নি উ ই য় র্ক সেদিন ফুটন্ত গরম পানির মতো নিউইয়র্ক শহর গরমে ফুটছে। সেই গরম উপেক্ষা করে মন ভর্তি আনন্দ ও উৎসাহ নিয়ে বইমেলায় গেলাম। লেখক-প্রকাশক সেমিনারের পর বইয়ের স্টলগুলোতে ঘুরলাম। ইচ্ছা ছিল বেশ কিছু বই কিনব। কয়েকটা স্টল ঘুরেই লক্ষ্য করলাম স্টলগুলোতে পুরনো বইয়ে ভর্তি। খুব কম সংখ্যক নতুন বই দেখা গেল। এক একটা বইয়ের দাম শুনে বই কেনার ইচ্ছা অনেকটা দমে গেল। বইয়ের এত দাম কেন জিজ্ঞেস করাতে একজন প্রকাশক বললেন, এক ডলার সমান ২০ টাকা হিসেবে বইয়ের দাম নির্ধারিত হয়েছে। ভাবলাম ডলারের মান এত কম নির্ধারণ করার কারণ কি? এখানকার লোকজন কি খুব আরামে ডলার কামায়? নাকি প্রকাশকরা বইয়ের দাম বাড়িয়ে নিউইয়র্ক আসা-যাওয়ার প্লেনের ভাড়া সমন্বিত করেছেন? আমি হিসেব করে দেখলাম এর থেকে কম খরচে আমি ঢাকা থেকে বই আনাই। একটা বইয়ের দাম শুনলাম ২০০ ডলার। বইটা শুধু দেখলাম, হাত লাগাতে সাহস পেলাম না। বইমেলা শেষে আমি জানি না বইমেলাতে কত বই বিক্রি হয়েছে বা বইমেলা সফল হয়েছে কিনা। তবে আমি ভীষণভাবে হতাশ হয়েছি পছন্দমতো বই কিনতে না পেরে। ইন্ডিয়ান বই স্টলে এত মোটা মোটা বইয়ের আধিক্য দেখে বলেই ফেললাম, এত মোটা বই রাখার জায়গা কি এই নিউইয়র্কে আছে? যেখানে আমরাই ভালোমতো থাকার জায়গা পাই না। বেশিরভাগ বই দেখলাম দামি লেখকদের গল্প সংকলন। যেহেতু সমরেশ মজুমদার স্টলে বসে ছিলেন, ওনার সম্মানার্থে একটা ছোট বই কিনলাম। ওনার অটোগ্রাফও নিলাম। ওনার মোটা মোটা বইগুলোর প্রচুর দাম। কেনার ইচ্ছা থাকলেও ইচ্ছাটাকে দমিয়ে রাখতে হলো। আগামী প্রকাশনীতে বেশিরভাগ হুমায়ুন আজাদের মোটা মোটা বইয়ে সয়লাব। বাংলা বইঘর স্টলের প্রকাশক আতাউর ভাই ভীষণ ভদ্র এবং অমায়িক। তার স্টলে বিভিন্ন ধরনের বই দেখা গেল। তিনি আমাকে কম দামে দুটো বই দিলেন ও তার একটা বই উপহার দিলেন। এ বছর বইমেলাতে আমার একটা বই বের হয়েছে। তিনি তার স্টলে আমার বই রাখলেন। আরো কিছু নতুন লেখকদের বই ওনার স্টলে দেখলাম। তিনি বাচ্চাদের বাংলা শেখান এবং আমাকেও অনুরোধ করলেন এ ব্যাপারে কিছু করার জন্য। ওনার এই উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ঢাকার বইমেলাতে হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই ‘উঠোন পেরিয়ে দুই পা’ অনন্যা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে শুনেছিলাম। এবার স্টলে গিয়ে বইটা পেলাম। বইটাতে উৎসর্গ, প্রথম প্রকাশ, লেখকের কথা দেখে নিশ্চিত হলাম এটা লেখকের একটা নতুন বই। ভেতরের প্রচ্ছদের একপাশে চারটা বইয়ের নাম দেখলাম। ভাবলাম এগুলো এই প্রকাশনী থেকে আগে বের হয়েছে। বাসায় এসে রাতে বইটি পড়ার জন্য খুলতেই প্রথমে দেখলাম ‘হোটেল গ্রোভার ইন’!! যে বই আমি বহু বছর আগে পড়েছি। ভাবলাম পরের তিনটা গল্প হয়ত নতুন হবে। সেগুলোও পুরনো এবং এই চারটি বই এখনো আমার কাছে আছে। ভীষণ হতাশ হলাম। কিছুক্ষণ বইটির চকচকে সুন্দর প্রচ্ছদ দেখে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম আর ভাবলাম এখন থেকে সবজি-মাছ কেনার মতো ভালোমতো যাচাই-বাচাই করে বই কিনতে হবে। ‘উঠোন পেরিয়ে দুই পা’ বইটি কিনে নিজেকে পুরোপুরি প্রতারিত মনে হয়েছে। প্রকাশকরা লেখকদের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে পাঠকদের ঠকানোর কৌশল বেশ ভালোই রপ্ত করেছেন। কিছু বিখ্যাত ও জনপ্রিয় লেখকরা এখন পাঠক তার বই পড়ছে কিনা সেটা নিয়ে মাথা ঘামান না। তারা শুধু দেখেন একটা বই বাবদ তাদের হাতে কত টাকা আসছে। লেখক-প্রকাশক সেমিনারে শুনলাম একজন বললেন, লেখক প্রকাশক দা-কুমড়ার সম্পর্ক। আমার মতে সেটা নতুন লেখকদের ক্ষেত্রে। জনপ্রিয় লেখকদের একটা লেখা পাওয়ার জন্য প্রকাশকরা মিষ্টির হাঁড়ি ও বড় বড় মাছ নিয়ে লেখকদের ড্রইংরুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন। অথচ নতুন লেখকরা, যারা নিজেদের টাকায় বই ছাপান, তাদের বই স্টলের পেছনে পড়ে থাকে। পাঠকরা নতুন বই স্টলে ভালোমতো দেখার সুযোগ পায় না। তবে পাঠকদের এখন সচেতন হওয়ার সময়। সবাইকে অনুরোধ করছি বই কেনার আগে ভালোমতো দেখে কিনবেন। সবশেষে বাংলা উৎসব ও বইমেলা আয়োজন করার জন্য মুক্তধারা ফাউন্ডেশনকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জন্মভূমির বইমেলার স্বাদ পুরোটা না হলেও কিছুটা তো পেয়েছি। এই বা কম কিসে! মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিত সাহাকে সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি এবারের প্রকাশকদের দেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসা কিছু মোটা মোটা বই (যেগুলো আমাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে) নিউইয়র্কের স্থানীয় লাইব্রেরিতে দান করার জন্য। তাহলে আমরা যারা নিয়মিত লাইব্রেরিতে গিয়ে বাংলা বই খুঁজে বেড়াই, তারা ভীষণ উপকৃত হব। মুনিয়া মাহমুদ