Logo
 বর্ষ ৩ সংখ্যা ৯ ১লা শ্রাবণ, ১৪১৭ ১৪ জুলাই, ২০১০ 
আপনি এখন পুরোনো সংখ্যায় আছেন ! তারিখ : ১৪ জুলাই, ২০১০
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
[বইপত্র] নাগরী সাহিত্য : বিস্মৃত ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার  

স্বকৃত নোমান

নাগরী সাহিত্য। শুনতে কেমন একটা অচেনা-অজানা বলে মনে হয়। মনে হয় পৃথিবীর কোনো দূরাঞ্চলের কোনো এক অখ্যাত-অজ্ঞাত জাতি-গোষ্ঠীর চর্চিত একটি সাহিত্য বুঝি! এ সাহিত্য যে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাংলাদেশ নামক এই ভুখ-ের হাজার হাজার অধিবাসীর চর্চিত একটি সাহিত্য—তা সহজে যেন বিশ্বাস হয়ে ওঠে না।
অবশ্য না হওয়ারই কথা। নাগরী সাহিত্য এখন বিলুপ্ত। এ সাহিত্য এখন বিস্মৃত অতীত, লুপ্ত ঐতিহ্য। বাংলার উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা সিলেট, আসাম, কাছাড়, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে একদা এই সাহিত্যের চর্চা ছিল। বাংলা লিপির পাশাপাশি ছিল নাগরী লিপিও। প্রায় ছয় শ বছর ধরে এ লিপিতে সাহিত্যচর্চা হয়েছে। সিলেট অঞ্চলের অজ্ঞ মুসলমান জনসাধারণের নিকট ধর্মশাস্ত্রমূলক সাহিত্য প্রচারের প্রেরণাই নাগরী অক্ষর প্রচলনের নেপথ্যে কাজ করেছে।
কবে, কখন, কীভাবে নাগরী চর্চা শুরু হয়—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। গবেষক সৈয়দ মুজতবা আলীর অভিমত : ‘সিলেটের মুসলমানদের মধ্যে একপ্রকার নাগরী লিপির প্রচলন আছে। এই লিপি দেবনাগরী লিপি থেকে ভিন্ন এবং কেবলমাত্র সিলেট জেলার মুসলমানদের মধ্যে এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।’ অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির মতে, ‘শ্রীহট্টের মুসলমানদের মধ্যে একরূপ নাগরাক্ষর প্রচলিত আছে। অনেক মুসলমানি কেতাব এই অক্ষরে মুদ্রিত হয়। এই ভাষা অতি সহজে শিক্ষা করা যায়।’
নাগরী লিপি সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন পদ্মনাথ ভট্টাচার্য্য বিদ্যাবিনোদ। তার অভিমতটির সংক্ষিপ্ত রূপান্তর এ রকম যে, হযরত শাহজালালের সঙ্গে ৩৬০ জন আউলিয়া শ্রীহট্টে এসেছিলেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের অধিবাসী। তখনো বোধহয় আরবি অক্ষরে হিন্দিভাষা লিখিত হয়ে উর্দু ভাষারই চর্চা করে দেবনাগরাক্ষরে লেখাপড়া করত। তাদের অনুকরণে শ্রীহট্টের সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে নাগরাক্ষর প্রসারিত হলো। ক্রমে যদিও পশ্চিমাঞ্চলের মুসলমান সমাজে হিন্দি আরবি অক্ষরে লিখিত হয়ে আরবি-পারসি শব্দবহুল হয়ে উর্দুতে পরিণত হলো এবং সেই উর্দু সমগ্র মুসলমানাধিকৃত ভারতবর্ষে প্রসারিত হয়ে শ্রীহট্টেও পৌঁছল—তবুও এ অঞ্চলের মুসলমানেরা নাগরাক্ষর একেবারে পরিত্যাগ করল না। তবে এই নাগরাক্ষরের প্রসার অনেকটা খর্ব হয়ে পড়ল। একদিকে স্থানীয় প্রচলিত ভাষা, অন্যদিকে মুসলমানদের আলোচ্য আরবি, পারসি ও উর্দু ভাষা। এই উভয় সঙ্কটে পড়ে নাগরাক্ষর হীনপ্রভ এবং শীর্ণ ও বিকৃত হতে লাগল। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এর অবস্থা দাঁড়াল এই যে, নিম্নস্তরের মুসলমানদের মধ্যে যারা বাংলা অক্ষর জানত না, তারা পরস্পরের মধ্যে চিঠিপত্রে মাত্র এই অক্ষরের ব্যবহার করত।
নাগরী সাহিত্যিকদের মধ্যে মুন্সী সাদেক আলীর নাম বহুবিশ্রুত। তার রচিত পুঁথিগুলোর মধ্যে রয়েছে—কেতাব হালতুন্নবী, মহব্বত নামা, রদ্দে কুফুর, হাশর মিছিল। কেতাব হালতুন্নবীর বর্তমান প্রকাশক মোস্তফা সেলিম গ্রন্থটির নাতিদীর্ঘ ভূমিকায় নাগরী ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে সম্যক আলোকপাত করেছেন। তার গবেষণা অনুসারে, নাগরী লিপির ব্যবহার প্রধানত সিলেটের মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। হিন্দুরা এই লিপির সঙ্গে মোটেই পরিচিত ছিল না। সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চলে—সদর, করিমগঞ্জ ও মৌলভীবাজার মহকুমায় এই লিপির প্রচলন ছিল বেশি। কাছাড় জেলায় ও ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ মহকুমায়ও একসময় অনেক অশিক্ষিত মুসলমান যারা বাংলা অক্ষর লিখতে পারত না, তারা শুধু নাগরী লিপিতেই তাদের নাম দস্তখত করতে পারত। কোনো কোনো প্রাচীন দলিলে নাগরী লিপিতে নাম দস্তখত দেখা যায়। রাজকার্যের সঙ্গে এই লিপি প্রচলনের কানো সম্বন্ধ ছিল না। নাগরী পুস্তকের মধ্যে কতকগুলো নামাজ, রোজা, হজ্ব, ইসলামি চালচলন, ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক। কতকগুলো মারফতি বিষয়ক। কতকগুলো পুঁথিতে পীর ও আউলিয়াদের জীবনী লিখিত আছে। আর কিছু পুঁথি প্রেম-উপাখ্যান। এ সকল পুঁথি অশিক্ষিত জনসাধারণকে শোকে, দুঃখে সান্ত্বনা ও বিশ্রামে আনন্দ দিয়েছে। নাগরী পুঁথি পল্লীর জীবন সরস করে পল্লীবাসীদের সাহিত্যধারা অক্ষুণœ রেখেছে। অভিজাত বংশীয়দের বাদ দিলে পল্লীবাসীর জনচিত্ত এই লিপিতে লিখিত সাহিত্যকে অবলম্বন করেই বিকাশ লাভ করে। কম পরিশ্রম ও কম সময়ে শেখা যায় বলে নারীদের মাঝেও এর বহুল প্রচার ছিল। জনসাধারণের মাঝে প্রবাদ ছিল যে, নাগরী লিপি মাত্র আড়াই দিনেই শেখা যায়। নাগরী লিপি সংযুক্ত বর্ণ ও অনেক জটিল অক্ষর থেকে মুক্ত। এ কারণেই সিলেটি নাগরী লিপি অতি সহজেই শেখা যেত।
পলাশীর যুদ্ধের পর এদেশ থেকে পারসি ও উর্দু ভাষার চর্চা উঠে গেল, তখন সাধারণ মুসলমানরা বাংলা সাহিত্যের দিকে নজর দিল। তারা দেখতে পেল বাংলা লিপি—বিশেষত সংযুক্ত বর্ণ খুবই জটিল। আবার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প-িতদের প্রভাবে বাংলা গদ্য তখন জাত বদল করেছে। ভারতচন্দ্রের ভাষাকে তখন ‘যবানী মিশাল’ বলা হচ্ছে। একে তো সিলেটের কথ্যভাষা নদীয়া-শান্তিপুরের সাধুভাষা থেকে অনেক পৃথক, তদুপরি সংস্কৃত শব্দের বহুল প্রয়োগ-নিমিত্ত ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের সাধুভাষা মুসলমানদের কাছে একেবারে দুর্বোধ্য মনে হলো। কাজেই বাধ্য হয়ে তারা নিজস্ব লিপি ও সাহিত্য সৃষ্টি করতে অগ্রসর হলো।
নাগরী সাহিত্যে রচিত পুঁথিগুলোর মধ্যে মুন্সী সাদেক আলীর কেতাব হালতুন্নবী, মহব্বত নামা, রদ্দে কুফুর, হাশর মিছিল ছাড়াও রয়েছে মহম্মদ খলিলের চন্দরমুখ, মুন্সী আব্দুল করিমের শুনাভানের পুঁথি, মুন্সী ইরফান আলীর ছয়ফুল বেদাত, ছৈয়দের রহমানের দেশচরিত, সৈয়দ শাহনূরের সাত কইন্যার বাখান এবং অজ্ঞাত লেখকের হরিণনাম, কড়িনামাসহ প্রায় অর্ধশতাধিক পুঁথি।
এই বিস্মৃত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান উৎস। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি এসব পুঁথির বেশ কটি প্রকাশ করেছে। আরো ৫০টি গ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা যায়।
প্রতিবছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে প্রচুর বই প্রকাশিত হয়ে থাকে। প্রকাশিত হয় হাজার হাজার স্বস্তা বই। বইমেলা উপলক্ষে আগমন ঘটে মৌসুমি লেখকদের। এসব জঞ্জালের ভিড়ে মোস্তফা সেলিম যে ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ নিয়েছে—এ জন্য তিনি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এই ঐতিহ্য পুনর্প্রকাশের মাধ্যমে আমরা জানতে পারব আমাদের সমৃদ্ধ অতীতকে। এ নাগরী সাহিত্য থেকে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশ যে ঐতিহ্য সম্পদের বৈভবে এক সমৃদ্ধ জনপদ। এ দেশে রয়েছে ভাষা বৈচিত্র্য। জাতি হিসেবে যে আমরা উন্মুল নই, আমাদেরও যে শক্ত শেকড় আছে—নাগরী সাহিত্যের এসব পুঁথি দ্বারা তা-ই প্রমাণ করে।

শেকড়ের সন্ধানেই আমাদের এই অভিযাত্রা
মোস্তফা সেলিম, প্রকাশক, উৎস

নাগরী সাহিত্য। ঐতিহ্যের এই আলোকিত অধ্যায় পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে উৎস যাত্রা শুরু করেছে ২০০৯ সালে। এই বিস্মৃতপ্রায় গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে সফল হয়েছি বলে মনে করি আমি। এ পর্যন্ত ৩৬টি বই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। শীঘ্রই এ গ্রন্থগুলো প্রকাশিত হবে বলে আশা করছি। এ বিষয়ে একটি ডুকুমেন্টারি নির্মাণের চেষ্টা করছি আমি। নাগরী পুঁথিগুলো অডিও সিডিতে ধারণ করে ১০০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। ২০১২ সালের মধ্যে সচেতন মানুষের কাছে ‘নাগরী লিপি ও সাহিত্য’ বিষয়টি পৌঁছে দিতে চাই। আমার স্বপ্ন হচ্ছে, প্রতিটি সচেতন মানুষের পাঠাগারে সিলেট বিষয়ক বইয়ের কর্নার প্রতিষ্ঠা করা। ‘আপনার লাইব্রেরিতে সিলেট কর্নার গড়ে তুলুন’Ñ এই সেøাগান নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে আমরা সিলেট কর্নার উদ্বোধন করতে সক্ষম হয়েছি। তার মানে এখানে আঞ্চলিকতার কোনো বিষয় নয়। একটি জনপদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এই নাগরী সাহিত্যের পুঁথিগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেয়াটাই হচ্ছে আমার লক্ষ্য। শেকড়ের সন্ধানেই আমাদের এই অভিযাত্রা।

ঘোষণা
এখন থেকে ‘বইপত্র’ বিভাগটি নিয়মিত প্রকাশিত হবে সাপ্তাহিক-এ। বই-আলোচনা প্রকাশের জন্য নিম্ন ঠিকানায় দুই কপি বই প্রেরণের জন্য আগ্রহী লেখক ও প্রকাশকদের অনুরোধ করা যাচ্ছে।
বিভাগীয় সম্পাদক
বইপত্র
সাপ্তাহিক
২৬ ইস্কাটন গার্ডেন, রমনা,  ঢাকা ১০০০
ফোন ৯৩৪৫৩৬৯, ৯৩৪৫৪৮৩
ফ্যাক্স ৯৩৩৩৩০৭
info@shaptahik.com

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাহিত্য সংস্কৃতি
  • [চারপাশ] ম্যানেজ করা কাহাকে বলে!
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive