Logo
 বর্ষ ২ সংখ্যা ৪১ ১৩ই ফাল্গুণ, ১৪১৬ ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০ 
আপনি এখন পুরোনো সংখ্যায় আছেন ! তারিখ : ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
‘নতুন করে সেনা মোতায়েন, এর মানে কী? এখানে ‘মার্শাল ল’ তো এমনিতেই আছে’ -জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা  


জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা যিনি অধিক পরিচিত সন্তু লারমা নামে। জীবনের বেশিরভাগ সময়, যৌবনের পুরোটাই কেটেছে জঙ্গলে, গেরিলা জীবনে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে ফিরে এসেছেন স্বাভাবিক জীবনে। এখন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। কিন্তু চুক্তির বাস্তবায়ন হচ্ছে না, কার্যকর হচ্ছে না আঞ্চলিক পরিষদ। বন্ধ হচ্ছে না পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনও। সাম্প্রতিক বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়ির ঘটনাসহ নানাবিধ প্রসঙ্গ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন গোলাম মোর্তোজা।
শ্রুতিলিখন করেছেন আব্দুল্লাহ্ নূহ

সাপ্তাহিক : বাঘাইহাটের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইছিলাম।
সন্তু লারমা : বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইঘাট এলাকার যেখানে ঘটনাটা ঘটল তার পাশে একটা আর্মি ক্যাম্প আছে।
এ এলাকা পুরোপুরিভাবে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। আপনি জানেন যে, পার্বত্য অঞ্চলে এখনো এক ধরনের সেনা কর্তৃত্ব আছে। সেই সেনা কর্তৃত্বাধীনে ওই এলাকার বাসিন্দাদের বসবাস করতে হচ্ছে। এই এলাকাটা বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের এলাকা। এবার ঘটনা সম্পর্কে আমি যতটুকু জেনেছি বা আমার কাছে যে তথ্যগুলো আছে তাতেই বোঝা যায় যে, সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতেই ঘটনাটা ঘটেছিল।
সাপ্তাহিক : ঘটনাটা ঘটার পর সেনাবাহিনীর কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
সন্তু লারমা : না। সে রকম সুযোগ হয়নি। সেনাবাহিনীর কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। অদ্যাবধি যোগাযোগ হয়নি।
সাপ্তাহিক : আমরা যতদূর জানি, ওই এলাকার মানুষ আতঙ্কে আছে... আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকে...
সন্তু লারমা : এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকে অনেক কিছু করণীয় থাকলেও কিছু করতে পারছি না আমরা।
সাপ্তাহিক : কেন করতে পারছেন না?
সন্তু লারমা : কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদকে কিছু জানানোর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। গত পরশু মাননীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঘুরে গেলেন সে বিষয়টাও আঞ্চলিক পরিষদকে জানানো হয়নি। যেমন আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও ঘুরে গেলেন। কিন্তু তিনিও আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি বা কোনো কথাবার্তাও বলেননি।
বিষয়টা হলো, আঞ্চলিক পরিষদকে এক পাশে রেখেই অন্যান্য যাবতীয় কাজ চলছে।
সাপ্তাহিক : পূর্বের সরকারের সময়ে আঞ্চলিক পরিষদকে না জানিয়ে যেমন কাজ করে যেত, এখনো কি তাই চলছে?
সন্তু লারমা : হ্যাঁ। এখনো ওই অবস্থা। অবস্থার কোনো পরিবর্তন দেখছি না।
সাপ্তাহিক : আগের সরকার তো চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চায়নি, কিন্তু বর্তমান সরকার তো চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চাইছে। সে জায়গায় আপনারা সত্যিকারের কোনো কাজ কি দেখছেন?
সন্তু লারমা : না। সে রকম কোনো কাজ তো চোখে পড়ছে না। এই সরকার নির্বাচিত হয়ে এসেছে তো প্রায় চৌদ্দ মাস হতে চলল। তেরো মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও এ সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তো আমি দেখি না।
সাপ্তাহিক : সরকারের পক্ষ থেকে, চারদলীয় জোটের পক্ষ থেকে, তাদের সমর্থিত লেখক, বুদ্ধিজীবীরা জোর দিয়ে বলছে যে, পার্বত্য অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করতে হবে।
সন্তু লারমা : আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারি না সেনা মোতায়েন তো আগে থেকেই হয়ে আছে এখানে। তা ছাড়া এখনো ৬টা ক্যান্টনমেন্ট আছে। এখানে ৪ শতাধিক অস্থায়ী ক্যাম্প রয়ে গেছে। এখানে নতুন করে সেনা মোতায়েনের বিষয়টা আমার কাছে বোধগম্য না। আমি জানি না কেন বলা হচ্ছে এটা।
সাপ্তাহিক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন যে, সেনা মোতায়েন করা হবে... আবার কি ক্যাম্পগুলো পুনর্মোতায়েন করা হবে?
সন্তু লারমা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে কথা বলেছেন সেটা কেন বলেছেন তা তিনিই ভালো বুঝবেন। তবে আমি মনে করি না যে এখানে নতুন করে সেনা মোতায়েন করতে হবে। সেনা মোতায়েন করতে হবে এ কথার মানে কি? তার মানে কি এখানে যাকে বলে ‘মার্শাল ল’ সেটা হতে যাচ্ছে? কিন্তু আমি তো এর প্রয়োজনীয়তা দেখি না। এখানে তো ‘মার্শাল ল’ এমনিতেই রয়ে গেছে।
সাপ্তাহিক : এমন অবস্থায় আপনাদের অবস্থান কী?
সন্তু লারমা : আমরা তো বর্তমান যে সরকার তার কাছে বরাবরই বলে আসছি যে, পার্বত্য চুক্তি যেটা হলো তার বাস্তবায়ন চাই।
বাঘাইঘাটে আজ যে ঘটনা ঘটে গেল এ ঘটনার ব্যাপারে একটা কথাই বলা যেতে পারে যে, এ ঘটনা ঘটানো হচ্ছে তাদের দ্বারা, যারা এ পার্বত্য শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে বরাবরই। যারা এ পার্বত্য অঞ্চলের উন্নতি চায় না, পার্বত্য অঞ্চল যাতে সবসময় একটা অশান্ত অবস্থায় থাকে, সর্বোপরি এখানে ইসলামীকরণের যে ষড়যন্ত্র পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসছে সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা হিসেবেও এটা একটা ঘটনা।
এখানে ভূমি বেদখল। সেটেলারদের বসতি সম্প্রসারণ এগুলোকে কেন্দ্র করে শান্তি চুক্তি পরবর্তী নানা ধরনের যে কার্যক্রম হাতে নেয়া বা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা এগুলো চলে আসছে। এখন আমার যে বিষয়টা বলা জরুরি সেটা হলো যে, অনতিবিলম্বে এখানে কতগুলো পদক্ষেপ নেয়া দরকার। যেমন, পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা-গুলো বন্ধের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ যেগুলো আছে সেগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ আইন ২০০১ যেটা আছে সেটা সংশোধনীর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অনতিবিলম্বে ল্যান্ড কমিশনকে কার্যকর করে তোলা। তার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন নিশ্চিত করা। অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহার করা। অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো সরিয়ে নেয়া। এগুলো খুবই জরুরি। এ ছাড়া এখানে ভূমি বেদখলের যে সমস্যাগুলো আছে, যেমন : ক্যাম্প সম্প্রসারণের নামে ভূমি বেদখল, নিজের নামে ভূমি বেদখল, নানাভাবে, নানা ছলচাতুরি করে ভূমি বন্দোবস্ত নেয়া, বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে রাবার বাগান করা বা সরকারি উদ্যোগে যেটা করছে বিভাগীয় কমিশনারের সভাপতিত্বে রবার প্ল্যান্টেশনের একটা স্ট্যান্ডিং কমিটি আছে। সেই স্ট্যান্ডিং কমিটির মাধ্যমে এখানে রাবার প্ল্যান্টেশনের নামে নানাভাবে ভূমি বেদখল করা হচ্ছে। ইকো পার্কের নামে করা হচ্ছে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা, যেমন : উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বান্দরবান সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিজস্ব উদ্যোগে এখানে পর্যটন কেন্দ্র করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীরাও নিজস্ব উদ্যোগে এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ছে। বান্দরবানের ডিসি সাহেবের নামেও পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে। পর্যটনের নামে এখানে ভূমি বেদখল করা হচ্ছে। নানাভাবে ভূমিগুলো যে বেদখল হচ্ছে। এই বেদখলের প্রক্রিয়াগুলো বন্ধে অনতিবিলম্বে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টাÑ পার্বত্য জেলা  পরিষদ আইন ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন কার্যকর করার জন্য কার্যবিধিমালাসহ অন্যান্য আইনসমূহ প্রণয়নের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সাপ্তাহিক : আরেকটা বিষয় সবসময়ই কোনো একটা ঘটনা ঘটলে বলা হয় যে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা এটা করেছে...
সন্তু লারমা : এটা তো আসলে সঠিক না। কারণ, এখানে তো নানা ধরনের সন্ত্রাসী রয়েছে। অস্ত্রসহ যে সন্ত্রাসী কাজ সেটা ইউপিডিএফ প্রকাশ্যে করে যাচ্ছে। এই ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা সরকারের সঙ্গে যুক্ত আছে। সরকারের বা শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ মহল এখানে জড়িত আছে এবং এই ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীদের যে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে তা কোনো না কোনোভাবে যারা এখানকার শাসক বা এখানকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করেন তারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন।
এখানে যে কথাগুলো বলা হয় যে, উভয়পক্ষের সন্ত্রাসীরা গোলাগুলি করছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ এই ইঙ্গিতটা করে থাকেন, জেএসএসকে লক্ষ্য করে যদি বলা হয়ে থাকে তবে সেটা সঠিক নয়। কারণ জেএসএস একটা চুক্তির মাধ্যমে এ অঞ্চলে শান্তি আনার চেষ্টা করেছে। তারা সে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এবং তাদের হেফাজতে থাকা সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। সুতরাং চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত জেএসএস তো শান্তির পক্ষেই কাজ করছে। কাজেই কেউ যদি এমন কথা বলে থাকে তবে সেটা ভিত্তিহীন কথা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথা। জেএসএসকে হেয় করার উদ্দেশে বলা।
সাপ্তাহিক : দুই পক্ষের কথা যে বলা হয়Ñ এই দুই পক্ষ আসলে কারা?
সন্তু লারমা : দুই পক্ষ যদি বলি তাহলে বলতে পারি ইউপিডিএফ তো আছেই। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে সরকারের বিশেষ মহল এদের জন্ম দিয়েছিল দুটো উদ্দেশ্যে। একটা হলো পার্বত্য চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত হতে না পারে তার জন্য নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করা, আরেকটা হলো জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করা।
এখানে প্রসঙ্গত এই ইউপিডিএফের ব্যাকগ্রাউন্ড আমাকে একটু বলতে হচ্ছেÑ গত বার বছরে তারা শতাধিক লোককে হত্যা করেছে, তারা কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেছে, অগণিত মানুষকে মারধর করেছে, পঙ্গু করেছে, অসংখ্য পরিবারকে তারা নিজ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করেছে। এই উচ্ছেদকৃতদের একটা বড় অংশ ৬৫টি পরিবার জনসংহতির সদস্য ছিল। এই ৬৫টি পরিবার ইউপিডিএফের ব্যাপারে খুবই ক্ষুব্ধ। সরকারের কাছে বার বার বলা সত্ত্বেও সরকার জনসংহতি সমিতির সদস্যদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা দিতে পারেনি। জনসংহতি সমিতির সদস্যরা যারা পার্বত্য চুক্তির পক্ষে ছিল তারা ইউপিডিএফ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসংখ্য পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারেরা তাদের নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সশস্ত্রভাবে নিজেদেরকে সজ্জিত করেছে। এরা মাঝে মধ্যে ইউপিডিএফের সদস্যদের ওপর হামলা করে বসে।
তাহলে এখন বিষয়টা হলো এ রকমÑ সরকার বা কোনো পক্ষ যদি বলে থাকে যে, উভয়পক্ষের সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে তাহলে বোধহয় এ রকমই ইঙ্গিত দিয়ে থাকে যে, একদিকে ইউপিডিএফ আর অন্যদিকে যারা ইউপিডিএফ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা নিজেদের পরিবারকে রক্ষার জন্য, নিজেদের জীবনকে রক্ষার জন্য, ইউপিডিএফের সন্ত্রাস বন্ধের জন্য যারা অস্ত্র ধরেছে তাদেরকেই হয়ত বোঝানো হয়ে থাকে।
সাপ্তাহিক : এবারের ঘটনায়ও বলা হয়েছে উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়েছে।
সন্তু লারমা : না, বিষয়টি তেমন নয়। উভয়পক্ষের বলতে পাহাড়িরা কোনো গুলি করেনি। গুলি করেছে সেনাবাহিনী। এটাই সত্যি ঘটনা।
সাপ্তাহিক : আপনাদের কাছে কি সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে যে কতজন পাহাড়ি মারা গেছেন, কতজন আহত হয়েছেন?
সন্তু লারমা : কমপক্ষে চার জন নিহত হয়েছেন। দুজনের লাশ পাওয়া গেছে। আর আহতের সংখ্যা তো অনেক হতে পারে। অনেকে আছেন যারা আহত হয়েছেন, তারা প্রকাশ্যে আসবেন না। যেমন ধরুন যারা আহত হয়েছে তাদের কয়েকজন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিল চিকিৎসার জন্য, তাদের মধ্য থেকে ৪ জনকে আসামি করে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে তো ভীতি বিরাজ করছে।
বাঘাইহাট ঘটনায় বাঘাইহাট ক্যাম্পের জনৈক সৈনিক বাদি হয়ে মামলা দিয়েছে। ওই মামলার আসামি করেই চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কাজেই কতজন আহত হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা খুবই কঠিন। এখানে বিষয় হচ্ছে, ওই এলাকার সমস্ত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকশ ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে।
সাপ্তাহিক : এমন ঘটনা তো পাহাড়ে নতুন নয়। আগেও ঘটেছে। কিন্তু তদন্ত কী হয়েছে?
সন্তু লারমা : এ ধরনের দাঙ্গার ঘটনা তো অনেকবার ঘটে গেছে, তবে আমার জানা নেই যে, আজ পর্যন্ত কোনো ঘটনার তদন্ত হয়েছে বা কোনো ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে বা ঘটনার জন্য দোষীদের কোনোরকম শাস্তি বিধান করা হয়েছে।
সাপ্তাহিক : এখন যে বলা হচ্ছে, একটা সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক...
সন্তু লারমা : হ্যাঁ। এখানে সংসদীয় কমিটি দ্বারা তদন্ত হওয়া উচিত। বিচার বিভাগের পক্ষ থেকেও তদন্ত হওয়া উচিত। তবে আমি দেখেছি ইতোপূর্বে প্রতিটি ঘটনা স্থানীয়ভাবে তদন্ত করা হয়, আইনশঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করেন, কিন্তু এগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। এখানে সংসদীয় তদন্ত কমিটি গেলে আমরা মনে করি যে, যেহেতু তারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি কাজেই তাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে এবং সেই আস্থা থেকে সাধারণ মানুষ মনে করে যে, যদি সংসদীয় তদন্ত কমিটি যান তবে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তারা দেখবেন এবং এটার একটি সমাধান হবে।
সাপ্তাহিক : এখন তাহলে সরকারের আছে বা দেশের মানুষের কাজে জনসংহতি সমিতির চাওয়া কি?
সন্তু লারমা : আমাদের জনসংহতির বক্তব্য যেটা শুরু থেকেই আমরা বলছি যে, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন চাই। এ ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা পেতে চাই। সরকার এই যে ‘আজ হবে, কাল হেব, হচ্ছে’ এ ধরনের কথা বলছে এটা ঠিক না। এখানে অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ সরকারকে গ্রহণ করতে হবে।
সাপ্তাহিক : আপনারা রোডম্যাপের কথা বলেছিলেন...
সন্তু লারমা : কর্মপরিকল্পনা তো থাকতেই হবে। আর এমনিতে চুক্তিতে অনেক বিষয়ের ব্যাপারে উল্লেখ করা আছে যে, কোনটা কোন সময় করতে হবে। আর যেগুলো উল্লেখ নেই সেগুলো একটা কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
অন্যদিকে পার্বত্য শান্তি চুক্তিটা সারাদেশের একটা চুক্তি। আমরা মনে করি সারা দেশের মানুষের এখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটা ভূমিকা আছে। গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক মুক্ত মনের মানুষের এ ব্যাপারে কেবল সরকারকে সহযোগিতা নয়, প্রয়োজনবোধে সরকারকে চাপও দিতে হবে যে, না তোমাকে এটা করতে হবে। এটা করা উচিত।
সাপ্তাহিক : এ চাপটা তো আপনাদেরই দিতে হবে...
সন্তু লারমা : হ্যাঁ, তা তো ঠিকই। তবে আমরা আশা করি আমাদের কথা ভেবে সারা দেশের মানুষের কাছ থেকে এবং গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেই এ চাপটা আসুক। যারা আমাদের দেশকে গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক একটা দেশে পরিণত করার অত্যন্ত সদিচ্ছা পোষণ করেন। আমি মনে করি তাদেরকেই অধিকতর দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকে শুধু সহযোগিতা দেয়া না। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু না, প্রত্যক্ষভাবে অধিকতর ভূমিকা আমরা আশা করি।
আপনি দেখুন, আমার জানা নেই যে, এ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল পার্বত্য চুক্তি বিষয়ে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, বা সে অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, দেরি হলেও পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পর্কে সবাই জেনেছে।
সাপ্তাহিক : চৌদ্দদলীয় মহাজোটের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল চুক্তি বাস্তবায়ন করার...
সন্তু লারমা : হ্যাঁ, সেটাই আর কি। এ জন্য বাঘাইহাটে যে ঘটনা ঘটে গেল তাতে আমরা মনে করি ১৪ দলের পক্ষ থেকেও সরাসরি এসে এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি আসবে। শুধু তারাই না ১১ দলের পক্ষ থেকে আমরা মনে করি তারা অবশ্যই যাবেন। এই যে মিডিয়া-সংবাদপত্রে যারা যুক্ত আছেন তারা মিলিতভাবে একটা তদন্ত কমিটি করে এসে দেখে যাবেন এগুলো আমি অনুভব করি।
সাপ্তাহিক : এই চুক্তির সঙ্গে বড়ভাবে বিরোধিতা করে চারদলীয় জোট। তাদের কাছে কিছু বলতে চান?
সন্তু লারমা : হ্যাঁ, চারদলীয় জোট তো এ চুক্তির ব্যাপারে বরাবরই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এসেছে। এবং বর্তমান মুহূর্ত পর্যন্ত তারা যা বলছেন তাতে দেখতে পাচ্ছি যে, আগের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা সরে যাননি। এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক। তবু আমি বলব যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এ দেশেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেমন ভূমিকা রাখতে চাই তেমনি আমরা দেশের নাগরিক হিসেবে অন্য এলাকার নাগরিকদের মতো সমঅধিকার, সমমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। এ এলাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইতিহাস বা তার বাস্তবতা ভিন্নতর হলেও সেই আঙ্গিকেই এখানে ব্যবস্থাটা হওয়া উচিত। সেই শর্তেই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেই চুক্তি বাস্তবায়নের মিশন নিয়ে আমরা চারদলীয় ঐক্যজোট, বিশেষ করে বিএনপি যেহেতু তাদের নেতৃস্থানে কাজেই তাদের কাছে অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা চুক্তির পক্ষে কামনা করি।
সাপ্তাহিক : আবার সেনা মোতায়েন...
সন্তু লারমা : এখানে সামরিক শক্তি মোতায়েন কোনো সমাধান না এটা আগেও প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা যিনি ছিলেন তিনি চেষ্টা করেছেন সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান করা যায় কিনা? অর্থনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। যে কারণে পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে এই উন্নয়ন বোর্ডকে ’৮৮ সালে ব্যবহার করা হয়েছিল। তাতেও সমাধান হয়নি। এটাকে আসলে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জাতীয় সমস্যা এবং রাজনৈতিক সমস্যাও। সুতরাং জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে এটার সমাধান করতে হবে।
সাপ্তাহিক : চারদলীয় জোটের কাছে আপনাদের এ প্রত্যাশাই থাকবে...
সন্তু লারমা : অবশ্যই। এ জন্য আমরা এখানে বলছি সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার চাই, পরিবর্তে পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করা হোক। পার্বত্য অঞ্চলে একটা মিক্স পুলিশ বাহিনী পাহাড়ি-বাঙালি মিলে গঠন করা হোক। এখানে আঞ্চলিক পরিষদের, জেলা পরিষদের সিভিল যে অর্থনীতি সেটাকে কার্যকর করলেই তো আমরা  মনে করি এটা আরো সহজতর হবে।
সাপ্তাহিক : জনসংহতি সমিতি সম্পর্কে একটা প্রশ্ন করতে চাই। বলা হচ্ছে আপনাদের ভেতরে বিভক্তি এসেছে। অনেকে দল ছেড়ে চলে গেছে...
সন্তু লারমা : বিষয়টা ঠিক সে রকম নয়। জনসংহতি সমিতি এ অঞ্চলের একমাত্র রাজনৈতিক দল। জনসংহতি সমিতির বয়স যে খুব কম তাও নয়। ১৯৭২ সাল থেকে ধরলে এর বয়স অনেক হয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে যেসব কর্মকা-ে যুক্ত সেগুলো নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জনসংহতির নেতৃত্বে এখানে অনেকদিন ধরে যে সশস্ত্র আন্দোলন হয়েছে সেখানে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। আবার অনেকে ছেড়ে গেছে। এটা তো সব দলেই হয়ে থাকে।
এখানে একটা বিষয় হলো, অনেকে বলেন যে, জনসংহতিতে ভাঙন ধরেছে, জনসংহতি সমিতি দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে এবং বর্তমান সভাপতি সন্তু লারমার নেতৃত্বসহ নানা কারণে এটা হচ্ছে ইত্যাদি নানা ধরনের প্রচারণা-প্রপাগা-া প্রচার করা হয়েছে, হচ্ছে। আসলে বিষয় হলো, জনসংহতি সমিতি ২০০৬ সালে সর্বশেষ যে কংগ্রেস করেছিল সেখানে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ব আবার পুনর্নির্বাচিত হয়েছে। নেতৃত্ব আবার পুনর্গঠিত হয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে এসেছেন তারা যখন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক নানা কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক সে সময়ই তো ওয়ান ইলেভেন শুরু হয়ে গেল। নবনির্বাচিত নেতৃত্ব তো সময় বেশি পায়নি।
সাপ্তাহিক : জাতীয় রাজনীতিতে এ সময় মাইনাস টু ফর্মুলা দেখা গেছে। জনসংহতি সমিতিতেও মাইনাস ওয়ান...
সন্তু লারমা : হ্যাঁ, সেখানে আসছি। ওয়ান ইলেভেনের পর তো পার্বত্য অঞ্চলেও জরুরি আইন প্রয়োগ হতে থাকে। ফলে তখন দু-ধরনের সেনা শাসনের মুখোমুখি হয়ে পড়ি আমরা। এক অপারেশন উত্তরণ তার পাশাপাশি জরুরি আইন। এই দুই সেনা শাসনের নিষ্পেষণে কঠোর যে বাস্তবতা সেটা হলো আমাদের দলের উচ্চপর্যায়ের কিছু সদস্য, মধ্যম পর্যায়ের সদস্য নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য এখানকার শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে।
একদিকে ইউপিডিএফের জনসংহতির ওপর আঘাতের পর আঘাত করা, অন্যদিকে জরুরি আইনের ফলে আমাদের অবস্থা এমন জায়গায় উপনীত হলো যে, আমরা বেঁচে আছি, থাকব কিনা, এই মুহূর্তে বাইরে আছি পরের মুহূর্তে জেলে থাকব কিনা বা আমাকে কোনো অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিয়ে যাবে কিনা এ ধরনের একটা কঠিন বাস্তবতা ছিল। সীমাহীন নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি সবাই। ওই অবস্থায় আঁতাতকারী সদস্যরা নানা ধরনের অপপ্রচার চালাতে থাকে জনসংহতির বিরুদ্ধে। নানা ধরনের লিখিত, অলিখিত বক্তব্য জনসংহতির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দিতে থাকে।
তখন দেখা গেল সারা দেশে রাজনৈতিক দলে যেমন সংস্কার নিয়ে আসার কথা চলছিল তখন জনসংহতি সমিতির মধ্যে অনেকটা সে রকম কথা উঠেছিল বলা যেতে পারে। সংস্কার বলতে মাইনাস সন্তু লারমা বা উষাতন তালুকদার বা মাইনাস সত্যবীর দেওয়ান এ ধরনের একটা বাস্তবতা আমরা দেখেছি। কিন্তু মূল বিষয় যেটা বলবÑ আমরা দীর্ঘদিন সশস্ত্র আন্দোলন করেছি, স্বাভাবিকভাবে অনেকের মধ্যে উদ্যোগহীনতা এসে গেছে, তার নিজের স্বার্থপরতা বা আত্মকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে তারা জরুরি অবস্থার সময়ের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে সাহস করেনি। ফলে তারা ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ হয়েছিল। এ ষড়যন্ত্র ছিল জনসংহতি সমিতিকে জরুরি অবস্থার সময় একেবারে চিরতরে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র।
এই যে কয়েকজন ষড়যন্ত্রে যুক্ত হলো তারা তো পার্টিতে বড় বড় দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। তারা দলীয় প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে গিয়ে দলীয় নীতি-আদর্শ, উদ্দেশ্য-লক্ষ্য থেকে বের হয়ে গিয়ে সেই পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হলো যে পক্ষ জনসংহতি সমিতিকে ধ্বংস করতে চায়, যে পক্ষ পার্বত্য চুক্তিকে বানচাল করতে চায়।
সুতরাং আমি বলব যে, ২০০৬ সালের আমাদের নির্বাচিত নেতৃত্ব, সে নেতৃত্ব ঠিক আছে। যা ঘটেছে সেটাই বাস্তবতা। প্রতিটি দলেই যা হয়ে থাকে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা সব সময়ই ছিটকে পড়ে যায়।
সাপ্তাহিক : এই যে ছিটকে পড়ার কথা বললেন, শেষ পর্যন্ত কি হলো?
সন্তু লারমা : তারাই ব্যক্তি হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনসংহতি সমিতি নিয়ে আমরা তো এখনো টিকে আছি। আমরা তো আমাদের কর্মসূচি হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। তারা তো হারিয়ে গেছে। কারণ তারা দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য দেশপ্রেম, বৈপ্লবিক চেতনাকে হারিয়ে নিজেরাই হারিয়ে গেছে। তারা আজকে জনগণের কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত, নিগৃহীত।

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • ‘উভয় নেত্রী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন মানসিকভাবে তারা শত্র“বেষ্টিত’
  •  মতামত সমূহ
    Author : ফয়সাল বিন মজিদ
    কী হতো যদি তাঁর নেতৃত্বাধীন পাহাড়ি জনগন সরকারের ডাকে সাড়া না দিয়ে কখনোই শান্তি আলোচনায় না বসত? যদি সরে না আসত সংগ্রামের সশস্ত্র পথ থেকে? একে তো দু দুটি দেশের সাথে সীমানা-ঘেরা অঞ্চল, তার উপর উভয় সীমান্তের ওপারেই অশান্তির অপছায়া। বিচ্ছিন্নতাবাদ আর বন্দুকের তর্জন-গর্জন। অস্ত্র আর মাদক কারবারীদের প্রলোভন, রাষ্ট্রশক্তিগুলোর কাউন্টার ইন্সার্জেন্সির ওৎ পেতে থাকা ফাঁদ... সবমিলিয়ে প্রশয়ের অভাব হতোনা। এক পক্ষ সরে যেতো তো অন্য পক্ষ আসতো। লাল-সাদা-সবুজ কত না প্রভুর আনাগোনা এ অঞ্চলে। চাইলে আদরে আপ্যায়নে বিলাসী জীবন যাপনও সম্ভব ছিল তাঁর। যেমনটি এদেশে পেয়েছেন নাগা নেতা লালডেংগা থেকে শুরু করে আসামের অনুপ চেটিয়াগণ। কিন্তু সন্ত লারমা প্রকৃতই শান্তিকামি নেতা, যিনি ভালোবাসেন তাঁর মাতৃভূমি ও জাতিকে। তাই তো নানান অসম্পূর্ণতা থাকা সত্ত্বেও শান্তির স্বার্থে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন ১৯৯৭ এ। চুক্তির পরতে পরতে দাম্ভিক আমলাপ্রসূত উপজাতি’ সম্বোধনের মত অসম্মানকেও উপেক্ষা করেছেন যেন এসব নিয়ে বাহাস করে অশান্তির দীর্ঘসুত্রিতা না বাড়ে। মানুষ ফিরে আসুক তার পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ভিটেয়। উদ্বাস্তু শিবিরে জন্ম নেয়া শিশুটি যেন বড় হয় তার না দেখা মাতৃভূমিতে। স্বজাতির জন্য ঘরছাড়া তরুন নতুন করে গড়ে তুলুক জীবন... চুক্তি তো হলো। দ্বন্দ্ব গেলোনা। চার বছর পর চুক্তি সম্পাদন করা সরকার বিদায় নিয়ে ক্ষমতায় এলো যারা তাদের শরীকদের রাজনৈতিক দর্শনই হলো সংখ্যালঘু জাতিসত্তার নির্মুল আর উৎখাত। জেহাদী জোসে আমরা আবার পাহাড়িদের ওপর চড়াও হতে শুরু করলাম সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসি নখর দিয়ে। সাজেকের মত নতুন নতুন দীঘিনালা ট্র্যাজিডির জন্ম যেন আর থামেনা। পাহাড়ের গহীন অরণ্যে গড়ে উঠলো রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাশের আরেক নতুন পাঠশালা। এবার আর পাহাড়িদের নয়। ধর্মীয় জঙ্গিবাদের। দেশের নানা প্রান্তের কিশোর যুবকদের জড়ো করা হয় জঙ্গি প্রশিক্ষণের জন্য। পাহাড়ে পাহাড়ে গড়ে ওঠা মাদ্রাসার নামে দরিদ্র কিশোরদের কোমল মনে ঢেলে দেয়া হয় হিংসার বিষ। সাঘাটা কিংবা মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলের এই ক্ষুধার্ত কিশোরের মলিন পাগড়ীর উপর ভর করে সাফারি আর উর্দির ক্ষমতাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন করার কাপুরুষোচিত স্বপ্ন দেখি আমরা। কিন' কাপুরুষের গ্রেনেড কেড়ে নিতে পারেনি এই জাতির ধর্মীয় সহিষ্ণুতা আর প্রগতিশীল মনোভাবকে। শান্তি চুক্তি সম্পাদন করা দল আবার ফিরেছে সরকারে। সরকারের কথায় আর উদ্যোগে শান্তি প্রত্যাশী মানুষের মনে হয়েছে আশার সঞ্চার। একে একে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারও শুরু হলো। কিন্তু শান্তি যাদের লোভ লালসা আর হিংসার চরিথার্তে বাধ সাধে তারা বসে থাকেনি। একটি দুটি করে খুন, গুম আর নারী নিপীড়নের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা! এর সবকিছুর পেছনে যে পাহাড়ে সেনা আবাস না সরানোর ওছিলা হাজির করা তা বুঝতে কারোর অসুবিধা হয়না। সবশেষ বাঘাইছড়ি আর খাগড়াছড়ির সন্ত্রাসের পর এখন তো কেল্লা ফতে। আগেই তারা হুশিয়ার করেছিল- সেনা প্রত্যাহারের পরিণতি ভালো হবেনা। এবারের ঘটনায় পাহাড়িদের যে অংশ সংঘর্ষের বাতাবরণে ষড়যন্ত্রের আগুনে ফুঁ দিল তারা কারা? ৯৭ এ এই দলটিই চুক্তির বিপক্ষে অনড় থেকেছিল। বোধকরি ৭৫ পূর্ববর্তী জনযুদ্ধের পটভূমিতে’ প্রাপ্ত দীক্ষায় তারা বিরত থাকলো আওয়ামি লীগ সরকারের এর সাথে হওয়া কোন চুক্তিতে অংশ নেয়া থেকে। ৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত এই অতি বিপ্লবী পাহাড়িদের শত্রু ছিল বাঙ্গালি আর সেনাবাহিনী। কিন্তু ২০০১ এর পরে এরা সেনাবাহিনীর উচ্ছিষ্ট খেয়ে স্বজাতির বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরা শুরু করলো। পরিণত হলো সেনাবাহিনীর ডগ স্কোয়াডে। এই ভূখন্ডে অতিবিপ্লবীদের বার বার কেন এই কুকুরের পরিণতি! কে না জানে, এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির ধারাও হালাল হয়েছে এই অতি বিপ্লবীদের দ্বারা। এইসব বখাটে রোমিও আর হপ্তাবাজ, যারা লেলানো ছিল নিজ জাতির বিরুদ্ধে, আজ তারা কিনা নেমেছে পাহাড়ি জনগণের অধিকারের পক্ষে! ষড়যন্ত্রের এই দিকটা কী একটু নজরে দেবেন সবাই? পাহাড়িদের মূল অংশ কিন' পাড়া খেয়ে বার বার পা সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক কষ্টে পাওয়া সি'তির সম্ভাবনা ধরে রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর। এই ধৈর্যের লড়াইয়ে আমরা কি তাদের পাশে থাকবোনা? নাকি শান্তির জন্য পাহাড়িদের এই ত্যাগের প্রতি সম্মানটুকু দিতে আমরা জাতি হিসেবে ব্যর্থ হযে যাবো? ভুলে গেলে চলবেনা, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতিও কিন্তু অশান্তি এড়ানোর স্বার্থে বার বার পাকিস্তানিদের আলোচনার ডাকে সাড়া দিয়েছিল। এই আলোচনার প্রতি পাকিস্তানিদের অমর্যাদার জবাব কী দিয়েছিল বাঙালি একাত্তরে? হায! যে নিপীড়ন আর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদ করে স্বাধীন জাতিসত্তা হিসেবে আমাদের আবির্ভাব, সেই আমরাই এখন ক্রমাগত নিপীড়কের ভূমিকায়।
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive