Logo
 বর্ষ ৩ সংখ্যা ১৮ ১লা আশ্বিন, ১৪১৭ ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
‘এটা আসলে পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্ব না। একটা চক্রের ষড়যন্ত্র’ -ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়  
ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়। এই চাকমা রাজা পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সার্কেলেরও প্রধান। কাজ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পাহাড়িদের ভূমি অধিকার আদায়ে আইনগত দিক নিয়ে গবেষণা করছেন দীর্ঘদিন। পাহাড়িদের উন্নয়নেও কাজ করে যাচ্ছেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। জাতিসংঘে আদিবাসী সনদ তৈরিতে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। তার উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাব আদিবাসী সনদেও গৃহীত হয়েছে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্ট অসন্তোষ নিয়ে সাপ্তাহিক-এর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। আলোচনা করেন পাহাড়ে অসন্তোষের কারণ ও সমাধানের পথ নিয়ে। সামরিক বাহিনীর ভূমিকা, শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন, আদিবাসী অধিকার, পাহাড়িদের ভূমির ন্যায্যতা নিয়ে আলাপ হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মহিউদ্দিন নিলয় ও আনিস রায়হান।  ছবি তুলেছেন মাহ্মুদা তুলি
সাপ্তাহিক : হঠাৎ করেই পাহাড় অশান্ত হয়ে উঠেছে, এর পেছনে কারণগুলো কি কি বলে মনে করেন?
ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় : প্রকৃত কারণটা আমি কেবল অনুমানই করতে পারি। নিশ্চয়তা দিতে পারি না। তবে অনেকেই মনে করছেন, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সরকার তার নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে চাইছে বলে আমরা মনে করছি। এসব পরিকল্পনার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতিগোষ্ঠীর নিরপেক্ষতার মতো কয়েকটি বিষয় আছে, সেগুলোকে বাধাগ্রস্ত করার একটা চেষ্টা হিসেবে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তাহলে কার্যত দেশের একটা অংশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।
’৭৯-৮০-এর দিকে পাহাড়ে সরকার যে বাঙালি অভিবাসীদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেটাকে কেন্দ্র করে ভূমি বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। তখন অনেককে জমির কাগজ এবং ঘর দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে জমি দিতে পারেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটা মিথ্যা প্রচারণা আছে। অনেকেই বলে থাকেন যে, সেখানে অনেক অনাবাদী খাসজমি পড়ে আছে। এটা একটা মিথ্যা প্রচারণা। আইনগত দিক থেকে লক্ষ্য করলেও দেখা যাবে যে, পাহাড়ে কোনো খাসজমি নেই। কারণ, প্রজাস্বত্ব আইনটি আসলে পাহাড়ে বর্তায় না। এসব আইনি অনুসিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করেই পাহাড়ে বাঙালিদের ঢোকানো হয়েছিল এবং এর মধ্য দিয়ে বাঙালি ও পাহাড়িদের মধ্যে একটা কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হলো। তখন ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বাঙালিদের বাড়িগুলো সরিয়ে নেয়ার জন্য সরকারের কাছে একটা দাবিও তোলা হয়। কিন্তু তখন এ প্রশ্নের কোনো সমাধান না হওয়ায় এটা চাপা পড়ে থাকে। পরবর্তীতে এটাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি বাঙালি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ এবং ছোটখাটো কিছু দ্বন্দ্ব হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সেখানে পাহাড়িদের ঘর পুড়ছে, লাশ পড়ছে।
২০০৭-০৮-এর দিকে বাঙালি কিছু বাড়ি নতুন করে বানানো হয়। পাহাড়িরা তখন অভিযোগ আনে যে, সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালিরা সেখানে তাদের জমি দখল করে ঘরবাড়ি তুলছে। সরকারের প্রতি আমার আবেদন, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগটা বার বারই উঠেছে। সুতরাং এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা বাস্তবতই আছে কি না তা সরকারের যাচাই করা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি।
সাপ্তাহিক : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বন্ধ করা কিংবা দেশজুড়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টার সঙ্গে এর যোগসূত্রতা কতটুকু?
দেবাশীষ : এমনটা হতে পারে। এ জন্য আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে তার সঙ্গে পাহাড়ি বাঙালি কোনো পক্ষেরই দ্বিমত নেই। তবে কিছু কিছু মানুষ উস্কানি দিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সরকারকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাপ্তাহিক : ক্যাম্প প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনায় আসছে...
দেবাশীষ : একটা জিনিস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বাঘাইহাটে সেনাক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তাহলে এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখবেন? তাই বলা যায়, ক্যাম্প প্রত্যাহারের সঙ্গে এর কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। ডিজিএফআই, এনএসআই, এসবি, সেনাবাহিনী এদের সকলকে নিয়োগ করলে আসলে শান্তি নিশ্চিত হয় না। এ সবের মাধ্যমে বিরোধ আরো বাড়ে। সন্ত্রাস, আইন ভঙ্গ, জ্বালাও-পোড়াও, মারধরÑ এসব যারা করে তাদেরকে খুঁজে বের করতে হলে মানুষের কাছ থেকে তথ্য পেতে হবে। আর মানুষের কাছ থেকে তারাই তথ্য পাবে যারা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। এসব আগপিছ না ভেবে সন্ত্রাস দমনের জন্য সামরিক বাহিনী নামিয়ে দিলে আসলে সন্ত্রাস দমন কিছুই হয় না। যেটা হয় সেটা হচ্ছে নিপীড়ন, ব্যাপক গণমানুষের ওপর নিপীড়ন। এটা তো সরকারের লক্ষ্য না। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে সমস্যা সমাধান করা। সত্যিকারার্থে সমস্যা সমাধান করতে হলে সবাইকে সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এটা কিন্তু সব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না।
তাছাড়া, সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের বিষয়টা নতুন কিছু না। এটা এরশাদের আমলেও হয়েছে, বিএনপির আমলেও হয়েছে। এই সরকারও তা করছে। কিন্তু সেনাবাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহারের কাজটি এখনো এই সরকার করতে পারেনি।
সাপ্তাহিক : পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন করণীয় কি আছে?
দেবাশীষ : অভিযোগ উঠেছে, সেনাবাহিনীকে গুলি করা হয়েছে। এটা অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। স্থানীয় প্রশাসন সম্পর্কেও অভিযোগ উঠেছে। মানুষ বলছে, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এটা কেন হবে? এসব ক্ষেত্রে সাধারণত স্থানীয় প্রশাসন ও জননেতৃবৃন্দের মধ্যে বৈঠক হয়। আলাপ-আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছার এবং উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি নিরবচ্ছিন্ন, নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এখনো নতুন করে জ্বলে উঠছে মহল্লার পর মহল্লা। পাহাড়ের স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চস্তরে এবং সেনাবাহিনীতে পাহাড়িদের কোনো অংশীদারিত্ব দেখা যাচ্ছে না। বাঙালি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এখন পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্দেশ দিচ্ছেন। এদের উপরে আবার সেনাবাহিনীর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে শোনা যায়। সুতরাং তাদের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে আবার কাউকে আশ্রয়ও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে পাহাড়িদের স্বার্থ দেখার মতো তাদের নিজেদের কোনো প্রতিনিধি নেই। এটা একটা বড় সমস্যা। এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দ্রুত সরকারকে সব ধরনের মানুষকে সঙ্গে রেখেই উদ্যোগ নিতে হবে। এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত। এটা সংসদীয় কিংবা বিচার বিভাগীয় যে কোনোভাবে হতে পারে। সকল সংস্থা, প্রতিষ্ঠান যাতে সরকারকে এ তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে পরবর্তীতে তাদের ওপর কোনো নিপীড়ন নেমে আসবে না। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে মানুষ ভয়েই মুখ খুলবে না। এ তদন্ত সুষ্ঠুভাবে, নিরপেক্ষভাবে করা গেলেই কেবল পরবর্তীতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে তেমন উদ্যোগ সরকার নিতে পারবে এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তি বিধান করতে পারবে।
সাপ্তাহিক : পাহাড়ে অন্যতম সমস্যা হলো ভূমি বিরোধ, এই বিরোধ নিষ্পত্তি কীভাবে সম্ভব বলে মনে করেন?
দেবাশীষ : ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা সেনাবাহিনীর কাজ নয়। ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত কোনো দ্বন্দ্ব হলে আদালত আছে, ভূমি কমিশন আছে তারা এর নিষ্পত্তি করবে। এটা করার মতো প্রশিক্ষণ সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়নি এবং এটা তার কাজও নয়। আমার মত হচ্ছে, পাহাড়ে ভূমি বিষয়ে সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বা বিডিআরের পক্ষ থেকে যেন কোনো সিদ্ধান্ত না দেয়া হয়। সরকারকে স্পষ্ট আদেশ দিয়ে এ ধরনের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে এবং এর দায়িত্ব আদালত ও ভূমি কমিশনের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এটা করা গেলে ভূমিকে কেন্দ্র করে বিরোধ বহুলাংশে কমে যাবে।
তবে ভূমি কমিশনের কাজ শুরু করার আগে একটি প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়ে গেছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর সঙ্গে পার্বত্য শান্তি চুক্তির কিছু অসঙ্গতি রয়েছে এবং ঐ আইনে গণতান্ত্রিক মতের প্রতিফলনের ক্ষেত্রেও কিছু ত্রুটি আছে। যেমন, ওই আইনে বলা হয়েছে, কমিশনের সদস্যদের মধ্যে কোনো বিষয়ে যদি ঐকমত্য না ঘটে তাহলে কমিশনের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে। এটা কোনো গণতান্ত্রিক রীতি হতে পারে না। এমনকি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টেও এ ধরনের কোনো নিয়ম নেই। এ ত্রুটিটি দূর করতে হবে এবং শান্তি চুক্তির সঙ্গে ওই আইনের অসামঞ্জস্য দূরীভূত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রীসহ অন্যান্য যারা এ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আছেন, আমারও যদি কোনো ভূমিকা রাখার প্রয়োজন পড়ে আমি তা রাখতে প্রস্তুত। সকলে মিলে এ আইনটিকে ত্রুটিমুক্ত করে এর চূড়ান্ত রূপ তৈরি করতে হবে। এ কাজটা দ্রুতই করতে হবে।
সাপ্তাহিক : পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী...
রাজা দেবাশীষ : মিশ্র পুলিশ বাহিনী আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৮৯ সালের যে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ছিল। এটা সেখানেও বলা হয়েছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও সেটা উঠে এসেছে। বলা হয়েছিল যে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের পুলিশ বাহিনী গঠিত হবে। এমনকি শান্তি চুক্তির আগেও একটি আনুপাতিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলÑ যা কি না আজো বাস্তবায়িত হয়নি।
যেমন, ঠরষষধমব উবভবহংব ঢ়ধৎঃু বা ভিডিপির কথাই ধরা যাক। পাহাড়ি অঞ্চলে তো পাহাড়ি ভিডিপি দেখা যাচ্ছে না। ১০০ জনের মধ্যে ৩ জন পাহাড়িও তো সেখানে নেই। তাহলে কি পাহাড়িদের ভিডিপি হবে না? পাহাড়িদের গ্রামে কি নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই? পাহাড়িদের অধিকার কোনো বিশেষ অধিকার না। বাংলাদেশের সংবিধান বা মানবাধিকার আইনে এর কোনো ভিত্তি নেই। বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে পাহাড়িদের বিচ্ছিন্নতা ছিল বা তারা ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে ছিল। সেই দূরত্বটা ঘোচাতে রাষ্ট্র একটা বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে। এটাকে বিশেষ অধিকার বলা চলে না। সংবিধানেও ২৮ ধারার ৪ উপধারায় এই বিষয়টার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র সমাজের অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারবে। এই বিশেষ ব্যবস্থা নেয়াকে কারো সমঅধিকার লঙ্ঘন হিসেবে পরিগণিত হবে না। এসব প্রশ্নের সমাধানে সরকারকে দ্রুতই পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাপ্তাহিক : আদিবাসী অধিকার এর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ও আমাদের অবস্থানটা যদি একটু ব্যাখ্যা করেন...
দেবাশীষ : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এই বিষয়টা স্পষ্টভাবে বলা আছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে আদিবাসী সনদও গৃহীত হয়েছে। এটা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়, এ জন্য যে, বিগত ৩০০ বছর ধরে সারা পৃথিবীতে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় সংবিধান প্রণয়ন, আইন প্রণয়ন, নীতি প্রণয়ন, প্রশাসন, উন্নয়ন এবং সমস্ত ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী যে প্রক্রিয়া ছিল তাতে আদিবাসীদের আসলে কোনো ভূমিকা ছিল না। তা সেটা আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, বাংলাদেশ কিংবা পৃথিবীর যে কোনো দেশই হোক না কেন। ’৭২-এ এম এন লারমা তৎকালীন আইন পরিষদে চিটাগাং হিলট্রাক্স রেগুলেশন ১৯০০-এর স্বীকৃতি, উপজাতীয় প্রধানদের দপ্তর সংরক্ষণ এবং বাঙালি অনুপ্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কিছু দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু তখন তা গৃহীত হয়নি। যদি তখন সে সমস্ত দাবি মেনে নেয়া হতো তাহলে আজ এই সশস্ত্র সংগ্রাম হতো না। অন্যান্য জেলা থেকে বাঙালিরা এসে এখানে বসতি গড়ত না। যদিও আমি মনে করি এটা আসলে পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্ব না। এটা একটা চক্রের ষড়যন্ত্র। যাই হোক, এসব ঘটে আসছে ঐতিহাসিকভাবেই। এ জন্যই মানবাধিকার একটা ছোট্ট জানালা দিয়ে আদিবাসীদের সামনে উঠে আসার একটা সুযোগ করে দিচ্ছে। আমি এ জন্যই এটাকে দরজা বলছি না যে, এটা আসলে ততটা প্রশস্ত না। দীপঙ্কর তালুকদার প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন কিন্তু তিনি এখনো ড্রয়িং রুমে বসার মতো জায়গায় যেতে পারেননি। তিনি ছোট্ট একটা ঘরে বসেন, আসলে তার পূর্ণ ক্ষমতা নেই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে আদিবাসীদের সকল চাওয়া প্রতিষ্ঠিত হতে এখনো অনেক সময় লাগবে।
সাপ্তাহিক : সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলছিলেন...
দেবাশীষ : মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, রাষ্ট্রকে বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এই বিশেষটা একটু ব্যাখ্যা করার দরকার। স্বাস্থ্যনীতির কথাই ধরা যাক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে প্রসূতি মায়েরা তো উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। তারা পাহাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভৌগোলিক অবস্থার কারণে একটা সমস্যায় পড়ছে। তারা সার্জারি আছে এমন হাসপাতাল সুবিধা পাচ্ছে না। এমএসএফের হেলিকপ্টারের কথা বাদই দিলাম। ফলাফল হচ্ছে, মা ও শিশু মারা যাচ্ছে। সুতরাং যে শিশুটি আজ জন্ম নিতে যাচ্ছে সে পার্বত্য অঞ্চলের প্রত্যন্ততার জন্য সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত সুবিধাটুকুও গ্রহণ করতে পারবে না। এটা তো হতে পারে না। আবার প্রাথমিক শিক্ষানীতির কথা ধরা যাক। নিয়মকানুন আছে অনেক। এত বর্গমাইলের মধ্যে ১টার বেশি স্কুল থাকতে পারবে না। শিক্ষকের যোগ্যতা অমুক হতে হবে, তাকে অমুক কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হতে হবে। এত ছাত্র না হলে সরকার স্কুলকে কোনো সহায়তা করবে না। পাহাড়ে এগুলো প্রয়োগ করবেন কীভাবে? আকাশ পথে হিসাব করলে পাহাড়ে জায়গা অল্প। কিন্তু উঁচু-নিচু পথ হেঁটে যেতে দেখা যায় সময় লাগছে অনেক এবং দূরত্বটাও বেড়ে যাচ্ছে। সুতরাং ছোট ছোট স্কুলবয়দের পক্ষে আসলে কতদূর যাওয়া সম্ভব? সুতরাং পার্বত্য অঞ্চলের প্রত্যন্ততার জন্যই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এই বিশেষ অন্য কোনো বিশেষ না।
সাপ্তাহিক : বিগত ১৩ বছরে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি আসলে কতটুকু?
দেবাশীষ : এটা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। গ্লাস অর্ধেক ভরা যেমন বলা যায়, তেমনি গ্লাসটা অর্ধেক খালি এটাও বলা যায়। তবে এটা আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, গ্লাসটা আসলে এখনো অনেকটাই খালি। এখনো যেভাবে পাহাড়ে সেনা ক্যাম্পগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাতে প্রশাসন তথা জেলা প্রশাসক, ইউএনও এবং আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষে তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে অস্ত্রধারীরাই সরকার। ক্যাপ্টেন সাহেব থাকতে তো তারা অন্য কারো কাছে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেনাবাহিনীকে সিভিল সমস্যা মেটানোর কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। তারা এর উপযুক্ত না। এর জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনীই যথোপযুক্ত। প্রয়োজন মনে করলে সরকার পার্বত্য অঞ্চলে দায়িত্বরত পুলিশদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে পারে। তাদের আরো আধুনিকায়ন ঘটাতে পারে।
সাপ্তাহিক : চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে রোডম্যাপের কথা উঠে আসছে, আপনার কী মনে হয়?
দেবাশীষ : এ ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে নানা ধরনের মতামত উঠে আসছে। কেউ কেউ রোডম্যাপের কথা বলছে। এটাকে যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এমনকি কোনো নাম না দিয়েও সরকার যদি চুক্তির কোন দিকটা কখন, কীভাবে কার মাধ্যমে করবে এটা পরিষ্কার করে একটা ঘোষণা দেয় তাহলে চুক্তি বাস্তবায়নের কাজটা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এভাবে সময় এবং অন্য বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট না করা হলে চুক্তি বাস্তবায়ন আরো বিলম্বিত হয়ে পড়বে।
সাপ্তাহিক : চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলেই কি পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে?
দেবাশীষ : চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে পাহাড়িদের সমস্যা অনেকাংশে মিটে যাবে। তবে চুক্তিটা একটা দলিল মাত্র। ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য অঞ্চলবাসীরা যে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন ছিল এবং এখনো যার প্রভাব কিছুটা হলেও আছে। আসলে এটাকে দূর করতে হবে। অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার, জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদকে তাদের আইনগত ভূমিকা রাখতে দেয়া, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সমস্যা দূর করতে হবে। আরেকটা কাজ করতে হবে, আদিবাসী নাকি উপজাতি এই দ্বন্দ্বের সমাধান করতে হবে। উপজাতি বলতে কিছু নেই। উপজাতি শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে বর্বর, অশিক্ষিত জংলি এবং আরো অনেক কিছু। আদিবাসীরা যখন যে সমস্ত অঞ্চলে বসতি গড়েছিল, সেখান থেকে কাউকে তারা উচ্ছেদ করেনি এবং সেখানে তখন কোনো বসতিও ছিল না। আদি থেকে সেখানে আছে বলেই তারা আদিবাসী। পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালিরা প্রথম যখন গিয়েছিল সেখানে তখন বর্তমান অধিবাসীদেরই তারা দেখতে পেয়েছিল। অনেকেই বলে থাকে যে, বঙ্গবন্ধু পাহাড়িদের বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিলেন। আমি মনে করি, এটা একটা অপব্যাখ্যা। বরং তৎকালীন পাহাড়ি এবং অন্যান্য নেতারা তাকে পাহাড়ের সমস্যাগুলো বোঝাতে পারেননি। এটা তাদেরই ব্যর্থতা।
সাপ্তাহিক : চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রশ্নে আপনি কতটা আশাবাদী?
দেবাশীষ : মানুষ আসলে আশা নিয়েই বাঁচে। আমিও তাই যথেষ্ট আশাবাদী। কিন্তু একটু আশঙ্কা আছে। কথা থেকে কাজে যাওয়ার ক্ষেত্রে সময় লেগে যাচ্ছে অনেক। সরকারকে সময় ধরে সবকিছু সুনির্দিষ্ট করে কাজগুলো করতে হবে। তার পরও যে সবকিছু হবে এমনটা আমি আশা করছি না। তবে মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হওয়া দরকার। এটা করতে পারলে সরকারেরই ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটা মৌলিক ক্ষত দূর হবে। এমনকি এটা সারা বিশ্বের জন্যও একটা নজির সৃষ্টি করবে।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :
বর্তমান সংথ্যা
পুরানো সংথ্যা
Click to see Archive
 
 
 
Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive