|
শুভ কিবরিয়া
ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুনতর সব ঘটনা ঘটছে। শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা এবং সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের অত্যাচার যখন চরমে তখন নতুন করে ঘিয়ে আগুন ঢালে জামায়াত-শিবির। হত্যা আর রগ কাটার নতুন চেহারা নিয়ে হাজির হয় ছাত্র শিবির, ধর্মের নামে। বিপরীতে পক্ষকালব্যাপী জামায়াতÑশিবির বিরোধী সরকারি চিরুনি অভিযান চলে। মিডিয়াজুড়ে তর্জন-গর্জন ব্যাপক আকার ধারণ করে। ভাবখানা এই, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে জামায়াতÑশিবিরের দেশব্যাপী পতন ঘটবে। নিষিদ্ধ হবে এই সংগঠন। কিন্তু যারা আওয়ামী সরকারের কর্তাব্যক্তিদের জানে, অর্থÑক্ষমতা, ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতি তাদের আনুগত্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তারা খুব নিশ্চিত ছিলেন, সরকার খুব দ্রুতই থেমে যাবে। ভেতরের হিসেব নিকেশ মিললেই সব উত্তাপ মিইয়ে পড়বে। বিশ্লেষকদের অভিমত, জামায়াতের নিজস্ব কিছু হিসেব নিকেশের ভুল এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্ক খেলায় হেরে আপাতত একটা বড় থাপ্পড় জুটল তাদের। ইতোমধ্যে সরকারের আগ্রাসন তারা থামিয়ে দিতে পেরেছে। সরকারকে অন্যদিকে ব্যস্ত রেখে নিজেদের সাংগঠনিক বিরোধকে মিটিয়ে পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছিল তা তারা সামলে নিয়েছে। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র শিবির’ এর অভ্যন্তরীণ ক্ষত না কাটলেও পদত্যাগীদের বদলে এই বিপত্তির মধ্যে নতুন কমিটির ঘোষণা দিতে তারা সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে সরকার স্পন্সরড শিবিরবিরোধী অপারেশন থেমে গেছে। সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের পক্ষে আদর্শিক, রাজনৈতিক প্ররোচনায় শিবিরবিরোধী ছাত্রজনমত গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কেননা অর্থ, ক্ষমতা, টেন্ডারবাজি, মেয়েদের প্রতি নির্যাতন ইত্যাদি অনিষ্টকর কাজে তারা এতটাই আদর্শচ্যুত যে তাদের পক্ষে সরকারের পুলিশ বা গোয়েন্দাবাহিনীর পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মতাদর্শিক রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এখন আর সম্ভব নয়। দুর্বল নেতৃত্ব, আদর্শচ্যুত কর্মকা-ে ব্যাপৃত ছাত্রলীগের পক্ষে তাই ছাত্র সংগঠনে কর্তৃত্ব বজায় রাখতেও নির্ভর করতে হবে পূর্ণভাবে সরকারি প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর।
২. ছাত্র সংঘাত-সহিংসতা যেতে না যেতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়ে উঠল। পাহাড় অশান্ত শেষ হতে না হতেই আসে ২৫ ফেব্রুয়ারি। পিলখানা হত্যাকা-ের বছরপূর্তির ঘটনা। মিডিয়া এ ঘটনায় আগের বছরের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। গত বছরে যখন এ ঘটনা সংঘটিত হয়, তখন মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে সামরিক মহলে যে ক্ষোভ উঠে এবার মিডিয়া সেদিকে খেয়াল রাখে। তবে, মিডিয়া এবং সামরিক মহলের একটি বড় অংশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষে একটা অংশ এ ঘটনায় বিচার কাজ যেভাবে এগিয়েছে তাতে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে। এই নৃশংস ঘটনার কুশীলবদের ছেড়ে দিয়ে, দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিয়ে সরকার যে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাচ্ছে তা শুধু বিএনপি-জামায়াতের অভিযোগ নয়, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকেই মিডিয়ায় টকশোতে প্রকাশ্যেই তা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিলখানার ঘটনায় নিহত সামরিক কর্মকর্তাদের বনানী কবরস্থানে নিজে ফুল বা শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে যাননি। তার পক্ষ থেকে সামরিক উপদেষ্টা এ কাজটি সেরেছেন। এ বছর এ ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো আর্থিক সহায়তা পেলেও, বিচারের বিষয়ে সরকার যে আন্তরিক, প্রকৃত খুনিরা যে শাস্তি পাবে, সেই ভাবনায় খুব নিশ্চিত নয় তারা। সরকার বিরোধী অংশ প্রকাশ্যেই এ হত্যাকা-কে ভারতীয় স্পন্সরে সরকারি সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলে চিহ্নিত করেছে। এ বিষয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষী সংগঠন হিযবুত তাহ্রীর বড় বড় পোস্টার (চাররঙা দামি পোস্টার) ঢাকার দেয়ালে সাঁটিয়েছে। সুতরাং বোঝা যায়, পিলখানা হত্যাকা-ের প্রথম ধাপ কাটিয়ে উঠলেও ভেতরের ক্ষোভ, দ্রোহ, উত্তাপ, বিক্ষুব্ধতা সরকার যে প্রক্রিয়ায় থামিয়েছে তা সম্পূর্ণ নির্বাপিত হয়নি। অন্যদিকে, পিলখানা হত্যাকা-ে অভিযুক্ত গ্রেফতারকৃত জওয়ানদের ৭১ জনের মৃত্যু বিষয়ে মিডিয়া এবং সরকার তুলনামূলক নীরব থেকেছে। বিডিআরের ৭১ জন জওয়ান নির্যাতনে না স্বাভাবিকভাবে মরেছে তার সুস্পষ্ট জবাব নেই। কোনো পরিকল্পিত এবং সুষ্ঠুÑনির্ভরযোগ্য তদন্ত হয়নি। এরা ক্ষমতাবান পরিবারের সন্তান নন, রাজনৈতিক মূলধারার শক্তিমান অংশ নন, কিংবা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণী থেকে আসা মানুষ বলেই এ মৃত্যু শেষ পর্যন্ত আমলে নেয়া হলো না বলেই অনেকের ধারণা। এই প্রশ্নপূর্ণ মৃত্যু সম্পর্কে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত প্রায় স্পর্শহীন থেকে গেল। এ বিষয়ে সরকার সমর্থক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর নির্লজ্জ নীরবতা ও লোক দেখানো চিৎকার কাগুজে বাঘ হয়ে থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মনোবেদনা কমাতে পারেনি।
৩. এ ঘটনা শেষ হতে না হতেই গাজীপুরে সোয়েটার কারখানায় ২২ জন শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা গেল। বড়লোক গার্মেন্টস মালিকরা যে প্রাচীন দাস প্রথাকে আধুনিক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে রূপান্তরিত করেছেন তার সর্বসাম্প্রতিক নির্মম দৃশ্য এটি। কিছু ক্ষতিপূরণ ছাড়া এর কিছুই হবে না। কেননা দেশের ক্ষমতা বলয়ের একটা বড় অংশ এই গার্মেন্টস মালিক বা তাদের সহযোগীরা। সুতরাং আগুনে ঝলসানো লাশই সার। ফেব্রুয়ারির মধ্য ভাগ থেকে দেশে যে হত্যা ও মৃত্যুর ধারা শুরু হয়েছে এ ২১ জন তার সংখ্যাই বাড়াল কেবল, সামাজিক ও রাজনৈতিক বড় কোনো অভিঘাত ছাড়াই।
৪. এর মধ্যে নতুন খবর, প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় আওয়ামী রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নিয়েছেন। রংপুরে জাতীয় পার্টির দুর্গে আঘাত হানতে ‘জয়’ বড় ভূমিকা রাখবেন এ আশা সে অঞ্চলের আওয়ামী নেতা-কর্মীদের। মহাজোটের পেটে ঢুকে জাতীয় পার্টি এমনিতেই কোণঠাসা, ‘জয়ে’র আগমনে তাতে হয়ত বড় ধাক্কা পড়বে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদকের একটি পদ এখনো ফাঁকা। সেখানে অচিরেই তাকে দেখতে পেলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনীতিতে আগমনকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি। তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধা হলো। একটা শক্ত প্রতিপক্ষ পাওয়া গেল। তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী নেতৃত্বের যে কোনো আক্রমণ হলে, তারা পাল্টা উত্তর দেয়ার একটা রাজনৈতিক পথ অন্তত তৈরি করতে পারবে ভবিষ্যতে তারা। সজীব ওয়াজেদ জয় রাজনীতিতে নতুন কি অভিঘাত আনবেন ? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই অভিঘাতের সাক্ষাৎ উত্তর তারেক জিয়া। জয় কি তারেক জিয়ার বিকল্প কিছু দেবেন? ভারতে রাহুল গান্ধী যে ভূমিকা নিয়েছেন তিনি কি তা নিতে পারবেন? সোনিয়া গান্ধীর যে রাজনৈতিক অবস্থান, তার ছায়ায় থেকে রাহুল গান্ধী ‘ক্ষমতা নয় সংগঠন’ এই যে নতুন দার্শনিক ভিত্তির ওপরে গোটা ভারতে নতুন ইমেজ তৈরি করেছেন, জয় কি সেই উচ্চতম জায়গা ছুঁতে পারবেন? এগুলো ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তবে বাঙালি মুসলমানের যে ‘তৈল চর্চার’ ইতিহাস এবং ক্ষমতাবানদের ‘তৈল মাখার’ যে অভ্যাস তাতে খুব বড় রাজনৈতিক চর্চা-অভিজ্ঞান এবং নির্মোহতা না থাকলে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানোর কোনো বিকল্প নেই। বেগম জিয়ার শাসনামলে দেশের অভ্যন্তরেই তারেক জিয়া দ্বিতীয় স্টেটের জন্ম দিয়েছিলেন। সজীব ওয়াজেদ জয় ঢাকা, রংপুর, নিউইয়র্কে অবস্থান নিলে নতুনতর ‘তিনটি স্টেট বা ক্ষমতা কেন্দ্র’ যে তৈরি হবে না, তার নিশ্চয়তা কি? এখন দেখার বিষয় পশ্চিমে শিক্ষা নেয়া, রাজনৈতিক পরিবারের এই প্রযুক্তিমনা উত্তরাধিকার রাজনীতিতে নতুন কি সংযোজন করেন।
৫. বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রমেই বিদেশি ক্ষমতাধরদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ১/১১ তার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। ১/১১ পরিস্থিতির সঙ্গে সমঝোতার সূত্রে বিএনপির করুণ ব্যর্থতা তাদের শুধু ক্ষমতা থেকেই বিদায় করেনি নিদারুণ দুর্দিনেও ফেলেছে। শেখ হাসিনা সেই দুই বছরে আন্তর্জাতিক লবিগুলোর সঙ্গে যে বোঝাপড়া করতে সক্ষম হয়েছিলেন এখন তার দেয়ার পালা। ইতোমধ্যে ভারত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সুবিপুল কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করেছে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, যৌথ গ্রিড ব্যবস্থাপনা কার্যকর হলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত একচেটিয়া বিদ্যুৎ বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাবে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবসায় ‘চীন’ দীর্ঘদিন বড় ভূমিকা রেখেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন বিদ্যুৎ ডিল কার্যকর হলে সেটা হবে চীনের জন্য বড় ধরনের ব্যবসায়িক বিপর্যয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক বাজারে চীনের যে আধিপত্য তা কমাতে ইতোমধ্যে অনেকটাই এগিয়ে গেছে ভারত। চট্টগ্রাম, মংলা বন্দরে ভারতের উপস্থিতি, ভারতের ট্রানজিট/করিডর লাভ বাংলাদেশের বাজারে চীনের আধিপত্য কমাবে। এ ব্যবসাÑযুদ্ধ অচিরেই রাজনৈতিক মহলেও ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক লড়াইয়ে ‘চীন-ভারত’ অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভেতরে ভেতরে এর রক্তক্ষরণ সক্রিয় হয়েছে। ‘চীন’কে ম্যানেজ করতে না পারলে সেটা বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপত্তি ডেকে আনলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শাসনামলে রাজনৈতিক সংঘাতের মুখে ফেলেছিল চীনপন্থীরাই। আজকার বাংলাদেশে আওয়ামীবিরোধী চীনপন্থীদের গলার সুর আর জামায়াত-বিএনপির গলার সুরে কিন্তু অমিল নেই। আপাতত, যত উপেক্ষাই করুক অচিরেই ভেতরে-বাইরে এই যৌথ শক্তির মোকাবেলা সরকারকে করতে হবে। হয়ত সেই সমীকরণ মেলাতেই প্রধানমন্ত্রী অচিরেই চীন সফরে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের সমস্যা হচ্ছে, সরকার একই সঙ্গে চীন-ভারত-আমেরিকার ত্রিপক্ষীয় স্বার্থ মেটানোর বড় ঝুঁকি নিয়েছে। ভারত-ইসরাইল বাণিজ্য ও সামরিক সখ্যের যে বাড়তি ঝুঁকি তাও সরকারকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আজকের দুনিয়ায় চীন, ভারত, আমেরিকা নিজেরা নিজেদের দেশে বাণিজ্য আধিপত্য বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লড়াইয়ে রত আছে। বাংলাদেশের সমুদ্র ও স্থলের খনিজ সম্পদ ক্ষেত্রে মার্কিন আধিপত্য বাড়ছে। চীন এ বিষয়ে অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠছে। অমীমাংসিত সমুদ্রসীমা বিরোধ মেটাতে মায়ানমারকে রাজি করাতে হলে চীনকে খুশি রাখতে হবে। অন্যদিকে চীনকে খুশি করতে চাইলে ভারত বেঁকে বসবে। আমেরিকা চাইবে চীন ও ভারতের চাইতে বড় শেয়ার। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা যারা চালাবেন, তাদের জন্য এই তিন বড় বাণিজ্য হাঙ্গরকে সন্তুষ্ট করা কতটা সম্ভব সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আশঙ্কা হচ্ছে, সরকার এসব বিষয় পূর্বাপর বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুতগতিতে যেভাবে ভারতমুখী হয়ে পড়তে চাইছে, তা শেষ পর্যন্ত সরকারের ভেতরে বড় কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে কি না? সরকারের ভেতরে রাজনৈতিকভাবে ক্রিয়াশীল ‘চীন’, ‘ভারত’ লবির দ্বন্দ্ব যেমন সরকারকে জ্বালাবে, তেমনি ম্যানেজ করতে না পারলে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের এই ‘চীন’Ñভারত’ লবিও অস্থিরতা তৈরিতে সকল রকম রসদ জোগাবে। তাতে বিদেশি সকল ষড়যন্ত্র আরো ঘনীভূত হবে।
৬. রাজনীতি ও বিদেশি সাহায্য সম্পর্কে ১৯৭১ সালের নবেম্বর মাসে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একটি বিশ্লেষণ দিয়েছিলেন। সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বয়ানে তার বর্ণনা এ রকম, ‘প্রশ্ন করলাম : বিদেশি ষড়যন্ত্র সফল হবে বলে আপনি মনে করেন? তাজউদ্দীন বললেন : তৃতীয় বিশ্বে ফরেন এইড বা বিদেশি সাহায্য এবং তার রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে মার্কিন লেখকদেরই কয়েকটি লেখা আমি পড়েছি। এই লেখা পড়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমি শঙ্কিত। এদের অপারেশন হবে অনেকটা এই ধরনের। বাংলাদেশ মুক্ত হলে এরা বিপুল সাহায্যের অফার নিয়ে এগিয়ে যাবে এবং নিজেদের তত্ত্বাবধানে সাহায্য বিতরণ করতে চাইবে। সাহায্য যা পাওয়া যাবে, তার বারো আনা ব্যয় হবে তাদের তদারকিতে, সাহায্য প্রেরণের জাহাজ ভাড়ায় এবং তাদের লোকদের খরচ মেটাতে। কিন্তু বাইরে প্রচার হবে, বাংলাদেশে সাহায্যের বন্যা বইয়ে দেয়া হয়েছে। এই সাহায্য প্রকৃত অভাবী লোকদের হাতে পৌঁছাবে না। সাহায্যের টাকার দৌলতে সরকারি প্রশাসনে তাদের সমর্থক শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি করা হবে। দেশপ্রেমিক অফিসার ও মুক্তিবাহিনীর লোকজনকে দুর্নীতিপরায়ণ করার চেষ্টা হবে। সরকারবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশিদের সমর্থক রাজনৈতিক দল ও পত্রিকাকে টাকা দেয়া হবে। সরকারি দলের মধ্যে নিজেদের গ্রুপ তৈরি করা হবে। সামরিক বাহিনীর আনুগত্য ও দেশাত্মবোধ নষ্ট করা হবে। তার পর বাংলাদেশের নতুন সরকার যদি এই বিদেশিদের কথামতো না চলেন, তাহলে সব দুর্নীতি ও খারাপ কাজের দায়-দায়িত্ব সরকারের কাঁধে চাপানো হবে। সাধারণ মানুষÑ বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলা হবে। ব্যবসায়ী শ্রেণীকে হাত করে দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করা হবে এবং এইভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের জনপ্রিয়তাকে নষ্ট করার পর সিভিল অথবা মিলিটারি ক্যু ঘটিয়ে পছন্দমতো তাঁবেদার সরকার বসানো হবে।’ (সূত্র : তাজউদ্দীন আহমদ ॥ বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর, লেখক : কামাল হোসেন, প্রকাশক অঙ্কুর প্রকাশনী, পৃষ্ঠÑ ৫৩৬-৩৭)
৭. তাজউদ্দীন আহমদের এই মূল্যায়ন তার জীবদ্দশায় বাস্তবে ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু এবং তার নিজের জীবনের মর্মন্তুদ পরিণতির মধ্য দিয়ে সেই ভয়াল অনিবার্যতা মেনে নিতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীনÑভারতÑআমেরিকাÑ ইসরাইল যে ভূমিকায় নেমেছে তাতে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের চাইতেও জটিল সময় পার করছে। কেননা সে সময় সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতি ছিল ঐক্যবদ্ধ। কতিপয় যুদ্ধাপরাধী ছাড়া গোটা দেশ ছিল ঐক্যবদ্ধ। হালে অবস্থা স¤পূর্ণ বিপরীত। দেশের রাজনীতি, সরকার, প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, বুদ্ধিজীবী, বিদ্যাজীবী, পেশাজীবী সকলেই আওয়ামী-বিএনপি শিবিরে বিভক্ত। এই বিভক্তি স্বার্থান্বেষী সুবিধাবাদীদের নানা রকম সুযোগ দিলেও জাতির জন্য তা হবে ভয়ঙ্কর। আমাদের সরকার ও বিরোধী দল তা বুঝতে পারছে না। গণতন্ত্রের জন্য বিপদ সেটাই। |