সাতক্ষীরা আল মামুন খান সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূমিহীন ও কৃষক আন্দোলনের পথিকৃৎ জেলা ভূমিহীন সমিতির প্রধান উপদেষ্টা, কেন্দ্রীয় কৃষক সংগ্রাম সমিতির সহ-সভাপতি কৃষক ও ভূমিহীনদের প্রিয় নেতা সাইফুল্লাহ লস্কর (৬৪) নিহত হয়েছেন। ৪ ডিসেম্বর ভোরে শহরের লস্করপাড়া এলাকায় তার বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি ছোট কাঠঘর থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। জেলা ভূমিহীন সমিতি তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। ঘটনাস্থল ও তার শরীরের একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখে তার মৃত্যু যে স্বাভাবিক নয় এমন মন্তব্য করেছেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা। এদিকে তার মৃত্যুর ঘটনায় জেলার ভূমিহীন উচ্ছেদ প্রতিরোধ সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি, কৃষক সংগ্রাম সমিতি এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ঐক্যফ্রন্ট কেন্দ্রীয়ভাবে একের পর এক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করছে। এমনকি ভূমিহীন ও কৃষকদের কয়েকটি সংগঠন তার লাশ নিয়ে শহরে মিছিল বের করে এবং বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। তারা মিছিলে সরাসরি পুলিশকে হত্যাকারী চিহ্নিত করে স্লোগান দেয়। একই সঙ্গে তারা সাতক্ষীরার এসপিকে হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিচার দাবি করে। সাইফুল্লাহ লস্কর প্রথম জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি থেকে ভাসানী ন্যাপ এবং পরে গোপন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। দীর্ঘকাল যাবৎ তিনি পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। গত প্রায় দেড় দশক যাবৎ তিনি গোপন রাজনীতি থেকে সরে আসেন। পরে তিনি বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতিতে যোগ দেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ছিলেন। সাইফুল্লাহ লস্কর নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির মৃণালের কর্মকা-ের বিপক্ষে দলগতভাবে কঠোর অবস্থান নেন। পুলিশ এই বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। গোপন দলীয় কোনো সংগঠন তাকে হত্যা করে কোনো সুবিধা গ্রহণ করতে চেয়েছে কিনা সে বিষয়টি তদন্তে এসেছে। একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্যতে জানা গেছে শহরের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে সাইফুল্লাহ লস্করের বিরোধ ছিল। তারা তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছিল এমন গোপন খবরের ভিত্তিতে পুলিশ হত্যার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এদিকে ভূমিহীনদের মধ্যে একাধিক গ্র“প রয়েছে। গত ১৫ নবেম্বর দেবহাটার নোড়ায় বন্দোবস্তকৃত একটি জলমহল ভূমিহীনরা দখল করে নেয়। ভূমিহীন নেতা সাইফুল্লাহ লস্কর এই দখলকে অবৈধ মন্তব্য করে এর বিরুদ্ধে বিবৃতিও প্রদান করেন। অপরদিকে ভূমিদস্যুরা তাকে পুলিশের সহায়তায় হত্যা করে থাকতে পারে এমন অভিযোগও উঠেছে।
ফিরে দেখা চিংড়ি চাষের জন্য বিখ্যাত হওয়ায় সাতক্ষীরা জেলার হাজার হাজার একর তালিকাভুক্ত এবং তালিকা বহির্ভূত খাস জমি ভূমিদস্যুরা বৈধ-অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে ভূমিহীনদের যেসব খাস জমি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে তাদের অনেকেই জমির দখল নিতে পারেনি। আবার ভূমিহীনদের ডিসিআরের মাধ্যমে একসনা বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে এমন জমিও শ্রেণী পরিবর্তন করে ভূমিহীনদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। চিংড়ি চাষের কারণে অল্প জমির মালিক প্রান্তিক কৃষক তার জমি হারিয়ে ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। যে কারণে জেলায় ভূমিহীন সমস্যা প্রকট। সাইফুল্লাহ লস্কর এই ভূমিহীনদের সমস্যা সমাধানের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করছিলেন। ১৯৯৮ সালে সাতক্ষীরার দেবহাটা-কালীগঞ্জে তথাকথিত বিশেষ জলমহালে অবস্থিত ৯টি গ্রামে বসবাসরত ভূমিহীনদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তার নেতা ছিলেন সাইফুল্লাহ লস্কর। জোট সরকারের আমলে ৯টি তথাকথিত জলমহালের একটি নোড়ার চারকুনী আবাদ নামমাত্র মূল্যে রাজনৈতিক বিবেচনায় চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দেয়া হয়। এর বিরুদ্ধে সাইফুল্লাহ লস্কর আন্দোলন সংগ্রাম করেন এবং আইন আদালতের আশ্রয় নেন। এক পর্যায়ে জোট সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে ইজারা গ্রহীতা তথাকথিত মৎস্যজীবী সমিতির দখলীয় নোড়ার চারকুনী আবাদের ৪৪৬ একর জমির খ-টি ভূমিহীনরা পুনরায় দখল করে নেয়। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে লিজ গ্রহীতা। এরই মধ্যে আপনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হওয়ার পর নোড়ার চারকুনী আবাদের লিজ গ্রহীতাসহ অন্যান্য ভূমিদস্যুরা পুনরায় এলাকায় ফিরে আসে এবং ১৯৯৮ সাল থেকে ভূমিহীন আন্দোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিদস্যুরা একত্রিত হতে থাকে।
নাককাটা সাঈদ গ্রেফতার বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, সাতক্ষীরা জেলা ভূমিহীন সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সাইফুল্লাহ লস্কর হত্যা মামলায় আবু সাঈদ ওরফে নাককাটা সাঈদকে (৪৫) পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার থানাঘাটা গ্রামের আবুল খায়েরের ছেলে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে পুলিশ তাকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। এ নিয়ে চাঞ্চল্যকর সাইফুল্লাহ লস্কর হত্যা মামলায় ১ জন ইউপি চেয়ারম্যানসহ ২ জনকে গ্রেফতার করা হলো। সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসেম খান জানান, কৃষক নেতা সাইফুল্লাহ লস্কর হত্যা হওয়ার পর থেকে আবু সাঈদ ওরফে নাককাটা সাঈদ গা ঢাকা দেয়। সম্প্রতি সে এলাকায় ফিরে আসে। সাইফুল্লাহ লস্কর হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। সাতক্ষীরার এক শীর্ষ সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু সাঈদ ওরফে কানকাটা সাঈদ।
লস্কার হত্যার বিচার দাবিতে আন্দোলন হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে অ্যাডভোকেট আব্দুর রহিমকে আহ্বায়ক ও অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির পক্ষ থেকে গত ১০ ডিসেম্বর থেকে সাতক্ষীরা জেলা সদরসহ সাতটি উপজেলায় কমপক্ষে ২৫টি সমাবেশ করা হয়। সেখানে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার এসএম মনিরুজ্জামান ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাইফুল্লাহ লস্কর হত্যা মামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বক্তব্য রাখা হয়। |