 |
‘পাহাড়িরা অসহায়, আমি নিরুপায়’Ñ কথাগুলো বলেছিলেন খাগড়াছড়ির ডিসি, ২০০৩ সালে। ঘটনা ঘটেছিল মহালছড়িতে। পাহাড়িদের ১৪টি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। এক রাতের মধ্যে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল কয়েক হাজার পাহাড়ি। সেই সময় সরেজমিন খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পোড়ানো গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনী আমাদের ঢুকতে দিতে রাজি নয়। অনেক বিত-ার এক পর্যায়ে জানানো হলো গ্রামে যাওয়া যাবে তবে ছবি তোলা বা ভিডিও করা যাবে না। গ্রামে ঢুকে দেখলাম সবকিছু পুড়ে ‘কয়লা’ হয়ে গেছে। গ্রামগুলোতে আগের দিনও ঘরবাড়ি ছিল, মানুষ বাস করতÑ বোঝার কোনো উপায় ছিল না। পাহাড়িরা জানাল সেনাবাহিনীর শেল্টারে সেটেলার বাঙালিরা পাহাড়িদের গ্রামে আগুন দিয়েছে। শুধু আগুন দেয়ার মধ্যেই সীমিত ছিল নাÑ নির্যাতন, লুটপাটের পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছিল। এই ঘটনার পর বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। ক. সত্যি কী সেনাবাহিনী সেটেলার বাঙালিদের দিয়ে পাহাড়ি গ্রামে আগুন লাগাতে সহযোগিতা করেছিল? খ. তা যদি না হয় তবে আর্মি ওই এলাকায় থাকার পরও বাঙালিরা আগুন দিল কীভাবে? গ. আগুন যারা দিল তাদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কী আর্মির ছিল না? ঘ. পোড়ানো গ্রামের ছবি কেন তোলা যাবে না, কেন কথা বলা যাবে না পাহাড়িদের সঙ্গে? ঙ. সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকার পরও কেন স্থানীয়ভাবে এমন অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল? প্রশ্ন ছিল, প্রশ্ন আছে। জবাব তখনো ছিল না, এখনো নেই? এই প্রশ্ন ভবিষ্যতেও কী থাকবে? উত্তর কী পাওয়া যাবে? অতীতের অবস্থা তো জানাই গেল। ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার আগে বর্তমানের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।
২. সাজেক একটি বেশ বড় ইউনিয়ন। রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় সাজেকের অবস্থান। যাদের যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তারা জানেন প্রাকৃতিকভাবে কতটা মনোরম সাজেক! লেক- ছড়ার নীল-সবুজ, কোথাও কোথাও স্বচ্ছ পানি। সবুজ বেষ্টিত পাহাড়। কান না পাতলেও শোনা যায় পানির কলতান, গাছ পাহাড়ের আমন্ত্রণ। কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনে হয় এ যেন এক অন্য দুনিয়া! প্রকৃতি কত সুন্দর!! আমার ধারণা পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি স্থান এই সাজেক। এই সুন্দরের মাঝেই ঘটছে ভয়ঙ্কর দানবীয় ঘটনা। যার কিছু জানি, অনেক কিছুই জানি না। আবার অনেক কিছু জানি ভুলভাবে। ঘটনা ঘটে এক রকম। পাহাড় থেকে সেই খবর আমাদের এই রঙিন শহরে এসে পৌঁছায় আরেক রকম। এবারের মূল ঘটনা প্রসঙ্গে ফিরে আসি। অপরূপ সাজেক ইউনিয়নের একটি অংশ বাঘাইহাট। ৫০/৬০ কিলোমিটার দূরত্বে ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা সীমান্ত। বাঘাইহাট খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার পাশে। দীঘিনালা থেকে মারিষ্যা পর্যন্ত রাস্তা আছে। এই রাস্তার মাঝামাঝি থেকে সাজেক পর্যন্ত আর একটি রাস্তা তৈরি হচ্ছে। রাস্তার কিছুটা নির্মাণ হয়েছে। বাকিটার কাজ চলছে। বর্তমানের যে ঘটনা তার সূত্রপাত ২০০৫ সালে। স্থানীয় প্রশাসন সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে ১০ হাজার বাঙালি পরিবারকে এই এলাকায় বসানো পরিকল্পনা করে। তৈরি হয় পাহাড়ি-বাঙালি উত্তেজনা। কারণ যে এলাকায় বাঙালিদের বসানোর পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছিল তা সবই পাহাড়িদের। জোর করেই কিছু বাঙালি পরিবারকে বসতি স্থাপন করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ১০ হাজারের পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি। আবার পরিকল্পনা বন্ধ করেও দেয়া হয়নি। পাহাড়িদের এলাকা থেকে উচ্ছেদ করতে না পারলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ২০ এপ্রিল ৭টি পাহাড়ি গ্রামের ৭৬টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। লেখার শুরুতে মহালছড়ির যে ঘটনা উল্লেখ করেছি এই ঘটনাটিও হুবহু প্রায় একই রকম। ঘটনার তদন্ত শাস্তি কিছুই হয়নি। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত জানুয়ারি থেকে আবার বাঙালি বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। সাজেক পর্যন্ত যে রাস্তাটি হচ্ছে তার দুই পাশে বাঙালি বসতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। পাহাড়িরা জুমসহ নানাবিধ চাষাবাদ করে এই জমিতে। এই জমিতে চাষাবাদই তাদের জীবনজীবিকার অবলম্বন। স্বাভাবিকভাবেই বসতি স্থাপনে বাধা দেয় পাহাড়িরা। তৈরি হয় পাহাড়ি-বাঙালি উত্তেজনা। মাঝখানে থাকে সেনাবাহিনী। গুচ্ছগ্রাম থেকে সেটেলার বাঙালিদের এনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানেই বসতি স্থাপনের কাজ চলছিল। প্রথমাবস্থায় ১২টি বাঙালি পরিবারকে ‘গঙ্গারামমুখ’ এলাকায় বসানো হয়। প্রতিবাদে পাহাড়িরা বাঘাইহাট বাজার বর্জনের ঘোষণা দেয়। বাঘাইহাটসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সব ব্যবসা বাণিজ্য সেটেলার বাঙালিদের দখলে। পাহাড়িরা পণ্য উৎপাদন করে এনে তাদের কাছে বিক্রি করে। পাহাড়িরা পণ্য না আনলে বাজার অচল হয়ে পড়ে। ১৬ জানুয়ারি থেকে পাহাড়িরা বাঘাইহাট বাজার বর্জন শুরু করে। বাঘাইহাট বাজারে তার প্রভাব পড়ে। পাহাড়িরা ফলসহ তাদের উৎপাদিত নানাবিধ জিনিস নিয়ে দীঘিনালাসহ আশপাশের বাজারে যেতে থাকে। কিন্তু অন্য বাজারে যেতে বাধা দেয় স্থানীয় প্রশাসন। ফলে তাদের ফলÑদ্রব্যাদি বিক্রি করতে না পারায় নষ্ট হয়ে যায়। অসহায় পাহাড়িদের উত্তেজনা ক্রোধে পরিণত হতে থাকে। ১৯ জানুয়ারি বিকালে সেটেলার বাঙালিরা ঘর তুলতে শুরু করে পাহাড়িদের আবাদের জমিতে। এর পাশেই আর্মি ক্যাম্প। পাহাড়ি-বাঙালি দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বিকাল-সন্ধ্যা কাটে টানটান উত্তেজনায়। রাতে সেটেলার বাঙালিরা আক্রমণ করে পাহাড়ি গ্রামে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে আর্মি ক্যাম্পের পাশের ‘গঙ্গারামমুখ’ গ্রাম দিয়ে সূচনা হয় আক্রমণ। তার পর আক্রমণ হয় ‘চামেলীপাড়া’ ও ‘বালুঘাট’ গ্রামে। এই তিনটি গ্রামের ৩৫টি পাহাড়ি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। পাহাড়িরা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কারণ আক্রমণ শুধু বাঙালিরা করে না, তাদের সঙ্গে ছিল স্থানীয় প্রশাসনের পুরো শক্তি। সম্মিলিত এ আক্রমণের মুখে পাহাড়ি নারী-পুরুষ, শিশু, যুবা-বৃদ্ধা আশ্রয় নেয় জঙ্গলে। সারা রাত জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। ২০ জানুয়ারি সকালে পাহাড়িরা বের হয়ে আসে জঙ্গল থেকে। অনেক পাহাড়ির হাতেই তখন ছিল দা, বঁটি, কাচি, লাঠি...। বাঙালিরাও ছিল রণ সাজে সজ্জিত। দুই পক্ষের মাঝখানে ছিল সেনাবাহিনী। বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ায় পাহাড়িরা ছিল ক্রুব্ধ। বাঙালিদের চেয়ে তাদের বেশি রাগ ছিল সেনাবাহিনীর ওপর। তারা বিশ্বাস করে প্রশাসনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাঙালিরা গুচ্ছগ্রাম থেকে এসে আগুন দিয়েছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে পাহাড়িদের তুমুল বাকবিত-া চলতে থাকে। পাহাড়িরা ঘর পোড়ানো এবং বসতি স্থাপনের জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করতে থাকে। সেনাবাহিনী পাহাড়িদের স্থান ত্যাগ করতে বলে। উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে একজন পাহাড়ি হাতের ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক সেনা সদস্যকে কোপ দেয়। ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আর্মি গুলি চালায়। কয়েকজন মারা যায়, রক্তাক্ত হয় অনেক পাহাড়ি। পরে জানা যায়, মারা যায় দুই জন। যদিও পাহাড়িরা দাবি করেছে মৃতের সংখ্যা আরো বেশি। এর পর আর্মির পেছনে থাকা বাঙালিরা আরেক দফা আক্রমণ করে পাহাড়ি গ্রামে। পাহাড়িদের মোট ৭টি গ্রামের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়।
৩. বর্তমান ঘটনাটি মোটামুটিভাবে এ রকমই (শওকত মিল্টনের সরেজমিন প্রতিবেদন থেকে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন)। পরবর্তীতে যা ছড়িয়ে পড়ে খাগড়াছড়িতেও। সেই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় যাচ্ছি না। তবে জনমনে আবারো অনেকগুলো প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিএনপিসহ ৪ দলীয় জোট ও তাদের বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকরা বলছেন, পাহাড়ে আবারো সেনা মোতায়েন করতে হবে। তার মানে কী পাহাড়ে এখন সেনাবাহিনী নেই? সব প্রত্যাহার করা হয়েছে? বাস্তবতা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় ৬টি ক্যান্টনমেন্ট আছে। এর বাইরে ৫০০’র ওপরে আর্মি ক্যাম্প ছিল। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তির পর ৩৫টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের এই সাম্প্রতিক সময়ে আরো ৩০টির মতো আর্মি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৪শ’র ওপরে সেনাক্যাম্প এখনো রয়ে গেছে এবং যে এলাকায় ঘটনা ঘটেছে সেই এলাকা থেকে কোনো সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়নি। প্রশ্ন হলো তার পরও কেন দাবি উঠছে আবারো সেনা মোতায়েনের? হয়ত ধরে নেয়া যেতে পারে বিরোধী দলে থাকার কারণে ৪ দলীয় জোট সঠিক তথ্য জানে না। কিন্তু সরকারও কী সঠিক তথ্য জানে না? এমন কী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানেন না সঠিক তথ্য? সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী করে বলতে পারলেন আবার সেনা মোতায়েন করা হবে। ঘটনা কেন ঘটল, কারা ঘটাল... স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী জানেন? জানার চেষ্টা করেছেন? কোন সোর্সে তিনি তথ্য পাচ্ছেন? শুধুই কী গোয়েন্দা তথ্য? দলীয় কোনো তথ্য কী তার কাছে আছে? প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য আরো কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন সরকারকে, আওয়ামী লীগকে। গুচ্ছগ্রাম থেকে বাঙালিদের এনে পাহাড়িদের আবাদি জমিতে বসতি স্থাপন করা হচ্ছে কেন? এ সিদ্ধান্ত কী সরকারিভাবে শেখ হাসিনা নিয়েছেন? যদি না নিয়ে থাকেন তবে কারা কাজ করছেন? সেটেলার বাঙালিরা আগুন দিল। পাশের ক্যাম্পের আর্মি তখন কী করছিল? বাঙালিদের আগুন দেয়ায় সহযোগিতা করার যে অভিযোগ আর্মির বিরুদ্ধে উঠেছে, সেটা কতটা সত্যি? আর্মি যদি আগুন দেয়ার সহযোগিতা নাও করে, বাঙালিদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হলো কেন? ঘটনার পরে বলা হয়েছে দুই পক্ষের তুমুল গোলাগুলি হয়েছে। বাস্তবে দুই পক্ষের গুলিবিনিময় হয়নি। দুই পক্ষের গুলির কথা কারা কোন উদ্দেশ্যে প্রচার করল? যতদূর জানা গেছে ঘটনার দিন সকালে ইউপিডিএফের এক ক্যাডার বাঘাইঘাট পুলিশ ক্যাম্পের পাশে গিয়ে এক রাউন্ড গুলি করে। কেন গুলি করা হলো? প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য না আক্রমণে উৎসাহিত করার জন্য?
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করেছিল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার। যদি সমস্যার সমাধান করে সেটাও করবে শেখ হাসিনার সরকারইÑ এমন মনোভাব পাহাড়িদের অনেকেরই। অনেক হতাশার মাঝে কিছুটা হলেও এমন আশা তারা করে। ১৪ দলীয় জোটের নির্বাচনী অঙ্গীকারও ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন করা হবে। ধারণা করা হচ্ছিল কয়েকটি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে তার সূচনাও হলো। এই যখন অবস্থা তখন আবার পাহাড়কে কেন অশান্ত করে তোলা হলো? এর ফলে লাভবান হবে কারা? পাহাড়ে এখন সেনা সংখ্যা যত আছে, তার কয়েকগুণ যদি বৃদ্ধিও করা হয় তবে কী সমস্যার সমাধান হবে? সামরিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা তো প্রায় ৩০ বছর ধরে করা হয়েছে। পাহাড়িরা নিপীড়ন, নির্যাতনের, হত্যার শিকার হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছে আমাদের সেনা সদস্যরাও। সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। সমাধান হয়নি। সামরিক উপায়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়Ñ এই ব্যর্থতাকে শিকার করে নিয়েই চুক্তি হয়েছে। আগানো হয়েছে রাজনৈতিক সমাধানের পথে। আগানো গেছেও অনেকটা। পাহাড়িরা অস্ত্র ত্যাগ করে ফিরে এসেছে স্বাভাবিক জীবনে। বন্ধ হয়েছে যুদ্ধ। এতে সমস্যার সমাধান পুরোপুরি হয়েছে সেটা বলা যাবে না। তবে সমাধান কোন পথে, সেটা জানা গেছে। সমাধানের এই পথটিকে মসৃণ করার জন্য কতগুলো কাজ করা প্রয়োজন ছিল, যা করা হয়নি। ফলে এ পথটি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ছে বার বার। অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটু উদ্যোগী হলে এমন হতো না। ফলে আমরা এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে আসছি বার বার। চুক্তির পর যা করার কথা ছিলÑ অস্ত্র জমা দিয়ে ফিরে আসা শান্তি বাহিনীর সদস্যদের পুনর্বাসনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার কথা ছিল। কথা অনুযায়ী যা করা হয়নি। কিছু সংখ্যককে পুলিশে চাকরি দেয়া হয়েছে। আরো অনেককে দেয়া হয়নি। চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফের হাতে প্রায় ৬৫ জন শান্তি বাহিনীর ফিরে আসা সদস্য নিহত হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা দেয়া হয়নি। যুদ্ধাবস্থায় পাহাড়িদের একটি অংশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। কিছুসংখ্যক পাহাড়ি ভারতে যায়নি, কিন্তু বাড়ি-জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছিল। চুক্তির পর ভারতে আশ্রয় নেয়া পাহাড়িরা ফিরে এসেছে। কিন্তু বাড়ি-জমি ফিরে পায়নি। তাদের জমি বাঙালি সেটেলারদের দখলে। ভূমি সমস্যার সমাধান না করে ফিরে আসা পাহাড়ি শরণার্থীদের জায়গা জমির সমাধান করার দিকে নজর দেয়া হয়নি। কোনো সন্দেহ নেই ভূমি সমস্যার সমাধান খুবই জটিল। কারণ পাহাড়িদের জমি ফিরিয়ে দিতে হলে জমি বাঙালিদের দখলমুক্ত করতে হবে। সেটা হয়ত পুরোপুরি সম্ভব নয়। কিন্তু আন্তরিকতা থাকলে অনেকখানি সম্ভব। সেটেলার বাঙালিরা যে পার্বত্য চট্টগ্রামে খুব সুখে-শান্তিতে আছেন তা নয়। নিয়মিত সরকারি রেশনের ওপর বেঁচে আছেন তারা। চাষাবাদ-ব্যবসা করে কেউ কেউ ভালো থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশই যাপন করছেন মানবেতর জীবন। তাদের সবাই না হলেও অনেকেই এখন আর থাকতে চান না। তাদেরকে সরিয়ে এনে ভূমি সমস্যার কিছুটা সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান যাদেরকে করা হয় তারা কোনো কাজই করেন না। বর্তমান কমিশনই কিছু করছে না। চুক্তি অনুযায়ী গঠিত হওয়া আঞ্চলিক পরিষদকে কার্যকর করা হয়নি। সবকিছু ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফকে নিয়ন্ত্রণ বা দমন না করে আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চুপ। ফলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণের ঘটনা পাহাড়ে ঘটছেই। বলা হয় স্থানীয় প্রশাসনের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এসব ঘটছে। বান্দরবান জঙ্গলে অবস্থান করছে মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। এরা এক একটি ছোট ছোট ডাকাত দল। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করাই যাদের কাজ। এসব কর্মকা-ের কথা স্থানীয় প্রশাসন সবই জানে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। উল্টো অপহরণের পর মধ্যস্থতা করতে দেখা যায় প্রশাসনকে।
৫. বর্তমান ঘটনার পেছনে ৪ দলীয় জোটের একটি বড় ভূমিকা আছে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ির ঘটনায়। এর নেপথ্যে রয়েছেন খাগড়াছড়ির বিএনপি নেতা সাবেক এমপি আবদুল ওদুদ ভূঁইয়া। প্রশাসন জামায়াতসহ আরো কিছু সংখ্যককে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছে। আরো কেউ কেউ হয়ত গ্রেফতার হবে। সমস্যার সমাধান কি হবে? মনে হয় না। পূর্বে সামরিক উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যায়নি। এখন ‘অপারেশনে উত্তরণ’ দিয়েও সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এসব ঘটনা ঘটিয়ে সন্তু লারমাদের দুর্বল করা যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ইউপিডিএফ শক্তিশালী। যে শক্তি নিজেদের এই এলাকা থেকে ‘প্রত্যাহার’ করতে চান না তারাও লাভবান হবেন, হচ্ছেন। কিন্তু দেশের কোনো লাভ হবে না। দেশের লাভের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান। প্রয়োজন চুক্তির বাস্তবায়ন। আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে শেখ হাসিনাকে। শেখ হাসিনা সরকারের ইশারায় চলতে হবে পার্বত্য প্রশাসনকে। বিশেষ মহলের ইশারায় নয়। এর জন্য শেখ হাসিনার পাশে প্রয়োজন যোগ্য মানুষ। যাদের ওপরে তিনি নির্ভর করছেন, তারা নির্ভর হয়ে পড়ছে বিশেষ মহলের ওপর। এই ‘বিশেষ মহল’ দিয়ে আর যাই হোক সমস্যার সমাধান হবে না। তারা মাঝে মাঝে নিজেদের সুবিধার জন্য আগুন জ্বালাবে, নেভাবে না। আগুন জ্বালানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আওয়ামী সরকারের ভূমিকা না থাকলেও দায় ঠিকই নিতে হবে। আগুন যাতে জ্বালাতে না পারে তার জন্য প্রয়োজন শক্ত অবস্থান। শেখ হাসিনা জানেন সমস্যা কী, জানেন সমস্যার সমাধানের পথও। সেই পথে অনেক কাঁটা আছে, আছে খাল...। শেখ হাসিনাকে হাঁটতে হবে শক্তি নিয়ে। যাতে কাঁটা, খালকে অতিক্রম করা যায়। সেই অধিকার জনগণ তাকে দিয়েছে ভোট দিয়ে। |