সৈয়দ রুমী উত্তরের রেলপথ এখনো ব্লাকাররাই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তাদের কথায় ঘুরছে রেলের চাকা। থামছে স্টেশনবিহীন রেলগাড়ি। রেলওয়ের ৮টি দায়িত্বশীল দপ্তরে প্রকাশ্যে নগদ লক্ষ্মী অর্থ দিয়ে ব্লাকাররা তাদের এ আধিপত্যকে টিকিয়ে রেখেছে। সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে ব্লাকারদের ট্রানজিট রুট রেলপথে দিনাজপুর জেলামুখী। প্রায় ৩ হাজার নারী ও পুরুষ সমান তালে একে অপরকে টেক্কা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে ব্লাকারের পেশা। এরা নিজেদের কাজে হেল্পার হিসেবে ব্যবহার করছে প্রায় ৩ শতাধিক কিশোর বয়সী ছেলে-মেয়েকে। এরা বাংলাদেশি পণ্য সরবরাহ করে ভারতীয় হরেকরকম নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্য আমদানি করে টিকিয়ে রেখেছে। রেল বিভাগের গার্ড হিসেবে কর্মরত খুলনার এসএ খান জানান, যারা ব্লাকার পেশায় রয়েছে তাদের কারো পায়ের নিচে মাটি নেই! ওরা সবাই বিভিন্ন এনজিওর কাছে ঋণের ভারে জর্জরিত। এমন কোনো এনজিও নেই যার কাছে ওরা ঋণ নেয়নি। মাঝে মধ্যেই ওদের মালামাল বিডিআরের কাছে ধরা পড়ে তবুও ওদের লজ্জা নেই। যেন মরণ কামড় দিয়ে এ পেশাকে বেছে নিয়েছে ওরা। এ কথা বলেই নিজের প্রাপ্যটা কড়ায় গ-ায় বুঝে নিলেন আন্তঃনগর রূপসা ট্রেনের ওই গার্ড। ব্লাকাররা বর্তমানে দিনাজপুর রেল রুটে চলাচলরত রূপসাসহ ২টি আন্তঃনগর ও ২টি লোকাল ট্রেনকে পণ্য আনার কাজে ব্যবহার করে আসছে। জয়পুরহাট, পাঁচবিবি, দর্শনা, বিরামপুর, হিলি এবং পার্বতীপুর রেলস্টেশন তাদের বাণিজ্যিক প্লাটফর্ম বলে জানা যায়। তারা ভারতীয় শাড়ি, সার, জিরা, গুঁড়োদুধ, আপেল, কমলা ও নানা রকম কস্মেটিক্স সামগ্রী আনা-নেয়ার মাঝে হরহামেশা আনছে অনাগ্রা, ভায়াগ্রাসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত নেশা জাতীয় ট্যাবলেট ডেক্সামেথাসন, নিউরোরিয়ান, কো-ফেরোফন এবং ওএমকে ট্যাবলেট ছাড়াও ফেনসিডিল। কুষ্টিয়ার পোড়াদহ স্টেশন অঞ্চলের বড় আলচারা গ্রামের মহিলা ব্লাকার সাগরী (৩৮) জানায়, তারা প্রতিবস্তা মালা বহন করে নিয়ে আসার পথে ৮টি ঘাটে ঘুষ দিয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম জিআরপি, টিটি, গার্ড, আরএনবি ও লাইনম্যান রয়েছে। সবাইকে পৃথক পৃথকভাবে ঘুষ দিতে হয়। সমস্ত ব্লাকার যারা ভারতীয় পণ্য ছাড়াও অবৈধ মালামাল বহন করে আনে রেলপথে তাদের কেউ আন্তঃনগর রেলের বিলাস সিটে বসার সাহস করে না। এদের ঠাঁই মেলে রেলের প্রতি কামরার টয়লেটের সম্মুখে আর গেটের কাছে। সাগরী জানায়, বস্তাপ্রতি তাকে ৮০/৯০ টাকা খরচ করতে হয়। তার এলাকার পোড়াদহের প্রায় ৬০ জন নারী-পুরুষ রয়েছে ব্লাকার পেশায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঈশ্বরদী জংশন থেকে দিনাজপুর রেলপথের মাঝে রয়েছে হিলি স্টেশন। এ স্টেশনটি ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় বলে এর কদর ব্লাকারদের কাছে বড় বেশি। হিলি স্টেশন পাওয়ার আগে ঠিক ৫ কি.মি. দূরবর্তী স্থানে ব্লাকারদের ইঙ্গিতেই থেকে যায় আন্তঃনগর রেলগাড়ির চাকা। এ সময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় যেমন প্রহরিরত বিডিআর তেমনি রেলের ভেতর থেকে টিটি, গার্ড, পুলিশ দেখতে থাকে একইভাবে। ঈশ্বরদী রেল জংশন থেকে দিনাজপুর অভিমুখের রেলযাত্রী পাবনার দিশারী মহিলা উন্নয়ন সংস্থার সভানেত্রী নাসরিন রশীদ ও সূচিতা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন পারভীন ছাড়াও নওগাঁ জেলার আশ্রয় সমাজকল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আলো দাস মন্তব্য করলেন সীমান্তের প্রহরি এবং রেল বিভাগের লোকবলকে ব্লাকারদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, টিটিরা টিকেট ছাড়া ব্লাকার যাত্রীদের কাছ থেকে যে অর্থ আয় করেন তা তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন না। ভাগাভাগি করে নেন নিজেদের মধ্যে। স্টেশন মাস্টারও থাকেন তাদের ভাগিদার হিসেবে। পুলিশও ব্লাকারদের অবৈধ মালামাল ভেদে কমিশন তুলতে কড়া শাসন চালিয়ে থাকে। স্টেশন ছাড়াই যেখানে ব্লাকারদের ইঙ্গিতে ট্রেনের চাকা থেমে যায় অনির্দিষ্টভাবে। সেখানে কেবলমাত্র ২/১ জন বিডিআরকে দেখা যায় লাঠি উঁচিয়ে শাসাতে। ৫ কি.মি. দূরবর্তী থেকে ফের হিলি স্টেশন পাওয়ার ২ কি.মি. দূরে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে পড়ে ট্রেন। যারা নেমেছিল সেই সব ব্লাকারদের তুলে নেয়ার জন্য। অতঃপর হিলি স্টেশনে পা দিতে না দিতেই অপর প্রান্ত থেকে ফিরে আসে আরেকটি আন্তঃনগর ট্রেন। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেন বদলে ফেলে ওদের অনেকেই। প্রতিদিন লোকাল এবং স্পেশাল ওই ৪টি ট্রেনকে জিম্মি করে রেখে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ বাণিজ্য। ওদের মধ্যে প্রায় শতাধিক যুবক আছে। তারা ফেনসিডিল খায় এবং বিক্রির জন্য কিনে আনে ওপার থেকে। রেল পুলিশ জমির, জানায়, ফেনসিডিল খাদক এবং ব্যবসায়ী যুবকরা রেলের ক্যান্টিন দখল করে থাকে। এদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ ঠিকমতো ক্যান্টিনে চলাচল করতে এবং খেতে পারে না। বিডিআর ঘুষ না দিলে স্টেশন মাস্টার প্লাটফর্মে রেলগাড়ি থামায় না। সূত্রে আরো জানা যায়, এপার থেকে টাকা হুন্ডি করে নিয়ে যায়, আরো নিয়ে যায় দু টাকার কয়েনগুলো অনেক এলাকার ব্লাকার। গত ২৩ জানুয়ারি র্যাব-১২ পাবনা ক্যাম্পের সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এদিন শনিবার সন্ধ্যায় ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে দিনাজপুর থেকে খুলনাগামী রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেন থামিয়ে তল্লাশি চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে ৪০০ পিস অনাগ্রা, ১০০ পিস ভায়াগ্রা, ৩০০ পিস কো-ফেরোফন, ১০ হাজার পিস ডেক্সামেথাসন, ৫০ পিস নিউরোরিয়ান এবং ১ হাজার পিস ওএমকে নিষিদ্ধ ঘোষিত নেশা জাতীয় ট্যাবলেট। ট্রেনের মাঝখানের বগিতে একটি কাপড়ের ব্যাগে এসব নেশা জাতীয় ট্যাবলেট রাখা ছিল। এভাবেই সীমান্তের ওপার থেকে আসছে ব্লাকারদের বাণিজ্যনীতির ক্যারিশমায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদসহ মরণ ছোবলমুখী নেশা জাতীয় পণ্য।