শরীফ শহীদুল্লাহ জনৈক শিক্ষক তার ছাত্রদের বললেন, আমি যে তোমাদের পেটাই এটা আসলে আমার ভালোবাসার বহির্প্রকাশ। শুনে এক ছাত্র বলল, আমরাও আপনাকে ভালোবাসি কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারি না! প্রকৃত শিক্ষকরা এমনই, তারা ছাত্রদের ভালোবাসেন, তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করেন। আর উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করতেই মাঝেমধ্যে ছাত্রদের পেটান। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় লক্ষ্য করে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালানোর সময় দায়িত্বরত পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা হাতেনাতে ধরে ফেলেন ছাত্রদল নেতা প্রদীপ সাহাকে। প্রদীপ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, ছাত্রদল নেতা দলের চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে বোমা হামলা করবেন কেন? উত্তরটা সহজ। এটা আসলে বোমা হামলা নয়, ছাত্রদল নেতা প্রদীপ যে বেগম জিয়ার একনিষ্ঠ ভক্ত এবং তিনি যে দলের চেয়ারপার্সনের নিরাপত্তা কামনা করেন এটা তারই বহির্প্রকাশ। সরকার মুখে বলে, বিরোধীদলীয় নেত্রীর যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের কথা ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য এ হামলা করা হয়েছিল। আর নেত্রীর কার্যালয়ে বোমা হামলা করে পার পেয়ে প্রদীপ প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তার নেত্রীর নিরাপত্তা কত দুর্বল! কিন্তু এই মহান নেতাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে তার এই অভিনব উদ্যোগে বাদ সেধেছে বেরসিক পুলিশ।
কাকতালীয় বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয় ঘিরে ককটেল হামলার সাম্প্রতিক ঘটনা দুটি কেমন যেন কাকতালীয়। এক. বিএনপি নেতৃবৃন্দ যখন নেত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন ঠিক তখনই তার কার্যালয়ের কাছ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার এবং এই ঘটনার এক সপ্তাহের মাথায় পর পর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ। দুই. সেই ঘটনায় হাতেনাতে আটক ছাত্রদল নেতা প্রদীপ সাহা বিএনপি চিফ হুইপ জয়নাল আবদিন ফারুকের নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা। তিন. চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত অসংখ্য নেতাকর্মী উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীদের নিক্ষিপ্ত ককটেলটি গিয়ে পড়ে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্র পবনের কাছে। আর সামান্য ককটেলের শব্দে অজ্ঞান হয়ে পড়েন চারদলীয় সরকারের আমলের চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজির গডফাদার পবন। এবং চার. এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও জাতীয় সংসদের হুইপ মির্জা আজমকে সন্দেহ করছে বিএনপি। বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, মির্জা আজম ওই সময় বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে দিয়ে তিনবার যাতায়াত করেছেন।’ তবে মির্জা আজম বলেছেন, ওই এলাকা দিয়ে তার যাতায়াত করাটা কাকতালীয় ঘটনা মাত্র। বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয় ওই এলাকায় এবং সেখানে বোমা হামলা হয়েছে জানলে সেখান দিয়ে তিনি যাতায়াত করতেন না। সত্যিই সবকিছুই কেমন যেন কাকতালীয়। তবে রতনে যেমন রতন চেনে তেমনি বিরোধী দলের নেতাদের কাছে সরকারি দলের নেতারা চিরচেনা। আর চিনতে পেরেছেন বলেই বিএনপি নেতা সন্দেহ করেছেন যে, জাতীয় সংসদের একজন হুইপ হস্তে বিরোধীদলীয় নেত্রীর কার্যালয়ে বোমা নিক্ষেপ করতে পারেন!
সবার ওপরে নেত্রী সত্য কবি সাইদুজ্জামান রওশন তার অনুকাব্যে একবার লিখেছিলেন, আগুন লেগেছে আগারগাঁয়/পানি ঢালো আমার গায়। তো বিএনপির ভাষায় বোমা আর পুলিশের ভাষায় বোমাসদৃশ বস্তু কিংবা ককটেল বিস্ফোরিত হয় ঢাকাস্থ বিরোধীদলীয় নেত্রীর কার্যালয়ের সামনে। আর সেই ঘটনার প্রতিবাদে রাতভর মিছিল, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে সারাদেশে। নৈরাজ্য ঠেকাতে পুলিশ গ্রেফতারও করে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে। আবার দিন-তারিখ ঠিক করে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় ও জেলায় জেলায় প্রতিবাদ সমাবেশও করেছে। বিএনপির প্রতিবাদ দেখে মনে হয়েছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার তাদের কাছে মুখ্য নয়, তাদের চাই আন্দোলনের ইস্যু। বিএনপি চেয়ারপার্সন একা নন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পেছনেও সেই কবে থেকে লেগে আছে বোমাবাজরা। শেখ হাসিনার আগের মেয়াদে তার পৈত্রিক ভিটা গোপালগঞ্জ থেকেই উদ্ধার হয়েছিল প্রায় দুই মণ ওজনের বোমা। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে জনসমাবেশে হামলার ঘটনায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। তখনো মিছিল, সমাবেশ ও হরতাল করে বোমা হামলার প্রতিবাদ করেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আর এখন বেগম জিয়ার কার্যালয় ঘিরে শুরু হয়েছে বোমা হামলা। কখনো জর্দার কৌটা, কখনো বোমাসদৃশ বস্তু, আবার কখনো মৃদু ককটেল বিস্ফোরণ। তবে লক্ষণীয় যে, দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বোমার আকার পরিবর্তন হয়েছে। বোমার ওজন একশ কেজি থেকে একশ গ্রামে নেমেছে। একেই বুঝি বলে ডিজিটাল বোমা! যদিও প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে জনগণের নিরাপত্তা দূরে থাক, রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান দুই নেত্রী ক্ষমতায় থাকাকালে পরস্পরকেই বোমা হামলা থেকে রক্ষা করতে পারেন না। খালেদা জিয়ার আমলে আক্রান্ত হন শেখ হাসিনা আর শেখ হাসিনার আমলে খালেদা জিয়া। আর জনগণের অবস্থান মাইনক্যা চিপায়, উভয় আমলে আক্রান্ত হন তারা। sharif139@yahoo.com |