলার পথে তিনি শুধু রেখে গেছেন তার পদচিহ্ন। এক এক করে হারিয়েছেন সকল প্রতিদ্বন্দিকে। শেন ওয়ার্নও তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। কিন্তু তিনি যে ঠিক করেছিলেন তিনি হবেন সম্রাট। রাজপুত্র হতে তিনি আসেননি। সবাইকে ছাড়িয়ে সেরার মুকুট এখন তার মাথায়ই। যে কোনো সময় বিপজ্জনক বল করার দক্ষতাই তাকে এগিয়ে রেখেছে শেন ওয়ার্নের চেয়ে। প্রতি মুহূর্তে তিনি পরীক্ষায় ফেলেছেন ব্যাটসম্যানদের। ওয়ার্ন সব সময় তাকে কটাক্ষ করেছেন বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে উইকেটগুলো নিয়ে। কিন্তু বাকি অন্য দেশগুলোর বিপক্ষেও তিনি অনেক এগিয়ে। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে এ দুটি দেশের বিপক্ষে মাত্র ২৫ টেস্ট থেকে নিয়েছেন ১৭৬ উইকেট।
এই ওয়ার্নও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন মুরালিই সেরা। সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না ঐ উচ্চতায় আর কেউ পৌঁছাতে পারবে। মুরালি ভালোই দেখালে, বলতে বাধ্যই হচ্ছি। সে যেভাবে কাজটা করল তা অবিশ্বাস্য। তার এ্যাকশন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইসিসি তো ওকে খেলার অনুমতি দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার স্পিনিং কন্ডিশনে মুখোমুখি হওয়াটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার।’ তার এই মন্তব্যে যদিও ভালো কথার চেয়ে খোঁচাই বেশি ছিল। কিন্তু তিনি মুরালিকে ঈর্ষা করবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের অনেক ব্যাটসম্যান এখন নিশ্চয়ই শান্তির ঘুম ঘুমাতে পারবেন। তাদের আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলতে নামার আগে মুরালিকে নিয়ে আলাদা ছক কষতে হবে না। তবে এই মুরালিকেও কাঁদিয়ে ছেড়েছেন অনেক ব্যাটসম্যান। তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে হচ্ছে ডানহাতিদের চেয়ে বাঁহাতিরাই ছিলেন তার বিপক্ষে সফল। কারণ স্বভাবগত কারণেই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানরা মুরালির অফ স্পিন পেতেন লেগ স্পিন হিসেবে। সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যানের তালিকায় নাম রয়েছে ব্রায়ান লারা, সৌরভ গাঙ্গুলীর নাম। অন্যদিকে শচীন এবং পিটারসেনের রেকর্ড তার বিপক্ষে যথেষ্ট খারাপ। টেস্টে প্রায় সবকিছু পাওয়া এই মুরালিরও রয়েছে কিছু অতৃপ্তি। বেশ কয়েকটি দেশ এখনো যে জয় করা হয়নি তার। এই খেদ তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে শেষ পর্যন্ত। আর দেখুন সেই ভাগ্য তার সেই চাওয়া পূরণ করতে না পারলেও এভারেস্ট শৃঙ্গেই তুলে দিল তাকে। ৮০০ উইকেটের মাইলফলকের প্রথম এবং একমাত্র যাত্রীকে বিদায় জানানো হয়েছে যথাযোগ্য সম্মান দিয়েই। টেস্টের প্রায় সব রেকর্ডই এই জাদুকরের দখলে। শেষ টেস্টের শেষ দিন খেলতে নেমেছিলেন লাল গালিচা দিয়ে হেঁটে। আর ম্যাচের নাটকীয় শেষ উইকেটটি নিয়ে দলকে জয় এবং নিজের জন্য ৮০০ উইকেট নিয়ে বিদায় নিয়েছেন সতীর্থদের ঘাড়ে চরে।
জীবনের মোদ্দাকথা হলো ক্ষমা করা এবং ভুলে যাওয়া এশিয়ার বিশ্বকাপই কি আপনার শেষ? মুরালি : বলা মুশকিল। আমার বয়স এখন ৩৫ বছর। আরো ২ বছর বা তিন বছর খেলা সম্ভব। যদি সব ঠিক থাকে তবে খেলব। আর না হলে অনেক হয়েছে বলে বিদায় নেব। আপনার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য আছে কি? মুরালি : না। টেস্ট বিদায়ের পর এখন আমি ওয়ানডে এবং টি-২০তে খেলতে চাই। শেষ বেলায় আম্পায়ারদের উদ্দেশে কিছু বলবেন কি? মুরালি : জীবনের মোদ্দাকথা হলো ক্ষমা করা এবং ভুলে যাওয়া। আমি সব ভুলে গেছি। তারা যা ভালো বুঝেছেন সে সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। এই বিদায়ে কি আপনি খুশি? মুরালি : এভাবে অবসর নিতে পারাটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে সব দিয়েছেন। শেষ টেস্টে আবেগ কতটা তাড়িয়ে বেড়িয়েছে? মুরালি : সত্যি বলছি, আমি মোটেও আবেগাক্রান্ত ছিলাম না। আমি বরং খুশি, দায়িত্বটা শেষ করতে পেরে। এর জন্য আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। এই ম্যাচটাকেও অনেক গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। ৮০০ না হলে মন খারাপ হতো নিশ্চয়ই। শেষ উইকেটের জন্য কতটা উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন? মুরালি : ৮০০ উইকেট না পেলেও আমি মন খারাপ করতাম না। পুরো ম্যাচে আমি একবারই উদ্বিগ্ন হয়েছি, মালিঙ্গা যখন মাঠ থেকে বেরিয়ে গেল। ভক্তদের কি বলতে চান? মুরালি : আমি নিশ্চিত আপনারা আমাকে খুব বেশি দিন মিস করবেন না। কারণ আমাদের আরো অনেক দুর্দান্ত প্রতিভাবান স্পিনার রয়েছে। যারা দলকে ঠিকই এগিয়ে নিয়ে যাবে।
মুরালি বনাম ওয়ার্ন মুরালি টেস্ট উইকেট ৫/১০ ওয়ার্ন টেস্ট উইকেট ৫/১০
সকল দেশ ১৩৩ ৮০০ ৬৭/২২ ১৪৫ ৭০৮ ৩৭/১০ সকল দেশ (বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে ছাড়া) ১০৮ ৬২৪ ৫০/১৬ ১৪২ ৬৯১ ৩৬/১০ দেশে (বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে ছাড়া) ৫৯ ৩৭২ ৩২/১০ ৬৯ ৩১৯ ১৫/৪ বিদেশে (বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে ছাড়া) ৪৯ ২৫২ ১৮/৬ ৭০ ৩৪৫ ১৯/৫
মুরালি বনাম ব্যাটসম্যান নাম বল রান আউট গড়
শচীন টেন্ডুলকার ৩২০ ১৫৮ ৮ ২৯.৬০ ব্রায়ান লারা ৭১০ ৩৭৩ ৩ ১২৪.৩৩ রিকি পন্টিং ২৪৩ ১৭২ ২ ৮৬.০০ বিভিএস লক্ষ্মণ ৪৬০ ২৩০ ২ ১০৩.৫০ কেভিন পিটারসেন ২৩৬ ১৬৮ ৬ ২৮.০০ ম্যাথিউ হেইডেন ২১৮ ১৪২ ৫ ২৮.৪০ |