Logo
 বর্ষ ৩ সংখ্যা ১০ ৮ই শ্রাবণ, ১৪১৭ ২২ জুলাই, ২০১০ 
আপনি এখন পুরোনো সংখ্যায় আছেন ! তারিখ : ২২ জুলাই, ২০১০
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
শোষিত মানুষের অশ্র“ভেজা মুখ  

অ স্ট্রে লি য়া


শাখাওয়াৎ নয়ন

দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরেছি। রাত্রি দ্বিপ্রহর। এয়ারপোর্ট থেকেই নানা রকম ডিজিটাল-এনালগ ধাক্কাধাক্কি-অন্যায়-অনিয়ম। বিস্ময়ে কখনো দুই ভ্রু এক। কখনো হতবাক। কি আর করা? ঢাকাস্থ ঠিকানায় চলছে ডিজিটাল লোডশেডিং। জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরম। হাঁসফাঁস অবস্থা। উৎসুক শিশু-কিশোর উপহারের স্যুটকেস খোলার অপেক্ষায়। স্যুটকেস খুলে যথারীতি সামগ্রী বিতরণ, প্রাপকদের মুখে আনন্দের ভাঁজ খুঁজি। সেই চেষ্টা ব্যর্থ। তারা কী পেল না পেল আলোর স্বল্পতায় ভালো করে দেখতেও পেল না। অতঃপর তেলাপোকাদের বসতি উচ্ছেদে নিদ্রার আয়োজন। জেনারেটরের দুর্বল শক্তির ফ্যানে বাতাসের চেয়ে শব্দ দূষণই বেশি। মাথা ধরায়। পালাক্রমে পারমান্যান্ট-রেসিডেন্ট তেলাপোকা, মশা গেরিলা আক্রমণে। কী আর করা? কাটে না দুঃসহ রজনী। নির্ঘুম। অবশেষে ভেসে আসে ফজরের আজান, হকারদের বিপণি চিৎকার এবং কাজের বুয়া নিয়ে আসে সকাল।
কিছুক্ষণ পর মাদারীপুরের উদ্দেশে যাত্রা। গাবতলী যাচ্ছি। জানালায় হালকা কুয়াশা আর ধূলিময় ঢাকা শহর। পত্রিকা বিক্রেতা হকাররা সুসংবাদ-দুঃসংবাদের বান্ডিল খুলছে। দিনের প্রথম আলোয় নতুন করে দেখছি সেই চেনা পথ। বয়সী দেয়ালে পানির জন্য খালি কলসির মিছিল; রাজনীতির হুঙ্কার কিংবা কথার ফুলঝুরি, সুন্নতে খৎনার বিজ্ঞাপনসহ কত হরেক রকমের পোস্টার! দোকানের চেপায় ফুল বিক্রেতাদের কুলি করে ফুলে পানি ছিটানো নজর কাড়ল। ট্রাফিক সিগন্যালে হতদরিদ্র, রোগা, শীর্ণকায় মহিলাদের সর্বরোগের ওষুধের লিফলেট বিতরণের প্রস্তুতি।
বাহন পরিবর্তনে গাবতলী নামলাম। মাদারীপুরগামী আরেক বাসে উঠেছি। বাস ছাড়তে এখনো আধাঘণ্টা বাকি। জানালায় এক বৃদ্ধাকে চোখে পড়ল। দমকা বাতাসে কোচকানো জলের মতো তার মুখ। কে জানে কত বড় ঝড় বয়ে গেছে তার জীবনে! কিংবা এখনো বইছে কিনা? ঘোলা নিভু নিভু চোখ। অযুত-নিযুত জিজ্ঞাসা সেই চোখে। খালি নাকে নাকফুলের ছিদ্রটা বলছে অতীত। ঠোঁট দুটো শেষবার কবে হেসেছে, কে জানে? হাতের পেশী মরা বাদুড়ের পাখনার মতো ঝুলে পড়েছে। দাঁতপাড়ের ক্ষয়ে যাওয়া খাটো শাড়িতে সম্ভ্রম বাঁচাতে অক্ষম। খিরা-ফাটা পায়ের গোঁড়ালি কিংবা দীর্ঘ কাঁচাপাকা উষ্কখুষ্ক চুল কোনোটাই ঠিকমতো ঢাকেনি। বোঝাই যায় ‘স্বল্পমূল্যে অধিক সংখ্যক’ যাকাতের কাপড়েরই একটি। খালি গা, বাউজ হয়ত জোটেনি। শীর্ণকায় শরীরে খালি পায়ে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটছেন। চুলের দৈর্ঘ্য যে যৌবনে প্রশংসার দাবিদার ছিল তা যে কোনো মূর্খও স্বীকার করবে। কপালের স্থায়ী ভাঁজগুলো এক একটা মৃত নদীর মতো ফ্যাল ফ্যাল। গলায় রোগ-শোক-বালাই প্রতিরোধক তাবিজ। হাতে তার কতগুলো বদনা।
বাস থেকে নেমে তাকে অনুসরণ করলাম। তিনি জীবিকার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। কর্মস্থল গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের গণশৌচাগার। মনটা বিষিয়ে গেল। কাদা-পানিতে শৌচাগারের পথ একাকার। শাড়ি-লুঙ্গি-প্যান্ট-পায়জামা একটু উঁচু করে ধরে চলছে সবাই। অসম্ভব দুর্গন্ধ! নাকমুখ টিপেও রক্ষে নেই। এক চিলতে পথ পেরিয়ে ঢোকার মুখে তিন পায়ের এক টুল। দেয়ালে হেলান দেয়া টুলটায় তিনি বসলেন। মাথার ওপরে অপরিচ্ছন্ন লেখাÑ পায়খানা ২ টাকা, প্রস্রাব ১ টাকা। সামনেই বদনাগুলো রাখলেন।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসলাম। বাস মাদারীপুরের উদ্দেশে ছুটে চলেছে। ক্লান্ত চোখে দূরপালার গাড়িগুলো ঢাকা শহরে ঢুকছে। মাথায় নানা রকম প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। এ রকম একজন বৃদ্ধা এখানে কেন? এই জগতে কি তার জন্য আর কোনো কর্ম নেই? কারা তাকে নিয়োগ দিয়েছে? কয় পয়সাই বা উপার্জন? জীবনবৃত্তান্ত কি? হরহামেশাই চোখে পড়েÑ এক মুঠো ভাতের জন্য, একটু আশ্রয়ের জন্য, এক টুকরো কাপড়ের জন্য অতিশয় বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে। কেন এত সংখ্যক বৃদ্ধ মানুষ এই লাইনে? ভিক্ষুকদের মধ্যে বৃদ্ধদের সংখ্যা এত বেশি হয় কেন? ছোটবেলায় যা দেখেছি, এখনো তাই দেখছি। কোনো পরিবর্তন হলো না কেন? দেশে নাকি দারিদ্র্য কমেছে, বৃদ্ধদের দারিদ্র্য কমছে না কেন? পরিসংখ্যানে এদের সংখ্যা কত? এই মানুষগুলোর ছেলেমেয়েরা কোথায়? তারা কি এদেরকে ভুলে গেছে?
কৌতূহলে জেনেছিÑ ‘তারা সন্তান পরিত্যক্তা দরিদ্র মাতা, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে ভিক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে কিংবা পাবলিক টয়লেটের তত্ত্বাবধায়ক।’ কেন এমন হচ্ছে? এমন তো হওয়ার কথা নয়? আমাদের সমাজে একজন নারী, একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন বোন এত অসহায়, এত দুঃখী কেন? যদি ধরে নেই স্বামী, সন্তান, আপনজনদের মধ্যে কেউ মানুষের মতো মানুষ হয়নি। তাহলেই কি উত্তর শেষ হয়ে গেল? না, হলো না। সমাজের কি কোনো দায়িত্ব কর্তব্য নেই? রাষ্ট্রের কি কোনো দায়িত্ব নেই? নাকি সমাজের মতো সমাজ আমাদের হয়নি। রাষ্ট্রেরও কী একই দশা? দেশে হাজার হাজার এনজিও দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করছে, নানা রকম স্বীকৃতিসহ নোবেল পুরস্কারও পেয়েছে। তাদের প্রদর্শিত পথ ‘কর্মের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন’। তাতেই ‘নারী মুক্তি’। এ কোন কর্ম? এ কোন ক্ষমতায়ন? এই কর্ম পেতে এবং টিকিয়ে রাখতেও নাকি ঐসব বৃদ্ধাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে। মানবতার কী চরম অপমান!
আমরা কি জানি না? কে বা কারা তাদেরকে এত কষ্ট দিচ্ছে? কেনই বা তারা এত দুঃখী? অদৃষ্টবাদীরা বলতেই পারে ‘ভাগ্যের লিখন’। কিন্তু মানুষের দুঃখ-কষ্টের জন্য শুধুমাত্র কি ভাগ্যই দায়ী? তাহলে ধনী দেশের মানুষের ভাগ্য এত খারাপ হয় না কেন? আমাদের দেশে তো মাথাপিছু আয়, বিয়েপিছু ব্যয় বেড়েছে অনেক, হাতে হাতে মোবাইল, ঘরে ঘরে টিভি, কম্পিউটার কত কিছু এসেছে! শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে এখনো মানবতা আসেনি কিংবা বাড়েনি। প্রিয় পাঠক, ফিরে যাচ্ছি দূরদেশ অস্ট্রেলিয়ায়। পেন রানওয়েতে উড্ডয়নের অপেক্ষায়। একটু পরেই দেশের মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারছি না। গভীর দুঃখের সঙ্গে মনে পড়ছেÑ সেই সব অবহেলিত মা, নির্যাতিত নারী এবং শোষিত মানুষের অশ্র“ভেজা মুখ।
লেখক : গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসল, অস্ট্রেলিয়া
nayonshakhawat@yahoo.com

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রবাসে
  • জাপানের গ্যালারিতে বাংলাদেশি শিল্পীর চিত্র প্রদর্শনী
  • সোনার হরিণ ও বৈদগ্ধের অপমৃত্যু
  • আজম খানের সুস্থতা কামনা
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive