|
মোহাম্মদ সোহেল ইসলাম
‘আজ তুমি কত দূরে মুছে গেছ মরণে নেই কাছে, তবু আছ ব্যথা ভরা স্মরণে তার ভুবনভোলানো হাসি, রোমান্টিক ম্যানারিজমস, চোখের দৃষ্টি আর অতুলনীয় অভিনয়ে তিন প্রজš§ পেরিয়ে এসেও আজো উত্তমেই বুঁদ হয়ে আছে বাঙালি দর্শক। ‘ওঁর মতো স্টার আর হবে না। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের দিকপাল সে’Ñ উত্তমের সম্পর্কে এমনটিই বলেছিলেন সত্যজিৎ রায়। বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি উত্তম সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়ের মন্তব্য, ‘উত্তমের চলে যাওয়া বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের আলোকবর্তিকার মৃত্যু। তার মতো অন্য কোনো নায়ক বাংলায় আসেনি আর আসবেও না কোনোদিন।’ উত্তম কুমার শুধু অভিনেতাই নন, এক চরিত্রস্রষ্টাও। এতেই তার এত জনপ্রিয়তা। বাংলা চলচ্চিত্রের অদ্বিতীয় নায়ক তিনি। সবার চেয়ে অগ্রগামী। একজন সর্বজনপ্রিয় রোমান্টিক হিরো সম্পর্কে এটাই হয়ত শেষ কথা নয়। পর্দার বুকে ফেইড ইন-ফেইড আউটের বাইরে, সকলের দৃষ্টির বাইরেও হয়ত একজন নায়ক আছে। যে নিজের কাছেও সর্বাংশে নায়ক। উত্তম কুমারও হয়ত তাই। সেটাই তার শক্তি! অবশ্য উত্তম কুমারের অভিনয় প্রতিভা নিয়ে কারো প্রশংসা বা সার্টিফিকেটের দরকার হয় না। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন অরুণ কুমার চ্যাটার্জী অর্থাৎ সিনেমার উত্তম কুমার। সাউথ সুবারবন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। অল্প বয়সে চাকরিতে ঢোকার ফলে গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করতে পারেননি। কলকাতার পোর্ট-এ কেরানির চাকরি দিয়ে শুরু। অপেশাদারভাবে মঞ্চে অভিনয়ও করতেন। প্রথম ছবি ১৯৪৮ সালে নীতিন বসুর ‘মায়াডোর’। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি। পরবর্তীতে মুক্তি পায় ‘দৃষ্টিহীন’ ছবিটি। শুরুর দিকের ছবিগুলো ব্যর্থ হলেও প্রথম জনপ্রিয় ছবি ‘বসু পরিবার’ মুক্তি পায় ১৯৫২ সালে। ১৯৫৩ সালে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে প্রথম আবির্ভাব ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। এই ছবিটি ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে কিছুদিনের জন্য পেশাদারী মঞ্চে অভিনয় করেন- স্টারথিয়েটারে ‘শ্যামলী’ নাটকে। ১৯৫৭ সালে অজয় কর নির্মিত ‘হারানো সুর’ ছবিটি পুরো ভারতের দর্শকদের মনে দোলা দেয়। অর্জন করেন রাষ্ট্রপতির সার্টিফিকেট অব মেরিট পুরস্কার। মজার বিষয় হচ্ছে, এই ছবির প্রযোজক ছিলেন উত্তম কুমার নিজেই। তারপর থেকে উত্তম-সুচিত্রা রোমান্টিক জুটির একের পর এক ছবি হিট হতে থাকে। শাপমোচন, সপ্তপদী, হারানো সুর, চাওয়াপাওয়া, অগ্নিপরীক্ষা, পথে হলো দেরি, সাগরিকা ইত্যাদি। সুচিত্রা সেন ছাড়াও তিনি অন্য নায়িকাদের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন। যেমন সুপ্রিয়া চৌধুরী, মাধবী মুখার্জী, সাবিত্রী চ্যাটার্জী, অপর্না সেন, শর্মিলা ঠাকুর এবং আরো অনেকে। রোমান্টিক নায়ক ছাড়াও অন্যান্য চরিত্রেও তার দক্ষতা অবিস্মরণীয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে নায়ক অরিন্দম মুখার্জীর ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেন তিনি। ১৯৬৬ সালে ‘নায়ক’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ফিল্ম সাংবাদিক সমিতি থেকে শ্রেষ্ঠ নায়কের পুরস্কার লাভ করেন। সত্যজিৎ-এর চিড়িয়াখানা ছবিতে ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বকশীর ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। তার প্রযোজিত হিন্দি ছবি ‘ছোটি সি মুলাকাৎ’ ১৯৬৭ মুক্তি পেয়ে ‘ভরত পুরস্কার’ পেল। তিনি কয়েকটি ছবিও পরিচালনা করেন। ১৯৬২ সালে স্ত্রী গৌরির সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় উত্তমের। একমাত্র ছেলে গৌতম তখন দার্জিলিং-এ অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ‘বসু পরিবার’ ছবি থেকে নায়িকা সুপ্রিয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। উত্তম- সুপ্রিয়া তিন নং ময়রা স্ট্রীটের ফ্ল্যাটে সতেরো বছর কাটিয়ে ছিলেন। উত্তম কুমারের অভিনীত ছবির সংখ্যা একশ’রও বেশি। দেশের বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়ে নিউইয়র্ক, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের অতিথির সম্মানও অর্জন করেছিলেন মহানায়ক। অতিরিক্ত কাজের চাপ ও অস্বস্তি থেকে কার্ডিয়াক এবং এ্যাজমায় আক্রান্ত হন উত্তম কুমার। ১৯৮০ সালের ২৩ জুলাই ‘প্রতিশোধ’ ছবির শূটিং শেষে পানাহার করে রাতে ঘরে ফিরে এলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছয়-সাত জন ডাক্তারের অক্লান্ত পরিশ্রমকে ব্যর্থ করে ২৪ জুলাই রাত ৯-৩২ মিনিটে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানক্ষত্র খসে পড়ল। সহস্র কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘যুগ যুগ জিও গুরু, যুগ যুগ জিও।’ |