আহসান কবির
প্রিয় মাহবুব তুই না ফেরার দেশে চলে যাবার পর সূর্যকে আরো একবার প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী! তুই না ফেরার দেশে চলে যাবার পর তোর আরেক সহযাত্রী আমার বন্ধু মেজর হুমায়ুন হায়দার পাবলোর বুকের ধন ঋত্বিকও চলে গেছে আকাশের ঠিকানায়। এই যে গত বছর তোকে আমি চিঠি লিখেছিলাম, আজো লিখছি, তুই কি চিঠি পেয়েছিলি কিংবা পাবি? নাকি কিছুই হবে না, বছরের পর বছর তোর কাছে শুধু চিঠির স্তূপই জমবে? মাহবুব যখনই এদেশে কোনো ঘটনা ঘটে হাজারো প্রশ্ন উদয় হয় মানুষের মনে। কিছু প্রশ্ন থাকে মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন হিসেবে। এই যেমন ২৫ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু যদি গ্রেফতার বরণ না করতেন তাহলে কি হতো? ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন জেনারেল ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না? জিয়াউর রহমান কেন তার জীবদ্দশায় নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করেন নি? পিলখানার ঘটনায়ও এমন কিছু প্রশ্ন জমেছে মানুষের মনে। মাহবুব বলতে পারিস এই প্রশ্নের উত্তর কি মানুষ জানতে পারবে? প্রশ্নগুলো তাহলে বলিÑ এক. বিডিআর জওয়ানদের অনেকে জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন তারা নিজেরা মিটিং করতেন। এরপর তাদের দাবি দাওয়াগুলো তারা জনপ্রতিনিধিদের জানানোর পরিকল্পনা করেন ২০০৮-এর নবেম্বর ডিসেম্বরে। তখন সারাদেশ নির্বাচনী জোয়ারে মাতাল। তখন তারা আওয়ামী লীগ নেতা ফজলে নূর তাপস ও নাসির উদ্দীন পিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ল্যান্ড স্লাইড বিজয় হলে তারা আবারো ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাপসের বক্তব্য ছিল এটা তার দেখার ব্যাপার নয়। এরপর তারা শেখ সেলিম ও প্রতিরক্ষা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। বিডিআর বিদ্রোহীদের এই যোগাযোগ নিয়ে তখন কেউ মাথা ঘামান নি কেন? যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল তাদের কেউ কি তখন গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারকে অবহিত করতে পারতেন না? দুই. বিডিআর বিদ্রোহীদের একেবারে ‘কোর’ গ্র“পের সদস্যরা তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে লিফলেট বের করেছিল যা ছড়িয়ে দেয়া হয় পিলখানায়। মেজর জেনারেল শাকিলসহ অনেক অফিসার এই লিফলেটের ব্যাপারে জানতেন। তারা কি উপর মহলে জানিয়েছিলেন? গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন কী সবসময় ঘুমিয়েই থাকে? জেনারেল শাকিল পাল্টা লিফলেট ছাপিয়ে সেটা বিলি করতে চেয়েছিলেন সেটা করেন নি কেন? তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমনের তারিখ প্রথমে ১৩, পরে ১৮ এবং সবশেষে ২৪ ফেব্র“য়ারি ২০০৯-এ নির্ধারণ করা হয়। কেন তারিখ বদল করা হয়েছিল? বিডিআর সৈনিকদের এই যে বিদ্রোহ ভাব সেটা কী প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছিল? এই ‘বিদ্রোহ উন্মুখ’ পরিস্থিতিতে কেন তাকে বিডিআর সদর দফতরে আমন্ত্রণ জানানো হয়? চার. সাধারণত একজন সেনা অফিসার ‘কোথ (যেখানে অস্ত্র থাকে) পাহারার জন্য কোথে অবস্থান নেন না। তখনই এর প্রয়োজন পরে যখন কোন বিশেষ পরিস্থিতির তৈরি হয়। যেমন ১৯৯৬ সালের মে মাসে যখন জেনারেল নাসিমকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে বহিষ্কার করেন সে সময়কার রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস, যখন ঢাকার রাস্তায় ট্যাঙ্ক নেমেছিল, সেই পরিস্থিতিতে অফিসারদের কোথ পাহারায় সরাসরি নিযুক্ত করা হয়েছিল। ২৩ ফেব্র“য়ারি দিবাগত রাতে এই দায়িত্বে ছিলেন মেজর মোকাররম। বিডিআর বিদ্রোহের সময় মোকাররম প্রাণে বেঁচে যান। ২৪ ফেব্র“য়ারি দিবাগত রাতে এই দায়িত্বে ছিলেন মেজর আব্দুস সালাম খান। পরদিন দরবার শুরু হবার আগেই অর্থাৎ ৮:৩০ মিনিটের দিকে মেজর সালামকে বেঁধে ফেলে বিদ্রোহীরা। তারপর অস্ত্র ও গুলি লুট করে সৈনিকরা। সম্ভবত মেজর সালামকে তখনই হত্যা করা হয়। এই খবরটি কি দরবারে উপস্থিত কেউ জানতে পেরেছিলেন? পাঁচ. ২৫ ফেব্র“য়ারি ২০০৯ এ দরবার হলে হত্যাকা- শুরু হবার পর বিডিআর বিদ্রোহীরা ৫৭ জন অফিসার ও ২ জন সৈনিকের মধ্যে প্রথম দফায় কয়জন কে হত্যা করা হরেছিল? ক’জন কে মারা হয় পরে? এদের কে কী বাঁচানো যেত না? কেন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় নি? ছয়. সকাল ১০-৩০ মিনিটের ভেতর বিডিআর পাঁচ নম্বর গেটের সামনে উপস্থিত হয়েছিল র্যাব। যদি আর্মি বা র্যাব ক্র্যাকডাউন হতো তাহলে কী ঘটত? হাজারো লোক মারা যেত নাকি কম লোক ক্ষয়ে আরো কিছু প্রাণ বাঁচানো যেত? সাত. পরিবার পরিজনদের কী ২৪ ফেব্র“য়ারিই সরিয়ে দিয়েছিল বিডিআর সৈনিকরা? যদি সত্যি হয় তাহলে এটি কী কারো চোখেই পড়েনি? আট. বিডিআর সৈনিকদের একটি দল ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। কতজন অফিসারকে তারা মেরে এসেছে সে কথা কী তখন জানতে চাওয়া হয়েছিল? ২৫ ফেব্র“য়ারি রাতে তখন প্রথম অস্ত্র সমর্পণ করে সৈনিকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে, তখনো তিনি কী জানতে চাইতে পারতেন না? এরপর তিনি কিছু অফিসারের পরিবারকে উদ্ধার করে আনেন। সবাইকে তখন উদ্ধার করার স্টেপ নেন নি কেন? সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা, আবার ক্ষমাপ্রাপ্তদের বিচারের সম্মুখীন করা কি দ্বিমুখী নীতি না? নয়. এ পর্যন্ত ৬৯ জন বিডিআর সৈনিক মারা গেছেন। বলা হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। কোনো কিছু লুকোনোর জন্য কী এদের মেরে ফেলা হলো? দশ. সাধারণ আইনে বিচার শুরু হয়েছে। বিদ্রোহের বিচার হচ্ছে। এরপর আছে হত্যা, নিপীড়ন ও লুটের মামলা। বিচারে সাক্ষী একটা ভাইটাল ব্যাপার। অনেকেই বলেছেন সাক্ষী দেয়াটাকে এক ধরনের হ্যারেজমেন্ট হিসেবে দেখছেন নিহত অফিসারদের আত্মীয়স্বজন। অনেকেই সাক্ষী দিতে চাচ্ছেন না। তাহলে? এগারো. সকাল থেকেই বাঁচার জন্য অনেকে বিভিন্ন জায়গায় রিং করেছিলেন। বিদ্রোহীরাও এখানে সেখানে মোবাইল থেকে রিং করেছিল? মোবাইল কল লিস্ট ও কথোপকথন কী রেকর্ড করা হয়েছিল? মাহবুব, প্রশ্নের তালিকা এভাবে বাড়তেই থাকবে। কিন্তু তোকে আমরা কতটা মিস করি, কতটা স্মরণ করি, তুই সেটাও হয়ত বুঝতে পারিস না। তোর স্মরণে মিলাদ হলো। এরপর আমরা বরিশাল ক্যাডেট কলেজে গেলাম। যারা এসএসসি পরীক্ষা দিল তাদের সংবর্ধনা দিলাম। শুরুতেই সবাই দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন। বললাম তোকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বললাম তুই ২৫ ফেব্র“য়ারি তারিখেই বিডিআরে জয়েন করতে গিয়েছিলি। কী দোষ ছিল তোর যে তোর মুখে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল? কলেজের গেট টুগেদারেও তোর কথা আলোচনা হলো। ইফতার মাহফিলেও তুই। সবশেষে এ বছরের ১২ ফেব্র“য়ারি পিকনিকের কথাই ধর। খাওয়া দাওয়া র্যাফেল ড্র হলো। শুরু হলো গান। হঠাৎ করেই তোর বন্ধু মেজর (অব.) মামুন কবির ধীমান এসে বলল ভাইয়া, মাহবুবের কথা বেশি মনে পড়ছে। এই দেখুন ওর লাশের ছবি আমার মোবাইলে। মাহবুবের মেয়ে ফাইজার খুব অসুখ। জানি না মেজর হুমায়ুন কবির পাবলোর ছেলে ঋত্বিকের মতো মাহবুবের মেয়েটা কতদিন বাঁচবে! এরপর পিকনিকের আনন্দের মধ্যে তোর জন্য কান্না। মাহবুব বলতে পারিস তোর স্ত্রীর কষ্টটাকে কীভাবে স্পর্শ করি? মাহবুব, তোর মৃত্যুর পর একটা বছর কেটে গেল। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন বিডিআর বিদ্রোহ ছিল সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা। আর বিএনপি নেতারা বলছেন এই ষড়যন্ত্র করেছে আওয়ামী লীগ এবং তাপস, নানক, আযম এবং শেখ সেলিমরা এসব জানতেন। মাহবুব তুই বল কোন বিদ্রোহের বা হত্যাকা-ের ঘটনার যদি এমন রাজনৈতিক রূপ দেয়া হয়, তার সুবিচার কী ব্যাহত হয় না? সরকারের এক মন্ত্রী তো এসবের ভেতর জঙ্গি ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়েছিলেন! মাহবুব কলেজের সব অনুষ্ঠানে, গেট টুগেদারে তোর কথা মনে হবে। তোর জন্য আমরা কিছু করতে পারি নি জেনে আমাদের কষ্ট হবে। তোর বউ আর তোর মেয়ের মুখের দিকে আমরা তাকাতে পারব না। তারপরও তোকে আমরা ভুলতে পারব না। মাহবুব তোকে কথা দিয়েছিলাম আমি আর কখনো পিলখানা যাব না। গত এক বছরে আমি কখনই পিলখানা যাই নি। মাহবুব আমার কথা কী তোর মনে পড়ে একবারও? মনে পড়ে জাতিসংঘ মিশন থেকে এসে আমাকে একটা ক্যাপ দিয়েছিলি? অথবা মনে পড়ে তোকে পাঠানো সেই গান?
দুঃখ পেলেও আসিস পারলে ভালোবাসিস শুনতে কী পাস হাতছানি দেয় মুগ্ধ অচিন পুর? বুকের ভেতর আজো কাঁদে একলা সমুদ্দুর!
মাহবুব কতখানি কান্না কর দিলে ফিরে আসবি তুই? ইতি আহসান কবির theahsankabir@gmail.com |