কাজী মাহমুদুর রহমান
কান নিয়েছে চিলে! চিলে কান নেয়ার গুজবে চিলের পিছু নেয়ার গল্প আমাদের সবারই জানা। কিন্তু তাই বলে কি আর নিজের কানে হাত দেয়ার কোনো দরকার আছে? এ প্রশ্ন করার আগে আমরা সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর মধ্যযুগীয় বর্বরতায় আগুন নিয়ে উন্মত্ত খেলার পর সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বিশ্লেষণ জেনে নেই। খোদ মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। একই বৈঠকে মৎস্য ও পানি সম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস জানিয়েছেন, দুর্গম পাহাড়ে অনেক জঙ্গি ঘাঁটি রয়েছে। মন্ত্রীদের কথা নিশ্চয়ই ফেলে দেয়ার মতো নয়। মন্ত্রীর কথামতো হয়ত জঙ্গিরা দেশকে ‘অস্থিতিশীল’ করতে এমন সংঘর্ষ বাধিয়ে দিয়েছে। আমাদের মনে পড়ে, এই সংঘর্ষের ঠিক এক বছর আগে কলঙ্কময় বিডিআর বিদ্রোহের পর সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বলেছিলেন, এই ঘটনায় জঙ্গিরা জড়িত। এমনকি বিভিন্ন বাহিনীতে জঙ্গিরা ঢুকে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। কিন্তু এতদিনের তদন্তে এমন কিছু এখনো পর্যন্ত প্রমাণ করা যায় নি। পাহাড়ের ঘটনার পর তার সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পৃক্ততা যদি সত্যিই প্রমাণিত হয় তবে তা নিশ্চয়ই একটি আশার ব্যাপার, কিন্তু এই আশার উল্টোপিঠের প্রশ্নটাও জরুরি, এ আবার নতুন কোনো চিলের পিছু ছোটা শুরু হলো নাকি? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছেন তখন তার মনে কি এ প্রশ্নের উদয় হয়নি যে এই গোয়েন্দাদেরই দায়িত্ব ছিল সংঘাতপূর্ণ পাহাড়ে, যেখানে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার অনেক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি, সেখানকার আগাম খোঁজখবর রাখা?
শুধুই কথার কথা নয় গত বছর বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও সংসদে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন। সেখানে অনেক ইঙ্গিত-আভাস দেয়া হয়েছে। এমনকি খালেদা জিয়া সেদিন তারেক রহমানের সঙ্গে কি কথা বলেছেন সে সম্পর্কেও সম্প্রতি তিনি মন্তব্য করেছেন। একজন ভদ্রমহিলা তার ছেলের সঙ্গে কি বললেন তা টেপ করা কিংবা সে সম্পর্কে প্রকাশ্যে মন্তব্য করার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখানে নিতান্তই অবান্তর, যেহেতু এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ইস্যু জড়িত। তবুও যদি ঘটনার সত্যিকার পূর্বাপরের হদিস পাওয়া যেত তাহলে কথা ছিল। খোদ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটিই জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলা বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত কাজে ঈপ্সিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। সত্যি সেলুকাস, এমন বিপর্যয়ের এক বছরেও কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তার চাকরি যায়নি, কেউ শাস্তি তো পায়ই নি, এমনকি কেউ এতে কোনো ভুলও স্বীকার করেনি। নিদেনপক্ষে সরকারের কেউ এ কথাও জানাননি যে আসলেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগাম কোনো তথ্য দিয়েছিল কি না!
কে বলে ওরা পারে না আমাদের দেশে কেনো অঘটন ঘটলেই গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয়। কিন্তু তারা আসলেই কি এতটা ব্যর্র্থ! এই কিছুদিন আগেও তো বঙ্গবন্ধু হত্যর মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি বজলুর রশিদ তনয়া মেহনাজ রশিদকে গ্রেফতার আর তার নাটকীয় সব জবানবন্দি (ফাঁস!) থেকে ব্রিগেডিয়ার বারি, ওরফে বিহারী বারির গোয়েন্দা কৃতিত্বের নানা ইতিহাস জানার সুযোগ পেলাম। জরুরি অবস্থার ভেতর রিমান্ডে থাকা রাজনীতিক আর ব্যবসায়ীরা অনেকেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দল ভাঙা আর নতুন দল গড়ার হেলাখেলার কথা বলছেন। বিএনপি-জামায়াত জোটের সময় দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা থেকে শুরু করে একুশে আগস্টের ঘটনার প্রেক্ষিতে জজ মিয়ার আষাঢ়ে গল্পের মতো সাফল্যের ফিরিস্তি দেয়ার সাধ্য কার আছে? আমাদের মনে আছে, এই গোয়েন্দারা ঢাকা ২০০৭ সালের মধ্য আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিক্ষোভের জের ধরে ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর শুধু নির্যাতনই করেনি রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র বিটিভিকে ব্যবহার করে কত কুৎসা প্রচার করেছে। গোয়েন্দা সূত্রের মিডিয়া ট্রায়াল নিয়ে আজকাল অনেক ডাকসাইটে রাজনীতিক টিভি টক শোতে জ্বলে ওঠেন। কিন্তু সরকারের ভেতর কী তার কোনো ছাপ আছে?
আর কত এভাবে? অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে হত্যা চেষ্টার পর তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিরোধী দলের হরতাল কর্মসূচি সফল করতে একজন সম্মানিত শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। সে মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নিরীহ ছাত্র আব্বাসকে পুলিশ বোমা আব্বাস বানিয়ে ছেড়েছে, গোয়েন্দা তৎপরতা কম হয়নি, হয়েছে মিডিয়া ট্রায়ালও। শেখ হাসিনাকে হুমকি দেয়া ই-মেইলের সূত্র ধরে নিরীহ পার্থ কী অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাও আমাদের জানা। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিছক ক্ষুদ্র স্বার্থে ব্যবহারের খেসারত আমরা এভাবেই দিয়ে চলেছি। এমনকি যারা এসব বাহিনীর পাহারায় থেকে নিজেদের খুব নিরাপদ মনে করেন এবং অতীতকে সহজেই ভুলে যান তাদেরও মাঝে মধ্যেই খেসারত দেয়ার সুযোগ আসে; কখনো কখনো নেমে আসে বৃহৎ ট্র্যাজেডি। গোয়েন্দা ব্যর্থতার বড় শিকার শেখ হাসিনা। গোয়েন্দা ব্যর্থতার বড় শিকার খালেদা জিয়া। তার পরেও কি এ যাত্রায় দিন বদলের কোনো গতি আসবে? সেই দিন কবে আসবে যেদিন অঘটনের আগাম খবর গোয়েন্দারাই দেবেন আর রাজনীতিকদের মন্তব্যে থাকবে সুনির্দষ্ট তথ্যের ভিত্তি? mahmudplus@yahoo.com |