|
অটিজম বহুমাত্রিক বিকাশজনিত সমস্যা যার ফলে বিশেষ করে স্নায়ুবিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি। এ সমস্যার কারণে বাচ্চাদের সামাজিক দক্ষতা, যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা ও একই আচরণের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়। প্রতি হাজারে ১-২ জন বাচ্চা অটিজমে আক্রান্ত। অটিজমের জোরালো জেনেটিক ভিত্তি রয়েছে। অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হলো জন্মগত ত্র“টি সৃষ্টিকারী পদার্থ, পরিবেশগত উপাদান যেমন ভারী ধাতব পদার্থ, কীটনাশক এবং শৈশবকালীন ভ্যাকসিন ব্যবহার ইত্যাদি। অটিজম বাচ্চাদের শিক্ষাক্ষেত্র, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করে। কিন্তু সচেতনতার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে বেশিরভাগ মানুষ অটিস্টিক বাচ্চাদের চিকিৎসা নেয় না। এই সাধারণ মানসিক সমস্যা নিয়ে সাপ্তাহিক প্রতিবেদককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানিয়েছেন বিশিষ্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এ্যান্ড হেড অব সাইকোথেরাপি, ডা. মোহিত কামাল। তিনি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে কর্মরত আছেন। একজন সফল চিকিৎসকের পাশাপাশি কথা সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্বকৃত নোমান
সাপ্তাহিক : অটিজম কি? ডা. মোহিত কামাল : অটিজম হলো প্রধানত স্নায়ুর বিকাশজনিত রোগ যার ফলে একটি শিশুর সামাজিক যোগাযোগ এবং সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একই আচরণ বা কাজ বার বার করে। এই রোগের লক্ষণ শিশুর ৩ বছর বয়সের পূর্বেই দেখা যায়। যে শিশু আপন মনে চিন্তা করে কিন্তু আশপাশের অন্যের কথার প্রতি মনোযোগ দেয় না বা যোগাযোগ করে না তাকে অটিজম (স্বতঃচিন্তন) বলা হয়। সাপ্তাহিক : অটিস্টিক বাচ্চাদের কি কি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়? ডা. মোহিত কামাল : সামাজিক যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত থাকে। আগ্রহের অভাব এবং একই কাজ/আচরণ বার বার করার প্রবণতা দেখা যায়। একাকীত্ব, ভাষার ক্ষমতা সীমিত, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। একটি চাহিদা বাধ্যতামূলকভাবে তাদের পেয়ে বসে যে, তাদের চারপাশে যা আছে তা হুবহু এক থাকুক, এতে কোন পরিবর্তন হতে দেয়া যাবে না। সমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য যে স্বাভাবিক যোগাযোগ তা ভালোভাবে বেড়ে ওঠে না। একইভাবে মাথা ঘোরানো, শব্দ করা। যে কোনো কিছু করার জন্য একটি নিয়ম অনুসরণ করে, যেমনÑ যে কোনো কিছু একটি সোজা লাইন ধরে করবে বা খেলনা, টিভি ও যে কোনো আনন্দদায়ক বিষয়ের প্রতি আগ্রহ কম থাকে। সাপ্তাহিক : অটিস্টিক বাচ্চাদের সামাজিক দক্ষতায় কি কি অভাব দেখা যায়? ডা. মোহিত কামাল : লোকজনের উপস্থিতি সম্পর্কে উদাসীন। আবেগীয় দূরত্ব বজায় রাখে। চোখে চোখে তাকায় না । জড়িয়ে ধরলে স্নেহ বা আগ্রহ প্রকাশ করে না। আদর বা স্নেহ আগ্রহবোধ করে না। স্নেহ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। সাপ্তাহিক : অটিস্টিক বাচ্চাদের যোগাযোগে ও ভাষাগত কি সমস্যা থাকে? ডা. মোহিত কামাল : ভাষার বিকাশ দেরিতে হয় অথবা সম্পূর্ণভাবে ভাষার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ বাচনভঙ্গি থাকে না, কথা শুরু করা এবং কথোপকথন চালিয়ে যাবার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাষার পুনরাবৃত্তি । বিকাশের পর্যায় অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত খেলা অথবা সামাজিকভাবে অনুকরণমূলক খেলার দক্ষতার যথোপযুক্ত অভাব থাকে। সাপ্তাহিক : অটিস্টিক বাচ্চাদের আচরণগত কি কি সমস্যা? ডা. মোহিত কামাল : একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি করা, সীমাবদ্ধ এক অথবা অধিক গৎবাধা এবং আগ্রহের বিষয়বস্তু নিয়ে সর্বক্ষণিক চিন্তা করা যা তীব্রতা অনুযায়ী অস্বাভাবিক। ধর্মীয় অথবা কোনো নির্দিষ্ট অকার্যকর বিষয়বস্তুর প্রতি কঠিন আনুগত্য প্রকাশ করা। একই ধরনের শারীরিক অঙ্গভঙ্গির পুনরাবৃত্তি করা। কোনো কোনো জিনিসের টুকরা নিয়ে ব্যস্ত থাকা বা সর্বক্ষণিক চিন্তা করা। সাপ্তাহিক : এ্যাসপারজার সিনড্রোম কি? ডা. মোহিত কামাল : এ্যাসপারজার সিনড্রোমে বাচ্চার সামাজিক অন্তঃক্রিয়ায় বড় ও বহুমাত্রিক ধরনের সমস্যা থাকে এবং একই ধরনের আচরণ করার প্রবণতা দেখা যায়। সাপ্তাহিক : বাবা-মা কখন তাদের সন্তানের সমস্যা বুঝতে পারে? ডা. মোহিত কামাল : অটিজম রোগের লক্ষণ শিশুর ৩ বছর বয়সের পূর্বেই দেখা যায়। অটিজমের ফলে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, ভাষার বিকাশ এবং অনুকরণমূলক/প্রতীকী খেলাধুলা দেরিতে হয় অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলোর মধ্যে যে কোনো একটি লক্ষণ দেখা গেলে বাবা-মাকে বুঝতে হবে তাঁদের সন্তানের সমস্যা রয়েছে। সাপ্তাহিক : অটিজমের প্রারম্ভিক লক্ষণগুলো কি কি? ডা. মোহিত কামাল : সামাজিক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমবয়সীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করতে সমস্যা হবে। নিজের আনন্দ, আগ্রহগুলো অন্যের সঙ্গে ংযধৎব (ভাগাভাগি) করার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব থাকবে। অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ভাষার বিকাশ দেরিতে হবে অথবা একেবারেই ভাষার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই ধরনের কাজ অথবা একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। সাপ্তাহিক : কত বছর বয়সে বাচ্চাদের অটিজম ধরা পড়ে? ডা. মোহিত কামাল : অটিজম রোগের লক্ষণ বাচ্চার ৩ বছর বয়সের পূর্বেই দেখা যায়। প্রায় অর্ধেক বাবা-মা বাচ্চার ১৮ মাসের পূর্বেই তাদের সমস্যা বুঝতে পারে এবং প্রায় ৪/৫ ভাগ বাবা-মা বাচ্চার বয়স ২৪ মাসের পূর্বে আচরণগত সমস্যা সম্পর্কে বুঝতে পারে। সাপ্তাহিক : অটিজম তাড়াতাড়ি নির্ণয় করা কেন গুরুত্বপূর্ণ ? ডা. মোহিত কামাল : অটিজম যত দেরিতে নির্ণয় করা হবে ততই বাচ্চার রোগের তীব্রতা বেশি হবে, রোগের লক্ষণগুলো বাড়বে। তাই যত তাড়াতাড়ি অটিজম নির্ণয় করা যাবে তত তাড়াতাড়ি সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে। সাপ্তাহিক : অটিজম কিভাবে নির্ণয় করা যায়? ডা. মোহিত কামাল : বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবার অথবা চিকিৎসক বাচ্চার মধ্যে অটিজমের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে অটিজম রোগীকে শনাক্ত করে। এ ছাড়াও নিম্নোক্ত যে কোনো লক্ষণ বাচ্চার মধ্যে দেখা গেলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে : ১২ মাস বয়সের মধ্যে কোনোরকম শব্দ উচ্চারণ না করা । ১২ মাস বয়সের মধ্যে কোনো ধরনের ইঙ্গিত না দেখানো/অঙ্গভঙ্গি না দেখানো। ১৬ মাস বয়সের মধ্যে কোনো ধরনের শব্দ উচ্চারণ না করা । ২৪ মাস বয়সের মধ্যে ২টি জটিল শব্দ বলতে না পারা। যে কোনো বয়সে ভাষার যোগাযোগে সমস্যা এবং সামাজিক দক্ষতার অভাব। এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে অটিজম নির্ণয় করা যায়। যেমনÑ অঁঃরংস উরধমহড়ংঃরপ ঙনংবৎাধঃরড়হ ঝপযবফঁষব (অউঙঝ) । বাচ্চাদেরকে পর্যবেক্ষণ এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অটিজম নির্ণয় করা যায়। সাপ্তাহিক : অটিজম শনাক্ত হওয়ার পর বাবা-মার প্রথমে কি করা উচিত? ডা. মোহিত কামাল : অটিজম শনাক্ত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব বাবা-মায়ের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। অটিজমের লক্ষণ শিশুর ৩ বছর বয়সের পূর্বেই দেখা যায়, কিন্তু অনেক সময় বাবা-মা এটা শনাক্ত করতে পারেন না, কেউ কেউ অনেক দিন পরে সচেতন হয় যে বাচ্চার মধ্যে কিছু সমস্যা রয়েছে। সাপ্তাহিক : সাধারণ বাচ্চাদের তুলনায় অটিস্টিক বাচ্চাদের শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে কি কি পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়? ডা. মোহিত কামাল : সাধারণ বাচ্চাদের সামাজিক যোগাযোগের ভাষার বিকাশ তাড়াতাড়ি হয়। এসব ক্ষেত্রে অটিস্টিক বাচ্চাদের বিকাশ দেরিতে হয় তাই অটিস্টিক বাচ্চাদের শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা জিনিস হাতে কলমে শেখাতে হয় এবং এক মাসে একাধিক বিষয় তাদেরকে শেখানো যায় না, একটা-একটা করে শেখাতে হয়। সাপ্তাহিক : বাবা-মা কিভাবে বুঝতে পারে তাদের সন্তানের জন্য কোন চিকিৎসা সবচেয়ে ভালো? ডা. মোহিত কামাল : যে সব চিকিৎসার মাধ্যমে বাচ্চার : স্কুলের কার্যকারিতা উন্নতি করবে। বুদ্ধির উন্নতি করবে। নিজের যতœ নিতে শিখবে। সামাজিক যোগাযোগে দক্ষতা বাড়বে। অটিজমের লক্ষণগুলোর তীব্রতা কমবে। অস্বাভাবিক আচরণের উন্নতি ঘটবে, তাহলেই বোঝা যাবে তাদের সন্তানের জন্য ওই চিকিৎসা ভালো । সাপ্তাহিক : যদি একাধিক চিকিৎসা নেয় সেক্ষেত্রে বাবা-মা কিভাবে বুঝতে পারে কোনটা তাদের সন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালোভাবে সাহায্য করছে? ডা. মোহিত কামাল : কোনো একক চিকিৎসায় খুব ভালো হবে তা নয়, চিকিৎসা মূলত বাচ্চার রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী দেয়া হয়। সাপ্তাহিক : পরিবার এক্ষেত্রে কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে? ডা. মোহিত কামাল : পরিবার এবং তাদের শিক্ষার পদ্ধতিই চিকিৎসার মূল উৎস। এক্ষেত্রে পরিবার : সামাজিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ বলবর্ধক প্রশিক্ষণ যোগাযোগের দক্ষতার প্রশিক্ষণ নিজের যতেœর প্রশিক্ষণ দৈনন্দিন কাজের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে।
ডা. মোহিত কামাল এ্যাসেসিয়েট প্রফেসর এ্যান্ড হেড অব সাইকোথেরাপি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট শেরে বাংলা নগর, ঢাকা- ১২০৭ চেম্বার ল্যাবএইড লিমিটেড (এনেক্স) বাড়ি-১, রোড-৪, ধানম-ি, ঢাকা-১২০৫৫ ফোন : নাম রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৮৬১০৭৯৩-৮, ৯৬৭০২১০-৩, ৮৬৩১১৭৭ |