|
আবদুল্লাহ আল-হারুন
৬ মে, ২০১০-এর সাপ্তাহিকে প্রকাশিত ড. সা’দত হুসাইনের সাক্ষাৎকারটি খুবই মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। সাধারণত সময়ের অভাবে আমি এ ধরনের লেখা পড়ি না। কিন্ত সা’দত হুসাইনের সঙ্গে আমার সামান্য ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকার কারণে তার ছবিসহ লেখাটি অনলাইনে প্রকাশিত সাপ্তাহিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তদানীন্তন পূর্র্ব পাকিস্তানে ৬৩-৬৪ সালে সা’দত হুসাইন মানিক, মাহবুবুল্লাহ, সাইফুল হক, আবদুল মান্নানÑ এ চারজনের সঙ্গে একটি বিরল সৌভাগ্যের স্পর্শে আমার মতো একজন ব্রাত্যজনের খুবই ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। এর সূত্র অবশ্য আবদুল মান্নান। ওর সঙ্গে আমি ১৯৬১ সালে জামালপুর সরকারি হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করি। আমাদের পিতৃপুরুষের বাড়িও একই জায়গায়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের, ভারতের আসাম সীমান্তে, শেরপুর থানায়। আমার সঙ্গে কিঞ্চিৎ আত্মীয়তাও আছে। সে ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষায় তৎকালীন ঢাকা বোর্ড থেকে প্রথম স্থান এবং মাহবুবুল্লাহ সম্ভবত দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং সেই সময়ের স্বতঃসিদ্ধ ও সুনিশ্চিত ক্যারিয়ার গঠনের সুদৃঢ় ভিত্তি গঠনের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অনার্স ক্লাসে ভর্তি হয়। উদ্দেশ্য একটিইÑ এম এ পাস করার পরই সিএসপি পরীক্ষা দিয়ে আমলাগিরির নিরাপদ জীবনে প্রবেশ করে, ভালো সরকারি বেতন, সুন্দরী ললনার পানি গ্রহণ, ঢাকার অভিজাত এলাকায় নিজস্ব বাসভবন এবং সন্তানসন্ততিদের ঐ একই পথে গমনের সুব্যবস্থা করা। আমাদের দরিদ্র দেশের দুশ বছর ব্রিটিশ শাসনের একটি উল্লেখযোগ্য উত্তরাধিকার, আমলাতন্ত্র। সরকারের আসল চালিকাশক্তি এরাই। সে সময় সুযোগ-সুবিধাও ছিল ষোলো আনা। পাকিস্তান আমলে আমার মহকুমা শহরে এসডিও বাহাদুর ও তার পরিবারের সেবা-যতেœর জন্য, মালী, আর্দালি চাকর, ড্রাইভার, আয়াদের সংখ্যা ছিল দু’হাতের আঙ্গুলের চাইতেও বেশি। স্বাধীন বাংলাদেশে এর কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা জানি না। দেশপ্রেম বা জনসেবা কোনোটাই সিভিল সার্ভিসে জয়েন করার মূলে কাজ করত কিনা সন্দেহ। তবে জনতার একটা বিরাট অংশের কাছে ক্ষমতা ও জাঁকজমকে এরা এক একটি ছোটখাটো দেবতা বিশেষ ছিলেন। এসডিও বাহাদুরের পরিবার একটু দেরি করে আসার জন্য, শুরু হয়ে যাওয়া সিনেমা আবার নতুন করে আরম্ভ করা হয়েছে, এ অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই আছে। ফরাস উদ্দিন আহমদ ঐ সময় অর্থনীতির সিনিয়র ডাকসাইটে ছাত্র। অর্থনীতির প্রতিভাবান ছাত্রদের মোটামুটি তিনি একজন মুরব্বিই ছিলেন। বলা হতো, সে সময় পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে প্রশাসনের চাকরি যারা পেত তাদের অর্ধেকের বেশিই ছিলেন অর্থনীতির ছাত্র। ফরাস ভাইও সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাস করে, প্রশাসনের নানা পথ বেয়ে বেয়ে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সেক্রেটারি হয়েছিলেন। এবং পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়ে রিটায়ার করেছেন। আমার চারজন বন্ধুর মধ্যে মাহবুবুল্লাহ একটু ব্যতিক্রম ছিল। সে সময় মাথা থেকে পা পর্যন্ত বামপন্থী ছাত্রনেতা সে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মেনন শাখার সে দীর্ঘদিন সভাপতি ছিল এবং খুবই সুনাম অর্জন করেছিল। ফরাস ভাইও এ দল থেকে নমিনেশন নিয়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পদে বিপুল ভোটাধিক্যে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাইফুল ছাড়া বাকি তিনজনই মেনন গ্র“প ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য ছিল। সে সময় সরকারবিরোধী বামপন্থী রাজনীতি করাটা মোটামুটি একটা ফ্যাশনও ছিল। কারণ জেনারেল আইয়ুব খান ও তার সেবাদাস গভর্নর মোনেম খানের সমর্থক ছাত্রদল জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য-সদস্যরা সাধারণ ছাত্র-জনতার কাছে খুবই অপ্রিয় ছিল। এনএসফের সদস্য হলে সুন্দরী মেয়েরাও প্রেমে পড়তে চাইতেন না বলে এ ধরনের একটা খবর চালু ছিল। হয়ত এটাও একটা অন্যতম কারণ যে রোমান্টিক ছাত্ররা সাধারণত সরকারি দল করতেন না। তবে রাজনৈতিক নীতি বা আদর্শ কোনোটাই যে অন্তত মুখ্য ছিল না, তা বোঝা যায় যখন এসব বাঘা বাঘা ছাত্ররা সিভিল সার্ভিস, পুলিশ সার্ভিসে গিয়ে আইয়ুব সরকারের সিভিল-সার্ভেন্ট হয়ে মন্ত্রী ও সরকারি রাজনৈতিক দলের নেতা-উপনেতাদের নির্দেশ বাস্তবায়িত করতে নিয়মিত তৎপর থাকতেন। এটাই নিয়ম। সরকারি কর্মচারী তো অবশ্যই সরকারের শাসনকেই বাস্তবায়িত করবেন। দেশ সেবা করার ইচ্ছা হলে, তোমার সিএসপি পরীক্ষা দেয়ার দরকারটা কি, উকিল হও, মাস্টার হও বা রাজনৈতিক দলের সর্বক্ষণিক কর্মী হয়ে থাকো। শেষের পেশায় থাকলে তো ভোটে জিতে সরকারি দলের লোক হয়ে সিভিল সার্ভেন্টদের সেবা নেয়াও সম্ভব। সা’দত হুসেনের (মানিক)-এর সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম, ‘সরকারই সব কিছুর জন্য দায়ী!’ একটি সর্বজনীন সত্যের পুনরুক্তি। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা চার বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে মন্ত্রিত্ব, উপমন্ত্রিত্ব এবং সহকারী মন্ত্রী এসব পদে যোগদান করেন। তাকে কিন্তু তার মন্ত্রণালয়ের প্রথম পাঠটি সেক্রেটারি, ডেপুটি, জয়েন্ট সেক্রেটারি, সেকশন অফিসাররাই দেন। সরকারি কর্মকা- যার কেন্দ্রভূমি সেক্রেটারিয়েট, সেখানে মন্ত্রী শুধু বাইরেই জনপ্রতিনিধি। ফাইল বা অর্ডার, নির্দেশ, সিদ্ধান্ত প্রায় সবই আমলারাই মুসাবিদা করেন। সুতাটি গুছিয়ে দেন মন্ত্রীর হাতে, তিনি তৈরি সুতাটি হাতে নিয়ে এসে প্রেস সম্মেলেনে বিবৃতি দেন বা কাগজে সাক্ষাৎকার দেন। কারণ ব্যাপারটি তো তারই মন্ত্রণালয়ের! মন্ত্রীদের সবারই তো আর প্রশাসনিক জ্ঞান থাকে না। এ জন্যই প্রায় সরকারই, গুরুত্বপূর্ণ পদে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের নিয়োগ করেন। রাষ্ট্রীয় মেশিনারির সব কিছুতেই অর্থাৎ সব সময়ে সব সরকারের মূল ভিত্তিটিই হলো বিসিএস (আগেকার সিএসপি) পরীক্ষায় পাসকরা আমলাগণ। সা’দত হুসাইনের কথা, ‘আমাদের সবকিছুই সরকারের ওপর নির্ভরশীল!’ নতুন কোনো তথ্য নয়। পৃথিবীজুড়ে সব দেশেই সরকারই তো প্রধান চালিকাশক্তি। সামরিক, বেসামরিক, রাজকীয় বা ধর্মীয় সব রাষ্ট্রেই সরকার প্রধান প্রশাসনিক ধাপ। খ্রিস্টপূর্ব তিনশ-চারশ বছর আগে প্লেটো, এরিস্টটল প্রমুখ গ্রিক দার্শনিকরা প্রথম জনগণের সরকারের রূপরেখা দেন। তাদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রোমের সাধারণ নাগরিকরা শক্তিশালী সিজারের পাশাপাশি একটি কর্মক্ষম সিনেটও রাজপ্রাসাদের পাশেই গড়ে তোলেন। যতই ষড়যন্ত্র আর গোপন হত্যা হয়ে থাক না কেন, তৎকালীন গ্রিসই যে বর্তমান গণতন্ত্রের সূতিকাগার, এ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে তেমন মতভেদ নেই। সেই আদর্শেই গণতন্ত্র ইউরোপে এখন এমন একটা পর্যায়ে উঠেছে যে একনায়কত্ব, সামরিক শাসন, বর্ণবাদ, সর্বস্তরে রাজনৈতিক দুর্নীতি, মৌলবাদ এসব এখনকার প্রজন্মের কাছে সবই তৃতীয় বিশ্ব, এশিয়া-আফ্রিকার ব্যাপার। গ্রিসে সত্তর দশকেও রাজতন্ত্র ছিল কিন্তু রাজা আর নেই। এখন আছে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন, ডান-বাম-মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল। নিয়মিত নির্বাচন হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ আর শ্রমিক এতই শক্তিশালী যে গত ২০/২৫ বছর ধরে তারা নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায় করে যে এখন কয়েক হাজার কোটির ঋণে আবদ্ধ হয়ে লেজে গোবরে অবস্থা। বাকি সবগুলো ইইসি দেশ, আইএমএফ সমানে টাকা দিয়েও এ বাঁধভাঙ্গা স্রোত বন্ধ করতে পারছে না। আমার এটা বলার একটাই উদ্দেশ্য, গ্রিসের কিন্তু নির্বাচিত সরকার সব সময় আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর রিব“দ্ধে তেমন দুর্নীতির অভিযোগ নেই। এখানে ধরতে গেলে জনগণের একটা বড় অংশই, যোগ্যতার চাইতে বেশি বেতন নিয়েছে, দেশের প্রকৃত আর্থিক ক্ষমতার ঊর্ধ্বে জীবনযাপন করে দেশকে দেউলিয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের দেশে শোষণ করে একটা ক্ষুদ্র অংশ, আর গ্রিসে জনগণই জনগণকে শোষণ করেছে। হারাকিরির মতোই! এর বিকল্প কি? ঐ সরকারই। গ্রিস সরকারই এখন নানা ব্যয় সংকোচের ব্যবস্থা নিয়ে, সরকারি চাকরির নানা সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে, কর বৃদ্ধি করে সামাল দিচ্ছে। অর্থাৎ যোগ্য হোক আর অযোগ্য হোক, সরকার ছাড়া কোনো দেশেরই আর কোনো বিকল্প পন্থা নেই। সরকারহীন দেশের যে কি ভয়াবহ অবস্থা তা সোমালিয়া, ইয়েমেন, কাবুল-সর্বস্ব সরকার বাদ দিলে আফগানিস্তানের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন গণতন্ত্রের একটি সহজ সংজ্ঞা দিয়ে গেছেন। ‘এড়াবৎহসবহঃ নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব।’ অনেকদিন আগের শোনা, প্রিপোজিশনগুলোর স্থান এদিক-ওদিক হয়ে থাকবে। কিন্তু সাজানো ভুল হলেও বক্তব্য ঠিকই আছে। জনগণের জন্য সরকার, জনগণের দ্বারা (নির্বাচিত) সরকার, জনগণের পাশেই থাকবে সরকার! এখন এ ফর্মুলায় আমাদের দেশের কি অবস্থা? ইউরোপ-আমেরিকার প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রের কি চিত্র? আমাদের দেশে সেই ১৯৯১ সাল থেকে (মাঝে কয়কটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাদ দিলে), ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচন হয়ে আসছে। কিছুটা সাপলুডু খেলার মতোই, দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল দুদিকে বসে খেলছেন। একবার একজন সাপের পেটে তো আরেকজন মই বেয়ে (নির্বাচনে জিতে) ১০০-এর ঘরে পৌঁছে গেলেন। তবে এখানেও দাবা খেলার মতো রেমি হয়ে আছে। দুটি দলই দুবার করে ক্ষমতায় গেছে। অর্থাৎ আমাদের গণতন্ত্র হলো কিছুদিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তারপর নির্বাচন। থাড়াবড়িথোর, থোড়বড়িথাড়া! আমরা প্রতি নির্বাচনেই ‘থুক্কু’ দিয়ে নতুন করে খেলাটি শুরু করি। কিন্তু ঘুরে ফিরেই নতুন বোতলে পুরনো মদই পরিবেশিত হচ্ছে। সরকার বদলায় কিন্তু অভাগা মানুষের ভাগ্য আর বদলায় না! গণতন্ত্র আর সরকারের কোনো সমন্বয় নেই। গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটা মহা বৈপরীত্য। আমলারা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পেনশন পর্যন্ত নানা সরকারি দায়িত্ব (প্রোজেক্ট দেখাশোনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথা মন্ত্রীদের পরামর্শ দান ও সেবা ইত্যাদি) পালন করেন। তারা নির্বাচনের মাধ্যমে আসেন না। কাজেই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নন। মুশকিল মন্ত্রীদেরই, আমলা ছাড়া ফাইল চলে না, তাদের পরামর্শ ছাড়া বলতে গেলে দেশের কোনো কাজই হয় না। কিন্তু নির্বাচনের সময় তাদেরই আসন টলমল। যাদের কথা শুনে সেক্রেটারিয়েটে বসে দেশের সেবা(!) করলেন চার বছর, তারা অটল, অনড়। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হলে, গড়ে একজন আমলা পেনশন পর্যন্ত অন্তত ৭-৮টি নির্বাচন উপভোগ করেন। সরকার বদল দেখেন। হাওয়া বুঝে ছাতা ধরেন। যারা সৌভাগ্যবান, পেনশনের পরও, বড় বড় ডেপুটেশনে নিয়োগ পান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় উপদেষ্টা (কাম মিনিস্টার) বা বিদেশে রাষ্ট্রদূত এর চাকরি পান। অনেকে (রিটায়ার করার পরেও) নির্বাচিত-রাজনৈতিক সরকারের সময়ও নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল হন। আর ওদিকে আমেরিকায় নতুন প্রেসিডেন্ট এলেই হোয়াইট হাউসে শুধু প্রেসিডেন্টের নিজস্ব স্টাফই বদলে যায় না, সারা দেশে হাজার ত্রিশেক নতুন আমলা, অনেকেই নতুন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দলের সদস্য নিযুক্তি পান। শুধু তাই নয়, আমেরিকায় শেরীফ (আমাদের দেশে থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার) স্থানীয় জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। থানার প্রধান, স্থানীয় লোক, ওখানেই জন্ম হয়ে সে বড় হয়েছে। অর্ধেক লোকই তার আত্মীয়, বন্ধু। দুর্নীতির একটা বাধা ওখানেই। নিজের ঘরে খুব কম লোকই চুরি করে! সরকারি উকিলও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। জার্মানিতে কোনো শহরেই ডিসি বাহাদুর বা এসডিও বাহাদুর নেই। আছে বুর্গারমাইস্টার (মেয়র)। বিশ হাজারের বেশি লোকসংখ্যার শহরে জনতার ভোটে নির্বাচিত হন ওবারবুর্গারমাইস্টার (মহা-মেয়র), তার নিচের শহরে বুর্গারমাইস্টার এবং পাঁচ হাজারের নিচে অর্টসফোরস্টেহার (নগরাধিপ)। সব পদগুলোরই নির্বাচন হয় প্রতি পাঁচ বছর পর পর। জনগণের প্রত্যক্ষ নির্বাচনে সবচাইতে বেশি ভোট পেয়ে এরা পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। এরাই পাঁচ হাজারী শহরের নিচে সিও (উন্নয়ন) বা টিইউসি, তারপরে মহকুমা লেভেলে এসডিও এবং বিশ হাজারী (এবং ঊর্ধ্বে) শহরের ডিসি বাহাদুর। তার এলাকার পুলিশের নিযুক্তি তিনি দেন। সমস্ত প্রশাসনিক, সংস্কার, উন্নয়ন, লেখাপড়া, খেলাধুলাÑ সব কিছুই তার তার প্রত্যক্ষ দায়িত্বে। শহর কমিটির নির্বাচিত সদস্য-সদস্যাদের নিয়ে তিনি এলাকার সার্র্বিক প্রশাসন চালিয়ে থাকেন। তারা ৯৫% জনই রাজনৈতিক দলের সসদ্য। বড় বড় শহরে রাজনৈতিক দলের সবাই যার যার প্রার্থী দেন। দলের অনুমোদন ছাড়া এসব জায়গায় নির্বাচিত হওয়া দুরূহ ব্যাপার। হঠাৎ একাধজন নির্দলীয় পার হন। ছোট ছোট শহরে (থানা লেভেলে), নির্দলীয় বা স্থানীয় অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত তথাকথিত নাগরিক কমিটির প্রার্থীরা অনেক সময় নির্বাচিত হন। কাজেই সমস্ত শহর, মহকুমা বা থানায় সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যক্তিটি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এবং স্থানীয়। অনেক সময় আশপাশের শহর থেকেও প্রার্থী নিয়ে আসা হয়। অনেক রাজনৈতিক দল স্থানীয়ভাবে কোনো ভালো প্রার্থী না পেলে অন্য জায়গা থেকে এনে মনোনয়ন দেন। অনেক সময় বড় কোনো রাজনৈতিক দলও প্রতিপক্ষের মনোনীত প্রার্থীকে হারানোর জন্য জনপ্রিয় নির্দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন করেন। মোটকথা, প্রশাসনের কোনো ক্ষেত্রেই, কেন্দ্রীয় সরকার, প্রাদেশিক সরকার, জেলা, মহকুমা, থানা বা গ্রামেও নির্বাচন ছাড়া কারও ক্ষমতা পাবার কোনোই সুযোগ নেই। জার্মানিতে কোনো বিসিএস জাতীয় সিস্টেম নেই। ‘স্টাটস-এক্সামিন’ বলে একটা পরীক্ষা দিয়ে যার ন্যূনতম যোগ্যতা আছে (আবিটুর, আমাদের ইন্টারমিডিয়েট), সে (বয়েস লিমিট ৩৫) কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নানা চাকরিতে প্রথমে ছোট পদে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে সেক্রেটারি পর্যন্ত হতে পারে। তবে এসডিও বা ডিসি জাতীয় প্রশাসনিক চাকরি পেেেত হলে তাকে পদত্যাগ করে নির্বাচনের মাধ্যমে আসতে হবে। প্রাদেশিক সরকারও ঐ প্রদেশেরই লোকজনকে সরকারি পদে নিয়োগের জন্য অগ্রাধিকার দেন। বদলি বলে কোন শব্দ এখানে শুনিনি। চাকরি জীবনের শুরুতে প্রাদেশিক সরকারে বহাল হয়ে আমলারা (যাদের জন্মও এ প্রদেশেই) রিটায়ার করেছেন, তার উদাহরণ সর্বত্র। এদের বেআমতে (বাংলায় আমলা বলা যেতে পারে) বলা হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষয়িত্রীরাও এখানে বেআমতে। দু’দলেরই পেনশন, চাকরিবিধি, বেতন সব এক। তবে সরকার বদল হলে, মন্ত্রীরা আমেরিকান কায়দায় সেক্রেটারি থেকে নানা দায়িত্বপূর্ণ কাজে আগের লোক সরিয়ে দিয়ে নিজের দলের লোক নিয়ে থাকেন এবং সেও জানে, চার বছর পরে সরকার বদল হলে তাকেও সরে যেতে হতে পারে। কাজেই স্বল্প সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করার মতো পরিবেশ সে গুছিয়েই উঠতে পারে না! এ ধরনের মতলব নিয়ে কেউ এখানে সরকারি চাকরি করে না। গণতন্ত্র আর রাজনীতির সমন্বয় কি করে সম্ভব? আমাদের দেশে এটা কি আদৌ সম্ভব? কিন্তু লিংকনের গণতন্ত্র যা ১০০% জনগণের, তাকে প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না করতে পারল প্রশাসন কোনোদিনই জনগণের হবে না। ব্যক্তিবিশেষের (বা রাজনৈতিক দলের) স্বার্থসিদ্ধিরই উপায় হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল আমল তো এখন অনেকেই ভুলে গেছেন। ঐ সময় জেলা গভর্নরের পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রথমবার বঙ্গবন্ধু তাদের মনোনীত করেন। পরবর্তী পর্যায়ে তাদের নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্তির কথা ছিল। এরা সবাই ছিলেন স্থানীয়। ঐ জেলাতেই তাদের জন্ম, রাজনীতিও ওখানে। ব্রিটিশ আমলের উত্তরসূরি, পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস, পরে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এর চাকরিবিধি, মূলত বেতন, টিএ বিল, নানা সুযোগসুবিধা, বাড়ি-গাড়ি এবং ট্রান্সফার নিয়েই বৃত্তায়িত। একজন অস্থানীয় ব্যক্তি প্রশাসনে কতটা একান্ত হবেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তার বাড়িতে ঢোকার নানা বিধি নিয়ম। চাকর আর্দালি, সিকিউরিটি বডি গার্ডের ভিড়ে, সাধারণ একটি লোক কোনোদিনই সাহস পায় না তার কোয়ার্টারে ঢুকে তার কথাটি জানাতে। কিন্তু স্থানীয় গভর্নরকে সে কিন্তু জন্ম থেকেই চেনে। যদি আমাদের দেশেও এক সময়ে স্থানীয় প্রধান প্রশাসনিক ব্যক্তিটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, তাকে সরাসরি তার জন্মস্থানের জনগণের কাছে দায়ী থাকতে হবে! কিন্ত একজন অন্য জেলার এসডিও বা ডিসির সে দায়বদ্ধতা নেই। উনি যদি সুশাসক হোন তো সেটি তার মানবতা বা মায়া দয়া এবং এলাকার জনগণের সৌভাগ্য! কিন্তু তার প্রশাসনিক এলাকার প্রতি কোনোদিনই কি তিনি শেকড়বদ্ধ হয়ে জনগণের প্রেমিক হবেন? এ মানবিকভাবেই অসম্ভব। আংগুর সব সময় রপ্তানি করতে হবে। আমাদের দেশে এর ফলন কোনোদিনই হবে না। আমাদের আমলা-প্রশাসকরা সবাই এমনি রপ্তানি হয়ে একটি স্থানে একটা সময় টেবিল চেয়ারে বসে, সরকারি বাসভবনে বসবাস করে পরবর্তী ট্রান্সফারটির অপেক্ষা করেন। মূল কাজ ফাইল সই আর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে মালা গলায় দিয়ে বক্তৃতা করা। তিনি জানেন না, তার কোয়ার্টারের সামনে বা অফিসের নামনে এত বড় আমগাছটি একদিন কে লাগিয়েছিল, কিভাবে ওটা বড় হলো। ঐ যে বৃদ্ধ লোকটি ন্যুব্জ দেহে রাস্তা দিয়ে মাথা নিচু করে বয়সের ভারে বেঁকে যাওয়া শরীরটি নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে, সে এক সময় স্থানীয় স্কুলের ডাকসাইটে মাস্টার ছিল! আজ ওর জায়গায় যদি তার একজন ছাত্র বা ছাত্রী এ শহরের প্রশাসক হতো, তার শেষ বয়সে এই নিঃসহায় অবস্থায় তার কিছু না কিছু ব্যবস্থা হতোই। আমাদের দেশের আমলারা, বিদেশে অভিবাসীদের মতোই। বছরের পর বছরের থেকেও, নাগরিকত্ব পেয়েও, মূল স্রোত থেকে সর্বদা বিচ্ছিন্ন! কাজ করে টাকা কামানো ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই। দীর্ঘদিনের প্রিয় প্রতিবেশীও কখনই ভোলে না যে এটা তার জন্মভূমি নয়। ভোট দিতে গেলেও, সবাই আশ্চর্য হয়, এ ব্যাটা এখানে কি করতে এসেছে? কাগজে-কলমে স্বীকৃতি আছে। আইনে তার সমানাধিকার সুনিশ্চিত, কিন্তু সামাজিক দূরত্বটি কখনই কমে না! পকেটে বিদেশি পাসপোর্ট, ব্যস ঐ পর্যন্তই! পুরনো বন্ধু সা’দত হুসাইনকে আমার একটাই অনুরোধ, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রধান হিসেবে অন্তত এ সুপারিশটি সে কি সরকারকে করতে পারে, পাস করা বিসিএস অফিসারদের বেশ কিছুদিন তার জন্মস্থানে চাকরি করতে হবে? এবং ধীরে ধীরে এটাই আমাদের দেশে প্রধান চাকরিবিধি করতে হবে? তা হলেই হয়ত তার সাক্ষাতকারটির প্রধান বক্তব্য, ‘আমাদের সবকিছুই সরকারের ওপর নির্ভরশীল...’ কথাটির মূল অর্থটি বাস্তবায়িত করা সম্ভব। এখনকার সরকারপ্রধানের পিতাই এক সময়ে জেলা গভর্নর প্রথা আমাদের দেশে প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। হয়ত তার সরকার এটা আন্তরিকতার সঙ্গে বোঝার চেষ্টা করবেন। যে গাছ বড় হয়ে গেছে তার শিকড় উপড়ে অন্যত্র পোঁতার চাইতে যেখানে তার জন্ম, তাকে সেখানেই থাকতে দিলে, সে ফুলে-ফলে বাড়তেই থাকবে। এবং এটাই প্রকৃতির নিয়ম। alharun@gmx.de |