|
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান
সাপ্তাহিক : পাহাড়ে হঠাৎ এই অশান্তির কারণ কি? রাশেদ খান মেনন : পাহাড়ে এই অশান্তি হঠাৎ না। পার্বত্য শান্তি চুক্তির প্রধান একটি বিষয় ছিল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ। এর মাধ্যমে নিজস্ব জমির ওপর পাহাড়িদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তাই ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে একটা অশান্তি লেগেই ছিল। বর্তমান ঘটনা এরই ধারাবাহিকতা। তবে এর সঙ্গে আরেকটা বিষয় যুক্ত হয়েছে। এটা হচ্ছে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাঙালি সেটেলারদের সেখানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে সংগঠিত করা হয়েছে পাহাড়ে তাদের দখলদারিত্ব কায়েমের জন্য। এর ফলে বাঙালিরা এখন এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে। এর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, পাহাড়ে সেনাবাহিনী এখনো বর্তমান। যদিও বলা হয়েছিল, সেখান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। বাঘাইছড়ির এই ঘটনার পেছনে এ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। পত্রপত্রিকাগুলোতে এ বিষয়টা পরিষ্কারভাবেই উঠে এসেছে। সব দিক বিবেচনা করে বলা যায় যে, এই ঘটনার জন্য সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং শান্তি চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াটাই দায়ী। সাপ্তাহিক : তাহলে আপনি বলছেন, সেনাবাহিনী সরকারের বিরোধিতা করছে? মেনন : অবস্থাদৃষ্টে আমার মনে হচ্ছে, সেনাবাহিনী সরকারের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করছে না। বরং তারা তাদের পুরনো সেই ‘অপারেশন উত্তরণের’ ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এবং সেই পথেই হাঁটছে। যে সমস্ত বিষয়ে তাদের জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না, সেখানেও তারা নিজেদের জড়াচ্ছে। সেনাবাহিনী ও পাহাড়ের স্থানীয় প্রশাসন উভয়কেই বুঝতে হবে এই চুক্তিটি সরকার করেছে এবং তারা সরকারের অধীন। সুতরাং চুক্তি অনুযায়ী তাদেরকে কাজ করতে হবে। সাপ্তাহিক : বর্তমান দুর্ঘটনা কি সরকারের পক্ষে এড়ানো সম্ভব ছিল না? মেনন : সরকারের পক্ষে অবশ্যই এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। যদি স্থানীয় প্রশাসনকে সরকার সঠিক উপায়ে কাজে লাগাতে পারত এবং তাদেরকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করা হতো তাহলে অবশ্যই এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। যে ইউএনওকে পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হলো, তাকে যদি আগেই ঠিক করা যেত অর্থাৎ জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের যদি সরকার সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারত এবং তারা যদি তাদের কাজগুলো ঠিকভাবে করত তাহলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত না। সাপ্তাহিক : তাহলে আপনি বলছেন, এই দুর্ঘটনার দায়ভার সরকারের? মেনন : প্রশাসনকে এই ব্যর্থতার দায়ভার তো নিতেই হবে। সাপ্তাহিক : সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে পাহাড়ে সহিংসতা বাড়ছে নাকি কমছে? মেনন : একটা সময় ছিল যখন সেনাবাহিনীর দরকার ছিল। তখন তাদের ভূমিকার ফলে পাহাড়ে সহিংসতা কমেছিল। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক স্বাভাবিক এবং শান্তিপূর্ণ। এখন পাহাড়ে সেনাবাহিনী রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। শান্তি চুক্তিতে বলা হয়েছিল তারা ক্যান্টনমেন্টে থাকবে। কিন্তু যেভাবে তারা বাইরে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের জড়াচ্ছে তাতে এখন তাদের ভূমিকাতেই পাহাড়ে অশান্তি নেমে আসছে বলে মনে হচ্ছে। সাপ্তাহিক : সেনাবাহিনী কেন সরিয়ে নেয়া হচ্ছে না? মেনন : পার্বত্য সমস্যার সমাধান করতে হলে অবশ্যই অতি দ্রুত সেখান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে। এই কাজটা করতে দেরি হচ্ছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের একটা প্রাকটিসের বিষয় জড়িত। নতুন নতুন অনেক বিষয়ে সরকার জড়িয়ে যাচ্ছে। তাই সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টা বিলম্বিত হচ্ছে। তবে আমি মনে করি, সরকারকে এই ব্যুহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যদিও এটা বেশ জটিল একটা কাজ। সাপ্তাহিক : বাঙালি সেটেলার প্রশ্নটির সমাধান কী হতে পারে? মেনন : বাঙালিদেরকে পাহাড় থেকে উঠিয়ে এনে সমতলে পুনর্বাসনের মাধ্যমেই একমাত্র এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি ঘটানো সম্ভব। ইতোপূর্বে যখন আমি শান্তি প্রক্রিয়ার আলোচনার মধ্যে ছিলাম, তখন এই বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছি এবং তখন আমরা বাঙালিদের সমতলে পুনর্বাসনের বিষয়ে একটা চুক্তির দিকেও এগিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি সরকারের আমলে ওই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত এবং বাতিল করা হয়েছে। এটা ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত জাতীয় কমিটির সময়কার কথা। পরবর্তীতে এই প্রশ্নটা অমীমাংসিত রেখেই শান্তি চুক্তি করা হয়েছিল। আমি মনে করি এই প্রশ্ন মীমাংসা করাটা কঠিন কিছু না। এর জন্য কয়েকটা কাজ সরকারকে করতে হবে। প্রথমত, বাঙালিদের নতুন করে অভিবাসন বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাহাড়ে অবস্থানরত বাঙালিদের রেশনিং বন্ধ করতে হবে। সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত কাজ হচ্ছে বাঙালিদের সমতলে পুনর্বাসন করতে হবে। সাপ্তাহিক : শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পথে কি কি বাধা আছে বলে আপনি মনে করেন? মেনন : শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়টা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে না পারাটা। সরকার চুক্তি করেছে ঠিকই কিন্তু তার নিম্নস্তরের প্রশাসনের কর্মকর্তারা সে অনুযায়ী কাজ করছে না। তাদের অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গি দুটোই অনড় রয়ে গেছে। তারা সরকারের নীতির যে মর্মবস্তু তা উপলব্ধি তো করছেই না, বরং অস্বীকার করছে। এ ছাড়া সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা পরিপূর্ণতা পায়নি, এটাও একটা বড় বিষয়। চুক্তিটা এই সরকারেরই করা। ইতোমধ্যে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। কিছু কিছু পদক্ষেপও সরকার নিয়েছে। কিন্তু চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের চেষ্টাটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। গত ৭ বছরে অর্থাৎ চারদলীয় জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যেসব জঞ্জাল জমেছে, সেগুলো দূর করাটা খুবই প্রয়োজনীয় একটা কাজ ছিল। কিন্তু সরকার তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সাপ্তাহিক : জেএসএস যে রোডম্যাপের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার তা মানছে না... মেনন : সরকার কেন এটা মানছে না তা আমার জানা নেই। তবে আমি বলতে পারি, অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সরকারকে বুঝতে হবে, চুক্তিটা সে করেছে। সুতরাং চুক্তির সকল ধারা-উপধারাকে সঠিক সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করার দায়িত্বটাও তার। জেএসএস বলল কি বলল না সেটা বড় ব্যাপার না। বড় ব্যাপার হচ্ছে, এটা করার দায়িত্ব সরকারেরই। সাপ্তাহিক : আন্দোলনকারী দুটি পক্ষ ইউপিডিএফ এবং জেএসএসের কর্মকাণ্ডকে কীভাবে দেখছেন? মেনন : ইউপিডিএফ সম্পর্কে বলার কিছু নেই। তারা তো সরাসরি শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করছে এবং এই সহিংসতায় ইউপিডিএফের এক ধরনের উস্কানি রয়েছে বলেও আমাদের মনে হচ্ছে। অনেকেই দাবি করে তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটা যোগসাজশ আছে। যদিও এই বিষয়টা আমার ভালোভাবে জানা নেই। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট, তারা চুক্তির বিরোধিতা করে উগ্রপন্থি একটা রাস্তায় হাঁটছে। এটা কোনোমতেই কাম্য নয়। ইউপিডিএফ সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার অভিমত হচ্ছে, তারা চুক্তির বিরোধিতা করে কার্যত পাহাড়ে অশান্তিই বজায় রাখছে। আর জেএসএস সংগঠিত এবং তারা আন্তরিকভাবে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই দিক থেকে তারা ইতিবাচক। তবে তারাও ক্রমাগত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে বলে আমার মনে হচ্ছে। সাপ্তাহিক : বর্তমান ঘটনার পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক যোগসূত্র রয়েছে কি? মেনন : আন্তর্জাতিক কোনো যোগসূত্র আমার চোখে পড়ছে না। তবে দেশীয় একটা চক্রের যোগসূত্র অবশ্যই আছে বলে আমি মনে করি। বিএনপি-জামায়াত জোট কতগুলো ইস্যুতে সরকারকে বিব্রত করার কর্মপন্থা গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে প্রধান একটা বিষয় হলো, পার্বত্য শান্তি চুক্তি। বিএনপি মহাসচিবের তৎপরতা থেকে এটা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। বাঘাইছড়ির ঘটনা ঘটার সঙ্গ সঙ্গেই তিনি বিবৃতি দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায় তারা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। আর জামায়াত তো পাহাড়ে সব সময়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য মুখিয়ে আছে। এটা ছাড়াও তারা শিক্ষানীতি ’৭২-এর সংবিধান পুনর্প্রবর্তন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো বিষয়গুলোতে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার জন্য ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। সাপ্তাহিক : ’৭২-এর সংবিধানের কথা বলছেন, কিন্তু এ সংবিধানে তো আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি... মেনন : দেয়া হয়নি, এটা ঠিক। আমাদের কথা হচ্ছে, এই ভুলটাকে সংশোধন করতে হবে। শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির পথটা উন্মোচিত হয়েছে। তাই পুরনো প্রশ্ন টেনে বর্তমানকে ঘোলাটে না করে বরং বর্তমানের উদ্যোগের দিকে তাকান। আমরা বলছি ’৭২-এর সংবিধানে যে ভুলটা ছিল, তা সংশোধন করে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে। সাপ্তাহিক : ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, আদিবাসীরা সংসদে বিল তুলেছিল, নিয়মমাফিক পথে এগিয়েছিল কিন্তু কোনো সমাধান না পেয়ে তারা সশস্ত্র সংগ্রামের পথ অবলম্বন করে। এখনো দেখা যাচ্ছে, একটা চুক্তি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না, বরং তাদের ওপর নিপীড়ন চলছে। আপনি কি মনে করেন পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, অর্থাৎ পাহাড়িরা আবারো সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে এগুতে পারে? মেনন : মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তো তারা এ ধরনের পথে যেতেই পারে। এ ধরনের কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটুক এটা আমরা চাই না। একটা সময় আমরাও এই পথে গিয়েছিলাম, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল বলেই। আমাদের জাতিসত্তার মুক্তির আর কোনো পথ না পেয়ে আমরাও লড়াই করেছি, দেশ স্বাধীন করেছি। অন্য একটি জাতিসত্তাও তাদের মুক্তির পথ খুঁজবে এটাই স্বাভাবিক। সরকারকে তাই এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়ানোর জন্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে। নচেৎ এ ধরনের ঘটনা ঘটেও বসতে পারে। |