Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২৫ ১৪ই অগ্রহায়ন, ১৪২৫ ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
‘পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, আমিও এগিয়ে যাব’ -স্যামসন এইচ চৌধুরী  

স্কয়ার শিল্প গ্রুপের চেয়ারম্যান। দেশের সর্ববৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ এই মানুষটি গত ৫০ বছর ধরে নিরলস শ্রম, ধৈর্য, সততা, স্বপ্ন, আর অবিশ্রান্ত কর্মকুশলতা দিয়ে নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন এই শিল্প সাম্রাজ্য।
পাকিস্তান আমলে পরাধীন দেশের একজন পঁচিশ বছর বয়সী তরুণ পাবনা জেলার এক নিভৃত গ্রামে যে স্বপ্নকে রোপণ করেছিলেন তাই-ই মহীরুহে পরিণত হয়েছে আজ।
আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা, আর সততায় ভর করে এগিয়ে আসা পঁচাশি বছর বয়সের এই স্বাপ্নিক তরুণ সাপ্তাহিক-এর মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বলেছেন তার শিল্পজীবনের গল্প।
বয়ান করেছেন সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশের বাস্তবযাত্রার স্বপ্নপথ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোলাম মোর্তোজা ও শুভ কিবরিয়া 


সাপ্তাহিক : আমাদের হতাশা তো অনেক আছে। আশার জায়গাটাও আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি তো রাজনীতি অত বুঝি না। তবে আমি মনে করি যে, বাংলাদেশে অনেক নেতিবাচক ব্যাপার আছে। নেতিবাচক বলতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি, এখন সেটা দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটিতে। এটা একটা বিরাট চাপ। আমার ব্যক্তিগত অভিমত শিক্ষা ক্ষেত্রেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।
বাংলাভাষা আমরা ভালোবাসি। চিরদিন আমরা বাংলাতেই কথা বলি। তার মানে এই না যে, এটা ছাড়া অন্য কিছু শেখা যাবে না। এখন আমি যদি আন্তর্জাতিক হতে চাই, ইংরেজি শিখতেই হবে। কিন্তু এখন এমন হয়েছে যে, ইংরেজির শিক্ষকই পাওয়া যায় না। আমি কোনো এক আইন প্রণেতাকে বলেছিলাম, আপনারা যখন পড়াশোনা করেছেন তখন তো ফাস্ট ল্যাংগুয়েজ বাংলা ছিল। দ্বিতীয় হিসেবে ছিল ইংরেজি। থার্ড হিসেবে তিনটার মধ্যে একটাকে পছন্দ করতে হতো। হয় সংস্কৃত, নয় ঊর্দু, নয় আরবি। শিক্ষাক্রমে তিনটা ভাষা সমানে চলেছে। এখানে আমরা অনেকটা পিছিয়ে গেছি। কিন্তু পিছিয়ে গেলে পরেও আমি বলব যে, আমাদের দেশের লোকদের বড় গুণ হচ্ছে তাদের অসীম ধৈর্য। এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, লোকসংখ্যা এত বৃদ্ধি সত্ত্বেও আমাদের  মাথাপিছু আয় কত বেড়েছে। এই আয়টা তো নিরাশায় ভুগলে হতো না। এটাই সবচেয়ে বড় কথা।
অনেক বাধাবিঘœ আমাদের আছে। ব্যক্তিগত জীবনেও অনেক বাধা সামনে আসে, যদি সদিচ্ছা থাকে, তবে আমরা তা দূর করতে পারি। এই গুণটা আমাদের মধ্যে আছে যে, আমরা সহ্য করতে পারি। আমার মনে হয় আমাদের জীবনযাত্রার মধ্যে এটা প্রকৃতিপ্রদত্তভাবেই নিহিত আছে। এসব কিছু মিলিয়ে বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা উৎসাহ আছে। আমরা আমাদের পজেটিভ দিকটা দেখতে চাই না বা দেখি না, বা এড়িয়ে যাই। ওই পজেটিভ দিকটা থেকে যারা যারা চিন্তা করে তারা কিন্তু দেশে অনেক অবদান রেখেছে। এভাবে দেশটা এগিয়ে চলছে।
সাপ্তাহিক : এই যে, আপনি বললেন পজেটিভ দিকটা দেখতে চাই না কিংবা এড়িয়ে চলি, মানুষের মধ্যে সাধারণত এটা কেন হয়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : নিজে যেটা চাই আমি সেটা যদি না পাই তাহলে তো আমি হারাই। সব কিছু চাইলে তো সব সময় পাওয়া যায় না। ধৈর্য ধরতে হয়। সময় লাগে। এই ধৈর্যটার জায়গায় আমরা অধৈর্য। আমরা রাতারাতি সবকিছু চাই। রাজনীতিতে তাই করছি।
দেশে অস্থিরতা বেড়ে গেছে। আমি মনে করি রাজনীতি করার স্বাধীনতা সবারই আছে। পাকিস্তান আমলে গভর্নর মোনায়েম খানের সময়ে ছাত্ররা এনএসএফ নামে একটা সংগঠন করেছিল। শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি করত। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাপ নিয়ে ঘুরতো ওরা। আমার মনে হয় ছাত্রদের দে হ্যাভ দি ফ্রিডম টু চুজ। কিন্তু যখন লেখাপড়া করতে যাবে তখন তাদের রাজনীতি করা উচিত না। তুমি রাজনীতি করতে চাও, কর। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে নয়। কেননা তুমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড় সেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলছে ট্যাক্সপেয়ার বা আয়কর দাতাদের টাকায়। সেই টাকাটা তোমাদের দেয়া হচ্ছে, খরচ করা হচ্ছে পড়াশোনা করার জন্য। মারামারি, হানাহানি, করার জন্য নয়। তুমি যদি এটা করতেই চাও তবে তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে চলে যাও।  সেটা করার জন্য একটা জায়গা থাকতে পারে। তবে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নয়। ক্যাম্পাসের বাইরে। শিক্ষাঙ্গনের ভেতরে রাজনীতি করতে দেয়া উচিত না।
সাপ্তাহিক : এটার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে অনেকে বলেন আমাদের মতো দরিদ্র দেশে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা এসেছেন তারাই এসে অনেক অন্যায় অনাচার করেছেন। তাদের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলো। তারা প্রতিরোধ করেছে বলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজ হয়েছে। এই যে যুক্তি এটা আপনি কিভাবে দেখেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : ছাত্ররা লেখাপড়া করবে। সেটাই তাদের মুখ্য কাজ। রাজনীতি সে করবে কখন, যখন যে যথেষ্ট জ্ঞান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে বাইরে যাবে তখন। এখানে তো ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রাজনীতি করা হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : সেটা এখন হচ্ছে, অতীতেও কি হয়েছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : অতীতেও তাই হয়েছে।  তবে একটা কথা বলব, আমাদের জাতীয় জীবনে এমন একটা সংকটের সময় এসেছিল যখন কেবল ছাত্র নয় আপামর জনতা সেই সংকটের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। যেমন ভাষার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সঙ্কটটা হঠাৎ করেই তৎকালীন শাসকরা তৈরি করেছিল। যার বিরুদ্ধে কৃষক, শ্রমিকসহ সারাদেশ প্রতিবাদ করেছিল। সেখানে কেবল ছাত্ররাই আন্দোলন করেনি। তবে ছাত্র আর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা তফাৎ আছে যে, ছাত্ররা অধিকতর শিক্ষিত ও জ্ঞানী। ছাত্রদের নতুন নতুন পরিকল্পনা, আইডিয়া থাকে, তাদের মনোবল খুব দৃঢ় হয়, ভাষা আন্দোলনে তাদের একটা অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। সেটা হচ্ছে একটা বিশেষ ক্ষেত্র।
আপনার বাড়িতে যখন আগুন লাগে সেখানে দু ধরনের লোক আসে। এক ধরনের লোক এসে আগুন নেভায় আরেক ধরনের লোক এসে সেই আগুনে আলু পুড়িয়ে খায়। ‘এই পরের বাড়িতে আগুন লাগছে যা আলু পোড়াতে দিয়ে আয়।’
আমি ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে নই। অবশ্যই ছাত্রদের অধিকার আছে রাজনীতি করার। তবে এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কর। কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আনছো? এটা তো ঠিক না। বিশ্ববিদ্যালয় চলছে জনগণের টাকায়। তোমার তো অধিকার নেই সেটা ধ্বংস করার। বর্তমান সরকার তো ছাত্ররাজনীতির এসব নেতিবাচক কাজ নিয়ে খুব স্বস্তিতে নেই। আমার কথা হচ্ছে রাজনীতি কর। অধিকার হিসেবেই কর। ছাত্র অবস্থাতেই করÑ কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নয়। এটা বন্ধ করতে হবে।
সাপ্তাহিক : তাহলে করণীয় কি? করবেই বা কে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী :  দেখেন আমি তো রাজনীতি করি না, কিন্তু আমি বলছি আমার যন্ত্রণা থেকে। যার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া করার কথা, জ্ঞান নেয়ার কথা সে ছাত্ররাজনীতির নামে সেটা না করে চাঁদাবাজি দলাদলি টেন্ডারবাজি নিয়ে গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ছে। আপনি আমেরিকায় যান কোন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করুন সে হয়ত প্রেসিডেন্টের নামই বলতে পারবে না। একবার আমি এক সংসদ সদস্যকে বললাম যে শিক্ষাক্রমে সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ বা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে আপনারা ইংরেজি চালু করে দেন না কেন! উনি বললেন, সমস্যা হচ্ছে শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না, এত গ্যাপ হয়ে গেছে, এখন যে ইংরেজি জানা শিক্ষকের অভাব দেখা দিয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাচ্ছি। এটা আমাদের একটা সুবিধা। দ্রুতগতিতে বেশ এগিয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ভালো তা বলব না, তবে অনেকগুলোই বেশ ভালো করছে। আমি নিজে ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিতে ছিলাম।
দুঃখের বিষয় আর্থিকভাবে ছাত্ররা যেখানে বেশি সুবিধা পাচ্ছে সেখানেই গন্ডগোল হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আপনি অনেকগুলো সমস্যার কথা বললেন। সমাধানের পথ দেখালেন। কিন্তু যারা দেশের নীতি-নির্ধারণে থাকে, দেশ যারা পরিচালনা করে তারা এ জিনিসগুলো বুঝতে পারেন না, নাকি বুঝতে চান না?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এটা একটা বড় কঠিন প্রশ্ন। আমি তো কোনোদিন রাজনীতি করি নাই, কিভাবে রাজনীতি করতে হয় তাও জানিনা। রাজনীতি করতে গেলে এই সমস্যাগুলোর সমাধান যে অত্যন্ত জরুরি, এটা বাদ দেয়া যাবে না ঠিকভাবে সুন্দর করে চালাতে হবে Ñএটা কি তারা বোঝে না, নাকি তারা করে না সেটা তো আমি বুঝতে পারি না। অনেক সময় তারা তো ভালো কথা বলে, বিশ্বের অনেক দেশেই একটা কথা আছে যে, পজেটিভ নিউজ যদি করতে হয় তবে রাজনীতিবিদরা যদি ‘না’ বলে তবে বুঝতে হবে ‘হ্যাঁ’। আর যদি ‘হ্যাঁ’ বলে তবে বুঝতে হবে ‘না’। তাদের মনের কথা খুঁজে বের করা খুব কঠিন। রাজনীতিবিদরা ভালো ভালো কাজ করার প্রতিশ্রুতিগুলো দেন, সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য। কিন্তু পরে ক্ষমতায় গিয়ে এই প্রতিশ্রুতিগুলো তারা আর রাখেন না। এজন্যই হয়ত আমাদের সমস্যা একটু আছে, নইলে হয়ত আমরা আরো তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতাম।
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘ফোরকাস্টিনেশন ইজ দ্যা রুট অব অল ইররস’।
হোয়েন আই মেক এ প্রমিজ, হোয়েন আই মেক এ্যান এ্যানাউন্সমেন্ট’, তো আমি ওই হিসাব করেই করবো। যদি লোকে দেখে উই হ্যাভ ফেইলড এখন ইউ উইল লুজ ইয়োর ফেস। অনেক অনেক আশার কথা আমরা শুনি, কিন্তু কোনটা বাস্তবায়ন করা যাবে, কোনটা বাস্তবায়ন করা যাবে না এটা চিন্তা করে বলা হয় না। আমাদের রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতি দেবার সময় চিন্তাও করেন না যে সেটা বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভব কি না? কেননা লোকে চিন্তা করবে না যে, আমি কতটা চেষ্টা করেছি বা করি নাই। তারা চাইবে ফল দেখতে?
সাপ্তাহিক : সেটা হয়ত ব্যবসার ক্ষেত্রে সত্য কিন্তু আমাদের এখানে দ্বিদলীয় রাজনীতি। একজন ফেল করলে আরেকজন তো নিশ্চিতভাবেই সুযোগ পাচ্ছে। কাজেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায় তো তার কম।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এটা তো পরিবর্তনশীল। এই যে ব্রিটেনে ভোট হলো, দুজন ছিল এখন তো তিনজন হয়ে গেছে? দুজন মিলে সরকার গঠন করল। একজন বিরোধী দলে থাকল।
আপনি কি কোনোদিন আশা করেছিলেন যে, আমেরিকাতে একজন নিগ্রো প্রেসিডেন্ট হবে? আমার তো মনে হয় না কেউ স্বপ্নেও ভেবেছিলেন এটা। সুতরাং দুনিয়া বদলাচ্ছে
সাপ্তাহিক : এই পরিবর্তনের জায়গায় আমাদের অবস্থান কি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : পরিবর্তন হচ্ছে। তবে খুবই স্লথগতিতে।
সাপ্তাহিক : অনেকে বলেন ইতিবাচকভাবে দেখলে বাংলাদেশ এক পা এগোয় নেতিবাচকভাবে দেখলে দুই পা পেছায়। আপনার কাছে কি তাই মনে হচ্ছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি ইতিবাচকভাবে ভাবি যে, দুই পা এগুবো কিন্তু এক পা এগিয়েই শেষ করছি।
সাপ্তাহিক : পিছিয়ে যাচ্ছি কি না?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : পিছিয়ে হয়ত যাচ্ছি না পিছিয়ে গেলে আমরা এগুলাম কি করে । কিন্তু যে গতিতে আমাদের এগুবার কথা সে গতিটা আমাদের শ্লথ হয়ে যাচ্ছে।
সাপ্তাহিক : এক্ষেত্রে কি আমাদের নীতি-নির্ধারকরা বা যারা দেশ পরিচালনা করছেন তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কি তারা এটা করছেন?
এর পেছনে কারণটা কি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : যদি আমি রাজনীতি করতাম তাহলে হয়ত বলতে পারতাম। তাদের যদি বলতে দেন, তবে এই ব্যর্থতার জন্য তারা হাজারো কারণ বলবে। এ কথা সত্যি, একদিনে তো সব হয় না। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যদি দেখেন, এত মোটা বই পাবেন। মানে, এমন কিছু নাই যে তারা করবে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে সব পাবেন।
সাপ্তাহিক : মানুষ তা বিশ্বাসও করে।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : বিশ্বাস করে কি না সেটা বলব না। কারণ এটা সম্ভব না। অতগুলো জিনিস যদি আপনি ধরেন, তবে তা বাস্তবে করা সম্ভব না।
একটা ঘটনা আমি বলব, আমাদের পাবনাতে রূপপুরে কত বছর আগে কত লোকের বাসস্থান উঠিয়ে, জমি অধিগ্রহণ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নেয়া হলো। সেখানে এখন জঙ্গল । সেটা থেমে গেল কেন?
সাপ্তাহিক : এখনো সে অবস্থাতেই আছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এখনো সে অবস্থাতেই আছে। ... সরকারও ব্যবহার করল না জমিটা, পড়েই থাকল।
সাপ্তাহিক : এখনো মাঝে মাঝে সরকার বলে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : সহজে তো কেউ আপনাকে এটা করতে দেবে না। হয় আপনি রাশিয়ার পায়ে ধরবেন না হয় আমেরিকার পায়ে ধরবেন।
সাপ্তাহিক : অনেকে বলে যে, এত ছোট দেশ, এত জনসংখ্যা, সম্পদ এত কম, দ্রুত এগুনো খুব কঠিন...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমার ব্যক্তিগত মতামত, কৃষিক্ষেত্রে আমাদের এখানে একটা বিপ্লব এসেছে। ইরি ধানের আবাদের প্রচলন আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়েছে। এখন দেখেন কত হাইব্রিড জিনিস হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : উৎপাদন অনেক বেড়ে গেছে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : অনেক বেড়ে গেছে। আমার বাবা তো একবার পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে পঞ্চাশ বিঘা জমি কিনলেন। বিঘা প্রতি তখন ৪/৫ মণ ধান পাওয়া যেত। এখন সেখানে ২০ মন, ৩০ মণ ধান উৎপাদন হয়। এটা একটা খুব বড় পরিবর্তন। এর পেছনে পরিশ্রম আছে, আমাদের এখানে গবেষণা হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : আমাদের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : শিল্পায়নে আমরা খুব একটা পিছিয়ে তো নেই। ভারি শিল্প নাই আমাদের। কিন্তু মাঝারি ধরনের শিল্প আমাদের আছে। কিন্তু এই শিল্পায়নের জন্য তো আবার এখন বিদ্যুৎ নাই। সঙ্কট চলছে।
সাপ্তাহিক : শিল্পায়নে আমাদের বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায়...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেন, আমরা অনেক এগিয়ে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করলে তো আবার আমরা অনেক পিছিয়ে...

স্যামসন এইচ চৌধুরী : একেক জায়গার অবস্থা তো একেক রকম। যে ফসলটা আপনার পাঞ্জাবে ফলবে সেটা  সে ফসলটা তো পশ্চিমবঙ্গে হবে না। তবে আমাদের মাটিতে কিন্তু নানা রকম ফসল ফলানো সম্ভব। আমাদের এগ্রোপ্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি আছে। গতবারে আমরা স্ট্রবেরি চাষ করেছি, ভালো করেছি। আমরা প্রায় ১০ রকম কলার চাষ করেছি। দু’বছর পর আমরা রপ্তানি করার মতো কলা করতে পারব। এখন তো সারা বাংলাদেশে ভালো কলা হয়। আগে দু-একটা জায়গায় হতো। দেখেন কি সুন্দর তরমুজ হচ্ছে।
আমার বাবা চিকিৎসক ছিলেন। ছোটবেলায় তিনি কলকাতা থেকে আসার সময় এত বড় বড় তরমুজ নিয়ে আসতেন। কালো তরমুজ। তরমুজ বড় কিন্তু মিষ্টি না। মা তরমুজ কেটে তার ওপর একটু চিনি দিয়ে আমাদের দিতেন। সে তুলনায় আমাদের এখনকার তরমুজ তো অনেক ভালো। ফলন ভালো, স্বাদ ভালো, কাজেই বোঝা যায় অন্তত কৃষির ক্ষেত্রে আমাদের দেশ অনেক এগিয়ে গেছে।
সাপ্তাহিক : আমাদের এখানে আমরা প্রধানত দেখি যে, যাদের অর্থবিত্ত আছে, যারা শিল্প-প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারতেন তারা তা না করে ব্যবসার প্রতি বেশি আগ্রহী, এটা কেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি বুঝলাম না। শিল্পের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে হলে তো ট্রেডিং লাগবে। শিল্পের সঙ্গে ট্রেডিংটা যুক্ত আছে পরোক্ষভাবে। কেননা আমাকে তো একজন ক্রেতা খুঁজতে হচ্ছে। সুতরাং সেখানে তো ট্রেডিং হচ্ছেই।
সাপ্তাহিক : আমরা বলছিলাম যে, আমরা ফিনিশড প্রোডাক্ট বাইরে থেকে এনে এখানে বিক্রির বিষয়ে যতটা আগ্রহী...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এখানে আবার একটা কথা আছে, সবকিছু তো আমরা করতে পারি না। আমরা ডাল খাওয়া বাঙালি। এখানে ডালের যে উৎপাদন হয় সেটা দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পারে না। তারপরে ধরেন, আমাদের ছোটবেলায় কোনোদিনও সরিষার তেল ছাড়া খাইনি। এটা বাঙালিয়ানা। ছোটবেলায় মাদ্রাজে গিয়েছিলাম, তারা বলে এই সরিষার তেল তোমরা খাও। আমি বললাম তোমরা কি খাও। বলে যে নারকেল তেল। আমি বললাম নারিকেল তেল তো আমরা খাই না, মাথায় দেই। কাজেই ভোজ্য তেল বিদেশ থেকে আসে। এটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
সাপ্তাহিক : আমরা বলতে যাচ্ছি, যেমন ধরেন টেলিভিশন। এটা দেশে তৈরি না আমরা চীন থেকে আমদানি করে এখানে বিক্রি করতেই পছন্দ করি। এটা হয়ত অন্যান্য শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আপনার অভিজ্ঞতা কি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আসল জিনিস হচ্ছে কোথায় আপনি সস্তা দরে পাবেন?
সাপ্তাহিক : ধরা যাক স্কয়ারের একটা প্রডাক্ট। একই মানের একটা প্রডাক্ট ভারত থেকে আসছে। ভারতের পণ্যের তুলনায় স্কয়ারের পণ্যের দাম হয়ত কম না। তারপরও মানুষ তো স্কয়ারের পণ্যটা কিনছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : না, দাম তো নিশ্চয় কম। খুব বেশি কম তা বলব না। কিন্তু দাম যদি ১-২ টাকা কম হয় তবে কেন একজন ক্রেতা ২ টাকা বেশি দিতে যাবে? কারণ কাঁচামাল তো একই। কাঁচামাল তো ভারতকেও আনতে হয় আমাদেরও আনতে হয়। ভারতকে কম আনতে হয়। ভারতের একটা সুবিধা আছে কি, যখন কেমিক্যাল হয় তখন এই কেমিক্যালটার পেছনে তেল (ঙরষ) দরকার হয়। যেখানে তেল নাই উত্তোলন করা যায় না। সে দেশে পণ্যের দাম বেশি পড়বেই। ভারতের আবার সে সুবিধাটা আছে। তাদের কাঁচামাল তারা নিজেরাই উৎপাদন করে। নিজেদের ঘরে যা দরকার সেটা নিজেরাই উৎপাদন করে। আমাদের তো কাঁচামাল কিনতে হয়। কিনে আনতে হলেও  আমরা ফিনিস প্রোডাক্ট যদি ভারত থেকে আনতে যাই তবে সেটার দাম বেশি পড়বে। সেজন্য আমরা কাঁচামাল কিনে সেটা তৈরি করি।
ফার্মাসিউটিক্যালসে আমরা আমেরিকা বা অন্য দেশে যেসব ওষুধ বিক্রি করি। সেখানে ভারতের চাইতে কম দামে আমরা বিক্রি করি।
সাপ্তাহিক : কিভাবে সম্ভব এটা।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : লেবার কস্টটা আমাদের দেশে অনেক কম। যে ওষুধটা আমরা এখানে ২০ টাকায়  বিক্রি করি আমেরিকাতে সেটার দাম অন্তত ৬০ টাকা হবে। আমরা তো আমেরিকায় রপ্তানি করি।
সাপ্তাহিক : সারা পৃথিবীতে ওষুধের বাজারের কি অবস্থা এবং বাংলাদেশের খুবই সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে এটাকে দেখাচ্ছে বলে অনেকে বলছেন। আসলে কি তাই? চিত্রটা কি এ রকম যে আমাদের আরো বড় সম্ভাবনা আছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আরো বড় সম্ভাবনা আছে। খুব সম্প্রতি আমরা ইনসুলিন তৈরির একটা ইন্ড্রাস্টি করেছি। সেটার বাজারও তৈরি হয়েছে।
সাপ্তাহিক : বাজার বলতে কি রপ্তানি না দেশের জন্য?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : দেশের জন্যও, রপ্তানির জন্যও। কেননা বাইরে থেকে যেটা এখানে আসে তার চাইতে আমাদের ইনসুলিনের দাম অনেক কম।
সাপ্তাহিক : কোয়ালিটি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : কোয়ালিটি একই। এ পর্যন্ত  ডাক্তারের কাছ থেকে একটা অভিযোগ নেই যে, এটা কাজ করছে না। আমদানিকৃত ইনসুলিনের চাইতে এটার মান খারাপ এ রকম কোনো অভিযোগ তো নাই।
সাপ্তাহিক : এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আপনার বাবা চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৫২ সালে আপনার বয়স যখন ২৭ তখন আপনি ওষুধের দোকান দিলেন। এই ওষুধ ব্যবসার ইচ্ছাটা কি বাবাকে দেখে পাওয়া?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল ব্যবসায় যাওয়ার।
সাপ্তাহিক : আপনি যে সময় বড় হয়েছেন সে সময় সাধারণত মানুষের চিন্তা থাকে চাকরি বা এ রকম কিছুর। কিন্তু আপনি গেলেন ব্যবসায়। কেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমার বাবা তো সেভাবে চাকরি করতেন না উনি একটা মিশনারী হাসপাতালে কাজ করতেন। তখন গ্রামে কুইনাইনের চাহিদা ছিল। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে কুইনাইন বিক্রি হতো। কুইনাইন ট্যাবলেট বা কুইনাইন পাউডার এটা পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বিক্রি হতো এবং তার একটা হিসাব দিতে হতো। পোস্ট অফিস তখন তো ছিল যে, ওখানে কোনো ঘুষ নাই, কিছু নাই। আমার আব্বা যে পরিমাণ কুইনাইন নিতেন  তো ওদের একবার সন্দেহ হলো। এক সময় এসে ওরা একবার খোঁজ নিল যে আব্বার সত্যি সত্যি এত কুইনাইন লাগে কি না। এসে তারা দেখল যে সত্যিই প্রয়োজন হয় এত পরিমাণ কুইনাইনের। কেননা বাবার কাছে ১২ মাইল ব্যাসার্ধ এলাকা থেকে রোগী আসত। একজন খ্রিস্টান মহিলা মিশনারী এই হাসপাতালটি চালু করছিলেন। উনি মারা যাওয়ার পর আমাদের কম্যুনিটির হাতে হাসপাতালটি পরিচালনার ভার যায়। এখানে উনিই নিয়ম করে গিয়েছিলেন যে, এখানে শুধু গরিবদেরই চিকিৎসা হবে। এবং এখানে উনি একটা পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যারা এখানে চিকিৎসা নিতে আসবে তারা হাতে করে একটুকরা জ্বালানি ঘড়ি নিয়ে আসবে।
 যারা একটু পয়সাওয়ালা লোক তাদের তো লজ্জা করবে যে, একটা খড়ি হাতে করে নিয়ে আসা। সে খড়িগুলো আবার হাসপাতালে পানি জ্বাল দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো।
সাপ্তাহিক : এটা পাবনার কোন গ্রাম?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আতাইকুলা।
সাপ্তাহিক : তারপর আপনার নিজের ওটা দেখে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : না, আমি আব্বাকে বলেছিলাম আমি ফার্মেন্সি করব। আতাইকুলায় তখন আমার ওষুধের দোকান হলো। পাবনায় ডাক্তার রশীদ বলে একজন সদ্য পাস করা ডাক্তার বসতেন। উনি আমার বন্ধু ছিলেন। তাকে বললাম হাটবারে আমার ফার্মেন্সিতে বসার জন্য। এমবিবিএস ডাক্তার বসত না তখন। সারাদিন রোগী দেখে, খাওয়া-দাওয়া করে তাস-টাস খেলে চলে যেতে পারবে। বন্ধু ডা. রশীদ রাজি হলো।
তখন পাবনায় একজন হিন্দু ফার্মাসিস্ট ছিলেন। তিনি ম্যালেরিয়ার ওষুধ তৈরি করে বিক্রি করতেন। মিকশ্চার ওষুধ। ১৯৪৭ সালে হিন্দু ফার্মাসিস্ট দেশত্যাগ করে ভারতে চলে গেলেন। তার জায়গা যিনি কিনে নিলেন, তিনি পরবর্তীতে এ্যাডরুক ওষুধ কোম্পানি তৈরি করলেন।
তখন আমি বললাম যে, আচ্ছা ওরা যদি করতে পারে তবে আমরা করতে পারব না কেন?
সাপ্তাহিক : তখন তো আপনার ওষুধের ফার্মেসি চলছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, ফার্মেসিতে বসে এসব আড্ডা চলছে, চিন্তাভাবনা চলছে। তো আমরা ভাবলাম চলো করি।
ডা. রশীদকে বললাম, তুমি থাকো আমার সঙ্গে। আমরা ওষুধ কোম্পানি করার চেষ্টা করে দেখি।
 ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেব আমাদের ল’ ইয়ার (আইনজীবী) ছিলেন। আমি উনার কাছে আসলাম, উনি বললেন, এটা তো মন্ত্রী ধীরেন দত্ত দেখে, আমি ধীরেন দত্তকে বলে দিচ্ছি। ধীরেন দত্তের কাছে গেলাম। উনি কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। তার ডিরেক্টর ড্রাগকে ফোনে বললেন, দেখ আমার সামনে একজন স্মার্ট ইয়ংম্যান দাঁড়িয়ে আছে। সে ওষুধ তৈরি করতে চায়। আমার মনে হয় আপনারা যদি ড্রাগ ম্যানুফ্যকচারিং লাইসেন্স দেন তবে সে এটা করতে পারবে। আমাদেরকে পাঠিয়ে দিলেন ডিরেক্টর (ড্রাগ)-এর কাছে, আমরা গেলাম। আমাকে দেখে টেখে বললেন, স্যার আপনি তো এসেছেন, আপনার কথা তো মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন কিন্তু আমাদের তো বাজেটে টাকা নেই। ইনসপেক্টর যাবেন। ভিজিট করবেন। এসব আনুসঙ্গিক কাজ করতে যে টাকা লাগবে তা আমাদের বাজেটে নেই। আমি বললাম, সেটার ব্যবস্থা আমি করব। খরচ যা হয় আমি দেব। আপনাদের বাজেট এলে আমাকে দিয়ে দেবেন। উনি তখন অনুমতি দিলেন। ওই প্রথম শুরু।
সাপ্তাহিক : ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি করতে গেলে জায়গা লাগবে, পুঁজি লাগবে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যা, আমরা জায়গা ভাড়া নিয়েছিলাম। একটা জায়গা ভাড়া নিয়ে দুটো না তিনটে আইটেম করতাম। কিন্তু এই তিনটা আইটেম আমরা এমনভাবে করেছিলাম যে, আমাদের দামটা একটু বেশি থাকলেও এটা সাদরে গৃহীত হলো। আমাদের সঙ্গে আরো দুজন ছিলেন। আমরা চারজন হলাম।
সাপ্তাহিক : আপনারা চারজনে করলেন বলেই কি নামটা স্কয়ার?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, আমরা চারজনে করলাম বলেই নামটা স্কয়ার দিলাম। আরেকটা মানে ছিল যে, ফোর হ্যান্ডস আর ইকুয়াল।
সাপ্তাহিক : চার হাতই সমান?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, সমান না হলে তো আর স্কয়ার (বর্গক্ষেত্র) হচ্ছে না। চারজনের মধ্যে দুজন হিন্দু ছিলেন। উনারা তাদের শেয়ার বিক্রি করে চলে গেলেন। তারপর আস্তে আস্তে...।
সাপ্তাহিক : তখন আপনারা কি ওষুধ বানাতেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : তখন আমরা বানিয়েছিলাম মিকচার সিরাপ, আর কিছু ট্যাবলেট।
সাপ্তাহিক : তখন মার্কেটিংটা কিভাবে করা হতো?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : তখন মার্কেটিং আমি নিজেও করেছি, তারপর আস্তে আস্তে লোকজন নিয়েছি। এটা খুব ধীরে এগিয়েছে। চতুর্থ বছর থেকে আমরা লাভের মুখ দেখতে শুরু করি।
সাপ্তাহিক : ওই সময় তো আপনাদের অনেক পুঁজি ছিল না?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : তিন বছর পর আমাদের ৮০ হাজার টাকা পুঁজি ছিল।
সাপ্তাহিক : শুরু তো করেছিলেন আরো অনেক কমে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ চারজনে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম। তখন বাড়িভাড়া ছিল। আমিই ছিলাম দারোয়ান বলেন, ঝাড়–দার বলেন, কেরানি বলেন সব।
সাপ্তাহিক : সেই সময়টার কথা যদি চিন্তা করি, ৫০ বছর আগে, সেই পাকিস্তানি আমলে একজন বাঙালি তরুণ একটা ওষুধের কারখানা করছেন। এটার অনুপ্রেরণা কি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : ওই যে, ছোটবেলায় আমার ইচ্ছে ছিল ব্যবসা করা। এবং আমি সেটা করতে চেয়েছি সততার সঙ্গে।
সাপ্তাহিক : অনেকে যে বলেন, সততার সঙ্গে ব্যবসা হয় না,
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এ কথার সঙ্গে আমি একদম একমত নই। না হওয়ার কি আছে?
সাপ্তাহিক : অনেক কাজ করা যায় না অনেক জায়গায় গিয়ে ঠেকে যেতে হয়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি প্রথমদিকের একটা ঘটনা বলি। কারখানার জন্য একটা মেশিন আনলাম। কাস্টমসে সেটা আটকে দিল। বলে যে এতবড় মেশিন এনেছেন। কিছু তো দিতে হয়। সে বিরাট এক সমস্যা। আমি কাস্টমসের কালেক্টর পর্যন্ত গেলাম। গিয়ে বোঝালাম। তিনি বললেন, আমি তো সবই বুঝলাম, কিন্তু কথা হচ্ছে যে, আপনারা সুপারিনটেন্ডেন্টকে একটু বুঝান। শেষ পর্যন্ত আমি লেগে থাকলাম। বিনে পয়সায় মেশিন ছাড়লাম।
সাপ্তাহিক : এটা কত সালের ঘটনা?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এটা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের ঘটনা।
সাপ্তাহিক : এরপর ঢাকায় চলে এলেন কখন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : ঢাকায় চলে এলাম ১৯৭১-এর পরই। যুদ্ধের পর পাবনাতে তখন সবার কাছেই অস্ত্র। নিরাপত্তার কথা ভেবেই ঢাকায় চলে এলাম।
সাপ্তাহিক : ঢাকায় কোথায়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আগে থেকেই আমাদের একটা অফিস ছিল এখানে দৈনিক ইত্তেফাকের কাছে। ওখানে কাজকর্ম শুরু করলাম। ফ্যাক্টরিটা ওখানেই থাকল। তারপর এমন একটা সময় এলো যখন আমাকে সবাই চাপ দিতে লাগল শেয়ার মার্কেটে যাওয়ার জন্য। আমার তখন এসব সম্পর্কে ধারণাও ছিল না। আমি যেতেও চাইনি। তখন ধারণা ছিল, নিজে মালিক আছি, নিজেই থাকব। আবার কারা এত শেয়ারের মালিক হবে। আমার ওপরে এসে আবার কেউ মাতব্বরি করবে কি না। তখন ইউনিয়ন ব্যাংক অব সুইজারল্যান্ড (ইউবিএস), হংকং-এর একজন নাছোড়বান্দা ছিল। ওরা এসে আমাকে বলল যে, আপনার ব্যালেন্সশিট দেখান। দেখালাম। দেখে বলল যে, আপনার এই ১০০ টাকার শেয়ার আমরা দু’হাজার টাকায় কিনতে পারি। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। তখন আমি দেখলাম যে, আমাকে যদি ভালো একটা ফ্যাক্টরি করতে হয় তবে প্রচুর টাকার প্রয়োজন এবং ওরা শেয়ারের যে দাম বলছে তার অর্ধেক দামও যদি পাই তাহলে যে পুঁজি আমার হাতে আসবে তা দিয়ে আমি টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিটা করতে পারি।
সাপ্তাহিক : কোন সময়ের কথা বলছেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : উনিশ’শ আশি সালের কথা। আমি আমার এক বন্ধুর পরামর্শ নিলাম। সে বলল তুমি ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে দাও। মুনাফা থেকে ৫০% তোমরা নিয়ে নাও। ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার আমরা ১ হাজার টাকা করে নিয়ে নিলাম। বাকি শেয়ার ৮শ টাকা ভ্যালুএডিশন আর ১শ টাকা দাম ধরে ৯শ টাকাতে নির্ধারণ করা হলো। আমি হংকং চলে গেলাম রোড শোতে। এখানে কেউ কেউ বলল যে, আমরা ঘুষ দিয়ে শেয়ার এত দামে বিক্রি করার অনুমতি নিয়েছি। শেয়ার যখন বিক্রি হলো তখন ৮০ শতাংশ শেয়ার বিদেশিরা নিয়ে নিল। এর পরই এখানে হাউকাউ বেধে গেল- হ্যা, আমরা বাংলাদেশে শেয়ার পেলাম না। আমি বললাম, তোমরা তো শোনো নাই। তোমরা তো বিশ্বাসই করতে পারো নাই।
তারপর যা হোক, তখন নিয়ম হলো যে, ৩০ শতাংশের বেশি শেয়ার বিদেশিরা নিতে পারবে না।
সাপ্তাহিক : প্রথম থেকেই কি হংকংয়ের শেয়ার মার্কেটে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : না, এখানকার শেয়ার মার্কেটে, কিন্তু কিনল বিদেশিরা। সেই টাকা থেকে আমরা কালিয়াকৈরে স্টেট অব দ্য আর্থ শিল্প-প্রতিষ্ঠান করেছি।
সাপ্তাহিক :  আপনি বলেছেন যে, সততা এবং শ্রম দিয়ে ইচ্ছা করলে বড় ব্যবসা করা যায়।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : অবশ্যই ইচ্ছে করলে পারে। ব্যবসায় যদি সততা সুনাম থাকে অবশ্যই আমি এগুতে পারবো। আর অসততা কিছু করলে সরকার ধরবে। এই যে কয়দিন আগে পত্রিকায় আছে একটা না দুটা কোম্পানিকে শেয়ার জালিয়াতির জন্য সরকার বড় ধরনের জরিমানা করেছে। এগুলোর কোনো মানে আছে? এই কোম্পানির যে বদনাম হলো তা কি আর ঘুচবে?
সাপ্তাহিক : এ ক্ষেত্রে অনেকে বলেন টাকা হয়ে গেলে এসব বদনাম ঘুচে যাবেই?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এক্ষেত্রে আমি বলব যে হাউ ইউ ফিল ইয়োরসেল্ফ। আপনাকে একটা সন্ত্রস্ততা, ভয় ডাকছে, এটা নিয়ে আপনি ঘুমাতে পারবেন? আপনার সন্তানেরা ঘুমাতে পারবে?
১৫ বছর আগে  দেশের সেরা আয়কর দাতা হিসেবে প্রথম দশজনকে যখন স্বীকৃতি দেয়া হয় তার মধ্যে আমি একজন। এখনো আমি সর্বোচ্চ করদাতা, আমার ছেলেরা সর্বোচ্চ করদাতা। আমার মেয়ে সর্বোচ্চ করদাতা। তার মানে এটা নয় যে, আমিই দেশের সেরা ধনী। ধনী যারা আছে তারা আবার অন্যভাবে আছে। তারা যদি ওইভাবে ভালো থাকতে পারে তবে থাকবে। তবে, আমি খুব শান্তিতে ঘুমাতে পারি।
সাপ্তাহিক : একটা কথা আমাদের সোসাইটিতে সব সময় বলা হয় যে, বাঙালির দেশপ্রেম নাই, তারা দেশের জন্য কিছু করতে চায় না। আপনার এতদিনের অভিজ্ঞতায় কি বলেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : দেখুন, চোর-ছ্যাচোর, ভালো-মন্দ সব নিয়েই তো একটা দেশ। দেশপ্রেম যদি না থাকত তবে কি করে এত তরুণ ১৯৭১ সালে দেশের জন্য প্রাণ দিল বলেন? দেশপ্রেম না থাকলে এটা কিভাবে সম্ভব?
সাপ্তাহিক : বলা হয় স্বাধীনতার পর আমাদের যেভাবে কাজ করার কথা ছিল সেভাবে কাজ করিনি বা করছি না। দেশপ্রেম না থাকার কারণেই এটা হয়েছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখতে হয় আমাকে। আমি মনে করি,  যে বয়সের ছেলেরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধে গিয়েছিল সেটা একটা ইউফোরিয়া (ঊঁঢ়যড়ৎরধ) ছিল। দেশকে ভালোবাসার জন্য। কিন্তু যখন একবার এই বন্দুকটা ব্যবহার করেছে তখন তার মানসিক পরিবর্তন এসেছে। উই হ্যাভ লস্ট এ জেনারেশন। এটা কিন্তু মনে রাখতে হবে। গুলি ছুড়ে যদি আপনি কাউকে মেরে ফেলেন তখন যে ইউফোরিয়াটা হয়, যে মানসিক একটা পরিবর্তন হয় এটা খুব মারাত্মক। আপনি হিসেব করে দেখেন আমরা একটা জেনারেশনকে হারিয়েছি।
সাপ্তাহিক : এরকম একটা যুদ্ধের পর কি পৃথিবীর সব জায়গায় একই চিত্র দেখা যায়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এরকমই তো হয়েছে। এটা শান্ত হতে সময় লাগে।
সাপ্তাহিক : আরেকটা কথা বলা হয় আমাদের দেশের মানুষ যখন শ্রমিক হয়ে বা অন্যভাবে বিদেশে যায় সেখানে গিয়ে যখন কাজ করে সেখানে তারা যে যোগ্যতার সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে পরিশ্রম করে কিন্তু দেশের ভেতরে থাকলে সেই পরিশ্রমটা করতে চায় না। এই যে আপনাদের শিল্পের সঙ্গে এত মানুষ জড়িত...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : সেখানে আমাদের ব্যবস্থাপনায় কিছুটা দোষ রয়েছে। আমাদের লেবার ইউনিয়নটা ঠিকমতো গাইড করে না। লেবার ইউনিয়নের মধ্যে দুরকম ব্যাপার আছে।  আমার এখানে যে লেবার ইউনিয়ন আছে তাদের সঙ্গে আদৌ আমার কোনো সমস্যা নেই। বছরে একটা মিটিং হয় তাদের সঙ্গে। তারা যা যা চায়, আমি যখন আমারটা বলি, যখন তারা দেখে তারা যা যা চেয়ে ছিল, তারা অনেক বেশি পেয়েছে।
আমার এখানে সব জায়গায় সব ফ্রি। আমি কোনো দাম নেই না। কাজের সময় সকল খাবার, টিফিন, জলপান সব বিনামূল্যে দেই।
২৪ ঘণ্টা যেসব ফ্যক্টরিতে কাজ হয়, সেখানে যে সকালে আসবে সে নাস্তা খেয়ে কাজ করতে ঢুকবে। লাঞ্চ খেয়ে বাড়ি যাবে। বিকেলে যে কাজে আসবে সে নাশতা খেয়ে ঢুকবে। রাতে খাবে। সকালে খেয়ে বাড়ি যাবে।  আগে আমি দেখতাম টিফিনের সময় চা খেতে যায়। চা খেতে গিয়ে আড্ডা মারে। কেউ দশ মিনিট আগে এলো। কেউ দশ মিনিট পর এলো তারপর সেকেন্ড হাফে খালি ঘড়ি দেখতে থাকে কখন বাড়ি যাবে। আমি এই ব্যবস্থা চালু করার পর কারো মধ্যে বাড়ি যাওয়ার বিষয়ে এ রকম উদ্বিগ্নতা দেখি না। এখন আর বাড়ি যাওয়ার সময় এলে বারবার ঘড়ি দেখে না তারা।
সাপ্তাহিক : আমরা দেখি যে, একটা প্রতিষ্ঠান সেটা ছোট হোক বা বড় হোক সেটা যিনি পরিচালনা করেন তিনি কেমন আচরণ করেন, সেটা একটা বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আপনার ক্ষেত্রে সেটা কেমন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : অবশ্যই সেটা একটা ফ্যাক্টর। আমার ক্ষেত্রে যদি বলি, আমি এ পর্যন্ত কোনো বড় সমস্যায় পড়িনি। কেননা আমি জানি, আমি যদি এই সংস্কৃতিটা বদলাতে চাই তাহলে আমাকে এই এই করতে হবে, আমি সেটা করেছি।
সাপ্তাহিক : শ্রমিকদের সুবিধা দিলে মুনাফা কমে যায় এটাও তো অনেক মালিকের চিন্তায় কাজ করে।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এটা ভুল। শ্রমিকদের যদি আপনি বেশি দেন তবে ওরা আরো দুইঘণ্টা বেশি কাজ করবে।
সাপ্তাহিক : এটা কি আপনার অভিজ্ঞতা?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে। যদি আপনি আপনার প্রতিষ্ঠানের মানুষদের প্রতি যতœবান হন তবে তারা আপনার প্রতি খেয়াল রাখবে। এই দেয়া-নেয়াটা একটা চিরকালীন ব্যাপার।
সাপ্তাহিক : গত ১০ বছরে আমাদের পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ একটা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এখন এটা তো আমার বেলা হয় না। আমার তো পাঁচ-ছয়টা কারখানা রয়েছে। আমার ওখানে তো একদিনও সমস্যা হয়নি। তাহলে অন্যদের বেলায় কেন হচ্ছে? সকলের বেলায় তো হয় না। এখন যদি কেউ কারো অধিকার কেড়ে নিতে চায় তবে দিন শেষে সে তার পরিণাম ভোগ করবেই।
সাপ্তাহিক : তার মানে আপনার ফ্যাক্টরিগুলোতে লেবার ইউনিয়নও আছে। সেখানে ফ্যাক্টরিও ভালোভাবেই চলছে। কোনো সমস্যা হয় না?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : না, কোনো সমস্যা হয় না।
সাপ্তাহিক : লেবার ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো বাকবিতণ্ডা হয় না?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : সেটা হওয়ার সুযোগ দিই না তো। আমি জানি মুদ্রাস্ফীতির ফলে বাজারে তার কি প্রভাব পড়ে। বাজারে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি কি তা আমার জানা আছে। আমি সেই বাড়তি চাপটা মিটিয়ে দেই। যে কারণগুলোতে বিতণ্ডা হতে পারে আমি আগেই তা সমাধান করে দিই।
সাপ্তাহিক : আপনি বারবার একটা কথা বলছেন যে, খুব ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলে পরিবর্তনটা সুদৃর হয়। কিন্তু আমরা দেখছি যে, একটা করে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষ শ শ কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে।
 স্যামসন এইচ চৌধুরী : ওটা আবার ভিন্ন বিষয়। আমি বা আমার ছেলেরা কেউ রাজনীতি করি না। তবে তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ আছে। জানাশোনা আছে। সৌহার্দ্য আছে।
সাপ্তাহিক : আপনি যখন একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, ঝাড়–দার থেকে শুরু করে সব কাজই আপনি করেছেন। এই আস্তে আস্তে প্রতিষ্ঠান বড় হয়েছে। আপনি আপনার জীবনযাপন কেমন রেখেছেন- আগেও যেরকম শ্রম দিতেন, এখনো কি সেরকম শ্রম দিচ্ছেন? সে অনুযায়ী আপনার যারা কর্মী তারা কি আপনাকে দেখে শিখছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি তো মনে করি আমাকে দেখে শিখছে। কেননা তারা অনেকে অফিসে আসার আগেই তো আমি এখানে এসে বসে থাকি।
সাপ্তাহিক : কেন এসেছেন? আপনার তো এত আগে আসার কোনো দরকার নাই।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : অভ্যাস। কাজ না করে থাকতে পারি না। আমার ছেলেরাসহ আমরা তো একই বিল্ডিংয়ে একই সঙ্গে থাকি। সকালে ছেলেরা উঠে ওদের মাকে বলে, ‘চেয়ারম্যান সাহেব কই? অফিসে চলে গেছে?’ ওদের মা বলে, ‘হ্যাঁ, চলে গেছে।’
সাপ্তাহিক : এটা কি প্রতিদিনের ঘটনা?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এটা আমার অভ্যাস বা চর্চা হয়ে গেছে। সকাল ৬টায় ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তো আমি ছাড়তে পারলাম না।
সাপ্তাহিক : ঘুম থেকে উঠে তারপর কি করেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : ঘুম থেকে উঠে আমি প্রথমে বিবিসি শুনি। তারপর আসে খবরের কাগজ। কাগজগুলো যদি আর একটু আগে আসত তবে ভালো হতো। সাড়ে ৭টার সময় আমি গোসলে যাই।
সাপ্তাহিক : আপনি যে কাজ করেন, বললেন যে, শান্তিতে ঘুমাতে পারেন, ঘুম থেকে উঠে যখন আমাদের সংবাদপত্রগুলো দেখেন- হানাহানি, মারামারি এগুলো দেখে কি ধাক্কা খান?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : না, এগুলো তো খবরের কাগজে থাকবেই। একেজনের খবরের কাগজ একেক রকম দেখি। এটা তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বিশ্বের সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। সেখানে এসব তো হবেই।
সাপ্তাহিক : প্রসঙ্গ পরিবর্তন করি। আমাদের এখানকার সরকারি প্রশাসনের অবস্থান কেমন দেখছেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি বা আমার বাবাকে যখন সিভিল সার্জন চিঠি লিখতেন, তখন শেষে লিখতেন ণড়ঁৎ সড়ংঃ ড়নবফরবহঃ ংবৎাধহঃ. ফরমেটটাই ছিল তাই।  আমরা বৃটিশ সরালাম যে, আমরা এর চেয়ে আরো ভালো দিন চাই। বৃটিশ আমলে নিয়ম ছিল, এখনো আছে হয়ত, প্রয়োগ হয় না। ‘আফটার ডার্ক নো ওয়ান ইজ এ্যালাউড টু এন্টার ইন এ হাউস। নো পুলিশ। তারা কাউকে গ্রেফতার করতে হলে সারারাত আপনার বাড়ি ঘিরে রাখবে। সূর্যোদয় হলে তখন প্রবেশ করবে।
সাপ্তাহিক : যদি কাউকে গ্রেফতার করতে চায়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, এবং তার আগে প্রথমে দেখাতে হবে যে ওয়ারেন্ট আছে। এবং ভেতরে ঢুকেই মহিলা ও শিশুদের আলাদা করতে হবে। তাদেরকে স্পর্শ করা যাবে না। এখন তো এগুলো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।
সাপ্তাহিক : আইন আমাদের প্রায় একই আছে।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। তার অপপ্রয়োগ আছে।
সাপ্তাহিক : এখন রাত ৩টার সময় গিয়ে দরজা ভেঙেও বাড়িতে ঢোকে।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : তারপর ধরুন এই যে, ‘রেসপেক্ট টু দি ট্যাক্স পেইয়ার’। এটা তো  দেশে এখন নাই-ই একেবারে। আমরা অফিস থেকে চিঠি দেই সরকারি কর্মকর্তাদের ‘ভিয়ার স্যার’ সম্বোধন করে, নিচে লিখি ‘ইওরস ফেইথফুলি’ আর তাদের পক্ষ থেকে উত্তর আসে ‘ আর্দিষ্ট হইয়া জানানো যাইতেছে যে, অমুক, অমুক, লিখে একটা কেরানির স্বাক্ষর দিয়ে দেয়। এগুলো খুবই দুঃখজনক।
তারপর এই যে দুদকের সংশোধনী আইনটা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারীকে গ্রেফতার করতে হলে অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু আমার কথা হলো, আইন তো সবার জন্য সমান এবং একই হওয়া উচিত। না হলে তো সে কাউকে ভয় পাবে না।
তারা আমাদের কাছ থেকে সম্মান চায় কিন্তু আমাদের প্রতি তাদের সম্মান প্রদর্শন করে না। তাদের সচেতন হওয়া উচিত যে, তাদের বেতন আসে জনগণের ট্যাক্সের পয়সায়। অবশ্য এদের অনেকে আছেন যাদের বেতন না নিলেও চলে।
সাপ্তাহিক : এই যে, আপনার ওষুধের পর আরো অনেক ব্যবসা আছে, বড় গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ হয়ে গেল, এগুলো আপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে না? পুরো জিনিস কোথায় কীভাবে চলছে? সঠিকভাবে চলছে কি না?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি জানি কোথায় কি হচ্ছে। সেই সিস্টেম তৈরি করেছি। যাদের দায়িত্ব দিয়েছি তারা জানে তাদের দায়িত্ব কি। সুতরাং কোনো চাপ নেই। নিয়মেই চলছে সব স্বাভাবিকভাবে। আমরা মিটিং করি, ডিসিশন দেই। ব্যাস।
সাপ্তাহিক : মিডিয়া ব্যবসাতেও তো আপনারা আসলেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, এটা আমার ছোটছেলের শখ।
সাপ্তাহিক : আপনার শখ নাই?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি তাকে বললাম যে, ক্রিয়েটিভ কিছু করো।
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশে একটা নতুন ধারা চালু হয়েছে যে, টাকা হলে, পুঁজিপতিরা দৈনিক সংবাদপত্র টেলিভিশন চ্যানেল ইত্যাদি করে।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : না, পত্রিকার দিকে যাবো না। এটা ভেরি কন্ট্রোভার্শিয়াল জিনিস।
সাপ্তাহিক : বিতর্ক জিনিসটাকে কি খুব ভয় পান?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডেকে এই ঝামেলার দরকার কি। দেখেন ইদানীং একটা প্রতিযোগিতা চলছে প্রথম আলোর সঙ্গে কালের কণ্ঠের। দেখতে পাচ্ছেন। কার গায়ে কে ধুলো দিচ্ছে? আমি ওটা করার পক্ষপাতি না।
সাপ্তাহিক : টেলিভিশনেও তো অনেক প্রতিযোগিতা আছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : প্রতিযোগিতা থাকতে পারে কিন্তু আমি কন্ট্রোভার্শিয়ালের কথা বলছি। আমি ছেলেকে একটা কথা বলে দিয়েছি যে, আমার ছোটবেলায় মিকি মাউস দেখেছি, টম এন্ড জেরি দেখেছি। তোরা ঐ রকম জিনিস বানা বাচ্চাদের জন্য।
সাপ্তাহিক : শুরুতে আপনি একটা কথা বলেছিলেন যে, আমাদের যেভাবে এগুনো দরকার আমরা সেভাবে এগুচ্ছি না, কিন্তু আমরা তো সেভাবে এগুতে চাই। সেভাবে যদি এগুতে চাই তবে আমাদের কি করতে হবে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এখন আমাদের শিক্ষার ওপর বেশি জোর দিতে হবে। ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’।
সাপ্তাহিক : সেটা তো বলি, কিন্তু ওইভাবে কাজ তো করছি না।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : কাজটা করাটাই তো ব্যাপার। ওটা যখন করবে তখন হবে, তাছাড়া হবে না।
সাপ্তাহিক : আপনি এ দৃষ্টিভঙ্গীটা বদলানোর কথা বলছিলেন, মানুষের প্রতি সম্মান...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : দেখুন বাজেটটা হয় প্রত্যেক বছর, তারপর এনবিআর, এসআরও বা প্রজ্ঞাপন ইস্যু করে ঐ বাজেটের কাটছাঁট করা হয়, স্বাভাবিকভাবেই ওটা ঠিক কাজ না। কারণ, আমাদের সংসদে প্রতিনিধিরাই ঠিক করে তারপর বাজেট করে। যদি এটাকে বদলাতে হয় ইট হ্যাজ টু গো ব্যাক টু পার্লামেন্ট। তাই তো হওয়া উচিত। এই কিছু কিছু জায়গায় সংশোধন দরকার।
সাপ্তাহিক : আপনি যে পরিবর্তনের কথা বলছেন সেটা তো একটা দীর্ঘমেয়াদী ব্যপার।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : কোন কিছুই রাতারাতি করা যাবে না। সময় নিবে প্রত্যেকটাই। আপনাকে এমনভাবে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে যাতে সেটা বাস্তবায়নযোগ্য হয়।
সাপ্তাহিক : আমরা কি পরিকল্পনায় দুর্বল না কি বাস্তবায়নে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমাদের দুর্বলতা বাস্তবায়নে।
সাপ্তাহিক : পরিকল্পনা কি আমরা করতে পারি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : পরিকল্পনা আমরা খুব করতে পারি। এমনভাবে করা উচিত না সব একসঙ্গে। এক মুহূর্তেই সব নয়।
সাপ্তাহিক : আমরা যদি আমাদের পরিকল্পনা ঠিকমতো করতে পারতাম তবে আমাদের বিদ্যুৎ সেক্টরের এই অবস্থা কেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এ অবস্থা তো হঠাৎ করে হয়নি। এটা আস্তে আস্তে পুঞ্জীভূত হয়েছে।
সাপ্তাহিক : এখন কান্নাকাটি লেগে গেছে।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ। এখন প্রশ্ন উঠছে কাকে কত টাকা দিয়ে কিনছে। যেমন একবার কাফকোকে কম দামে গ্যাস দিয়ে ভুগছে।
সাপ্তাহিক : এখনো ভুগছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : ভুগতে তো হবেই। কার স্বার্থে এত কম দামে গ্যাস দিচ্ছেন?
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশের জন্য এটা তো একটা বিপর্যয়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, বিপর্যয় তো বটেই।
সাপ্তাহিক : প্রায় মাগনা দামে, বিনে পয়সায় গ্যাস বিক্রি করার মতো।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আর এখন আমরা না খেয়ে মরছি। আমাদের গ্যাস নাই।
সাপ্তাহিক : তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আপনি পটেনশিয়াল কেমন দেখেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমি বলব তরুণ প্রজন্ম গ্র্যাজুয়েলি ইমপ্রুভ করছে। দেশে বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আসার পর, নানা রকম সাবজেক্ট আসার ফলে আমাদের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম আগের চাইতে যোগ্যতর হয়ে উঠছে।
সাপ্তাহিক : অনেকে বলেন যে, আমাদের অনেকগুলো সেক্টর আছে, আমরা যে পরিমাণ উন্নতি করব, সেখানে যোগ্য জনশক্তির একটা ঘাটতি রয়ে গেছে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমার মনে হয় না। হয়তো কোনো সময় কোথাও হোঁচট খেতে পারেন। কিন্তু বড় সমস্যা হবে না।
সাপ্তাহিক : আপনি একটু আগে শুরুর গল্পটা বলছিলেন। শুরু থেকে জীবদ্দশাতেই আপনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। এখন আপনার স্বপ্ন কি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : আমার স্বপ্ন, পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, আমিও এগিয়ে যাব। দেখেন আমি কি নিয়ে আরম্ভ করেছিলাম। এখন আমাদের ক্রমাগত বিস্তৃতি ঘটছে। সেদিন আমাদের ইনসুলিন তৈরির নতুন কারখানা উদ্বোধন হলো। এটা আন্তর্জাতিক মানের কারখানা। অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
সাপ্তাহিক : আপনি কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেন ম্যানপাওয়ার না টেকনোলজি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : টেকনোলজি তো অবশ্যই। টেকনোলজি না জানা পর্যন্ত তো আপনি এগুতে পারবেন না। এজন্যই তো আমাদের অনেক খরচ হয়। পরামর্শ নিতে হয়। আমরা সাধারণত আমেরিকা থেকে ইউরোপ থেকে পরামর্শকদের পরামর্শ নেই।
আপনারা চা খেলেন না। আপনাদের চা বোধহয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ঠাণ্ডা চা নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। পড়ষফ ঃবধ ধহফ ড়ষফ রিভব রং ঃযব নবংঃ রহ ঃযব ড়িৎষফ. (ঠাণ্ডা চা এবং প্রবীণ স্ত্রী পৃথিবীতে সবচেয়ে উত্তম।) কিন্তু এটা তার জন্যই প্রযোজ্য যে এটার টেককেয়ার করতে জানে। প্রথম প্রথম বিয়ে করলে তখন ঝগড়াঝাটি হয়। এখন আমরা স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের জন্য অপেক্ষা করি।
সাপ্তাহিক : কিন্তু আপনি তো চলে আসেন ভোরবেলায়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, তবে বাসায় ফিরলে একসঙ্গেই থাকি। সন্ধ্যেতে কোথাও বেরুলে একসঙ্গেই বের হই।
সাপ্তাহিক : দেশের বাইরে গেলে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গেই যাই।
সাপ্তাহিক :.দেশের বাইরে সাধারণত একা যান না।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : সাধারণত না, কোনো সময়ই যাই না। ব্যবসার কাজে বিদেশে গেলেও একসঙ্গেই যাই।
সাপ্তাহিক : বলা হয় আমাদের ব্যবসায়ীদের দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি কোনো কমিটমেন্ট নেই। আপনারও তাই মনে হয়?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : কিছু কিছু আছে।  দেখুন আপনার সব সন্তান এক রকম হতে পারে না। কারো মেধা কম থাকতে পারে। কেউ অসাধারণ মেধার অধিকারী হতে পারে, কেউ কেবলমাত্র লম্বা হতে পারে।
সাপ্তাহিক : আমাদের এখানে এসব আলোচিত বেশি হয় কারণ হয়ত আমাদের এখানে গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : দেখুন ২০ বছর আগে যাদের গরিব বলা হতো তারা তো এখন গরিব নেই। তবে যেটা আমাদের ক্ষতি করে সেটা হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঝড়-তুফান, বন্যা। এগুলো ইউরোপেও হয়ে গেছে। এসব সংকট তো হবেই। এসব সংকট ছাড়া কোনো দেশ আছে বলুন।
সাপ্তাহিক : একটা তো প্রাকৃতিক, আরেকটা তো মানুষ সৃষ্ট?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এগুলো সবই প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সাপ্তাহিক : আমাদের জন্য কি প্রাকৃতিক দুর্যোগটা বেশি দায়ী না মানুষ সৃষ্ট সংকট বেশি দায়ী?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুযোগ অনেকে নেয়। ব্যবসা করে। আবার একই সঙ্গে অনেকে দানও করে। যে লোক সুযোগ নিচ্ছে, লাভ করছে, সেও হয়ত দান করছে।
সাপ্তাহিক : আপনি যখন উঠে এসেছেন গ্রাম থেকে। তখন গ্রামেও শিক্ষিত লোক ছিল। গ্রামের মানুষের পক্ষে শিক্ষার সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন তো  শিক্ষা ক্রমশ ব্যয়বহুল হচ্ছে। গরিব মানুষের পক্ষে...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এটা একটা নতুন ট্রেন্ড আমি দেখতে পাচ্ছি।  এটা আগে ছিল না। আমরা যখন লেখাপড়া করেছি তখন এই ধারাটা ছিল না। আমি কলকাতায় পড়াশোনা করেছি। যে হোস্টেলে থাকতাম সেটা ১৮০ বিঘার ওপরে। আবার হেডমাস্টার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করে আসা। তিনি খুব ভালো ফুটবলার ছিলেন। মোহনবাগানে খেলতেন। আমাদের ৮টা ফুটবল মাঠ ছিল, হকি মাঠ ছিল।
সাপ্তাহিক : স্কুলের নাম কি?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : শিক্ষাসাগর। নাভানা রোডে।
আমি মনে করি যে, এখন অনেক দাতা সংস্থা রয়েছে। অনেক এনজিও কাজ করছে। ব্র্যাক কাজ করছে, গ্রামীণ ব্যাংক কাজ করছে।
সাপ্তাহিক : ব্র্যাক তো শিক্ষার বিষয়ে মনোযোগী?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : শিক্ষার প্রতি তাদের একটা ঝোঁক আছে। এজন্য ব্র্যাকটাকে, আমি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়েও। গ্রামীণ ব্যাংকে শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নাই। উনি একটা টাকা দিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে মেয়েরা গিয়ে আগে বসে থাকত, ক্ষুদ্র ঋণের ফলে ওরা চাল থেকে মুড়ি করে, চিড়া করে বাজারে বিক্রি করে বেঁচে ছিল। কেউ না খেয়ে মারা যায়নি এটা বলা চলে। কিন্তু ব্র্যাকে শিক্ষা এবং না খেয়ে থাকার বিরুদ্ধে কাজ দুটোই একসঙ্গে ব্র্যাকে। আমি গ্রামীণ ব্যাংকের কাজকে ছোট করছি না। সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা যে দেশে নাই সে দেশ তো অনেক পিছিয়ে পড়বে।
সাপ্তাহিক : আপনি এই যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন এবং এখনো দিচ্ছেন, আপনার কখনো হতাশা আসে না?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হতাশা যে আসে না তা নয়, কিন্তু আমি চেষ্টা করি এটাকে অতিক্রম করার জন্য। যখন সব কিছু হয়ে গেছে সামান্য কিছুর জন্য একটা কাজ আটকে আছে, তখন হতাশা আসে। ওটা খোলা যায় পয়সা দিয়ে। কিন্তু আমি সেটা করি নাই কোনো সময়। সেজন্য আমার কাজ সব সময় দেরিতে হয়।
সাপ্তাহিক : কিন্তু আপনার নিজের প্রতিষ্ঠানের কথা যদি বলতে যাই তাহলে তো এটা  যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ, গত ৪০ বছরে  দেশটার যে জায়গায় থাকার কথা সে জায়গায় পৌঁছুতে পারেনি।
স্যামসন এইচ চৌধুরী : না আমি সেটা বলব না। আমাদের এখানে ইন্ডাস্ট্রি তো প্রচুর হয়েছে। সরকার যেখানে ফেল করেছে সেখানে ব্যাক্তিমালিকানায় তো হচ্ছে। কাজেই আমি মনে করি না যে, ইতিবাচক উদাহরণ নাই, সাফল্য নাই।
সাপ্তাহিক : তাহলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : অবশ্যই আছে। অবশ্যই আছে। তবে যত দ্রত আমরা চেয়েছিলাম তত দ্রুত হচ্ছে না।
সাপ্তাহিক : আপনার প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আপনার ছেলেদের কথা আসে। আপনার ছেলেদের যদি আপনি মূল্যায়ন করতে চান আপনার কাজের জায়গা থেকে, আপনার প্রতিষ্ঠানের জায়গা থেকে যে যেভাবে কাজ করছে, তাদের আপনি কিভাবে নেন?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : যে যে কাজ পারবে সেই কাজ তাকেই দেয়া হয়। এদেরকে প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানো হয়। তারা যোগ্য হয়েই দায়িত্ব নিয়েছে। যোগ্যতার সঙ্গেই কাজ করছে।
সাপ্তাহিক : এদের কাছে আপনার প্রত্যাশার যে জায়গা...
স্যামসন এইচ চৌধুরী : হ্যাঁ, সেটা পাচ্ছি আমি। না হলে আমরা দেশের এক নম্বর প্রতিষ্ঠান হলাম কিভাবে।
সাপ্তাহিক : আজকের গ্রামের কেউ যদি স্যামসন এইচ চৌধুরী হতে চান তাহলে কি যোগ্যতা, কি গুণ দরকার?
স্যামসন এইচ চৌধুরী : এটা নির্ভর করবে ‘হোয়াট ইজ হিজ এ্যাম্বিশন’ তার ওপরে। আমি যদি বলি, ‘চাকরি চাই, চাকরি চাই’ তাহলে তো হবে না। আপনার ভিশন থাকতে হবে, মিশন থাকতে হবে। আপনাকে লেখাপড়া শিখতে হবে। আপনাকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। জ্ঞান যদি থাকে তবে সেখান থেকে আপনার উত্তরণ হবে। এই জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞান অর্জন করাটাই আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • ‌'রাজনীতি এখন ভোগের মহিমা শেখায়'-ড. তোফায়েল আহমেদ
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive